somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইনকুইজিশন!

০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০১১ বিকাল ৪:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মধ্যযুগে খ্রিস্টান ধর্মের বিরোধীদের ওপর জিজ্ঞাসাবাদের নামে ভয়াভহ নির্যাতন চালানো হত। এই ভয়াবহ পদ্ধতিটিই ‘’ইনকুইজিশন নামে পরিচিত। ইনকুইজিশন শব্দটি লাতিন এবং অর্থও কিন্তু তেমন ভয়ঙ্কর নয়- period of intense questioning এবং harsh investigation;কিন্তু,জিজ্ঞাসাবাদের নামে সন্দেহভাজন ব্যক্তির এক রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার মুখোমুখী হতে হত। ইনকুইজিশন চলেছিল ১২৩১ থেকে ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দ অব্দি। এই সময়কারে কেবল আত্মস্বীকৃত খ্রিস্ট বিরোধী নয়, বহু নিরপরাধ মানুষ কে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল। বিশেষ করে নারীদের ডাউনি সন্দেহে অভিযুক্ত করে ইনকুইজিশন-এর মুখোমুখী দাড় করানো হত । এমন কী দু-বছরের শিশুকেও গরম পানি ভর্তি কড়াইয়ে ছুড়ে হত্যা করেছিল ...




রোমান সাম্রাজ্যের মানচিত্র। এই সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে ধর্মান্ধ যাজক শ্রেণির আধিপত্য ছিল বলেই বিরাজ করছিল এক মধ্যযুগীয় অন্ধকার।

খ্রিস্টান ধর্মের উদ্ভবের সময় রোমান দের নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। রোমান সাম্রাজ্যে
নব্যখিস্ট্রানদের ক্ষুধার্ত সিংহের সামনে ছেড়ে দেওয়া হত কিংবা জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হত। এই ধর্মের প্রবর্তককেও ক্রশবিদ্ধ করা হয়েছিল। যা হোক। এরপর রোমান সম্রাট কন্সটানটাইন ৩১৩ খ্রিস্টাব্দে খ্রিষ্টান ধর্ম কে রোমান সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রধর্ম ঘোষনা করেন। এর পরপরই ইউরোপে খ্রিস্টধর্মটি বিকাশ হতে থাকে। পঞ্চম শতকে বর্বর জার্মানিক গোষ্ঠীসমূহ খ্রিস্টধর্ম গ্রহন করে। মধ্যযুগে ক্যাথলিক চার্চ ইউরোপে উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ক্ষমতা অর্জন করে। তবে সামান্য হলেও heretic দের বিরোধীতা ছিল। হেরেটিক শব্দটির অর্থ হল:somebody who holds unorthodox religious belief: অপরদিকে অর্থডোক্স শব্দটির মানে হল: ঐতিহ্যবাহী ধর্মমত, অর্থাৎ খ্রিস্টান ধর্ম। হেরেটিকরা খোলাখুলিই খ্রিস্টান ধর্ম অস্বীকার করত এবং তাদের মতামত প্রচার করত। তারা দাবী করত তারা শয়তানের প্ররোচনার ফলে নয় বরং বিচার বিশ্লেষন করেই খ্রিস্টবিরোধী সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে । যা হোক। খ্রিস্টান চার্চের কর্তৃত্ব ধরে রাখার জন্যই কর্তৃপক্ষ heretic দের বন্দি করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে।




ইনকুইজিশন চলাকালীন সময়ে কেবল আত্মস্বীকৃত খ্রিস্ট বিরোধী নয়, বহু নিরপরাধ মানুষই নির্যাতনের শিকার হয়েছিল।

রাষ্ট্রীয়ভাবে রোমান সাম্রাজ্যে ইনকুইজিশন এর আরম্ভ ১২৩১ খ্রিস্টাব্দে, যখন পোপ ষস্ট গ্রেগরি ওই বিষয়ে একটি অধ্যাদেশ অনুমোদন করেন। তিনি হেরেটিকদের শাস্তি দিতে ট্রাইবুনাল প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ দেন । ওই সময়ে ডোমেনিকান অর্ডারের সাধুগন ছিলেন শিক্ষিত ও ভদ্র; এদের ওপরই ইনকুইজিশন-এর দায়িত্ব দেওয়া হয়! আর তারা যেন অপেক্ষা করে ছিল। কেননা, দশম -একাদশ শতকে ইউরোপে বহু উপদল ও সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়েছিল। এরাই প্রথম ইনকুইজিশনের শিকার হয়। যেমন ক্যাটহার-রা। এরা ‘বিশুদ্ধবাদী’ নামে পরিচিত ছিল। দক্ষিণ ফ্রান্সে এদের সংখ্যা বেশি ছিল। সে সময় ফ্রান্স ছিল রোমান সাম্রাজ্যের অধীন। ক্যাটহার-রা হেরেটিক ছিল কেননা এদের শিক্ষা ও বিশ্বাসের সঙ্গে রোমান ক্যাথলিকদের শিক্ষার ও বিশ্বাসের ফারাক ছিল। এরা ছিল দ্বৈতাবাদী। তারা দু জন ঈশ্বরে বিশ্বাস করত। শুভ এবং অশুভ ঈশ্বর। শুভ ঈশ্বর স্বর্গ এবং আধ্যাত্মিক বস্তুসমূহ সৃষ্টি করেছেন এবং অশুভ ঈশ্বর ভৌত জগৎ সৃষ্টি করেছেন। সুতারাং ট্রাইবুনালে ক্যাটহার সম্প্রদায়ের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হল। ডাকা হল মানে- বিচারের নামে পুড়িয়ে মারা হল আর কী।



ইনকুইজিশন চলাকালীন সময়ে স্বাধীন চিন্তার অধিকারী বহু মানুষকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। এদের মধ্যে ইতালির গিওদার্নো ব্রুনো অন্যতম। ব্রুনো বিশ্বাস করতেন কেবল পৃথিবীতেই নয়- অন্যন্য গ্রহেও বুদ্ধিমান প্রাণির অস্তিত্বের সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রথম প্রথম হেরিটিকদের পুড়িয়ে মারা হত। কেননা বাইবেলে রয়েছে: If anyone does not abide in Me, he is cast out as a branch and is withered; and they gather them and throw them into the fire, and they are burned. (John 15:6. New King James Version) ... এরপর নিষ্ঠুর উপায়ে হত্যার বহুবিধ পদ্ধতি আবিস্কার করে ক্যাথলিক যাজকেরা। যে সব বর্ননা গা শিউরে ওঠে।



স্পেনের মানচিত্র। ইনকুইজিশন দু’ভাগে বিভক্ত। ১. রোমের প্যাপাল ইনকুইজিশন। এবং ২. স্প্যানিশ ইনকুইজিশন। ১৪৭৮ সালে স্পেনে ইনকুইজিশন-এর শুরু হয়। ইহুদিরা এর শিকার হয়। পঞ্চদশ শতকের শেষের দিকে স্পেন গ্রানাদা জয় করে । গ্রানাদা ছিল মুসলিম অধ্যুষিত। সুতরাং মুসলিমরাও ইনকুইজিশনের শিকার হয়। ষষ্ট শতকে লুথেরিয়ান প্রেটেস্টনরা ইনকুইজিশন- এর শিকার হয়। স্প্যানিশরা দক্ষিণ আমেরিকার উপনিবেশেও আদিবাসীদের ওপর ইনকুইজিশন চাপিয়ে দিয়েছিল।

ধর্ম কখনও কখনও রাজনৈতিক রূপ পরিগ্রহ করে। স্পেনের ইতিহাসে এর প্রমাণ রয়েছে। পঞ্চদশ শতকের শেষের দিকে,অর্থাৎ, রাজা ২য় ফার্দিনান্দ এবং রানী ইসাবেলার শাসনামলে স্প্যনিশ ইনকুইজিশন চালু হয় । আশ্চর্য এই-এরা দুজনেই ছিলেন ধর্মনিপেক্ষ। এরা দুটি স্প্যানিশ রাজ্য একীভূত করেছিলেন । স্প্যানিশ রাজতন্ত্র ছিল ক্যাথলিক। এই একত্রীকরণের জন্য প্রয়োজন ছিল ধর্মীয় ঐক্য। ইনকুইজিশন-এর প্রয়োজন হয়ে পড়ে। রোমে তখন স্প্যানিশ সৈন্য অবস্থান করছিল। রোমে তুর্কি আক্রমনের আশঙ্কা ছিল। স্পেন পোপকে বলল, ইনকুইজিশন এর অনুমোদন দিন, নইলে সৈন্য সরিয়ে নেব! পোপ সম্মতি দিলেন। এ ছাড়া স্থানীয় রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও পারিবারিক জোট দূর্বল করতে দূর্বল করতেও ইনকুইজিশন কে ব্যবহার করা হয় । এককথায় রাজনৈতিক স্বার্থে ইনকুইজিশন অব্যাহত রাখে । তবে এর পিছনে অর্থনৈতিক কারনও ছিল। যেমন, সরকার হেরেটিক এর ধনসম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে পারত। মধ্যযুগে রোমের গির্জা এবং স্পেনের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম কারণ ছিল ইনকুইজিশন।


নির্যাতনের এসব ছবিই বলে দেয় ইনকুইজিশনের ভয়বহতার পরিনাম

জার্মান দার্শনিক নিৎসে বলেছেন:"The Christian resolve to find the world evil and ugly, has made the world evil and ugly." কথাটা ভেবে দেখার মতো। তবে বর্তমান কালে খ্রিস্টানদের দাবী ইনকুইজিশন অখ্রিস্টান সুলভ এবং অনভিপ্রেত। Robert Jones লিখেছেন,The Inquisition was one of the great blights in the history of Christianity. No other institution in the history of the Christian Church was so horrible, so unjust, so...un-Christian. When it was finally brought to a halt in 1834, thousands of lives had been lost, and tens of thousands of lives ruined through imprisonment and con-fiscation of property. Whole populations were driven from their homelands, and the Roman Church had earned a blight against its name that still resonates to this day. (A Brief History of the Inquisi-tion. page,5)


তথ্যসূত্র:

Robert Jones -এর A Brief History of the Inquisition.

বইটির ডাউনলোড লিঙ্ক

http://www.mediafire.com/?c7vcx1f04fdwvfw
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

⌂ ভ্রমণ » বাংলার সোনালী ঐতিহ্যের প্রাচীন রাজধানীতে একদিন !

লিখেছেন নিয়াজ সুমন, ১৬ ই অক্টোবর, ২০১৭ দুপুর ১২:৫৩








নারায়ণগঞ্জ জেলার অন্তর্গত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মোগড়াপাড়া ক্রসিং থেকে প্রায় আড়াই... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাকড়সা

লিখেছেন তারেক ফাহিম, ১৬ ই অক্টোবর, ২০১৭ দুপুর ১:৪৫




মাকড়সা একটি নিরীহ প্রাণি। কারো কোন ক্ষতি করে না। নিজের খাবারের জন্য আবার কোথাও ছোটাছুটিও করে না। শুধু জাল পেতে সারাক্ষন বাসায় বসে থাকে। মশা মাছি জালের সুতোয় আটকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

উড়ালপুরের রাজপুত্র [প্রিয় প্রামানিক ভাইয়ের 'আজব কানা' অবলম্বনে]

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৬ ই অক্টোবর, ২০১৭ বিকাল ৪:৩৯



উড়ালপুরের রাজপুত্র,
দিনে স্বপন দেখে।
বলে না সে কোন কিছু,
মুখ বুজে যে শিখে!

সাপের চোখে পাতা দেখে,
হাতির দেখে পা।
ঘোড়ার ডিম দেখে বলে,
ওটা কিনতে ঝাপা।

ব্যাঙের ছাতাও হয় যে রঙ্গিন,
সেই পুত্রের চোখে।
কেঁচো'র আছে অনেক... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিপদে পড়লে ক্রমাগতভাবে চেস্টা করে যাবেন, পথ পাবেন

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১৭ ই অক্টোবর, ২০১৭ সকাল ৭:০৬



বিকাল ৫টার দিকে ঘরে ফিরলাম, চা টা খাওয়ার দরকার; দেখি, স্ত্রী বার্থরুম পরিস্কার করছে; এখানে আমার একটু দুর্বলতা আছে, কাজটা ঘুরেফিরে ওর ভাগে পড়ে যায়! আমি যে ফিরছি সে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাইতুল্লাহর মুসাফির (পর্ব-৩)

লিখেছেন নতুন নকিব, ১৭ ই অক্টোবর, ২০১৭ সকাল ১০:৫৩



মাকামে ইবরাহিমের পাশে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করাটা একটু কঠিন। প্রতিবার নতুন যারা তাওয়াফ করতে নামেন এই জায়গাটায় কেমন যেন একটা জটলা লেগেই থাকে। নামাজ আদায়কারীর সামনে দিয়ে যাতায়াত করা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×