Sin Nombre ছবিটির মার্কিন লেখক এবং পরিচালক ক্যারি জোজি ফুকুনাগা। ( জন্ম ১০ জুলাই ১৯৭৭) জাত বিচারে Sin Nombre থ্রিলার গোত্রের অর্ন্তভূক্ত বলে চিহ্নিত হলেও কাহিনীর সুনিপুন বিন্যাসে ছবিটিতে জীবনবোধের সার্থক রূপায়ণ ঘটাতে সমর্থ হয়েছেন ফুকুনাগা ।
Sin Nombre ছবিটির মূল বিষয়: মেক্সিকান অপরাধী চক্রের অর্ন্তদ্বন্দ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রগামী অবৈধ অভিবাসীদের দুর্বিষহ যাত্রায় মেক্সিকান সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা। তবে ছবিটির যে জায়গায় আমাদের চোখ আটকে যায় সেটি হল: হন্ডুরান অভিবাসী কিশোরী সায়রা এবং মেক্সিকান অপরাধী চক্রের সদস্য ক্যাসপার-এর মধ্যে ভালোবাসা এবং তার দুঃখজনক পরিনতি। ... অবৈধ অভিবাসীরা ট্রেনের ছাদে বসে মেক্সিকো অতিক্রম করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভিমূখে যাচ্ছে । দৃশ্যটি ভয়াবহ। ভয়াবহ এবং মর্মান্তিক। এসব বিষাদিত দৃশ্য ফুটিয়ে তুলতে ফুকুনাগার মুনশিয়ানার তারিফ করতেই হয়। যা হোক। অবৈধ অভিবাসীদের মধ্যে সায়রা ছাড়াও রয়েছে ওর বাবা এবং চাচা । ট্রেন চলছে। পলাতক যাত্রীদের ভয়ার্ত বিষাদিত মুখ। দূরে পাহাড় চূড়ায় গির্জে, গির্জের মাথায় পবিত্র ক্রশচিহ্ন। অবৈধ অভিবাসীদের অনেকেই বুকে ক্রশ চিহ্ন আঁকছে। তথাপি তাদের ট্রেনের ছাদে বৃষ্টিতে ভিজতে হচ্ছে, ট্রেন থামলে খালি কোকেরর বোতলে ভরছে ড্রেনের দূষিত পানি । চোখে আমেরিকার ছবি। মুক্তির স্বপ্ন ...
মেক্সিকান অপরাধী চক্রের সদস্য ক্যাসপার- এর চরিত্রে হন্ডুরান অভিনেতা এডগার ফ্লোরেস চমৎকার অভিনয় করেছেন। ক্যাসপারের বস মাগো ক্যাসপারের প্রাক্তন প্রেমিকাকে হত্যা করেছে। যে কারণে গম্ভীর দুঃখী এক বিয়োগান্তক চরিত্রে ক্যাসপারকে দেখা যায়। ক্যাসপার ওর হৃদয়ের গভীরে ক্রোধ এবং হতাশা পুষে রাখে। তার পরও বড় অসময়ে প্রেম আসে ক্যাসপারের জীবনে।
লুঠতরাজ করতে ক্যাসপার ট্রেনে ওঠে । তার সঙ্গে ক্যাসপার- এর বস মাগো এবং অন্য একজন খুদে সদস্য। মাগো যখন ট্রেনের ছাদে সায়রাকে রেপ করতে উদ্যত ...ঠিকই তখনই প্রতিশোধ নিতে মাগোকে খুন করে ক্যাসপার। ক্যাসপার খুনি হলেও সায়রা তাকে কে গভীরভাবে ভালোবেসে ফেলে। উপরোন্ত কিশোরীটি ক্যাসপারের গোপন দুঃখবোধ টের পায়।
ছবির ঘটনা এখানেই বাঁক নেয়।
এবং আমাদের মন ভিজে যেতে থাকে।
ক্যাসপার এবং সায়রা। বড় অসময়ে এরা পরস্পর পরস্পরকে ভালোবেসেছিল ... এদের এই ক্ষণিক প্রেমের কারণেই ছবিটা দীর্ঘদিন মনের মধ্যে বিঁধে থাকে ...
ওদিকে মাগোকে খুন করার অপরাধে অপরাধী চক্র ক্যাসপারকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। বেঁচে থাকতে হলে ক্যাসপারকে ট্রেন থেকে পালাতে হবে। সায়রা ওর বাপ-চাচাকে ত্যাগ করে ক্যাসপারের সঙ্গে ট্রেন থেকে চুপিসারে নেমে যায়। ক্যাসপার ক্ষেপে উঠে বলে, এ কি করলে! আমি তোমার দায়িত্ব নিতে পারব না।
আমাকে কারও দায়িত্ব নিতে হবে না।
সায়রার শ্রেফ উত্তর।
(এই দৃশ্যে দম বন্ধ হয়ে আসে)
সায়রা কেন অনায়াসে এক খুনির জন্য ওর বাপ-চাচাকে ছেড়ে গেল?
নারীর এই নিগূঢ় মনস্তত্ত্ব নিয়ে দর্শক ভাবতে বাধ্য হয়।
সায়রার চরিত্রে মেক্সিকান অভিনেত্রী পাওলিনা গাইতান রুইজ (জন্ম ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২) সাবলীল অভিনয় করেছেন । কিশোরী বয়েসের নমনীয় সৌন্দর্যের পাশাপাশি জীবনের নির্মম রূপ দর্শককে ব্যথিত করে তোলে।
বিপদজনক এবং ক্লান্তিকর যাত্রাপথের মাঝখানে সায়রার বাবা কে আমরা নিহত হতে দেখি। সায়রার চাচাও মেক্সিকান কর্তৃপক্ষের হাতে গ্রেফতার হন। জীবনের এই ট্র্যাজিক পরিনতি আমাদের মর্মমূলকে কাঁপায়। ওদিকে গ্যাং লিডার মাগোর প্রতিশোধের জন্য খুনোখুনি বহুদূর পর্যন্ত গড়ায় এবং কার্যত ক্যাসপার- এর মৃত্যু সায়রা কে মার্কিন সীমান্তের এক অনিকেত প্রান্তরে ঠেলে দিলেও শেষ অবধি সায়রা সীমান্ত অতিক্রম করে আমেরিকায় পৌঁছতে সক্ষম হয় ।
এ যেন জীবনেরই জয় ...
আর জীবনের জয় হল বলে ছবিটিও শিল্প হিসেবে সার্থক হল।
Sin Nombre ছবিটির প্রেক্ষাপট লাতিন আমেরিকার ক’জন ‘নামহীন গোত্রহীন’ মানুষ বলেই আমাদের দেশের ম্লান জীবনছবির সঙ্গে কোথায় যেন এক গভীর যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষই যেন অবৈধ অভিবাসী। যারা নিয়তই খুঁজছে মুক্তি উপায় । যারা অবরুদ্ধ ক্ষুদ্র জীবন থেকে মরিয়া মাছের মতো টপকে যেতে চাইছে সীমাবদ্ধ জলজ গন্ডি; দুর্বিষহ জীবন থেকে পালিয়ে স্বপ্লীল মার্কিন দেশের গোত্রভূক্ত হতে চাইছে। এই নির্মম সত্যকে ফ্যান্টাসির নীলচে ধোঁয়ায় ঢেকে রাখা যায় না। কাজেই এ দেশের তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যে যারা চলচ্চিত্রে ফ্যান্টাসির নীলচে ধোঁয়া না-ছড়িয়ে জীবনকে তার যথার্থ স্বরূপে প্রতিফলিত করতে চায় তাদের জন্য Sin Nombre এবং ছবিটির পরিচালক ক্যারি জোজি ফুকুনাগা হয়ে উঠতে পারেন অফুরাণ প্রেরণার উৎস। ভোগবাদী মার্কিন সমাজে বাস করেও মুনাফার লোভে ফ্যান্টাসির নীলচে ফানুস ওড়াননি ফুকুনাগা । চলচ্চিত্রের কাছে জীবনের দাবীর কথা ... ‘তৃতীয় বিশ্বের’ নামহীন মানুষের দাবির কথা ঠিকই মনে রেখেছেন তিনি।
তাঁকে আমাদের সশ্রদ্ধ সালাম।
ছবি: ইন্টারনেট।
তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


