আজ আগলা হাট থেকে এক জোড়া চিতল মাছ কিনেছেন কাজেম আলী কোরেশী । মেছুনি বড় দর হাঁকছিল। শেষ পর্যন্ত আড়াই টাকায় রফা হল। বছর পাঁচেক হল মানিকগঞ্জ সদরে বড় কন্যাটির বিবাহ দিয়েছেন । বাড়িতে জামাই এসেছে। আবদুর রহমান। বড় ভালো ছেলে ...
এক হাতে মাছ ঝুলিয়ে অন্য হাতে ছাতা ধরে একটু দ্রুতই হাঁটছেন কাজেম আলী কোরেশী । সময়টা পূর্বাহ্ন। ১৯০৭ সাল। জুলাই মাসের মাঝামাঝি। এ বছর বর্ষাকাল উজার করে তার জলের ভান্ডটি ঢেলে দিচ্ছে যেন! অবিরাম বর্ষণে ভিজে যাচ্ছে পূর্ব বাংলার মাঠঘাট। আজ অবশ্য বৃষ্টির তেমন জোর নেই। কেবল গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। আকাশ যদিও মেঘলা।
কাজেম আলী কোরেশী মূলত কবি। ‘কায়কোবাদ’ নামে কবিতা লেখেন। কবির বয়স এ বছর পঞ্চাশ পূর্ণ হল। দীর্ঘদেহী, গৌড়বর্ণ। কবির পরনে পাজামা-পাঞ্জাবি। খয়েরি রঙের কুর্তা। মাথায় লাল রঙের তুর্কি ফেজ টুপি। পায়ে রাবারের কালো পাম্প শু। কবিকে দেখলেই বোঝা যায় কবির শিরায়-শিরায় পশ্চিম দেশিও মুসলমানের রক্ত বইছে । কবি যদিও নিজেকে মনেপ্রাণে বাঙালিই মনে করেন। বাংলা ভাষার প্রতি কবির অগাধ শ্রদ্ধা, মাতৃভাষা বলেই।
কবি কায়কোবাদ পেশায় পোস্টমাস্টার। আগলা গ্রামেই নিবাস । পড়ালেখা করেছেন ঢাকার পোগজ এবং সেন্ট গ্রেগরী স্কুলে । পিতা শাহামাতুল্লাগ আলী কোরেশী ছিলেন ঢাকা জেলা জজ কোর্টের আইনজীবি । স্কুলের পাট চুকিয়ে কবি ঢাকা মাদ্রাসাতে ভর্তি হয়েছিলেন। পরীক্ষা অবশ্য দেওয়া হয়নি । তার বদলে পোস্টমাস্টারের চাকরি নিয়ে আগলা গ্রামে ফিরে এসেছেন। আগলা গ্রামটির অবস্থান ঢাকা জিলার নবাবগঞ্জ থানার পুবে।
কবি দীর্ঘদেহী বলেই ঝুঁকে ঝুঁকে হাঁটছেন। দু’পাশে ঘন বাঁশঝাড়। রাস্তায় এন্তার কাদা। বেশ কায়দা করে পা ফেলতে হচ্ছে। এসবে অভ্যেস আছে কবির। আজন্ম গ্রামেই লালিত। ঢাকায় পড়াশোনা করার সময় ছুটিছাঁটায় চলে আসতেন। অতিরিক্ত এক দিনও ঢাকা শহরে থাকতেন না। গ্রামের বাইরে কবির মন টেকে না। কবি মাদ্রাসা থেকে পাস করে বড় চাকরি করতে পারতেন। বড় পদের মোহ অবহেলা করে তিরিশ বছর আগে ফিরে এসেছিলেন জন্মগ্রামে। এ জীবনে আগলা গ্রাম ও তার মানুষকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে চান কবি। মনের সাধ এতটুকুই। মহান আল্লাহ্তালা এই দূলর্ভ মানবজীবন দান করেছেন। কবি সেন্ট গ্রেগরী স্কুলে পড়ার সময় কবি William Blake -এর কবিতা পাঠ করেছেন ফাদার রেমন্ডের নির্দেশে। সেই বিখ্যাত কবিতাটির চারটে পঙতি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন কবি:
To see a world in a grain of sand,
And a heaven in a wild flower,
Hold infinity in the palm of your hand,
And eternity in an hour.
উলটো দিক থেকে কে যেন আসছে। পরনে খাকি উর্দি, খাকি হাফপ্যান্ট । ওঃ, রানার শুধাংশু । গ্রামে- গ্রামে চিঠি বিলি করে শুধাংশু । বর্ষাকালেও বিরাম নেই । বেশ ভালো ছেলে শুধাংশু । অবসর সময়ে কবির সঙ্গে বসে সুখ-দুঃখের কত কথা হয়। সামান্য আয় শুধাংশু। তথাপি সুখি। পুজা-পার্বণে ধার দেনা করে হলেও পুষলি হাট থেকে বউছেলের জন্য নতুন কাপড় কিনে দেয় । দূর্গা পূজার চাঁদা ওই শুধাংশুর হাতেই পূজা কমিটির কাছে পাঠিয়ে দেন কবি।
রানার শুধাংশু কবিকে দেখে আদাব দিল বটে, তবে থামল না। ওর যে থামার উপায় নেই!
হাঁটতে-হাঁটতে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালে কবি।
সামনের বাঁকে থিকথিকে কাদায় একটা জুরী গাড়ি আটকে আছে। গাড়িটা শাকুর খান মজলিস-এর। খান মজলিসরা আগলা গ্রামের অভিজাত বিত্তশালী পরিবার। নবাবগঞ্জ সদরেও দো-মহলা দালান আছে এদের। শাকুর খান মজলিস- এর কাঠের ব্যবসা । প্রায়ই বার্মা যান। রেঙ্গুন শহরেও নাকি বাংলোবাড়ি আছে। তাছাড়া খান মজলিসদের পূর্বপুরুষ জমিদার। সেসব জৌলুষ আজ অনেকটাই বিলুপ্ত হয়ে গেলেও আজও আগলা গ্রামের
শত শত বিঘে জমি এদের দখলে রয়েছে।
কবি উঁকি দিয়ে দেখলেন গাড়িতে শাকুর খান মজলিস-এর ছোট ছেলে আখলাক খান মজলিসও রয়েছে। এরা উর্দুভাষী। বাংলার ধার ঘেঁষে না। কবি পরিবারটিকে এসব কারণে এড়িয়ে চলেন।
পিছন থেকে দুটি লিকলিকে বালক জুরী গাড়ি ঠেলছে। মনা আর দুলু। এদের বয়স তেরো-চৌদ্দর বেশি না। কালো, শীর্ণ চেহারা। খালি গা, ছেঁড়া লুঙ্গি মালকোচা মারা । দু’জনেই বৃষ্টিতে ভিজে একশা। হাতে পায়ে কাদা মেখে ভূতের মতো দেখাচ্ছে। এরা দু’জন রজবালির ছেলে। রজবালি খান মজলিসদেরই বর্গা চাষী। উদয়অস্ত ফসলের মাঠে রোদে পুড়ে বর্ষায় ভিজে অমানুষিক পরিশ্রম করে কোনওরকমে টিকে আছে। আর ওদিকে রজবালিদের গায়ের রক্ত চুষে চুষে শাকুর খান মজলিস এবং আখলাক খান মজলিস দিনদিন থলথলে হয়ে উঠেছে। আখলাক খান মজলিস নাকি নিয়মিত মদ্য পান করে, মসজিদের ধারেও ঘেঁষে না। অথচ দৈনিক ফসলের মাঠে শরীরের নুন ঘাম ঝড়িয়েও আগলা জামে মসজিদে কবির পাশে এসে নামাজে দাঁড়ায় রজবালি । শত দুঃখ দারিদ্র সত্ত্বেও পবিত্র ঈদের দিনে রজবালির বিবি জমিলা সেমাই রান্না করে। ঈদের আগেই রজবালি গ্রাম ঘুরে সবাইকে দাওয়াত করে। পোস্টমাষ্টারকেও দাওয়াত করে। শুধাংশু কে নিয়ে ঈদের দিন সকালের দিকে রজবালির কুঁড়েঘরে যান কবি । শুধাংশুর ছেলে অংশও থাকে সঙ্গে। অংশু আবার সেমাই খেতে ভারি পছন্দ করে। অংশু নাকি ওর বাবাকে প্রায়ই জিগ্যেস করে, বাবা, সেমাই আগলার হাটে কিনতে পাওয়া যায় না কেন?
উত্তরে শুধাংশু বলে, সেমাই হইল ভগবানের পাসাদ। ভগবানের পাসাদ হাটে বিক্রি হয় না বাপ। পুজার নাড়ু কি হাটে কিনতে পাওয়া যায়?
না বাবা।
তাইলে?
অংশু আবার মনা আর দুলুর বন্ধু।
হঠাৎ গাড়ির ভিতর থেকে শাকুর খান মজলিস অবাঙালি ভাষায় তীব্র চিৎকার করে উঠলেন। সহিস রমজান ‘হট’ ‘হট’ করে চেঁচিয়ে উঠল। তারপর ঘোড়া পিঠে শপাং করে চাবুক কষাল। কাদায় আটকে থাকা জুরী গাড়িটি দুলতে- দুলতে চলতে শুরু করে। তারপর দেখতে দেখতে মিলিয়ে যায় চোখের আড়ালে ।
ছিঃ, মনা আর দুলুকে দুটিকে দুটি পয়সা দিয়ে গেলনা খান মজলিস সাহেব। এতক্ষণ ধরে চাকা ঠেলল। ক্ষোভে দুঃখে কবির চোখে পানি এসে যায় । পরক্ষণে সামলে নিলেন। ... শাকুর খান মজলিস- এর কাছে বদান্যতা আশা করাই ভুল। এরা বংশানুক্রমিকভাবে নবাবগঞ্জ অঞ্চলে শোষন করে আসছে। গত বছর ৩০ ডিসেম্বর ঢাকয় মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা হয়েছে। মুসলিম লিগে যোগ দিয়েছেন শাকুর খান মজলিস। কবিরা দুরদর্শী হয়। কবি জানেন: সম্ভবত মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রে ডাক দেবে মুসলীম লীগ। কিন্তু, তাতে দরিদ্র মুসলমানের কী লাভ? মুসলিম রাষ্ট্রটির নিয়ন্ত্রণের ভার থাকবে মুসলিম অভিজাত শ্রেণির হাতে। তারা নিজেদের স্বার্থেই অর্থনৈতিক বৈষম্য অব্যাহত রাখবে। রজবালির দের মতো বর্গা চাষীদের পায়ের তলায় রাখবে। ওদিকে পৃথক রাষ্ট্রে গঠন হলে শুধাংশু আর অংশুদের হারানোর সম্ভাবনা আছে। সেই অস্বস্তিকর ভাবনাও কবির শরীরে শীতল আতঙ্কের স্রোত তৈরি করে।
এই শোন। কবি মনা আর দুলু কে ডাকলেন।
ওরা কাছে এলে মনার হাতে চিতল জোড়া তুলে দিলেন কবি। তারপর বললেন, তর মায়েরে কইস পোস্টমাস্টর সাবে দিসে।
মাছ নিয়ে মনা আর দুলু দৌড়াতে-দৌড়াতে চলে যায়।
ওদের চলার ছন্দে আনন্দের চিহ্ন স্পষ্ট।
কবি আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে হাঁটতে লাগলেন। মেছুনি এখনও আছে কিনা কে জানে। যাক, মাছ না পেলে সের দুয়েক গরুর গোস্ত কিনবেন। মনা ও দুলুর আনন্দে আনন্দিত হলেও পরক্ষণেই তীব্র অস্বস্তি ঘিরে ধরে কবিকে। সত্যিই কি মুসলীম লীগ পৃথক রাষ্ট্রের আন্দোলন শুরু করতে যাচ্ছে? একটু আগে মনা ও দুলুর বিরুদ্ধে নিষ্ঠুরতার জন্য কবির মাথার ভিতরে শাকুর খান মজলিস দের বিরুদ্ধে ডালপালা মেলছে ক্রোধ। সেই সঙ্গে মাথার ভিতরে গুঞ্জরিত হয় প্রতিবাদী বাক্য ....
কে আর বুঝিবে হায় এ দেশের বাণী?
এ দেশের লোক যারা,
সকলইতো গেছে মারা,
আছে শুধু কতগুলি শৃগাল শকুনি!
সে কথা ভাবিতে হায়
এ প্রাণ ফেটে যায়,
হৃদয় ছাপিয়ে উঠে - চোখ ভরা পানি।
কে আর বুঝিবে হায় এ দেশের বাণী!
এ দেশের লোক যত
বিলাস ব্যসনে রত
এ দেশের দুঃখ কিছু নাহি বুঝে তারা।
দেশ গেল ছারেখারে,
এ কথা বলিব কারে?
ভেবে ভেবে তবু মোর হয়ে গেছে সারা!
প্রাণভরা হাহাকার
চোখ ভরা অশ্রুধার,
এ হৃদি যে হয়ে গেছে মরূভূমি-পারা!
... ঘটনাটি কাল্পনিক। কবি কায়কোবাদ-এর (১৮৫৭-১৯৫১) ‘দেশের বাণী’ কবিতাটি পাঠ করার পর তৎকালীন পরিবেশ -পরিস্থিতি অনুমান করে লেখা।
‘দেশের বাণী’ সহ কবি কায়কোবাদ-এর আরও দুটি কবিতার লিঙ্ক
Click This Link
উৎসর্গ: কবি জুবেরী।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা আগস্ট, ২০১১ দুপুর ১২:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



