হরপ্পা সভ্যতার মানচিত্র।১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় সিন্ধু অঞ্চলে সব মিলিয়ে চল্লিশটির মতন প্রত্নক্ষেত্র আবিস্কার হয়েছিল। এর পর গত ৫০/৬০ বছরে সব মিলিয়ে ১৪০০ প্রাচীন বসতি আবিস্কৃত হয়। এর মধ্যে ৯২৫ টি ভারতে; এবং ৪৭৫ টি পাকিস্তানে। কাজেই বর্তমানকালের রাজনৈতিক সীমানায় হরপ্পা-সংস্কৃতির বিচার করা যাবে না, কাজেই হরপ্পা-সংস্কৃতির সমীক্ষা চালাতে হবে সভ্যতাটি ভৌগোলিক প্রেক্ষপটে। যা বিশাল এক ভূখন্ডে ছড়িয়ে রয়েছে- পশ্চিমে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের সুতকাজেন্দর; পুবে ভারতের উত্তরপ্রদেশের মিরাট জেলার আলমগীরপুর; দক্ষিণে মহারাষ্ট্রের আহমদনগর জেলার ধাইমাবাদ; এবং উত্তরে জন্মু এবং কাশ্মীরের আখনুর জেলার মানডা। পুব-পশ্চিমে সব মিলিয়ে ১৬০০ কিলোমিটার। এবং উত্তরদক্ষিণে ১৪০০ কিলোমিটার।
সুবিশাল হরপ্পা সভ্যতা কিভাবে টিকে ছিল?
এই বিষয়টি নিয়ে বরং আজ ভাবা যাক। সভ্যতাটি নির্ভরশীল ছিল কৃষিকাজ এবং ব্যাবসা-বাণিজ্যের ওপর। কৃষিকাজ আবার নির্ভরশীল ছিল উন্নত ধরণের জলসেচ এবং জমির উর্বরতার ওপর। হরপ্পা অঞ্চলের জমি উর্বরই ছিল। এর কারণ সিন্ধু এবং সরস্বতী নদীর বাৎসরিক বন্যা হত এবং বন্যার পর কৃষিজমিতে উর্বর পলির সঞ্চয় হত। উর্বর জমিতে প্রধানত ফলত গম এবং যব। এ ছাড়া ফলত সর্ষে এবং মটর। ফলের মধ্যে ছিল তরমুজ এবং খেজুর। হরপ্পা অঞ্চলে উন্নতমানের তুলাও জন্মাত। এ জন্যই বলা হয়েছে যে- The earliest traces of cotton known anywhere in the world have been found in the Valley.পশ্চিম উপকুলে হত ধানের চাষ। অবশ্য এ তথ্যটি প্রমাণের জন্য প্রত্নতাত্ত্বিকদের হাতে যথেষ্ট উপকরণ পাওয়া যায়নি।
হরপ্পা সভ্যতাটি ছিল মূলত নগর সভ্যতা। আর যে কোনও নগর সভ্যতার পটভূমিতে থাকে ব্যাপক কৃষিকাজ। এতে কিছু মানুষের কৃষিকাজ থেকে অব্যাহতি পায়, তারা ব্যবসা এবং অন্যান্য পেশায় যুক্ত হতে পারে। হরপ্পা নগরগুলির খাদ্যের যোগান কাছাকাছি গ্রামগুলি থেকেই আসত।
কৃষিকাজ ছাড়াও ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল হরপ্পা সভ্যতার টিকে থাকার অন্যতম একটি কারণ। হরপ্পা সভ্যতার নগরগুলি অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের কেন্দ্র ছিল। বাণিজ্য হত দুভাবে। এক. অভ্যন্তরীণ এবং দুই. বৈদেশিক। যদি তাই হয়- তাহলে আমাদের হরপ্পায় কীভাবে পণ্য বহন করা হত তা নিয়ে ভাবতে হবে। এ প্রসঙ্গে উইকিপিডিয়ায় লেখা রয়েছে The IVC (Indus Valley Civilization, আমরা যাকে হরপ্পা সভ্যতা বলছি ) may have been the first civililzation to use wheeled transport. হরপ্পা সভ্যতায় এক ধরনের চাকাওয়ালা পশুটানা গাড়ি ব্যবহার করা হত।
পশুটানা চাকার গাড়ি। হরপ্পায় অনেক মাটির তৈরি খেলনা পাওয়া গিয়েছে। ওসব শিশুদের বিনোদনের জন্য তৈরি করা হত। চাকার গাড়ি টানত উট গাধা এবং ঘোড়া। ঘোড়া নিয়ে অবশ্য বিতর্ক আছে। তবে হরপ্পা সভ্যতার শেষের দিকে ঘোড়ার ব্যবহারের প্রমান মিলেছে । বড় বড় নগরে শস্যভান্ডার ছিল। কেন্দ্রিয় শস্যাগারে এসব গাড়িতে করে শস্য নেওয়া হত।
পণ্য পরিবহনের জন্য চাকার গাড়ি বাদে ছিল নৌকা । নৌকার আকার হত ছোট, তলী সমতল এবং নৌকায় পাল ছিল। সিন্ধু এবং সরস্বতী নদীতে নৌকায়পণ্য পরিবহন করা হত।
খেলনা নৌকা।
ভারতবর্ষে এবং ভারতবর্ষের বাইরে, বিশেষ করে মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে হরপ্পা সভ্যতার ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। ভারতবর্ষে কাশ্মীর, মহীশূর এবং নীলগিরি অঞ্চলের সঙ্গে সর্ম্পকের কথা জানা গেছে। দক্ষিণ ভারত থেকে আনা হত মূল্যবান ধাতু।
সিন্ধুনদীতে নৌকা। (বর্তমান কালের ছবি) এই নদীর পাড়েই ছিল হরপ্পা সভ্যতার মহেনজোদারো নগর। ইতিহাস পাঠের সময় আমাদের চেতনা অনেক সময়ই অতীত এবং বর্তমানের সংযোগ আবিস্কার করে থাকে।
মেসোপটেমিয়ার সুমের-এ হরপ্পা সভ্যতার অনেক সীল প্রত্নতাত্ত্বিকগণ উৎখননের মাধ্যমে আবিস্কার করেছেন। একইভাবে মেসোপটেমিয়ার পাথরের তৈরি সীলমোহর ও মনি-মুক্তার অলঙ্কার হরপ্পা সভ্যতায় পাওয়া গেছে। সম্ভবত সুমের এর সঙ্গে বাণিজ্য পারস্য সাগরীয় উপকূলে বাহারাইনের মধ্য দিয়ে হত। কেননা সেখানে হরপ্পার সীল এবং রুদ্রাক্ষ পাওয়া গিয়েছে।
মেসোপটেমিয়া (বাঁয়ে) এবং হরপ্পা সভ্যতার (ডাইনে) মানচিত্র । ৪৩০০ খ্রিস্টপূর্ব থেকে ৩২০০ খ্রিস্টপূর্বে তাম্রপ্রস্তর যুগে হরপ্পা সভ্যতায় নির্মিত তৈজষপত্রের সঙ্গে দক্ষিণ তুর্কিমিনিস্তান এবং উত্তর ইরানের তৈজষপত্রের সাদৃশ্য রয়েছে। যা স্পষ্টতই দুটি অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। আদি হরপ্পা যুগে (খ্রিস্টপূর্ব ৩২০০ থেকে ২৬০০ ) নির্মিত মৃৎপাত্র, সীল, নারীমূর্তি, অলঙ্কার -এসব মধ্য এশিয়া এবং পারস্য উপত্যকায় পাওয়া গেছে।
অধিকাংশ বর্হিবাণিজ্য স্থলপথে সম্পন্ন হলেও সমুদ্রপথেও বাণিজ্য হত বৈ কী । অবশ্য হরপ্পায় সরাসরি সমুদ্রগামী বাণিজ্যতরীর ধ্বংসাবশেষ পাওয়া না-গেলেও এর পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। হরপ্পা সভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ নগর ছিল ভারতবর্ষের পশ্চিম উপকূলে। সে নগরের নাম লোথাল। বর্তমান গুজরাটের আহমদাবাদেই ছিল প্রাচীন লোথাল । লোথাল - এ খননকার্যের ফলে এক বিশাল খাল আবিস্কৃত হয়েছে যা নৌবন্দরের ইঙ্গিত দেয় । এছাড়া লোথাল নগরে জাহাজ নির্মানের ক্ষেত্রটিও চিহ্নিত করা গিয়েছে।
ভারতবর্ষের মানচিত্রে লোথাল- এর অবস্থান।
হরপ্পা সভ্যতার বাণিজ্যিক সর্ম্পক মিশরের সঙ্গেও গড়ে উঠেছিল। হরপ্পা সভ্যতায় মিশরের সামগ্রী পাওয়া গিয়েছে। তবে এ যোগাযোগ সরাসরি হয়নি। মিশরের পণ্য সুমেরিয় বণিকগণ হরপ্পায় নিয়ে এসেছিলেন। রুশ ইতিহাসবিদ জি এম বোনগার্ড লেভিন মধ্য এশিয়ার সঙ্গে হরপ্পা সভ্যতার সম্পর্ক নিয়ে গবেষনা করেছেন। মধ্য এশিয়ায় খননকার্য চালিয়ে বোঝা গেছে এ অঞ্চলের সঙ্গে হরপ্পা সভ্যতার যোগাযোগ ছিল।
বর্তমান কালের শিল্পীর চোখে সেকালের লোথাল।
হরপ্পা সভ্যতা এবং মেসোপটেমিয়া সভ্যতার বাণিজ্য সম্পর্কে একজন ঐতিহাসিক মন্তব্য করেছেন : Trade with Mesopotamia has been noted, as Indus pottery has been discovered in the ancient city of Tell Asmar Indus Valley civilization was mainly an urban culture sustained by surplus agricultural production and commerce, the latter including trade with Sumer in southern Mesopotamia.
এ ধরণের মৃৎপাত্র পাওয়া গেছে মধ্য এশিয়ায় ...এমন কী পারস্য উপসাগরের তীরে বাহারাইনে
হরপ্পা সভ্যতা যে মিশর ও সুমেরিয় সভ্যতার চেয়ে উন্নত ছিল - ইতিহাসবিদগণ এটি একবাক্যে স্বীকার করেছেন । হরপ্পার মানুষ সে যুগে সুতি কাপড়ের ব্যবহার জানত। তাছাড়া হরপ্পার জনগন অনেক বেশি পরিকল্পিত এবং স্বাস্থসম্মত ভাবে নগর গড়তে সমর্থ হয়েছিলেন। প্রশস্ত এবং আলোবাতাস পূর্ণ ঘরবাড়িতে বাস করত। এরকম বাড়িঘর মিশর বা মেসোপটেমিয়ায় ছিল না। স্নানাগার তৈরি, ড্রেন ব্যবস্থা, পরিকল্পিত রাস্তা, পয়ঃনিস্কাশনের ব্যবস্থা এসব ক্ষেত্রে হরপ্পাবাসী অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করেছে।
হরপ্পার অলঙ্কার। অন্যতম অভ্যন্তরীণ কিংবা বৈদেশিক বাণিজ্যিক পণ্য বলে অনুমান করা যায়।
হরপ্পার কারুশিল্পীদের নির্মিত বালা। এটিও ছিল বাণিজ্যিক পণ্য।
ক্রমশ ...
এর আগের পর্বগুলির লিঙ্ক
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
ছবি: ইন্টারনেট।
তথ্যসূত্র: শেষ কিস্তিতে সংযুক্ত করা হবে।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে জানুয়ারি, ২০১২ সকাল ১০:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


