প্রাচীন ভারতে নারীর স্থান খুব একটা সম্মানজনক ছিল না। সদ্যোজাত শিশুকন্যাকে রাখা হত মাটির ওপর আর শিশুপুত্রকে তুলে ধরা হত। এ কারণে সোমযোগের একটা পর্বে যজ্ঞের কয়েকটি পাত্রকে মাটিতে রাখা হত আর বাকি কয়েকটিকে ওপরে তুলে ধরা হত। ( তৈত্তিরীয় সংহিতা।৬/৫/১০/৩) প্রাচীন ভারতে জন্মের পর থেকেই নারীর স্থান পুরুষের নীচে। নারীর সে অবস্থানটি আর বদলায়নি, বরং অবনতি হয়েছে।
প্রাচীন ভারতীয় সমাজটিতে বেদ-এর কঠোর অনুশাসন ছিল বলে প্রাচীন ভারতীয় সমাজ বৈদিক সমাজ নামেও পরিচিত। প্রাচীন ভারতে যে সময়টায় বৈদিক সাহিত্য রচনা করা হয়েছিল তাই বৈদিক যুগ। ঋদ্বেগ হল বৈদিক সাহিত্যের প্রথম গ্রন্থ। ঋদ্বেগ-এর রচনাকাল খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতক থেকে নবম দশক বলে পন্ডিতেরা অনুমান করেন । ঋদ্বেগ ছাড়াও সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক, উপনিষদ ও সূত্রসাহিত্য বৈদিক সাহিত্যের অর্ন্তভূক্ত । সূত্রসাহিত্যের মধ্যে শ্রৌত, গৃহ্য এবং ধর্মসূত্র প্রধান। ব্রাহ্মণ এবং উপনিষদগুলি খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম থেকে পঞ্চম শতকের রচনা। সূত্রসাহিত্য সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ থেকে খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকের মধ্যে রচিত। সুতরাং খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতক থেকে খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকের সময়কালই বৈদিক যুগ এবং ওই সময়টায় সমাজে নারীর স্থান যে খুব একটা সম্মানজনক ছিল না, তার প্রমাণ বৈদিক সাহিত্যে রয়েছে।
প্রাচীন কালে বর্তমান ইরানের নাম ছিল পারস্য। ওই প্রাচীন পারস্যে ছিল আর্যদের আদি বাসভূমি। নানা কারণে আর্যরা পূর্বদিকে অগ্রসর হয়ে ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বের দিকে প্রাচীন ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে অনুপ্রবেশ করে। এই ঘটনাটি ঘটেছিল ঋগ্বেদ রচনারও ২০০ বছর পূর্বে। সে যাই হোক। ক্রমশ বহিরাগত আর্যরা স্থানীয় দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীকে পরাজিত করে আর্যাবর্ত অধিকার করে নেয়। (আর্যাবর্ত প্রাচীন ভারতের অপর নাম) ...
যাযাবর জীবন ত্যাগ করে আর্যরা চাষবাস করতে শেখে । তারা ভারতবর্ষে সঙ্গে করে লোহা এনেছিল। কাজেই কৃষিকাজে তা সহায়ক হয়েছিল। উল্লেখ্য, হরপ্পা সভ্যতা ছিল ব্রোঞ্জ সভ্যতা। যে কারণে, আর্য আক্রমন দ্রাবিড় জাতি প্রতিহত করতে পারেনি। এই বিষয়টিই বেদে অন্যভাবে উল্লেখিত হয়েছে।
সে যাই হোক। ক্রমশ আর্যরা চাষাবাদে জড়িয়ে পড়ে এবং গ্রামীণ সভ্যতার বনিয়াদ রচনা করে। এর আগে যাযাবর আর্যদের সমাজকাঠামোটি ছিল ট্রাইবাল এবং তারা বিভক্ত ছিল কৌমে । কৃষিকাজে জড়িত হওয়ার পরই এ কাঠামোটি অর্থনৈতিক সর্ম্পকের পালাবদলের কারণেই ভেঙে পড়েছিল এবং আর্যসমাজে ‘কুল’ এর উদ্ভ হয়েছিল। কিন্তু, কুল কি? কুল মানে একটা বাড়িতে তিন চার পুরুষের ডালপালা ছড়ানো বড় পরিবার যে বাড়ির প্রতিটি বয়স্ক পুরুষ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত, অর্থাৎ যে বাড়ির প্রতিটি বয়স্ক পুরুষ ফসলের মাঠে কাজ করে। এই সময়ে সমাজে নারীর মর্যাদা হ্রাস পেতে থাকে। কেননা, নারী উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। যদিও বৃহৎ পরিবারে নারীর সাংসারিক কাজকর্ম ছিল। সংসারের নিত্যদিনের কাজের মধ্যেই নারীর ভূমিকা সীমাবদ্ধ ছিল । নারীর প্রধান কাজ ছিল পশম পাকানো ও বোনা। অন্যান্য কাজের সঙ্গে এ দুটো কাজ তাকে করতে হত। তা সত্ত্বেও নারীকে বলা হল ‘ভার্যা’। অর্থাৎ, স্বামীর অন্নে প্রতিপালিত। ‘ভৃত্য’ এবং ‘ভার্যা’ শব্দ দুটির অর্থ একই - যাকে ভরণ করতে হয়। স্ত্রী অন্ন উৎপাদন করে না বলেই স্ত্রী ভরণীয়া। ভরণীয়া নারী তখনও ঠিক অসূর্যষ্পশ্যা হয়ে ওঠেনি। বৈদিক যুগের শেষের দিকে বৈদেশিক আক্রমনের সময়ে নারীহরণ ও বর্ণসংকর রোধ করতে নারীকে অন্তঃপুরে ঠেলে দেওয়া হয়। বৈদিক নারী তখন অসূর্যষ্পশ্যা হয়ে উঠেছিল।
বৈদিক সমাজে নারীর শিক্ষালাভের পথ ছিল রুদ্ধ। কেননা যে ব্রহ্মচর্য ছিল বেদ অধ্যয়নের প্রবেশদ্বার, সেটি নারীর জন্য প্রাচীনকাল থেকেই নিষিদ্ধ ছিল। তবে ঋগ্বেদে কয়েকজন ঋষিকার (নারীঋষি) নাম উল্লেখ রয়েছে। বিশ্ববারা, ঘোষা, অপালা ও গোধা। এ থেকে বোঝা যায় নারীদের মধ্যে কেউ কেউ শিক্ষালাভের সুযোগ পেতেন। যেমন: বাক, গার্গী, মৈত্রেয়ী, শাশ্বতী-এরাও জ্ঞানচর্চা করে আর্যসমাজে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তবে নারীশিক্ষা ছিল একেবারেই সীমাবদ্ধ। শিক্ষিতা নারী সম্বন্ধে পরিহাস করে বলা হয়েছে,‘নারী হয়েও তারা পুরুষ।’ (তৈত্তিরীয় আরণ্যক ১/১১/৪) ... সঙ্গীত, নৃত্য ও চিত্রশিল্পে কিছু কিছু কুমারী নারীর অধিকার থাকলেও অন্যান্য শিক্ষা থেকে তারা ছিল বঞ্চিত। অবশ্য পুরুষের মন যোগাতে গণিকারা নানা শিল্পে পারদর্শী ছিল।
আগেই বলেছি, ঋগ্বেদ হল বৈদিক সাহিত্যের প্রথম গ্রন্থ। ঋগ্বেদে অবশ্য সরাসরি নারীর স্থান সম্বন্ধে সেরকম কোনও উক্তি নেই। তবে আদি বৈদিক যুগে নারী যে অপেক্ষাকৃত স্বাধীন ছিল সেরকম ইঙ্গিত ঋগ্বেদে রয়েছে । সেকালে নারী নিজেই তার জীবনসঙ্গী বেছে নিতে পারত । ঋগ্বেদে নিষিদ্ধ সর্ম্পকের মিলনের বিষয়টিও উল্লেখিত রয়েছে।তৈত্তিরীয় সংহিতায় রয়েছে, ‘যজমান দীক্ষার দিনে গণিকাসাহচার্য বর্জন করবেন, তার পরদিন পরস্ত্রীর এবং তৃতীয় দিনে নিজের স্ত্রীর।’ (৬/৬/৮/৫) অর্থাৎ দীক্ষার দিনেও পরস্ত্রীর সান্নিধ্য নিষিদ্ধ ছিল না এবং গণিকাগমনের জন্য দীক্ষার দিনেও কোনও প্রায়শ্চিত্ত করতে হত না।
ঋদ্বেদে এমন কী নারীহরণের কথাও রয়েছে। কোনও পুরুষ রাত্রে একটি নারীকে হরণ করতে যাবে, তাই প্রার্থনা করছে মেয়েটির ভাইয়েরা যেন জেগে না যায়, কুকুরগুলি যেন না ডেকে ওঠে।
যৌতুক প্রথা বা কন্যাপণের প্রথা সেই খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ অব্দেও ছিল! ইন্দ্র আর অগ্নি ভক্ত কে ধন দেন, অবাঞ্ছিত জামাতা যেমন প্রচুর ধন দিয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকদের অনুকূল করে তাদের প্রীতিভাজন হয়।
তবে বৈদিক সমাজে সব মেয়েরই যে বিয়ে হত তা কিন্তু নয়-যে মেয়েরা বাপের বাড়িতে বুড়ি হয়ে যায় তাদের ‘বৃদ্ধকুমারী’ বা ‘জরৎকুমারী’ বলা হয়েছে।
পুরুষতান্ত্রিক বৈদিক সমাজে যজ্ঞ ছিল অন্যতম ধর্মীয় কৃত্য। সুতরাং যজ্ঞে নারীর ভূমিকা ছিল নিষ্ক্রিয়। যজ্ঞে পুরুষ যজমানের ভূমিকাই ছিল প্রধান! নারীর উপনয়ন নেই বলে নারী হোম করতে পারত না। গৌতমধর্মসূত্রে রয়েছে,‘অস্বতন্ত্রা ধর্মে স্ত্রী।’ অর্থাৎ ধর্মবিষয়ে নারীর কোনও স্বাতন্ত্র নেই!
বৈদিক সমাজে পুরুষের একাধিক স্ত্রী ছিল। স্ত্রীদের শাসনের (অর্থাৎ বশে রাখার) মন্ত্রও রয়েছে বেদে। অবশ্য আদি বৈদিক সমাজে নারীরও একাধিক বিবাহের কথা জানা যায়। তবে তা অল্প সময়ের জন্য। তৈত্তিরীয় সংহিতা ও ব্রাহ্মণে রয়েছে,‘যজ্ঞে একটি দন্ডকে বেষ্টন করে থাকে দুটি বস্ত্রখন্ড; তাই পুরুষ দুটি স্ত্রী গ্রহণে অধিকারী; একটি বস্ত্রখন্ডকে দুটি দন্ড বেষ্টন করে না, তাই নারীর দ্বিপতিত্ব নিষিদ্ধ।’ ( তৈত্তিরীয় সংহিতা ৬/৬/৪/৩ এবং তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ১/৩/১০/৫৮)
শতপথ ব্রাহ্মণে রয়েছে-
‘একস্য পুংসো বহ্ব্যো জায়া ভবন্তি।’
অর্থাৎ, এক পুরুষের বহু পত্নী হয়।
এভাবে পুরুষের জন্য সুবিধাজনক আচরণের সমর্থন জুগিয়েছে মানবরচিত শাস্ত্র। প্রাচীন ভারতের রাজাদের চারজন বৈধ স্ত্রী থাকত । মহিষী, বাবাতা, পরিবৃক্তি (বা পরিবৃত্তী) ও পালাগলী। এ ছাড়াও বহু উপপত্নী থাকত রাজঃঅন্তপুরে। মৈত্রীয়ণী সংহিতায় রয়েছে যে মনুর দশটি এবং চন্দ্রের সাতাশটি স্ত্রী ছিল।
মানসিক বা সামাজিক কোনও কারণে নয়- একমাত্র সন্তানের জন্ম দেওয়ার জন্যই নারীকে পুরুষের অর্ধাঙ্গিনী বলা হত । বিবাহে কন্যাকে দান করা হত স্বামীকে নয়-স্বামীর পরিবারকে। এই অধিকারেই শ্বশুরবাড়ির লোকেরা বধূকে নির্যাতন করত! ‘সূর্যোদয় হলে প্রেত যেমন করে ছুটে পালায়তেমন করে পুত্রবধূ শ্বশুরের সামনে থেকে ছুটে পালায়।’ (অর্থববেদ ৮/৬/২৪)
ঋগ্বেদে সহমরণ বা সতীদাহ প্রথার কোনও উল্লেখ নেই। বিধবা নারী বেঁচে থাকত। কখনও-বা বিধবা নারীর বিয়ে হত দেওরের সঙ্গে কখনও-বা বিয়ে হত না। তবে সে বৈধব্যের জীবন মোটেও সুখের ছিল না। বিধবা নারীর তাই প্রার্থনা: ‘যেন ইন্দ্রাণীর মতো অবিধবা হই।’ সহমরণ এর উল্লেখ রয়েছে অর্থববেদে। ‘দেখলাম জীবিত নারীকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মৃতের বধূ হতে।’(অর্থববেদ ১৮/৩/৩) অনেক ঐতিহাসিকের মতে সহমরণ আর্যরীতি নয় বরং প্রথাটি অনার্য । কেননা, ইন্দো-ইউরোপীয় সভ্যতায় সহমরণ-এর বিষয়টি নেই।
সহমরণ কি তাহলে হরপ্পা অর্থাৎ সিন্ধসভ্যতার উত্তরাধিকার?
ক্রমশ ...
তথ্যসূত্র:
সুকুমারী ভট্টাচার্য; প্রাচীন ভারত: সমাজ ও সাহিত্য

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



