somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... অনূদিত কবিতা (৩) মূল: হাসান নাজমি
অনুবাদ: ইমন জুবায়ের

আমি আমার মায়ের সৌরভ লুকিয়ে রাখার জন্য
একটা নিরাপদ জায়গা খুঁজছি।
যে আমি আমার রক্তে লুকিয়ে রাখি গোলাপ।

নীরবে
আমার মা আমার ঘুমের মধ্যে এসে
চুমু খায় আমার কপালে।
আর আমার বালিশের নীচে রাখে নুন।

বিদ্যুতায়িত আকাশ।
আর ভূখন্ড ফেনিয়ে উঠছে
শহীদের রক্তে ।
আমি আমার মায়ের মুখ দেখি।
আজ মৃতদেহ পূর্ণ যে ট্রেনটি চলে গেল
সেই ট্রেনে আমি আমার মায়ের মুখ দেখেছি।



The war

I seek a safe place
For my mother’s scent
And I hide the rose in my blood.



Silently
My mother came to me in sleep.
She kissed my forehead
And placed salt under the pillow.




Electrocuted sky.
And the ground is sprouting
With the martyr’s blood.
I see my mother’s face.
I saw it on the train that passed today
Loaded with the dead.


হাসান নাজমি মরক্কোর কবি। তাঁর সম্বন্ধে তথ্য...

Click This Link

কবিতাসূত্র:

Click This Link]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29539419 http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29539419 2012-02-12 08:49:39
আমরা আমাদের শিয়রে মৌন পাহাড়; পায়ের কাছে অথই সমুদ্র,
বাঁ দিকে গহীন বনাঞ্চল, ডাইনে এক স্মৃতিময় জনপদ।

আমাদের বাস আলুথালু গ্রামে । আমাদের ঘরগুলি খড়ের, উঠানগুলি
খোলামেলা আর চতুস্কোন; আমাদের খাদ্য ধান, আমাদের জল বৃষ্টি।
রুপালি মাছের আশায় আমরা মেঘনার উজানে যাই । সম্বৎসর ফসল
ফলাই; শীতের মাঠজুড়ে তাই ফোটে হলদে সর্ষের ফুল। আমরা আবাদ
করি হৃদয়ের উর্বরতম মৃত্তিকায়। তাই আমরা কবি। পূর্ণিমার রাত্রে উথাল-পাথাল হাওয়ায় আমাদের ঘুম আসে না।
আমরা নিশীথে ফুলবনে যাই, নিরন্তর বুনি গান
প্রাণের গভীর সুরে। ঢাকের বাদ্যে ভুলি আমাদের ব্যক্তিগত দুঃখ।

কখনো-বা আমরা হারিয়ে যাই গ্রামীণ মেলার ভিড়ে।
তখন আমরা কাঁদি দুঃখী বালকের মতন ।

আমরা এক প্রাচীন মায়ের সন্তান;
যে সন্তান হাঁটে ‘সেরাতুল মোস্তাকিম’- এর পথে
আতরের গন্ধমাখা আলেক ফকিরের মারফতি চাদর জড়িয়ে গায়ে;
আমাদের দেশের পাখিরাও রাধাকৃষ্ণের জানে গান! মূলত আমরা বাউল। আমাদের হৃদয় মরমী। আমাদের দেহাতীত আত্মার একতারায় ধ্বণিত হয় নিগূঢ় বয়ান আ মরি বাংলা ভাষায়।

কখনও-বা আমরা ভেসে যাই পদ্মা-যমুনার জলে
খড়কুটোসমেত। শূন্য ভিটায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে নিরন্ন শিশুরা ।
শহরের দিকে ছোটে উৎখাত হয়ে যাওয়া মানুষের মিছিল ।
পথে আমাদের মেয়েরা হারিয়ে যায়, বিক্রি হয়ে যায় সীমান্তের ওপারে!

তারপর অবরুদ্ধ শহরে আমরা ক্রমাগত কংক্রিটের চাপে
জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে দুলতে থাকি ...
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29538667 http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29538667 2012-02-10 22:57:32
অনূদিত কবিতা (২) মূল: আল সাদিক আল রাদদি
অনুবাদ: ইমন জুবায়ের

জলে
তোমার নৈঃশব্দে
আগুনে- যে আগুন আমাদের কাছাকাছি নিয়ে আসে
আমি ভেসে যাই- আর
তুমিই কেবল আমায় ডাকতে পার।

একটি পাখি প্রবেশ করে বসন্তে
বর্শাফলার মতো
তোমার চোখে ঝিকিয়ে উঠছে তাহাদের গুপ্তকথা
চুম্বন স্পর্শ করে রংধনুকে
ঝরে বৃষ্টি

অথচ আমার বন্ধুদের রাস্তাগুলি ফাঁকা
দূরের ঘরগুলোয়
নিভে গেছেপ্রদীপ
আর শূন্য কক্ষে প্রতিধ্বনি ওঠে ভগ্ন হৃদয়ের

যারা চলে গেছে
তাদের তুমি আর্শীবাদ করো
আর বাকিদের ছেড়ে দাও ভাগ্যের ওপর।


Lamps

by Al-Saddiq Al-Raddi

In the water
in silence at your side
in a fire that draws us close
I drift -
and only you can call me

. . . . . . . . . .
A bird enters spring
like a lance
Your eyes flash their secrets
A kiss grazes the rainbow
The rain rains

But the streets are empty of my friends
Lamps are extinguished
in the far-flung houses
and the lost heart echoes in its lonely chamber

You give your blessings to those who depart
and leave the rest to fate



কবি আল সাদিক আল রাদদি সম্বন্ধে তথ্য

Click This Link

কবিতাসূত্র

Click This Link]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29538301 http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29538301 2012-02-10 10:16:13
গল্প: শিহরণ । যাত্রাবাড়ির কাছে একটা বেসরকারি কলেজে বাংলার অধ্যাপক লুৎফুল; গোনাগুন্তির সংসার তার, আবিরের একটার পর একটা বায়নায় বিপর্যস্ত সে। নাজনীনই ছেলেকে লাই দিয়ে মাথায় তুলেছে! কথাটা আজ রাগের মাথায় নাজনীনকে সরাসরি বলেই ফেলল লুৎফুল । নাজনীনও ছাড়বে কেন- গনগনে মুখে চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তুলে কথার বিষ উগড়ে দিল। নাজনীন যে বুকের ভিতরে এত ক্ষোভ পুষে রেখেছে তা কে জানত!
মন অশান্ত থাকলে নিউমার্কেটের দিকে যায় লুৎফুল। নতুন বই এসেছে কিনা দেখতে। অধ্যাপনার পাশাপাশি লেখালেখিও করে লুৎফুল । এরই মধ্যে তার দুটো কবিতার বই বার হয়েছে। কবিতায় ডুবে থেকে সংসারের জ্বালাযন্ত্রণা ভুলে থাকে অর্ন্তমুখি ও কল্পনাপ্রবণ লুৎফুল । সেই সঙ্গে কবিতায় শ্যামলা রঙের একটি কিশোরীকে মূর্ত করে তোলে । সেই কিশোরীর নাম- মাহফুজা; লুৎফুল-এর সঙ্গে একই কলেজে পড়ত । অবশ্য মাহফুজার ডিপার্টমেন্ট ছিল আলাদা । তারপর কখন যে লুৎফুল-এর
জীবন থেকে হারিয়ে গেল বড় বড় ডাগর চোখের ছিপছিপে শ্যামলা সেই মেয়েটি । আজও লুৎফুলের স্মৃতিতে বেঁচে আছে মাহফুজা । অর্ন্তমুখি ও কল্পনাপ্রবণ লুৎফুল আজও মাহফুজা কে মনে রেখেছে; আজও মাহফুজা কে গভীর ভাবে ভালোবাসে সে ।
আজ নিউমার্কেটে ঢোকার মুখে দূর থেকে ওবায়দুরকে দেখতে পেয়ে থমকে দাঁড়াল লুৎফুল । অনেক বছর পর ওবায়দুর কে দেখল লুৎফুল । তা কম করে পনেরো বছর তে হবেই। ওবায়দুর আর সে একই কলেজে পড়ত।
ওবায়দুর ফুল কিনছিল। কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই মুহূর্তেই চিনতে পেরে লুৎফুল কে জড়িয়ে ধরল ওবায়দুর । দু’জনের বয়েসই এখন প্রায় চল্লিশের কাছাকাছি । তবে জিন্সের প্যান্ট আর টি-শার্ট পরা ওবায়দুরকে লুৎফুল-এর তুলনায় বেশ স্মার্টই লাগে । ওবায়দুর অবশ্য বরাবরই স্মার্ট ছিল । কলেজের মেয়েদের কাছে ভীষণ পপুলার ছিল সে।
ওবায়দুরের গায়ের রং ফরসা, বেঁটে, মাথায় সামান্য টাক, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। ওকে দেখে মাহফুজার কথা মনে পড়ে গেল লুৎফুল-এর । ওবায়দুরদের ডিপার্টমেন্টেই ছিল মাহফুজা । লুৎফুল ছিল মুখচোরা। কলেজে মেয়েদের সঙ্গে সেভাবে মিশতে পারত না। দূর থেকে কেবল শ্যামলা, ছিপছিপে আর ডাগর ডাগর চোখের মাহফুজা কে দেখত । মাহফুজাকে নিয়ে কবিতা লিখত। গোপনে ...
এমন না যে কলেজ জীবনে ওবায়দুরের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ট ছিল লুৎফুল- এর। (এবং ডিপার্টমেন্টও আলাদা ছিল।) তবে ওবায়দুরের ব্যবহার ভীষণ অমায়িক ঠেকল। হয়তো চল্লিশ ছুঁই ছুঁই ওবায়দুর এরই মধ্যে জীবনের বহু অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে গিয়ে জড়তামুক্ত হয়ে উঠেছে । হয়তো সে জন্যই সে লুৎফুল- এর কাঁধে হাত দিয়ে বলতে পারল, চল দোস্ত, তোকে একজনের বাড়ি নিয়ে যাব।
কার বাড়ি? লুৎফুল খানিকটা বিস্মিত হয়।
আহা, আগে চল না।
ওরা পাশাপাশি হাঁটতে থাকে। একটা গুমোট দিনের শেষে সন্ধ্যা নামছিল। শুক্রবার। নিউমার্কেটে বেশ ভিড়।
ওবায়দুরের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর থেকে লুৎফুল-এরও বিষাদও ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছিল। তার নাজনীন কিংবা আবির-এর কথা মনে পড়ছিল না। ওবায়দুর একটা পার্ক করা গাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। সাদা রঙের টয়োটা আভানজা। গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে ওবায়দুর বলল, ওঠ।
গাড়িতে ভিতরে ঢুকে বসতে বসতে ঈর্ষা হচ্ছিল লুৎফুল-এর। ওবায়দুর একটা প্রাইভেট ব্যাঙ্কে চাকরি করে বলল। ভালো গুছিয়ে নিয়েছে বোঝা গেল।
ওবায়দুর বলে, তোদের ওদিকে জমির কাঠা কত করে রে লুৎফুল ?
কিনবি?
হু। দেখি।
আচ্ছা আমি খোঁজখবর নিয়ে তোকে জানাব ।
ওকে। আমার মোবাইল নাম্বার সেভ করে রাখ।
নাজনীন বারবার ফোন করছিল বলে ফোন অফ করে রেখেছিল লুৎফুল । এখন অন করল। ওবায়দুর নাম্বার বলে। লুৎফুল নাম্বারটা সেভ করে নেয়। তারপর বলে, অ্যাই ওবায়দুর? আমরা যাচ্ছি কোথায় বলবি তো!
তোর কি মাহফুজা কে মনে আছে? আমাদের কলেজে পড়ত?
লুৎফুল- এর বুক ধক করে ওঠে। বলে, হ্যাঁ। ঘাম টের পায়, হাতের তালুতে, ঘাড়ে।
আমরা এখন মাহফুজার ওখানে যাচ্ছি।
মাহফুজা ঢাকায় থাকে? হঠাৎ ভীষণ তৃষ্ণা টের পায় লুৎফুল।
হ্যাঁ।
কোথায় ?
কাছেই। চল দেখবি।
ওর হাজব্যান্ড কি করে? প্রশ্নটা লুৎফুল না-করে পারল না।
মাহফুজার ডির্ভোস হয়ে গেছে।
ওহ্ । কি হয়েছিল জানিস?
না, আমাকে বলে নি। একটা মেয়ে আছে সুইটির মানে মাহফুজার । ক্লাস এইটে পড়ে। বলে টার্ন নেয় ওবায়দুর।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে লুৎফুল । একই ছাদের নীচে বেঁচে আছে বলে নাজনীন কে নিয়ে মধুর স্বপ্ন দেখতে পারে না সে । লুৎফুল সংসারের প্রতিদিনের ব্যর্থতা আর গ্লানি ভুলে থাকে কল্পনায় মাহফুজা কে জীবন্ত করে তুলে । এখন মাহফুজার ডির্ভোসের কথা শুনে বিষন্ন বোধ করে সে। ভেবেছিল কোথাও সুখে সংসার করছে তার মনের মানুষ!
এলিফ্যান্ট রোডের একটা গলির ভিতরে ঝকঝকে ফ্ল্যাটবাড়ি। চারতলার বাঁদিকের ফ্ল্যাট। সাজানো গোছানো ড্রইংরুম। দামী আসবাবপত্র। এসিও আছে। ড্রইংরুমে ঢুকে শরীর জুড়িয়ে গেল। লুৎফুল খানিকটা অবাক হয়। ফিসফিস করে জিগ্যেস করে, মাহফুজা কি চাকরিবাকরি কিছু করে ?
না। বলে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটা সিগাররেট ধরালো ওবায়দুর ।
তাহলে?
মাহফুজার কিছু ক্লায়েন্টস আছে । আমার বসও ওর ক্লায়েন্ট। বস এখানে এসে মাঝে মাঝে রিল্যাক্স করে। ওবায়দুর বলল।
তার মানে মাহফুজা ... লুৎফুল কথা শেষ করতে পারল না।
ওবায়দুর বলল, রিয়েলিটি দোস্ত।
লুৎফুল কী বলতে যাবে- মাহফুজা এল। দীর্ঘকাল পর কল্পনার নারী বাস্তব দেহ নিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তার শরীর ভীষণ কেঁপে ওঠে। অদ্ভূত এক আবেগ টের পায় । নিজের অজান্তেই উঠে দাঁড়ায় সে । মাহফুজার পরনে সাদা রঙের শাড়ি। কালো ব্লাউজ। কপালে সবুজ রঙের টিপ। ছোট গোল ফ্রেমের চশমা পরা শ্যামলা মুখটা গম্ভীর। এককালের সেই শ্যামলা রংটি কেমন কালো হয়ে গেছে। এ কয় বছরে বেশ মুটিয়েছে মাহফুজা, শ্যামলা ছিপছিপে তন্বী আর নেই। বড় বড় ডাগর চোখ প্রাণহীন । দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে লুৎফুল । তার কেন যেন মনে হল মাহফুজাকে না-দেখলেই হয়তো ভালো ছিল।
ওবায়দুরও উঠে দাঁড়িয়েছে। মাহফুজার দিকে ফুলের তোড়া বাড়িয়ে দিয়ে সে বলল, হ্যাপি বার্থ ডে সুইটি ।
ফুলের তোড়া নিয়ে হাসার চেষ্টা করল মাহফুজা । তারপর বলল, আমার আবার জন্মদিন। বলে লুৎফুল-এর দিকে তাকাল। লুৎফুল কে ঠিক চিনতে পারছে না মনে হল ।
ওবায়দুর বলল, আরে, এ হল লুৎফুল । আমাদের কলেজে মানবিক বিভাগে ছিল। কেন তোমার মনে নেই?
মাহফুজা এবার মনে হয় চিনতে পারল যে । বলল, ও। কতদিন পর। কেমন আছ? ঢাকায় থাক? মাহফুজার কন্ঠস্বর কেমন নিষ্প্রাণ ঠেকল। লুৎফুল আহত বোধ করে । আশ্চর্য হয়ে যায় সে। যাকে নিয়ে দু-দুটো কবিতার বইয়ে অন্তত শখানেক কবিতা লিখেছে, সে কিনা তাকে মনে রাখেনি!
একটা মেয়ে ড্রইংরুমে ঢুকল। শ্যামলা। সালোয়ার কামিজ পড়া। আঠারো- উনিশ এর মতো বয়স হবে। হাতে ট্রে । ট্রেতে দুটো কাপ। এই মেয়েটিই দরজা খুলে দিয়েছিল। মেয়েটা টেবিলের ওপর ট্রে রেখে চলে যায়।
আজ মাহফুজার জন্মদিন । কেক আশা করেছিল লুৎফুল। নেই। তার মানে জীবনে সুখি হয়নি মাহফুজা!
মাহফুজা বলল, নাও কফি খাও। বলে লুৎফুল- এর হাতে কফির কাপ তুলে দেয় মাহফুজা । বুকের আঁচল বেশ খানিকটা সরে যায়। কালো রঙের ব্লাউজ, কাঁধের একপাশে ব্রার স্ট্যাপ স্পস্ট । ওদিকে তাকিয়ে লুৎফুল- এর চোখ আটকে যায়। চমৎকার সেইপ, ভরাট। ভিতরে প্রবল কাঁপুনি টের পায় সে । এত কাল মাহফুজা কে কল্পনায় দেখেছে কেবল। কল্পনাতেও ছোঁয়নি। বাস্তবের ছোঁওয়ার কথাও কখনও ভাবেনি। মাহফুজ কে নিয়ে লেখা একটি পদ্য চকিতে মনে পড়ে যায় তার।

শীতসন্ধ্যায় সাগরপাড়ে দাঁড়িয়ে ছিলে লোকের ভিড়ে; ফিরে এলে আমার নীড়ে কল্পনদীর অরূপ তীরে।

ওবায়দুরের দিকে আড়চোখে তাকায় লুৎফুল । ওবায়দুর সিগারেট টানছে। মোবাইল বার করে কী যেন দেখছে।
হঠাৎ ‘তেরে মেরে প্রেম কাহানি’ বলে একটা পরিচিত হিন্দি গানের রিংটোন বেজে উঠল। । মাহফুজা সোফার ওপর থেকে মোবাইল তুলে নেয়। তারপর নাম্বার দেখে। তারপর মোবাইল কানে ঠেকিয়ে বলে, হ্যাঁ, বলেন, আচ্ছা, কেন মিসেস জেসমিন আপনাকে রেট বলেনি? আশ্চর্য! হ্যাঁ। বুঝলাম তো। ক’জন? ওকে। কাল দুপুরে ফ্রি আছি। না, আমার এখানে প্রোবলেম আছে, আমার বাড়িঅলা ঝামেলা করছে। না না, প্লেস আপনিই ঠিক করবেন। ওকে? মাহফুজা মোবাইল অফ করে দেয় । মাহফুজাকে কিছুটা ক্লান্ত মনে হল।
লুৎফুল অবাক হয়ে যেতে থাকে ...
মাহফুজা বলল, শোন না ওবায়েদ, আমার বাড়িওয়ালা কী বদমাইশি শুরু করেছে। কথা নেই বার্তা নেই হুট করে ভাড়া সাড়ে তিন হাজার টাকা বাড়িয়ে দিল। আমি বললাম দিতে পারব না। ওমাঃ অমনি নোটিশ পাঠালো। অক্টোবরের মধ্যে ফ্ল্যাট ছাড়তে হবে। এখন কী করি বল তো?
ওবায়দুর এক মুখ ধোঁওয়া ছেড়ে বলল, নো প্রোবলেম সুইটি। আমি আজই বস- এর সঙ্গে কথা বলছি। উত্তরায় শৈবাল অ্যাপার্টমেন্ট-এর কাজ অল মোস্ট কমপ্লিট। বসকে ওখানে তোমাকে একটা ফ্ল্যাট রেডি করে দিতে বলব।
মাহফুজা উচ্ছ্বসিত বলল, থ্যাঙ্কস ওবায়েদ। আমি তাহলে নিশ্চিত হলাম। নোটিশ পাওয়ার পর না আমি ভীষণ টেনশনে পড়ে গিয়েছিলাম। কোথায় যাই। যে কোনও ফ্ল্যাটে তো ওঠা যায় না। হাজারটা প্রশ্ন করে।
ওবায়দুর হাসে। কফির কাপে চুমুক দেয়। একমুখ ধোঁওয়া ছাড়ে।
মাহফুজা বলল, শুনলাম বস নাকি সিঙ্গাপুর গেছেন?
হ্যাঁ। বস অবশ্য এই উইকেই ঢাকায় ফিরবেন। আঠাশ তারিখ নতুন টিভি চ্যানেল উদ্বোধন।
শুনলাম জলি রহমান আছে বসের সঙ্গে? মাহফুজার কন্ঠস্বর কেমন খসখসে হয়ে ওঠে।
হুমম।
জলি রহমান তো আগে আফজাল মল্লিকের সঙ্গে ছিল।
ওবায়দুর বলল, শেয়ারে কোটি টাকা লস করে মাইল্ড স্ট্রোক করেছে আফজাল মল্লিক । আর জলিপাখিও উড়ে গেছে। বেচারা আফজাল মল্লিক এখন একাই থাকে, দেখাশোনার কেউ নেই। জলি রহমান- এর জন্য বুড়ো বয়েসে বউকে ডির্ভোস দিল। ছেলেমেয়েরাও বাপকে এড়িয়ে চলে।
লুৎফুল কিছুই বুঝতে পারছিল না। কে বস? কে জলি রহমান? কে আফজাল মল্লিক? ও বোঝে যে ও একটা সীমাবদ্ধ জগতে বেঁচে আছে, যে জগতে কল্পনাই কেবল লাগামহীন। ওর কফির স্বাদ তেতো লাগে। মাহফুজার কথা বলার ভঙ্গি ভালো লাগে না। সে পাঁজরে ক্ষীণ ব্যথা অনুভব করতে থাকে।
সামান্য উদ্বেগ বোধ করে লুৎফুল । আবির দুপুরের পর রাগ করে বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিল; ও কি বাড়ি ফিরে এসেছে? নাজনীন কি খুব টেনশন করছে?
ওবায়দুরের মোবাইলের রিংটোন বেজে উঠল। কার সঙ্গে কথা বলছে সে। একটু পর ফোন অফ করে মাহফুজার দিকে তাকিয়ে বলল, সিফাত ফোন করেছিল। আমাকে এখুনি একবার গুলশান যেতে হবে।
কেন? মাহফুজার কালো মুখে ক্ষীণ উদ্বেগ ফুটে উঠল।
আমার শাশুড়িকে দু'দিন আগে গুলশানের একটা ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে। অবস্থা নাকি ক্রিটিকাল।
ও।
মাহফুজা? ওবায়দুর উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলে।
বল। বলতে বলতে মাহফুজা উঠে দাঁড়াল।
ওবায়দুর বলল, আজ তুমি না হয় লুৎফুল কে একটু সময় দাও। ওকে এদ্দিন পরে দেখলে।
মাহফুজা হাসল। বলল, ওকে। বলে লুৎফুল-এর দিকে গভীর চোখে তাকাল।
ওবায়দুর বলল, ফোন করিস দোস্ত। আর জমির কথা মনে রাখিস। আরে তোকে আমি মিছিমিছি খাটাবো না। টু পাসেন্ট পাবি।
লুৎফুল মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়াল।
আর মোবাইলটা এখন বন্ধ রাখ দোস। এসব সময়ে বউয়ের ফোন না এলেই ভালো। বলে চোখ টিপে ওবায়দুর।
মাহফুজা হিহি করে হেসে ওঠে। বলে, বউকে ভীষণ ভয় কর বুঝি? কেমন বউ? সুন্দরী?
লুৎফুল ম্লান হাসে। নাজনীনের মুখটা মনে পড়ে গেল তার। মনের ভিতরে ক্ষীণ অপরাধ বোধ টের পেল সে । তবে লুৎফুল লেখক বলেই অপরাধ বোধ ছাপিয়ে গভীর এক কৌতূহল তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে তাকে। নির্জনে মাহফুজাকে পাওয়ার গভীর এক কৌতূহল।
ওবায়দুরকে বিদায় করে এসে মাহফুজা বলল, চল লুৎফুল । আমরা ও ঘরে যাই।
তারপর নীল আলো জ্বলা নির্জন এক সুগন্ধি ছড়ানো বেডরুমে লুৎফুল কে নিয়ে যায় মাহফুজা । এই মুহূর্তে তার সামনে কল্পনার মানসীর বাস্তব শরীর । সে এখন তার কল্পনাকে স্পর্শ করবে । লুৎফুল তীব্র শিহরণ বোধ করে। একটু পর মনের মধ্যে সামান্য দ্বিধা নিয়েই কল্পনার দেহটির দিকে হাত বাড়াতে যায় লুৎফুল... মাহফুজা বুকের আঁচল ফেলে ব্লাউজের বোতাম খুলতে খুলতে খসখসে স্বরে বলে, আমার রেট পাঁচ হাজার। এখন সব টাকা না থাকলে পরে এসে বাকি টাকা দিয়ে যেও কেমন।
মুহূর্তেই জমে যায় লুৎফুল। ভালোবাসার এক নারীর কল্পনায় মগ্ন হয়ে সংসারের প্রতিদিনের যাবতীয় গ্লানি আর ব্যর্থতা ভুলে থাকত সে , এর পর বেঁচে থাকাটা ঠিক কেমন হবে সেটা ভাবতেই তার করোটিতে, মগজে আর দেহের কোষে কোষে তীব্র শিহরণ টের পায় ...
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29537691 http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29537691 2012-02-09 11:07:59
অনূদিত কবিতা মূল:খলিল জিব্রান
অনুবাদ: ইমন জুবায়ের।

প্রাচীন কালে, যখন আমার ঠোঁটে স্পন্দিত হল ভাষা
আমি পবিত্র পর্বতে উঠলাম। তারপর ঈশ্বরকে বললাম: ‘হে আমার প্রভূ, আমি তোমারই দাস; তোমার গুপ্ত ইচ্ছাই আমার বিধান আর আমি চিরকাল তোমার বাধ্য থাকব।’

ঈশ্বর নীরব রইলেন।
তারপর প্রচন্ড ঝড়ের মূর্তি ধরে চলে গেলেন।

হাজার বছর পর আমি আবার পবিত্র পর্বতে উঠলাম।
তারপর ঈশ্বরকে বললাম: ‘হে আমার স্রষ্টা, আমি তোমারই সৃষ্টি। তুমি আমাকে নির্মাণ করেছ কাদা দিয়ে। আমার সবই তোমার।

ঈশ্বর নীরব রইলেন।
তারপর অজস্র ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে গেলেন।

হাজার বছর পর আমি আবার পবিত্র পর্বতে উঠলাম।
তারপর ঈশ্বরকে বললাম: ‘হে আমার পিতা, আমি তোমার পুত্র। প্রেমে আর করুণায় তুমি আমায় জন্ম দিয়েছো । প্রেমে এবং প্রার্থনায় আমি তোমার রাজ্য পেয়েছি।’

ঈশ্বর নীরব রইলেন।
তারপর দূরের পাহাড়ের কুয়াশার আবরনের মতো অদৃশ্য হলেন।

হাজার বছর পর আমি আবার পবিত্র পর্বতে উঠলাম।
তারপর ঈশ্বরকে বললাম:‘ হে আমার ঈশ্বর, তুমিই আমার লক্ষ, তুমিই আমার পরিপূর্ণতা; আমিই তোমার ফেলে আসা দিন আর তুমিই আমার ভবিষ্যৎ। পৃথিবীতে আমিই তোমার মূল আর আকাশে তুমিই আমার ফুল। একটাই সূর্যের নীচে আমরা বেড়ে উঠছি।’

এবার ঈশ্বর আমার দিকে ঝুঁকলেন। তারপর আমার কানে মধুবর্ষন করতে লাগলেন। আর সমুদ্র যেভাবে জড়িয়ে ধরে ছোট নদীকে, ঠিক সেভাবেই জড়িয়ে ধরলেন আমাকে।

আর আমি যখন নীচের উপত্যকার দিকে নেমে যাচ্ছিলাম ... সেখানেও যেন আমি ঈশ্বরকে দেখতে পেলাম।


God

Khalil Gibran

In the ancient days, when the first quiver of speech came to my lips, I ascended the holy mountain and spoke unto God, saying, 'Master, I am thy slave. Thy hidden will is my law and I shall obey thee for ever more.'

But God made no answer, and like a mighty tempest passed away.

And after a thousand years I ascended the holy mountain and again spoke unto God, saying, 'Creator, I am thy creation. Out of clay hast thou fashioned me and to thee I owe mine all.'

And God made no answer, but like a thousand swift wings passed away.

And after a thousand years I climbed the holy mountain and spoke unto God again, saying, 'Father, I am thy son. In pity and love thou hast given me birth, and through love and worship I shall inherit thy kingdom.'

And God made no answer, and like the mist that veils the distant hills he passed away.

And after a thousand years I climbed the sacred mountain and again spoke unto God, saying, 'My God, my aim and my fulfilment; I am thy yesterday and thou art my tomorrow. I am thy root in the earth and thou art my flower in the sky, and together we grow before the face of the sun.'

Then God leaned over me, and in my ears whispered words of sweetness, and even as the sea that enfoldeth a brook that runneth down to her, he enfolded me.

And when I descended to the valleys and the plains, God was there also.



খলিল জিব্রান সম্বন্ধে:

http://en.wikipedia.org/wiki/Khalil_Gibran

কবিতার সূত্র:

http://www.poemhunter.com/poem/god-137/]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29536574 http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29536574 2012-02-07 14:06:47
গল্প: মুনিয়াদির চাদর মৃত্যুর আগে একবার বৌদ্ধবিহারে গিয়ে বুদ্ধের কাছে প্রার্থনা করবে অংচাপ্রু মারমা । বৌদ্ধবিহারটি থানচিতে । মাঘের এক ভোরে তিন্দু বাজার থেকে রওনা হয়ে সাঙ্গু নদীর তীর ধরে কুয়াশা মোড়ানো পথে হাঁটতে থাকে সে । ভট ভট শব্দে খুব নীচু দিয়ে একটা আর্মির হেলিকপ্টার উড়ে যায় থানচির দিকে ।তার শরীরের গড়নটি ছোটোখাটো, গায়ের রং ফরসা । তার পরনে চেক লুঙ্গি । গায়ে খয়েরি রঙের একটা সোয়েটার, সে সোয়েটারের নীচে সাদা শার্টের হাতা আর কলার দৃশ্যমান। সাধারণত স্থানীয় লোকজন এ পথটুকু আসা-যাওয়া করে নৌকায়। বুদ্ধের কাছে সহজে যেতে চায় না সে । পাথরের আঘাতে পায়ে রক্ত ঝরিয়ে তবেই সে থানচির বৌদ্ধবিহারে পৌঁছতে চায়।
অংচাপ্রু মারমার বাড়ি তিন্দু। জায়গাটা সাঙ্গু নদীর পাড়ে। তিন্দু বাজারের পিছনে একটা ছোট টিলার ওপর অংচাপ্রু মারমার গ্রাম । তিন্দুর পরই রেমাক্রিবাজার।ওই রেমাক্রিবাজার থেকেই বিখ্যাত নাফাখুম ঝরনা ঘন্টা তিনেকের হাঁটাপথ। বছর কয়েক হল এসব নির্জন বন- পাহাড়ে শহর থেকে পর্যটকরা সব আসছে; তাদের অধিকাংশই তরুণ, তবে পর্যটকদের মধ্যে তরুণিও রয়েছে । অংচাপ্রু মারমার শৈশবে জায়গাটা নির্জনই ছিল। হঠাৎই করেই যেন নির্জন পাহাড়ি পরিবেশ গেল বদলে । বান্দরবান থেকে থানচি হয়ে শহুরে তরুণ-তরুণিরা এসে তিন্দু-রেমাক্রিবাজার- নাফাকুম দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তাতে অংচাপ্রু মারমার ভাগ্য গেল বদলে। এর আগে সে এক রকম বেকারই ছিল; থানচি থেকে মিনারেল ওয়াটার কিংবা চিপস-এর প্যাকেট এনে তিন্দু বাজারে বিক্রি করত। এবার গাইড-এর কাজ পেয়ে গেল সে। তরুণ পর্যটকদের সে রেমাক্রিবাজার থেকে নাফাখুম ঝরনা দেখিয়ে আনে। বাংলা ভালোই বলে অংচাপ্রু মারমা । পাহাড় এবং পাহাড়ে বসবাসরত মানুষের প্রতি শহুরে তরুণরা আজকাল গভীর আকর্ষন এবং কৌতূহল বোধ করে। তরুণ পর্যটকদের সঙ্গে তার মধুর সম্পর্ক গড়ে ওঠে । বাঙালি তরুণদের ভালোই লাগে তার। মেয়েদেরও ভালো লাগে। মেয়েরা তাকে বলে, আচ্ছা, আপনারা নাকি খরগোশ ভর্তা খান? আমাদের খাওয়াতে পারবেন?
অবশ্যই। বলে ঘন ঘন মাথা নাড়ে অংচাপ্রু মারমা । হাসে।
রেমাক্রিবাজারের কাছেই তার এক বন্ধুর বাড়ি। বন্ধুর নাম জ্যোতি মারমা । তার বাড়িতে তরুণ পর্যটকদের নিয়ে যায় সে । তারপর শহরে পর্যটকেরা বনমুরগির ঝোল আর খরগোশ ভর্তা খেয়ে আনন্দে আটখানা । যেন পৃথিবীতেই স্বর্গ পেয়ে গেছে। অংচাপ্রু মারমা লক্ষ করেছে যে, বাঙালিরা অতি অল্পতেই খুশি হয়। তারা বিদেশি পোশাক আর বিদেশি যন্ত্রপাতি (ক্যামেরা, মোবাইল ইত্যাদি) ব্যবহার করলেও বেশ সহজ ও সরল। অনেকে আবার ভীষণ মিশুক।
সে যাই হোক। পার্বত্য চট্টগ্রামের মারমাসমাজটি পিতৃতান্ত্রিক। অংচাপ্রু মারমার বাবা উশি মারমার বয়স পঞ্চাশের মতো, তিন্দুর একটা সরকারি গেস্ট হাউজের কেয়ারটেকার সে। অংচাপ্রু মারমার মা অবশ্য বেঁচে নেই, কেবল মায়ের স্মৃতি আছে ওই মারমা তরুণটির হৃদয়ের গহীনে। অংচাপ্রু মারমার একটাই বোন; কালাবি মারমা। তো কালাবির বিয়ে হয়ে গেছে। ওর স্বামী উম্রাচিং মারমার থানচি বাজারে একটা ভাতের হোটেল আছে ।
অংচাপ্রু মারমা থাকে রেমাক্রিবাজারেই একটা ঝুপসি ঘরে । মাস গেলে আয় মন্দ না তার। টাকা বাবাকে দেয়, থানচি গিয়ে ছোট বোনকেও দিয়ে আসে। হ্যাঁ, কিছু দেওয়ার জন্য তার জীবনে আরও একজন আছে; সে তার প্রেম। মেয়েটির নাম- অনিমা মারমা । অনিমা মারমার বাড়ি তিন্দু বাজারের কাছেই । ষোড়শী অনিমা মারমা দারুণ সুন্দরী, গানের গলাও চমৎকার। আর চমৎকার নাচেও। সাংরাই এর উৎসবে ঐতিহ্যবাহী ময়ূরনৃত্য, ছাতানৃত্য,পাখানৃত্য এবং থালানৃত্য পরিবেশনে অনিমা মারমার তুলনা নেই। অনিমা মারমা যখন উপহার পাওয়া নতুন থামি আর টপস পরে তার সামনে এসে দাঁড়ায় তখন সে মুগ্ধ চোখে সুন্দরী ষোড়শীর দিকে চেয়ে থাকে। ওরা দুজন ঘর বাঁধবে। সাঙ্গু নদীর পাড়ে বসে সে রকমই কথা হয়। অংচাপ্রু মারমারও গানের গলা চমৎকার। অনিমা মারমা তার গান শুনতে চায়। সে গায়-

নুখ্যাং নিংচ ইখিংমা/হ্নাকসে প্যাইংরে অগংখামা/খ্যাসু গা যামা হিরেলে।

একলা বসে থাকি যখন তোমায় মনে পড়ে তখন

গান শুনে অনিমা মারমা ভারি খুশি হয় ...
অংচাপ্রু মারমার গান শুনে তরুণ বাঙালি পর্যটকরাও ভারি খুশি হয়। এই পাহাড়ি নদী দেখে, ছোটখাটো টিলা দেখে, নদীর বুকে ও নদীর পাড়ে ছোটবড় পাথর দেখে বাঙালিরা ভীষণ খুশি হয়ে ওঠে। বনপাহাড়ের প্রতি বাঙালিদের কী রকম এক গভীর মুগ্ধতা আছে । সেটি টের পেয়ে গভীর ও গোপন আনন্দ পায় অংচাপ্রু মারমা ।এই বনপাহাড়ে তারও প্রাণের সুর বাজে। সুতরাং বাঙালি পর্যটকদের প্রতি গভীর আকর্ষন বোধ করে সে।
গত নভেম্বরের মাঝামাঝি যে দলটি এসেছিল- ওদের কথা এখনও মনে করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে অংচাপ্রু মারমা। সেই দলে ছিল মারূফদা, মুনিয়াদি, সুমিতদা ও জয়াদি। এরা নাকি সবাই ঢাকা শহরের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। ওদের সঙ্গে সে বেশ ঘনিষ্ট হয়ে উঠেছিল । সন্ধ্যার পর ওরা রেক্রামিবাজারের গেষ্টহাউজের পিছনের কুয়াশা-ঢাকা মাঠে আগুন জ্বালিয়ে গোল হয়ে বসত । তখন শীত সন্ধ্যার নির্জন আকাশ থেকে ঝরে ঝরে পড়ত ফুটফুটে জ্যোস্না ।
জয়াদি বলত, অংচাপ্রু ভাই, আপনি এত সুন্দর জায়গায় থাকেন, আপনাকে আমার ভীষণ ঈর্ষা হচ্ছে ।
অংচাপ্রু মারমা হেসেছিল। কী বলবে সে। আসলেই তো এসব বনপাহাড় আর সাঙ্গু নদী প্রকৃতির ঐশ্বর্য নিয়ে অপরূপা হয়ে রয়েছে।
মুনিয়াদি বলল, ইস্, কী শীত রে বাবা! অংচাপ্রুদা, আপনি শুধু সোয়েটার পড়ে আছেন। নিন, এই চাদরটা গায়ে জড়িয়ে নিন। বলে মুনিয়াদি নিজের গায়ের চাদর খুলে দিয়েছিল। অংচাপ্রু মারমার চোখে জল এসে গিয়েছিল।
সুমিতদা গিটার বাজাচ্ছিল। হঠাৎ গিটার বাজানো থামিয়ে বলল, উহঃ, বাংলাদেশটা এত সুন্দর! ওহ! এখানে না এলে জীবনে কী ভুলই না করতাম! উফঃ
অংচাপ্রু মারমা হাসে। সুমিতদা গিটারে কী কর্ড বাজাচ্ছিল। ওদের একটি গান শোনাতে ভীষণ ইচ্ছে হচ্ছিল তার। সে গান করে -

সাংগ্রাইমা ঞি ঞি ঞা ঞা/ রি কেজেই কে পা মে ...

সাংরাই এর উৎসবে এসো সবাই মিলে জল খেলা খেলি।

দারুণ! দারুণ! জয়াদি আর মুনিয়াদি একসঙ্গে হাততালি দিয়ে ওঠে।
মারূফদা ওর মোবাইলে গান রেকর্ড করে নিয়েছিল। গান শেষ হতে বলল, আপনাদের গান কী সুন্দর!
মুনিয়াদি বলে, সত্যি সুন্দর। সহজ সুন্দর।
সুমিতদা মাথা ঝাঁকিয়ে বলে। সত্যি অসাম। কী সহজ কর্ড প্রোগ্রেশন। জি-এ মাইনর-সি। আর পেন্টাটনিক স্কেল।
অংচাপ্রু মারমার এসব ইংরেজি শব্দের অর্থ জানার কথা না; তবে সে সব শব্দের অর্থ বুঝতে তার মোটেও অসুবিধে হচ্ছিল না ।
মুনিয়াদি বলে, অ্যাই সুমিত! তুই না এবছর অ্যালবাম বার করবি। তো, তোর অ্যালবামে অংচাপ্রু ভাইয়ের এই গানটা রাখ না। অ্যালবামে একটা-দুইটা ট্রাইবাল সং রাখলে কী হয়। এই গান তো আমাদের বাংলাদেশেরই গান।
জয়াদি হাততালি দিয়ে বলে, গ্রেট আইডিয়া।
আচ্ছা, করব। সুমিতদা বলে।
তাহলে অংচাপ্রু ভাইয়ের অনুমতি নে! অনুমতি নে। বলে মুনিয়াদি চেঁচিয়ে ওঠে।
কি বলে এরা! আমার গান রেকর্ড করবে? অংচাপ্রু মারমা ভিতরে ভিতরে ভীষণ কাঁপছিল। সে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার ক্যশৈপ্রু মারমার কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস সম্বন্ধে শুনেছে। স্বাধীনতার আগে নাকি পশ্চিম পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার বাঙালির প্রিয় রবি ঠাকুরের গান নিষিদ্ধ করেছিল। অথচ ... অথচ এরা এক মারমা তরুণের গান রেকর্ড করতে চায়, সেজন্য অনুমতিও চায়। কী আশ্চর্য! অংচাপ্রু মারমার বসবাস বাংলাদেশের মূল কেন্দ্র থেকে সুদূর পূর্ব-দক্ষিণ কোণে । অথচ প্রান্তবাসী অংচাপ্রু মারমার প্রতি মূলধারার বাঙালিদের ব্যবহারে বিন্দুমাত্র অবজ্ঞা কিংবা কর্তৃত্ব নেই । কি এর কারণ? বাঙালি তরুণ-তরুণিরা অন্য রকম একটা বাংলাদেশ আবিস্কার করে ফেলেছে। তারা সেই অন্যরকম পাহাড়ি বাংলাদেশকে বুঝতে চাইছে? পাহাড়ের মানুষসহ পাহাড়ি প্রকৃতিকে ভালোবেসে প্রকৃতির কোলে নিজেকে মিশিয়ে দিতে চাইছে ?
ফেরার পথে ওদের সঙ্গে থানচি অবধি গিয়েছিল সে। থানচিতে চান্দের গাড়িতে ওঠার আগে মুনিয়াদি কে চাদরটা ফেরৎ দিতে চাইল । তখন মুনিয়া বলল, আরে, না না। এটা ফেরত দিতে হবে না। এটা আপনার কাছেই রেখে দিন। স্মৃতি হিসেবে। তাহলে মাঝেমাঝে আমাদের মনে পড়বে। হি হি।
আবার আসবেন। অবরুদ্ধ কন্ঠে বলেছিল অংচাপ্রু মারমা ।
আসব না মানে।অবশ্যই আসব। শহরে থেকে আমরা মরে যাই ভাই। এখানে এলেই মনে হয় বেঁচে আছি। মায়ের কোলে ফিরে এসেছি।

সে যখন বৌদ্ধবিহারে পৌঁছল তখন শীতবেলার মধ্যাহ্নের আলো ঝলমল করছিল । থানচির আধ কিলোমিটার আগে বৌদ্ধবিহারটা একটা টিলার ওপর । সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে থাকে সে । সিঁড়ির ধাপে রক্তের ছোপ লাগে । পথের তীক্ষ নুড়িপাথরে তার পায়ের পাতা ছিলে গেছে। ওপরে ওপরে সিঁড়ির বাঁপাশে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ। তারপর সুপরিসর চাতাল। অসংখ্য শুকনো পাতা পড়ে আছে চাতালের ওপর । ভিতরের একটি প্রকোষ্টে সোনার একটি বৌদ্ধমূর্তি।
দীর্ঘক্ষণ সেই মূর্তির সামনে অবনত হয়ে রইল সে।
ফেরার সময় সিঁড়ি দিয়ে নামতেই চমকে যায় সে । কালাবি সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসছে । কালাবির মুখটি মলিন। কোলে ছোট্ট মংপুচি । কালাবির স্বামী অসুস্থ । বুদ্ধের কাছে প্রার্থনা করতে এসেছে। কিন্তু, ওর সঙ্গে তো এখানে দেখা হওয়ার কথা না। কে ওকে পাঠালেন এখানে? বুদ্ধ? শেষবার অবশ্য বোনের মুখটা দেখতে ইচ্ছে হচ্ছিল তার। বুদ্ধ সে ইচ্ছে পূরণ করলেন? কালাবির চোখ এড়িয়ে একদল ভিক্ষুদের ভিড়ে মিশে পায়ে পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে সে। ঠিক তখনই ভট ভট শব্দে খুব নীচু দিয়ে একটা আর্মির হেলিকপ্টার উড়ে যায় তিন্দুর দিকে ।
বুদ্ধের কাছে প্রার্থনা করে নির্ভার বোধ করে সে। এবার মৃত্যুর অপেক্ষা ... সে জানে ... ওরা আসবে। আজ হোক কাল হোক। থিয়েন আঙ-এর দলের লোকজন ওকে হত্যা করতে আসবে ...
তার একবার মনে হয় অনিমা কে নিয়ে দূরে কোথাও পালিয়ে যায়। বান্দরবান ।বান্দরবানের পরে কী আছে সে সর্ম্পকে তার পরিস্কার ধারণা নেই । অবশ্য সে জানে চোরাকারবারিদের হাত অনেক দূর যায়। বান্দরবান গিয়েও বাঁচা যাবে না। মিছিমিছি ওর জীবনের সঙ্গে অনিমার জীবন জড়িয়ে কী লাভ। অনিমা তো কোনও দোষ করেনি। আসলে তার কপালই মন্দ। নইলে থিয়েন আঙ-এর সঙ্গে দেখা হবে কেন?
গত ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে কালাবিকে টাকা দিতে থানচি গিয়েছিল সে । তখন থিয়েন আঙ-এর সঙ্গে পরিচয়। কালাবির মুখ কালো হয়ে ছিল। ওর স্বামী উম্রাচিং মারমার বুকে ব্যথা। চিকিৎসার জন্য বান্দরবান নিয়ে যাওয়া দরকার। এদিকে কালাবির হাত খালি। চিকিৎসার জন্য বান্দরবান গেলে অন্তত পাঁচ-সাত হাজার টাকা খরচ হবে।
বিকেলে থানচি বাজারে একটা চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিল সে । মনের ভিতরে ঘুরপাক খাচ্ছিল দুশ্চিন্তার কালো মেঘ । কালাবির স্বামীর চিকিৎসার জন্য অত টাকা যোগার করার কোনও পথ পাচ্ছিল না। চা খেতে খেতে বারবার একটা লোকের ওপর চোখ আটকে যাচ্ছিল তার। মাঝবয়েসি লোকটার পরনে বার্মিজ লুঙ্গি আর মেরুন রঙের জ্যাকেট। অংচাপ্রু মারমা জানে লোকটা স্থানীয় নয়, বার্মিজ। লোকটাও মাঝে মাঝে আড়চোখে তার দিকে তাকাচ্ছিল। একটু পর লোকটা নিজেই তার পরিচয় দিল। নাম বলল, থিয়েন আঙ। বাড়ি বার্মার রামরিক। তা অংচাপ্রু মারমা বার্মিজ ভাষা বোঝে বটে। এককালে মারমা জাতির উদ্ভব তো সীমান্তের ওই পারেই হয়েছিল; মারমা শব্দটির উদ্ভব হয়েছে বার্মিজ ‘ম্রাইমা’ শব্দটি থেকে। আজও মারমা ভাষার লেখার বর্ণমালা বার্মিজ। সে যাই হোক। থিয়েন আঙ-এর মতিগতি ভালো ঠেকল না তার । মিয়ানমার সীমান্তের দিকে দীর্ঘদিন ধরে চোরাকারবারিদের নানা রকম অশুভ তৎপরতা চলছে। বার্মিজদের সে এড়িয়েই চলে। সে চায়ের বিল মিটিয়ে উঠে দাঁড়াবে -ঠিক তখনই থিয়েন আঙ নীচুস্বরে বলে, তুই একটা কাজ করতে পারবি?
কি কাজ?
একটা প্যাকেট নিয়া বান্দরবান যাবি। ঐ খানে হোটেল হিলস গ্রিন- এ প্যাকেটটা একজনকে দিবি। যাওয়ার আগে আমি তোরে লোকটার রুম নাম্বার বলে দিব। থিয়েন আঙ ফিসফিস করে বলে।
কি আছে প্যাকেটে?
অত কথায় দরকার কী তোর? থিয়েন আঙ চাপা খসখসে কন্ঠে বলে।
প্যাকেটের কি আছে না-বললে আমি বান্দরবান যাব না।
বিশ হাজার টাকা পাবি। এখন দশ হাজার আগাম পাবি।
আগে কও প্যাকেটে কি আছে।
নীলবড়ি (ইয়াবা)।
অংচাপ্রু মারমা চমকে ওঠে। তীক্ষ্মকন্ঠে বলে, আমি এই কাজ করতে পারব না। তার গায়ে মুনিয়াদির চাদর গায়ে। যে চাদর তাকে প্রতি মুহূর্তে প্রচন্ড পাহাড়ি শীতে উষ্ণতা দিচ্ছে। সে নীলবড়ি পাচার করে বাঙালি তরুণ-তরুণিদের সর্বনাশ করতে পারবে না ।
থিয়েন আঙ তারপর চোখের নিমিষে থানচি বাজারের ভিড়ে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল।
পরদিন অংচাপ্রু মারমা রেমাক্রিবাজারে ফিরে আসে। একটা পর্যটক দল নিয়ে নাফাখুম যায়। পর্যটকদের ঝরনা দেখিয়ে আবার রেমাক্রিবাজারে নিয়ে আসে।
আজকাল হাতে কাজ না-থাকলে সে রেমাক্রিবাজারের কোনও চা দোকানের সামনে বেঞ্চির ওপর বসে থাকে। চা খায়। কালাবির স্বামীর চিকিৎসার জন্য টাকা জোগারের উপায় চিন্তা করে। তার গায়ে মুনিয়াদির চাদর। বাইরে থেকে তাকে দেখে স্বাভাবিকই মনে হয়। অবশ্য সে জানে ... ওরা আসবে। আজ হোক কাল হোক। আসবে। থিয়েন আঙ-এর দলের লোকজন ওকে হত্যা করতে আসবেই ... তখন মুনিয়াদির চাদরে রক্তের ছিটে লাগবে ... সে জানে ...

এ গল্পে ব্যবহৃত মারমা গান দুটির রচয়িতা ও সুরকার সামং প্রু
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29535913 http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29535913 2012-02-06 11:18:24
কয়েকটি সত্য যদিও তিনিই যন্ত্রণার মূল উৎস !

প্রকৃতিকে মানুষ শিল্পে ফুটিয়ে তোলে।
যদিও প্রকৃতির রুদ্র রূপই তীব্র!

যৌথশ্রমে নির্মিত হয় সমাজ।
যে সমাজের অধিকাংশই দুস্থ!

পুরুষ মানুষ খামাখা বাহাবা পায়।
কেননা পুরুষ নিষ্ঠুর আর উদাসীন !

মানুষ বলে যে, ‘নারী তোমাকে বুঝেছি ’।
যদিও সে নারী কুয়াশায় আবছা ছবি!

সময় কে মানুষ বেঁধে রাখতে উদ্যত ।
যদিও সময় ক্ষিপ্র অশ্বের সঙ্গী!

তবুও মানুষ হতে চায় অবিনশ্বর।
তার স্মৃতিপট কালের গর্ভে লোপাট!


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29535692 http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29535692 2012-02-05 23:15:23
প্রাচীন ভারতে নারী (প্রথম পর্ব) ( তৈত্তিরীয় সংহিতা।৬/৫/১০/৩) প্রাচীন ভারতে জন্মের পর থেকেই নারীর স্থান পুরুষের নীচে। নারীর সে অবস্থানটি আর বদলায়নি, বরং অবনতি হয়েছে।
প্রাচীন ভারতীয় সমাজটিতে বেদ-এর কঠোর অনুশাসন ছিল বলে প্রাচীন ভারতীয় সমাজ বৈদিক সমাজ নামেও পরিচিত। প্রাচীন ভারতে যে সময়টায় বৈদিক সাহিত্য রচনা করা হয়েছিল তাই বৈদিক যুগ। ঋদ্বেগ হল বৈদিক সাহিত্যের প্রথম গ্রন্থ। ঋদ্বেগ-এর রচনাকাল খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতক থেকে নবম দশক বলে পন্ডিতেরা অনুমান করেন । ঋদ্বেগ ছাড়াও সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক, উপনিষদ ও সূত্রসাহিত্য বৈদিক সাহিত্যের অর্ন্তভূক্ত । সূত্রসাহিত্যের মধ্যে শ্রৌত, গৃহ্য এবং ধর্মসূত্র প্রধান। ব্রাহ্মণ এবং উপনিষদগুলি খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম থেকে পঞ্চম শতকের রচনা। সূত্রসাহিত্য সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ থেকে খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকের মধ্যে রচিত। সুতরাং খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতক থেকে খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকের সময়কালই বৈদিক যুগ এবং ওই সময়টায় সমাজে নারীর স্থান যে খুব একটা সম্মানজনক ছিল না, তার প্রমাণ বৈদিক সাহিত্যে রয়েছে।
প্রাচীন কালে বর্তমান ইরানের নাম ছিল পারস্য। ওই প্রাচীন পারস্যে ছিল আর্যদের আদি বাসভূমি। নানা কারণে আর্যরা পূর্বদিকে অগ্রসর হয়ে ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বের দিকে প্রাচীন ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে অনুপ্রবেশ করে। এই ঘটনাটি ঘটেছিল ঋগ্বেদ রচনারও ২০০ বছর পূর্বে। সে যাই হোক। ক্রমশ বহিরাগত আর্যরা স্থানীয় দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীকে পরাজিত করে আর্যাবর্ত অধিকার করে নেয়। (আর্যাবর্ত প্রাচীন ভারতের অপর নাম) ...
যাযাবর জীবন ত্যাগ করে আর্যরা চাষবাস করতে শেখে । তারা ভারতবর্ষে সঙ্গে করে লোহা এনেছিল। কাজেই কৃষিকাজে তা সহায়ক হয়েছিল। উল্লেখ্য, হরপ্পা সভ্যতা ছিল ব্রোঞ্জ সভ্যতা। যে কারণে, আর্য আক্রমন দ্রাবিড় জাতি প্রতিহত করতে পারেনি। এই বিষয়টিই বেদে অন্যভাবে উল্লেখিত হয়েছে।
সে যাই হোক। ক্রমশ আর্যরা চাষাবাদে জড়িয়ে পড়ে এবং গ্রামীণ সভ্যতার বনিয়াদ রচনা করে। এর আগে যাযাবর আর্যদের সমাজকাঠামোটি ছিল ট্রাইবাল এবং তারা বিভক্ত ছিল কৌমে । কৃষিকাজে জড়িত হওয়ার পরই এ কাঠামোটি অর্থনৈতিক সর্ম্পকের পালাবদলের কারণেই ভেঙে পড়েছিল এবং আর্যসমাজে ‘কুল’ এর উদ্ভ হয়েছিল। কিন্তু, কুল কি? কুল মানে একটা বাড়িতে তিন চার পুরুষের ডালপালা ছড়ানো বড় পরিবার যে বাড়ির প্রতিটি বয়স্ক পুরুষ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত, অর্থাৎ যে বাড়ির প্রতিটি বয়স্ক পুরুষ ফসলের মাঠে কাজ করে। এই সময়ে সমাজে নারীর মর্যাদা হ্রাস পেতে থাকে। কেননা, নারী উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। যদিও বৃহৎ পরিবারে নারীর সাংসারিক কাজকর্ম ছিল। সংসারের নিত্যদিনের কাজের মধ্যেই নারীর ভূমিকা সীমাবদ্ধ ছিল । নারীর প্রধান কাজ ছিল পশম পাকানো ও বোনা। অন্যান্য কাজের সঙ্গে এ দুটো কাজ তাকে করতে হত। তা সত্ত্বেও নারীকে বলা হল ‘ভার্যা’। অর্থাৎ, স্বামীর অন্নে প্রতিপালিত। ‘ভৃত্য’ এবং ‘ভার্যা’ শব্দ দুটির অর্থ একই - যাকে ভরণ করতে হয়। স্ত্রী অন্ন উৎপাদন করে না বলেই স্ত্রী ভরণীয়া। ভরণীয়া নারী তখনও ঠিক অসূর্যষ্পশ্যা হয়ে ওঠেনি। বৈদিক যুগের শেষের দিকে বৈদেশিক আক্রমনের সময়ে নারীহরণ ও বর্ণসংকর রোধ করতে নারীকে অন্তঃপুরে ঠেলে দেওয়া হয়। বৈদিক নারী তখন অসূর্যষ্পশ্যা হয়ে উঠেছিল।
বৈদিক সমাজে নারীর শিক্ষালাভের পথ ছিল রুদ্ধ। কেননা যে ব্রহ্মচর্য ছিল বেদ অধ্যয়নের প্রবেশদ্বার, সেটি নারীর জন্য প্রাচীনকাল থেকেই নিষিদ্ধ ছিল। তবে ঋগ্বেদে কয়েকজন ঋষিকার (নারীঋষি) নাম উল্লেখ রয়েছে। বিশ্ববারা, ঘোষা, অপালা ও গোধা। এ থেকে বোঝা যায় নারীদের মধ্যে কেউ কেউ শিক্ষালাভের সুযোগ পেতেন। যেমন: বাক, গার্গী, মৈত্রেয়ী, শাশ্বতী-এরাও জ্ঞানচর্চা করে আর্যসমাজে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তবে নারীশিক্ষা ছিল একেবারেই সীমাবদ্ধ। শিক্ষিতা নারী সম্বন্ধে পরিহাস করে বলা হয়েছে,‘নারী হয়েও তারা পুরুষ।’ (তৈত্তিরীয় আরণ্যক ১/১১/৪) ... সঙ্গীত, নৃত্য ও চিত্রশিল্পে কিছু কিছু কুমারী নারীর অধিকার থাকলেও অন্যান্য শিক্ষা থেকে তারা ছিল বঞ্চিত। অবশ্য পুরুষের মন যোগাতে গণিকারা নানা শিল্পে পারদর্শী ছিল।
আগেই বলেছি, ঋগ্বেদ হল বৈদিক সাহিত্যের প্রথম গ্রন্থ। ঋগ্বেদে অবশ্য সরাসরি নারীর স্থান সম্বন্ধে সেরকম কোনও উক্তি নেই। তবে আদি বৈদিক যুগে নারী যে অপেক্ষাকৃত স্বাধীন ছিল সেরকম ইঙ্গিত ঋগ্বেদে রয়েছে । সেকালে নারী নিজেই তার জীবনসঙ্গী বেছে নিতে পারত । ঋগ্বেদে নিষিদ্ধ সর্ম্পকের মিলনের বিষয়টিও উল্লেখিত রয়েছে।তৈত্তিরীয় সংহিতায় রয়েছে, ‘যজমান দীক্ষার দিনে গণিকাসাহচার্য বর্জন করবেন, তার পরদিন পরস্ত্রীর এবং তৃতীয় দিনে নিজের স্ত্রীর।’ (৬/৬/৮/৫) অর্থাৎ দীক্ষার দিনেও পরস্ত্রীর সান্নিধ্য নিষিদ্ধ ছিল না এবং গণিকাগমনের জন্য দীক্ষার দিনেও কোনও প্রায়শ্চিত্ত করতে হত না।
ঋদ্বেদে এমন কী নারীহরণের কথাও রয়েছে। কোনও পুরুষ রাত্রে একটি নারীকে হরণ করতে যাবে, তাই প্রার্থনা করছে মেয়েটির ভাইয়েরা যেন জেগে না যায়, কুকুরগুলি যেন না ডেকে ওঠে।
যৌতুক প্রথা বা কন্যাপণের প্রথা সেই খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ অব্দেও ছিল! ইন্দ্র আর অগ্নি ভক্ত কে ধন দেন, অবাঞ্ছিত জামাতা যেমন প্রচুর ধন দিয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকদের অনুকূল করে তাদের প্রীতিভাজন হয়।
তবে বৈদিক সমাজে সব মেয়েরই যে বিয়ে হত তা কিন্তু নয়-যে মেয়েরা বাপের বাড়িতে বুড়ি হয়ে যায় তাদের ‘বৃদ্ধকুমারী’ বা ‘জরৎকুমারী’ বলা হয়েছে।
পুরুষতান্ত্রিক বৈদিক সমাজে যজ্ঞ ছিল অন্যতম ধর্মীয় কৃত্য। সুতরাং যজ্ঞে নারীর ভূমিকা ছিল নিষ্ক্রিয়। যজ্ঞে পুরুষ যজমানের ভূমিকাই ছিল প্রধান! নারীর উপনয়ন নেই বলে নারী হোম করতে পারত না। গৌতমধর্মসূত্রে রয়েছে,‘অস্বতন্ত্রা ধর্মে স্ত্রী।’ অর্থাৎ ধর্মবিষয়ে নারীর কোনও স্বাতন্ত্র নেই!
বৈদিক সমাজে পুরুষের একাধিক স্ত্রী ছিল। স্ত্রীদের শাসনের (অর্থাৎ বশে রাখার) মন্ত্রও রয়েছে বেদে। অবশ্য আদি বৈদিক সমাজে নারীরও একাধিক বিবাহের কথা জানা যায়। তবে তা অল্প সময়ের জন্য। তৈত্তিরীয় সংহিতা ও ব্রাহ্মণে রয়েছে,‘যজ্ঞে একটি দন্ডকে বেষ্টন করে থাকে দুটি বস্ত্রখন্ড; তাই পুরুষ দুটি স্ত্রী গ্রহণে অধিকারী; একটি বস্ত্রখন্ডকে দুটি দন্ড বেষ্টন করে না, তাই নারীর দ্বিপতিত্ব নিষিদ্ধ।’ ( তৈত্তিরীয় সংহিতা ৬/৬/৪/৩ এবং তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ১/৩/১০/৫৮)
শতপথ ব্রাহ্মণে রয়েছে-

‘একস্য পুংসো বহ্ব্যো জায়া ভবন্তি।’

অর্থাৎ, এক পুরুষের বহু পত্নী হয়।

এভাবে পুরুষের জন্য সুবিধাজনক আচরণের সমর্থন জুগিয়েছে মানবরচিত শাস্ত্র। প্রাচীন ভারতের রাজাদের চারজন বৈধ স্ত্রী থাকত । মহিষী, বাবাতা, পরিবৃক্তি (বা পরিবৃত্তী) ও পালাগলী। এ ছাড়াও বহু উপপত্নী থাকত রাজঃঅন্তপুরে। মৈত্রীয়ণী সংহিতায় রয়েছে যে মনুর দশটি এবং চন্দ্রের সাতাশটি স্ত্রী ছিল।
মানসিক বা সামাজিক কোনও কারণে নয়- একমাত্র সন্তানের জন্ম দেওয়ার জন্যই নারীকে পুরুষের অর্ধাঙ্গিনী বলা হত । বিবাহে কন্যাকে দান করা হত স্বামীকে নয়-স্বামীর পরিবারকে। এই অধিকারেই শ্বশুরবাড়ির লোকেরা বধূকে নির্যাতন করত! ‘সূর্যোদয় হলে প্রেত যেমন করে ছুটে পালায়তেমন করে পুত্রবধূ শ্বশুরের সামনে থেকে ছুটে পালায়।’ (অর্থববেদ ৮/৬/২৪)
ঋগ্বেদে সহমরণ বা সতীদাহ প্রথার কোনও উল্লেখ নেই। বিধবা নারী বেঁচে থাকত। কখনও-বা বিধবা নারীর বিয়ে হত দেওরের সঙ্গে কখনও-বা বিয়ে হত না। তবে সে বৈধব্যের জীবন মোটেও সুখের ছিল না। বিধবা নারীর তাই প্রার্থনা: ‘যেন ইন্দ্রাণীর মতো অবিধবা হই।’ সহমরণ এর উল্লেখ রয়েছে অর্থববেদে। ‘দেখলাম জীবিত নারীকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মৃতের বধূ হতে।’(অর্থববেদ ১৮/৩/৩) অনেক ঐতিহাসিকের মতে সহমরণ আর্যরীতি নয় বরং প্রথাটি অনার্য । কেননা, ইন্দো-ইউরোপীয় সভ্যতায় সহমরণ-এর বিষয়টি নেই।
সহমরণ কি তাহলে হরপ্পা অর্থাৎ সিন্ধসভ্যতার উত্তরাধিকার?

ক্রমশ ...


তথ্যসূত্র:

সুকুমারী ভট্টাচার্য; প্রাচীন ভারত: সমাজ ও সাহিত্য
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29534826 http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29534826 2012-02-04 12:45:45
গল্প: দ্রাবিড়া সম্প্রতি হরপ্পা নগরের অধিবাসীদের রাত্রিগুলি অনিদ্র উৎকন্ঠায় কাটছে। দিনগুলি কাটছে ভয়ানক উদ্বেগ আর দুশ্চিন্তায়। নগরবাসীকে ঘিরে ধরেছে মৃত্যুর হিমশীতল আতঙ্ক। আতঙ্কিত নগরবাসী নগরের কেন্দ্রীয় উপাসনালয়ের সামনের সড়কে সমবেত হয়েছে। ইটের তৈরি উপাসনালটি একটি চতুস্কোন উঁচু বেদির ওপর নির্মিত। উপাসনালয়ের সমুখে অপরিসর প্রাঙ্গন। তারই মধ্যিখানে দেবতা শিবের একটি কৃষ্ণবর্ণের প্রস্তরমূর্তি। সে মূর্তির সামনে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে হরপ্পা নগরের প্রধান পুরোহিত শিবা। মাঝবয়েসি পুরোহিতের গড়নটি শীর্ণ এবং খর্বকায়, গায়ের রং কৃষ্ণবর্ণ । পুরোহিত শিবার পরনে সুতির শ্বেতবস্ত্র। মুখচোখ ভাবলেশহীন। প্রধান পুরোহিত শিবাই হরপ্পা নগরের প্রধান শাসক।
কয়েকদিন আগে যখন উপাসনালয়ের প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে পুরোহিত শিবা বলেছিল, হরপ্পা নগরে যাযাবর আরিয়গণের
(আর্য) আক্রমণ আসন্ন। তারা আমাদের অসুর মনে করে, তারা অসুর নগর ধ্বংস করে দেবে। তখন সমবেত জনতার মধ্যে গুঞ্জন উঠেছিল। পুরোহিত শিবা আরও বলেছিল, আরিয়গণের আদি নিবাস পশ্চিমের এক পার্বত্য অঞ্চলে। আরিয়গণ যাযাবর, তারা বণিকদের ঘৃণা করে। তারা তাদের দেবতার নিকট প্রার্থনা করে, হে পূষন, তুমি বণিকদের ধন আমাদের এনে দাও। আরিয়গণ বর্তমানে ইরাবতী নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থান করছে । যে কোনও মুহূর্তে তারা এ নগর আক্রমন করতে পারে।
এরপর নগরময় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। হরপ্পা নগরের অধিকাংশ নাগরিকই বণিক কিংবা কারিগর। নগর প্রতিরক্ষার জন্য কখনোই সুদক্ষ সৈন্যবাহিনী গড়ে ওঠেনি। প্রতিরক্ষা বলতে কেবল নগরের পশ্চিমে সুউচ্চ দূর্গপ্রাচীর। নগরের বাইরে কৃষিক্ষেত্রের কৃষক, জেলে, মাঝি কিংবা ব্যাধ যুদ্ধবিগ্রহে অনভিজ্ঞ। সুতরাং, হরপ্পার নগরবাসী আরিয়গণের আক্রমনের আশঙ্কায় আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে রয়েছে । নগরদূর্গ ধ্বংস করে আরিয়গণ নগরে প্রবেশ করতে সক্ষম হলে যে নগরময় রক্তের নদী বইয়ে দেবে তাতে কোনও সন্দেহ নেই!
উপাসনালয়ের সামনের সড়কে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল রাঢ়ঈ। হরপ্পা নগরের ব্যবসায়ী সে । এদিক ওদিক চেয়ে রাঢ়ঈ বলল, আরিয়গণ এ নগর আক্রমন করলে যে বাঁচার পথ থাকবে না ।
আমরা অত সহজে ওদের ছেড়ে দেব না। আমরা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলব। দৃঢ়কন্ঠে পিপ্পাই বলল। পিপ্পাই শিল্পী, ব্রোঞ্জ দিয়ে নানা ধরনের মূর্তি তৈরি করে।
অহিমঅ, পেশায় যে শস্যাগারের হিসেবরক্ষক, ব্যাক্তিগত জীবনে বড় ধার্মিক, সেই অহিমঅ বলল, আমার বিশ্বাস মহামাতৃদেবীর প্রবল উত্থানে এ নগর রক্ষা পাবে।
রাঢ়ঈ বলল, এই! তোমরা চুপ কর, চুপ কর। পুরোহিত শিবা কী যেন বলছেন।
পুরোহিত শিবা উষার আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো আকাশে দৈব ইঙ্গিত খুঁজছে। হালকা ফিরোজা রঙের আকাশে সাদা মেঘপুঞ্জ ভেসে যাচ্ছে । পুরোহিত শিবা আকাশ থেকে মুখ ফিলিয়ে একবার সমবেত নাগরিকের দিকে তাকাল। তারপর বলল, আরিয়গগণের অধিপতির নাম ইন্দ্র। সে বীর যোদ্ধা, অসুরগণের প্রতি নিষ্ঠুর । আরিয়গণ ইন্দ্রকে স্বয়ং দেবতা মনে করে। ইন্দ্র কে তারা দেবরাজ বলে সম্বধোন করে । ইন্দ্রকে বধ করা সম্ভব হলেই আরিয়গণ ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবে। হরপ্পা নগর রক্ষা পাবে।
সমবেত জনতার মধ্যে গুঞ্জন ওঠে।
ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল তামাটে বর্ণের একটি তরুণি । তরুণির নাম দ্রাবিড়া। পুরোহিত শিবার কথায় তার চোখ দুটি জ্বলে ওঠে। আরিয়গণের বিরুদ্ধে প্রবল ঘৃণায় তরুণির শ্যামল মুখ বিকৃত দেখায়। তরুণি দ্রাবিড়ার আদিম রক্তে কোথাও বেজে উঠেছে তালবাদ্য। আবার আদিম বন্য জীবনে ফিরে যেতে দ্রাবিড়া উদ্যত। আরিয়গণের আক্রমন থেকে দ্রাবিড়া ওর অনাগত সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়, স্বামীকে কে বাঁচিয়ে রাখতে চায় । হরপ্পা নগরে বর্বর আরিয়গণের আক্রমন করার কোনও অধিকার নেই! দ্রাবিড়া ইন্দ্রকে হত্যা করবে! দ্রাবিড়ার তামাটে শরীরে আদিম নিষাদ রক্ত ফুঁসে ওঠে।
দ্রাবিড়া যদিও হরপ্পা নগরেরই নাগরিক, তবে তার জন্ম হয়েছিল হরপ্পা নগরের বাইরে সরস্বতী নদীর পাড়ের এক গভীর বনভূমি তে। দ্রাবিড়ার পিতা শবর ছিল নিষাদ গোত্রের দক্ষ শিকারী । তার নিক্ষিপ্ত শর কখনোই লক্ষ্যভ্রষ্ট হত না। বালিকা বয়েসেই পিতার কাছেই ধনুকে তীর যোজনার দীক্ষা নিয়েছিল দ্রাবিড়া। কালক্রমে নিপুনা শিকারী হয়ে ওঠে কিশোরী দ্রাবিড়া । কাঁধে তীরধনুক নিয়ে বনপথে হরিনীর মতো দ্রুতপদে ছুটত । সে দৃশ্যের বর্ণনা দিয়ে এক নিষাদ কবি তাঁর শ্রুতিকাব্যে লিখেছে-

তামাটে বর্ণের কিশোরী দ্রাবিড়া পরনে বৃক্ষের হরিৎ বল্কল; চকিতা হরিণীর গতিতে ছুটত নিবিড় বনপথে ছড়িয়ে বিদ্যুৎ।

এক দৈব ঘটনায় অরণ্যচারী কিশোরী দ্রাবিড়া হরপ্পাবাসী হয়েছিল। বৈশাখ মাসের ভোরবেলা। দ্রাবিড়ার পিতা শবর সরস্বতী নদীর পাড়ে এক দীঘলকান্তি শ্যামল তরুণ কে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখল। শবর তরুণকে উদ্ধার করে বনমধ্যে তার পর্ণকুটিরে নিয়ে আসে । পরে নিবিড় শশ্রুষায় তরুণের চেতনা ফিরে এলে তাকে কাঠের পাত্রে গরুর উষ্ণ দুধ খেতে দেয় দ্রাবিড়া; তরুণের অর্ধনগ্ন কোমল শরীরের দিকে মন্ত্রমুগ্ধ চেয়ে থাকতে থাকতে কিশোরী দ্রাবিড়ার রক্তে উঠেছিল কামনার ঝড় । জানা গেল-তরুণের নাম মঋঅ; হরপ্পা নগরের নাগরিক সে; পেশায় বণিক, গত রাত্রিতে যে ঝড় উঠেছিল- তাতেই সরস্বতী নদীতে নৌকা ডুবে গেছে। মহামাতৃদেবীর কৃপায় মঋঅ বেঁচে ফিরেছে। এখন দ্রাবিড়াকে সেও দেখে মুগ্ধ । ব্যাধ শবর এর কাছে সে তার কন্যাকে যাচ্ঞা করে। অরণ্যচারী শবর নিষাদ ছিল বলেই ছিল উদার; অসম বিবাহে সে সম্মত হয় । তরুণ বণিক মঋঅ দাবিড়াকে বিয়ে করে হরপ্পা নগরে নিয়ে যায় । এরপর দ্রাবিড়ার নগরজীবন শুরু হয় বটে তবে আরণ্যক জীবনের শিক্ষা কখনোই বিস্মৃত হয়নি দ্রাবিড়া । এরপর দ্রাবিড়ার স্বামী মঋঅ পশ্চিমদেশে বাণিজ্যে যায়। এর পরপরই আরিয়গণ হরপ্পা নগরে আক্রমনে উদ্যত হয়। দ্রাবিড়া গর্ভবতী । দ্রাবিড়ার মাতৃসুলভ কল্পনায় শিশুরা খেলা করে। দাবিড়া মনে মনে ঠিক করে রেখেছে ওর মেয়ে হলে নাম রাখবে সরস্বতী; আর ছেলে হলে? শবর। বর্বর আরিয়গণের আক্রমনে শবর ও সরস্বতীর জীবন আজ বিপর্যস্ত।
শর নিঃক্ষেপ করে আরিয়গণের দেবরাজ ইন্দ্র কে হত্যার শপথ নেয় দ্রাবিড়া।

ইরাবতী নদীর পশ্চিম তীরে প্রসারিত প্রান্তর। তারই এক প্রান্তে ইন্দ্র একটি কৃষ্ণবর্ণের বলিষ্ট অশ্বের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। কৃষ্ণবর্ণের অশ্বের লাগাম ধরে ছিল একটি উদ্ভিন্ন যৌবনা স্বর্ণকেশী তরুণি । তরুণির নাম মৈত্রায়ণী । ফরসা দীর্ঘাঙ্গি মৈত্রায়ণী ইন্দ্রের শয্যাসঙ্গীনি । পশুচর্মের পোশাক পরিহিতা মৈত্রায়ণীর উদ্ধত যৌবন টলটল করে। আরিয়দেশ (ইরান) থেকে দীর্ঘ যাত্রায় ইন্দ্রের অনুবর্তিনী ছিল মৈত্রায়ণী । ইন্দ্রের সঙ্গে অবিরত সঙ্গমের পরও ইন্দ্রের প্রতি মৈত্রায়ণীর আকর্ষন ম্লান হয়নি। মৈত্রায়ণীর তৃষ্ণা মেটে না; তবে সম্প্রতি মৈত্রায়ণীর মনের ভিতরে জমে উঠেছে আশঙ্কার মেঘ । পশুচারী যাযাবর আরিয় গোষ্ঠীতে বহুবিবাহ স্বীকৃত। সম্প্রতি ইন্দ্র এক বন্য প্রকৃতির যুবতীর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। যুবতীর নাম বধ্রিমতী । বধ্রিমতীর ওপর ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠেছে রুদ্রাণী । সম্ভবত এ এক নতুন আবেগ। যাযাবর আরিয়সমাজের ধর্মটি বহু ঈশ্বরবাদী হলেও বর্তমানে আরিয় ঋষিগণের চিন্তায় ক্রমশ এক ঈশ্বরের অস্পষ্ট কল্পনা ফুটে উঠছে; সেরকমই আরিয়সমাজে পুরুষের বহুনারীগমন সত্ত্বেও একমুখী প্রেমের উত্তরণ ঘটছে। বধ্রিমতীর ওপর মৈত্রায়ণীর ঈর্ষা তাই প্রমাণ করে ...
আরিয়গণের অধিপতি ইন্দ্রর গড়ন দীর্ঘকায় এবং বলিষ্ট, তার পরনে পশুচর্মের পোশাক; মাথায় লোহার শিরস্ত্রাণ। তারই ফাঁকে কাঁধ অবধি নেমে আসা সোনালি রঙের চুল সূর্যের আলোয় ঝলমল করে। ঈষৎ চৌকো রক্তিম মুখে চোখ দুটি ক্ষুরধার । লালচে দাড়ির নীচে দৃঢ় চোয়াল। প্রথম দর্শনে ইন্দ্রকে অন্যান্য আরিয়গণের চেয়ে স্বতন্ত্রই মনে হয়। ইন্দ্রর কাঁধে তীরধনুক, হাতে লোহার ফলাযুক্ত একটি ক্ষুরধার বজ্র (অস্ত্র) ।
ইন্দ্র ইরাবতী নদীর পশ্চিমপাড়ে নগরদূর্গের দিকে চেয়ে আছে । দূরের ওই অনার্য অসুর নগর ধ্বংস করে আরিয়দের অপরিমেয় ধনসম্পদ এনে দেবে ইন্দ্র। এর আগেও অসুর নগর ধ্বংস করেছে ইন্দ্র। আরিয়সমাজে তাঁর উপাধি ‘পুনন্দর’। অর্থাৎ, ‘নগর ধ্বংসকারী’। যখন রাত্রিকালে আরিয়গণ পবিত্র অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করে ইন্দ্রের বন্দনাগীত গায় আর সোমরস পান করে, তখন ইন্দ্রের অহং তৃপ্ত হয়। হ্যাঁ, আজ দূরের ওই অনার্য নগর ধ্বংস করে আরিয়দের অপরিমেয় ধনসম্পদ এনে দেবে ইন্দ্র!
ইরাবতী নদীর পাড়ে আজ ভোর থেকে অশ্ববলী যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হচ্ছে । যজ্ঞে অশ্ব বলি দিয়ে মৃত অশ্ব ইরাবতীর জলে নিঃক্ষেপ করা হচ্ছে। মৃত অশ্বের ওপর দিয়ে নদী পার হবে আরিয়সৈন্যগণ। নদীপাড়ে হোমাগ্নির আগুন প্রজ্জলিত করা হয়েছে। সুললিত কন্ঠে সূক্তপাঠ করছেন এক বৃদ্ধ ঋত্বিক-

‘ হে অশ্বিনৌ তোমরা আমাদের পর্যাপ্ত ধন দাও। যেমন দেয় পরস্ত্রীতে আসক্ত কামুক তার অভিলষিতাকে। হে অশ্বীরা, বেদীর ওপরে কে তোমাদের অভিমুখী হয়? বণিকদের মন ভেজাও, পূষন, ওদের ধন আমাদের এনে দাও। হে পূষন, তোমার ‘আরা’ অস্ত্র দিয়ে পণিদের হৃৎপিন্ড বিদ্ধ কর, ওদের ধন আমাদের এনে দাও। যারা আর্যব্রত (যজ্ঞ) করে না তারা মরুক। ওদের ধন আমাদের এনে দাও।’

আজই অসুরনগর আক্রমন করবে দেবরাজ? রুদ্রাণী জিজ্ঞাসা করে।
হ্যাঁ।
মৈত্রায়ণী কি বলতে যাবে - দূর থেকে ঋশ্ব এবং বধ্রিমতী কে পাশাপাশি দুটি ঘোড়ার পিঠে চড়ে এগিয়ে আসতে দেখল। ঋশ্বর কাঁধে বজ্র। বধ্রিমতীর কাঁধে তীরধনুক। ঋশ্ব আরিয়সৈন্যদলের সেনাধ্যক্ষ । সে দেবরাজ ইন্দ্রের স্নেহভাজন। বলিষ্ট দেহের অধিকারী ঋশ্ব অসুর-বধে অত্যন্ত দক্ষ। বধ্রিমতীও। সম্প্রতি বধ্রিমতী কে আরিয়সৈন্যদলের উপ-সেনাধক্ষ নিযুক্ত হয়েছে। আরিয়গণ তাদের আদিবাসস্থান পরিত্যাগ করে পূর্বদিকে অগ্রসর হচ্ছে। যাত্রাপথে আরিয়গণ ‘দাস’, ‘দস্যু’ এবং ‘অসুরগণের’ সঙ্গে সম্মুখসমরে অবতীর্ণ হচ্ছে। সুতরাং আরিয়সমাজে যোদ্ধাগণ সম্মানিত। বধ্রিমতী সুদক্ষ সাহসী যোদ্ধা, সেকারণে আরিয়সমাজে জনপ্রিয়। শর নিঃক্ষেপে বধ্রিমতী আরিয়গণের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। বধ্রিমতীর শর নিঃক্ষেপ অব্যর্থ । ছুটন্ত অশ্বপৃষ্ঠে আরূঢ় হয়েই বধ্রিমতী উড়ন্ত পাখি কি দূরবর্তী বৃক্ষের ফল অনায়াসে বিদ্ধ করতে পারে। মৈত্রায়ণীর কেবল রূপই সম্বল, তার গৌড়বর্ণের শরীরটি কোমল, মেদুর । বুনো প্রকৃতির বধ্রিমতী অঙ্গপ্রতঙ্গ দৃঢ়, যদিও লাবণ্যহীন। বস্তুত, রুক্ষ তাম্রবর্ণের এক অদম্য যোদ্ধা বধ্রিমতী ।
বধ্রিমতীর প্রতি ঈন্দ্রের আকৃষ্ট হওয়ার এই কি কারণ?

দ্রাবিড়া দৃঢ় পায়ে হাঁটছিল। গন্তব্য হরপ্পা নগরের পশ্চিমের দূর্গপ্রাচীর। যত শীঘ্র সম্ভব সেখানে পৌঁছতে চায় দ্রাবিড়া, আরিয়গণ ইরাবতী পার হওয়ার আগেই । দ্রাবিড়ার কাঁধে ধনুক, তূণে কালো পালকের বিশাক্ত তীর। এই মুহূর্তে দ্রাবিড়া যেন অতীতের নিষাদজীবনে ফিরে গেছে। ইট-পাথরের নগর হয়ে উঠেছে নিষাদারণ্য ...
অবরুদ্ধ হরপ্পা থমথম করছিল । সড়ক প্রায় জনশূন্য। আরিয়গণের আক্রমণের আশঙ্কায় মানুষের কর্মকোলাহল স্তিমিত হয়ে গেছে। যদিও হরপ্পা নগরের অতীত গৌরব বহুকাল হল ম্লান হয়ে গেছে। যাযাবর আরিয়গণের আক্রমনে বাণিজ্যপথ অবরুদ্ধ হওয়ায় বাণিজে অবনতি ঘটেছে। কেবল নৌপথে বাণিজ্য সচল রয়েছে । (মঋঅ নৌপথেই পশ্চিমদেশে গেছে।) বাণিজ্য ছাড়াও নিদারুণ অবনতি ঘটেছে কৃষির । হরপ্পা নগরের বাইরে জমি আর আগের মতো উর্বর নেই। জমিতে পলির বদলে বালি জমছে। সরস্বতী নদীও ধীরে ধীরে মজে যাচ্ছে। সরস্বতী নদীর পাড়ের নগরগুলি জনশূন্য বিরাণ হয়ে পড়েছে । মহামাতৃদেবী কি কুপিতা হয়েছেন? হাঁটতে হাঁটতে ভাবে দ্রাবিড়া। হরপ্পা ধনী বণিকের নগর । নগরের নাগরিক বিলাসব্যসনে মত্ত। হরপ্পা সুপরিকল্পিত নগর হলেও বর্হিশক্র আক্রমনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি।
দ্রাবিড়া যখন পশ্চিম দূর্গপ্রাচীরের কাছে পৌঁছালো তখন প্রায় পূর্বাহ্ন। চারদিকে প্রখর রৌদ্র ঝলমল করছিল। ইটের তৈরি আকাশ ছোঁয়া দূর্গপ্রাচীর। প্রাচীর ঘেঁষে প্রশস্ত সিঁড়ি উপরে উঠে গেছে । দ্রাবিড়া সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকে। টের পায় গর্ভের জলের ঘরে ভ্রুনরূপী অনাগত শিশুর আন্দোলন। সরস্বতী কিংবা শবর। শিশু দুটিকে যে করেই হোক বাঁচাতেই হবে। ইন্দ্রকে হত্যা করতেই হবে!
সিঁড়ি যেখানে শেষ সেখানে একটি ক্ষুদ্র প্রকোষ্ট রয়েছে। প্রকোষ্টটি দেয়ালহীন কেবল চারদিকে চারটি স্তম্ভ আর ছাদ । প্রকোষ্টে পা রাখতেই দ্রাবিড়ার শরীর ভয়ঙ্কর ভাবে কেঁপে ওঠে । যদি শর লক্ষভ্রষ্ট হয়? দ্রাবিড়া মহামাতৃদেবীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায়। আজ বাতাস তীব্র নয়। তীর লক্ষভ্রষ্ট হবে না।
দূর্গপ্রাচীরের প্রকোষ্টে দাঁড়িয়ে ছিল দাশ্বন। আঠারো-উনিশ বছরের শ্যামবর্ণের কিশোর। দাশ্বন পুরোহিত শিবার নিযুক্ত পর্যবেক্ষণকারী; দূর্গপ্রাচীরের প্রকোষ্টে দাঁড়িয়ে আরিয়গণ গতিবিধি লক্ষ রাখছে। পুরোহিত শিবার নিযুক্ত আরও একজন পর্যবেক্ষণকারী রয়েছে। অঋঈ। অঋঈ এখন পুরোহিত শিবার কাছে প্রতিবেদন জমা দিতে গিয়েছে। অঋঈ ফিরে এলে দাশ্বন পুরোহিত শিবার কাছে প্রতিবেদন জমা দিতে যাবে।
কি খবর রে দাশ্বন? বলে পশ্চিমদিকে তাকায় দ্রাবিড়া।
আরিয়গণ নদী পাড় হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দাশ্বন বলল। কন্ঠস্বর অবরুদ্ধ।
সূর্যালোকে ইরাবতী নদীর জল ঝলমল করছিল। নগরদূর্গের ঠিক নীচেই নদী। পাড়ে আছড়ে পরা জলের শব্দ শোনা যায়। নদীর পাড়ে কয়েকটি নৌকা। যাত্রীশূন্য। ওপর পাড়ে অবারিত প্রান্তরে অজস্র আরিয় নারীপুরুষ। আর ঘোড়া। আর ঘোড়ায় টানা রথ। দীর্ঘকায় গৌড়বর্ণের আরিয়গণের পরনে চামড়ার পোশাক। । নদীর পাড়ে ধোঁওয়ার কুন্ডলী। মৃত ঘোড়ার স্তূপ। দ্রাবিড়া সেই দিকে চেয়ে আছে। চোখে অবিশ্বাস।
দ্রাবিড়া কাঁধ থেকে ধনুক নামিয়ে নেয়। তূণ থেকে তীর। শিশক সাপের বিষমাখানো তীর, লহমায় মৃত্যু আনে; তীরের পুচ্ছে কৃষ্ণকায় হংসবলাকার কালো পালক।
ইন্দ্র কোথায়?
দ্রাবিড়ার চোখ বহু নীচে দূরে তার অনাগত সন্তানের হত্যাকারীকে খুঁজছে ...

ইন্দ্রের কাছে এসে ঘোড়া থেকে নামে ঋশ্ব । মাথা ঝাঁকিয়ে ইন্দ্রকে অভিবাদন জানায়। বধ্রিমতীও ঘোড়া থেকে নেমে ইন্দ্রকে অভিবাদন করে। বধ্রিমতী চোখের দিকে তীব্র চোখে তাকায় মৈত্রায়ণী, যেন বধ্রিমতীকে অগ্নিদগ্ধ করে দেবে। মৈত্রায়ণী অবশ্য জানে-বধ্রিমতী প্রতিশোধ নেবে না। মৈত্রায়ণীর পিতা ঋষি সামদেব শ্রুতিগ্রন্থ বেদের ভাষ্যকার। মৈত্রায়ণীর ক্ষতি করলে আরিয় গোষ্ঠীর যে ঘোর অমঙ্গল হবে- বধ্রিমতী তা জানে।
ঋশ্ব বলে, দেবরাজ, অশ্বাবলী যজ্ঞ সমাপ্ত প্রায় প্রায় । আরিয়গণ নদী পার হতে প্রস্তুত। তারা আপনার নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে।
ইন্দ্র সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে। তারপর অশ্বের দিকে এগোয়, অশ্বে আরূঢ় হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে তীব্র আর্তনাদ করে ঢলে পড়ে ইন্দ্র । তার কন্ঠনালীতে একটি কালো পালকের তীর বিদ্ধ। । মৈত্রায়ণী চিৎকার করে ওঠে । তারপর ইন্দ্রের বুকে ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে উচ্চস্বরে কাঁদতে থাকে । বধ্রিমতী দূরের অসুর নগরের দিকে চকিতে ফিরে তাকায় । কাল বিলম্ব না করে হাঁটু গেড়ে বসে, তার আগেই ধনুকে তীর যোজনা করে ফেলেছে ... দূর্গপ্রাচীরের দিকে লক্ষ করে তীর ছোড়ে বধ্রিমতী । দূর্গ প্রাচীরের ওপর থেকে নীচের ইরাবতীর জলে একটি নারীদেহ পড়ে যেতে দেখে বিস্মিত হয় বধ্রিমতী ।

বৈদিক সূক্তের সূত্র:

সুকুমারী ভট্টাচার্য; প্রাচীন ভারত: সমাজ ও সাহিত্য

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29533726 http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29533726 2012-02-02 09:44:22
গল্প: ভাষা শহীদ সিরাজ উদ্দীন-এর বড় ছেলে আলী আশরাফ দীর্ঘদিন হল কানাডা প্রবাসী, খানিকটা ছন্নছাড়া স্বভাবের আলী আশরাফ বিয়ে- থা করেনি, ‘সোনালি বাংলা’ নামে এক মাসিক পত্রিকার সম্পাদনা করে। ছোট ছেলে ওমর খালেদ একটা বেসরকারি ব্যাঙ্কের ম্যানেজার। বছর খানেক হল চিটাগাংয়ে পোস্টিং হয়েছে, পরিবার নিয়ে সেখানেই থাকে ওমর খালেদ । সিরাজ উদ্দীন-এর ছোট মেয়ে বিলকিস-এর শ্বশুরবাড়ি সিলেট শহরের টুকেরবাজার । বিলকিস-এর ছোট মেয়ে রুমকি সিরাজ উদ্দীন- এর ফ্ল্যাটেই থেকে ঢাকায় একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে । রুমকি ছাড়াও বিপত্নীক সিরাজ উদ্দীন-এর ছোট সংসারে আছে জোছনা নামে সতোরো-আঠারো বছর বয়েসি চাঁদপুরের একটি মেয়ে। মেয়েটির রান্নার হাত ভালোই, তবে কথাবার্তায় চাঁদপুরের আঞ্চলিক ভাষার ছাপ স্পস্ট। যেমন জোছনা মুরগিকে বলে কুরকা, মোরগকে বলে রাতা, মুড়িকে বলে উরুম, চিরুনিকে বলে কাফুই, বোনকে বলে ভোন, বাথরুমকে বলে ভাতরুম। জোছনার উচ্চারণ নিয়ে রুমকি হাসাহাসি করে। সিরাজ উদ্দীন নাতনীকে ধমক দিয়ে বলেন, অত হাসিস না রে রুমকি । এ দেশের মানুষ ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে।
রুমকি সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে বলে, সব মানুষ না নানা, কিছু মানুষ। আর প্রাণ কি চাঁদপুরের আঞ্চলিক ভাষার জন্য দিয়েছে নাকি? ধরা যাক বাংলাকে তৎকালীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নেওয়া হয়েছে, সেই ভাষা কি জোছনার মুখের ভাষা হত, নাকি পশ্চিমবঙ্গের শুদ্ধ চলিত ভাষা? যে ভাষাকে ঐতিহাসিকভাবে পূর্ববঙ্গবাসী ১৯৪৭ সালেই টা টা গুডবাই জানিয়েছে।
সিরাজ উদ্দীন কী বলবেন। তুখোর এক প্রজন্মের মেয়ে রুমকি। রাজনীতিবিমূখ এই প্রজন্ম ঘরে বসে না থেকে কুয়াকাটা কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রামের দূর্গম জনপদ আবিস্কার করে বেড়াচ্ছে, আর সিরাজ উদ্দীন-রা ঘরে বসে বসে ‘খন্দকার মোশতাক’, ‘খন্দকার মোশতাক‘ করে অনেক সময় নষ্ট করেছেন!
তা এ বছর শীত ভালোই পড়েছে।
দেখতে দেখতে ভাষার মাসও এসে গেল।
জানুয়ারি মাসের শেষের দিকের কথা। বিকেল পাঁচটার মতো বাজে। সিরাজ উদ্দীন ড্রইংরুমের সোফায় বসেছিলেন। জোছনা রান্নাঘরে। চা তৈরি করছিল । এমন সময় কলিংবেলটা বাজল। রান্নাঘর থেকে গিয়ে জোছনাই দরজা খুলে দিল । রুমকি। ইউনিভারসিটি থেকে ফিরল। ঘরে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে কাপড় বদলে নিল । তারপর ড্রইংরুমে এল। রুমকির হাতে ছোট্ট একটা চোখের ড্রপের প্লাস্টিকের শিশি। বলল, 'দুই বু কি' নানা। সত্যি দেরি হয়ে গেল।
দেরি কোথায় রে? তুই তো সময় মতোই ফিরলি।
চিনে ভাষার ‘দুই বু কি’ মানে হল, ‘আমি দুঃখিত’। রুমকি চাইনিজ ভাষা শিখছে । প্রায়ই সিরাজ উদ্দীন কে রুমকি জিগ্যেস করে, বলত তো নানা চাইনিজরা ‘হ্যালো’ কে কি বলে? সিরাজ উদ্দীন হেসে বলেন, সেকথা আমি কী করে জানব রে । আমি কি চিনে ভাষা জানি? রুমকি বলে, ‘হ্যালো’ কে চাইনিজ ভাষায় বলে নিহাও। আর ‘তুমি কেমন আছো’ কে বলে নিহাওমা? হুমম বুঝলাম। তা তুই চাইনিজ শিখে কি করবি রে রুমকি? সিরাজ উদ্দীন জিগ্যেস করেন। ওমাঃ বলে কি! এখন তো হিন্দি আর চাইনিজ ভাষার যুগ। আমেরিকানরা পর্যন্ত চাইনিজ শিখছে। পাকিস্তানে ক্লাস সিক্স থেকে চাইনিজ চাইনিজ ভাষা কম্পলসারি করেছে জানো না। তাই নাকি? হ্যাঁ।
সিরাজ উদ্দীন- এর চোখে ড্রপ দিতে দিতে আদুরে গলায় রুমকি বলল, নানা। আমার এক ফ্রেন্ড না তোমায় খুব রেসপেক্ট করে।
ওর নাম রায়হান, রায়হান কবীর। ও লাস্ট মান্থ-এ চ্যানেল সিক্সটিন- এ জয়েন করেছে। জান তো আজকাল সব জায়গাতেই কী রকম কম্পিটিশন। রায়হান তোমার একটা এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউ নিতে চায়।ফেব্রুয়ারি এক তারিখে চ্যানেল সিক্সটিনে প্রচার করবে।
বেশ তো, ছেলেটাকে আসতে বলল।
পর দিন দুপুরে রায়হান তার দলবল নিয়ে এল। দলবল মানে ক্যামেরাম্যান আর একজন সহকারি। রায়হান-এর বয়স ২৪/২৫। শ্যামলা, লম্বা, চশমা পরা । পরনে জ্যাকেট আর জিন্সের প্যান্ট। রায়হান হয়তো সিরাজ উদ্দীন-এর সামনে নার্ভাস ছিল। মুখ ফশকে বসল: আজ আমরা কথা বলব প্রখ্যাত ভাষা শহীদ সিরাজ উদ্দীন- এর সঙ্গে।
সিরাজ উদ্দীন সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলে খানিকটা লাফিয়ে উঠে বললেন, না, না। আমি ভাষা শহীদ নই, আমি ভাষা শহীদ নই, আমি ভাষা সৈনিক। আমি এখনও বেঁচে আছি। ছেলেটার অজ্ঞতায় অবাক হয়েছেন সিরাজ উদ্দীন।
সরি দাদু। রায়হানের চেহারা দেখার মতো হল। ইঙ্গিতে ক্যামেরা অফ করতে বলল সে।
রুমকি বসেছিল উলটো দিকের সোফায়। দাঁতে জিভ কাটল ও। তারপর চিৎকার করে বলল, আরে গাদ্ধে, তুই নানাকে এখন ‘দুই বু কি’ বল, ‘দুই বু কি’ বল ।
সিরাজ উদ্দীন হেসে ফেললেন। রায়হানও কি চিনে ভাষা শিখছে নাকি? রায়হানের মুখ কালো হয়ে উঠেছে দেখে নরম হলেন সিরাজ উদ্দীন । নরম গলায় বললেন, আচ্ছা, সাক্ষাৎকার পরে নিও, এসো আগে গল্পটল্প করি । এই, তোমারও বসো, এসো। এই জোছনা, জোছনা। আমাদের উরুম আর চা দিয়ে যা। এখন বলত রায়হান তোমার দেশের বাড়ি কই?
বারাসাত দাদু। রায়হান মৃদুস্বরে বলল। ততক্ষণে মাইক্রোফোন অফ করে ফেলেছে সে।
বারাসাত ? মানে পশ্চিমবঙ্গে?
হ্যাঁ।
আরে! আমিও তো ওখানকারই লোক। ১৯৪৮ সালে দেশবিভাগের পর আমার বাবা ঢাকায় চলে আসেন। জান তো ভাষা শহীদ বরকতও ছিল পশ্চিম বঙ্গের মানুষ। বরকতও ওই ১৯৪৮ সালেই ঢাকায় এসেছিল।
তাই নাকি?
হ্যাঁ। আমি আর বরকত প্রায় সমবয়েসিই বলতে পার। একই সঙ্গে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পড়তাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওঁর জন্ম পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ভরতপুর থানার বাবলা গ্রামে।
গ্রামের নাম বাবলা?
হ্যাঁ। বাবলা। বরকতের ডাক নাম কি ছিল জান?
না।
বরকতের ডাকনাম ছিল আবাই।
আবাই?
হ্যাঁ, আবাই। ও ম্যাট্রিক পাশ করে ১৯৪৫ সালে তালিবপুর হাইস্কুল থেকে। আর আই এ ১৯৪৭ সালে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে। তো, আমার আবার ইতিহাসে আগ্রহ আছে। ওঁর সঙ্গে একবার আমি মুর্শিদাবাদ গেছিলাম ।
রুমকি খানিকটা অবাক হয়ে বলল, তুমি আবার কবে মুর্শিদাবাদ গেলে নানা? কই, আমাকে তো বলনি তুমি?
বলিনি। বলতে ভুলে গেছি। সেই নাইনটিন ফোরটি এইট-এর কথা। ঐ বছর ১৯ মার্চ পাকিস্তানের গভর্নর জেনালের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তান সফরে এলেন। তিনি ঢাকার দুটি সভায় বক্তৃতা দেন এবং দুই জায়গাতেই তিনি বাংলা ভাষার দাবিকে উপেক্ষা করে একমাত্র উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষনা দেন। এই সময়ে সারা পূর্ব পাকিস্তানেই ভাষা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। মুর্শিদাবাদ গেলাম ঐ বছরই, মানে নাইনটিন ফোরটি এইট-এর জুন মাসে। ১৬ জুন বরকতের জন্মদিন ছিল। ওই দিনেই পৌঁছলাম। যাঃ গরম পড়েছিল কী বলব। ঘুরে ঘুরে সব দেখলাম। যেন অবিকল ইস্ট পাকিস্তানেরই কোনও গ্রাম। অথচ দুটো ভিন্ন দেশ!
এরপর চা-টা খেয়ে ইন্টারভিউ ধারণ করে সন্ধ্যার আগে আগে রায়হান ওর দলবল নিয়ে চলে যায় ।
সিরাজ উদ্দীন মাগরিবের নামাজ পড়ে ড্রইংরুমে এসে বসলেন। রুমকি চা নিয়ে এল। রায়হানকে নানার কেমন লাগল কৌশলে তা বের করতে হবে। সিরাজ উদ্দীন চায়ের কাপ নিয়ে নাতনীকে বললেন, ওহো, ভালো কথা। তোকে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। আজ ফাহমিদা ফোন করেছিল।
কী বলল ছোট মামী? রুমকি সর্তক হয়ে যায়। রুমকির ছোট মামী ফাহমিদা রায়হানের ছোট ভাবী রেহনুমার কলিগ। দুজনেই চিটাগাঙে একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ায়। সিরাজ উদ্দীন বললেন, ফাহমিদা বলল, এক বছর হল চিটাগাঙে আছি, একবারও তো আমাদের দেখতে এলেন না।
রুমকি বলল, যাও ঘুর এস।
হ্যাঁ। আমি তো যাবই। তুইই আমার সঙ্গে চল।
সে কী! আমি না কাল ফ্রেন্ডদের সঙ্গে পাহাড়পুর যাচ্ছি। কেন তোমার মনে নেই?
ওহো। আমি তাহলে একাই যাই, কি বলিস? নইলে ফাহমিদা মন খারাপ করবে। এই সুযোগে একবার বিনোদদাকেও দেখে আসি। কতকাল হল বিনোদদাকে দেখি না। বিপ্লবী বিনোদবিহারী,বুঝলি, সূর্যসেনের সঙ্গী ছিলেন। সেই ১৯৩২ সাল, যখন চট্টগ্রাম জ্বলছিল।
রুমকি ফস করে জিগ্যেস করে বসল, নানা তুমি কি ‘খেলেইন হাম জি জান সে’ ছবিটা দেখেছ? সূর্য সেনের ওপর ছবি। সূর্যসেনের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন অভিষেক বচ্চন। ডাইরেক্টর আশুতোষ গোয়ারিকার। ছবিটা দেখে আমি ভীষণ বোর হয়েছিলাম। দীপিকা পাড়ুকন এত ফেইড ক্যারেকটারে অভিনয় করতে রাজি হলেন কেন ভেবে পাই না।
সিরাজ উদ্দীন কথা ঘুরিয়ে বললেন, অভিষেক বচ্চন-এর মা যে বাঙালি জানিস? জয়া ভাদুরী। জয়ার বাবা তরুণ কুমার ভাদুরী । বড় মাপের লেখক ছিলেন । তা তোরা তো আজকাল বাংলা বইয়ের ধার ধারিস না।
রুমকি বলে, সময় কই বলো? ক্লাসটাস, পড়াশোনা আর টিভি দেখে বই পড়ার সময় পাই না। সময় পেলে অবশ্য আনিসুল হক এর বই পড়ি। ভাবছি পারমিশন পেলে ওনার দু-একটা বই ইংরেজিতে অনুবাদ করব। বলতে বলতে কেমন লাজনম্র হয়ে ওঠে রুমকি। যেন আনিসুল হক এসে রুমকির ঠিক পিছনে দাঁড়িয়েছেন।
সিরাজ উদ্দীন লক্ষ করেছেন রুমকির ইংরেজিটা বেশ ঝরঝরে। তবে বাংলা লিখলেই বিপত্তি। গত মাসে আলী আশরাফ ‘প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস-জীবন’ সম্বন্ধে ‘ সোনালি বাংলার’ জন্য রুমকিকে একটা লেখা পাঠাতে বলল। বাংলায় রুমকি যা লিখল তা পড়ে সিরাজ উদ্দীন- এর চক্ষু চড়ক গাছ। ওদিকে আলী আশরাফও বাবার ওপর খেপে ফায়ার। বিলকিসের মেয়ে তোমার কাছে থাকে, ওর লেখায় অত গুরুচন্ডালী দোষ কেন? বিলকিসের মেয়ে লিখেছে, ‘আমরা অবসর টাইমে ক্যাম্পাসে বসে কফি পান করতে করতে রিল্যাক্স পালন করি’ । সিরাজ উদ্দীনও ছেলেকে ছাড়লেন না। কিছুটা রূঢ়স্বরেই বললেন, অত যখন বাংলা বাংলা করিস তখন বাংলাদেশে এসে থাকিস না কেন? দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের মতো বিদেশ পড়ে আছিস কেন? আশরাফ চুপ। মিনমিন করে একবার রেমিট্যান্স শব্দটা উচ্চারণ করল কেবল।
চট্টগ্রামে ওমর খালেদ- এর ফ্ল্যাটটা মেহদীবাগে। ব্যাঙ্ক কাছেই, কাজীরদেউরী। ফাহমিদার স্কুলটাও কাছেই, আশকার দিঘীর পাড়ে।
ফাহমিদা মেয়েটা ভালোই। শ্বশুরকে ভারি ভক্তিশ্রদ্ধা করে। রাজশাহীর মেয়ে; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে এম এ করেছে । ওমর খালেদ- এর প্রথম পোস্টিং পদ্মাপাড়ের ওই শহরেই ছিল। তখনই পরিচয়, প্রণয় এবং বিয়ে। সিরাজ উদ্দীন অমত করেননি। ফাহমিদার ছেলেমেয়ে দুটি । বড়টি ছেলে, নাম সামি, সামি ক্লাস ফাইভ পড়ে; আর ছোটটি মেয়ে,নাম সামিয়া, সামিয়া ক্লাস টু তে পড়ে। মজনুর মা নামে এক মধ্যবয়েসি ঝি সামি আর সামিয়া কে স্কুল থেকে নিয়ে আসে। স্কুল থেকে ফিরে সামি আর সামিয়া গোছল করে, খেয়ে নেয় তারপর টিভিতে হিন্দি ভাষায় ডাবিং করা কার্টুন দেখে। বুড়ো দাদার প্রতি ওরা তেমন কৌতূহল বোধ করে না। অথচ বৃদ্ধের ঝুলিতে ওদের বলবার জন্য অনেক গল্প ছিল। সে গল্প আর বলা হয় না। যে ভাষায় বৃদ্ধ গল্পটা বলবেন সে ভাষা ওদের আকর্ষন করে না। এ ফ্ল্যাটে আসার পরই তিনি ‘হিন্দি ভাষা শিখুন’ বইটি আবিস্কার করেন । সিরাজ উদ্দীন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কার লাগে এই বই? ফাহমিদার? প্রথম নাতী হওয়ার পর সিরাজ উদ্দীন এর ইচ্ছে ছিল নাতীর নাম রাখবেন বরকত । ফাহমিদা মুখের ওপরই বলে দিল- না,না, বাবা, বরকত নামটা ব্যাকডেটেড।
সিরাজ উদ্দীন সবচে কষ্ট পেলেন আড়াল থেকে সামি আর সামিয়ার হিন্দি কথপোকথন শুনে ...
এ বাড়ির রান্নাবান্না মজনুর মাই করে। সিরাজ উদ্দীন সে রান্না খেতে পারেন না, হলুদ বেশি দেয়, তবে সিরাজ উদ্দীন তাঁর বিতৃষ্ণা মুখে প্রকাশ করেন না । দু’দিনের জন্য এসেছি, অহেতুক কোন্দল বাড়িয়ে কী লাভ। তবে মজনুর মার প্রতি বৃদ্ধ কৌতূহল বোধ করেন। তার কারণ আছে। মজনুর মার চেহারা কিছুটা মঙ্গোলয়েড; বাড়ি টেকনাফ- এর উনছি প্রাং নামে একটা গ্রামে। ফাহমিদা বলল, মজনুর মার স্বামী হাতির আক্রমনে মারা গেছে । ওদের গ্রামের পিছনে পাহাড় তারপর সমুদ্র। মাঝেমাঝে পাহাড় থেকে গ্রামে হাতির পাল নেমে আসে। যেন অন্য এক বাংলাদেশের কথা শুনছেন সিরাজ উদ্দীন। পার্বত্যচট্টগ্রামে যে হাতি আছে তা তিনি জানেন। তবে হাতির আক্রমনে মরে যাওয়া কারও ঘনিষ্ট আত্মীয়াকে এই প্রথম দেখলেন। সে যাই হোক। সিরাজ উদ্দীন যেমন জোছনার মাতৃভাষা (চাঁদপুরের আঞ্চলিক ভাষা) বোঝেন না, তেমনি মজনুর মার মাতৃভাষাও (টেকনাফের আঞ্চলিক ভাষা) তিনি বুঝতে পারেন না । অথচ মজনুর মা বাংলাদেশি। তাহলে কি দাঁড়ালো? ফাহমিদা রাজশাহীর মেয়ে। ফাহমিদাও টেকনাফের ভাষা বোঝে না। আকারে ইঙ্গিতে কাজ চালিয়ে নেয়। বাংলাদেশে এখন গ্রামীণ উন্নয়নের জোয়ার চলছে। আজকাল কাজের লোক পাওয়াই মুশকিল। ...মজনুর মার ওপর সংসার ছেড়ে দিয়ে ফাহমিদাও একরকম নিশ্চিন্ত। স্কুল থেকে ফিরে রাত এগারোটা-বারোটা অবধি টিভিতে ইন্ডিয়ান চ্যানেল দেখে ফাহমিদা । (এই স্বভাব রুমকিরও আছে) টিভি ড্রইংরুমে। ছেলেবেলা থেকেই ক্রিকেটের প্রতি ওমর খালেদের খুব ঝোঁক। বেচারা টিভিতে খেলা দেখতে পারে না, বেডরুমে পড়ে থাকে মুঠোফোন কী সব করে । ফাহমিদা বিরক্ত হবে বলে সিরাজ উদ্দীন ড্রইংরুমে না- বসে বেডরুমে কিংবা বারান্দায় বসে থাকেন।
আজ দিনটা ছুটির। সিরাজ উদ্দীন আজ সকাল দশটার দিকে বিপ্লবী বিনোদবিহারীর বাড়ি যাবেন। মুঠোফোনে সেরকমই কথা হয়েছে। সকালে ড্রইংরুমে বসে খবরের কাগজ পড়লেন সিরাজ উদ্দীন । দেশের প্রথমসারির একটি দৈনিকে ‘সাংঘর্ষিক’ শব্দটার ওপর চোখ আটকে গেল। এই ‘সাংঘর্ষিক’ শব্দটাই ভুল। শিক্ষিত সম্পাদক শব্দটি মেনে নিলেন কেমন করে? বুঝতে পারেন না বৃদ্ধ।
বাবা আসুন, চা খাবেন। ফাহমিদা বলল ।
সিরাজ উদ্দীন ডাইনিং টেবিলে এসে বসলেন। বললেন, ওরা এখনও ওঠেনি?
ফাহমিদা বসতে বসতে বলল, না, বাবা। আরেকটু ঘুমাক । আজ তো ছুটি।
সিরাজ উদ্দীন বললেন, বউমা, সামি আর সামিয়া যে হিন্দিতে কথা বলে ।
ফাহমিদা মিষ্টি করে হাসল। হাসলে শ্যামলা গালে টোল পড়ে। শূন্য কাপে লিকার ঢালতে ঢালতে বলল, টিভিতে হিন্দি কার্টুন দেখে তো। আর এখন তো সময়টা হিন্দি আর চাইনিজ ভাষার । আমেরিকানরা পর্যন্ত আজকাল হিন্দি আর চাইনিজ শিখছে। আর না- শিখেই-বা উপায় কী বলুন । চাকরি জোটাতে হবে তো। বিশ্বের বিখ্যাত সব কোম্পানী চাইনিজরা কিনে ফেলছে। ভবিষ্যতের কথা ভেবেই পাকিস্তানে ক্লাস সিক্স থেকে চাইনিজ ভাষা শেখা কম্পলসারি করেছে।
তাহলে বাংলার কি হবে? সিরাজ উদ্দীন-এর কন্ঠস্বর ম্লান আর নিষ্প্রাণ শোনালো।
আচ্ছা বাবা, বাংলা শিখে কী লাভ বলুন তো। বাংলা শিখে কি কারও ভাত জুটবে? ওই চাকরির লোভেই ব্রিটিশ আমল থেকে এ দেশে ইংরেজি শেখার ধুম। ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্টের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ আছে তা সাহিত্য চর্চার জন্য না বাবা, চাকরির সুবিধার জন্য । আমি ইংরেজি না জানলে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াতে পারতাম? মাস গেলে আপনার ছেলের সংসারে কুড়ি হাজার টাকা ঢালতে পারতাম বলুন? দিন দিন জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বেড়ে চলেছে, তাতে -
বৃদ্ধর শরীর কাঁপছিল। এই শীতের সকালেও তাঁর শরীরে ঘামছিল। চাদরের নীচে গেঞ্জি, পাঞ্জাবি ভিজে যাচ্ছিল। চোখে সব ঝাপসা ঠেকছে। ফাহমিদা যেন কুয়াশায় ঢেকে আছে। আর ভীষন তৃষ্ণাও পেয়েছে। হাতের কাছেই গ্লাস। অথচ ডান হাত ভীষণ ভারী ঠেকছে।
ফাহমিদা বলল, ওহহো বাবা। কাল না আমার এক কলিগ আপনার কথা বলছিল। রেহনুমা। আপনি আমাদের বাসায় আছেন শুনে সে কী খুশি । আজ বিকেলে আপনাকে সালাম করতে আসবে ।
বেশ তো, আসুক না। অস্ফুট স্বরে বললেন বৃদ্ধ।
কাল বেশ মজার একটা কথা বলল রেহনুমা। ওর এক দেওর, রায়হান নাম, চ্যানেল সিক্সটিন এর রিপোর্টার। আপনার বাসায় রায়হান গিয়েছিল না? ওই যে আপনার ইন্টারভিউ নিল? রেহনুমাকে ফোন করে রায়হান বলেছে, ভাবি, আমি যখন ভুল করে সিরাজ উদ্দীন সাহেব কে ভাষা সৈনিক না বলে ভাষা শহীদ বলেছিলাম তখন সিরাজ উদ্দীন সাহেব লাফিয়ে উঠে বলেছিলেন, ‘না, না। আমি ভাষা শহীদ নই, আমি ভাষা শহীদ নই, আমি ভাষা সৈনিক। আমি এখনও বেঁচে আছি।’ বলে হি হি করে হেসে উঠল ফাহমিদা।
আশি ছুঁই ছুঁই সুস্থ সবল বৃদ্ধর আজ কী যে হল। তিনি বাঁ দিকে ঢলে পড়লেন ...
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29531856 http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29531856 2012-01-30 09:25:35
গল্প: শহরে ও মফঃস্বলে সকাল আটটার মতো বাজে। গায়ে চাদর জড়িয়ে দাওয়ার ওপর কাঠের বেঞ্চিতে বসে আছেন সাঈদ আলী। পায়ের কাছে মাঘ মাসের রোদ পড়ে আছে । এই মফঃস্বল শহরে শীত এখনও অনেকটাই তীব্র । সকাল সন্ধ্যায় ঘন কুয়াশায় ডুবে থাকে। আর চারধার তখন কী রকম নির্জন হয়ে থাকে।
সেতারা চা নিয়ে এলেন। চায়ের কাপ স্বামীর দিকে এগিয়ে দিতে দিতে ক্ষোভের সুরে বললেন, সোহরাব ভাই এইটা কি করলেন, কন তো ?
সাঈদ আলী চায়ের কাপ নিতে নিতে বললেন, ক্যান, কি হইছে?
শুনলাম, সোহরাব ভাই নাকি নবীগঞ্জের লোকমান হাজীর বড় ছেলে আমানুল্লার সঙ্গে তার ছোট মেয়ের বিয়া ঠিক করছেন। আমাগো একবার খবরও দিলেন না।
সাঈদ আলী দীর্ঘশ্বাস ফেলেন । তাঁর বুকটা সামান্য মুচড়ে ওঠে । তিনি অন্যমনস্কভাবে চায়ে চুমুক দেন। সোহরাব, মানে লতিফপুরের ‘গাজীবাড়ির’ বড় ছেলে সোহরাব গাজী সাঈদ আলীর বাল্যবন্ধু। খানদান পরিবার হিসেবে লতিফপুরে গাজীবাড়ির বেশ নাম ডাক আছে । সোহরাব গাজীর দাদা আরাফাত গাজীর নামে দৌলতপুর শহরে একটি স্কুল আছে। গাজীদের অর্থনৈতিক অবস্থাও বেশ ভালো। সোহরাব গাজীর বাবা আজমত গাজীর বাড়ুইপাড়ায় ‘স’ মিল, লতিফপুর স্টেশনের কাছে মুদি দোকান, তালতলার মোড়ে একটা মিষ্টির দোকান ছিল। সোহরাব গাজী আর সাঈদ আলী ছেলেবেলায় এই মফঃস্বল শহরটা দাপিয়ে বেড়িয়েছে। সোহরাব গাজী ছোটবেলা থেকেই সাহসী, বুদ্ধিমান, এবং রসিক; অন্যদিকে সাঈদ আলী মুখচোরা, কিছুটা ভীতু স্বভাবের আর গম্ভীর। দুজনেই মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। দুজনের বয়েস তখনও ষোল অতিক্রম করেনি। এত বছর পরও দুজনের সম্পর্ক ভালো। সাঈদ আলী চায়ে চুমুক দেন। তাঁর মুখেচোখে গভীর চিন্তার ছাপ ফুটে আছে। সত্যিই কি নবীগঞ্জের লোকমান হাজীর ছেলের সঙ্গে সোহরাব গাজী তার ছোট মেয়ের বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে? তাহলে সোহরাব গাজী আমাকে সে কথা জানাল না কেন?
স্বামীর মুখ গম্ভীর হয়ে উঠেছে দেখে সেতারা আর কিছু বললেন না। তিনি ঘুরে দাঁড়িয়ে রান্নাঘরের দিকে যেতে থাকেন। কাজের মেয়েটার জ্বর। রান্নাবান্না যা করার আজ তাকেই করতে হবে। সারা বাড়ি খাঁখাঁ করছে। ছোট ছেলে সজল ঢাকায় থাকে, পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে । বড় মেয়ে পারভীনের ঘরসংসারও ওই শহরেই । মেয়ের কথা মনে হলেই বুকটা কেমন খাঁ খাঁ করে। সোহরাব ভাইয়ের ছোট মেয়ের নাম স্নিগ্ধা।
বাড়ুইপাড়ার ময়নার মার কাছে স্নিগ্ধার বিয়ের কথা শোনার পর থেকেই বুকটায় জ্বালাপোড়া শুরু হয়েছে। স্নিগ্ধার সঙ্গেই মনে মনে সজলের বিয়ের স্বপ্ন দেখছিলেন সেতারা। স্নিগ্ধা দারুণ রূপবতী-এ এক কারণ। মেয়েটি লতিফপুরে বেড়ে উঠলেও এসএসসি-র পর ঢাকায় ওর এক ফুপুর বাড়ি থেকে পড়াশোনা করছে স্নিগ্ধা। সেতারা ঠিকই জানেন, সজল চাপা স্বভাবের হলেও মনে মনে স্নিগ্ধাকে পছন্দ করে।
চা খেতে খেতে সাঈদ আলী বড় অস্থির বোধ করেন। মেয়ের বিয়ের কথা বলল না সোহরাব গাজী। অথচ দুজনের মধ্যে এতদিনের সম্পর্ক! মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং চলাকালীন সময়ে আগরতলায় মস্কোপন্থী ন্যাপ (ওয়ালি) -এর জালাল ভাই দুজনকেই মার্কসবাদী আদর্শে দীক্ষা দিয়েছিলেন। তবে মাকর্সবাদী থিওরি সোহরাব গাজী কে তেমন না- টানলেও সাঈদ আলী ছিলেন সিরিয়াস। ওদিকে সোহরাব গাজীর বাবা আজমত গাজী ছিলেন রাজাকার। স্বাধীনতার পর অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আরাফাত গাজী স্কুলের সামনে মুক্তিযোদ্ধারা বৃদ্ধকে গুলি করে হত্যা করে। মুক্তিযুদ্ধে সোহরাব গাজীর প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল বলে ঘটনা বেশি দূর গড়ায়নি। স্বাধীনতার পর সোহরাব গাজী পৈত্রিক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। আর ওই সোহরাব গাজীরই সহায়তায় তাদের পারিবারিক আরাফাত গাজী স্কুলে জয়েন করেন সাঈদ আলী । শিক্ষকতার পাশাপাশি কমিউনিষ্ট পার্টির কাজও এগিয়ে নিয়ে যান। পচাত্তর সালে মাত্র কুড়ি বছর বয়েসে সোহরাব গাজী পরিবহণ ব্যবসা শুরু করে। দশটা বাস আর পঁচিশটা ট্রাকই এখন সোহরাব গাজীর কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার উৎস। অবশ্য এতেও দুজনের সর্ম্পকে কখনোই চির ধরেনি। দু-জনার বন্ধুত্ব বরাবরই অটুটই ছিল। যদিও আদর্শগত কারণেই তাঁরা একে অন্যের প্রতিপক্ষ। সোহরাব গাজী গত চল্লিশ বছরে বৈধভাবে কিংবা ঘুরপথে ধনসম্পদ বাড়িয়েই চলেছেন। অন্যদিকে সাঈদ আলী ধনবন্টনের পক্ষপাতী। সোহরাব গাজী খাইরুন্নেসা প্রাইমারি স্কুলের পিছনের জমি ভাড়াটে লোকজন দিয়ে দখল করে পানাপুকুর ভরাট করে গাছপালা কেটে ফেলে বহুতল মার্কেটের সাইনবোর্ড পুঁতে রাখেন কিংবা আরাফাত গাজী স্কুলের হেডস্যার কর্তৃক ষষ্ট শ্রেণির ছাত্রী যৌন নির্যাতনের শিকার হলে ধর্ষনকারীকে সোহরাব গাজী প্রত্যক্ষভাবে মদদ দেন-এসব অন্যায়ের প্রতিবাদে সাঈদ আলী কে তালতলার মোড়ে মানববন্ধনে দাঁড়াতেই হয়। সোহরাব গাজীর কালো রঙের একটা পুরনো ধ্যাদ্ধেড়া ভক্সওয়াগেন আছে। মানববন্ধনের যে জায়গায় সাঈদ আলী দাঁড়িয়ে থাকেন - ঠিক তার সামনেই সেই ভক্সওয়াগেন এসে থামে। জানালায় কালো সানগ্লাস পরা সোহরাব গাজীর ফরসা ভরাট গোলপানা মুখ, মেহদি রাঙানো তামা রঙের চুল। বুর্জোয়া বন্ধুকে দেখে সাঈদ আলী শিঁটিয়ে ওঠেন। রসিক সোহরাব গাজী তখন সাঈদ আলীর নাম্বারে বারবার মিস কল দিতে থাকেন । সাঈদ আলীর পাঞ্জাবির পকেটে ভাইব্রেশন মোডে থাকা মুঠোফোন বিজবিজ করে বাজে। সাঈদ আলী ফোন ধরেন কি করে ...
এসব বেহাল দশার কথা সেতারা কি সজলকে বলতে পারেন না সাঈদ আলী। বলেন সাদিক আমিন কে। সাদিক আমিন হল সজলের বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু; ছেলেটা মাঝেমাঝে লতিফপুর আসে। ছেলেটার মাথায় সারাক্ষণ ফিলমের পোকা ঘোরে। চোখে ফিলম বানানোর স্বপ্ন। কালো মতন চেহারা। মাথায় লম্বা চুল, তাতে ঝুঁটি। চোখে গোল ফ্রেমের চশমা। কানের লতিতে দুল। চোয়াল ভাঙা। মুখে চাপদাড়ি। সব সময় পাঞ্জাবি-পায়জামা পরে। মিষ্টি করে বাংলা বলে। যদিও গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার বড়ুরা। সেই সাদিক আমিনই একমাত্র সোহরাব গাজীর রঙ্গরসিকতার ব্যাপারটা জানে। সাদিক আমিন বলে, আমার ফিলমে এই পার্টটা রাখব চাচা। আচ্ছা, রাইখো। সাঈদ আলী বলেন। ছেলেটাকে পছন্দ করেন সাঈদ আলী। জ্ঞানবুদ্ধি ভালোই। মার্কস- লেনিন এর প্রতি ভক্তিশ্রদ্ধা আছে। সাদিক আমিন বলে, ওরাই তো জগতের আসল গুরু চাচা। জগৎ পালটে দিতে এসেছিল। শুনে সাঈদ আলী ভীষণই উত্তেজিত হয়ে পড়েন।
তো এত কিছুর পরও সোহরাব গাজীর সঙ্গে সাঈদ আলীর সম্পর্ক আজও অটুট আছে। আজ থেকে পাঁচ-বছর আগে সাঈদ আলীর বড় মেয়ে পারভীন যখন জাহাঙ্গীর নামে লতিফপুরের এক তরুণ ব্যবসায়ীর সঙ্গে পালিয়ে গেল তখন সাঈদ আলী বুকের ব্যথায় মেঝের ওপর ঢলে পড়েছিলেন ; সোহরাব গাজীই তখন খবর পেয়ে ছুটে এসেছিলেন। সব খরচ বহন করে ইন্ডিয়ায় নিয়ে গিয়ে বাইপাস অপারেশন করিয়ে এনেছিলেন। আজ হোক কাল হোক বন্ধুর টাকা তিনি শোধ করবেন। সজল কি ভালো চাকরি পাবে না? খটকা এখানেই। সজল কি চাকরি করবে? না, শ্রমিকের ছদ্মবেশে কারখানায় ঢুকে শ্রমিক আন্দোলন করবে?
সেতারা খালি কাপ নিতে দাওয়ায় এলেন । বললেন, পারভীন কইল জামাইয়ের ব্যবসাপাতি ভালো না, মেয়ে নিয়া লতিফপুরে কিছু দিন থাকতে চায়।
সাঈদ আলীর মুখ গম্ভীর হয়ে ওঠে। পারভীন কে না-হলেও পারভীনের মেয়ে ঐশীকে দেখার জন্য মন ভীষণ ছটফট করে । মুঠোফোনে মাঝেমাঝে ঐশীর সঙ্গে কথা হয়। কথা বলার সময় ঐশী হিন্দি শব্দ বলে। তখন কষ্ট হয় সাঈদ আলীর । ঐশীরা কি বাংলার বদলে হিন্দি শিখছে নাকি?
সাঈদ আলী বললেন, সজল রে ফোন কইরা কও, পারভীনরে নিয়া আসবে।
আচ্ছা, বলব। সেতারার বুকের ভিতরে কান্নার বলক ওঠে। তার কত সখ ছিল মেয়ে জামাইকে আদরযত্ন করবেন, রান্না করে খাওয়াবেন।
আর শুন, পারভীনের জামাই যেন আমার বাড়িতে না আসে।
কথাটা শুনে সেতারার চোখে পানি চলে আসে। স্বামীর বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহস নেই সেতারা বানুর। হায় আল্লা, আমার কপালে তুমি সুখ দিলা না!
সেতারা চলে গেলে সাঈদ আলী বুকে হাত দেন। মেয়ে জামাইয়ের কথা মনে পড়লে পাঁচ বছর আগের সেই পুরনো ব্যথা টের পান। সোহরাব গাজীর কাছে আমারে ছোট করল পারভীন । চিকিৎসা খরচ বাবদ সাত লক্ষ টাকা পায় সোহরাব গাজী। কথাটা মনে হলেই সাঈদ আলীর মাটির সঙ্গে মিশে যেতে ইচ্ছে করে। মেয়েকে কখনও বাড়িতে ঢুকতে দেবেন না বলে পণ করেছিলেন। মৃত্যুর আগে ঐশীর মুখটা একবার দেখবেন বলেই রাজি হলেন। নাতনীকে নিয়ে মেয়ে আাসতে পারে, কিন্তু মেয়েজামাই কখনও নয়!

ঐশী গত বছর স্কুলে ভর্তি হয়েছে। তবে স্কুলের বই ও পড়তে চায় না, এমন কী ছবির বইটইও না। সারাক্ষণ টিভিতে কার্টুন দেখে। ‘ডোরেমন’ ওর খুব প্রিয়। সেদিন নাজমাকে হিন্দি ভাষায় পানি আনতে বলল ঐশী। অতটুকু মেয়ের কারিশমায় পারভীন রীতিমতো তব্দ খেয়েছিল । পারভীনকেই ঐশী কে খাইতে দিতে হয়। মেয়েটা নাজমার হাতে খায় না। পারভীন একা কত দিকে সামলাবে । ওদিকে ঐশীর বাবা ‘কাজের মেয়ের হাতে’ খেতে পারে না। রান্নাবান্না পারভীনকেই করতে হয়। এমনিতেই শেয়ার মার্কেটে টাকা-পয়সা লস করে জাহাঙ্গীরের মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকে । তরকারিতে নুন কম হলে চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় তোলে । জাহাঙ্গীর দু-বছর আগে গার্মেন্টস-এ একসেসরিস সাপ্লাইয়ের কাজ করত । লাভ যা হোক একটা হত তখন । এক বন্ধুর (কু) পরামর্শে সব জমানো টাকা শেয়ার মার্কেটে খাটাল। আর তাতেই - ...কলেজে পড়ার সময়ই জাহাঙ্গীর-এর প্রেমে পড়েছিল পারভীন। জাহাঙ্গীর পড়াশোনা বেশি করেনি । ব্যবসায় নেমে পড়েছিল। মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবেন, সাঈদ আলীর তাই সে ‍"অসম" বিয়েতে রাজি হওয়ার কথা নয়। প্রেমের ঘোরে এক সন্ধ্যায় লতিফপুর স্টেশনে বোরখা পরে জাহাঙ্গীরের সঙ্গে ঢাকাগামী ট্রেনে উঠল পারভীন । জাহাঙ্গীর নতুন বৌকে যাত্রাবাড়িতে দুরুমের একটা ভাড়া বাড়িতে এনে তুলেছিল। কী সুখের দিনই না ছিল তখন । সজল তখন সদ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। দুই ভাইবোনের মধ্যে খুব ভাব । বাবার চোখ এড়িয়ে বড় বোনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত সজল। আর কী কারণে জাহাঙ্গীরকেও পছন্দ করত । লেখাপড়া বেশিদূর না করলে কী হবে-বেশ সহজ সরল আছে জাহাঙ্গীর। সজলের মাধ্যমে স্বামীকে লুকিয়ে টাকা পাঠাতেন সেতারা, কখনও শাড়ি-কাপড় , কখনও আচার। সজল ওর ফিলিম-পাগল বন্ধু সাদিক আমিন কেও মাঝেমধ্যে পারভীনের বাসায় নিয়ে যেত । পাগলাটে সাদিক আমিন- এর সঙ্গে কথা বলে ভারি মাজা পায় পারভীন। সাদিক আমিনও বেশ মিশুক আছে। পারভীনকে ‘আপু’ ‘আপু’ করে। অনায়াসে রান্নাঘরে চলে আসে। একদিন তো সে পারভীনকে বলেই বসল, ‘তোমার মুখটা না আপু ভীষণ ফটোজেনিক।’ শুনে পারভীন লজ্জ্বায় লাল। ভাগ্যিস সজল তখন টিভি অফ করে ড্রইংরুমে ঐশীকে বসিয়ে বাংলা ছড়া মুখস্ত করাচ্ছিল। ... ভোর হল দোর খোল খুকি মনি ওঠ রে /ওই জাগে জুঁইশাখে ফুলকলি ছোট রে । পারভীন বুকের আঁচল ঠিক করেছিল। সারা শরীর ঝনঝন করে বাজছিল । জাহাঙ্গীর-এর সঙ্গে আজকাল সেক্সটা ঠিক উপভোগ করে না পারভীন। শেয়ার বাজারে সর্বশ্রান্ত মানুষটা আগের মত দীর্ঘক্ষণ ধরে সুখ দিতে পারে না, জাহাঙ্গীর-এর স্খলন দ্রুত হয়ে যায়। পারভীন বলে, 'ডাক্তার দেখাও। সারাদিন এত কষ্ট করি ওইটুকু সুখের জন্যই তো।' ... জাহাঙ্গীর কি জানে যে পৃথিবীর কোনও ডাক্তারই এ অসুখ সারাতে পারবে না? সে পারভীনকে আঁকড়ে ধরে কাঁদে। বারবার বলে, কথা দাও আমারে ফেলায়া তুমি কখখোনো যাইবা না। পারভীন বলে, ‘আরে তুমি কি পাগল হইলা। তুমার হাত ধইরা আমি পালাইসি বইলা আমি কি বেইশ্যা নাকি।’ জাহাঙ্গীর তারপরেও কাঁদে, বাচ্চা শিশুর মত কাঁদে। সেদিন সন্ধ্যায় মতিঝিল থেকে ফিরল জাহাঙ্গীর । শরীরের এখানে ওখানে ক্ষত, পুলিশ পিটিয়ে মারাত্মকভাবে জখম করেছে। সেদিনও হুহু করে কেঁদেছিল জাহাঙ্গীর । তারপর অসার্থক মিলন। জাহাঙ্গীরের শরীরে আর বন্য ঘোড়ার মতো শক্তি নেই, সেই শক্তি ছিল যখন বিয়ের আগে লতিফপুরের কোনও নির্জন স্থানে তারা দুজনে মিলিত হত । যেসব দিনে জাহাঙ্গীর গভীর আবেগে স্বীকার করত ... তোমারে আদর করতেই আমার জন্ম পারভীন। এখন সেই আবেগের নদীতে চর পড়ে গেছে। এদিকে পারভীনের দিনদিন যৌনতৃষ্ণা বাড়ছেই। পারভীন আজকাল সাদিক আমিন কে খুব মন দিয়ে দেখে। সাদিক আমিন- এর এক ফুপাতো বোন পলি রামপুরায় থাকে, খুব নিরীহভাবে ঐশীকে নিয়ে পলিদের বাড়িতে যেতে চায় পারভীন ...

আজ সন্ধ্যার পর সজল এসেছিল। টিভি অফ করে ঐশীকে পড়াল কিছুক্ষণ । ঐ দেখা যায় তালগাছ ঐ আমাদের গাঁ/ ঐখানেতে বাস করে কানাবগীর ছা । তারপর ভোর হল দোর খোল ... সজল নাজমাকেও পড়ায়। নাজমা যে নাম সই করতে পারে সে সজলের জন্যই। গেল মাসে নাজমা তার মাকে চিঠি লিখে পাঠিয়েছে। পারভীন জানে ... এই মুঠোফোনের যুগেও সজল আজও তার বাবা কে চিঠি লেখে। নাজমা দিন দিন ডাগর হয়ে উঠছে। অথচ নিজের ওপর সজলের আশ্চর্য নিয়ন্ত্রণ দেখে অবাক পারভীন। অথচ, নাজমার নগ্নদেহ কল্পনা করে জাহাঙ্গীর-এর চাপা উত্তেজনা ঠিকই টের পায় পারভীন। জীবিকার তাগিদে গ্রাম থেকে বড় শহরে আসা এই গরীব কিশোরীকে যথাসাধ্য আগলে রাখে। এতকাল নামাজ-কালামের ধার না ধরলেও আজকাল অবশ্য নামাজ পড়ছে জাহাঙ্গীর। ...
সজল রাত দশটা অবধি ছিল। তখনও জাহাঙ্গীর ফেরেনি। সজল এলে সাধারণত খেয়েই যায়। আজ খাওয়ার পর পারভীন সজলকে বেডরুমে ডেকে নিয়ে গেল। তারপর সব খুলে বলল। আর কত কাল একাএকা সহ্য করা যায়? তোর দুলাভাই শেয়ার মার্কেটে লাখ লাখ টাকা লস করছে । ছয় মাসের বাড়ি ভাড়া বাকি, নাজমার তিন মাসের বেতন বাকি। সামনের মাস থেকে ঐশীর স্কুল বন্ধ। মায়ের দেওয়া গয়না বিক্রি করে কোনওমতে চলছে সব।
জাহাঙ্গীর তাবলীগ জামাতএর নাম লিখিয়েছে।
কি! জাহাঙ্গীর ভাই তবলীগ জামাত করে? সজল ভীষণ চমকে ওঠে।
হ্যাঁ।
সজল এর শ্যামল মুখটা কী রকম আরক্ত হয়ে উঠেছিল তখন, যেন মায়ের মৃত্যু সংবাদ শুনেছে। আপনমনে বলল, যারা সহজেই বেহেস্ত- দোযখে বিশ্বাস করে, তারা সহজেই শেয়ারমার্কেটে ইনভেস্ট করে। দেশে এত স্টুপিড লোক! এদের দিয়ে কী হবে ...ছিঃ

সীমান্তে ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দুপুরে টিএসসি-র সামনে মানববন্ধন। বিশিষ্ট গায়ক মাহমুদুজ্জামান বাবুর পাশে দাঁড়িয়ে আছে সাদিক আমিন। মাঝেমাঝে হতাশ লাগে সাদিক আমিন এর। কী হয় মানববন্ধন করে। গুলি কি থামবে। মানববন্ধনে সজল নেই। ঘন্টাখানেক আগে পারভীন আপাদের নিয়ে লতিফপুর গেছে। হঠাৎ রাস্তার দিকে তাকিয়ে সাদিক আমিন চমকে ওঠে। ক্রিম কালারের একটা টয়োটা প্রিয়াস শাহবাগের দিকে চলে যাচ্ছে, সামনে ড্রাইভিং সিটের পাশে স্নিগ্ধা বসে । স্নিগ্ধার ফরসা মুখে কালো সান গ্লাস। গাড়ির ড্রাইভিং সিটে যে সুদর্শন তরুণটি বসে ছিল তাকেও চেনে সাদিক আমিন। নাঈম আদনান । জাস্টওয়ে গ্রুপের চেয়ারম্যান শামসের হুদার ছোট ছেলে । নাঈম আদনান মিডিয়াতেও ইনভেস্ট করেছে। স্নিগ্ধা টল, ফরসা, সুন্দরী। শখের বশে আজকাল মডেলিংয়ের প্রতি ঝুঁকেছে। সেইসূত্রেই নাঈম আদনান-এর সঙ্গে পরিচয় স্নিগ্ধার। সাদিক আমিন মিডিয়ায় ঘোরাফেরা করে বলেই সে জগতের ভিতরের কথা সে জানে। স্নিগ্ধার আকর্ষণ সামান্য ভিন্ন বলেই স্নিগ্ধার সঙ্গে ঘনিষ্ট হয়ে উঠছে নাঈম আদনান । মডেলিং ছাড়াও স্নিগ্ধা নাটকে অভিনয় করতে চায়। নাঈম আদনানও রাজি। সজলের কাছে এসব কথা সাদিক আমিন চেপে রেখেছে । স্নিগ্ধা যে নাঈম আদনান এর গ্রিপে চলে গেছে সেটি সজল এখনও জানে না। সজল কষ্ট পাবে বলেই সাদিক আমিন বলেনি। এখন বলার সময় এসেছে। সাদিক আমিন জানে সজল স্নিগ্ধাকে ভালোবাসে। কিন্তু, স্নিগ্ধা? জটিলতা আরও আছে। সজল ওর আর্দশবাদী বাবার আদর্শ সন্তান । স্নিগ্ধার মডেলিং করবে, এটা জানার পর ব্যাপারটা সজল কি ভাবে? মডেলিং যেমন পণ্য সর্বস্ব নয়া ঔপনেবিশিক আগ্রাসনের অংশ, তেমনি আবার নারীস্বাধীনতার প্রশ্নটিও এর সঙ্গে জড়িত । এই বিষয়টি এই সময়ের ফিলমে কীভাবে আসা উচিত? সাদিক আমিন ঈষৎ উত্তেজিত। আর যে সব মানুষ নেপথ্যে থেকে পণ্যকে সমাজে ছড়িয়ে স্থানীয় বাজার ধ্বংস করে দেয়,তাদেরকেই- বা ফিলমে কীভাবে দেখানো যায় । কাজেই স্থান কাল পাত্র বিস্মৃত হয়ে সাদিক আমিন স্নিগ্ধা এবং নাঈম আদনান এর নিভৃত দুপুরটি কল্পনায় জীবন্ত করে তুলতে থাকে : ...গাজীপুরে লন ঘেরা বাংলো আদনান-এর লাল টালির বাড়ি । বাংলো। নাম: ‘নায়রি লজ’। এই বাংলোয় নাঈম আদনান এসে মাঝে মাঝে রিল্যাক্স করে । তখন কেউ না কেউ থাকে। কখনও অল্প বয়েসি মডেল কখনও মধ্যবয়েসি নাট্যাভিনেত্রী। আজ স্নিগ্ধা। বাংলোয় একজন বুড়ো কেয়ারটেকার আছে। সে চোখে কম দেখে। লনে নানারকম ফুলের গাছ । বাগানে দোপাটি, ডালিয়া আর চন্দ্রমল্লিকা আছে। বাংলোয় সুগন্ধী ঘরে আছে নরম বিছানা। সে বিছানায় শুয়ে থেকে এই মুহূর্তে নাঈম আদনান বড় বিপর্যস্ত বোধ করছে। তার আজ প্রিম্যাচুওর ইজাকুলেশন হয়ে গেছে। নগ্ন অতৃপ্ত স্নিগ্ধা জিগ্যেস করে, হোয়াট'স রং!
নাঈম আদনান বলে, সরি। সে স্নিগ্ধাকে সত্যি কথা বলতে পারে না । বলতে পারে না আমাদের গ্রুপ অভ ইন্ড্রাষ্ট্রির অনেক ব্যাঙ্ক লোন স্নিগ্ধা। আবাসন শিল্পে যেভাবে ধস নেমেছে। রড-সিমেন্টের দাম দিনদিন বাড়ছে। আগের দামে ক্রেতাদের ফ্ল্যাট দিতে পারছি না। ক্রেতারা মামলা করছে। এর ওপর শেয়ার মার্কেটে কোটি টাকা ইনভেস্ট করে লস করেছি। আমার বাবার মাইল্ড স্ট্রোক হয়ে গেছে গত নভেম্বরে। এ শহরে আমাদের চেয়ে আরও কঠিন হৃদয়ের ঈশ্বরে অবিশ্বাসী বুদ্ধিমান মানুষ বাস করে স্নিগ্ধা। আমরা তাদের কাছে হেরে গেছি।
স্নিগ্ধা বলে, এনি ওয়ে, তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে নাঈম?
ইউ নো, দ্যাটস ইমপসিবল।
বাট, হোয়াই?
বাবা ইকরা গ্রুপের চেয়ারমেন হাজী আলমের ছোট মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিক করে রেখেছে । শুনেছি তাসনুভা খুব রিলিজিয়াস।
স্নিগ্ধা চিৎকার করে ওঠে। আই নো! আই নো! আই নো! উফঃ হাউ আই হেইট অল দিস!
নাঈম আদনান একটা সিগারেট ধরায়। মালবোরো । স্নিগ্ধা কন্ঠস্বর নীচু করে বলে, আমাকে তুমি কোথাও লুকিয়ে রাখতে পারবে নাঈম? মেয়েটির কন্ঠস্বর কেমন করুণ শোনাল।
লুকিয়ে রাখব মানে?
আমার বাবা আমার বিয়ে ঠিক করেছে ফেলেছে। পাত্র নবীগঞ্জের লোকমান হাজীর বড় ছেলে আমানুল্লা আমান না কে যেন। আমি এখন বিয়েটিয়ে করব না । আমি নাটক আর মডেলিং নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই। ’কজ আই ওয়ান্ট ফ্রিডম, এনাফ ফ্রিডম! তুমি আমায় কোথাও লুকিয়ে রাখবে নাঈম?
ওকে।
আমার কিন্তু বাবার পাওয়ারফুল লোক। পুলিশের পিছনে টাকা ঢালবে।
নো প্রোব। পুলিশের মুখ আমিও বন্ধ করতে জানি। তুমি কালই গুলশান থানায় তোমার বাবার বিরুদ্ধে একটা জিডি করে রেখ।
ওকে। আমি তাহলে এ মাসেই গুলশানে আলাদা ফ্ল্যাটে উঠব। তোমার বিয়ের আমাকে তোমার লাভ-টাভ করতে হবে না। জাস্ট তুমি মাঝে মাঝে এস। কফি খাওয়াব।
ওকে।
তোমার হবু বউয়ের নাম তাসনুভা, না? খুব রিলিজিয়াস বললে। তার মানে হিজাব পড়ে। ভালো। এরা একটু বোকা কিসিমেরই হয়, রিয়েলিটিকে মিসরিড করে, তাসনুভা আমাদের রিলেশন সহজে টের পাবে না, কেননা, ও ভাববে দয়াময় গড দয়া করে তোমাকে ওকে মিলিয়ে দিয়েছেন; তবে তাসনুভা মেয়ে বলে একদিন টের আমাদের গোপন অভিসার ঠিকই পেয়ে যাবে, বাট ততদিন তোমার আমাকে কিংবা আমাকে তোমার ভালো নাও লাগতে পারে ...হি হি ...

ওরা যখন লতিফপুর বাস্টস্ট্যান্ডে বাস থেকে নামল তখন সন্ধ্যা। পারভীনের কোলে ঐশী। নাজমার বকেয়া বেতন মিটিয়ে দিয়ে ওকে বিদায় করে দেওয়া হয়েছে। সজল একটা রিকশায় বড় সুটকেশটা তুলে দিল। ঠিক তখনই মুঠোফোন বেজে ওঠে। ‘তোরা যা। আমি আসছি বলে’ সে হাঁটতে থাকে। সাদিক আমিন ফোন করেছে। তারপর ও প্রান্তের কথা শুনতে শুনতে সজলের শরীর জমে যায়। তারপর ফোন অফ করে হনহন করে হাঁটতে থাকে সে। ততক্ষণে ছোট্ট মফস্বল শহরটায় ঘোর কুয়াশা ছড়িয়ে পড়েছে ... সজল রেললাইনের সমান্তরাল হাঁটছে; লতিফপুর স্টেশনটা পিছনে পড়ে থাকে ... হাঁটতে হাঁটতে কত কথা মনে পড়ে তার ... বাবা, মা, ঐশী, পারভীন, সূর্যসেন হল, মধুর কেন্টিন আর এই দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংগঠিত করবার কথা ... কিন্তু তার চেয়েও বড় হয়তো প্রেম ... যে প্রেম পিছনে ফেলে আসা স্টেশনের মতো ... সামনে আরেকটি স্টেশন ... যে স্টেশনে কোনওদিনই পৌঁছাবে না সে ... কেবল ওকে ঘিরে ধরে মাঘের কুয়াশা আর শীত ... আর ঝিঁঝি পোকার ডাক ...আর ভোর হল দোর খোল ...আর ... বিপরীত দিক থেকে কুউউ ঝিক ঝিক কুউউ ঝিক ঝিক করে আসছিল একটা ট্রেন ...
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29530686 http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29530686 2012-01-28 11:41:54
গল্প: মেঘা আমরা যখন বান্দরবান থেকে থানচি পৌঁছলাম তখন মধ্যাহ্ন । চারদিকে শীত-দুপুরের শীত-মাখানো ঝলমলে রোদ ছড়িয়ে ছিল। চান্দের গাড়ির থেকে নামার পর সালেহীন একটা সিগারেট ধরালো। ওকে ভীষণ বিমর্ষ দেখাচ্ছে। হয়তো আমাকেও। সালেহীনের পরনে কালো রঙের পুলোভার, নীল জিন্সের প্যান্ট; পায়ে কেডস। কাঁধে ব্যাগ। আমারও তাই, তবে আমার সোয়েটারের রংটা নীল। আর আমার কাঁধের ব্যাগে শুভ্রর স্কেচবুকটা রয়েছে। শুভ্র আমাদের বন্ধু ছিল। ওর জন্যই আজ আমরা রেমাক্রিবাজারে রাঙীদের গ্রামে চলেছি । রেমাক্রিবাজার জায়গাটা থানচি ইউনিয়নের পুব দিকে, "ভূস্বর্গ" তিন্দু ছাড়িয়ে। তার পরই বিখ্যাত নাফাখুম ঝরনা। নাফাখুম ঝরনার সৌন্দর্য দেখব বলে এ পথে আমি, সালেহীন আর শুভ্র এর আগেও বেশ ক’বারই আসা-যাওয়া করেছি। আজ অবশ্য আমাদের সঙ্গে শুভ্র নেই। আজ আমরা শুভ্রকে ছাড়াই সাঙ্গু নামে এক পাথুরে নদীর বুনো রূপ দেখব।
গত রাতটা আমরা কাটিয়েছি বান্দরবানের একটা হোটেলে । তারপর সকাল ন’টায় উঠেছি চান্দের গাড়িতে। বান্দরবান থেকে থানচির দূরত্ব ৮২ কিলোমিটার। এই সড়কের সবচাইতে উঁচু পয়েন্ট হচ্ছে পিক ৬৯, এইটার উচ্চতা ২৭০০ ফুট! নীচের দিকে তাকিয়ে হার্টের রোগীর রীতিমতো ভয় খাওয়ার কথা। অনেকবারই আমি বান্দরবান-থানচি সড়কে যাওয়া-আসা করলেও আমার অ্যাক্রোফোবিয়া নেই বলে কখনোই আমার নীচের দিকে তাকিয়ে ভয় করেনি । অথচ আজ কী কারণে নীচের দিকে চোখ যেতেই আমার শরীর হিম হয়ে গেল । মাস কয়েক আগে থানচিতে ভয়াবহ এক অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে গেল -সে কারণেই সম্ভবত ...
থানচি পৌঁছোনোর আগে বলিপাড়া নামে একটি জায়গায় কিছুক্ষণের জন্য চান্দের গাড়িটা থেমেছিল। ওখানে আমরা চা-টা খেয়ে নিয়েছিলাম। একটা সিগারেট ধরিয়ে খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা একটা দীর্ঘ কৃষ্ণচূড়া গাছের গুঁড়ি পেশাব করে ভিজিয়ে দিয়েছিল সালেহীন। আমি তখন দূর পাহাড়ের ধোঁওয়ার কুন্ডলীর দিকে তাকিয়ে আমার সনি এরিকসনটা কানে ঠেকিয়ে রাফিয়া আন্টির সঙ্গে কথা বলছিলাম। ( থানচি অবধি টেলিটকের নেটওয়ার্ক অ্যাক্টিভ।) রাফিয়া আন্টি হলেন শুভ্রর মা । থানচি থেকে রেমাক্রিবাজার অবধি নৌপথ অত্যন্ত বিপদজনক। রাফিয়া আন্টি সেটা জানেন। সে কারণে বললেন, তোমাদের দুজনকে এমন একটা কাজে পাঠালাম যে এখন আমার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে। আবার না-পাঠিয়েও মনে ঠিক স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। আমি বললাম, আন্টি, আমরা রাঙীদের গ্রামে ঠিকই পৌঁছে যাব দেখবেন। আপনি অহেতুক টেনশন করবেন না।
এই কথার পর নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় ওপাশের কথা শোনা গেল না। ...
থানচি পৌঁছনোর পর চান্দের গাড়ি থেকে নেমে সালেহীন একটা সিগারেট ধরালো । আজকাল ওর সিগারেট খাওয়া অনেক বেড়ে গেছে। হয়তো শুভ্রর স্মৃতি ওকে তাড়া করছে। ওর কপালে এখনও ব্যান্ডেজ বাঁধা । শরীরে ক্ষত এখনও পুরোপুরি শুকায়নি। সেই কুয়াশার ভোরে ওদের বাসটা খাদ থেকে গড়িয়ে পড়ার আগে সালেহীন কী ভাবে ঝাঁপ দিয়েছিল বলেই বেঁচে গিয়েছিল। বাসে অনেক ভিড় ছিল। শুভ্র বাসের ভিতরে ছিল। পরে ওকে আর ঠিক চেনা যায়নি ...
হাঁটতে- হাঁটতে আমরা সাঙ্গু নদীর পাড়ে চলে এলাম। পাহাড়ি এই নদীটা বরাবরই আমার ভালো লাগে। আজ রৌদ্র ঝলমল নদীটি দেখে মন ভারি খারাপ হয়ে এল। এই পাহাড়ি নদীটাকে শুভ্র বড় ভালোবাসত। চমৎকার ছবি আঁকত শুভ্র । সাঙ্গুর প্রায় শ’খানেক ছবি এঁকেছিল শুভ্র। ছবি এঁকে সাঙ্গুর প্রতি ওর গভীর ভালোবাসা প্রকাশ করেছিল। শুভ্রর এই এক অভ্যেস ছিল, যাকে ভালো লাগত তার ছবি আঁকত ...
থানচি বাজারটা সাঙ্গু নদীর ওপাড়ে । বাজার অবধি চান্দের গাড়ি যায় না। মাত্র ব্রিজ তৈরি করা হচ্ছে। সাঙ্গু পার হলাম নৌকায়। কি কনকনে শীত রে বাবা! রীতিমতো জমে যাচ্ছি। অথচ মাথার ঠিক ওপরেই জ্বলজ্বল করছে আস্ত একটা মাঝ-ডিসেম্বরের সূর্য। শুভ্র থাকলে কী হইচই-ই না করত এই সময়। পানি ছিটিয়ে আমাদের ভিজিয়ে দিত। সালেহীন কিছুটা রাশভারী গম্ভীর প্রকৃতির । ও রেগে যেত নিশ্চয়ই। দু-জনের মধ্যে খালি ঝগড়া বাঁধত এটা-ওটা নিয়ে।
থানচি বাজারটা তেমন জমকালো নয়। সরু পাকা রাস্তা। দু-দিকে মামুলি দোকানপাট। টের পেলাম খিদে পেয়েছে। এখুনি কিছু একটা খেয়ে নিতে হবে। রেমাক্রিবাজার পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা ঘনাবে। হাতের বাঁয়ে একটা ভাতের হোটেল। ঢুকলাম। হোটেল মানে বেড়ার ঘর আর কী । কাঠের পুরনো চলটা-ওঠা টেবিল-বেঞ্চ। বেড়ায় একটা সাদা কাগজে মেনু লিখে সেঁটে রেখেছে। বন্য শুকর (শূকর) -৬০ টাকা ; গুইসাপ-৪০টাকা; মুরগী (র) চাটনী- ৪০টাকা; হাঙ্গর মাছ- ৩৫ টাকা; বন্য আলু+ শুটকি (শুঁটকী?) ২০ টাকা; টকগুলা + শুটকি; ২০ টাকা...আমি মুরগীর চাটনি নিলাম। সালেহীন নিল হাঙ্গর মাছ আর মুরগীর চাটনি। শুভ্র থাকলে নির্ঘাৎ বুনো শূকর কিংবা গুঁইসাপ নিত। আমাদেরও জোর করত নিতে। শুভ্রর পাহাড়ি খাবারে বেজায় উৎসাহ। গত বছর রাঙী মারমার রান্না তেলাপোকার চচ্চড়ি, খরগোশ ভর্তা আর শামুকের জেলি খেয়ে শুভ্র তো মহা উল্লসিত হয়ে উঠেছিল ।
পাহাড়ি লালচে ভাতে বিশ্রি গন্ধ পেলাম। জুমের চাল বলেই হয়তো। আর তামাকের গন্ধও পেলাম। এসব অবশ্য আমার গা সওয়া হয়ে গেছে। সত্যি কথা বলতে কি- আমি প্রায় একরকম বাংলাদেশের আদিবাসী সংস্কৃতি ভালোবেসেই ফেলেছি। শুভ্র নামের ওই পাগলাটে বন্ধুটাই এ ভালোবাসার পথ দেখিয়েছে। আকাশের মতো উদার ছিল শুভ্রর হৃদয়। বাংলাদেশের পাহাড়ের রূপসৌন্দর্য আর আদিবাসী জনমানুষকে হৃদয়ের গভীর থেকে ভালোবাসত।
খাওয়ার পর থানচি ঘাটে এলাম। নদীর পাড়টি বেশ ঢালু। কারা যেন পাড়ে বেশ কয়েকটি নৌকা তুলে রেখেছে। ঘাটেও সার সার নৌকা। নৌকাগুলি বেশ সরু আর লম্বা । উঁচু গলুইটি দাঁড়কাকের ঠোঁটের মতো বাঁকানো। বেশির ভাগ নৌকাই ছইবিহীন। তবে ছইনৌকাও চোখে পড়ল। আর শ্যালো ইঞ্জিন চালিত নৌকাও আছে।
সময়মতো রওনা হতে পারলে আমরা সন্ধ্যার আগেই রেমাক্রিবাজার পৌঁছতে পারব। রেমাক্রিবাজারে ইউনিসেফের একটা গেস্টহাউজ আছে। পাশেই বিজিবি ক্যাম্প। নিরাপত্তার সমস্যা নেই। এর আগেও আমরা তিন্দু আর রেমাক্রিবাজারে দু-তিনবার এসেছি। তেমন সমস্যায় পড়তে হয়নি।
ঘাটে মাঝির তল্লাস করতেই রহিম মাঝি উদয় হল। মাঝবয়েসি মানুষটি বেশ লম্বা । হালকাপাতলা গড়নের। গায়ের রংটি কালো। একমুখ দাড়ি। আমরা যে রেমাক্রিবাজার যাব, সে কথা রহিম মাঝিকে বললাম। শেষ অবধি
দু-জনের ২২০০ টাকায় রফা হল। রেমাক্রিবাজার অবধি রহিম মাঝিই আমাদের গাইড। প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় যাওয়ার আগে বিজিবি-র অনুমোদন নিতে হবে। মাঝিদের সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের সম্পর্ক ভালো । অনুমোদন আমাদের তরফ থেকে রহিম মাঝিই নিয়ে নেবে। একটা কাগজে আমার আর সালেহীনের নাম, ঠিকানা, বাসার ফোন নাম্বার লিখে রহিম মাঝি কে দিলাম । রহিম মাঝি ছুটল পারমিশন আনতে। এরই ফাঁকে আমরা ১০০ টাকায় এক কাঁদি কলা কিনে নৌকায় তুলে ফেললাম।
অনুমোদন নিয়ে ফিরে এসে রহিম মাঝি নৌকা ছাড়ল। আমি চারপাশে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম। নদীর দু’পাশেই সবজে রঙের অনুচ্চ পাহাড়। কোথাও পাহাড়ের ঢাল থেকে প্রশস্ত বড় পাথর বেড়িয়ে এসে নদীর পানিতে মিশে গেছে । সাঙ্গু খরস্রোতা পাথুরে নদী। রহিম মাঝি উজান বেয়ে চলেছে। তার হাতে লগি। তার সহযোগী মিজানের হাতে বৈঠা। সাঙ্গুর গভীরতা সব জায়গায় সমান না। কোথাও হাঁটু অবধি, কোথাও আবার চল্লিশ ফুটের মতো। নদীর মাঝে শ্যাওলা ধরা ছোটবড় পাথর । মাঝে মাঝে পাথরে নৌকা ঘঁষা খাচ্ছিল। শীতে পানি কম থাকায় মাঝেমাঝেই নৌকা আটকে যাচ্ছে। তখন নৌকা থেকে নেমে আমাদের নৌকা টানতে হচ্ছিল । পায়ের পিছল নীচে নুড়িপাথর। দু-পা এগুনো ভীষণ কষ্ট। আর কী কনকনে ঠান্ডা পানি রে বাবা । আমরা কেউই শুভ্রর মতো নই, আমরা মন্দ পরিস্থিতি নিয়ে আনন্দ করতে পারি না। আমাদের খালি রাজ্যির অভিযোগ! ... আমি নৌকার দড়ি টানতে টানতে শুভ্রর কথা ভাবছি আর রাঙীর কথা ভাবছি। মেয়েটি নিশ্চয়ই আমাদের দেখে ভারি অবাক হয়ে যাবে। যখন ওকে শুভ্রর স্কেচবইটা দিয়ে বলব, ‘এই নাও, দেখ শুভ্র তোমার কী সুন্দর ছবি এঁকেছে।’ শুভ্র যে রাঙীর ছবি এঁকেছিল -এই কথাটা আমি জানতাম না। কথাটা আমি রাফিয়া আন্টির কাছে শুনেছি। শুনে আমি ভীষণই অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। শুভ্র অবশ্য প্রচুর ছবি তুলত। ওর একটা ১৬ মেগার ক্যানন মার্ক ফোর ক্যামেরা ছিল। ওটা দিয়েই মিনিটে-মিনিটে চারপাশের ছবি তোলা ছিল শুভ্রর অভ্যেস। কিন্তু, শুভ্র রাঙীর ছবি আঁকল কখন? আমাদের তো কিছুই বলেনি ও। ভারি আশ্চর্য ছেলে তো বাবা! ...সেই দুর্ঘটনার পর আমি শুভ্রদের কলাবাগানের বাড়িতে যাই। (সালেহীন তখনও হাসপাতালে ছিল।) শোকে স্তব্দ-হিম ঘরদোর। এরই ফাঁকে রাফিয়া আন্টি আমার কাছে এসে বসলেন। চশমা পরা ফরসা গম্ভীর মুখ। একটা কলেজে পড়ান রাফিয়া আন্টি । তিনিই আমাকে শুভ্রর আঁকা রাঙীর ছবি দেখালেন। দেখে আমি তো অবাক। আমার তখন সব মনে পড়ে যাচ্ছিল। নাফাখুম ঝরনার আসল সৌন্দর্য দেখার সময় শীত নয়, বর্ষাকাল। গত বছর বর্ষাকালে আমরা যখন রেমাক্রিবাজারে এসেছিলাম- তখন একবার ঘোর বৃষ্টির মধ্যে পড়েছিলাম। সে সময় আমরা রাঙীদের টঙঘরে আশ্রয় নিয়েছিলাম। নিপাট সরলতায় ভরা ফরসা ফুটফুটে নিষ্পাপ মুখ । রাঙী তার বুড়ো বাপের সঙ্গে মাটি থেকে বেশ উঁচুতে একটা টঙ ঘরে থাকত । রাঙীর বাপের নাম উসসুরী মারমা। চমৎকার রান্নার হাত রাঙীর। খরগোশ ভর্তা, শামুকের জেলি আর তেলাপোকার চচ্চড়ি ছাড়াও আমাদের কত কী যে রান্না করে খাইয়েছিল রাঙী। জুম চালের লালচে ভাত, মুরগীর চাটনি, চিংড়ির ঝোল,আলু দিয়ে শুটকি মাছ। আরও কত কী। আমরা শহরে ফিরে ফেসবুকে সেসব ছবি আপলোডও করেছি । উচ্ছ্বসিত মন্তব্যে পৃষ্ঠা ভরে উঠেছিল। আসলে বাংলাদেশি তরুণ প্রজন্ম আজকাল ট্রাইবাল কালচারকে ভালোবাসতে শুরু করেছে। কিন্তু, রাঙীর ছবি শুভ্র আঁকল কখন? কেন আঁকল? শুভ্র যাকে ভালোবাসত, তার ছবিই আঁকত ...তাহলে?
রাফিয়া আন্টি আমাকে দোতলায় শুভ্রর ঘরে নিয়ে গেলেন। শুভ্রর স্মৃতিময় ঘরটা কেমন হিম হয়ে ছিল। দেয়ালে ঠেস দিয়ে রাখা ওর কালো রঙের ইয়ামাহা অ্যাকুয়েস্টিক গিটার, দেয়ালে শুভ্রর বড় একটা হাস্যজ্জ্বল সাদাকালো ছবি, বাঁ পাশে বইয়ের তাক, টেবিল, তার পাশে ডিভিডির র‌্যাক, বিছানার ওপর একটা ১৪ ইঞ্চি ডেল এক্সপিএস, জানালার পাশে ক্যানভাস; সবই আগের মতোই আছে, কেবল কবিস্বভাবের মানুষটিই নেই।
রাফিয়া আন্টি আমাকে একটা স্কেচবুক দিয়ে বললেন, দ্যাখো তো মৃদুল, এই মেয়েটিকে তুমি চেন কিনা?
স্কেচবুক ভরা রাঙীর স্কেচ। আমি চমকে উঠলাম। হ্যাঁ, চিনি। মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম।
কে ও?
রাঙী মারমা। বান্দরবান থাকে ।
ওহ্ । ও কি শুভ্রর ব্যাপারটা জানে? মানে ...
না।
রাফিয়া আন্টি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, শুভ্রর এই স্কেচবইটা কি তুমি ওকে দিয়ে আসতে পারবে?
আমি মাথা নাড়লাম।
রাফিয়া আন্টি বললেন, আমি মনে করি এই স্কেচবইটা ওর কাছেই থাকা উচিত। রাফিয়া আন্টির কন্ঠস্বর কেমন করুণ শোনালো।

তিন্দু ছাড়িয়ে আমরা যখন রেমাক্রিবাজারে পৌঁছলাম তখনও আকাশে শেষবেলার কিছু আলোর রেশ ছিল। আমরা নৌকা থেকে নেমে এলাম। ঠিক হল কাল আবার রহিম মাঝি আমাদের থানচি নিয়ে যাবে। আজ রাতটা রহিম মাঝি আর মিজান এখানেই কোথাও কাটিয়ে দেবে ।
এর আগেই দেখেছি যে এই রেমাক্রিবাজার জায়গাটা একেবারেই ‘অজ’ না। এখানে ইউনিসেফের রেস্ট হাউজ ছাড়াও আছে বিজিবি ক্যাম্প, আছে সৌরবিদুৎ; বাজারে মিনারেল ওয়াটার, সফট ড্রিঙ্কস, চিপস-বিস্কুট-এসবও কিনতে পাওয়া যায় । ১০-১৫ টাকা দিলে মোবাইল চার্জও করা যায়। এখান থেকে নাফাখুম ঝরনা ২ ঘন্টার হাঁটাপথ।
রেমাক্রিবাজারে বেশ ভিড়। বেশির ভাগই শহুরে তরুণ-তরুণি। এদিক-ওদিক অনেক তাঁবুও পাতা হয়েছে। দূর থেকে একটা তাঁবুর সামনে শিবলীকে দেখতে পেলাম। আমাদের দেখে শিবলী হাত নাড়ল ।বুয়েটে শুভ্রর ক্লাসমেট ছিল শিবলী । ‘আহ্নিক’ নামে একটা ব্যান্ডে বেজ গিটার বাজায়। আরও অনেকেই ঢাকা থেকে এসেছে। বাংলাদেশের অন্যান্য জায়গা থেকেও এসেছে। ব্লগ, ফেইসবুক আর পত্রপত্রিকায় নাফাখুম ঝরনা নিয়ে প্রচুর লেখার কারণেই হঠাৎই নাফাখুম ঝরনাটি বিখ্যাত হয়ে উঠেছে। তরুণ প্রজন্ম খানিকটা ঝুঁকি নিয়েই প্রিয় মাতৃভূমির নৈসর্গিক সৌন্দর্য আবিস্কারে নেশায় ছুটে এসেছে প্রত্যন্ত এই পাহাড়ি জনপদে । তিন্দু, রেমাক্রি এবং নাফাখুনের নাম এরই মধ্যে "বাংলার ভূ-স্বর্গ" হিসেবে পরিচিতি পেয়ে গেছে।
ইউনিসেফের রেস্টহাউজটা একটা টিলার ওপর। ওটা অলরেডি বুকড। সামনের বারান্দাটিও এরই মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা দল দখল করে নিয়েছে। এ দিকে দ্রুত সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। এখান থেকে রাঙীদের গ্রাম অবশ্য ঘন্টাখানেকের হাঁটা-পথ। মাঝখানে অবশ্য বেশ ক'টা টিলা পেরোতে হয়। আকাশে আজ পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে বটে, তবে ঘন কুয়াশার কারণে পাহাড়ি পথে ঝামেলা হতে পারে। আজ রাতটা বরং এখানেই কোথাও কাটিয়ে দেওয়া যাক । কাল ভোরে রওনা হলেই চলবে। শিবলীরা সঙ্গে করে তাঁবু এনেছে। ওর সঙ্গে কথা বলব কিনা ভাবছি। ঠিক তখনই সালেহীন বলল, চল, ক্য কি নু মারমার বাড়ি যাই। ভদ্রমহিলা নিশ্চয়ই আমাদের জন্য একটা ব্যবস্থা করতে পারবেন।
ওহ!। তাই চল।
ক্য কি নু মারমা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মহিলা মেম্বার। গত বর্ষায় যখন রেমাক্রিবাজারে এসেছিলাম তখন ভদ্রমহিলার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। মধ্যবয়সিনী ক্য কি নু মারমা রাঙীদের কেমন যেন ঘনিষ্ট আত্মীয়াও হন। ভদ্রমহিলা ভারি অমায়িক। ভালো বাংলা জানেন।
আমরা পাশাপাশি কুয়াশার ভিতরে হাঁটছি। হাঁটতে-হাঁটতে কখন আমরা ক্য কি নু মারমার বাড়ির উঠানে চলে এলাম। পাশাপাশি বেশ কয়েকটা ঘর। ক্য কি নু মারমার বাড়িটি দোতলা। গত বর্ষায় এ বাড়িরই চিলেকোঠায় রাত্রিযাপন করেছিলাম। থাকার জন্য জনপ্রতি ২০০ টাকা করে দিয়েছিলাম । রেস্টহাউজে অবশ্য রেট ৫০/৬০ টাকা ।
ক্য কি নু মারমা বাড়ির ছাদে সোলার প্যানেল বসিয়েছেন দেখছি। বাড়ির পিছনে ঘন গাছপালার আভাস। চারদিকেই ঘন কুয়াশা ছড়িয়ে আছে । তারই মধ্যে মধ্য ডিসেম্বরের পরিপূর্ণ চাঁদ কিরণ ঢালছে নীচের এই নির্জন পাহাড়ি জনপদে । কেবল ঝিঁঝির ডাক সে নির্জনতাকে ভেঙে ফেলতে চাইছে। উঠানের মাঝখানে কারা যেন আগুন জ্বেলে গোল হয়ে বসে আছে। কে যেন গান গাইছে। কন্ঠস্বর বৃদ্ধের মনে হল। গানের ভাষা অচেনা ঠেকল। অনেকটা বেদেদের সাপ ধরার মন্ত্রের মতন সুর ।
ক্য কি নু মারমার বাড়ির দরজায় একটি কিশোরী মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। অবিকল রাঙীর মতন দেখতে। আমি চমকে উঠলাম। কে এ? গতবার তো দেখিনি। আমাদের দেখেই মেয়েটি বাড়ির ভিতরে চলে গেল। যেন জানত আমরা আসব।
একটু পর ক্য কি নু মারমা এলেন। হালকাপাতলা শরীর। উচ্চতা মাঝারি। ফরসা গোলপানা মুখ। আমাদের দেখেই ভদ্রমহিলা চিনতে পারলেন। হাসলেন।
ম্যাডাম, আজ রাতটা কি আপনার এখানে থাকা যাবে? সালেহীন জিগ্যেস করে।
হ্যাঁ। আসেন, ভিতরে আসেন। বলে ভদ্রমহিলা হাসলেন।
ছোট ঘর। ম্লান সৌর-আলো জ্বলে ছিল। বাতাসে ধূপের গন্ধ ভাসছিল। একপাশে একটা খাট। তারই পাশে দোতলায় যাওয়ার ছোট্ট সিঁড়ি। ঘরটা বেড়ার । বেড়ায় সাইনু প্রু মারমার একটা বড় ছবি টাঙানো। প্রখ্যাত ওই প্রমীলা ফুটবলারকে দেখেই চিনলাম । ঘরের মেঝেটি মাটির। দুটো কাঠের চেয়ার। আমরা কাঁধের ব্যাগ নামিয়ে চেয়ারে বসলাম। গভীর ক্লান্তি ঘিরে ধরেছে। রাঙীর মতো দেখতে সেই কিশোরী কোথায় গেল? মেয়েটি দেখতে অবিকল রাঙীর মতো কেন? গভীর কৌতূহল আমাকে ঘিরে ধরেছে।
সালেহীন ওর মানিব্যাগ বের করে ক্য কি নু মারমা কে একটি পাঁচশ টাকার নোট দিল। ভদ্রমহিলা নোট নিয়েই ঘুরে দাঁড়ালেন। তারপর ‘ মেঘা ’ ‘মেঘা ’ বলে কাকে যেন ডাকতে ডাকতে ভিতরে চলে যান। হয়তো রান্নার আয়োজন করবেন। কে মেঘা? ওই কিশোরী নয়তো?
বেশ খিদে পেয়েছিল। কনকনে ঠান্ডা পানিতে হাত মুখ ধুয়ে সামনে খবরের কাগজ বিছিয়ে দুজন খাটের ওপর বসেছি। ক্য কি নু মারমা আমাদের প্লেটে ধোঁওয়া ওঠা গরম ভাত বেড়ে দিলেন। ছোট রাঙা আলু দিয়ে মুরগীর ঝোল রেঁধেছেন। মুখে দিয়ে দারুণ স্বাদ। ভদ্রমহিলা মুরগীর ভর্তাও করেছেন। খেতে খেতে একবার দরজার দিয়ে জ্যোস্না ছড়ানো উঠানে চোখ গেল। অগ্নিকুন্ড ঘিরে এখনও লোকজন বসে রয়েছে। বৃদ্ধার গান অবশ্য শোনা গেল না।
খাওয়ার পর ক্য কি নু মারমা বললেন, আপনাদের এক বন্ধু ছিল না? চশমা পরা, লম্বা চুলদাড়ি-সে কই, আসে নাই?
ম্যাডাম আপনি কি শুভ্রর কথা বলছেন?
ক্য কি নু মারমা মাথা নাড়লেন।
যা বলার সালেহীনই বলল। ভদ্রমহিলা অনেকক্ষণ গুম হয়ে রইলেন। যেন গভীর শোক অনুভব করছেন । ঘরের ভিতরে ঝিঁঝির ডাক তীব্র হয়ে উঠল। সেই সঙ্গে কুন্ডুলী পাকিয়ে ঘরের ভিতরে ঢুকে পড়ল শীত।
তারে ফেলে আইছেন দেখি অবাক হইছি। যাক। মেঘায় দোতলায় আপনাগো বিছনা কইরা দিব। এখন যান, শুইয়া পড়েন।
কাল ভোরে আমাদের ডেকে দেবেন। আমি বললাম।
আচ্ছা।
সালেহীন কী মনে করে বলল, কাল ভোরে আমরা রাঙীদের বাড়ি যাব।
ক্য কি নু মারমার ফরসা মুখটি নিমিষে কালো হয়ে উঠল। অস্ফুট কন্ঠে বললেন, রাঙী? রাঙী তো বাঁইচা নাই। মহিলার কন্ঠস্বর কেমন খসখসে শোনাল।
চমকে উঠলাম। বেঁচে নেই মানে?
রাঙী মইরা গেছে।
কিভাবে? আমার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। যে শহুরে তরুণ ওকে মনে মনে ভালোবেসেছিল সেই রাঙী কি তাহলে তার কাছেই চলে গেল?
ক্য কি নু মারমা বললেন, রাঙীর জ্বর হইছিল। দুই দিন ভুইগা মরল।
আমার শরীর মুহূর্তেই ভিজে যায়। ভিতরে সাংগু নদীর অজস্র পাথর গড়িয়েপড়তে থাকে।
সালেহীন মাথা নীচু করে আছে। কাঁপছে। আমি টের পাচ্ছি। ওহ্ । রাঙী তাহলে বেঁচে নেই। কথাটা রাফিয়া আন্টিকে বলা যাবে না-আন্টি ভীষণ কষ্ঠ পাবেন।
ক্য কি নু মারমা বললেন, মেঘায় হইল রাঙীর জমজ ভোন ।
গতবার দেখিনি যে।
রাঙীরা তিন ভোন। গত বর্ষায় আপনারা যখন রেমাক্রিবাজারে আইছিলেন তখন মেঘায় ওর বড় ভোনের শ্বশুরবাড়িত বেড়াইতে গেছিল। রাঙী মারা যাইবার পর ওর বাপেও মইরা যায়। আমি মেঘা রে নিয়া আসছি।

পরদিন ভোরে আমরা রেমাক্রিবাজারে ঘাটে নৌকায় উঠলাম।
সাঙ্গু নদীর পাড়ে ঘন কুয়াশার ভিতরে দাঁড়িয়ে ছিল মেঘা।
আমরা শুভ্রর স্কেচবইটা সাঙ্গুর জলে না ভাসিয়ে দিয়ে ওর হাতেই তুলে দিয়েছি।

উৎসর্গ: রাশমী

এই গল্পটা লিখতে যেসব ব্লগের সাহায্য নিয়েছি:

Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
http://www.sachalayatan.com/amlan/36897
Click This Link]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29529551 http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29529551 2012-01-26 11:37:26
বাঙালি কৌমের কেলি কল্লোলিত কর কলাবতী/জানতো না যা বাৎসায়ন, আর যত আর্যের যুবতী প্রাচীন বাংলার কৌম বাঙালি ছিল নির্জন-সবুজ গ্রামীণ প্রকৃতিতে লালিত। তার নিবাস ছিল, কবি রফিক আজাদ এর ভাষায়,‘সীমাবদ্ধ জলে, সীমিত সবুজে’। অপরূপা প্রকৃতির মূখর আঙ্গিনায় নিজেকে নিয়েই তার আত্মমগ্ন দিনগুলি কাটছিল। তার চৌহদ্দি ছিল মাটির ঘর, নিকানো উঠান এবং ধান-আখ আর হলুদ সর্ষের ফসলের মাঠ; খালে-বিলে আর নদীতে মাছ আর বনভূমিতে পশুপাখি শিকার করে কাটত তার নিষাদজীবন । তাকে ঘিরে ছিল কৌমের সহজ সরল তাম্রবর্ণের মানুষ, আর তার অন্তরে ছিল ‘মনের মানুষ’। সে ভিতরে ভিতরে পরমের অস্বিত্ব টের পায়, দুঃখ-দুর্বিপাকে তার কাছে প্রার্থনা করে, নতজানু হয়; তাকে সুখদুঃখের সঙ্গী ভাবে। এই নিয়েই ছিল নির্জনতাপ্রিয় বঙ্গবাসীর মাতৃতান্ত্রিক নিষাদসমাজ। জবা ফুল, বেলপাতা দিয়ে মাতৃদেবীর পুজা করত ওরা। কৌমের চিন্তাশীল নরনারী নারী কে পর্যবেক্ষণ করে, বিচিত্র বৈশিষ্ট্যের নারীকেই মর্তে পরমের প্রতীক বলে ভাবে । এভাবে কৌমসমাজে তান্ত্রিক ধ্যানধারণা ডালপালা মেলে। তন্ত্র হল প্রকৃতির অন্তরালের পরম সত্তাকে উপলব্দি করবার নিগূঢ় মার্গ বা পথ!
বাঙালি চিরকালই এমনই থাকতে চেয়েছিল। পূর্ণিমা রাতে নির্জন জ্যোস্নার উঠানে বসে অস্ট্রিকভাষী নিষাদবুড়োর কাছে শুনতে চেয়েছিল আশ্চর্য সব রূপকথা, যে রূপকথা আজও বেঁচে আছে মধ্যযুগের ‌'মঙ্গলকাব্যে' । হয়তো রূপকথা শোনার সময় নিকটস্থ বনভূমি থেকে ভেসে আসত মাদলের ধিতাং ধিতাং বোল। ওই বনভূমিতে অরণ্যবাসী নিষাদেরা বোঙ্গা দেবতার মূর্তি ঘিরে নৃত্যগীতে মেতে উঠেছে যে! এই বোঙ্গা দেবতার নাম থেকেই বঙ্গ শব্দটির উৎপত্তি বলে কারও কারও ধারণা। এ প্রসঙ্গে কাবেদুল ইসলাম লিখেছেন,‘সম্ভবত অস্ট্রিক ভাষার দেবতাবোধক ‘বোঙ্গা’ শব্দ থেকে তাঁর ভক্ত অর্থে বঙ্গ শব্দের উদ্ভবের কথা অনুমান করা যেতে পারে। ( প্রাচীন বাংলার জনপদ ও জনজাতি গোষ্ঠী; পৃষ্ঠা,১৮) ...সে যা হোক। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্তের মৌতাতে অবগান করে কী সুখেই না কাটছিল প্রাচীন বঙ্গবাসীর দিনগুলি !
হায়! আত্মমগ্ন বাঙালি কৌমের এমন নিস্তরঙ্গ সুখের দিন আর রইল না। পশ্চিম থেকে ঘনিয়ে এল আতঙ্কজনক কালো মেঘ।
ভারতবর্ষে লোহার আবিস্কার হয় খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ অব্দে । এরও প্রায় সাতশ বছর আগে আর্যরা যাযাবর জীবন ত্যাগ করে ভারতবর্ষের পশ্চিমাঞ্চলে বসতি স্থাপন করতে থাকে। এই বসতিস্থাপনের প্রক্রিয়ায় আর্যরা ভারতবর্ষের আদি অধিবাসী দ্রাবিড়দের ধ্বংস করে ফেলছিল। ড. আর এম দেবনাথ লিখেছেন, ‘এ সংঘর্ষের পরিচয় বেদের পাতায় পাতায় পাওয়া যায়। দেখা যায় আর্যরা তাদের দেবতা ইন্দ্রের কাছে মহেঞ্জোদারো নগরী ধ্বংস করার জন্য বারবার প্রার্থনা করছে।’ ( সিন্ধু থেকে হিন্দু; পৃষ্ঠা, ৬২)। ওই মহেঞ্জোদারো নগরীটি দ্রাবিড়রা নির্মাণ করেছিল। উন্নত হরপ্পা সভ্যতার নির্মাতা তারাই। হরপ্পা সভ্যতা যে মিশর ও সুমেরিয় সভ্যতার চেয়ে উন্নত ছিল-ইতিহাসবিদগণ একবাক্যে স্বীকার করেছেন । হরপ্পার মানুষ সে যুগে সুতি কাপড়ের ব্যবহার জানত। তাছাড়া হরপ্পার জনগন, অর্থাৎ দ্রাবিড় জনগোষ্ঠী অনেক বেশি পরিকল্পিত এবং স্বাস্থসম্মত ভাবে নগর গড়তে সমর্থ হয়েছিলেন। প্রশস্ত এবং আলোবাতাস পূর্ণ ঘরবাড়িতে বাস করত। এরকম বাড়িঘর মিশর বা মেসোপটেমিয়ায় ছিল না। স্নানাগার তৈরি, ড্রেন ব্যবস্থা, পরিকল্পিত রাস্তা, পয়ঃনিস্কাশনের ব্যবস্থা এসব ক্ষেত্রে হরপ্পাবাসী অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করেছে।
অথচ আর্যরা দাবিড়দের দস্যু, দাস এবং অসুর বলে অবহিত করেছে!
আর্যরা দ্রাবিড় সভ্যতা ধ্বংস করে বাঙালি কৌম ধ্বংস করতে পূর্বদিকে অগ্রসর হতে থাকে ।
সেই খ্রিস্টপূর্ব যুগে প্রাচীন বাংলার পশ্চিমাঞ্চল ঘন বনভূমিতে আচ্ছাদিত ছিল। প্রাচীন বঙ্গবাসী সে বনভূমি অতিক্রম করে কখনোই পশ্চিমে যায়নি। কেন? আপন কৌমজীবনে সন্তুষ্ঠ ছিল সে। সে পুজা (পুজা শব্দটি অষ্ট্রিক ভাষার শব্দ) করত, তীর্থে-তীর্থে ঘুরে বেড়াত। প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপনই ছিল তার ধর্ম। এ ছাড়া ১৯৩৪ সালে লেখা জীবনানন্দের একটি কবিতার দুটি চরণ বিষয়টি বুঝতে সাহায্য করে -

‘অশ্বত্থের পাতাগুলো পড়ে আছে ম্লান শাদা ধুলোর ভিতর/ এ পথ ছেড়ে দিয়ে এ-জীবন কোনোখানে গেল নাকো তাই।’ (রূপসী বাংলা) ...

নিজস্ব কৌমজীবনে সমাচ্ছন্ন প্রাচীন বঙ্গবাসীর আত্মার স্বরূপটি উপলব্দি করা গেল। খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ অব্দে লোহা আবিস্কার হওয়ার পর ধারালো অস্ত্র নির্মিত হতে লাগল। তাতে ঘন বনভূমি কেটে সাফ করে বৈদিক আর্যদের পক্ষে পূর্বমুখী অভিপ্রয়াণ সহজ হয়েছিল। তারা দলে দলে প্রাচীন বাংলায় আসতে লাগল । তৎকালীন সময়ে বাংলার জনসংখ্যা ছিল কম। লোকালয়ের বাইরে বসতি স্থাপনের জন্য প্রচুর জায়গা খালি ছিল । দীর্ঘকাল অবধি আর্য সম্প্রসারণ সীমাবদ্ধ ছিল করতোয়া নদী পশ্চিমপাড়েই। 'করতোয়া' নামটি বাংলায় আর্য প্রভাবের ফল। কর (হাত) এবং তোয়া (জল)। শিব যখন পার্বতীকে বিয়ে করেন তখন শিবের হাতের জল থেকেই করতোয়ার উৎপত্তি! দিনাজপুরের ‘পুনর্ভবা’ নদীর নামটিও উত্তর বাংলায় আর্যস্মৃতির সাক্ষ বহন করছে। এসব প্রভাব হয়তো মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু আর্যরা সঙ্গে করে এনেছিল পশুবলির ধারণা। অথচ কৌমবাঙালি জবা ফুল, বেলপাতা দিয়ে মাতৃদেবী পুজা করত । আমি আগে একবার বলেছি যে পুজা শব্দটি অষ্ট্রিক ভাষার শব্দ। তারা তীর্থে-তীর্থে ঘুরে বেড়াত। প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপনই ছিল তার ধর্ম। সে পশুবলি মেনে নেবে কীভাবে! তাছাড়া আর্যরা মানববিরোধী এক সংকীর্ণ ধারণায় আচ্ছন্ন ছিল- তা হল: ‘বর্ণাশ্রম প্রথা’; যা সাম্যবাদী বাঙালির তো মেনে নেওয়ার কথা নয়। কেননা তার জীবন ছিল শ্রেণিহীন কৌমজীবন। সে যাই হোক। করতোয়ার পূর্বপাড়ের প্রাচীন বঙ্গবাসী আর্য অভিপ্রয়াণ রুখে দিয়েছিল! তার নজীর রয়েছে কবি আল মাহমুদ-এর ‘সোনালি কাবিন’ কবিতায়।

অতীতে যাদের ভয়ে বিভেদের বৈদিক আগুন/ করতোয়া পার হয়ে এক কঞ্চি এগোতো না আর ...

বলিপ্রথা এবং মানববিরোধী বর্ণাশ্রম প্রথা ছাড়াও আর্যরা সঙ্গে এনেছিল এক গ্রন্থ। সে গ্রন্থের নাম বেদ। প্রাচীন মানবসমাজের ধ্যানধারণা ধারণ করে বলে আমরা ওই গ্রন্থকে সম্মান করি, শ্রদ্ধা করি। তবে প্রাচীন কৌমবাংলায় মানুষ মানবরচিত গ্রন্থের বড় একটা ধার ধারত না । ওদের কাছে বিচিত্র রসায়নে সৃষ্ট মানুষ আর বিস্ময়কর প্রকৃতিই ছিল একমাত্র গ্রন্থ। একারণেই প্রাচীন কৌম বাংলার মানুষ মানুষরচিত গ্রন্থ পাঠ করে তৃপ্ত হত না। বেদের ওপর ওদের বিতৃষ্ণাই ছিল বলা যায়। দীর্ঘ কাল পরে বাঙালির আধ্যাত্মিক গুরু লালনের একটি গানেও বেদের প্রতি বিতৃষ্ণার কথা প্রতিফলিত হয়েছে-

আত্মারূপে কর্তা হরি, মনে নিষ্টা হলে মিলবে তারি ঠিকানা। বেদ-বেদান্ত পড়বি যত বেড়বি তত লখনা (সন্দেহ)

আর্যরা প্রাচীন বাংলায় বেদ নিয়ে এসেছিল বটে, তবে বিস্ময়কর হলেও সত্য যে - বেদে বঙ্গের নাম উল্লিখিত হয়নি! অবশ্য এটি কোনও গুরুতর অভিযোগের বিষয় নয়। বেদের যুগে খুব সম্ভবত বৈদিক আর্যদের কাছে ‘বঙ্গ’ অপরিচিত ছিল। বেদ এর খন্ড চারটি।ঋগ্বেদ, সামবেদ, যজুর্বেদ এবং অথর্ববেদ। এই অথর্ববেদ -এ অবশ্য অঙ্গ দেশের নাম রয়েছে। ‘ঐতরেয় আরণ্যক’-এ সর্বপ্রথম ‘বঙ্গ’-র উল্লেখ করা হয়েছিল। ‘ঐতরেয় আরণ্যক’ টি ঐতরেয় মুনি প্রণীত। এটির রচনাকাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতক। তবে সে উল্লেখ সুখকর নয় বরং অপমানজনক। সেরকমই তো হওয়ার কথা। ‘ঐতরেয় আরণ্যক’-এর বঙ্গবিষয়ক শ্লোকটি এরকম:

‘ইমাঃ প্রজা স্তিস্রো অত্যায়মায়ং স্তানীমানি বয়াংসি। বঙ্গাবগধাশ্বের পাদান্যন্যা অর্কমভিতো বিবিস্র ইতি। (২/১/১)

অর্থাৎ, বঙ্গদেশবাসিগণ, বগধবাসিগণ এবং চের জনপদবাসিগণ, এই ত্রিবিধ প্রজাই কি দূর্বলতা, কি দুরাহার ও বহু অপত্যতায় কাক, চেটক ও পারাবাত সদৃশ! ‘ঐতরেয় আরণ্যক’ রচনাকালে বৈদিক আর্যরা বগধ (মগধ?), চের এবং বঙ্গবাসিকে ‘পাখির মতো অস্ফূটভাষী অথবা যাযাবর’ মনে করত। অথচ যে ভাষায় রচিত হয়েছে মানবসভ্যতার সমৃদ্ধতম দার্শনিকসংগীত, যে ভাষায় কাব্য রচনা করে সুর্যপ্রতিম এক বাঙালি কবি বিশ্বের স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছেন, যে ভাষার সম্মান রক্ষার্থে প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন একঝাঁক বাঙালি তরুণ, একুশ শতকে যে ভাষাটি মধুরতম ভাষা হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পেয়েছে, যে ভাষার শিশুতোষ ছড়ার ধ্বনিমাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে ফরাসিরা সযত্নে বইয়ে স্থান দিয়েছে । সুতরাং ঐতরেয় মুনির রচনায় সে ভাষার প্রতি ঈর্ষা এবং অবজ্ঞা প্রকাশ পেয়েছিল-এটা বোঝাই যায়।
ঐতরেয় মুনির পর বঙ্গ সম্বন্ধে তাচ্ছিল্যপূর্ণ মন্তব্য করেন আর্য ঋষি বৌধায়ন। ইনি ‘কল্পসূত্র’ লিখেছিলেন। তারই অর্ন্তগত ‘ধর্মসূত্র’- এ বৌধায়ণ লিখেছিলেন: ‘ যিনি বঙ্গ, কলিঙ্গ ও প্রাণৃন (!) দেশ ভ্রমন করিবেন, তাহাকে পুনস্তোম বা সর্বপৃষ্ঠা ইষ্টি করিতে হয়।’ অর্থাৎ বঙ্গে যে যাবে তাকে প্রায়শ্চিত্য করতে হবে। এ প্রসঙ্গে গবেষক কাবেদুল ইসলাম লিখেছেন: ‘মূলত আত্মগর্বী আর্যদের রচিত এই সব গ্রন্থনিচয়ে পারতপক্ষে ‘বঙ্গ’ এর নাম এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, আর কোথাও একান্ত বাধ্য হয়ে উচ্চারিত হলেও তা নেওয়া হয়েছে নিতান্ত অবজ্ঞা ও ঘৃণা ভরে।’ (প্রাচীন বাংলার জনপদ ও জনজাতি গোষ্ঠী । পৃষ্ঠা,২৪ )
বৈদিক আর্যরা বঙ্গের উদ্ভব সম্বন্ধে উদ্ভট এক গল্প প্রচার করেছে। দীর্ঘতমা নামে এক ঋষি ছিল। সে ছিল অন্ধ এবং চরিত্রহীন। আর্য নারীরা তাকে ঘৃনা ভরে পরিত্যাগ করেছিল। দীর্ঘতমা ঋষি তারপর গঙ্গার জলে ভেসে যাচ্ছিল (!) ... তখন বলি নামে এক অনার্য (অনার্য শব্দটি লক্ষ করুন) রাজা তাকে উদ্ধার করে এবং প্রাসাদে নিয়ে যায়। বলি রাজার স্ত্রীর নাম সুদেষ্ণা। এরপর বলি রাজা নাকি সুদেষ্ণার সঙ্গে যৌনসঙ্গমের জন্য দীর্ঘতমা ঋষিকে প্ররোচিত করে (!)। এর ফলে সুদেষ্ণার গর্ভে এবং দীর্ঘতমার ঔরসে পাঁচটি সন্তান জন্ম হয়। এদের নাম: অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুন্ড্র এবং সূক্ষ্ম। বলিরাজ এদের পাঁচটি রাজ্য দেন। এদের নামানুসারে রাজ্যের নাম হয় অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুন্ড্র এবং সূক্ষ্ম। এই বিষয়ে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান মন্তব্য করেছেন, ‘ব্রাত্যজনের চরিত্রহননের জন্য এটি একটা চিত্তাকর্ষক ব্রাহ্মণ্য-প্রচার’। (গঙ্গাঋদ্ধি থেকে বাংলাদেশ। পৃষ্ঠা, ১২)
আর্য ব্রাহ্মণরা ক্রোধের বশে কৌমবাংলার এক মেধাবী চিন্তাবিদের রচনা ধ্বংস করে ফেলেছিল । সেই চিন্তাবিদের নাম কপিল। যশোরের কপোতাক্ষ নদের পাড়ে কুপিলমুনি নামে একটি গ্রাম আছে, সেখাইে সেই খ্রিস্টপূর্ব যুগে কপিলের জন্ম। কপিল উত্তর ভারতে গিয়ে তাঁর দর্শন প্রচার করেন। কপিলের দর্শনের নাম সাংখ্য দর্শন ; যে সাংখ্য দর্শনের মূল হল প্রকৃতিপুরুষতত্ত্ব। কপিলের মতবাদ নিরেশ্বরবাদী এবং বেদ বিরোধী হওয়ায় মূল রচনা বৈদিক ব্রাহ্মণরা ধ্বংস করে ফেলেছে। তথাপি আজও বাঙালি কবির কবিতায় বেঁচে আছেন কপিল। কবি আল মাহমুদ লিখেছেন-

সে -কোন গোত্রের মন্ত্রে বলো বধূ তোমাকে বরণ করে এই ঘরে তুলি? আমার তো কপিলে বিশ্বাস, প্রেম কবে নিয়েছিল ধর্ম কিংবা সংঘের শরণ? (সোনালি কাবিন)

‘ আমার তো কপিলে বিশ্বাস’ বলতে আল মাহমুদ কপিলপ্রবর্তিত স্বাধীন মতবাদের প্রতিই ইঙ্গিত করছেন। ওই চরণ কটি প্রমান করে কপিল প্রাচীন বাংলার জন্মে গ্রহন করেছিলেন। এবং বাঙালি কবি আজও আজও তাঁকে নিয়ে কবিতা লিখেন। অন্যদিকে উত্তরভারত সাংখ্য দর্শনের স্থ’ল ব্যাখ্যা করে মাত্র! মধ্যযুগের বাংলার বজ্রযানী সাধকগণ কপিলের প্রকৃতিপুরুষ তত্ত্বটিকে আরও বিকশিত করেছিলেন।
বুদ্ধের সময়ে অড়াড় এবং কলাম নামে কপিল-এর দুজন শিষ্য ছিলেন। বুদ্ধ কপিলবস্তুর (কপিলবস্তু শব্দের অর্থ, যেখানে কপিল বাস করেন। কপিল শেষ জীবনে হিমালয়ের পাদদেশে চলে গিয়েছিলেন) রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করার পর
সাংখ্য দার্শনিক অড়াড় এবং কলাম -এর শিষ্যত্ব গ্রহন করেছিলেন। তার পরের ইতিহাস আমরা জানি। অহিংসার দীপশিখা জ্বালিয়ে প্রাচীন ভারত আলো করেছিলেন মহামতি বুদ্ধ। অথচ পরবর্তীতে কট্টর ব্রাহ্মণ্যবাদ বুদ্ধকে ভারতবর্ষ থেকে উচ্ছেদ করে। তখন বাংলাই বুদ্ধের মানবিক ধর্মটিকে বুকে টেনে পরম যত্বে আশ্রয় দিয়েছিল। ইতিহাসের পাতায় সেকথা লেখা রয়েছে।
বুদ্ধ যেমন প্রথম জীবনে কপিলপ্রবর্তিত সাংখ্য দর্শনে আচ্ছন্ন হয়েছিলেন, ঠিক সে রকমই সাংখ্য দর্শনের প্রকৃতিপুরুষতত্ত্বটি ধারণ করে আছে বাংলার বাউল দর্শন । ‘মায়েরে ভজিলে হয় তার বাপের ঠিকানা’- লালনের এই জনপ্রিয় নারীবাদী গানটিতে তারই ইঙ্গিত রয়েছে-

পুরুষ পরওয়ারদিগার অঙ্গে ছিল প্রকৃতি তার। প্রকৃতি প্রকৃতি সংসার সৃষ্টি সবজনা।

যে লালন আজ অনিবার্যভাবেই বাঙালির অর্ন্তজগতের গুরু হিসেবে অধিষ্ঠিত হয়েছেন, সেই লালনের জীবনীভিত্তিক ‘মনের মানুষ’ চলচ্চিত্রটি ভারতবর্ষের সরকার রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে সম্মানিত করতে দ্বিধা করেনি। এরপরও সীমান্তে ভারত সরকার বাংলাদেশিদের রক্ত ঝরাতে দ্বিধা করে না। সামান্য অজুহাতে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষিরা বাংলাদেশিদের নগ্ন করে লাঠিপেঠা করে নয়তো গুলি করে হত্যা করে।
এ কেমন দ্বৈত আচরণ?
ভারত সরকার বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক গুরুকে সম্মান জানানোর পরও কেন সীমান্তে রক্তপাত ঘটানোর নির্দেশ দেয়? অবশ্য এরকম পরস্পরবিরোধীতা অতীতেও দেখা গিয়েছে। অতীতে বৈদিক আর্যরা বাংলার কঠোর সমালোচনা করলেও কোনও কোনও লেখক বাংলার মাহাত্ম স্বীকার করে নিয়েছিলেন । যেমন বাংলার বস্ত্রশিল্পের প্রশংসা করে কৌটিল্য তাঁর ‘অর্থশাস্ত্রে’ লিখেছেন-

‘বাঙ্গকং শ্বেতং স্নিগ্ধং দুকূলং। পৌন্ড্রকং শ্যামং মনি স্নিগ্ধং।।’ (২/১১/১৭)

এর মানে বঙ্গ দেশের তৈরি দুকূল (রেশমী কাপড়) স্নিগ্ধ এবং মসৃণ। ঐতরেয় মুনি, বৌধায়ন প্রমূখ সংকীর্ণচেতা আর্য লেখকগণ বাংলার সমালোচনায় মূখর হলেও দেখা যাচ্ছে কৌটিল্যের ন্যায় মেধাবী পন্ডিত বাংলার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
এ কেমন দ্বৈত আচরণ?
কৌটিল্যই কামশাস্ত্রের রচয়িতা বাৎসায়ন কিনা সে বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। সে যাই হোক। বাৎসায়ন এর কামশাস্ত্র একটি অনবদ্য গ্রন্থ হিসেবে আজ বিশ্বে স্বীকৃতি লাভ করেছে । যৌনতা মানুষের জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। যৌনজীবনের পরিপূর্ণতায় এ গ্রন্থ সহায়ক এবং কার্যকরী বটে, তবে আমি আগেই বলেছি-প্রাচীন কৌমবাংলার মানুষ কাছে মানবরচিত গ্রন্থের বড় একটা ধার ধারত না । ওদের কাছে বিচিত্র রসায়নে সৃষ্ট মানুষ আর বিস্ময়কর প্রকৃতিই ছিল একমাত্র গ্রন্থ। একারণেই প্রাচীন কৌম বাংলার মানুষ মানুষরচিত গ্রন্থ পাঠ করে তৃপ্ত হত না। হোক সে কামশাস্ত্র, বেদ কি অর্থশাস্ত্র। সেসব স্মরণ করেই কবি আল মাহমুদ লিখছেন-

বাঙালি কৌমের কেলি কল্লোলিত কর কলাবতী/জানতো না যা বাৎসায়ন, আর যত আর্যের যুবতী (সোনালি কাবিন)

বৈদিক যৌনশিক্ষা ব্যতীতই যে প্রাচীন বাংলার মেয়েরা কামকলায় অধিক পারদর্শী ছিল- কবির এ প্রবল আর্যবিরোধী বক্তব্য আমাদের দারুণ ভাবে শিহরিত করে। কাজেই সীমান্তে মানুষ হত্যার প্রতিবাদে আজ যে ভারতীয় পণ্যবর্জনের কথা উঠছে এবং ভারতীয় দূতাবাসের সামনে মানববন্ধনের যে উদ্যেগ নেওয়া হয়েছে, ভারতবিরোধী এইসব ন্যায়সঙ্গত প্রতিবাদ-প্রতিরোধ নতুন কিছু নয়, বরং আজ থেকে হাজার বছর আগেই প্রাচীন বাংলায় আর্যভারতের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ হয়েছিল ...

তথ্যসূত্র:

আল মাহমুদ ; শ্রেষ্ট কবিতা
শ্রীযোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত; বিক্রমপুরের ইতিহাস
আবদুল মমিন চৌধুরী; প্রাচীন বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি
কাবেদুল ইসলাম; প্রাচীন বাংলার জনপদ ও জনজাতি গোষ্ঠী
এ কে এম শাহনাওয়াজ; বাংলার সংস্কৃতি
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29528290 http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29528290 2012-01-24 11:44:22
হরপ্পা সভ্যতা (পঞ্চম পর্ব) হরপ্পা সভ্যতা নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে লিখছি। সভ্যতাটি সর্ম্পকে প্রথম পর্বে ভূমিকা হিসেবে লিখেছি যে- হরপ্পা সভ্যতা ভারতবর্ষের প্রাচীনতম সভ্যতা । এবং হরপ্পা সভ্যতার আবিস্কার একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কেননা, এই আবিস্কারের পূর্বে মনে করা হত যে ভারতের ইতিহাসের সূচনা আর্যদের ভারতবর্ষে আসার পর থেকে । আজ আর এ কথার কোনও ভিত্তি নেই। হরপ্পা সভ্যতা আবিস্কারের পর ভারতীয় সংস্কৃতির প্রাচীনত্ব এবং মৌলিকত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছে। অন্তত পাঁচ হাজার বছরের পরনো হরপ্পা সভ্যতাটি প্রাচীনত্বের দিক থেকে মিশর-ব্যাবিলন আসিরিয়ার সমকক্ষতা অর্জন করেছে। সে যাই হোক। প্রাগৈতিহাসিক ভারতবর্ষে সিন্ধু নদের অববাহিকায় হরপ্পা সভ্যতা গড়ে ওঠার সুনির্দিষ্ট কারণ ছিল। মাঠ পর্যায়ে গবেষনা করে প্রত্নতাত্ত্বিকগণ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, নবোপলীয়, অর্থাৎ নব্যপ্রস্তর যুগে খাদ্য ও ঘাসের অভাব দেখা দিয়েছিল। নিজেদের এবং পশুদের খাদ্য যোগানোর জন্য নদীর তীরই ছিল উপযুক্ত জায়গা। কাজেই ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ নদীর তীরে বসতি গড়তে থাকে। ঐতিহাসিকদের মতে হরপ্পা সভ্যতার কালসীমা খ্রিস্টপূর্ব ২২০০ থেকে ১৭০০। মিশর কিংবা মেসোপটেমিয় সভ্যতার তুলনায় হরপ্পা-সংস্কৃতি সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান সীমিত। এর প্রধান কারণ লিখিত দলিলের অভাব। প্রায় হাজার দুয়েক সীল পাওয়া গেলেও সেগুলির পাঠোদ্ধার হয়নি। প্রতœতাত্ত্বিক উৎখননের (archaeological excavation ) ফলে যে তথ্য পাওয়া গিয়েছে তারই ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। অবশ্য এই খননকার্যও মহেনজোদারোয় ভূগর্ভস্থ কয়েকটি স্তর জলমগ্ন থাকায় পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। সুবিশাল হরপ্পা সংস্কৃতির আয়তন সব মিলিয়ে ১২,৫০,০০০ বর্গ কিলোমিটার ।এ প্রসঙ্গে একজন ভারতীয় ঐতিহাসিক লিখেছেন:The totalgeographical area over which this civilization flourished is more than 20 times of the area of Egyptian and more than 12 times of the area of Egyptian and Mesopotamian civilizations combined.




হরপ্পা সভ্যতার মানচিত্র।১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় সিন্ধু অঞ্চলে সব মিলিয়ে চল্লিশটির মতন প্রত্নক্ষেত্র আবিস্কার হয়েছিল। এর পর গত ৫০/৬০ বছরে সব মিলিয়ে ১৪০০ প্রাচীন বসতি আবিস্কৃত হয়। এর মধ্যে ৯২৫ টি ভারতে; এবং ৪৭৫ টি পাকিস্তানে। কাজেই বর্তমানকালের রাজনৈতিক সীমানায় হরপ্পা-সংস্কৃতির বিচার করা যাবে না, কাজেই হরপ্পা-সংস্কৃতির সমীক্ষা চালাতে হবে সভ্যতাটি ভৌগোলিক প্রেক্ষপটে। যা বিশাল এক ভূখন্ডে ছড়িয়ে রয়েছে- পশ্চিমে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের সুতকাজেন্দর; পুবে ভারতের উত্তরপ্রদেশের মিরাট জেলার আলমগীরপুর; দক্ষিণে মহারাষ্ট্রের আহমদনগর জেলার ধাইমাবাদ; এবং উত্তরে জন্মু এবং কাশ্মীরের আখনুর জেলার মানডা। পুব-পশ্চিমে সব মিলিয়ে ১৬০০ কিলোমিটার। এবং উত্তরদক্ষিণে ১৪০০ কিলোমিটার।

সুবিশাল হরপ্পা সভ্যতা কিভাবে টিকে ছিল?
এই বিষয়টি নিয়ে বরং আজ ভাবা যাক। সভ্যতাটি নির্ভরশীল ছিল কৃষিকাজ এবং ব্যাবসা-বাণিজ্যের ওপর। কৃষিকাজ আবার নির্ভরশীল ছিল উন্নত ধরণের জলসেচ এবং জমির উর্বরতার ওপর। হরপ্পা অঞ্চলের জমি উর্বরই ছিল। এর কারণ সিন্ধু এবং সরস্বতী নদীর বাৎসরিক বন্যা হত এবং বন্যার পর কৃষিজমিতে উর্বর পলির সঞ্চয় হত। উর্বর জমিতে প্রধানত ফলত গম এবং যব। এ ছাড়া ফলত সর্ষে এবং মটর। ফলের মধ্যে ছিল তরমুজ এবং খেজুর। হরপ্পা অঞ্চলে উন্নতমানের তুলাও জন্মাত। এ জন্যই বলা হয়েছে যে- The earliest traces of cotton known anywhere in the world have been found in the Valley.পশ্চিম উপকুলে হত ধানের চাষ। অবশ্য এ তথ্যটি প্রমাণের জন্য প্রত্নতাত্ত্বিকদের হাতে যথেষ্ট উপকরণ পাওয়া যায়নি।



হরপ্পা সভ্যতাটি ছিল মূলত নগর সভ্যতা। আর যে কোনও নগর সভ্যতার পটভূমিতে থাকে ব্যাপক কৃষিকাজ। এতে কিছু মানুষের কৃষিকাজ থেকে অব্যাহতি পায়, তারা ব্যবসা এবং অন্যান্য পেশায় যুক্ত হতে পারে। হরপ্পা নগরগুলির খাদ্যের যোগান কাছাকাছি গ্রামগুলি থেকেই আসত।

কৃষিকাজ ছাড়াও ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল হরপ্পা সভ্যতার টিকে থাকার অন্যতম একটি কারণ। হরপ্পা সভ্যতার নগরগুলি অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের কেন্দ্র ছিল। বাণিজ্য হত দুভাবে। এক. অভ্যন্তরীণ এবং দুই. বৈদেশিক। যদি তাই হয়- তাহলে আমাদের হরপ্পায় কীভাবে পণ্য বহন করা হত তা নিয়ে ভাবতে হবে। এ প্রসঙ্গে উইকিপিডিয়ায় লেখা রয়েছে The IVC (Indus Valley Civilization, আমরা যাকে হরপ্পা সভ্যতা বলছি ) may have been the first civililzation to use wheeled transport. হরপ্পা সভ্যতায় এক ধরনের চাকাওয়ালা পশুটানা গাড়ি ব্যবহার করা হত।



পশুটানা চাকার গাড়ি। হরপ্পায় অনেক মাটির তৈরি খেলনা পাওয়া গিয়েছে। ওসব শিশুদের বিনোদনের জন্য তৈরি করা হত। চাকার গাড়ি টানত উট গাধা এবং ঘোড়া। ঘোড়া নিয়ে অবশ্য বিতর্ক আছে। তবে হরপ্পা সভ্যতার শেষের দিকে ঘোড়ার ব্যবহারের প্রমান মিলেছে । বড় বড় নগরে শস্যভান্ডার ছিল। কেন্দ্রিয় শস্যাগারে এসব গাড়িতে করে শস্য নেওয়া হত।

পণ্য পরিবহনের জন্য চাকার গাড়ি বাদে ছিল নৌকা । নৌকার আকার হত ছোট, তলী সমতল এবং নৌকায় পাল ছিল। সিন্ধু এবং সরস্বতী নদীতে নৌকায়পণ্য পরিবহন করা হত।



খেলনা নৌকা।

ভারতবর্ষে এবং ভারতবর্ষের বাইরে, বিশেষ করে মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে হরপ্পা সভ্যতার ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। ভারতবর্ষে কাশ্মীর, মহীশূর এবং নীলগিরি অঞ্চলের সঙ্গে সর্ম্পকের কথা জানা গেছে। দক্ষিণ ভারত থেকে আনা হত মূল্যবান ধাতু।



সিন্ধুনদীতে নৌকা। (বর্তমান কালের ছবি) এই নদীর পাড়েই ছিল হরপ্পা সভ্যতার মহেনজোদারো নগর। ইতিহাস পাঠের সময় আমাদের চেতনা অনেক সময়ই অতীত এবং বর্তমানের সংযোগ আবিস্কার করে থাকে।

মেসোপটেমিয়ার সুমের-এ হরপ্পা সভ্যতার অনেক সীল প্রত্নতাত্ত্বিকগণ উৎখননের মাধ্যমে আবিস্কার করেছেন। একইভাবে মেসোপটেমিয়ার পাথরের তৈরি সীলমোহর ও মনি-মুক্তার অলঙ্কার হরপ্পা সভ্যতায় পাওয়া গেছে। সম্ভবত সুমের এর সঙ্গে বাণিজ্য পারস্য সাগরীয় উপকূলে বাহারাইনের মধ্য দিয়ে হত। কেননা সেখানে হরপ্পার সীল এবং রুদ্রাক্ষ পাওয়া গিয়েছে।



মেসোপটেমিয়া (বাঁয়ে) এবং হরপ্পা সভ্যতার (ডাইনে) মানচিত্র । ৪৩০০ খ্রিস্টপূর্ব থেকে ৩২০০ খ্রিস্টপূর্বে তাম্রপ্রস্তর যুগে হরপ্পা সভ্যতায় নির্মিত তৈজষপত্রের সঙ্গে দক্ষিণ তুর্কিমিনিস্তান এবং উত্তর ইরানের তৈজষপত্রের সাদৃশ্য রয়েছে। যা স্পষ্টতই দুটি অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। আদি হরপ্পা যুগে (খ্রিস্টপূর্ব ৩২০০ থেকে ২৬০০ ) নির্মিত মৃৎপাত্র, সীল, নারীমূর্তি, অলঙ্কার -এসব মধ্য এশিয়া এবং পারস্য উপত্যকায় পাওয়া গেছে।

অধিকাংশ বর্হিবাণিজ্য স্থলপথে সম্পন্ন হলেও সমুদ্রপথেও বাণিজ্য হত বৈ কী । অবশ্য হরপ্পায় সরাসরি সমুদ্রগামী বাণিজ্যতরীর ধ্বংসাবশেষ পাওয়া না-গেলেও এর পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। হরপ্পা সভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ নগর ছিল ভারতবর্ষের পশ্চিম উপকূলে। সে নগরের নাম লোথাল। বর্তমান গুজরাটের আহমদাবাদেই ছিল প্রাচীন লোথাল । লোথাল - এ খননকার্যের ফলে এক বিশাল খাল আবিস্কৃত হয়েছে যা নৌবন্দরের ইঙ্গিত দেয় । এছাড়া লোথাল নগরে জাহাজ নির্মানের ক্ষেত্রটিও চিহ্নিত করা গিয়েছে।



ভারতবর্ষের মানচিত্রে লোথাল- এর অবস্থান।

হরপ্পা সভ্যতার বাণিজ্যিক সর্ম্পক মিশরের সঙ্গেও গড়ে উঠেছিল। হরপ্পা সভ্যতায় মিশরের সামগ্রী পাওয়া গিয়েছে। তবে এ যোগাযোগ সরাসরি হয়নি। মিশরের পণ্য সুমেরিয় বণিকগণ হরপ্পায় নিয়ে এসেছিলেন। রুশ ইতিহাসবিদ জি এম বোনগার্ড লেভিন মধ্য এশিয়ার সঙ্গে হরপ্পা সভ্যতার সম্পর্ক নিয়ে গবেষনা করেছেন। মধ্য এশিয়ায় খননকার্য চালিয়ে বোঝা গেছে এ অঞ্চলের সঙ্গে হরপ্পা সভ্যতার যোগাযোগ ছিল।



বর্তমান কালের শিল্পীর চোখে সেকালের লোথাল।

হরপ্পা সভ্যতা এবং মেসোপটেমিয়া সভ্যতার বাণিজ্য সম্পর্কে একজন ঐতিহাসিক মন্তব্য করেছেন : Trade with Mesopotamia has been noted, as Indus pottery has been discovered in the ancient city of Tell Asmar Indus Valley civilization was mainly an urban culture sustained by surplus agricultural production and commerce, the latter including trade with Sumer in southern Mesopotamia.



এ ধরণের মৃৎপাত্র পাওয়া গেছে মধ্য এশিয়ায় ...এমন কী পারস্য উপসাগরের তীরে বাহারাইনে

হরপ্পা সভ্যতা যে মিশর ও সুমেরিয় সভ্যতার চেয়ে উন্নত ছিল - ইতিহাসবিদগণ এটি একবাক্যে স্বীকার করেছেন । হরপ্পার মানুষ সে যুগে সুতি কাপড়ের ব্যবহার জানত। তাছাড়া হরপ্পার জনগন অনেক বেশি পরিকল্পিত এবং স্বাস্থসম্মত ভাবে নগর গড়তে সমর্থ হয়েছিলেন। প্রশস্ত এবং আলোবাতাস পূর্ণ ঘরবাড়িতে বাস করত। এরকম বাড়িঘর মিশর বা মেসোপটেমিয়ায় ছিল না। স্নানাগার তৈরি, ড্রেন ব্যবস্থা, পরিকল্পিত রাস্তা, পয়ঃনিস্কাশনের ব্যবস্থা এসব ক্ষেত্রে হরপ্পাবাসী অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করেছে।



হরপ্পার অলঙ্কার। অন্যতম অভ্যন্তরীণ কিংবা বৈদেশিক বাণিজ্যিক পণ্য বলে অনুমান করা যায়।



হরপ্পার কারুশিল্পীদের নির্মিত বালা। এটিও ছিল বাণিজ্যিক পণ্য।

ক্রমশ ...

এর আগের পর্বগুলির লিঙ্ক
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link

ছবি: ইন্টারনেট।

তথ্যসূত্র: শেষ কিস্তিতে সংযুক্ত করা হবে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29527600 http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29527600 2012-01-23 10:23:24
বেঁচে থাকো রাষ্ট্রহীন বেঁচে থাকো রাষ্ট্রহীন পাখির মতন;
নীলাভ শূন্যতায় হোক তোমার উড়াল।

তোমাকে রক্তাক্ত করে সীমান্তের হিংস্র আক্রোশ!
অদ্ভুত এক মানচিত্রের লোক তুমি হে,
যে মানচিত্র আজও তার গন্ডী চেনে নি !

বেঁচে থাকো রাষ্ট্রহীন,
বেঁচে থাকো রাষ্ট্রহীন বাউলের মতন;
মানুষ-ভজন হোক তোমার সাধন।

আমরাও শহরের কিছু দলছুট লোক;
যূথবদ্ধ আদিম জীবনে ফিরে যাব বলে
রাষ্ট্রহীন জীবনের লক্ষ্যে দীর্ঘকাল হল দীক্ষা নিয়েছি;
তাই-
তোমাকে আমাদের আজ বড় প্রয়োজন হে।
আমরা আসছি।
ততদিন-
বেঁচে থাকো রাষ্ট্রহীন,
বেঁচে থাকো সম্পূর্ণ স্বাধীন।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29526973 http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29526973 2012-01-22 11:59:58
জীবনানন্দের বিয়ের গল্পটা ‘অশ্বত্থের পাতাগুলো পড়ে আছে ম্লান শাদা ধুলোর ভিতর/ এ পথ ছেড়ে দিয়ে এ-জীবন কোনোখানে গেল নাকো তাই।’ (রূপসী বাংলা) ... যে কবি এ লাইন কয়টি লিখেছেন তাঁর উষ্ণ আর আবেগী হৃদয়ের গড়নটি ঠিক কেমন হতে পারে, বাংলার প্রতি সে কবির ভালোবাসা কতটা প্রগাঢ় হতে পারে, নিবিড় হতে পারে। দীর্ঘদিন হল আমি জীবনানন্দের প্রকৃতিপ্রেমের গভীরতা নিয়ে ভেবে ভেবে একরকম আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছি। রূসপী বাংলার প্রতি এই নিগূঢ় প্রেমের জন্যই আজও জীবনানন্দের অধিষ্ঠান বাঙালিহৃদয়ের অথই গহীনে। বাংলার প্রতি কবির এ অন্তহীন মমত্ববোধ আমাদের সহৃদয় বাঙালি হৃদয়কে আর্দ্র করে তোলে। সেই সঙ্গে কবির প্রতি আমাদের মনে সৃষ্টি হয় গভীর এক কৌতূহল । এই কৌতূহল থেকেই জীবনানন্দের জীবনের নানা দিক সম্বন্ধে লিখছি। বলছি।
আজ বলব জীবনানন্দের বিয়ের গল্পটা ।
পড়াশোনার পালা চুকিয়ে কলকাতার সিটি কলেজে পড়াতে ঢুকেছিলেন জীবনানন্দ। অবশ্য ১৯২৮ সালের মাঝামাঝি চাকরি হারান তিনি। (সে এক মহা বিতর্কিত অধ্যায়; এ নিয়ে পরে বিস্তারিত লিখবার আশা রইল।) ... সে যা হোক। এর পর জীবনানন্দ খুলনার বাগেরহাটের প্রফুল্লচন্দ্র কলেজে চাকরি পেলেও সে কলেজে মাস কয়েক- এর বেশি পড়ান নি। এর পর জীবনানন্দ চাকরি পান দিল্লির রামযশ কলেজে। সে কলেজের উপাধক্ষ ছিলেন সুকুমার দত্ত। ইনি বরিশালেরই মানুষ এবং বরিশালের অশ্বিনীকুমার দত্তের ভাইয়ের ছেলে। উল্লেখ্য, ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে অশ্বিনীকুমার দত্ত বরিশাল শহরে ব্রজমোহন ইনষ্টিটিউশন নামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন-যে স্কুলে জীবনানন্দের বাবা সত্যানন্দ দাশ পড়াতেন।
এটুকু ভূমিকার পর এবার পাত্রীপক্ষের কথা পাড়ি খানিকটা।
বিয়ের আগে জীবনানন্দের স্ত্রীর নাম ছিল লাবণ্যবালা গুপ্ত। বিয়ের পর থেকে অবশ্য লাবণ্য দাশ। লাবণ্যবালা জন্মেছিলেন সেনহাটিতে। খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটি ইউনিয়ন কি? আমি কিন্তু নিশ্চিন্ত নই। ... সে যাই হোক। লাবণ্যবালার বাবার নাম ছিল রোহিণীকুমার গুপ্ত। ইনি হিন্দু হলেও এঁর দুই ভাই অমৃতলাল এবং বিহারীলাল ছিলেন ব্রাহ্ম। এঁদের মধ্যে অমৃতলাল ছিলেন ঢাকায় পূর্ব বাংলা ব্রাহ্মসমাজের প্রচারক। ইনি আমাদের এই এক অন্যতম চরিত্র।
লাবণ্যবালা বালিকাবেলায় মাত্র চার মাসের ব্যবধানে মা-বাবা দুজনকেই হারিয়েছিলেন। বালিকার বয়স তখন মাত্র ৭। ভাইয়ের মেয়ের দায়িত্ব নিলেন অমৃতলাল । ভারি রূপসী বালিকা। তবে পড়াশোনাতেও মাথা বেশ পরিস্কার। স্কুলের পালা চুকিয়ে ঢাকার ইডেন কলেজে আই য়ে ক্লাসে ভর্তি হল, স্বদেশী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ি পড়ি অবস্থা, ঠিক তখনই বিয়ের বাদ্যি বেজে উঠল ...
এবার জীবনানন্দের দিল্লির জীবন কথা।
জীবনানন্দ ১৯২৯ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৩০ সালের মার্চ মাস অবধি দিল্লিতে ছিলেন। রামযশ কলেজটি ছিল দিল্লির উপকন্ঠে; জায়গাটির নাম কালাপাহাড়। জীবনানন্দের ভাষায়: উষর, জলহীন আর পাহাড়ি। জীবনানন্দ দিল্লিতে বড় একাকী ও অসুখী বোধ করতেন। এ কথা বলেছেন রামযশ কলেজেরই এক শিক্ষক- কবির বাঙালি কলিগ প্রভাসচন্দ্র ঘোষ। দিল্লিতে জীবনানন্দের অবশ্য একজন দেশিবন্ধু ছিল । বরিশালের এই বন্ধুটিও ব্রাহ্ম। নাম-সুধীরকুমার দত্ত। ... এখানেই বলে রাখি যে জীবনানন্দের পিতামহ সর্বানন্দ দাশ ছিলেন বিক্রমপুরের লোক এবং তিনি ছিলেন ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী। সর্বানন্দ দাশ ‘কার্যোপলক্ষে’ বিক্রমপুর থেকে বরিশাল শহরে এসেছিলেন। সর্বানন্দ দাশ সরকারি চাকরি করতেন। বরিশাল শহরে এসে তিনি নব্য ভাবধারায় উজ্জীবিত হন, অর্থাৎ ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হন। ১৮৬১ সালে বরিশালের ব্রাহ্মসমাজটির প্রতিষ্ঠায় সর্বানন্দ দাশ প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেছিলেন । এর আগে অবশ্য কলকাতায় ব্রাহ্মসমাজটি গঠিত হয় উনিশ শতকের গোড়ার দিকে । হিন্দু ধর্মের প্রতি ইউরোপীয় মিশনারিদের সমালোচনার প্রতিক্রিয়া হিসেবেই বহু ঈশ্বরবাদ পরিত্যাগ করে ব্রাহ্মরা উপনিষদের নিরাকার ঈশ্বরে ভজনা করতে থাকে । যদিও ব্রাহ্মদের অনেক আচার খ্রিষ্টধর্মের মতোই ছিল, তবে ব্রাহ্মদের অনেক আচার আবার হিন্দু ধর্মগ্রন্থ সমর্থিত ছিল। ব্রাহ্মধর্মটি ছিল মূলত উনিশ শতকের ধর্মীয় ও সামাজিক আন্দোলন। কুড়ি শতকে ব্রাহ্মদের ‘নীতিবাগীশ’ বলে ভাবা হত। ব্রাহ্ম শব্দটির বিকৃত রূপ ‘বেম্ম’ বলতে বোঝাত নৈতিক বিশুদ্ধতা।
সে যাই হোক। দিল্লিতে সুধীরকুমার দত্ত এবং জীবনানন্দ রোজ সন্ধ্যায় নিয়মিত দেখা করতেন। কখনও জীবনানন্দ সুধীরকুমার কে রামযশ কলেজের ক্লাবে নিয়ে যেতেন। সুধীরকুমার সম্বন্ধে জীবনানন্দ লিখেছেন:

ডিসেম্বর মাস, দিল্লীতে তখন গভীর শীত -পাহাড়ে আরো শীত ...সমস্ত অসুবিধা অগ্রাহ্য করিয়া সে (সুধীরকুমার দত্ত) এই বিমর্ষ পাহাড়ে আমার সঙ্গে আসিয়া থাকিতে লাগিল।

দিল্লির ওই প্রচন্ড শীতই সম্ভবত ত্রিশ বছরের এক অনুভূতিময় যুবকের রক্তে নারীর সান্নিধ্য-তৃষ্ণা জাগিয়ে তুলেছিল। বাংলায় ফিরে বিয়ে করে রামযশ কলেজে ফিরে আসবার পরিকল্পনা করছিলেন জীবনানন্দ। চাকরির মেয়াদ বাড়ানো এবং ছুটি মঞ্জুরের জন্য কলেজের অধ্যক্ষ কে সুপারিশ করার জন্য তিনি সহকর্মীদের অনুরোধ করেন। বেরসিক অধ্যক্ষ সে অনুরোধ প্রত্যাখান করেন। চার মাসের মাথায় জীবনানন্দের চাকরির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়!
আমি যে সময়টার কথা বলছি সে সময়টা ছিল স্বদেশী আন্দোলনের বারুদগন্ধ মেশানো এক উত্তাল সময়। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী সর্বাত্মক আন্দোলনের প্রস্তুতি চলছিল। কাজেই লাবণ্যবালার জেঠা অমৃতলাল বড় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন তাঁর ভাইঝিটি না- আবার এইসব রাজনৈতিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে-এই ভেবে । ঢাকার ইডেন কলেজে আই এ পড়ার সময় লাবণ্যবলা সত্যি সত্যিই স্বদেশী রাজনীতির প্রতি কিছুটা ঝুঁকে পড়েছিলেন। আমি ১৯৩০ সালের কথা লিখছি। ওই সময়ই মাষ্টারদা সূর্যসেন-এর নেতৃত্বে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এবং কল্পনা দত্ত চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের পরিকল্পনা করছেন। ১৯৩০ সালের ঢাকার গুমোট বাতাসে সে আশঙ্কাই ঘুরপাক খাচ্ছিল। জ্যাঠামশাই অমৃতলাল ভাইঝির অর্ন্তগত টানটান উত্তেজনা ঠিকই টের পেয়েছিলেন।
ব্রাহ্ম ধর্মের প্রচারক হওয়ায় অমৃতলাল জীবনানন্দর বাবা-মা সত্যানন্দ দাশ এবং কুসুমকুমারী দাশকে চিনতেন। তিনি তাঁদের প্রভাষক ছেলের সঙ্গে তাঁর ভাইঝির বিয়ের প্রস্তাব দেন। সত্যানন্দ দাশ এবং কুসুমকুমারী দাশ এতে সম্মত হন এবং ছেলেকে দিল্লি থেকে ডেকে পাঠান। অবশ্য তাঁরাও বসে ছিলেন না। ছেলের জন্য পাত্রী দেখছিলেন। ছেলেকে ব্যারিষ্টারি পড়াবে এমন এক ধনাঢ্য পরিবারের সঙ্গে জীবনানন্দের বিয়ের প্রাথমিক কথাবার্তাও চলছিল।
এদিকে অমৃতলাল গোপনে কনে দেখার আয়োজন করতে থাকেন । পাত্রর একবার মা-বাবার পছন্দ করা মেয়েকে দেখাই রীতি। সেই দিনক্ষণও নির্ধারণ করা হল। দিল্লির রামযশ কলেজের এক তরুণ প্রভাষক ঢাকার অমৃতলালের বাসায় লাবণ্যবালাকে দেখতে আসবেন। এসব কথা অবশ্য লাবণ্যবালা জানতেও পারলেন না।
লাবণ্যবালা থাকতেন ঢাকারই এক ছাত্রীনিবাসে। কনে দেখার দিন অমৃতলাল ভাইঝিকে ডেকে পাঠালেন। সেদিনের কথা পরবর্তীকালে লাবণ্যবালা স্মরণ করেছিলেন। ছাত্রীনিবাস আর তাঁর জ্যাঠামশায়ের বাড়ির মাঝখানে ছিল একটা মাঠ। বর্ষাকাল। বৃষ্টি হওয়ায় মাঠে কাদা জমেছিল। সেদিন লাবণ্যবালার পরনে ছিল নকশি পাড়ের একটি সাধারণ সুতি শাড়ি। মাঠ পেরোনোর সময় শাড়িতে কাদার ছিটে লাগল।
বাড়িতে পৌঁছনোর পর অমৃতলাল ভাইঝিকে বললেন, বাসায় একজন অতিথি এসেছেন, যা, ওঁর জন্য চা-নাশতা বানিয়ে নিয়ে আয়।
লাবণ্যবালা রান্নাঘরে ঢুকলেন। চা তো বুঝলাম। কিন্তু লাবণ্যবালা কি নাশতা বানিয়েছিলেন সেদিন ? মানে ১৯৩০ সালে ঢাকার বাঙালি মধ্যবিত্ত ঘরে অতিথি এলে কি নাশতা বানাতো ? তাছাড়া ব্রাহ্মপরিবারের রান্নাবান্নার কি কোনও তফাৎ ছিল?
সে যাই হোক। লাবণ্যবালা নাশতা বানাচ্ছেন। ধরা যাক লুচি আর পায়েস। পরনে সুতি শাড়ি। সে শাড়িতে আবার কাদার দাগ। যা হোক। একটু পর বসবার ঘরে নাশতা নিয়ে ঢুকলেন। দিনটি মেঘলা ছিল কি? বেতের সোফায় একজন মাত্র অতিথি বসে । তো, সে অতিথি কেমন দেখতে ছিল? বহু বছর পর এক স্বাক্ষাৎকারে পশ্চিমবাংলার কবি কবিতা সিংহকে লাবণ্যবালা বলেছিলেন: বসবার ঘরে লোকটা ছিল ২৮-২৯ বছরের সাধারণ ধুতি-পাঞ্জাবি পরা মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকা কালো রঙের এক লোক।
কিন্তু কি ভাবছিলেন জীবনানন্দ?
তিনি যাই ভাবুন না কেন- জীবনানন্দের ইডেন কলেজের ছাত্রীটিতে তাঁর ভালো লেগেছিল। তিনি সেই ধনী পরিবারে বিয়ে করেন নি: ব্যারিষ্টারি পড়তে বিলেতেও যান নি ।
অমৃতলাল আর লুকালেন না। ভাইঝিকে এবার সব খুলে বললেন ।
বিয়ে! সে কী! সে কেমন করে হয়! লাবণ্যবালার ফরসা মুখখানি আরক্ত হয়ে উঠল মুহূর্তেই । বিয়ের চেয়ে বিপ্লবীর জীবন বেশি রোমাঞ্চকর নয় কি?
কেন তোর বুঝি বিয়ের বয়স হয়নি? অমৃতলালের প্রশ্নে মৃদু শ্লেষ।
লাবণ্য গুম মেরে যান। মা-বাবা মরা মেয়েকে বুকে ধরে মানুষ করেছেন যে সিংহহৃদয় মানুষটি তাঁর মুখের ওপর কথা শুনিয়ে দেওয়া অত সহজ নয়। হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
বিয়ে হল ঢাকায়।
তারিখ: ১৯৩০ সালের ৯ মে। স্থান : ঢাকার ব্রাহ্মমন্দির।

আমার অনেক সৌভাগ্য যে আমি গত শতকের আশির দশকের শেষে আমার এক বন্ধুর সঙ্গে আমি ওই বাড়িতে গিয়েছিলাম । পুরনো আমলের রংহীন লোহার রেলিংওলা দোতলা বাড়ি। ওটাই যে ব্রাহ্মমন্দির, তখন সেভাবে আমি উপলব্দি করিনি। ওই সময়ে জীবনানন্দও আমাকে তেমন গভীরভাবে রেখাপাত করেনি। তবে পরবর্তীকালে অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ব্রাহ্মদের নিয়ে বিস্তারিত জানবার সুযোগ হয়েছিল আমার এবং ওই সময় থেকেই জীবনানন্দ আমায় আচ্ছন্ন করতে থাকে । সে যাই হোক। পুরনো ঢাকার ওই ব্রাহ্মমন্দিরে আমার কিছু দেবতূল্য মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, যাঁদের উষ্ণ আতিথেয়তা এবং আন্তরিক আচরণ আজও আমার গহন সুখের স্মৃতি হয়ে রয়েছে।

ব্রাহ্মরীতিতে বিয়ে পরিচালনা করেন জীবনানন্দের পিসেমশাই (ফুপা) মনমোহন চক্রবর্তী। এঁর সম্বন্ধে এবার কিছু কথা বলে নিই। তাহলে জীবনানন্দের পরিপার্শ্বের ছবিটা আরও উজ্জ্বল হবে। জীবনানন্দের বাবা সত্যানন্দ দাশও লেখালেখি করতেন। কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘মুকুল’ পত্রিকায় লিখতেন সত্যানন্দ দাশ । সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই সম্ভবত তিনি বরিশাল থেকে একটি পত্রিকা সম্পাদনায় উদ্যেগী হয়েছিলেন ১৯০০ সালে। জীবনানন্দ দাশ সে সময় দু বছরের শিশু। সত্যানন্দ দাশ ব্রাহ্মসমাজের মুখপাত্র হিসেবে ব্রহ্মবাদী নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করতে শুরু করেন। পত্রিকা সম্পাদনায় তাঁকে সাহায্য করতেন তাঁর ভগ্নিপতি মনমোহন চক্রবর্তী। পত্রিকাটির প্রথম দিকের বেশ কিছু কবিতা মনমোহন চক্রবর্তীরই রচনা; (জীবনানন্দের শৈশবের পরিমন্ডলের কথা ভেবে বিস্মিত হতেই হয়) তবে ব্রহ্মবাদী পত্রিকার অনেক কবিতাই লিখেছেন জীবনানন্দের মা কুসুমকুমারী দাশ । সব মিলিয়ে শ’ খানেক। কিন্তু, শ’ খানেক কবিতা কীভাবে রচিত হল? সংসারে নানান কাজ ছিল, জটিলতাও কম ছিল না। সে সম্বন্ধে জীবনানন্দ লিখেছেন,‘ (মা) সংসারের নানা কাজকর্মে খুবই ব্যস্ত আছেন ...এমন সময়ে ব্রহ্মবাদীর সম্পাদক আচার্য মনমোহন চক্রবর্তী এসে বললেন, এক্ষুনি ব্রহ্মবাদীর জন্য তোমার কবিতা চাই, প্রেসে পাঠাতে হবে। লোকে দাঁড়িয়ে আছে। শুনে মা খাতা কলম নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে একহাতে খুন্তি আর একহাতে কলম নাড়ছেন দেখা যেত, যেন চিঠি লিখছেন, বড়ো একটা ঠেকছে না কোথাও; আচার্য চক্রবর্তী কে প্রায় তখনই কবিতা দিয়ে দিলেন।’ (‘আমার মা বাবা’ ) পরবর্তীকালে মনমোহন চক্রবর্তী এলাহাবাদ বদলী হয়ে যান। ওখান থেকে বের করেন বিখ্যাত প্রবাসী পত্রিকা । এতেও জীবনানন্দের মায়ের কিছু কবিতা প্রকাশিত হয়।
জীবনানন্দের বিয়েতে কবি বুদ্ধদেব বসু নেমতন্ন পেয়েছিলেন। তার কারণ ছিল। ১৯২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কলকাতা থেকে প্রকাশিত কল্লোল পত্রিকায় জীবনানন্দের একটি কবিতা ছাপা হয়েছিল। সে কবিতার নাম ‘নীলিমা’। কবিতার শুরুটা এরকম:

রৌদ্র ঝিলমিল, ঊষার আকাশ, মধ্যনিশীথের নীল, অপার ঐশ্বর্যবেশে দেখা তুমি দাও বারেবারে নিঃসহায় নগরীর কারাগার-প্রাচীরের পারে।

বুদ্ধদেব বসুর তখন ১৭ বছর বয়েস। পড়তেন ঢাকার একটি কলেজে। নীলিমা পাঠে মুগ্ধ হয়েছিলেন কিশোর বুদ্ধদেব । পরবর্তীকালে জীবনানন্দর প্রতিভাকে তুলে ধরতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন তিনি। জীবনানন্দের কবিতার প্রতি যখন সাড়া মিলছিল না তখন তাঁরই সম্পাদিত ‘প্রগতি’ পত্রিকায় বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন, ‘তাঁর কবিতা একটু ধীরে -সুস্থে পড়তে হয়, আস্তে আস্তে বুঝতে হয়।’ এসবই জীবনানন্দের বিয়েতে কবি বুদ্ধদেব বসুর নেমতন্ন পাওয়ার কারণ বলে অনুমান করি !
যা হোক। বিয়ের কয়েকদিন পর নববিবাহিত দম্পতি লঞ্চে করে বরিশালে পৌঁছান। বরিশালে বগুড়া ও গোরস্তান রোডের মোড়ে ‘সর্বানন্দ ভবন’। টিন সেডের সাদাসিদে বাড়ি। মে মাসের চৌদ্দ তারিখে বৌভাত সে বাড়িতেই হয়েছিল।
ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক ক্যারিয়ার তো বটেই বিয়ের পর লাবণ্য দাশ- এর পড়াশোনায় ছেদ পড়ে। বিয়ের এক বছরের মাথায় অর্থাৎ ১৯৩১ সালে বড় মেয়ে মঞ্জুশ্রীর জন্ম হয়। এরপর লাবণ্য দাশ ১৯৩৫ সালে বরিশালের বি.এম কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এই সংবাদ ব্রহ্মবাদী পত্রিকার ১৩৪২ অব্দের আষাঢ় সংখ্যায় বেরিয়েছিল ‘মহিলাদের কৃতিত্ব’ শিরোনামে।

ব্রাহ্মসমাজের শ্রীযুক্ত সত্যানন্দ দাস বি,এ মহাশয়ের পুত্রবধূ অধ্যাপক জীবনানন্দ দাশের পত্নী শ্রীমতী লাবণ্যবালা একটি পাঁচ বৎসরের শিশুকন্যার মা হইয়া আই, এ পাস করিয়ে এবার বি,এম, কলেজ হইতে বি,এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়াছেন।

১৯৩৮ সালে লাবণ্য দাশ এক ছেলেরও মা হন। জীবনানন্দের বড় ছেলের নাম সমরানন্দ ।
বিয়ের পর জীবনানন্দ আর দিল্লি ফিরে যাননি।
কেন?
কারণ বাংলা তাঁকে টানছিল। অত্যন্ত গভীরভাবে। সনেট লিখে সে অনুভূতি প্রকাশ করছিলেন জীবনানন্দ। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ফকরুল আলম লিখেছেন, 1934: Composes Ruposhi Bangla (Beautiful Bengal) poems, even though theses too will be published after his death. দিল্লিতে আর ফিরে না যাওয়ার কারণটিও তিনি আমাদের একটি সনেটের শেষে জানিয়ে দিয়েছেন এভাবে-

‘অশ্বত্থের পাতাগুলো পড়ে আছে ম্লান শাদা ধুলোর ভিতর/ এ পথ ছেড়ে দিয়ে এ-জীবন কোনোখানে গেল নাকো তাই।’ (রূপসী বাংলা)

তথ্যসূত্র:

এই পোস্টটির অধিকাংশ তথ্যই টুকেছি মার্কিন গবেষক ক্লিন্টন বি সিলি-র লেখা 'আ পোয়েট অ্যাপার্ট' (অনন্য জীবনানন্দ) থেকে। বইটির অনুবাদক ফারুক মঈনউদ্দীন যে বই সম্বন্ধে লিখেছেন: মার্কিন গবেষক ক্লিন্টন বি সিলি ষাটের দশকে দুই বছর বরিশালে ছিলেন। কিন্তু তখনো জীবনানন্দ দাশের কবিতার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটেনি, পরিচয় ঘটে নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার পর। এই কবি সর্ম্পকে তাঁর গভীর গবেষণালব্দ তথ্য ও অন্তর্দৃষ্টিময় বিশ্লেষণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত হয় আ পোয়েট অ্যাপার্ট । যা জীবনানন্দ দাশের জীবন ও কবিতা সর্ম্পকে অপরিহার্য একটি বই। ...এই পোস্টটি লিখতে আরেকটি বই কাজে দিয়েছে; সেটি Fakrul Alam; এর Jibanananda Das Selected Poems with an Introduction , Chronology, and Glossary
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29526206 http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29526206 2012-01-21 11:02:30
হরপ্পা সভ্যতা (চতুর্থ পর্ব) হরপ্পা সভ্যতা নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে লিখছি। সভ্যতাটির ভূমিকা হিসেবে প্রথম পর্বে লিখেছি যে- হরপ্পা সভ্যতা ভারতবর্ষের প্রাচীনতম সভ্যতা । এবং হরপ্পা সভ্যতার আবিস্কার একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কেননা, এই আবিস্কারের পূর্বে মনে করা হত যে ভারতের ইতিহাসের সূচনা আর্যদের ভারতবর্ষে আসার পর থেকে । আজ আর এ কথার কোনও ভিত্তি নেই। হরপ্পা সভ্যতা আবিস্কারের পর ভারতীয় সংস্কৃতির প্রাচীনত্ব এবং মৌলিকত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছে। অন্তত পাঁচ হাজার বছরের পরনো হরপ্পা সভ্যতাটি প্রাচীনত্বের দিক থেকে মিশর-ব্যাবিলন আসিরিয়ার সমকক্ষতা অর্জন করেছে। সে যাই হোক। প্রাগৈতিহাসিক ভারতবর্ষে সিন্ধু নদের অববাহিকায় হরপ্পা সভ্যতা গড়ে ওঠার সুনির্দিষ্ট কারণ ছিল। মাঠ পর্যায়ে গবেষনা করে প্রত্নতাত্ত্বিকগণ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, নবোপলীয়, অর্থাৎ নব্যপ্রস্তর যুগে খাদ্য ও ঘাসের অভাব দেখা দিয়েছিল। নিজেদের এবং পশুদের খাদ্য যোগানোর জন্য নদীর তীরই ছিল উপযুক্ত জায়গা। কাজেই ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ নদীর তীরে বসতি গড়তে থাকে। ঐতিহাসিকদের মতে হরপ্পা সভ্যতার কালসীমা খ্রিস্টপূর্ব ২২০০ থেকে ১৭০০। মিশর কিংবা মেসোপটেমিয় সভ্যতার তুলনায় হরপ্পা-সংস্কৃতি সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান সীমিত। এর প্রধান কারণ লিখিত দলিলের অভাব। প্রায় হাজার দুয়েক সীল পাওয়া গেলেও সেগুলির পাঠোদ্ধার হয়নি। প্রতœতাত্ত্বিক উৎখননের (archaeological excavation) ফলে যে তথ্য পাওয়া গিয়েছে তারই ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। অবশ্য এই খননকার্যও মহেনজোদারোয় ভূগর্ভস্থ কয়েকটি স্তর জলমগ্ন থাকায় পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। সুবিশাল হরপ্পা সংস্কৃতির আয়তন সব মিলিয়ে ১২,৫০,০০০ বর্গ কিলোমিটার ।এ প্রসঙ্গে একজন ভারতীয় ঐতিহাসিক লিখেছেন: The totalgeographical area over which this civilization flourished is more than 20 times of the area of Egyptian and more than 12 times of the area of Egyptian and Mesopotamian civilizations combined.



হরপ্পা সভ্যতার মানচিত্র।১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় সিন্ধু অঞ্চলে সব মিলিয়ে চল্লিশটির মতন প্রতœক্ষেত্র আবিস্কার হয়েছিল। এর পর গত ৫০/৬০ বছরে সব মিলিয়ে ১৪০০ প্রাচীন বসতি আবিস্কৃত হয়। এর মধ্যে ৯২৫ টি ভারতে; এবং ৪৭৫ টি পাকিস্তানে। কাজেই বর্তমানকালের রাজনৈতিক সীমানায় হরপ্পা-সংস্কৃতির বিচার করা যাবে না, কাজেই হরপ্পা-সংস্কৃতির সমীক্ষা চালাতে হবে সভ্যতাটি ভৌগোলিক প্রেক্ষপটে। যা বিশাল এক ভূখন্ডে ছড়িয়ে রয়েছে- পশ্চিমে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের সুতকাজেন্দর; পুবে ভারতের উত্তরপ্রদেশের মিরাট জেলার আলমগীরপুর; দক্ষিণে মহারাষ্ট্রের আহমদনগর জেলার ধাইমাবাদ; এবং উত্তরে জন্মু এবং কাশ্মীরের আখনুর জেলার মানডা। পুব-পশ্চিমে সব মিলিয়ে ১৬০০ কিলোমিটার। এবং উত্তরদক্ষিণে ১৪০০ কিলোমিটার।

এই চতুর্থ পর্বের আলোচনা হরপ্পা সভ্যতার ধর্ম। অনেকেই হরপ্পা ধর্মের সঙ্গে আজকের দিনের হিন্দুধর্ম অর্থাৎ Hinduism -এর মধ্যে একটা সর্ম্পক খোঁজেন। যে কারণে উইকিপিডিয়ার প্রবন্ধকার লিখেছেন,The religion of Hinduism probably has its roots in the Indus Valley civilisation.তবে অনেকে আবার এই সম্পর্ক অস্বীকার করেন। বিখ্যাত ঐতিহাসিক John Keays এঁদের অন্যতম। তিনি লিখেছেন :"The religion of Harappans is unknown. No site has certainly been identified as a temple and most suppositions about sacrificial fires, cult objects and deities rest on doubtful retrospective references from Hindu practices of many centuries later. Such inferences may be as futile as, say, looking to Islamic astronomy for an explanation of the orientation of the pyramids. In short, these theories are all fanciful and do not bear scrutiny. এর মানে হরপ্পার ধর্মটির স্বরূপ অজানা। এ সভ্যতার প্রত্নক্ষেত্রে উপাসনাগৃহ কিংবা অগ্নিবেদি কিংবা তেমন পূজ্যবস্তু পাওয়া যায়নি। যা থেকে পরবর্তীকালের হিন্দুধর্ম সঙ্গে হরপ্পা ধর্মের একটি যোগসূত্র আবিস্কার করা যায়। নিশ্চয় আমরা ইসলামি জ্যোর্তিবিদ্যা ব্যাখ্যা করার জন্য পিরামিডের নির্মিতির মধ্যে যোগসূত্র খুঁজতে পারি না। যে কারণে হরপ্পার ধর্মটির সঙ্গে বর্তমান ভারতীয় ধর্মের শিকড় খোঁজা অর্থহীন ।
দেখা যাক এই ঐতিহাসিকের মন্তব্যে কোন সত্যতা আছে কি না। অন্য কথায় এই পন্ডিতের যুক্তি খন্ডনের জন্যই এই পোস্ট!




হরপ্পা সভ্যতা সম্বন্ধে প্রথম কথাই হল সভ্যতাটি ছিল নগর সভ্যতা ...

গত পর্ব থেকে আমরা জেনেছি যে হরপ্পা সভ্যতাটি ছিল নগর সভ্যতা। আর যে কোনও নগর সভ্যতার পটভূমিতেই থাকে ব্যাপক কৃষিজমি। এতে কিছু মানুষ কৃষিকাজ থেকে অব্যাহতি পায়, তাতে তারা ব্যবসা এবং অন্যান্য কারিগরি পেশায় যুক্ত হতে পারে। যে কোনও সভ্যতার উত্থানের অন্যতম শর্তই হল এটি। হরপ্পা নগরগুলির খাদ্যের যোগান কাছাকাছি গ্রামগুলি থেকেই আসত। (এ বিষয়ে আমরা গত পর্বগুলিতে আলোচনা করেছি) । আজকের দিনের মতোই আয়-রুজির জন্য হরপ্পা নগরের অধিবাসীদের একটা বড় অংশ আসত গ্রাম থেকে । এবং এই অনুমান করা অসংগত নয় যে এদের ধর্মীয় চেতনায় গ্রামীন কৃষিজীবিদের ধ্যানধারণাই প্রবল ছিল। যা বর্তমান যুগের নগরবাসীদের মধ্যেও লক্ষ্য করা যায়। এ কারণেই হরপ্পার ধর্মে কৃষিজীবি সমাজের বহুল প্রচলিত মাতৃদেবীর প্রাধান্যই বেশি। হরপ্পা সভ্যতার ধর্মকে বোঝার এটিই মূলসূত্র। যা ঐতিহাসিক John Keays উপলব্দি করতে পারেন নি।



মহেনজোদারোয় প্রাপ্ত পুরোহিত -রাজার মূর্তি। প্রাচীন সভ্যতার রাজা মাত্রই পুরোহিতের ভূমিকা পালন করত। এ সময়ে মাদার গডেস অপসারিত না হলেও মাদার গডেসের পাশাপাশি পুরুষ দেবতার উত্থান ঘটে। হরপ্পা সভ্যতায় তাই হয়েছিল। দেবতা শিব- এর প্রাথমিক ধারণাটি আমরা হরপ্পাসভ্যতায় দেখি। ঐতিহাসিক John Keays এটি উপলব্দি করতে পারেননি!

হরপ্পা নগর থেকে যেসব মাতৃমূর্তি পাওয়া গেছে সেসব মূর্তি ছিল রংহীন। (হরপ্পা সভ্যতার সঙ্গে মিশর ও মেসোপটেমিয়ার সভ্যতার সংযোগ ছিল।অবশ্য এসব সভ্যতার মাতৃমূর্তি রংহীন ছিল না। আবার মহেনজোদারোর মাতৃমূর্তি গুলোর বেশির ভাগই ছিল লাল রঙে মাখানো।) হরপ্পায় প্রাপ্ত মাতৃদেবীদের মস্তকাবরণ আছে, কোনও কোনও ক্ষেত্রে তা দেওয়া হয়েছে পিছন দিক থেকে, কোনও কোনও ক্ষেত্রে সোজাসুজি মাথার উপর থেকে। দেবী প্রায় নগ্ন হলেও দেবীর কোমরে জড়ানো ছোট একটা আবরণ আছে। আর আছে শরীরময় অলঙ্কারের বাহুল্য। কিছু কিছু মাতৃমূর্তি অবশ্য আবক্ষ নয়, অর্থাৎ আংশিক নয়;এদের হাত-পা আছে এবং এরা নানারকম ভঙ্গিতে গঠিত।



হরপ্পা সভ্যতার মাতৃমূর্তি। এই মাতৃদেবীর গুণাবলী আত্মস্থ করে পরবর্তী কালে ভারতবর্ষে বহু দেবীর উত্থান ঘটেছে। ঐতিহাসিক John Keays এটি উপলব্দি করতে পারেননি!

কোনও কোনও ঐতিহাসিক হরপ্পার এই মাতৃমূর্তির সঙ্গে পশ্চিম এশিয়ার বিখ্যাত মাতৃদেবীদের সম্পর্ক রয়েছে বলে দাবি করছেন। মেসোপটেমিয়া সভ্যতার উর, নিনেভ, লাগাস, আক্কাদ এবং ব্যাবিলন প্রভৃতি নগরের মাতৃদেবীর মূলে ছিল সুমেরিয় মাতৃদেবীর কল্পনা এবং আরাধনা। ঠিক একই ভাবে হরপ্পার এই মাতৃদেবীর গুণাবলী আত্মস্থ করে পরবর্তী কালে ভারতবর্ষে বহু দেবীর উত্থান ঘটেছে। হরপ্পায় একটি সীল পাওয়া গিয়েছে, যে সীলে একটি নগ্ন দেবীমূর্তি রয়েছে, যে দেবীর যোনিপ্রদেশ থেকে একটি চারা উত্থিত হয়েছে। অনেক ঐতিহাসিকেরই ধারণা এটি ভারতীয় পুরাণকথিত শাকম্ভরী কল্পনার একটি প্রাথমিক পর্যায়। অন্য একটি সীলে একটি পিপুল গাছের দুই শাখার মাঝখানে মাতৃভূমি রয়েছে। কাজেই The religion of Harappans is unknown. এমন অগভীর সিদ্ধান্ত ঐতিহাসিক John Keays কিভাবে নিলেন?



হরপ্পা সভ্যতার ষাঁড়ের ছবি আঁকা প্রচুর সীল পাওয়া গিয়েছে।

অন্য আর দশটা সুপ্রাচীন সভ্যতার মতোই হরপ্পার ধর্মটিও বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে ছিল বহু ঈশ্বরবাদী । কাজেই সেটি কেবলই দেবী উপাসনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। দেবী-দেবী ছাড়াও হরপ্পায় বৃক্ষ এবং এবং পশু-উপাসনার প্রচলন ছিল বলে মনে হয়। গাছের মধ্যে হরপ্পাবাসী পিপুল এবং নিম গাছ পূজা করত। (আজও বাংলায় গাছপূজা করে।বাংলার প্রাচীন রক্তে মিশে রয়েছে দ্রাবিড় রক্ত আর হরপ্পা সভ্যতা তো দ্রাবিড়দেরই কীর্তি) আর হরপ্পায় উপাস্য পশুর মধ্যে যাঁড়ই ছিল অন্যতম। (গরু আজও ভারতীয়দের চোখে পবিত্র) হরপ্পা সভ্যতায় ষাঁড়ের ছবিযুক্ত প্রায় ২০০০ সীল পাওয়া গেছে। প্রাচীন সভ্যতায় ষাঁড় উপাসনা সম্পর্কে Encyclopaedia Britannica লিখেছে, "The Bull Cult was a prehistoric religious practice that originated in the eastern Aegean Sea and extended from the Indus Valley of Pakistan to the Danube River in eastern Europe .... The Bull Cult continued into historic times and was particularly important in the Indus Valley and on the Grecian island of Crete. In both places the bull's 'horns of consecration' were an important religious symbol."




হরপ্পায় প্রাপ্ত পশুপতি শিব। অনেক ঐতিহাসিকের মতে হরপ্পার শিব হলেন আদিশিব। শিব অনার্য দ্রাবিড় জাতির দেবতা হলে পরে বহিরাগত আর্যরা গ্রহন করেছিল।

একটি সীলে যোগাসনে উপবিষ্ট পশুর দ্বারা সমাকীর্ণ তিনমুখ বিশিষ্ট এক পুরুষদেবতার ছবি পাওয়া গিয়েছে। ঐতিহাসিক মার্শাল এঁকে "পশুপতি শিব" বলে ধারণা করছেন। এছাড়া শিবলিঙ্গের মতোই হরপ্পা সভ্যতায় লিঙ্গপূজার ধারণা ছিল বলে পন্ডিতেরা অনুমান করেন। ঐতিহাসিক নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য লিখেছন," হিন্দুধর্মে লিঙ্গ ও যোনি যথাক্রমে শিব ও দেবীর প্রতীক, যাঁদের আদিরূপের নিদর্শন হরপ্পা সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ থেকে পাওয়া যায়। " (ধর্ম ও সংস্কৃতি: প্রাচীন ভারতীয় প্রেক্ষাপট। পৃষ্ঠা:৪৫)



মহেনজোদারোয় বৃহৎ স্নানাগার।

মহেনজোদারো নগরে কিছু কিছু বড় কাঠামো পাওয়া গেছে। এর একটি হল গ্রেট বাথ বা বৃহৎ স্নানাগার । ইটের তৈরি কাঠামোটির আয়তন ১২ মিটার / ৭ মিটার। গভীরতা ৩ মিটার। এর চারধারে সিঁড়ি। মেঝে মসৃণ ইটের। পাশে বড় কুয়া থেকে পানি। এক প্রান্তে ছিদ্রে নর্দমা। চারিদিকে পোর্টিকো আর ঘর। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় যাওয়া যেত। কোনও সন্দেহ নেই যে এখানে হরপ্পাবাসী ধর্মীয় কৃত্য সম্পন্ন করত । আজও গঙ্গা হিন্দুদের কাছে পবিত্র।



হরপ্পায় প্রাপ্ত নৃত্যরতা নারী। অনেকের মতে নারীটি ছিল মন্দির-নর্তকী!

মোহেনজোদারো নগরে কবর পাওয়া গিয়েছে। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্বন্ধে ধারণা করা যায়। সব গুলি কবর এক ধরণের ছিল না। এক ধরণের কবরে মৃত ব্যক্তির আসবাবপত্র অলঙ্কার সমাহিত করা হত। কিছু কবরে মৃত ব্যক্তির কঙ্কাল স্থাপন করা হত। এ ছাড়া আরও এক শ্রেণির কবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। এগুলিতে মৃতদেহ পূর্বে দাহ করে, পরে ভস্ম ওই কবরে রাখা হয়েছে।



হরপ্পা সভ্যতায় প্রাপ্ত স্বস্তিকা। আজও এটি ভারতবর্ষের হিন্দুসমাজে মঙ্গলচিহ্ন হিসেবে সমাদৃত । স্বস্তিকা শব্দের মূলে রয়েছে সংস্কৃত স্বস্তি এবং এর ধারণায় রয়েছে শুভ (শিব)।

কাজেই এইসব আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে হরপ্পা ধর্ম সম্বন্ধে ঐতিহাসিক John Keays এর মন্তব্য অসার বলেই মনে হয়।

হরপ্পা সভ্যতার ধর্মের ওপর নির্মিত একটি ভিডিওচিত্র

Click This Link



ক্রমশ ...

প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্বের লিঙ্ক
Click This Link
Click This Link
Click This Link

ছবি: ইন্টারনেট।
তথ্যসূত্র: শেষ কিস্তিতে সংযুক্ত করা হবে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29525614 http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29525614 2012-01-20 12:13:16
মন আমার দেহঘড়ি সন্ধান করি কোন্ মেস্তরি বানাইয়াছে খ্যাতিমান লোকসঙ্গীত শিল্পী আবদুর রহমান বয়াতী আজ বৃদ্ধ হয়েছেন, বর্তমানে তিনি রোগশোকে কাতর এবং শয্যাশায়ী। তাঁর আশু রোগমুক্তি কামনা করে ‘ মন আমার দেহঘড়ি’ গানটির সঙ্গে সুফি-বাংলার ভাবদর্শনের অনিবার্য সম্পর্কটি অনুধাবনের চেষ্টা করব। কিন্তু তার আগে পুরো গানটির পাঠ জরুরি -

ঘড়ি দেখতে যদি হয় বাসনা চইলা যাও গুরুর কাছে যেই ঘড়ি তৈয়ার করে ভাই লুকায় ঘড়ির ভিতরে। মেকার যদি হইতাম আমি ঘড়ির জুয়েল পালটাইতাম জ্ঞাননয়ন খুইলা যাইত দেখতে পাইতাম চোখের সামনে। মন আমার দেহঘড়ি সন্ধান করি কোন্ মেস্তরি বানাইয়াছে ও একটা চাবি মাইরা দিসে ছাইড়া জনম ভইরা চলতে আছে। মাটির একটা কেস বানাইয়া মেশিন দিছে তার ভিতর রঙবেরঙের বার্নিশ করা দেখতে ঘড়ি কী সুন্দর! দেহঘড়ি চৌদ্দতালা তার ভিতরে দশটি নালা নয়টি খোলা একটি বন্ধ গোপন একটা তালা আছে। ঘড়ির হেয়ার স্প্রিং ডেবরা কেসিং লিভার হইল কলিজা ছলেবলে আজব কলে দিবানিশি প্রেম খেলায়। ঘড়ির হেয়ার স্প্রিং ডেবরা কেসিং লিভার হইল কলিজা ছয় তার বলে আজব কলে দিবানিশি প্রেম খেলায়। তিনপাটে তার করণ সারা বয়লারে মেশিনের গোড়া তিনশ ষাটটি ইসক্রপ মারা ষোলজন প্রহরী আছে। এমন সাধ্য কার আছে ভাই এই ঘড়ি তৈয়ার করে যে ঘড়ি তৈয়ার করে ভাই লুকায় ঘড়ির ভিতরে । তিন কাঁটা বারো জুয়েলে মিনিট কাঁটা হইল দিলে ঘন্টার কাঁটা হয় আক্কেলে মনটারে তুই চিনে নিলে। মন আমার দেহঘড়ি সন্ধান করি কোন্ মেস্তরি বানাইয়াছে একটা চাবি মাইরা দিসে ছাইড়া জনম ভইরা চলতে আছে।

আবদুর রহমান বয়াতীর চিন্তার সূত্রপাত এভাবে: কত রকমের কলকবজা দিয়ে একটা ঘড়ি তৈরি হয়; তেমনি মানবদেহের অভ্যন্তরেও রয়েছে হরেক রকম কলকবজা । জড় এবং চেতন দুটি বস্তুর তুলনা সে কারণেই। কাজেই ‘ মন আমার দেহঘড়ি’ ...
আবদুর রহমান বয়াতীর চিন্তার দ্বিতীয় ধাপটি হল: কোনও যন্ত্রের কল-কবজা থাকলে তার তো একজন ‘মেস্তরি’ বা মেকার থাকার কথা। কাজেই, মানবদেহটিও কেউ না কেউ ‘মেইক’ করেছেন। বাংলার মারফতী জগতে সেই মেকার কে মালিক, মওলা কিংবা শাঁই বলে গভীর আবেগে সম্বোধন করা হয়। কাজেই -

মন আমার দেহঘড়ি সন্ধান করি কোন্ মেস্তরি বানাইয়াছে

কেননা,

ও একটা চাবি মাইরা দিসে ছাইড়া জনম ভইরা চলতে আছে।

কী আশ্চর্য! জন্মের পর থেকেই দেখা যায় দম দেওয়া ঘড়ির মতোই দেহঘড়ি ‘চলতে আছে’। এ যে কী বিপুল বিস্ময়- তা একমাত্র সাধকই জানেন। এ দৃশ্য সাধক অভিভূত হয়ে দেখেন আর ক্ষণে ক্ষণে শিউরে ওঠেন। অবশ্য যান্ত্রিকতার ঘেরাটোপে আবদ্ধ ভিড়ের মানুষের দেহমনে এতে বিন্দুমাত্র বিস্ময় জাগে না। সে যাই হোক। আবদুর রহমান বয়াতী একজন উঁচুস্তরের সাধক। কাজেই, দেহঘড়ির মেস্তরিরূপী এক মহাচৈতন্যের (লা শরিক আল্লাহর) সন্ধান করাই তার জীবনের পরমব্রত। তিনি পথে নেমেছেন। সাধনমার্গের প্রথম পর্বে তিনি যেতে চান একজন সৎ গুরুর কাছে । কেননা, বাংলায় গুরুর কাছে দীক্ষা নেওয়ার ঐতিহ্যটি দীর্ঘকালীন । নবম-দশম শতকের বাংলার বজ্রযানী বৌদ্ধ সাধকেরাই (অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ এর ভাষায় গৃহত্যাগী বৌদ্ধ বাউল) প্রথম গুরুর কাছে দীক্ষা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন। কাজেই মহাচৈতন্যের অধিকারী সেই দেহঘড়ির মেস্তরির সন্ধান করার আগে গুরুর পদধূলি নিতে হবে। তাইই সাধক আবদুর রহমান বলছেন:

ঘড়ি দেখতে যদি হয় বাসনা চইলা যাও গুরুর কাছে যেই ঘড়ি তৈয়ার করে ভাই লুকায় ঘড়ির ভিতরে।

দ্বিতীয় চরণটিতেই যেন সব কথাই বলা হয়ে গিয়েছে। মহাচৈতন্যের অধিকারী দেহঘড়ির নির্মাতা বাস করেন দেহঘড়ির ভিতরে। এই বিস্ময়কর ধারণাটির শিকড় নবম-দশম শতকের বজ্রযানী বৌদ্ধ সাধকের সাধনায় স্ফূরিত হয়েছে, যা ক্রমশ নানাবর্ণে ডালপালা মেলেছে বাংলার পরবর্তী যুগের লৌকিক ধর্মের সাধনপ্রক্রিয়ায়।

মেকার যদি হইতাম আমি ঘড়ির জুয়েল পালটাইতাম

কেন?

জ্ঞাননয়ন খুইলা যাইত দেখতে পাইতাম চোখের সামনে।

কাকে চোখের সামনে দেখার কথা হচ্ছে?
মওলা-মালিক-শাঁই কে।
মওলা- মালিক- শাঁই কে চোখের সামনে দেখতে পাওয়াই একজন বাউল কিংবা দেহতাত্ত্বিক মারাফতি সাধকের সাধনার মূল লক্ষ। সে জন্য ঘড়ির জুয়েল পালটাতে হবে। অর্থাৎ দেহটি শুদ্ধ করে তুলতে হবে। বাংলায় এ ধারণাটিও বেশ প্রাচীন। নবম-দশম শতকের নাথযোগীরা হঠযোগ বা কায়াসাধনা করত। এর মাধম্যে শরীর নিরোগ এবং অধ্যাত্ম সাধনায় অমরত্ব লাভ সম্ভব বলে তারা মনে করতেন। তারা এ ধারণা লাভ করেছিলেন বজ্রযানী বৌদ্ধদের কাছ থেকে। কেননা বজ্রযানী বৌদ্ধরা বিশ্বাস করতেন যে জড় দেহকে সিদ্ধ দেহ এবং সিদ্ধ দেহ কে দিব্যদেহে রূপান্তরিত করা সম্ভব। অর্থাৎ একান্ত সাধনার মাধম্যে মেটেরিয়াল বডিকে ডিভাইন বডি তে ট্রান্সফার করা সম্ভব।
এরপর গানটির সেই বিখ্যাত কোরাস। যা বাংলার শ্রোতাদের আজও দর্শন ও সঙ্গীতের সমন্বয়ে এক বিচিত্র আবেগে সিক্ত করে দেয়।

মন আমার দেহঘড়ি সন্ধান করি কোন্ মেস্তরি বানাইয়াছে ও একটা চাবি মাইরা দিসে ছাইড়া জনম ভইরা চলতে আছে।

এরপর শরীরের বর্ণনা-

মাটির একটা কেস বানাইয়া মেশিন দিছে তার ভিতর রঙবেরঙের বার্নিশ করা দেখতে ঘড়ি কী সুন্দর! দেহঘড়ি চৌদ্দতালা তার ভিতরে দশটি নালা নয়টি খোলা একটি বন্ধ গোপন একটা তালা আছে।

শেষ দুটি চরণের অর্থ সহজে বোঝা যাওয়ার কথা না। কেননা, চরণ দুটি বাংলার লৌকিক ধর্মের নিগূঢ় তত্ত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে নিগূঢ় তত্ত্বের শিকড়টি বাংলার প্রাচীন দার্শনিক চিন্তায় নিহিত। নানান দার্শনিক সম্প্রদায়ের ধারণা এই তত্ত্বে মিশে আছে। রয়েছে অগ্রগন্য বাউলমতের প্রভাবও। বাউলের বিশ্বাস এই যে দেহের ভিতর রয়েছে আঠারো মোকাম (আঠোরোটি ঘর), ছয় লতিফা, বারো বরজ, চারচন্দ্র, চৌদ্দ ভুবন, ষড় রিপু ও দশ ইন্দ্রিয়। এসবই বাউলের কল্পনা। বাউলগণ যে কল্পনাসূত্র লাভ করেছেন ষোড়শ শতকের সহজিয়া বৈষ্ণবগণের কাছ থেকে । সহজিয়া বৈষ্ণবগণ সে ধারণা লাভ করেছিলেন বাংলার প্রাচীন তন্ত্রের কাছ থেকে।
নাথধর্ম এবং বজ্রযানী বৌদ্ধ দর্শন আবার তন্ত্রপ্রভাবিত। সে যাই হোক। তন্ত্রের অন্যতম সিদ্ধান্ত ছিল, ‘যা নাই দেহভান্ডে, তা নাই ব্রহ্মান্ডে’ । এরই সূত্র ধরে হাজার বছর পর সুফি-বাংলার মারফতী ঘরনার দেহতাত্ত্বিক সাধকগণ বললেন, দেহঘড়ির ভিতরে চৌদ্দতালা আর দশটি নালা আছে, যার নয়টি খোলা একটি বন্ধ আর গোপন একটা তালা আছে। মওলা –মালিক- শাঁই কে চোখের সামনে দেখতে হলে প্রয়োজন দৈহিক এবং মানসিক শুদ্ধির । আর সেই শুদ্ধতা অর্জনে চাই দেহের অভ্যন্তরীণ নানা প্রকোষ্ঠ সম্বন্ধে পরিস্কার ধারণা। সে যাই হোক। আবদুর রহমান দেহঘড়ির আরও বর্ণনা দিয়েছেন:

ঘড়ির হেয়ার স্প্রিং (!) ডেবরা কেসিং (!) লিভার হইল কলিজা ছলেবলে আজব কলে দিবানিশি প্রেম খেলায়। ঘড়ির হেয়ার স্প্রিং ডেবরা কেসিং লিভার হইল কলিজা ছয় তার বলে আজব কলে দিবানিশি প্রেম খেলায়। তিনপাটে (!) তার করণ সারা (!) বয়লারে মেশিনের গোড়া (!) তিনশ ষাটটি ইসক্রপ মারা ষোলজন প্রহরী আছে।

এই স্তবকের সব শব্দই যে বোঝা যায়, তা কিন্তু নয়। তা সম্ভবও নয়। তাছাড়া একই গানে আবদুর রহমান বয়াতীর এবং ফকির আলমগীর-এর উচ্চারণের মধ্যেও যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ‘ তিনপাটে তার করণ সারা বয়লারে মেশিনের গোড়া’-এ লাইনটি বোঝা না-গেলেও বোঝা যায় যে এ হল দেহঘড়ির 'এনার্জির' বর্ণনা, তথা রূপকের মাধ্যমে মানবদেহের উপস্থাপনা। তবে শেষ লাইনটি - ‘তিনশ ষাটটি ইসক্রপ মারা ষোলজন প্রহরী আছে’ বেশ রহস্যময়। ‘তিনশ ষাটটি ইসক্রপ মারা’ মানে কি? ‘ষোলজন প্রহরী’ই বা কে? এসব প্রশ্নে আমাদের নাগরিক মননে মর্চে পড়াই স্বাভাবিক। তবে ‘ ছলেবলে আজব কলে দিবানিশি প্রেম খেলায়’ এই লাইনটিই এই অনুচ্ছেদের সবচে তাৎপর্যময়; এবং এই চরণের ব্যঞ্জনাও অত্যন্ত গভীর । মানবদেহে এবং মনে কখনও কখনও বিশুদ্ধ প্রেমের পবিত্র অনুভূতি জাগে। আবার কখনও ওঠে বন্য যৌনতার প্রবল ঢেউ। আর এভাবেই লীলাময় মওলা- মালিক -শাঁই জানান দেন যে তিনি দেহের অভ্যন্তরেই আছেন।
সাধকের এখানেই পরম বিস্ময় ...
আবদুর রহমান বয়াতী এবার দেহঘড়ির নির্মাতার স্বরূপ সম্বন্ধে বলছেন।

এমন সাধ্য কার আছে ভাই এই ঘড়ি তৈয়ার করে যে ঘড়ি তৈয়ার করে ভাই লুকায় ঘড়ির ভিতরে ।

ওপরের দুটি চরণের প্রতিধ্বনি শুনি গানটির প্রারম্ভের দুটি চরণে-

ঘড়ি দেখতে যদি হয় বাসনা চইলা যাও গুরুর কাছে যেই ঘড়ি তৈয়ার করে ভাই লুকায় ঘড়ির ভিতরে।

গানটির শেষ দুটি চরণ দিক নির্দেশনামূলক। যেখানে ঘড়ির ঘন্টা, মিনিট এবং সেকেন্ড এর কাঁটার কথা বলা হয়েছে। মিনিট কাঁটাকে দিল বা হৃদয় বলা হয়েছে। মনকে চিনলে (অর্থাৎ মওলা মালিক শাঁই) যে আক্কেল (জ্ঞানবুদ্ধি) হয় সে কথাও বলেছেন আবদুর রহমান বয়াতী।

তিন কাঁটা বারো জুয়েলে মিনিট কাঁটা হইল দিলে ঘন্টার কাঁটা হয় আক্কেলে মনটারে তুই চিনে নিলে।

আবদুর রহমান বয়াতীর কন্ঠে

Click This Link

ফকির আলমগীরের কন্ঠে



পরিশেষে একটি কথা বলতে চাই। একজন শিল্পীর প্রতিটি গানই জনপ্রিয় হয় না। কোনও কোনও শিল্পীর একটি গানের মাধ্যমেই শ্রোতার হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন লাভ করেন। আবদুর রহমান বয়াতীর ‘ মন আমার দেহঘড়ি’ গানটি তেমনই একটি গান। যে কালজয়ী গানটির মাধ্যমে আবদুর রহমান বয়াতী চিরকাল বাঙালির অন্তরে বেঁচে থাকবেন।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29524963 http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29524963 2012-01-19 10:55:03
হরপ্পা সভ্যতা (তৃতীয় পর্ব) হরপ্পা সভ্যতা নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে লিখছি। হরপ্পা সভ্যতার সম্বন্ধে প্রথম পর্বে ভূমিকা হিসেবে লিখেছি যে হরপ্পা সভ্যতা ভারতবর্ষের প্রাচীনতম সভ্যতা । এবং হরপ্পা সভ্যতার আবিস্কার একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কেননা, এই আবিস্কারের পূর্বে মনে করা হত যে ভারতের ইতিহাসের সূচনা আর্যদের ভারতবর্ষে আসার পর থেকে । আজ আর এ কথার কোনও ভিত্তি নেই। হরপ্পা সভ্যতা আবিস্কারের পর ভারতীয় সংস্কৃতির প্রাচীনত্ব এবং মৌলিকত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছে। অন্তত পাঁচ হাজার বছরের পরনো হরপ্পা সভ্যতাটি প্রাচীনত্বের দিক থেকে মিশর-ব্যাবিলন আসিরিয়ার সমকক্ষতা অর্জন করেছে। সে যাই হোক। প্রাগৈতিহাসিক ভারতবর্ষে সিন্ধু নদের অববাহিকায় হরপ্পা সভ্যতা গড়ে ওঠার সুনির্দিষ্ট কারণ ছিল। মাঠ পর্যায়ে গবেষনা করে প্রতœতাত্ত্বিকগণ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, নবোপলীয়, অর্থাৎ নব্যপ্রস্তর যুগে খাদ্য ও ঘাসের অভাব দেখা দিয়েছিল। নিজেদের এবং পশুদের খাদ্য যোগানোর জন্য নদীর তীরই ছিল উপযুক্ত জায়গা। কাজেই ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ নদীর তীরে বসতি গড়তে থাকে। ঐতিহাসিকদের মতে হরপ্পা সভ্যতার কালসীমা খ্রিস্টপূর্ব ২২০০ থেকে ১৭০০। মিশর কিংবা মেসোপটেমিয় সভ্যতার তুলনায় হরপ্পা-সংস্কৃতি সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান সীমিত। এর প্রধান কারণ লিখিত দলিলের অভাব। প্রায় হাজার দুয়েক সীল পাওয়া গেলেও সেগুলির পাঠোদ্ধার হয়নি। প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননের ( (archaeological excavation ) ফলে যে তথ্য পাওয়া গিয়েছে তারই ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। অবশ্য এই খননকার্যও মহেনজোদারোয় ভূগর্ভস্থ কয়েকটি স্তর জলমগ্ন থাকায় পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। সুবিশাল হরপ্পা সংস্কৃতির আয়তন সব মিলিয়ে ১২,৫০,০০০ বর্গ কিলোমিটার ।এ প্রসঙ্গে একজন ভারতীয় ঐতিহাসিক লিখেছেন: The total geographical area over which this civilization flourished is more than 20 times of the area of Egyptian and more than 12 times of the area of Egyptian and Mesopotamian civilizations combined.


হরপ্পা সভ্যতার মানচিত্র।১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় সিন্ধ অঞ্চলে সব মিলিয়ে চল্লিশটির মতন প্রতœক্ষেত্র আবিস্কার হয়েছিল। এর পর গত ৫০/৬০ বছরে সব মিলিয়ে ১৪০০ প্রাচীন বসতি আবিস্কৃত হয়। এর মধ্যে ৯২৫ টি ভারতে; এবং ৪৭৫ টি পাকিস্তানে। কাজেই বর্তমানকালের রাজনৈতিক সীমানায় হরপ্পা-সংস্কৃতির বিচার করা যাবে না, কাজেই হরপ্পা-সংস্কৃতির সমীক্ষা চালাতে হবে সভ্যতাটি ভৌগোলিক প্রেক্ষপটে। যা বিশাল এক ভূখন্ডে ছড়িয়ে রয়েছে- পশ্চিমে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের সুতকাজেন্দর; পুবে ভারতের উত্তরপ্রদেশের মিরাট জেলার আলমগীরপুর; দক্ষিণে মহারাষ্ট্রের আহমদনগর জেলার ধাইমাবাদ; এবং উত্তরে জন্মু এবং কাশ্মীরের আখনুর জেলার মানডা। পুব-পশ্চিমে সব মিলিয়ে ১৬০০ কিলোমিটার। এবং উত্তরদক্ষিণে ১৪০০ কিলোমিটার।

হরপ্পা সভ্যতার অধিবাসীরা যে ধরণের পোশাক পরত তার কোনও নমুনা পাওয়া যাওয়ার তো কথা না। তবে হরপ্পায় যেসব মূর্তি পাওয়া গেছে সেগুলি বিশ্লেষন করে হরপ্পা সভ্যতার অধিবাসীরা কী ধরনের পোশাক পরত সে সম্বন্ধে কিছু হলেও ধারণা পাওয়া সম্ভব। যেমন, পরিধেয় বস্ত্রের ওপরের দিকটা ছিল শালের মত আর নিচের অংশ ছিল ধুতির মতো। নারীপুরুষের পোশাকের বিশেষ পার্থক্য ছিল বলে মনে হয় না। এবং পোশাকের উপাদান ছিল তুলা আর পশম।



হরপ্পা নগর; একালের শিল্পীর চোখে

নারী এবং পুরুষ উভয়ই অলঙ্কার ভালোবাসত। (আর একালের নারীরা পুরুষের চেয়ে অলঙ্কার পছন্দ করে বেশি!) ...সে যাই হোক। হরপ্পায় খননকার্য চালিয়ে নানা ধরনের আংটি, গলার হার, কঙ্কণ পাওয়া গেছে। অলঙ্কার নির্মাণে ব্যবহৃত হত সোনা এবং রূপাসহ নানা মূল্যবান ধাতু । অধ্যাপক সুনীল চট্টোপাধ্যায় তাঁর 'প্রাচীন ভারতের ইতিহাস' বইতে লিখেছেন,‘ মেয়েরা লিপস্টিক ব্যবহার করত।’ ( প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা,২০) এটা কী করে বোঝা গেল তা অবশ্য তিনি ব্যাখ্যা করেননি। কাজেই খটকা রয়েই গেল। অধ্যাপক সুনীল চট্টোপাধ্যায় আরও লিখেছেন যে, ‘হরপ্পায় পাওয়া একটি ভ্যানিটি ব্যাগ আমাদের কৌতূহল উদ্রেক করে। মনে হয় মধ্যবিত্তের সমৃদ্ধি এই সভ্যতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। ’




এই ছবিটি হরপ্পা সভ্যতার নগর সম্বন্ধে চমৎকার ধারণা দেয়

এমনকী হরপ্পা সভ্যতায় তিনতলা বাড়িও ছিল! আর সেসব বাড়িতে ছিল ড্রইংরুম বা বৈঠকখানা। আর সে বৈঠকখানায় থাকত খাট, চেয়ার, টুল এবং আলো (এই আলোর ব্যাপারটা ঠিক বোঝা গেল না। প্রদীপের আলো হবে সম্ভবত) । এছাড়া ঘরে আরও অনেক জিনিসপত্র ছিল। তবে সেসব জিনিস পাথর দিয়ে বানানো হত না, তামা এবং ব্রোঞ্জ দিয়েও বানানো হত । তামা আনা হত বিদেশ থেকে। কাজেই তামা ওরা হিসেব করেই ব্যবহার করত। হরপ্পা সভ্যতার অস্ত্র ছিল- কুঠার, বর্শা, ছোরা, তীর- ধনুক, গুলতি এবং ঢাল। তবে তরবারি জিনিসটা একেবারেই ছিল না। হরপ্পাবাসীর অবসর বিনোদন ছিল পাশা খেলা, শিকার এবং ষাঁড়ের খেলা।



এই ছোট ছোট মূর্তিগুলি হরপ্পায় পাওয়া গিয়েছে

হরপ্পাবাসীর গড় আয়ু ছিল মাত্র ত্রিশ! মোহেনজোদারো নগরে কবর আবিস্কৃত হয়েছে। কবরগুলি থেকে হরপ্পাবাসীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্বন্ধে ধারণা করা যায়। সব গুলি কবর অবশ্য এক ধরণের ছিল না। এক ধরণের কবরে মৃত ব্যক্তির আসবাবপত্র এবং অলঙ্কার সমাহিত করা হত। কিছু কবরে কেবল মৃত ব্যক্তির কঙ্কাল সমাহিত করা হত। এ ছাড়া আরও এক শ্রেণির কবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। এগুলিতে মৃতদেহ পূর্বে দাহ করে, পরে ছাইভস্ম ওই কবরে রাখা হয়েছে। আসলে কবরগুলির পার্থক্য হরপ্পাসভ্যতার শ্রেণিবৈষম্যেরই প্রতিফলন মাত্র।



সেই কবে নানা জাতির কোলাহলে মূখর ছিল এই নগরটি

মোহেনজোদারো নগরটি ছিল আর্ন্তজাতিক! কেননা ওই নগরে প্রোটো -অসট্রালয়েড, আলপিনয়ড, মেডিটারেনিয়ান এবং মঙ্গোলয়েড প্রভৃতি জাতির মানুষ বাস করত। লোকসংখ্যা অবশ্য জানা যায় নি। কারও মতে ৩৫০০০। আবার কারও মতে এক লক্ষ। নগরে খাদ্যের অভাব ছিল না। পলিমাটির কারণ্যে ভালো ফসল উৎপন্ন হত । এছাড়া নদীপথে খাদ্য আমদানী করা হত। হরপ্পাবাসীর প্রধান খাদ্য ছিল যব এবং গম। এছাড়া ভাত, দুধ, তরকারি, খেজুর, ভেড়া ও গরুর মাংস প্রভৃতি হরপ্পাবাসীর খাদ্য তালিকার অর্ন্তভুক্ত ছিল।



হরপ্পায় প্রচুর ষাঁড়ের ছবি অঙ্কিত সীল পাওয়া গেছে

হরপ্পা সভ্যতায় কী ধরণের গৃহপালিত জীবজন্তু ছিল- সে কথা আমরা হরপ্পায় প্রাপ্ত পশুর কঙ্কাল থেকে জানতে পারি। যেমন কুঁজবিশিষ্ট ষাঁড়, মহিষ,ভেড়া, হাতি এবং উট। এছাড়াও হরপ্পায় নানা ধরণের মাটির খেলনার ছাঁচ পাওয়া গিয়েছে। কাজেই খেলনার ছাঁচ আর পশুর কঙ্কাল থেকে বাঘ, সিংহ, গরু, কুকুর, গাধা, বাঁদর এবং খরগোশ এসব পশুর কথা জানা যায়। হরপ্পাসভ্যতায় ঘোড়ার অস্তিত্ব নিয়ে এককালে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছিল।অথচ জীবনানন্দ লিখেছিলেন:

মহীনের ঘোড়গুলি ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে

পরবর্তীকালে খননকার্যের ফলে এই সন্দেহের তীব্রতা অনেক কমে গিয়েছে। কালিবনগানে এবং সুরকোদতে মাটির তলায়, খুব গভীরে না হলেও ঘোড়ার চিহ্ন পাওয়া গেছে। তবে মনে হয় ঘোড়ার অস্তিত্ব এই সভ্যতার শেষের দিকে ছিল। হরপ্পা সভ্যতার "ঘোড়া রাজনীতির" ওপর লেখা ব্লগার ম্যাভেরিক এর এই পোস্ট পাঠ করতে পারেন ...
Click This Link

হরপ্পা সভ্যতার ওপর ব্লগার ম্যাভেরিক এর আরও একটি পোস্ট

Click This Link



হরপ্পার ধোলাভীর নগর

ক্রমশ ...

প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বের লিঙ্ক

Click This Link
Click This Link

ছবি: ইন্টারনেট।
তথ্যসূত্র: শেষ কিস্তিতে সংযুক্ত করা হবে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29524355 http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29524355 2012-01-18 12:00:54
এ -তীর্থে আসবে যদি ধীরে অতি পা ফেলো সুন্দরী/মুকুন্দরামের রক্ত মিশে আছে এ-মাটির গায় মঙ্গলকাব্য নামে পরিচিত। প্রায় পাঁচশো বছর ধরে অসংখ্য কবি অজস্র মঙ্গলকাব্য রচনা করেছেন। মধ্যযুগটি ছিল ধর্মীয় যুগ। সুতরাং মঙ্গলকাব্যে দেবতাদের প্রাধান্য ছিল; এবং তাতে মানুষের ভূমিকা ছিল গৌণ। আসলে মঙ্গলকাব্য হল মধ্যযুগের দেবতাদের জীবন কেন্দ্রিক কাহিনীকাব্য।
কিন্তু, কাব্যের নাম মঙ্গলকাব্য হল কেন?
দেবতাদের কাছে মঙ্গল কামনা করে এ-কাব্যগুলি রচনা করা হয়েছে বলে এই কাব্যের নাম মঙ্গলকাব্য-অনেকেরই এমনই ধারণা। আবার কারও কারও মতে: এ-কাব্যগুলি গাওয়া হত এক মঙ্গলবার থেকে আরেক মঙ্গলবার অবধি; তাইই মঙ্গলকাব্য নাম। অনেকেই আবার এ ধারণা অস্বীকার করে দাবি করে বলেন যে: যে বিশেষ সুরে মঙ্গলকাব্য গাওয়া হত সে -সুরের নাম মঙ্গল।
মঙ্গলকাব্যের নাম কয়েক ধরণের হত। অর্থাৎ পৃথিবীতে যে দেবতার পুজা প্রচারের জন্য কাব্যটি রচিত-সে দেবতার নামানুসারেই কাব্যের নাম হত। চন্ডীর পুজা প্রচারের জন্য যে মঙ্গলকাব্য রচিত হত, তার নাম: ‘চন্ডীমঙ্গলকাব্য’; আবার মনসা দেবীর পুজা প্রচারের জন্য যে মঙ্গলকাব্য রচিত হত, তার নাম: ‘মনসামঙ্গলকাব্য’। মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যের মধ্যে ‘চন্ডীমঙ্গলকাব্য’ এবং ‘মনসামঙ্গলকাব্য’ কাব্য দুটিই বিখ্যাত।
মাণিক দত্ত, দ্বিজ মাধব,দ্বিজ রামদেব, ভারতচন্দ্র রায় এবং মুকুন্দরাম চক্রবর্তী (১৫৪০-১৬০০) প্রমূখ কবিরা চন্ডীমঙ্গলকাব্য লিখেছেন । এ ক্ষেত্রে কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তর একটি উক্তি স্মরণীয়। তিনি একবার বলেছিলেন, ‘বাংলা সাহিত্যে মধ্যযুগ অপাঠ্য’। তবে অনেক আধুনিক গবেষকই কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন এই কারণে যে, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে যথেষ্ট পরিমানে উৎকৃষ্ট মানের কাব্য রয়েছে। আর সবচে বড় কথা হল: মঙ্গলকাব্যে প্রতিফলিত হয়েছে মধ্যযুগের বাংলার সমাজচিত্র। কাজেই, সামাজিক ইতিহাস উপলব্দির জন্য মঙ্গলকাব্যের পাঠ অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে এক্ষেত্রে কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর রচনা পাঠ অনিবার্য। আমি সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।
মনসামঙ্গলকাব্যের অর্ন্তগত বেহুলা-লখিনদরে কাহিনীটি বাংলায় অতি সুপরিচিত। তবে চন্ডীমঙ্গলকাব্যের কালকেতু-ফুল্লরার কাহিনীটিও কিন্তু কম চিত্তাকর্ষক নয়। এ কাহিনী বিষাদিত নয় বরং আনন্দ আর পুলকে ভরপুর। সবচে বড় কথা হল এ কাহিনী আমাদের, অর্থাৎ বাঙালির। যুগ যুগ ধরে এ গল্পটি বর্ণিত হয়েছে বাংলার কৌমসমাজে। মঙ্গলকাব্যের লেখকগণ তাদের পূর্বপুরুষদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন, গভীর শ্রদ্ধা করতেন; এই আজকের আমাদের মতোই। সে কারণেই মঙ্গলকাব্যের কবিরা কাব্য রচনার জন্য নতুন বিষয়ের সন্ধান করেননি, পূর্বপুরুষদের গল্পই বার বার নতুন করে লিখেছেন। কালকেতু-ফুল্লরার কাহিনীটিও সেরকমই, মূল কাহিনী অবিকৃত রেখে একেকজন কবি একেক ভাবে লিখেছেন। তবে সবার শিল্পমানই যে সন্তোষজনক, তা কিন্তু বলা যাবে না। তবে সংগত কারণেই কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী এক্ষেত্রে অনন্য।
কিন্তু, কি রয়েছে কালকেতু-ফুল্লরার আখ্যানে?
বলছি সংক্ষেপে। নীলাম্বর নামে এক দেবতা ছিল। স্বর্গে তার দিনগুলি সুখেই কাটছিল । তার স্ত্রীর নাম ছায়া। নীলাম্বর ছায়া কে গভীরভাবে ভালোবাসত। তারপরে দেবতা শিবের অভিশাপে নীলাম্বর স্বর্গচ্যূত হল। ধর্মকেতু নামে একব্যাধের পুত্রস্বরূপ পৃথিবীতে জন্ম নিল নীলাম্বর। তার নাম হল কালকেতু। ছায়াও অন্য এক ব্যাধের ঘরে জন্মাল, ছায়ার নাম হল ফুল্লরা। ফুল্লরার যখন এগারো বছর বয়েস, তখন তার সঙ্গে কালকেতুর বিয়ে হল।

প্রাচীন বাংলার কৌমসমাজে কোনও এক নিষাদ বুড়ো এ গল্পটি বলছেন বা এ গল্প উদ্ভাবন করেছেন- একুশ শতকে দাঁড়িয়ে আমাদের এমনটাই কল্পনা করে নিতে হবে, নইলে গল্পের প্রকৃত স্বরূপ আমাদের উপলব্দির বাইরে থেকে যাবে। তখন আমি প্রাচীন বাংলার কৌমসমাজ বললাম বটে, কিন্ত ততদিনে প্রাচীন বাংলায় আর্যসংস্কৃতির বিস্তার ঘটে গেছে, কেননা, মঙ্গলকাব্যে আমরা দেবতা শিবকে পাই, যদিও শিব অনার্য দেবতা, তবে তার উপস্থাপনটি অনিবার্য ভাবেই বৈদিক ...

...যা হোক। কালকেতু ছিল সাহসী, স্বাস্থবান এবং চতুর শিকারী। (কীভাবে গল্পের বাঁক নিচ্ছে লক্ষ করুন) কালকেতুর ভয়ে বনের পশুপাখি সব আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে উঠেছে। কালকেতুর নিক্ষিপ্ত বিষমাখা অব্যর্থ তীর যেন এক একটি মৃত্যুবাণ! বনের পশুপাখির আরাধ্য দেবী হলেন চন্ডী; ইনিই মহাশক্তি। দেবী চন্ডী বনের পশুপাখিদের বাঁচাতে সম্মত হলেন। দেবী পশুপাখিদের এক অলক্ষ্য স্থানে লুকিয়ে রাখলেন। কাজেই কালকেতু আর শিকার পায় না, পায় না। খানিকটা বিস্মিত হয়েই সে বনের এদিক-সেদিক ঘুরতে লাগল। হঠাৎই একটা হরীতকী গাছের আড়ালে একটি গুইসাপ দেখতে পেল সে । কালকেতু গুইসাপটি ধরে বাড়ি নিয়ে এল। ফুল্লরা তখন স্বামীর পথ চেয়ে বসেছিল। কালকেতু শিকার আনবে তবেই না রান্না হবে।
বাড়ি ফিরে কালকেতু ফুল্লরাকে গুইসাপ দেখিয়ে বলল, এটি আজ রাঁধ। তার আগে দেখ যদি পাশের বাড়ি থেকে কিছু খুদ যোগাড় করতে পার কিনা। আমি এখন হাটে যাচ্ছি।
বলে কালকেতু হাটে চলে গেল।

কালকেতু-ফুল্লরার গল্পটি আবহমান বাংলার গল্প বলেই এর ভিতরে অনিবার্যভাবেই গ্রামীণ জীবনের ছবি রয়েছে। বন, বাড়ি, উঠান, রান্নাবান্না, খুদকুঁড়ো আর হাট। মধ্যযুগের বাঙালি কবিরা গ্রামীণ পরিবেশ ভালোবাসতেন বলেই কি তাঁরা তা নিয়ে লিখতে স্বস্তি বোধ করতেন? নতুন গল্পের সৃষ্টি করতে চাইতেন না ? উনিশ শতক অবধি বাংলা সাহিত্যের এই ধারাই অব্যাহত ছিল। তার আগে অবশ্য কাব্যের বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছিলেন নদীয়ার মহাপুরুষ শ্রীচৈতন্যদেব।

ফুল্লরা পাশের বাড়ি থেকে খুদ নিয়ে ফিরে এল।
ওমাঃ এ কী! এ কে দাঁড়িয়ে রয়েছে!
উঠানে একটি উদ্ভিন্ন যৌবনা সুন্দরী যুবতী দাঁড়িয়ে রয়েছে বলেই ফুল্লরার এমন বিস্ময়সূচক মন্তব্য। যুবতীর শরীরে যৌবন তরঙ্গে রূপালি বিদ্যুতের ফলার মতন রূপের ঝিলিক।(আসলে গুইসাপটিই ছিল স্বয়ং দেবী চন্ডী; এখন দেবী বিশেষ কারণে রূপ পাল্টেছেন)
ফুল্লরা সুন্দরী যুবতীকে তীক্ষ্মকন্ঠে শুধালো, এই কে তুমি ? এখানে কেন এসেছ শুনি?
চন্ডীরূপীনি যুবতী তখন বলল, কালকেতুই তো আমায় এখানে নিয়ে এলে। কেন, তুমি তখন দেখতে পাওনি?
একথা শোনামাত্রই ফুল্লরার শরীর আতঙ্কে হিম হয়ে এল। এ সর্বনাশী দেখছি আমার সুখের সংসার ধ্বংস করে দেবে ! হে শিব, এখন আমি কি করি? কালকেতুও তো ফিরে এল না। ফুল্লরা চিৎকার করে বলল, তুমি চলে যাও! ছিঃ, লোকে তোমায় এখানে দেখে কী বলবে। বেবুশ্যে। বলতে বলতে কেঁদে ফেলল ফুল্লরা।
না, আমি যাব না আমি এখানে থাকব। আমি এখানে থাকতে এসেছি। সুন্দরী যুবতী বলল। কন্ঠস্বরে একগুঁয়েমি ভাব।
ফুল্লরা তখন কী করে। ও হাটের দিকে দৌড়াতে লাগল। হাটের মাঝে কালকেতুকে দেখতে পেয়ে সব খুলে বলল। কালকেতু তো সব শুনে অবাক। দ্রুত বাড়ি ফিরে এল সে । সুন্দরী যুবতীর দিকে হাত তুলে বলল, এই! কে তুমি? যাও! এখুনি চলে যাও!
না! আমি যাবো না!
যাবে না? না! ক্রোধে অধীর হয়ে কালকেতু তখন ধনুকে তীর যোজনা করল। মুহূর্তেই দেবী চন্ডী তখন আপন স্বরূপ ধরলেন।
কালকেতু সে মোহনীয় রূপ দর্শন করে মুগ্ধ হল। অভিভূত হল। তার হৃদয়ে ভক্তির ভাব জাগ্রত হল।
চন্ডী তখন বললেন, আমি দেবী চন্ডী। তোমরা আমার পূজা প্রচার কর। আমি তোমাদের অঢেল সম্পদ দেব।
অভাবিত সৌভাগ্যে কালকেতু-ফুল্লরা বিষম ঘোরের মধ্যে পড়ল।
দেবী চন্ডী ওদের সাত কলস ধন দান করলেন।
তারপর?
তারপর সে ধন দিয়ে কালকেতু গুজরাট বন কেটে নির্মান করালো এক বিরাট নগর । সে নগরে ভাড়ু দত্ত নামে এক খল চরিত্রের লোক ছিল। সে কালকেতুর মন্ত্রী হতে চাইল। অবশ্য কালকেতু রাজি হল না।ষড় করতে ভাড়ু দত্ত তখন গেল কলিঙ্গে । সে কলিঙ্গের রাজাকে কালকেতুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্ররোচিত করল। বাঁধল যুদ্ধ । সে যুদ্ধে কালকেতু গেল হেরে। ধানের গোলায় সে লুকিয়ে রইল ফুল্লরার পরামর্শে । কলিঙ্গরাজের সৈন্যরা তাকে বন্দি করে নিক্ষেপ করল কারাগারে । কারাগারের ঘোর অন্ধকারে কালকেতু দেবী চন্ডীকে স্মরণ করল। দেবী চন্ডী কালকেতুর ওপর সদয় ছিলেন। দেবী চন্ডী কলিঙ্গের রাজাকে দেখা দিলেন স্বপ্নে। কলিঙ্গের রাজা কালকেতুকে মুক্তি দিলেন, ফিরিয়ে দিলেন কালকেতুর রাজ্য। কালকেতু আবার রাজ্য শাসন করতে লাগল। ফুল্লরা আর তা দিন সুখে কাটতে লাগল। শেষে তারা বৃদ্ধ
বয়েসে নীলাম্বর এবং ছায়ারূপে ফিরে গেল স্বর্গে।
এ-গল্পটি অবলম্বন করেই ১৫৭৫ অব্দের কাছাকাছি সময়ে মুকুন্দরাম চক্রবর্তী চন্ডীমঙ্গলকাব্য লিখেছেন । হুমায়ূন আজাদ এই সালটি (১৫৭৫ অব্দ) নির্ধারণ করেছেন। এ বিষয়ে অবশ্য খন্দকার মুজাম্মিল হক বাংলাপিডিয়ায় ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। খন্দকার মুজাম্মিল হক এর মতে ১৫৭৫ অব্দে মুকুন্দরাম চক্রবর্তী পৈত্রিক ভিটেমাটি ত্যাগ করেন এবং তিনি চন্ডীমঙ্গলকাব্য রচনা করেন ১৫৯৪ থেকে ১৬০০ অব্দের মধ্যে। মুকুন্দরাম চক্রবর্তী যদি সত্যিই সত্যিই ১৫৭৫ অব্দে পৈত্রিক ভিটেমাটি ত্যাগ করেন তাহলে চন্ডীমঙ্গলকাব্য লেখার অবকাশ তখন তাঁর কোথায়? এই প্রশ্নটি উঠতেই পারে।
সেই যাই হোক। মুকুন্দরাম চক্রবর্তী চন্ডীমঙ্গলকাব্য লিখেছেন খানিকটা বিচিত্র পরিস্থিতিতে। কবির জন্ম পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার দামুন্যা গ্রামে। বাবার নাম হৃদয় মিশ্র; মায়ের নাম দৈবকী। সে সময় বাংলা-বিহারে রাজা মানসিংহের রাজত্ব। সে প্রসঙ্গে মুকুন্দরাম চক্রবর্তী চন্ডীমঙ্গলকাব্য লিখেছেন:

‘ধন্য রাজা মানসিংহ বিষ্ণুপদাম্বুজ-ভৃঙ্গ গৌড়-বঙ্গ-উৎকল-অধিপ।’

দামুন্যা গ্রামে এক অত্যাচারী ডিহিদার ছিল। তার নাম মামুদ শরিফে। ১৫৭৫ অব্দে মামুদ শরিফের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে কবির পরিবার মেদিনীপুরের উদ্দেশে গ্রামত্যাগ করে। পথে অশেষ দূর্গতি পোহাতে হয়েছিল। রূপরায় ডাকাতের কবলে পড়েছিলেন। অন্নবস্ত্রহীন, যাত্রাক্লেশকর অনির্দিষ্ট জীবন। সে যাই হোক। শেষে অবশ্য কবির পরিবারটি মেদিনীপুরের আড়রা গ্রামে আশ্রয় পান। এবং এর কিছুকাল পরে মুকুন্দরাম চক্রবর্তী জমিদারপুত্র রঘুনাথের গৃহশিক্ষক নিযুক্ত হন। পরবর্তীকালে এই রঘুনাথেরই অনুপ্রেরণায় চন্ডীমঙ্গলকাব্য রচনা করেন। এজন্য জমিদার তাঁকে ‘কবিকঙ্কন’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর অসাধারণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ছিল। কবি তৎকালীন বাংলার বাস্তবজীবনে ছবি অপূর্ব দক্ষতায় এঁকেছেন। খন্দকার মুজাম্মিল হক এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন, ‘সাধারণ বাঙালি জীবন থেকে নেওয়া উপাদানের দ্বারা মুকুন্দরাম তাঁর কাব্যের চরিত্র অঙ্কন করেছেন। চন্ডীদেবীর মাহাত্ম্য প্রচার মুখ্য বিষয় হলেও সমকালীন সমাজ ও পারিপার্শ্বিকতা তিনি উপেক্ষা করতে পারেন নি। তাই মানব -চরিত্র ও প্রকৃতি -পরিবেশের বস্তুনিষ্ট বর্ণনা তিনি দিয়েছেন। ...বস্তুতান্ত্রিক ঔপন্যাসিকদের অগ্রদূত মুকুন্দরামের মুরারি শীল, ভাড়ু দত্ত, ফুল্লরা চরিত্র বাংলা সাহিত্যের অমর সৃষ্টি। এসব কারণে তাঁর চন্ডীমঙ্গলকাব্য মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে এক অভিনব সৃষ্টি। ’ (বাংলাপিডিয়ায়)
মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর আরেক বৈশিষ্ট্য হল এই যে তিনি নিস্পৃহ ছিলেন, চন্ডীমঙ্গলকাব্য রচনাকালে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। এটি লেখকের একটি বড় গুণ। এ জন্যেই তাঁকে ‘ বস্তুতান্ত্রিক ঔপন্যাসিকদের অগ্রদূত’ বলা হয়েছে।
কিন্তু বাংলার ইতিহাসে মুকুন্দরাম চক্রবর্তী কেন বিশিষ্ট?
গভীর মানবিক বোধের জন্য বাংলার ইতিহাসে মুকুন্দরাম চক্রবর্তী অনন্য।
১৫৭৫ অব্দে ডিহিদার মামুদ শরিফের অত্যাচারে মুকুন্দরাম চক্রবর্তী মেদিনীপুরে চলে যান। মুকুন্দরাম চক্রবর্তী সে দুঃখজনক অধ্যায়টি কখনও বিস্মৃত হন নি। বরং মুকুন্দরাম চক্রবর্তী একটি শান্তিপূর্ণ এবং ভারসাম্যপূর্ণ সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন । লেখকগণ সাধারণত তাঁদের স্বপ্নের কথা তাঁদের শিল্পমাধ্যমে প্রকাশ করে থাকেন। এই ক্ষেত্রে মুকুন্দরাম চক্রবর্তীও ব্যাতিক্রম নন। তাই আমরা দেখতে পাই গুজরাট বনে কালকেতুর নগরে অত্যাচার আর অনাচার নেই; শোষণ আর বঞ্চনা নেই। কালকেতু তাঁরই এক প্রজাকে বলছেন: তুমি আমার নগরে বাস করে ইচ্ছেমত জমি চাষ কর। কর দিও তিন বছর পর পর। করের হার হাল প্রতি মাত্র এক টাকা। আর যখন ফসল ফলাবে তখন আমার লোকেরা তোমার ওপর অত্যাচার করবে না। আমার নগরে অত্যাচারী ঢিহিদার থাকবে না ...

আমার নগরে বৈস যত ভূমি চাহ চষ তিন সন বই দিও কর। হাল পিছে এক তংকা না করো কাহার শংকা পাট্টায় নিশান মোর ধরো। খন্দে নাহি নিব বাড়ি রয়ে সহে দিও কড়ি ডিহিদার না করিব দেশে।

এসব মানবিক বোধ স্মরণ করেই কবি আল মাহমুদ তাঁর ‘সোনালি কাবিন’ কবিতায় লিখেছেন:

এ -তীর্থে আসবে যদি ধীরে অতি পা ফেলো সুন্দরী/মুকুন্দরামের রক্ত মিশে আছে এ-মাটির গায়

কুড়ি শতকে রবীন্দ্রনাথ কি মুকুন্দরাম পাঠেই উজ্জীবিত হয়ে লিখেছিলেন

আমরা সবাই রাজা আমাদেরই রাজার রাজত্বে/ নইলে মোদের রাজার সঙ্গে মিলব কি সত্ত্বে।

এভাবেই আজও বাংলার মানবিক বোধটিকে প্রবাহমান দেখতে পাই তার কাব্যে, তার কবিতায় ...

তথ্যসূত্র:

আল মাহমুদ; শ্রেষ্ঠ কবিতা
হুমায়ূন আজাদ: লাল নীল দীপাবলী (বাংলা সাহিত্যের জীবনী)
বাংলাপিডিয়ায় মুকুন্দরাম চক্রবর্তী সম্পর্কে নিবন্ধ
Click This Link
Click This Link
Click This Link
http://prothom-aloblog.com/posts/16/32914
Click This Link
Click This Link
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29523819 http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29523819 2012-01-17 12:46:25
জীবনানন্দের মা আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/ কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে। কবি কুসুমকুমারী দাশ।

জীবনানন্দের মা কুসুমকুমারী দাশ বরিশালেরই মেয়ে ছিলেন। গ্রামের নাম গৈলা। যদিও কুসুমকুমারী দাশ ১৮৭৫ সালের দিকে বরিশাল শহরেই জন্ম গ্রহন করেছিলেন । কুসুমকুমারী দাশ-এর বাবা , অর্থাৎ জীবনানন্দের মাতামহের নাম ছিল চন্দ্রনাথ দাশ; তিনি ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন এবং বরিশাল ব্রাক্ষ্মসমাজে যোগ দিয়েছিলেন । ১৮৬১ সালে বরিশালের যে ব্রাহ্মসমাজটির প্রতিষ্ঠায় জীবনানন্দের পিতামহ সর্বানন্দ দাশ প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন । এইখানেই বলে রাখি যে- কলকাতায় ব্রাহ্মসমাজটি গঠিত হয় উনিশ শতকের গোড়ার দিকে । হিন্দু ধর্মের প্রতি ইউরোপীয় মিশনারিদের সমালোচনার প্রতিক্রিয়া হিসেবেই রাজা রামমোহন রায়ের অনুপ্রেরণায় বহু ঈশ্বরবাদী ধ্যানধারণা পরিত্যাগ করে ব্রাহ্মরা উপনিষদের নিরাকার ঈশ্বরে ভজনা করতে থাকে । যদিও ব্রাহ্মদের অনেক আচার খ্রিষ্টধর্মের মতোই ছিল, এবং ব্রাহ্মদের অনেক আচার আবার হিন্দু ধর্মগ্রন্থ সমর্থিত ছিল। সে যাই হোক। ব্রাহ্মধর্মটি ছিল মূলত উনিশ শতকের একটি ধর্মীয় ও সামাজিক আন্দোলন। কুড়ি শতকে ব্রাহ্মদের ‘নীতিবাগীশ’ বলে ভাবা হত। ব্রাহ্ম শব্দটির বিকৃত রূপ ‘বেম্ম’ বলতে বোঝাত নৈতিক বিশুদ্ধতা।
জীবনানন্দের মা কুসুমকুমারী দাশ এমনই এক ব্রাহ্ম পরিবারের মেয়ে ছিলেন।
জীবনানন্দের পিতামহ সর্বানন্দ দাশ- এর পৈত্রিক ভিটেমাটি বরিশালে নয়, ছিল পদ্মারই এক শাখানদী কীর্তিনাশার তীরে বিক্রমপুরের গাঁওপাড়া গ্রামে। সেই গ্রামখানি কীর্তিনাশার জলে তলিয়ে গিয়েছিল । জীবনানন্দের ঠাকুমা অর্থাৎ সর্বানন্দ দাশ- এর স্ত্রীর নাম ছিল প্রসন্নকুমারী দাশ। তাঁরই মুখ থেকেই জীবনানন্দ শৈশবে বিক্রমপুর আর পদ্মা নদীর গল্প শুনেছিলেন। সে সব গল্পের মধ্যে ছিল অষ্টাদশ শতকের রাজা রাজবল্লভের স্মৃতি, যাঁর একুশ চূড়াযুক্ত প্রাসাদকে বলা হত ‘একুশ রতত্ন’। সেই স্মৃতিই পরবর্তীকালে উঠে এসেছে কবির রূপসী বাংলা কবিতায়:

তবু তাহা ভুল জানি-রাজবল্লভের কীর্তি ভাঙে কীর্তিনাশা; তবুও পদ্মার রূপ একুশরত্নের চেয়ে আরো ঢের গাঢ়-(রূপসী বাংলা)

জীবনানন্দের পিতামহ সর্বানন্দ দাশ সরকারি চাকরি করতেন। সেই সুবাদে
কীর্তিনাশার পাড়ে গাঁওপাড়া গ্রামটি কীর্তিনাশার জলে তলিয়ে যাওয়ার অনেক আগেই সর্বানন্দ দাশ ‘কার্যোপলক্ষে’ বরিশাল শহরে এসেছিলেন। বরিশাল শহরে এসে তিনি নব্য ভাবধারায় উজ্জীবিত হন, অর্থাৎ ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হন। দাশ পরিবারের উপাধি ছিল দাশগুপ্ত। সর্বানন্দ দাশ উপাধি থেকে ‘গুপ্ত’ শব্দটি ছেঁটে ফেলেন, কেবলই ‘দাশ’ লিখেন। এরপর তাঁর বিক্রমপুরের সঙ্গে তেমন সম্পর্ক আর রইল না। বরিশাল শহরেই স্থায়ী হলেন সর্বানন্দ দাশ এবং একে একে সাত পুত্র এবং চার কন্যার জনক হলেন। সর্বানন্দ ‘বেম্ম’ হয়েছে। এ নিয়ে নানারকম কথা উঠেছিল সে সময় সর্বানন্দ দাশ-এর হিন্দু আত্মীয়সমাজে। সর্বানন্দ দাশ এ কারণে তাঁর বড় ছেলেকে তাঁর হিন্দুসমাজে আত্মীয়স্বজনের কাছে রেখে আসেন। সর্বানন্দ দাশ-এর বড় ছেলের নাম হরিচরণ দাশ। পরে অবশ্য হরিচরণ দাশও ব্রাহ্মধর্ম গ্রহন করেছিলেন।
ব্রাহ্মরা শিক্ষাদীক্ষার বিষয়ে অত্যন্ত উদার ছিলেন। সর্বানন্দ দাশ প্রথমে তাঁর বড় ছেলেকে বরিশাল শহরের স্থানীয় জেলা স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। তারপর পাঠালেন কলকাতায়। সেখানে ব্রাহ্ম ইনষ্টিটিউশন, সিটি স্কুলে ভর্তি হন হরিচরণ দাশ । পরবর্তীকালে হরিচরণ দাশ এবং দ্বিতীয় পুত্র সত্যানন্দ দাশ দুজনই কলকাতার ব্রাহ্ম মহাবিদ্যালয় সিটি কলেজে ভর্তি হন। সর্বানন্দ দাশ- এর এই দ্বিতীয় পুত্র সত্যানন্দ দাশই জীবনানন্দের বাবা, অর্থাৎ কুসুমকুমারী দাশ-এর স্বামী।
বরিশাল শহরের একটা স্কুলেই কুসুমকুমারী দাশ তাঁর মেয়েবেলায় পড়াশোনা শুরু করেছিলেন। অবশ্য চতুর্থ শ্রেণির পর আর পড়া হয়নি। কেননা সেই স্কুলটি হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে যায়। কলকাতায় কুসুমকুমারী দাশদের আত্মীয়স্বজন ছিল; কাজেই বালিকা কুসুমকুমারী কলকাতার একটি স্কুলে ভর্তি হল ।


‘আমার মা বাবা ’ নামে কবি জীবনানন্দের বিখ্যাত একটি নিবন্ধ রয়েছে, যে নিবন্ধটির মর্যাদা জীবনানন্দ প্রেমিকগণের কাছে ধর্মগ্রন্থের সমান । এই পোস্টের অনেক তথ্যই আমি সেই নিবন্ধ থেকেই টুকেছি।

মা কুসুমকুমারী দাশ সম্বন্ধে ওই নিবন্ধে জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন, ‘আমার মা শ্রীযুক্তা কুসুমকুমারী দাশ বরিশাল শহরে জন্মগ্রহন করেন। তিনি কলকাতার বেথুন স্কুলে পড়েছিলেন। খুব সম্ভব ফার্ষ্ট ক্লাস অবধি পড়েছিলেন, তার পরেই তাঁর বিয়ে হয়ে যায়।তিনি অনায়াসেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ পরীক্ষায় খুব ভালোই করতে পারতেন, এ বিষয়ে সন্তানদের চেয়ে তাঁর বেশি শক্তি ছিল মনে হচ্ছে।’ (আমার মা বাবা)
প্রতিভাবান ছেলের পক্ষ থেকে মায়ের মেধার এরূপ অকুন্ঠ স্বীকৃতি আমাদের মুগ্ধ করে বৈ কী । সেই যাই হোক, একুশ শতকে দাঁড়িয়ে আমাদের কৌতূহল কিন্তু অন্যত্র। তা হল-উনিশ শতকে সামাজিকভাবে অগ্রসর বহু সংস্কারমুক্ত মানুষ ব্রাহ্মসমাজে যোগ দিয়েছিলেন, এবং ব্রাহ্মরাও বিবেচিত হতেন আধুনিক ও উদার মনের মানুষ হিসেবে। নারীশিক্ষার প্রতি ব্রাহ্মসমাজের প্রত্যক্ষ সমর্থন ছিল। অথচ, ব্রাহ্মপিরবারের মেয়ে কুসুমকুমারী দাশ কে বিয়ের জন্য পড়াশোনা ছাড়তে হল? ...
বিয়ের পর এই প্রতিভাময়ী নারীর কি হল-সে প্রসঙ্গে আমি পরে আসছি।
কলকাতায় কুসুমকুমারী দাশ-এর অভিভাবক ছিলেন রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়। ইঁনি ব্রাক্ষ্মসমাজের উপরের সারির একজন নেতা ছিলেন। তাঁরই আগ্রহে ১৮৯৫ সালে প্রকাশিত হল শিশুদের মাসিক পত্রিকা ‘মুকুল’। মুকুল পত্রিকায় লিখতেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, লিখতেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। আরও লিখতেন তরুণি কুসুমকুমারী দাশ। প্রথম বছরেই অর্থাৎ ১৮৯৫ সালেই কুসুমকুমারী দাশ- এর বেশ কয়েকটি কবিতা ছাপা হয়েছিল মুকুল-এ। এগুলোর মধ্যে ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতাটির প্রথম দুটি চরণ আজ প্রবাদবাক্যে পরিণত হয়েছে:

আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।

এবার পুরো কবিতাটি পাঠকরা যাক।

আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।
মুখে হাসি, বুকে বল, তেজে ভরা মন,
‘মানুষ হইতে হবে’-এই তার পণ।

বিপদ আসিলে কাছে, হও আগুয়ান,
নাই কি শরীরে তবে রক্ত মাংস প্রাণ?
হাত পা সবারি আছে, মিছে কেন ভয়,
চেতনা রয়েছে যায়, সে কি পড়ে রয়?

সে ছেলে কে চায় বল-কথায় কথায়
আসে যার চোখে জল, মাথা ঘুরে যায়?
সাদা প্রাণে, হাসি মুখে কর এই পণ-
‘মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন’।

কৃষকের শিশু কিংবা রাজার কুমার
সবারি রয়েছে কাজ, এ বিশ্ব মাঝার,
হাতে প্রাণে খাট সবে, শক্তি কর দান
তোমরা মানুষ হলে দেশের কল্যাণ।

মায়ের কবিতা সম্বন্ধে জীবনানন্দ লিখেছেন, ‘মায়ের কবিতায় আশ্চর্য প্রসাদগুণ (রয়েছে?) । অনেক সময় বেশ ভালো কবিতা বা গদ্য রচনা করছেন দেখতে পেতাম।’ (‘আমার মা বাবা’ )
মুকুল-এ কেবল জীবনানন্দের মা-ই লিখতেন না, লিখতেন জীবনানন্দের পিতা সত্যানন্দ দাশ। কি ছিল তাঁর লেখার বিষয়? তাঁর লেখার বিষয় ছিল: ইতিহাস। ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়নের ওপর সত্যানন্দ দাশ একটি ইতিহাসনির্ভর লেখা লিখেছিলেন। বাঙালি কবিদের মধ্যে জীবনানন্দের কবিতা ইতিহাসচেতনায় মূখর। এখন যেন অনেক কিছুই পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া আমাদের মনে রাখতে হবে জীবনানন্দের মা এবং বাবা যে পত্রিকায় লিখতেন সেই একই পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথও লিখতেন। সন্দেহ নেই, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এ এক তাৎপর্যময় ঘটনা ।
মুকুল পত্রিকা পতিষ্ঠার এক বছর আগে অর্থাৎ ১৯৯৪ সালে সত্যানন্দ দাশ- এর সঙ্গে কুসুমকুমারী দাশ- এর বিয়ের হয়। কুসুমকুমারী দাশ- এর বয়স তখন ১৯। বিয়ের আগে সত্যানন্দ দাশ- এর জীবনের কিছু ঘটনা বলা দরকার। তাতে বরিশালে কুসুমকুমারী দাশ এর শ্বশুরবাড়ীর আবহাওয়া বুঝতে আমাদের কিছুটা সাহায্য করবে।
১৮৮৫ সালের ডিসেম্বর মাসে জীবনানন্দের পিতামহ সর্বানন্দ দাশ দেহরক্ষা করেন। শোকসংবাদ শুনে সত্যানন্দ দাশ এবং তাঁর বড় ভাই হরিচরণ দাশ কলকাতা থেকে বরিশাল এসে শ্রাদ্ধপর্ব সেরে আবার কলকাতায় ফিরে যান। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা আসন্ন। পরীক্ষায় দু ভাইয়ের কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেননি । এঁদের পিতা সর্বানন্দ দাশ, আমি আগেই বলেছি যে, সরকারি চাকরি করতেন। তবে তাঁর ছেলেদের কেউই যে সরকারি চাকরি পাননি তা এক লেখায় সত্যানন্দ দাশ উল্লেখ করেছেন । দু ভাই অথই সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। তারপর হরিচরণ দাশ পোষ্ট অফিসের চাকরি পেলেন। জীবনানন্দের পিতা সত্যানন্দ দাশ হবিগঞ্জে একটা স্কুলে ঢুকলেন পড়াতে। (এই হবিগঞ্জ কি বর্তমান হবিগঞ্জ জেলা?) সেই যাই হোক। ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে অশ্বিনীকুমার দত্ত বরিশাল শহরে ব্রজমোহন ইনষ্টিটিউশন নামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। সত্যানন্দ দাশ সে স্কুলে যোগ দিলেন। তবে চাকরি বেশি দিন করতে পারেননি। সেসব অবশ্য অনেক পরের কথা ...
আমি আগেই ইঙ্গিত দিয়েছি যে সত্যানন্দ দাশ মুকুল পত্রিকায় লিখতেন । হয়তো সেই অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি এবার বরিশালে একটি পত্রিকা সম্পাদনায় উদ্যেগী হলেন। সময়টা ১৯০০ সাল। জীবনানন্দ দাশ দু বছরের শিশু। সত্যানন্দ দাশ ব্রাহ্মসমাজের মুখপাত্র হিসেবে ব্রহ্মবাদী নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করতে শুরু করেন। পত্রিকা সম্পাদনায় তাঁকে সাহায্য করতেন তাঁর ভগ্নিপতি (অর্থাৎ জীবনানন্দের পিসেমশাই (ফুপা) ) মনমোহন চক্রবর্তী। পত্রিকাটির প্রথম দিকের বেশ কিছু কবিতা মনমোহন চক্রবর্তীই লিখেছিলেন; (জীবনানন্দের শৈশবের সাহিত্যিক পরিমন্ডলের কথা ভেবে বিস্মিত হতেই হয়) তবে ব্রহ্মবাদী পত্রিকার অনেক কবিতা লিখেছেন জীবনানন্দের মা কুসুমকুমারী দাশ । সব মিলিয়ে শ’ খানেক। কিন্তু, শ’ খানেক কবিতা কীভাবে রচিত হল? অনুমান করি- সংসারে নানান কাজ ছিল, জটিলতাও কম ছিল না। সে বিষয়ে জীবনানন্দ আমাদের জানাচ্ছেন, ‘ (মা) সংসারের নানা কাজকর্মে খুবই ব্যস্ত আছেন ...এমন সময়ে ব্রহ্মবাদীর সম্পাদক আচার্য মনমোহন চক্রবর্তী এসে বললেন, এক্ষুনি ব্রহ্মবাদীর জন্য তোমার কবিতা চাই, প্রেসে পাঠাতে হবে। লোকে দাঁড়িয়ে আছে। শুনে মা খাতা কলম নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে একহাতে খুন্তি আর একহাতে কলম নাড়ছেন দেখা যেত, যেন চিঠি লিখছেন, বড়ো একটা ঠেকছে না কোথাও; আচার্য চক্রবর্তী কে প্রায় তখনই কবিতা দিয়ে দিলেন।’ (‘আমার মা বাবা’ )
পরবর্তীকালে মনমোহন চক্রবর্তী বরিশাল থেকে এলাহাবাদ বদলী হয়ে যান। ওখান থেকে বের করেন বিখ্যাত প্রবাসী পত্রিকা । এতেও জীবনানন্দের মায়ের কিছু কবিতা ছাপা হয়েছিল। কেবল তাই নয়, কুসুমকুমারী দাশ ‘কবিতা মুকুল’ নামে একটি শিশুতোষ কবিতার বইও বের করেছিলেন। কবিতা ছাড়া গদ্যও লিখেছেন কুসুমকুমারী দাশ । ‘পৌরাণিক আখ্যায়িকা’ নামে একটি বই লিখেছিলেন। এটি ছিল প্রাচীন সংস্কৃত পুরাণের ওপর লেখা গল্প।
তা, কুসুমকুমারী দাশ, আমাদের প্রিয়তম কবিটির মা তাঁর একান্ত ঘরের উঠানে কেমন মানুষ ছিলেন?
সে কথাও জীবনানন্দের লেখাতে উল্লেখ রয়েছে। কবিদের বরিশালের বাড়িটির টিনের ছাদের তলায় ছিল বিরাট এক জমজমাট যৌথ সংসারের কলহাস্যধ্বনি; অনেক মানুষের গুঞ্জনে অহোরাত্র কোলাহল মূখর । (জীবনানন্দের লেখা গল্পউপন্যাসে তার অনেক ছবি পেয়েছি) ... কবির জেঠিমা (হরিচরণ-এর স্ত্রী?) এবং মা দু-হাতে সংসার ঠেলছেন। (এ ক্ষেত্রে আমাদের ভেবে নিতে হবে কলকাতার বেথুন কলেজে পড়া এক কেতাদূরস্ত মেয়ে বরিশালের মতন একটি মফঃস্বল শহরের একটি একান্নবর্তী পরিবারে খেটে মরছে! ) পরিবারের অবস্থা যে বিশেষ সচ্ছল ছিল না, তার ইঙ্গিত আমি আগেই দিয়েছি। তবু কবির ঠাকুরমা প্রসন্নকুমারী দাশ, কবির জেঠিমা এবং কবির মা এই তিন নারীর আপ্রাণ প্রচেষ্টায় প্রতিটি সংসারের প্রতিটি অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতিই সামলে নিতেন। কবির মাই হয়তো এক্ষেত্রে মধ্যমনি ছিলেন বলে অনুমান করি। কেননা, ইঁনিই তো কিশোরী বয়সে লিখেছিলেন:

বিপদ আসিলে কাছে, হও আগুয়ান, নাই কি শরীরে তবে রক্ত মাংস প্রাণ? হাত পা সবারি আছে, মিছে কেন ভয়, চেতনা রয়েছে যায়, সে কি পড়ে রয়?

সংসারের যাঁতাকলে পিষ্ট হতে হতে জীবনানন্দের মা কবিতার লেখার বেশির সময় পাননি। অবশ্য পরিবারটি ছিল আলোকিত, পরিবারের লোকজন কাব্যচর্চার মর্ম ঠিকই বোঝত, তবে নারী বিশাল যৌথপরিবারে ঘানি না-টেনে কাব্য চর্চা করছে-এমন চিত্র পুরুষশাসিক সমাজে যে আজও অকল্পনীয়। সে কারণেই কি জীবনানন্দ খানিকা ক্ষোভের সুরে লিখেছেন, ‘কবিতা লেখার চেয়ে কাজ ও সেবার সর্ব্বাত্মতার ভেতরে ডুবে গিয়ে তিনি ভালোই করেছেন হয়তো। তাঁর কাজকর্মের আশ্চর্য নিষ্ঠা দেখে সেইকথা মনে হলেও ভেতরের খবর বুঝতে পারিনি, কিন্তু তিনি আরো লিখলে বাংলা সাহিত্যে বিশেষ কিছু দিয়ে যেতে পারতেন মনে হয় ।’
সে যাই হোক। কুসুমকুমারী দাশ যে ছেলের জীবন বাঁচিয়েছিলেন সেটাই তাঁর জীবনে সবচে বড় অর্জন বলে মনে করি । এখন সেকথাই বলি। জীবনানন্দের ছেলেবেলায় এক ধরণের যকৃতের রোগ হয়েছিল । বাঁচবার আশা ছিল না। ডাক্তার ‘হাওয়া পরিবর্তনের’ উপদেশ দিলেন। ছেলের মা ছেলেকে নিয়ে গেলেন লখনউ, আগ্রা দিল্লি। সঙ্গে পরিবারের একজন পুরুষসঙ্গী। জলের মতন টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে। আমি আগেই ইঙ্গিত দিয়েছি যে দাশ পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো ছিল না। ছেলেকে বাঁচানোর জন্য কুসুমকুমারী দাশ-এর এমন নিদারুণ প্রচেষ্টাকে যৌথপরিবারের অনেকের কাছেই ‘আত্মঘাতী’ বলে মনে হয়েছিল। তবু মানসিকভাবে ভেঙে পড়েননি জীবনানন্দের মা। যৌথপরিবারের সমালোচনা অগ্রাহ্য করে পশ্চিমের স্বাস্থনিবাসে দীর্ঘ দিন কাটিয়ে ছেলেকে সম্পূর্ণ সুস্থ করেই তবে বরিশালে ফিরে এসেছিলেন।


তথ্যসূত্র:

ক্লিন্টন বি সিলি; অনন্য জীবনানন্দ। অনুবাদ: ফারুক মঈনউদ্দীন।
জীবনানন্দ স্মৃতি।
আবদুল মান্নান সৈয়দ সংকলিত ও সম্পাদিত প্রকাশিত-অপ্রকাশিত কবিতাসমগ্র জীবনানন্দ দাশ
Fakrul Alam; Jibanananda Das Selected Poems with an Introduction , Chronology, and Glossary এই পোষ্ট লিখতে এই বইয়ের
Introduction কিছু কাজে লেগেছে।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29523272 http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29523272 2012-01-16 13:20:58
মহীনের ঘোড়াগুলি ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে কলকাতার ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ ব্যান্ডটির একটি অ্যালবামের প্রচ্ছদ । ব্যান্ডটি বাংলাদেশেও বেশ পরিচিত এবং জনপ্রিয়। কিন্তু,ব্যান্ডটির নাম নিয়ে শ্রোতারা আজও ঘোর অন্ধকারের মধ্যে রয়েছে । ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’-কি এর মানে? একে ওকে জিগ্যেস করে কিংবা উইকিপিডিয়ায় ক্লিক করেও যথাযথ উত্তর মেলে না। উইকিপিডিয়ায় 'মহিনের ঘোড়াগুলি' শীর্ষক আর্টিকেলে Meaning of the band's name নামক শিরোনামে লিখেছে: The literal meaning of Moheen'er Ghora-guli is "Moheen's horses". While this obscure phrase puzzles many of the band's fans, it is actually taken from a poem Ghora ('Horses') by the great modernist Bengali poet Jibanananda Das. The second line of the poem is: Moheener ghoragulo ghash khae Kartiker jyotsnar prantorey... loosely translated as: "Moheen's horses graze on the horizon, in the Autumn moonlight" One of the band's most popular songs, Bhalobashi jyotsnae, is a tribute to the natural beauty of the Bengali countryside; the influence of Jibanananda's pastoral poetry is evident throughout the song. জীবনানন্দ দাশ রূপসী বাংলার রূপে মগ্ন ছিলেন বৈ কী। সেই রকম কলকাতার "মহীনের ঘোড়াগুলি" ব্যান্ডের সদস্যরাও বাংলার রূপে মুগ্ধ । কিন্ত তাতে কি মহীনের ঘোড়াগুলি -এই বাক্যবন্ধের অর্থের কোনও কূলকিনারা হয়? না, হয় না। উইকিপিডিয়ায় আরও লিখেছে: There are other parallels: Jibanananda broke with the literary tradition of his time and introduced modernist themes and diction to Bengali poetry. He is often considered the first Bengali poet to truly break free of Rabindranath's imposing presence. To some extent, Moheener Ghoraguli attempted to do the same for Bengali popular music. জীবনানন্দ দাশ আধুনিক ছিলেন বৈ কী। এবং তিনি রবীন্দ্রনাথের ওপর অচলা ভক্তি রেখেই রবীন্দ্রপ্রভাব এড়িয়েই কবিতা-গল্প এবং উপন্যাস লিখেছেন, ঠিক সেরকমই "মহীনের ঘোড়াগুলি" ব্যান্ডটি attempted to do the same for Bengali popular music. ভালো কথা। কিন্তু তাতে কি মহীনের ঘোড়াগুলি -এই বাক্যবন্ধের অর্থ বোঝা গেল?
না।
কাজেই নিজেদের পথই ধরি। ইতিহাস অনুসন্ধানে ব্রতী হই, এবং জীবনানন্দের "ঘোড়া" কবিতাটি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি।
১৯৪৮ সাল। জীবনানন্দ দাশ ‘সাতটি তারার তিমির’ নামে তাঁর পঞ্চম কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ করলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ফকরুল আলম 'সাতটি তারার তিমির' এর ইংরেজি অনুবাদ করেছেন: The Darkness of Seven Stars. ‘সাতটি তারার তিমির’ কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয় কবিতার শিরোনাম ‘ঘোড়া’। কবিতাটি পাঠ করা যাক:

আমরা যাইনি ম’রে আজো -তবু কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয়;/
মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে;/
প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া যেন -এখানে ঘাসের লোভে চরে/
পৃথিবীর কিমাকার ডাইনামোর প’রে।

আস্তাবলের ঘ্রান ভেসে আসে একভিড় রাত্রির হাওয়ায়;
বিষন্ন খড়ের শব্দ ঝ’রে পড়ে ইস্পাতের কলে;
চায়ের পেয়ালা ক’টা বেড়ালছানার মতো -ঘুমো-ঘেয়ো
কুকুরের অস্পষ্ট কবলে
হিম হয়ে নড়ে গেল ও-পাশের পাইস্ -রেস্তরাঁতে,
প্যারাফিন -লন্ঠন নিভে গেল গোল আস্তাবলে
সময়ের প্রশান্তির ফুঁয়ে;
এইসব ঘোড়াদের নিওলিথ-স্তব্দতার জ্যোৎস্নাকে ছুঁয়ে।




চল্লিশের দশকের কলকাতা ; জীবনানন্দের কলকাতা ...যে শহরে রাতভর হাঁটতেন কবি

বলেছি যে, ১৯৪৮ সালে জীবনানন্দ দাশ ‘সাতটি তারার তিমির’ প্রকাশ করেন। সে সময়টায় কবি কলকাতায় থাকতেন। কবি বলেই কী এক ঘোরের মধ্যে রাতভর নিঝঝুম কলকাতা শহরের অলিতে-গলিতে এবং বড় রাস্তায় হাঁটতেন । সে সময়ই একবার এক জোৎস্নারাতে রাস্তার পাশে একটি আস্তাবল দেখে থমকে দাঁড়ালেন কবি। পরবর্তীতে সে অভিজ্ঞতার কথা ‘ঘোড়া’ কবিতায় কবি লিখেছেন এভাবে:

আস্তাবলের ঘ্রান ভেসে আসে একভিড় রাত্রির হাওয়ায়;

তার পরপরই কবির মনে হল:

বিষন্ন খড়ের শব্দ ঝ’রে পড়ে ইস্পাতের কলে;

কি এর মানে? কবি কি নাগরিক যান্ত্রিকতা বুঝিয়েছেন? সম্ভবত। কবি এর পর আস্তাবলের চারপাশের সুরিয়ালিষ্ট বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন:

চায়ের পেয়ালা ক’টা বেড়ালছানার মতো -ঘুমো-ঘেয়ো/
কুকুরের অস্পষ্ট কবলে/
হিম হয়ে নড়ে গেল ও-পাশের পাইস্ -রেস্তরাঁতে,/
প্যারাফিন -লন্ঠন নিভে গেল গোল আস্তাবলে/
সময়ের প্রশান্তির ফুঁয়ে;/
এইসব ঘোড়াদের নিওলিথ-স্তব্দতার জ্যোৎস্নাকে ছুঁয়ে।

বোঝা যায়। আস্তাবলের পাশেই একটি পাইস্ -রেস্তরাঁ। তার ‘ চায়ের পেয়ালা ক’টা বেড়ালছানার মতো -ঘুমো-ঘেয়ো কুকুরের অস্পষ্ট কবলে হিম হয়ে নড়ে গেল’। কি বিকল্পধারার বাক্য বিন্যাস!, কি ভীষণ অন্যরকম ভাবনা! আধুনিক জীবনবোধে আক্রান্ত জীবনানন্দের বিক্ষত হৃদয়টি উপলব্দ হয় যেন। সেই যাই হোক। কবিতার শেষ তিনটি লাইন এরকম:

প্যারাফিন -লন্ঠন নিভে গেল গোল আস্তাবলে/সময়ের প্রশান্তির ফুঁয়ে;/এইসব ঘোড়াদের নিওলিথ-স্তব্দতার জ্যোৎস্নাকে ছুঁয়ে।

গোল আস্তাবলে সময়ের প্রশান্তির ফুঁয়ে প্যারাফিন -লন্ঠন নিভে গেল। এইসব ( অর্থাৎ আস্তাবলের) ঘোড়াদের নিওলিথ-স্তব্দতার জ্যোৎস্নাকে ছুঁয়ে। নিওলিথ-স্তব্দতার জ্যোৎস্নাকে ছুঁয়ে-মানে কি? তার কিছু ইঙ্গিত পেতে কবিতাটির প্রথমে ফিরে যেতে হবে।

আমরা যাইনি ম’রে আজো -তবু কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয়; /
মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে;/
প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া যেন -এখানে ঘাসের লোভে চরে/
পৃথিবীর কিমাকার ডাইনামোর প’রে। /

তখন একবার বলেছিলাম যে কবি রাতভর হাঁটতেন নিঝঝুম কলকাতা শহরের অলিতে-গলিতে এবং বড় রাস্তায়। সে সময়ই একবার রাস্তার পাশে আস্তাবল দেখে থমকে দাঁড়ালেন। কবির মনে হচ্ছিল আস্তাবলের ঘোড়াগুলি যেন বলছে: আমরা যাইনি ম’রে আজো -তবু কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয়। কিন্ত, কি এর মানে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ফকরূল আলম অনুবাদ করেছেন:Not that we are all done for-new scenes still come to sight; কিন্তু কি এর মানে? এতেও তো মানে বোঝা যাচ্ছে না। এই লাইনের অর্থ কি এই যে... ঘোড়ারা আজও মরে যায়নি। অর্থাৎ, ঘোড়ারা আজও বেঁচে আছে । এই বক্তব্যের সঙ্গে ‘তবু কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয়’-এই বাক্যর সম্পর্ক বোঝা যাচ্ছে না; যাই হোক। অগ্রসর হই -

মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে;

মহীনের ঘোড়াগুলো মনে কি? মহীন নামে কোনও সহিসের ঘোড়া কি? নাকি কবি প্রাচীন কোনও সময়ে ইঙ্গিত দিচ্ছেন? সেরকম হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আমরা জানি জীবনানন্দর কবিতাগুলি ইতিহাসচেতনায় মুখর। যিনি নিজের পরিচয় দিয়েছেন ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে।’ এ কারণেই মনে হয়: মহীনের ঘোড়াগুলো মানে সুপ্রাচীন সেই মহেঞ্জোদারো নগরের ঘোড় নয় তো? হরপ্পা সভ্যতার যে নগরটির উদ্ভব সেই ২২০০ থেকে ১৭০০ খ্রিস্টপূর্বে । হ্যাঁ, সেরকমই হওয়ার কথা।

প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া যেন -এখানে ঘাসের লোভে চরে/
পৃথিবীর কিমাকার ডাইনামোর প’রে।

জীবনানন্দ লিখেছেন: প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া যেন। হরপ্পা সভ্যতা তাম্রপ্রস্তর যুগের সভ্যতা হলেও Neolithic period বা নব্যপ্রস্তর যুগে সভ্যতাটির সূত্রপাত ; মাঠ পর্যায়ে গবেষনা করে প্রত্নতাত্ত্বিকগণ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, নবোপলীয়, অর্থাৎ নব্যপ্রস্তর যুগে খাদ্য ও ঘাসের অভাব দেখা দিয়েছিল। নিজেদের এবং পশুদের খাদ্য যোগানোর জন্য নদীর তীরই ছিল উপযুক্ত জায়গা। কাজেই ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ নদীর তীরে বসতি গড়তে থাকে। ঐতিহাসিকদের মতে হরপ্পা সভ্যতার কালসীমা খ্রিস্টপূর্ব ২২০০ থেকে ১৭০০।



ধুতি পাঞ্জাবি পরা সাদাসিদে চেহারার বরিশালের এই কলেজ শিক্ষকটি ছিলেন তীব্র আধুনিক ... সেই চল্লিশের দশকেই যাঁর কবিতার বইয়ের নাম The Darkness of Seven Stars.

এবার কবিতার শেষ তিনটি লাইনে আবার ফিরে যাই।

প্যারাফিন -লন্ঠন নিভে গেল গোল আস্তাবলে
সময়ের প্রশান্তির ফুঁয়ে;
এইসব ঘোড়াদের নিওলিথ-স্তব্দতার জ্যোৎস্নাকে ছুঁয়ে।

চল্লিশের দশকে কলকাতার রাত্রিতে হাঁটতে হাঁটতে জীবনানন্দ আস্তাবলে যে ঘোড়াদের দেখেছিলেন তাঁর ‘মহিনের ঘোড়া’ প্রাচীন মহেঞ্জোদারোর ঘোড়া মনে হয়েছিল । যে ঘোড়াগুলি ঘাস খেত কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে। আজও পৃথিবীতে জ্যোৎস্নার আলো ছড়ায়; কলকাতার আস্তাবলের ঘোড়াদের নিওলিথ-স্তব্দতার জ্যোৎস্নাকে ছুঁয়ে। প্যারাফিন -লন্ঠন নিভে গেল গোল আস্তাবলে সময়ের প্রশান্তির ফুঁয়ে; ...ঘোড়া তাহলে কোনও কিছুর প্রতীক? সময়ের কি? যে সময়ের দুটি প্রান্তে ঘোড়ারা বেঁচে রয়েছে এবং দৃশ্যের জন্ম হচ্ছে। যা হোক। এত প্রশ্ন আর উদ্বৃতির পরও হয়তো সবটা বোঝানো গেল না। কবিতা বলেই।
সে যাই হোক। কলকাতায় ১৯৭৫ সালে "মহীনের ঘোড়াগুলি" ব্যান্ডটি গড়ে ওঠে কয়েকজন তরুণ মিউজিশিয়ানের উদ্যেগে। আর তখনই ব্যান্ডটির নাম "মহীনের ঘোড়াগুলি" রাখা হয় । ঘটনাটি হয়তো অনেকটাই আকস্মিক। হয়তো খানিকটা অ্যাবসার্ডও। কেননা, তখনকার কলকাতার সাহিত্যমহলে ‘সুরিয়ালিজম’,‘যাদুবাস্তবতা’, কিংবা ‘ অ্যাবসার্ডবাদ’ ইত্যাদি শব্দগুলি সাহিত্যরসিকের মুখে মুখেই ফিরছিল। এসব হয় তো অন্য প্রসঙ্গ। কিন্তু, 'মহীনের ঘোড়াগুলো'-র মানে যে মহেঞ্জোদারো নগরের ঘোড়া তারই একটা ইঙ্গিত তো আমরা এই আলোচনায় পেলাম এবং যথারীতি জীবনানন্দের ইতিহাস চেতনার গভীরতায় মুগ্ধ হলাম।
জীবনানন্দ দাশ-এর ‘ঘোড়া’ কবিতার ইংরেজি অনুবাদ ।

Horses (Ghora)

Not that we are all done for-new scenes still come to sight;
Maheen’s horses yet munch grass in Kartik’s late autumn moonlight;
As if horses from some Paleolithic age-lured
Into grazing in a dreadful dynamo of a world.
The stink from the stable drifts in with the onrushing night breeze;
The sad sound of rustling straw rubs onto steel machines;
The few empty teacups are like kittens-asleep-under the slack watch
of many dogs.
Chilled, they make for the cheap restaurant close by,
The placid puff of time blows out the paraffin lamp of the stable
Caressing the neolithic –still moonlight of these horses.

(অনুবাদ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ফকরুল আলম।)
শেষ করছি ঈষৎ অপ্রাসঙ্গিক অথচ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ একটি প্রসঙ্গের অবতারণা করে। মহিনের ঘোড়াগুলি সম্বন্ধে ইউইকিপিডিয়া লিখেছে ( যা আগেও উল্লেখ করেছি) He (মানে জীবনানন্দ দাশ ) is often considered the first Bengali poet to truly break free of Rabindranath's imposing presence. To some extent, Moheener Ghoraguli attempted to do the same for Bengali popular music. কিন্তু আমি মনে করি রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করা যায় না। অঞ্জন দত্ত পরিচালিত ব্যান্ড মিউজিক নিয়ে নির্মিত ২০১১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘রঞ্জনা আমি আর আসব না’ ছবিটির একটি রবীন্দ্রসংগীতই তার প্রমান:





রবীন্দ্রনাথ। চিরকালের, চিরদিনের। জীবনানন্দ যাঁকে উল্লেখ করেছেন "আমাদের সময়ের শ্রেষ্ঠ মনিষী হিসেবে।"

মহিনের ঘোড়াগুলি নিয়ে ব্লগার নাহোল এর একটি পোস্ট
Click This Link

তথ্যসূত্র:

আবদুল মান্নান সৈয়দ সংকলিত ও সম্পাদিত প্রকাশিত-অপ্রকাশিত কবিতাসমগ্র জীবনানন্দ দাশ
Fakrul Alam; Jibanananda Das Selected Poems with an Introduction , Chronology, and Glossary
Click This Link

উৎসর্গ:

ডাক্তার মুগ্ধকে, যিনি গতকাল আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন, যাঁকে আমি কখনও দেখিনি, তবে জানি যে তিনিও জীবনানন্দ ভালোবাসতেন, আর "মহিনের ঘোড়াগুলি" শুনতেন ...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29522670 http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29522670 2012-01-15 11:57:20
হরপ্পা সভ্যতা (দ্বিতীয় পর্ব) গতকালই আমি হরপ্পা সভ্যতার ওপর ধারাবাহিক লেখার প্রথম কিস্তিটি পোস্ট করেছি। সে পোস্টের ভূমিকায় লিখেছি যে, হরপ্পা সভ্যতা ভারতবর্ষের প্রাচীনতম সভ্যতা । এবং হরপ্পা সভ্যতার আবিস্কার একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কেননা, এই আবিস্কারের পূর্বে মনে করা হত যে ভারতের ইতিহাসের সূচনা আর্যদের ভারতবর্ষে আসার পর থেকে । আজ আর এ কথার কোনও ভিত্তি নেই। হরপ্পা সভ্যতা আবিস্কারের পর ভারতীয় সংস্কৃতির প্রাচীনত্ব এবং মৌলিকত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছে। অন্তত পাঁচ হাজার বছরের পরনো হরপ্পা সভ্যতাটি প্রাচীনত্বের দিক থেকে মিশর-ব্যাবিলন আসিরিয়ার সমকক্ষতা অর্জন করেছে। সে যাই হোক। প্রাগৈতিহাসিক ভারতবর্ষে সিন্ধু নদের অববাহিকায় হরপ্পা সভ্যতা গড়ে ওঠার সুনির্দিষ্ট কারণ ছিল। মাঠ পর্যায়ে গবেষনা করে প্রতœতাত্ত্বিকগণ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, নবোপলীয়, অর্থাৎ নব্যপ্রস্তর যুগে খাদ্য ও ঘাসের অভাব দেখা দিয়েছিল। নিজেদের এবং পশুদের খাদ্য যোগানোর জন্য নদীর তীরই ছিল উপযুক্ত জায়গা। কাজেই ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ নদীর তীরে বসতি গড়তে থাকে। ঐতিহাসিকদের মতে হরপ্পা সভ্যতার কালসীমা খ্রিস্টপূর্ব ২২০০ থেকে ১৭০০। মিশর কিংবা মেসোপটেমিয় সভ্যতার তুলনায় হরপ্পা-সংস্কৃতি সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান সীমিত। এর প্রধান কারণ লিখিত দলিলের অভাব। প্রায় হাজার দুয়েক সীল পাওয়া গেলেও সেগুলির পাঠোদ্ধার হয়নি। প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননের (archaeological excavation ) ফলে যে তথ্য পাওয়া গিয়েছে তারই ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। অবশ্য এই খননকার্যও মহেনজোদারোয় ভূগর্ভস্থ কয়েকটি স্তর জলমগ্ন থাকায় পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। সুবিশাল হরপ্পা সংস্কৃতির আয়তন সব মিলিয়ে ১২,৫০,০০০ বর্গ কিলোমিটার ।এ প্রসঙ্গে একজন ভারতীয় ঐতিহাসিক লিখেছেন: The total geographical area over which this civilization flourished is more than 20 times of the area of Egyptian and more than 12 times of the area of Egyptian and Mesopotamian civilizations combined.




হরপ্পা সভ্যতার মানচিত্র।১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় সিন্ধ অঞ্চলে সব মিলিয়ে চল্লিশটির মতন প্রত্নক্ষেত্র আবিস্কার হয়েছিল। এর পর গত ৫০/৬০ বছরে সব মিলিয়ে ১৪০০ প্রাচীন বসতি আবিস্কৃত হয়। এর মধ্যে ৯২৫ টি ভারতে; এবং ৪৭৫ টি পাকিস্তানে। কাজেই বর্তমানকালের রাজনৈতিক সীমানায় হরপ্পা-সংস্কৃতির বিচার করা যাবে না, কাজেই হরপ্পা-সংস্কৃতির সমীক্ষা চালাতে হবে সভ্যতাটি ভৌগোলিক প্রেক্ষপটে। যা বিশাল এক ভূখন্ডে ছড়িয়ে রয়েছে- পশ্চিমে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের সুতকাজেন্দর; পুবে ভারতের উত্তরপ্রদেশের মিরাট জেলার আলমগীরপুর; দক্ষিণে মহারাষ্ট্রের আহমদনগর জেলার ধাইমাবাদ; এবং উত্তরে জন্মু এবং কাশ্মীরের আখনুর জেলার মানডা। পুব-পশ্চিমে সব মিলিয়ে ১৬০০ কিলোমিটার। এবং উত্তরদক্ষিণে ১৪০০ কিলোমিটার।

এই পর্বে আমি হরপ্পা সভ্যতার নগরগুলির রাস্তাঘাট ও দালানকোঠা নিয়ে আলোচনা করব । এ ব্যাপারে প্রথমেই আমি যে কথাটা বলে নিতে চাই তা হল হরপ্পা সভ্যতা হল নগর সভ্যতা, এবং নগর ঘিরে থাকা কৃষিজমি এই সভ্যতার অন্নের সংস্থান করেছে। হরপ্পা সভ্যতা কেবল নগর সভ্যতাই নয়, এর নগরগুলি রীতিমতো সুপরিকল্পিত । রাস্তাগুলি তৈরি করা হয়েছিল সোজা উত্তর-দক্ষিণ এবং পূর্ব পশ্চিমে। কাজেই দেখতে ছিল অনেকটা গ্রিডের আকার। ৪,০০০ বছর আগের সুপ্রাচীন নগর পরিকল্পনাবিদদের চিন্তাভাবনা দেখে বিস্মিত হতেই হয়। নগরের প্রধান সড়কগুলি ছিল ৩৫ ফুট চওড়া। সবচে অপরিসর রাস্তা চওড়ায় ছিল ১০ ফুট প । গলি ছিল চওড়ায় ৫ ফুট ।



হরপ্পা সভ্যতার একটি নগরের মানচিত্র; যেনবা আধুনিক কোনও শহরেরই মানচিত্র দেখছি ওপর থেকে ! ভেবে বিস্মিত হই, ওই অঞ্চলের প্রাচীন কৃষকেরা আজ থেবে ৪/৫ হাজার বছর আগে কী এক বিপুল উদ্যমে কৃষিজমির মাঝখানে পরিকল্পিত নগরের সৃষ্টির কথা ভাবলেন! শুধু ভাবলেনই না- সেই সঙ্গে কারিগরি জ্ঞানের অধিকারী হলেন। যে কোনও নগরেরই ক্ষুদ্রতম ভিত হল ইট (বা আজকের ‘হলো ব্লক’)। সে ইটের নির্মাণ কৌশল তারা কি ভাবে আয়ত্ব করলেন? কি ভাবে আয়ত্ব করলেন সে ইট বিন্যাসের হরাইজেন্টাল এবং ভার্টিক্যাল জ্যামিতিক/গাণিতিক জ্ঞান? আমি মনে করি যে হরপ্পা সংস্কৃতি উপলব্দি করতে হলে আমাদের দীর্ঘ সময় ধরে এই বিষয়টি নিয়েই ভাবতে হবে। আরও ভাবতে হবে গণিতশাস্ত্রের প্রাচীন ভারতের অবদান অসামান্য। কেননা, বিশ্বসভ্যতায় সংখ্যা হিসেবে ‘শূন্যের’ ধারণা এদেরই। এই গণিতজ্ঞানের উৎপত্তি হরপ্পা সভ্যতায় নয় তো?

আর সব প্রাচীন নগরের মতোই হরপ্পা সভ্যতার নগরগুলিতে ছিল নগরপ্রাচীরের বেষ্টনী। এর পর গভীর পরিখা বা খাল । পশ্চিমদিকে সুরক্ষিত দূর্গ। পশ্চিমদিকে, কেননা, ওই পথ দিয়েই শক্রর আক্রমনের সম্ভবনা। তাই কিন্তু হয়েছিল। ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বে আর্যরা ওই পশ্চিমদিক থেকেই ভারতের সিন্ধু অঞ্চলে প্রবেশ করেছিল। সে যাই হোক। সব কিছুর আগে প্রতিরক্ষা। সে কারণেই দূর্গগুলিতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সৈন্য এবং অস্ত্রশস্ত্র মজুদ ছিল। দুর্গের দৈর্ঘ্য ১,২০০ ফুট এবং প্রস্থ ৬০০ ফুট। দুর্গের চারিদিকে আবার ৪০ ফুট উঁচু প্রতিরক্ষা দেয়াল ছিল। কাদামাটি এবং কাঁচা ইট দিয়ে দুর্গের দেওয়াল তৈরি করা হয়েছিল। দুর্গের বাইরের অংশে পোড়ানো ইটের দেয়ালটি ৪ ফুট পুরু আরেকটি অতিরিক্ত দেয়াল ছিল। আর ছিল সুউচ্চ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। এসবই যাযাবর ইরানি আর্যরা গুঁড়িয়ে দিয়েছিল সেই ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বে। বৈদিক সাহিত্যে আর্যদের বলা হয়েছে ‘নগর ধ্বংসকারী’। প্রধানতম বৈদিক দেবতা ইন্দ্রকে ‘পুনন্দর’ বলা হয়ে ছে। এর মানে,‘পুর (নগর) ধ্বংসকারী’।



হরপ্পা নগরের মানচিত্র। রাস্তার পাশে সমান দূরত্বে ছিল সড়ক বাতি বা ল্যাম্পপোষ্ট। এবং ময়লা ফেলার জন্য ছিল ডাস্টবিন! ভাবা যায়?

নগরে প্রবেশের জন্য ছিল বিশাল নগর তোরণ; এবং সে তোরণে সাঁটা থাকত সাইনবোর্ড। সে সাইনবোর্ডে জরুরি বিজ্ঞপ্তি লেখা থাকত সম্ভবত । তো, কি ভাবে সাইনবোর্ড তৈরি করা হত? কাঠের তক্তার ওপর জিপসামের পেস্ট দিয়ে লেপ্টে । হরপ্পা এবং মহেনজোদারো নগর দুটি বিভক্ত ছিল দুটি অংশে। একটি অংশ সমতলের চেয়ে কিছুটা উঁচু; সেখানেই ছিল নগরদূর্গটি। বাকি অংশটি নীচু। উঁচু দুর্গ এলাকায় বাস করত অভিজাত শ্রেণির মানুষ । আর নীচু এলাকায় বাস করত মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র শ্রেণি। (ঐতিহাসিকদের মতে হরপ্পাসমাজে মধ্যবিত্ত শ্রেনির সংখ্যা বেশি ছিল এবং এই শ্রেনিটি হরপ্পাসমাজে গুরুত্বপূর্ণ ছিল) ... সে যাই হোক। নগরে সড়ক এবং গলিপথ ছাড়াও ছিল বড় বড় ভবন, বাজার এবং ছোটবড় ঘরবাড়ি। তবে কোনও বাড়িই দোতলা কি তিনতলার বেশি উঁচু হত না। (এই পোষ্টের শেষে একটি ভিডিও চিত্র সংযুক্ত করেছি। ভিডিও চিত্রটি মহেনজোদারো নগর সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা দেবে । )



পাখির চোখে হরপ্পাসভ্যতার একটি নগর।

প্রাচীন হরপ্পাবাসীরা কি ভাবে তাদের বাড়িঘর তৈরি করত ? প্রধানত পলিমাটির তৈরি ইট দিয়ে। তার সঙ্গে মেশাত কাঠ আর নলখাগড়া। কোথাও আবার ব্যবহার করত পাথর। ইটের আয়তয় ছিল ৭.৫/১৫/৩০ সেন্টিমিটার । অবশ্য দূর্গ প্রাচীর নির্মাণের ইটের আয়তন ছিল ১০/২০/৪০ সেন্টিমিটার।দরজা জানালার উপাদান ছিল কাঠ বা ঘন ভাবে পাকানো কিছু-যেমন ম্যাট। মেঝে তৈরি করত ঘন কাদা দিয়ে। স্নানঘর এবং নর্দমা তৈরি করত পোড়ানো ইট কিংবা পাথর দিয়ে। কিছু বাড়ি ছিল ইটের এবং পোড়ানো টেরাকোটা কেক-এর তৈরি । বাড়ির ছাদ আবিস্কৃত হয়নি। ছাদ সম্ভবত কাঠের বিমের ভিতর নলখাগড়া এবং কাদা ভরে তৈরি করত।



কতযুগ আগে যেন ছিল কোলাহলমূখর এ নগর ...আজ মৌন আজ কেবলি স্মৃতি

হরপ্পা সভ্যতার নগরগুলির ভবন এবং বসতবাড়িগুলিকে প্রত্নতাত্ত্বিকগণ তিনভাগে ভাগ করেছেন। (ক) ব্যাক্তিগত বাড়ি;(খ) ছোট ছোট বাড়ি ঘেরা বড় বাড়ি; এবং (গ) বড় সরকারি দালান। এসবের মধ্যে এক কক্ষের বাড়ি যেমন আছে তেমনি আছে প্রাঙ্গন ঘেরা বিভিন্ন আকারের ১০/১২টি কক্ষবিশিষ্ট বাড়িও। রাস্তার দিকে দরজা এবং জানালা ছিল না। দেয়াল থাকার কারণে রাস্তার থেকে বাড়ি দেখা যেত না । কাজেই প্রাঙ্গনে কি হতো না হতো তা পথিক দেখতে পেত না। বাড়ি হত দোতলা। এমনকী তিনতলাও! রান্নাবান্না ঘরের ভিতরেই করত। তাছাড়া প্রতিটি বাড়িতেই ছিল স্নানাগার। কিছু কিছু বাড়ির দোতলায় ছিল স্নানাগার! দরজা বানাত কাঠের ফ্রেম দিয়ে; আর দরজা চৌকাঠে থাকত ইটের ছোট গাঁথুনি ।দরজায় রং করত, থাকত অলঙ্করণ। (হরপ্পা সভ্যতার শিল্প সম্পর্কে আলোচনা করব তৃতীয় পর্বে ) ঘরের জানালা ছোট হত। দুবাড়ির মাঝখানে থাকত অলিখিত সীমান্ত।



মহেনজোদারোর বৃহৎ স্নানাগার; এত শতাব্দী পর আজও অটুট।

মহেনজোদারো নগরের একটি বৃহৎ স্নানাগার আবিস্কৃত হয়েছে । ইটের তৈরি স্নানাগারটির ভিতরে ছিল একটি জলাধার - যার গভীরতা ছিল ৮ফুট এবং চওড়ায় ২৩ ফুট এবং দৈর্ঘে ৩০ ফুট। দোতলা স্নানাগারটি চারধারে ছিল সিঁড়ি। চারিদিকে ছিল পোর্টিকো আর ঘর। মেঝেটি ছিল মসৃণ ইটের তৈরি । পাশের বড় কুয়া থেকে পানি সরবরাহ করা হত । কুয়ার এক প্রান্তে ছিদ্রে নর্দমা। জলাধারটি সম্ভবত ধর্মীয় কৃত্য পালনের জন্য ব্যবহৃত হত।



কুয়া? হরপ্পাসভ্যতায় নগরবাসীর জন্য পানি সরবরাহের চমৎকার ব্যবস্থা ছিল। পথের ধারে অনেক কূপ খনন করা হতো। অনেক বাড়ির আঙ্গিনায় কূপ ছিল।গলিপথের ধারেও কূপ ছিল। কূপে দড়ি আর কাঠের বালতি ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

মহেনজোদারোর নগরের আয়তন ছিল এক বর্গমাইলের মতন। আর হরপ্পা নগরের সীমানা ছিল প্রায় আড়াই বর্গমাইল।প্রশ্ন উঠতেই পারে এত মানুষের ভরনপোষন কী ভাবে হত। বলছি। হরপ্পা ও মহেনজোদারোয় খননকার্যের ফলে জানা গেছে যে নগরের চারপাশে ছিল কৃষিজমি। তাতে উৎপন্ন হত যব ও গম। এমনটাই ছিল স্বাভাবিক। কেননা কৃষির উদ্বৃত্ত থেকেই নগর গড়ে ওঠে। কৃষিজমি বাদেও ছিল নদী; মহেনজোদারো সিন্ধুনদের তীরে, হরপ্পা রাভী নদীর তীরে। নদী ছাড়াও সেকালে বনভূমি এবং চারণভূমি। এতে করে শিকারী এবং খাদ্য সংগ্রাহক শ্রেণির অস্তিত্বের কথা অনুমান করা যায়। চারণভূমি নগরে দুধ, মাংস, হাড় ও চামড়ার যোগান দিত । নদীপথে নৌবাণিজ্য গড়ে উঠেছিল।



অতীত নগরের দিকে অভিভূত হয়ে দেখছেন বর্তমান কালের এক মানুষ

এর আগে ভরনপোষনের বিষয়টি তুলেছিলাম। হরপ্পায় দুর্গের উত্তরে আবিস্কৃত হয়েছে বিশাল একটি শস্যাগার। যার আয়তন ১৬৯ ফুট/১৩৫ ফুট।বিশিষ্ট ঐতিহাসিক বাসাম একে রাষ্ট্রীয় ব্যাঙ্কের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এর কাছে রয়েছে পাথরের তৈরি একটি উচুঁ মঞ্চ। ওই মঞ্চেই সম্ভবত শস্য মাড়াই করা হত। শস্যাগার সংলগ্ন কক্ষগুলি ছিল শ্রমিকদের বাসস্থান । ঐতিহাসিক মার্টিমার হুইলার বলেছেন,‘কী পরিকল্পনার বৈশিষ্ট্যে, কী বিস্ময়কর উৎকর্ষে, সিন্ধু উপত্যকার শস্যাগারগুলির সঙ্গে তুলনীয় কোনও শস্যাগার খৃঃ পূঃ পঞ্চম শতাব্দীর পূর্বে পৃথিবীর কোথাও পাওয়া যায়নি। সেদিক থেকে এগুলি অনন্য। ’



হরপ্পা সভ্যতা মানেই ইট আর ইটের রাজ্য; সেকালের রিয়েল এস্টেট কোম্পানী গুলোর ব্যবসাপাতি যে রমরমা ছিল সেটি বোঝাই যায়<img src=" style="border:0;" /> !

হরপ্পা সভ্যতার নগরসমূহের পয়ঃপ্রণালী ছিল অত্যন্ত উন্নতমানের। নগরায়নের এমন আধুনিক ধারণা অন্য কোনও প্রাচীন সভ্যতায় দেখা যায়নি। প্রতিটি বাড়িতে স্নানাগার ও ময়লা পানি বের হওয়ার জন্য ড্রেনের ব্যবস্থা ছিল। এই ড্রেনগুলি প্রধান ড্রেন বা পয়ঃপ্রণালীর সঙ্গে যুক্ত ছিল। ড্রেনগুলির মধ্যে কিছু ছিল মাটির ওপর দিয়ে আবার কিছু ছিল মাটির নীচ দিয়ে। ড্রেন তৈরি করা হত পোড়ানো ইট দিয়ে। ড্রেনের প্রধান মুখটি থাকত নদীর দিকে। নিয়মিত ড্রেনের পাইপ পরিস্কার করা হত। এসব কারণে একজন ভারতীয় ঐতিহাসিক আক্ষেপ করে বলেছেন, "বর্তমান ভারতের অনেক শহরেরও এত উন্নতমানের পয়ঃপ্রণালী নেই!"



বর্তমান কালের শিল্পীর চোখে হরপ্পা সভ্যতার একটি নগর।


মহেনজোদারো নগরের ওপর নির্মিত একটি ভিডিও চিত্র; এই ভিডিও চিত্রটিতে আরও অনেক কিছুর সঙ্গে মহেনজোদারের বৃহৎ স্নানাগারটি রয়েছে। তাছাড়া নগর জুড়ে ইটের ব্যবহার লক্ষনীয়। যে প্রশ্নটি আগেই তুলেছি যে ... কি ভাবে আয়ত্ব করলেন সে ইট বিন্যাসের হরাইজেন্টাল এবং ভার্টিক্যাল জ্যামিতিক/গাণিতিক জ্ঞান?


ক্রমশ ...

ছবি: ইন্টারনেট।
তথ্যসূত্র: শেষ কিস্তিতে সংযুক্ত করা হবে।

প্রথম পর্বের লিঙ্ক
Click This Link]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29522151 http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29522151 2012-01-14 11:48:43
হরপ্পা সভ্যতা (প্রথম পর্ব) হরপ্পা সভ্যতা ভারতবর্ষের প্রাচীনতম সভ্যতা । সভ্যতাটির আবিস্কার ভারতের ইতিহাসে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কেননা, এই আবিস্কারের পূর্বে মনে করা হত যে আর্যদের ভারতবর্ষে আসার পর থেকে ভারতের ইতিহাসের সূচনা । হরপ্পা সভ্যতা আবিস্কারের পর ভারতীয় সংস্কৃতির প্রাচীনত্ব এবং মৌলিকত্ব প্রমাণ হয়েছে। অন্তত পাঁচ হাজার বছরের পুরনো হরপ্পা সভ্যতাটি প্রাচীনত্বের দিক থেকে মিশর-ব্যাবিলন আসিরিয়ার সমকক্ষতা অর্জন করেছে। সে যাই হোক। প্রাগৈতিহাসিক ভারতবর্ষে হরপ্পা সভ্যতা গড়ে ওঠার সুনির্দিষ্ট কারণ ছিল। মাঠ পর্যায়ে গবেষনা করে প্রত্নতাত্ত্বিকগণ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, নবোপলীয়, অর্থাৎ নব্যপ্রস্তর যুগে খাদ্য ও ঘাসের অভাব দেখা দিয়েছিল। মানুষ এবং পশুখাদ্য যোগানোর জন্য নদীর তীরই ছিল উপযুক্ত জায়গা। কাজেই ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ নদীর তীরে বসতি গড়তে থাকে। এই ঘটনা ঘটেছিল ২২০০ খ্রিস্টপূর্বের আগে। কেননা, ঐতিহাসিকদের মতে হরপ্পা সভ্যতার কালসীমা খ্রিস্টপূর্ব ২২০০ থেকে ১৭০০। সে যাই হোক। মিশর কিংবা মেসোপটেমিয় সভ্যতার তুলনায় হরপ্পা-সংস্কৃতি সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান সীমিত। এর প্রধান কারণ হরপ্পা সভ্যতার লিখিত দলিলের অভাব। হরপ্পা সভ্যতার বিভিন্ন নগরে প্রায় হাজার দুয়েক সীল পাওয়া গেলেও আজও সেগুলির পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়নি। প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননের (archaeological excavation) ফলে যে তথ্যসমূহ পাওয়া গিয়েছে তারই ভিত্তিতে হরপ্পা সভ্যতা সম্বন্ধে আমাদের ধারণা গড়ে উঠেছে। অবশ্য মহেনজোদারোয় ভূগর্ভস্থ কয়েকটি স্তর জলমগ্ন থাকায় খননকার্যও পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। হরপ্পা সংস্কৃতি সুবিশাল ভূখন্ডে ছড়িয়ে আছে। আয়তন সব মিলিয়ে ১২,৫০,০০০ বর্গ কিলোমিটার ।এ প্রসঙ্গে একজন ভারতীয় ঐতিহাসিক লিখেছেন:The total geographical area over which this civilization flourished is more than 20 times of the area of Egyptian and more than 12 times of the area of Egyptian and Mesopotamian civilizations combined.



হরপ্পা সভ্যতার মানচিত্র

প্রথম দিকে হরপ্পা সংস্কৃতিটি সিন্ধ সভ্যতা নামেও পরিচিত ছিল। তবে, হরপ্পা সংস্কৃতি কে "সিন্ধ সভ্যতা" অবহিত করলে ভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। কেননা প্রথম দিকে প্রাচীন এই সভ্যতাটির আবিস্কার সিন্ধ নদীর উপত্যকায় হলেও পরবর্তীকালে তার বাইরেও বহু প্রত্নক্ষেত্র আবিস্কৃত হয়েছে যা হরপ্পা-সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যসূচক। তাছাড়া হরপ্পার এক নগরে সভ্যতাটির প্রাথমিক নিদর্শন পাওয়া যায় বলেই সভ্যতার নাম হরপ্পা সভ্যতা হওয়াই যুক্তিযুক্ত। এ প্রসঙ্গে ভারতীয় ঐতিহাসিক মাখখান লাল লিখেছেন: A culture may also be named after the site from where it came to be known for the first time.



হরপ্পা সভ্যতা ভারত এবং পাকিস্তান -এ দু দেশেই ছড়িয়ে আছে।

এবার কী করে হরপ্পা সভ্যতা আবিস্কৃত হল সে বিষয়ে কিছু বলি।
১৮২৬ খ্রিস্টাব্দ। চার্লাস ম্যাসন (প্রকৃত নাম অবশ্য জেমস লুইস) নামে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন সৈন্য এবং অবিস্কারক পাঞ্জাবে যান। উদ্দেশ্য পাঞ্জাবের মহারাজা রণজিৎ সিংহের সঙ্গে সাক্ষাৎ। ওই পাঞ্জাবেরই পশ্চিমে মন্টোগোমারি জেলায় ইরাবতী নদীর পূর্ব তীরে হরপ্পার অবস্থান। চার্লাস ম্যাসন হরপ্পায় ঢিবি দেখেছিলেন। এবং তার লেখায় চার্লাস ম্যাসন ঢিবিটিকে ‘প্রত্নতাত্ত্বিক দিক থেকে সম্ভাবনাময়’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। তখন ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের প্রধান ছিলেন ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব চর্চার পথিকৃৎ মেজর জেনারেল কানিংহাম । ইনি ১৮৫৩ এবং ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কয়েকবার হরপ্পা পরিদর্শন করেন। এবং সীল ও ছুরির ফলা সম্বলিত সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। তা সত্ত্বেও পন্ডিতমহলে হরপ্পা নিয়ে তেমন আগ্রহ তৈরি হয়নি। যাই হোক। মহেনজোদারোর অবস্থান বর্তমান পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের লারকানা জেলার খয়েরপুর বিভাগে। মেজর জেনারেল কানিংহাম কর্তৃক সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশের পঞ্চাশ বছর পর মহেনজোদারোর প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখনন করা হয়। সেসময় একই ধরনের সীল পাওয়া যায়। সংবাদটি ‘ইলাষ্ট্রেটেড লন্ডন নিউজ’ এ প্রকাশিত হলে প্রত্নতাত্ত্বিক মহলে সাড়া পড়ে যায়।



হরপ্পা নগরের ধ্বংসাবশেষ

হরপ্পা সভ্যতার আবিস্কারের সঙ্গে একজন বাঙালি ঐতিহাসিক জড়িত। তিনি ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্ধ্যোপাধ্যায়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্য এবং অবিস্কারক চার্লাস ম্যাসন হরপ্পায় যে ঢিবি দেখেছিলেন ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্ধ্যোপাধ্যায় সেটি বৌদ্ধ উপাসনালয়ের ধ্বংসাবশেষ ভেবেছিলেন । সে যাই হোক। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে তিনি হরপ্পায় খননকার্য শুরু করেন এবং অচিরেই প্রাগৈতিহাসিক যুগের মৃৎপাত্র এবং পাথরের তৈরি শিল্পকর্ম আবিস্কার করতে সক্ষম হন। হরপ্পা সভ্যতার অন্য আবিস্কারক হলেন প্রত্নতাত্ত্বিক পন্ডিত দয়ারাম সাহানী। এঁরা দুজনই হরপ্পা ও মহেনজোদারোতে দুইটি নগরের সন্ধান পান।



হরপ্পা। খননকার্য চলছে।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় সিন্ধ অঞ্চলে সব মিলিয়ে চল্লিশটির মতন প্রত্নক্ষেত্র আবিস্কার হয়েছিল। এর পর গত ৫০/৬০ বছরে সব মিলিয়ে ১৪০০ প্রাচীন বসতি আবিস্কৃত হয়। এর মধ্যে ৯২৫ টি ভারতে; এবং ৪৭৫ টি পাকিস্তানে। কাজেই বর্তমানকালের রাজনৈতিক সীমানায় হরপ্পা-সংস্কৃতির বিশ্লেষন সম্ভবপর নয়, কাজেই ভৌগোলিক প্রেক্ষপটেই হরপ্পা-সংস্কৃতির সমীক্ষা চালানো সমীচীন যা, আগেই ইঙ্গিত দিয়েছি যে বিশাল এক ভূখন্ডে ছড়িয়ে রয়েছে- পশ্চিমে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের সুতকাজেন্দর; পুবে ভারতের উত্তরপ্রদেশের মিরাট জেলার আলমগীরপুর; দক্ষিণে মহারাষ্ট্রের আহমদনগর জেলার ধাইমাবাদ; এবং উত্তরে জন্মু এবং কাশ্মীরের আখনুর জেলার মানডা। পুব-পশ্চিমে সব মিলিয়ে ১৬০০ কিলোমিটার। এবং উত্তরদক্ষিণে ১৪০০ কিলোমিটার।



মানচিত্রে সরস্বতী নদীর অবস্থান। বর্তমানে নদীটি মজে গেলেও অতীতে খরস্রোতা ছিল এবং এই নদীর পাড়েই হরপ্পার ৮০% প্রাচীন বসতি গড়ে উঠেছিল; যে কারণে হরপ্পা সংস্কৃতিটি সরস্বতী সভ্যতা নামেও পরিচিত।

নব্যপ্রস্তর যুগে হরপ্পা-সংস্কৃতির বেশির ভাগই গড়ে উঠেছিল নদীর কিনারে। যার কারণটি পূর্বেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। হরপ্পা সভ্যতার ৪০% গড়ে উঠেছিল সিন্ধু নদের অববাহিকায়; ৮০% বসতি গড়ে উঠেছিল সিন্ধু এবং গঙ্গার মধ্যবর্তী অঞ্চলে বয়ে যাওয়া সরস্বতী নদীর তীরে । সরস্বতী নদীটি যদিও বর্তমানে মজে গেছে। অতীতে সরস্বতী নদীর তীরে ২৫০ বসতি গড়ে উঠেছিল, এর কিছু আবার গুজরাটে, কিছু মহারাষ্ট্রে। কাজেই হরপ্পা সভ্যতাটি কে ঠিক সিন্ধসভ্যতা নয় বরং এককালে প্রবাহমান সরস্বতী নদী সৃষ্ট সভ্যতা বলাই সমীচীন! একারণে হরপ্পা সভ্যতাকে কোনও কোনও ঐতিহাসিক বলেন সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতা, কেউ-বা সরস্বতী সভ্যতা।




হরপ্পা-সংস্কৃতির মৃৎপাত্র; যা এক উৎকর্ষ শিল্পমানের ইঙ্গিত দেয়

হরপ্পা ও মহেনজোদারোয় খননকার্যের ফলে জানা গেছে যে ওসব অঞ্চলে প্রাগৈতিহাসিক কালেই নগর গড়ে উঠেছিল। হরপ্পা ও মহেনজোদারো ছাড়াও কালিবানগান, লোথাল, সুরকোটাডা ও ধোলাভিরা ইত্যাদি অঞ্চলে সুপ্রাচীন বসতির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। নগরের চারপাশে ছিল কৃষিজমি। এমনটাই স্বাভাবিক। কেননা কৃষির উদ্বৃত্ত থেকেই সাধারণত নগর গড়ে ওঠে। নগর ঘিরে কৃষিজমি বাদেও ছিল নদী, বনভূমি এবং চারণভূমি। এতে করে শিকারী এবং খাদ্য সংগ্রাহক শ্রেণির অস্তিত্বের কথা অনুমান করা যায়। চারণভূমি নগরে দুধ, মাংস, হাড় ও চামড়ার যোগান দিত । নদীপথে গড়ে উঠেছিল নৌবাণিজ্য ।



বর্তমান কালের শিল্পীর চোখে হরপ্পা নগর।

তো, কারা নির্মাণ করেছিল হরপ্পা সভ্যতা?
ঐতিহাসিকগণের অভিমত হল: প্রাচীন ভারতে দ্রাবিড় ভাষাভাষী জাতিই হরপ্পা সংস্কৃতি নির্মাণ করেছে। আর্যরা ভারতবর্ষে আসার আগেই প্রাচীণ ভারত দ্রাবিড়-অধ্যূষিত ছিল। বেলুচিস্তানের পাহাড়ি ব্রাহুই আদিবাসীরা আজও দ্রাবিড় ভাষায় কথা বলে। দ্রাবিড়দের আদিভূমি দক্ষিণ ভারত। প্রাচীন হরপ্পাবাসীর দেহগত নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে দক্ষিণ ভারতের দ্রাবিড়দের সাদৃশ্য প্রমাণিত। দুই সংস্কৃতির মানুষই শৈব (এরা শিবের ভক্ত) ও শাক্ত (এরা আদ্যশক্তি মহাদেবীর ভক্ত) ধর্মের অনুসারী। দুটি সংস্কৃতিতেই লিঙ্গ পূজার প্রচলন ছিল। তাছাড়া এদের মধ্যে ভাষাগত ঐক্যও লক্ষ করা গিয়েছে। আর্যরা অনার্যদের পরাজিত করেছিল বলে ঋক বেদ-এ উল্লেখ রয়েছে। এ অনার্য জাতিই ভারতীয় ভূমিপুত্র দ্রাবিড় জাতি।




হরপ্পা সভ্যতার অন্যতম নগর ধোলাভিরা-র ধ্বংসাবশেষ

কোনও কোনও ঐতিহাসিকের মতে আর্যরাই হরপ্পা সংস্কৃতির স্রষ্টা। দাবীটি অযৌক্তিক। কয়েকটি যুক্তি তুলে ধরছি। (১) আর্য সভ্যতা ছিল গ্রাম ভিত্তিক। আর্যরা পশুপালন ও কৃষিকাজ করত। অন্যদিকে হরপ্পা সংস্কৃতির কেন্দ্র ছিল নগর। বৈদিক সাহিত্যে আর্যদের বলা হয়েছে ‘নগর ধ্বংসকারী’। প্রধানতম বৈদিক দেবতা ইন্দ্রকে ‘পুনন্দর’ বলা হয়ে ছে। এর মানে,‘পুর (নগর) ধ্বংসকারী’। (২) হরপ্পা সংস্কৃতিতে আর যাই থাক, লোহা ছিল না; অথচ বৈদিক সভ্যতায় তামা ও লোহার ব্যাবহার ছিল। (৩) হরপ্পা এবং মহেনজোদারোর নগরগুলিতে ইটের দোতলা এবং তিনতলা বাড়ি ছিল; আর্যরা ঘর বানাতো মাটি বাঁশ ও খড় দিয়ে। (৪) ঘোড়ার সঙ্গে হরপ্পা সভ্যতার অধিবাসীদের সম্পর্ক ক্ষীণ বলে ধারণা করা হয়। অথচ বহিরাগত আর্যদের প্রধান বাহনই ছিল অশ্ব বা ঘোড়া। (৫) হরপ্পা সভ্যতার অধিবাসীদের জীবন ছিল স্থায়ী; অন্যদিকে আর্যরা ছিল যাযাবর । (৬) ষাঁড় ছিল হরপ্পা সভ্যতার পূজ্য দেবতা। আর্যসমাজে গাভী পূজনীয় ছিল। (৭) আর্যরা লিঙ্গ পূজাকে নিন্দনীয় মনে করত। হরপ্পা সভ্যতায় লিঙ্গ ও মাতৃদেবীর পূজা। (৮) আর্য সংস্কৃতিতে পুরুষ দেবতার আধিক্য থাকলেও হরপ্পায় মাতৃদেবী বা নারীদেবী হরপ্পার লিখিত ভাষা ছিল; আর্যদের ছিল না। (৯) আর্যরা ভারতবর্ষে এসেছিল ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বে; হরপ্পা সভ্যতার সূত্রপাত তিন হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে।
কাজেই, দ্রাবিড় ভাষাভাষী জাতিই হরপ্পা সংস্কৃতি সৃষ্টি করেছে।

ক্রমশ ...

ছবি: ইন্টারনেট।
তথ্যসূত্র: শেষ কিস্তিতে সংযুক্ত করা হবে।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29521595 http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29521595 2012-01-13 12:22:26
মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি
মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি/ মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপারে তুই মূল হারাবি।

কথা তো সেটাই। মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হওয়া যায় । বাংলার বাউলের এই এক বিশ্বাস; বাউলের ধর্মসাধনার মূলকথাটি তাই, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি । তো, এই মানুষ ভজার পথটি কিন্তু অত সহজ নয়, বরঞ্চ অনেকই জটিল, প্রায় দুঃসাধ্যই বলা চলে। কেননা, দীর্ঘকালের পথপরিক্রমায় বাউল সাধনায় এসেছে মিশেছে নানা পথ ও মত। সে কারণেই জ্ঞান, যোগ এবং বামাচারী সাধনমার্গ হয়ে উঠেছে বাউল সাধনারই অনিবার্য অঙ্গ। বামাচারী সাধনা হল কামজ সাধনা; অর্থাৎ এই সাধনায় নারীসঙ্গ অনিবার্য। বাউলের সাধনা আবার কামশূন্য জ্ঞানমার্গীয়ও বটে।অর্থাৎ বাউলের বিশ্বাস এই যে শুদ্ধজ্ঞান সাধন করেই তবে ‘অজান’ (unknown) খবর জানা যায়। এই নিগূঢ় 'অজান' খবর জানার তৃষ্ণায় কাতর বাউলগণ বাংলার পথে পথে ঘুরে বেড়ান, এবং গভীর প্রজ্ঞার অধিকারী সৎ গুরুর সন্ধানে হন্যে হয়ে ওঠেন। যে যোগসাধনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য শ্বাসপ্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রন, বাউলের সাধনায় সে যোগের অমসৃণ পথও এসে মিশেছে । এসব কারণেই বাউলের সাধনা অনায়াস লব্দ নয়। কাজেই মানুষভজার পথটি অত সহজ নয়, অনেকই জটিল। তারপরও তত্ত্বদর্শী বাউলগণ স্বেচ্ছায় সে বক্রসর্পিল পথে হেঁটে যান। একা। মূল না-হারানোর ভয়ে ...

ছেঁউড়িয়ার সাঁইজী আরও বলিছেন-

মানুষে মানুষ গাঁথা/ দেখো যেমন আলোকলতা জেনে শুনে মুড়াও মাথা ও তুই জাতে চরবি।

‘মানুষে মানুষ গাঁথা’ ...এই কথার কি মানে ? মানুষে কি মানুষ বিদ্ধ হয়ে রয়েছে? নাকি মানুষের গল্প মানুষের মধ্যে নিহিত? সে যাই হোক। কথা যা হচ্ছে তা মানুষকে নিয়েই, যে মানুষের স্বরূপ উপলব্দিই বাউলজীবনের একমাত্র লক্ষ । ছেঁউড়িয়ার সাঁইজী বলছেন: ‘জেনে শুনে মুড়াও মাথা’। কি এর মানে? সাঁইজী মাথা মুড়াতে বলছেন কেন? বঙ্গে কি ভারতবর্ষে সন্ন্যাস গ্রহনের পূর্বে মাথা মুড়নোর রেওয়াজ রয়েছে । সন্ন্যাস গ্রহনের উদ্দেশ্য ultimate reality-র স্বরূপ উপলব্দি । এই ultimate reality -ই লালনের 'মনের মানুষ'; যিনি আত্মারূপে কিংবা অচিন পাখিরূপে দেহখাঁচার মধ্যে রয়েছেন। যাঁর কথা ভাবলে সাপ দেখার মতোই চমকে উঠতে হয়। (যেখানে শাঁইয়ের বারামখানা/শুনিলে প্রাণ চমকে ওঠে/ দেখতে যেন ভুজঙ্গনা।) ... দেহের ভিতরে বাস করা অচিন পাখিরূপী শাঁই সর্বক্ষণ লীলে করছেন । তাঁকে জানাই ‘জতে ওঠা’, তাঁকে জানার মাধ্যমেই এক মহিমান্বিত আধ্যাত্বিক স্তরে পৌঁছনো যায়। যে কারণেই ইসলামের নবী (সা) বলছেন: 'মানঅরাফা নাফসাহু ফাবাদে আরাফা রাব্বাহু।'অর্থাৎ, যে নিজেকে চিনেছে, সে আল্লাহকে চিনেছে।

ছেঁউড়িয়ার সাঁইজী এবার মনের মানুষের অবস্থান নির্দেশ করছেন-

দ্বিদলে মৃণালে সোনার মানুষ উজলে। মানুষ-গুরুর কৃপা হলে সেই ধন পাবি।

তো লালনের সোনার মানুষ কোথায় রয়েছেন? দ্বিদলে মৃণালে। কিন্তু, কোথায় সেই দুই পাঁপড়ির মৃণাল? মৃণাল রয়েছে মানবদেহের ভিতরে। দেহের ভিতর মৃণাল ছাড়াও রয়েছে আঠারো মোকাম (অর্থাৎ আঠোরোটি ঘর), ছয় লতিফা, বারো বরজ, চারচন্দ্র, চৌদ্দ ভুবন, ষড় রিপু ও দশ ইন্দ্রিয়। এসবই বাংলার বাউলের কল্পনা। বাউলগণ এই কল্পনাসূত্র লাভ করেছেন বাংলার তান্ত্রিক ঐতিহ্য, সুফিমত এবং ষোড়শ শতকের সহজিয়া বৈষ্ণবগণের কাছ থেকে । দেহের ভিতরে আরও রয়েছে পদ্ম। এবং সে পদ্মেই আলোকিত হয়ে রয়েছেন সোনার মানুষ। ‘দ্বিদলে মৃণালে সোনার মানুষ উজলে।’
বাউলের চোখে কী অপূর্ব সেই দৃশ্য ! যেন সূর্যকিরণবিম্বিত অথই রূপ সাগর । রূপের ওই সাগরে তত্ত্বদর্শী রবীন্দ্রবাউলও ডুব দিয়েছেন:

রূপ সাগরে ডুব দিয়েছি অরূপ রতন আশা করে

তবে সেই অন্তরের মানুষকে পাওয়া কিন্তু সহজ নয়। জ্ঞান, যোগ ও বামাচারের কষ্টসাধ্য কন্টক বিছানো পথ অতিক্রম করেই তবে পদ্মাসনে আসীন সেই মানুষরতনকে পাওয়া যায়। কিন্তু তার আগে চাই মনের মানুষের সায়। ‘মানুষ-গুরুর কৃপা হলে সেই ধন পাবি।’

সবশেষে ছেঁউড়িয়ার সাঁইজী বলিছেন-

মানুষ ছাড়া মন রে আমার দেখবি ভবে সব শূন্যকার। ফকির লালন বলে মানুষ আকার (এই রূপ) ভজলে পাবি।

মানুষ পলে পলে যে শূন্যতার বোধ উপলব্দি করে, তা আসলে সেই অন্তরের মানুষেরই বিহনে। ভিতরকার মানুষের উপলব্দির অভাবহেতু সবই যে শূন্য শূন্য ঠেকে।বুকটা কেমন খাঁ খাঁ করে। সবই যে অসার আর নিরর্থক মনে হয়, প্রার্থনার সকল সময় শূন্য মনে হয়/শূন্য মনে হয় ... এই তিক্ত শূন্যতা মানুষ সইতে পারে না। তাই সেই নিরালম্ব শূন্যতা ভরিয়ে তুলতেই সে মানুষভজনে ব্রতী হয়। সেই মানুষের অলীক স্পর্শ লাভ হলে তবেই গিয়ে হৃদয়ে পরম সন্তোষ আর গভীর চিত্তসুখ লাভ হয়। সেই চিত্তসুখ লাভ করেই সোনার মানুষ রবীন্দ্রবাউল গেয়েছিলেন:

সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর/ আমার মাঝে তোমার প্রকাশ তাই এত মধুর।

তথ্যনির্দেশ:

(১)আবদেল মাননান সম্পাদিত অখন্ড লালনসঙ্গীত; এবং
(২)আবুল আহসান চৌধুরী সম্পাদিত লালনসমগ্র'র বেশ কিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধ

বাউল আবদুল করিম শাহের কন্ঠে

http://www.mediafire.com/?6t3eyrfeb6vv46t
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29520980 http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29520980 2012-01-12 10:58:35
বাংলায় পর্তুগীজ জাতি এক প্লেট আনারস। বাংলায় পর্তুগীজ জাতির আলোচনার শুরুতেই আনারসের ছবি কেন? কেননা, আজ থেকে চারশ বছর আগে ওই ফলটা তারাই বাংলায় এনেছিল । আমরা আনারস বললেও পর্তুগিজ ভাষায় উচ্চারণ অবশ্যি ‘আনানাস’। শুধু কি আনারস-গোল আলু, টমাটো, মরিচ, ঢেঁরস, কাজু বাদাম, কামরাঙা এমনকী পেয়ারাও ওই পর্তুগিজরাই বাংলায় এনে চাষাবাদ করেছিল। এছাড়া ‘আলফান্সো’ নামে এক জাতের সুস্বাদু আম আছে। ওই আমাটিও ওদেরই কল্যাণে পাওয়া গেছে । অবশ্য আমরা এসব জিনিস আমাদের নিজেদের বলেই ভাবতে অভ্যস্থ। কিন্তু ইতিহাস বলে যে চাবি, বালতি, পেরেকে, তামাক, গির্জা, বিশপ, বোতল স্পঞ্জ, আতা (ফল) বারান্দা-এসবই পর্তুগিজ শব্দ। বাঙালি তামাক খাওয়া শিখেছে ওদেরই কাছ থেকে। তাই নিয়ে পুঁথি পর্যন্ত রচনা হয়েছে। নাম ‘তামাকু মাহাত্ম’

‘দিবা নিশি যেই নরে, তামাকু ভক্ষণ করে,
অন্তকালে চলে যায় কাশী।’

শুধু তামাকই নয়, যে ছানা ছাড়া মিষ্টি তৈরি করা যায় না- সে ছানা তৈরির প্রক্রিয়াটিও পর্তুগিজদের বলে ঐতিহাসিকদের ধারণা। মুগল আমলে ফরাসি পরিব্রাজক ফ্রাসোয়া বার্ণিয়ের ভারতবর্ষে এসেছিলেন । তিনি লিখেছেন, ‘বাঙালির সঙ্গে মিশে পর্তুগিজরা নানারকম সুস্বাদু মিষ্টান্ন ও তৈরি করেছে সেকালে।’ বাংলায় যে পর্তুগিজদের এত অবদান তারাই আবার বাংলাজুড়ে ফিরিঙ্গী জলদস্যু হিসেবে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল।বাংলা প্রথম বইটিও ছেপেছিল তারা। কাজেই আমরা বাংলায় পর্তুগিজ জাতির পরস্পরবিরোধী কর্মকান্ডের প্রতি কৌতূহল হতেই পারি।



ইউরোপের মানচিত্রে পর্তুগালের অবস্থান । দেশটি ছোট। তবে মধ্যযুগের শেষে সেই ভূ-আবিস্কারের যুগে প্রযুক্তির কল্যাণেই সারা বিশ্বে তাদের অগ্রযাত্রা হয়ে উঠেছিল অপ্রতিরোধ্য।

ইউরোপীয়দের মধ্যে পর্তুগিজরাই প্রথম বাংলায় আসে। এ প্রসঙ্গে একজন লেখক লিখেছেন:: The Portuguese first visited Bengal in 1517, just 33 years after Bartholomew Diaz landed at Calicut on the East coast.তো, কে বার্থোলোমিউ দিয়াজ ? বার্থোলোমিউ দিয়াজ ছিলেন একজন রোমান ক্যাথলিক পর্তুগীজ নৌ-অভিযাত্রী। তার জন্ম ১৪৫০ খ্রিস্টাব্দে। এঁকে ভারতে যাওয়ার বিকল্প পথ বের করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কারণ পনেরো শতকের শেষ দিক থেকে এশিয়া থেকে মসলা সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ভেনিস ও আরব বণিকদের এড়িয়ে বিকল্প পথ অনুসরণ করে ভারতে তথা বাংলায় অনুপ্রবেশ করা পর্তুগিজদের জন্য অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।
বার্থোলোমিউ দিয়াজ কালিকূট বন্দরে অবতরণ করেন। অবশ্য ইউরোপ থেকে ভারতে আসার জলপথ আবিষ্কার করেন ভাস্কো দা গামা। এই পর্তুগীজ নৌ কমান্ডার ১৫২৪ সালে সালে স্বল্প সময়ের জন্য 'পর্তুগীজ ইন্ডিয়া'র গভর্নর ও ছিলেন। যদ্দুর জানি, ১৪৯৮ সালে ভাস্কো দা গামার নেতৃত্বে ইউরোপীয়রা জলপথে ভারতে প্রবেশ করেছিলো। সেটা কালিকূটেই ছিলো।



পঞ্চদশ শতকের হালকা ও দ্রুতগামী পর্তুগিজ জাহাজ। উপযুক্ত জাহাজ নির্মান ছাড়াও অক্ষাংশ নির্ণয়ে কৌণিক উচ্চতা পরিমাপক যন্ত্র ব্যবহারও সমুদ্রযাত্রায় পর্তুগিজদের প্রাধান্য দিয়েছিল।

পর্তুগিজদের বাংলায় আসার আগেই ইউরোপ অবধি বাংলার ধনসম্পদের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। বাংলার উর্বরা মাটিই বাংলার কৃষিপণ্যকে একটি উন্নত স্তরে পৌঁছে দিয়েছিল। বিশেষ করে চাল এবং তুলা। এছাড়া মসলা ও বস্ত্রশিল্পেও বাংলার প্রশংসনীয় অগ্রগতি হয়েছিল সেকালে। রোমান মেয়েরা নাকি ঢাকাই মসলিন কাপড়ের জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকত। এসব কারণেই পর্তুগিজ বণিকের লোভাতুর দৃষ্টি পড়েছিল সুজলাসুফলাশষ্যশ্যামলা বাংলার ওপর । এই ধন সম্পদই বাংলার মানুষের জন্য অশেষ দুঃখের কারণ হয়েছিল। চর্যাপদের কবিরা যার ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন বহু বছর আগেই:আপনা মাংসে হরিণা বৈরী এই পদ রচনা করে। বাংলায় উৎপন্ন পণ্যের বিপননের জন্য ষোড়শ শতাব্দীর বাংলায় দুটো সমৃদ্ধশালী বাণিজ্য-কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল।বাংলার পুবের চট্টগ্রাম আর পশ্চিমের সপ্তগ্রাম। সরস্বতী নদীর পাশে ছিল সপ্তগ্রাম ছিল একটি সরগরম গঞ্জ। রেশম, কার্পাস, গালা, চিনি, সুতার কাপড় আর চালের আড়ত-কি নেই সেখানে। চট্টগ্রামও অনুরূপ পণ্যে সমৃদ্ধশালী ছিল। পণ্যলোভী পর্তুগীজরা প্রথমে ঘাঁটি গেড়েছিল চট্টগ্রামে। তারপর সপ্তগ্রামে। চট্টগ্রাম হচ্ছে তাদের কাছে ‘পোর্ট-গ্রান্ডী’ অর্থাৎ বড় স্বর্গ। আর সপ্তগ্রাম হচ্ছে ‘পোর্ট পিকানো’; অর্থাৎ ছোট স্বর্গ’। বাংলার রাজধানী ছিল গৌড়। যে গৌড় অচিরেই অধিকার করে নেবে মুগলরা।



হুগলি নদী। বাংলায় পর্তুগীজ জাতির ইতিহাস আলোচনায় বারবার এ নদীর কথা আসবে । পূর্ণেন্দু পত্রী লিখেছেন,‘পর্তুগিজরা যখন হুগলিতে জাঁকিয়ে বসেছে, তখন একটু একটু করে পতন শুরু হয়ে গেছে সপ্তগ্রামের। আর এদিকে পর্তুগিজদের দাপট দম্ভ দুঃসাহসের মাত্রা ক্রমশ ডিগ্রি পেরিয়ে গেছে। (পুরনো কলকাতার কথাচিত্র;পৃষ্ঠা; ৪৪)


১৫৮০ খ্রিস্টাব্দ। মুগল বাদশা আকবর পর্তুগীজদের হুগলি নদীর পাড়ে বসতি স্থাপনের সনদ প্রদান করেন। জায়গাটি ঠিক কোথায় ছিল? বর্তমান কলকাতার ২৫ মাইল উজানে। পর্তুগিজরা তাদের বসতিকে বলত Porto Pequeno. অবশ্য এখন জায়গাটি ব্যান্ডেল নামেই পরিচিত। জায়গাটি ষোড়শ শতকের একটি প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে ওঠে। বাংলার পণ্য ছিল শস্তা। পর্তুগিজ বণিকেরা সে পণ্য কিনে এশিয়ার পুবের বন্দরে চড়া মূল্যে বিক্রি করত । প্রথম প্রথম কেবল বর্ষাকালেই তারা বাংলায় ব্যবসা করত । বর্ষা শেষ হলে তারা গোয়ায় চলে যেত। কেননা, পশ্চিম ভারতের গোয়া ছিল পর্তুগিজদের অন্যতম ঘাঁটি। পরে অবশ্য পর্তুগিজরা বাংলায় স্থায়ী ভাবে বসতি গড়ে তোলে। এবং ধীরে ধীরে বণিক থেকে পরিনত হয় জলদস্যুতে। কিভাবে? সে কথায় আমি পরে আসছি।



বাংলাদেশের মানচিত্রে চট্টগ্রামের অবস্থান। বাংলায় পর্তুগীজ জাতির ইতিহাস আলোচনায় বারবার এ অঞ্চলের কথা আসবে ...

১৬৭০ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় পর্তুগিজদের বংশধরের সংখ্যা ছিল প্রায় ২০,০০০ হাজার। অবশ্য বিশুদ্ধ পর্তুগীজ ছিল মাত্র ৩০০। বাংলাপিডিয়ায় অনিরুদ্ধ রায় লিখেছেন, ‘তাদের (অর্থাৎ পর্তুগিজদের) আগমনের প্রথম দিক থেকেই পর্তুগিজরা স্থানীয় মহিলাদের সাথে বিয়েতে আপত্তি করে নি।’ কুড়ি হাজার পর্তুগিজের অর্ধেক বাস করত হুগলি। বাকিরা সপ্তগ্রাম, চট্টগ্রাম, বানজা (এই জায়গাটি কোথায় ছিল?) ঢাকা এবং অন্যত্র। পর্তুগিজরা বিলাসবহুল জীবন কাটাত । তারা স্থানীয় নবাবদের মতন পোশাক পড়ত। আর? আর...... “made merry with dancing slave girls, seamstresses, cooks and confectioners.” তৎকালীন বাংলার সমাজে দাসপ্রথা ছিল। পর্তুগিজদের বাড়িতে দাস ছিল। এদের প্রধান কাজ ছিল আম কমলা লেবু আদা এবং আচার থেকে মিষ্টান্ন তৈরি করা। (আচার থেকে কীভাবে মিষ্টি তৈরি হয় বলতে পারি না, তবে মূল বইতে এরকমই লেখা আছে) পর্তুগিজ ময়রারা তৈরি করত রুটি, কেক এবং পেস্ট্রি এবং অন্যান্য ইউরোপীয় পদ।



রসগোল্লা। যদ্দূর জানি দুধ থেকে ছানা তৈরি না-করার জন্য ভারতে (বাংলায়) কি এক বৈদিক সংস্কার ছিল। দুধ থেকে চিজ তৈরি করতে সক্ষম পর্তুগিজদের তো সে সংস্কার মানার কথা নয়। কাজেই বাঙালি ময়রাদের সামনে ছানার মিষ্টান্ন তৈরির এক নতুন দিগন্ত খুলেগিয়েছিল ।

ওদিকে পর্তুগিজ পাদ্রীদের সঙ্গে বাদশা আকবর- এর ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। আকবর অন্যধর্ম সম্বন্ধে ছিলেন উদার। তা সত্ত্বেও অনেক চেষ্টা করেও পর্তুগিজ পাদ্রীরা আকবরকে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহন করাতে পারেননি। সে যাই হোক। আকবরের রাজত্বকাল থেকে শায়েস্তা খাঁর আমল অবধি অর্থাৎ ১৬৬৬ অবধি বাংলার গ্রাম ও জনপদে অবাধ লুন্ঠন চালিয়েছিল পুর্তগিজরা। বাংলার মানুষের কাছে তারা ‘হার্মাদ’ নামে পরিচিত ছিল। হার্মাদ অর্থ ‘জলদস্যু’। কথাটা এসেছে স্পেনিশ নৌবহর ‘আরমাডা’ থেকে। জলপথে, একটা দুটো নয়, অসংখ্য জাহাজ এক সারিতে সাজিয়ে শুরু হত তাদের লুন্ঠন অভিযান। জাহাজগুলিকে বলা হত ‘বহর’। বহরেরক্যাপ্টেন-‘বহরদার’। আক্রমনের প্রধান প্রধান স্থান ছিল চট্টগ্রাম, খুলনা, চব্বিশ পরগণার উপকূল,নোয়াখালি, সন্দ্বীপ, বরিশাল। এসব জায়গায় পর্তুগিজদের ঘরবাড়িও ছিল।



বাংলার জনগনের ওপর যুগে যুগে কম অত্যাচার হয়নি। আজ আর বাংলায় জলদস্যুর আক্রমন নেই। তবে দেশিও রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা ভিনদেশি তস্করের চেয়ে কম নয় ...

বাংলায় পর্তুগিজদের ওপর কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ ছিল শিথিল । ফলে তারা দন্ডপ্রাপ্ত আসামী এবং সন্ত্রাসীদের নিয়ে অবাধে লুন্ঠন করত। বিশেষ করে পূর্ববাংলায়। পর্তুগিজরা দন্ডপ্রাপ্ত আসামী এবং সন্ত্রাসীদের কোথা থেকে যোগাড় করত? ‘বুলখক খানা’ থেকে। ‘বুলখক খানা’ কি? বাদশা আকবর সপ্তগ্রাম বা সাতগাঁকে বলতেন-‘বুলখক খানা’। অর্থাৎ বিদ্রোহীদের আড্ডা। মুগল সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করত যারা, তারা এসে জমায়েত হত এই সপ্তগ্রামেই। এদের সঙ্গে যোগ দিত বাংলার পুবের আরাকানি এবং মগরা। এরা চট্টগ্রামের আশেপাশেই বাস করত, জাতে ছিল সেমি-ট্রাইবাল, ধর্মে বৌদ্ধ। (দেখুন,(পূর্ণেন্দু পত্রী; পুরনো কলকাতার কথাচিত্র) এদের ফিরিঙ্গীও বলা হত। একটি সূত্র অনুযায়ী ফিরিঙ্গী শব্দটি এসেছে ‘ফ্রাঙ্ক’ থেকে।(দেখুন,
Colleen Taylor Sen;The Portuguese Influence on Bengali Cuisine) আরবরা ক্রসেডারদের ফ্রাঙ্ক বলত। সে যাই হোক। চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গীবাজার নামটি আজও সেই স্মৃতি বহন করে। ফিরিঙ্গী ও পর্তুগিজরা মিলে বাংলায় লুন্ঠন চালিয়েছিল।



বাংলার দুঃখিনী নারী। এরা সপ্তদশ-অস্টাদশ শতকে লাঞ্ছিত হয়েছে পর্তুগিজদের দ্বারা, ১৯৭১ এ পাকিস্তানি সৈন্যদের দ্বারা এবং বর্তমানে লাঞ্ছিত হচ্ছে বিকারগ্রস্থ পুরুষ দ্বারা। এবং এ নির্যাতন থেকে শিশুদেরও রেহাই নেই!

হার্মাদরা কখনও ছোট ছোট ডিঙিতে তীরের বেগে ছুটে এসে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলত বণিকের জলযান। কখনও-বা মাইলের পর মাইল হেঁটে এসে কলরব-মুখর উৎসব বাড়িতে হানা দিয়ে লোকের ওপর অত্যাচার চালাত। মেয়েদের ওপর অত্যাচার ছিল অকল্পনীয়। মেয়েদের চরম অপমানের পর ক্রীতদাসী হিসেবে বিক্রি করে দিত আরাকানে। আজও বাংলাদেশের পল্লী গানে সেইসব হত্যভাগ্য নারীদের বিলাপ ধ্বনিত হয়:

অভাগিনীরে মনে রাখিও। ঘাটে আমার কলসী পড়িয়া রহিল, আমার হাতের কঙ্কন ফেলিয়া আসিয়াছি;আমাকে মনে করিয়া দুঃখ হইলে কঙ্কন ও কলসী তোমার হাত দুখানি দিয়া ছুঁইও-তাহাতে আমি জুড়াইব। আর সুন্দরী দেখিয়া একটি মেয়ে বিবাহ করিও। আমি যে আদর ও স্নেহের জন্য পাগল ছিলাম, তাহা তাহাকে দিও, হতভাগিনীর অদৃষ্টে তাহা নাই।

সমুদ্র উপকূলীয় গ্রামগুলিতে হানা দিয়ে নারী অপহরণ এবং ক্রীতদাসী হিসেবে বিক্রি করা ছিল পর্তুগিজদের একচেটিয়া ব্যবসা। এই ব্যবসার কেন্দ্র ছিল বরিশাল, খুলনা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালি । পর্তুগিজরা ছোট ছোট শিশুদেরও অপহরণ করে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করে দিত।



পর্তুগিজ হার্মাদ আক্রমনের প্রাক্কালে ষোড়শ-সপ্তদশ শতকের ঢাকা শহরের একটি প্রাচীন মানচিত্র। বুড়িগঙ্গা নদীতে হার্মাদের রণতরী থেকে কামান দাগত বলে সে সময় খুব একটা স্বস্তিতে ছিল না ঢাকাবাসী । অবশ্য সেসময় বুড়িগঙ্গা নদীর পানি ছিল টলটলে । যা আজ কালো হয়ে উঠেছে অসুখি ঢাকাবাসীর প্রতীক হিসেবে ।

আকবরের মৃত্যুর পর মুগল সিংহাসনটি লাভ করলেন বাদশা জাহাঙ্গীর। তাঁর সেনাপতি ছিলেন অসম সাহসী মানসিংহ। তিনি দ্বিতীয়বার বাংলায় আসেন বারো ভূঁইয়াদের বিদ্রোহ দমন করতে। পর্তুগিজরা সে সময় মুগল সম্রাটের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেছিল। ফ্রান্সিস কার্ভালো, রডা গঞ্জালেস প্রমূখ পর্তুগিজরা প্রতাপাদিত্যর পক্ষের নৌ সেনাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিল। একই সঙ্গে তারা হুগলীতেও হামলা অব্যাহত রেখেছিল। পদ্মা- মেঘনা আর কর্ণফুলিতে বাণিজ্যতরী আটকে কর আদায় করত । মক্কাগামী হযযাত্রীদের জাহাজ থামিয়ে লুটপাট করত। ভাঙত হিন্দুদের দেবমূর্তি । এসব কথা সম্রাট জাহাঙ্গীরের কানে গেলে তিনি ক্রোধান্বিত হয়ে ওঠে। পর্তুগিজ দমনের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। ঢাকার নতুন নাম হল ‘জাহাঙ্গীর নগর।’



সম্রাট শাহজাহান। (১৫৯২-১৬৬৬) এঁর সময়েই বাংলায় পুর্তুগিজ শক্তি নির্মূল হয়। বাবা সম্রাট জাহাঙ্গীরের সঙ্গে বিদ্রোহ করে শাহজাহান একবার বাংলায় এসেছিলেন। সেসময় তিনি পর্তুগিজদের দ্বারা প্রতারিত হয়েছিলেন। শাহজাহান ঠিকই প্রতিশোধ নিয়েছিলেন।

১৬২৭ খ্রিস্টাব্দে বাদশা জাহাঙ্গীর ইন্তেকাল করেন। মুগল তখতে বসলেন শাহাজাহান । কাশেম খাঁকে তিনি বাংলার শাসনকর্তা করে পাঠালেন। তার আগে বাদশা কাশেম খাঁকে বললেন,‘আমার প্রজার সুখেই আমার সুখ।আপনি পর্তুগিজদের ধ্বংস করেন’। এর পরপরই মুগল সৈন্যদের সঙ্গে পর্তুগিজদের যুদ্ধ বাঁধল। বড় ভয়ঙ্কর ছিল সে যুদ্ধ । তিন মাস চলল সে যুদ্ধ। তারপর ব্যান্ডেলে মুগল সৈন্যরা মাটির তলায় সুড়ঙ্গ কেটে, সেই সুড়ঙ্গে বারুদ পুরে গোটা পতুর্গিজ দুর্গই উড়িয়ে দিল। হাজার হাজার পুর্তগিজ নরনারী নিহত হল। ওদিকে ১৬৬৬ সালে মুগল সেনাপতি বুজুর্গ উমেদখান পর্তুগিজদের পরাজিত করে চট্টগ্রামে মুগল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। উল্লেখ্য,১৬৬৬ সালটি সম্রাট শাহজাহান- এর মৃত্যুর বছর।



সেন্ট জেভিয়ার। (১৫০৬-১৫৫২)

তবে এও সত্য যে পর্তুগিজ মাত্রই হার্মাদ বজ্জাত ছিল না। অনেক সৎ মানুষ ছিলেন তাদের মধ্যে। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সেন্ট জেভিয়ার । অতি সজ্জন সাধু ছিলেন তিনি । রাজনীতি নয়, ধর্মই ছিল এঁর আদর্শ। বাংলায় পর্তুগিজদের অত্যাচার ও অসংযত জীবনযাত্রায় ক্রদ্ধ হয়ে উনি একসময় চলে যান শ্রীলঙ্কায়। তারপরে জাপানে। মৃত্যুর পর তাঁর দেহাবশেষ এনে প্রোথিত করা হয় ভারতের গোয়ায়।



কলকাতার পার্ক স্ট্রিটের রাস্তায় দাঁড়ালে চোখে পড়ে সেন্ট জেভিয়ার কলেজের একাংশ। আশ্চর্য! বাংলায় আজ কোথাও আর পর্তুগিজ নির্যাতনের চিহ্ন নেই। অথচ একজন পর্তুগিজ সাধুই কেবল বাংলায় সত্য হয়ে রইলেন। মানুষ তার পরও ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না!

মুগলা পর্তুগিজদের দমন করেছিল। তবে পর্তুগিজরাও মুগলদের ওপর প্রভাব ফেলেছিল। মুগলরা আরব বানিজ্য জাহাজে রাধুঁনি ছিল। পর্তুগিজরা এই ঐতিহ্য বজায় রেখেছিল। তারা মুগলদের তাদের জাহাজে নিয়োগ দিত। এভাবে রান্না শিখেছিল। হয়ে উঠেছিল দক্ষ ময়রা । কেবল রান্নাবান্না্ই নয়, পর্তুগিজ ভাষাটিও বাংলায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অষ্টাদশ শতক অবধি পর্তুগিজ ভাষাটি বাংলায় প্রচলিত ছিল। এমনকী রবার্ট ক্লাইভ অবধি অনর্গল পর্তুগিজ ভাষায় কথা বলতে পারতেন।



ব্যান্ডেল গির্জা। ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজদের নির্মিত। । পশ্চিম বাংলায় সবচে পুরোনো গির্জা এটি ।

পর্তুগিজরা যতই গ্রামবাংলা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়খার করে দিক না কেন বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা কিন্তু কম নয়। যেমন বাংলায় ছাপাখানা বা বই ছাপানোর পিছনে পর্তুগিজদের অবদান অসামান্য। বাংলা ভাষার প্রথম বইটি পর্তুগিজদের হাতেই ছাপা । পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে ১৭৪৩ সালে এই অবিস্মরণীয় ঘটনা ঘটেছিল । হরফ অবশ্য রোমান। সে সময় তিনটি বই ছাপা হয়েছিল। (১) ব্রাহ্মণ-রোমান ক্যাথলিক সংবাদ।(২) কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ। এবং (৩) বাংলা ও পর্তুগিজ ভাষার শব্দকোষ ও ব্যাকরণ। ১৫৯৯ সালে ফাদার সোসা একটি ক্ষুদ্রাকৃতি ধর্মীয় পুস্তিকা বাংলায় অনুবাদ করেন। অবশ্য এর কোনও প্রতিলিপি এখন আর নেই।



আজ আর চট্টগ্রামের কর্ণফুলি নদীতে পর্তুগিজ হার্মাদের আক্রমনের ভয় নেই, নদীটি স্বাধীন বাংলাদেশের একটি নদী। অথচ এককালে হার্মাদরা কখনও ছোট ছোট ডিঙিতে তীরের বেগে ছুটে এসে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলত বণিকের জলযান। কখনও-বা মাইলের পর মাইল হেঁটে এসে কলরব-মুখর উৎসব বাড়িতে হানা দিয়ে লোকের ওপর অত্যাচার। মেয়েদের ওপর অত্যাচার ছিল অকল্পনীয়। ক্রীতদাসী হিসেবে বিক্রি করে দিত আরাকানে।

বাংলার ইতিহাসে পর্তুগিজ-অধ্যায়ের কথা ভাবলে আজ আমাদের অবাকই হতে হয়। তার পরও তারা বাংলার সংস্কৃতিতে আজও নানাভাবে রয়ে গেছে। চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গি বাজারের কথা আগেই বলেছি। আজও বাঙালি মেয়েরা ‘ফিরিঙ্গী’ নামে এক ধরনের ‘খোঁপা’ বাধে । এছাড়া বহু পর্তুগিজ শব্দ যে যে বাংলায় প্রচলিত সে সম্বন্ধে এ লেখার গোড়ায় বলেছি। পূর্ণেন্দু পত্রী লিখেছেন,‘ যে ‘সাবান’ রোজ গায়ে মাখি, যে ‘জানালায়’ আকাশকে কাজে পাই, যে ‘আলমারি’তে থাকে থাকে সাজাই অনেক দামে কেনা আদরের বইগুলো,‘বেহালা’র কান্নায় নিজের কান্না শুনে কাঁদি যখন,‘বোতাম’ লাগাই জামায়, পা ছড়িয়ে জিরিয়ে নিই ‘কেদারায়’ বসে, তখন ক্ষণে ক্ষণে আমরা পর্তুগিজদের সম্পদকেই নিজেদের ব্যবহারে খাটাচ্ছি। (পুরনো কলকাতার কথাচিত্র;পৃষ্ঠা;৫৫) এছাড়া মাস্তুল, ইস্ত্রী, আলপিন, তুফান, বজরা, কামান, পিস্তল, লোকলস্কর এবং আয়া শব্দটিও পর্তুগিজ। সবচে বড় কথা - বাংলাদেশের বরিশাল এবং সন্দীপসহ দক্ষিণ-পূর্বে বসবাসরত অনেক বাঙালির গৌড়বর্ণ আজও পর্তুগিজ স্মৃতি বহন করে।

ছবি। ইন্টারনেট।
তথ্যসূত্র:

পূর্ণেন্দু পত্রী; পুরনো কলকাতার কথাচিত্র
বাংলাপিডিয়া
Colleen Taylor Sen;The Portuguese Influence on Bengali Cuisine
Food on the Move Proceedings of the Oxford Symposium on Food and Cookery 1996


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29520386 http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29520386 2012-01-11 12:15:51
ব্যাঘ্রতটী মন্ডল একটি প্রাচীন মানচিত্রে বাংলার অবস্থান । হঠাৎ করেই যদি আমাদের অতি পরিচিত কোনও জায়গার একটা খুবই অপরিচিত নাম দেখতে পাই, তাহলে আমাদের বিস্মিত হয়ে যাওয়া ছাড়া আর উপায় কি বলুন। ‘ব্যাঘ্রতটী মন্ডল’ তেমনই এক বিস্ময়-জাগানিয়া নাম। প্রাচীন এবং মধ্যযুগের বাংলায় ব্যাঘ্রতটী মন্ডল নামে একটি অঞ্চল ছিল বটে তবে বর্তমানে ওই অঞ্চলটির নাম আমুল বদলে গেছে। আজ আমরা সেই অঞ্চলটি নিয়েই সামান্য আলোচনা করব। তবে ব্যাঘ্রতটী মন্ডল- এর বর্তমান নামটি আমি সহজে বলছি না। তবে ক্লু হিসেবে আপনাদের জানিয়ে রাখি যে ‘ব্যাঘ্রতটী মন্ডল’ এর বর্তমান নামটি যাইই হোক না কেন-বিশ্বের লোকে সেটি এক নামেই চেনে!





অবিভক্ত বাংলার মানচিত্র । কত বিচিত্র যে এটুকুন অঞ্চলের ইতিহাস। স্থানের নামগুলিও কত বিচিত্র ...

আমরা জানি যে এককালে বাংলায় সেন রাজারা শাসন করতেন। সেই সময়টা ছিল আনুমানিক ১০৯৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১২২৫ খ্রিস্টাব্দ । সেন বংশের প্রতিষ্ঠাতার নাম বিজয়সেন (১০৯৭-১১৬০)। বিজয় সেনের মৃত্যুর পর তাঁরই পুত্র বল্লালসেন বাংলার রাজা হন। বল্লালসেন কে নিয়ে ১৫১০ খ্রিস্টাব্দে আনন্দভট্ট নামে এক ঐতিহাসিক ‘বল্লালচরিত’ নামে একখানা বই লিখেছিলেন। (কে বলে বাঙালি ইতিহাস সচেতন নয়?) ... সে বইয়ে লেখা আছে যে ... লক্ষ্মণসেনের রাজত্বকালে বাংলা পাঁচটি অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। (১) রাঢ়; (২); বাগড়ি (৩) বঙ্গ; (৪) বরেন্দ্র; এবং (৫) মিথিলা। মিথিলার অবস্থান বর্তমান নেপালের দক্ষিনে এবং বর্তমান দিনাজপুরের উত্তরে। রাঢ়-এর অবস্থান ছিল বর্তমান পশ্চিম বঙ্গের একটি বড় অংশ জুড়ে; ঢাকা এবং ফরিদপুর নিয়ে ছিল বঙ্গ; বরেন্দ্রর অবস্থান ছিল প্রাচীন বাংলার উত্তরে।
কিন্তু কোথায় ছিল বাগড়ি ?



গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ

কোনও কোনও ঐতিহাসিক বাগড়ি কে the delta of the Ganges বলে অবহিত করেছেন। ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’ বইতে পন্ডিত শ্রীরাজকৃষ্ণ মন্তব্য করেছেন, ‘যে ভূভাগ পদ্মা এবং ভাগীরথীর মধ্যস্থিত, তাহার নাম বাগড়ি।’ কোনও কোনও ঐতিহাসিকের মতে বাগড়ির প্রাচীন নাম হল ‘বালবলভী।’ এই মতটি অবশ্য বিতর্কিত। অবশ্য প্রাচীন ‘রামচরিত’ গ্রন্থে বালবলভীর যে বর্ণনা পাওয়া যায় তাতে বালবলভী দেশটিকে নদীবহুল বলেই মনে হয় । কাজেই বাগড়ির প্রাচীন নাম বালবলভী হলেও হতে পারে। কেননা, বাগড়ি স্থানটি নদীবহুল। যেহেতু, বাগড়ি ছিল পদ্মার দক্ষিণে। সে খুলনা কি বরিশাল হোক না কেন -আজও নদীবহুল।




নদী এবং বাংলা অবিভাজ্য

ঐতিহাসিকগণ বাগড়ি অঞ্চলের আয়তন নির্ধারণ করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কীসের ওপর ভিত্তি করে? উত্তর: বিশিষ্ট মুগল ঐতিহাসিক আবুল ফজলের ‘আকবরনামা’-র ভিত্তিতে। ঐতিহাসিক শ্রীরজনীকান্ত চক্রবর্তী লিখেছেন, ‘রাঢ়, বরেন্দ্র, বঙ্গ ও মিথিলা পূর্ব্ব হইতেই ধন-জন-পরিপূর্ণ ছিল; কিন্তু বাগড়িতে মানুষের বাস ছিল না।'
এর মানে কি? বেশ ধাঁধায় পড়া গেল তো! যে বাগড়ি নিয়ে এত কথা হচ্ছে, সে বাগড়িতেই কিনা মানুষের বাস ছিল না? ঐতিহাসিক শ্রীরজনীকান্ত চক্রবর্তী আরও লিখেছেন, "এই স্থান সমুদ্র গর্ভ হইতে মস্তক উত্তোলন করিতেছিল।" (বাংলা ভাষার কি বাহার! মস্তক উত্তোলন করিতেছিল ... ) ...সেই যাই হোক। ঐতিহাসিক শ্রীরজনীকান্ত চক্রবর্তীর কথা অনুযায়ী বাগড়ি-র অবস্থান সমুদ্রের কাছাকাছি।



বাংলাদেশ আর বঙ্গোপসাগরও কখনও কখনও অবিভাজ্য বলেই মনে হয়। বিরাট প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সে জানান দেয় যে সে আছে ...

বিশিষ্ট গবেষক কাবেদুল ইসলাম লিখেছেন, ‘সুন্দরবন অঞ্চল সম্ভবত এ সময় (অর্থাৎ সেন আমলে) বাগড়ি-র মধ্যে ছিল। তখন একে বলা হত ‘ব্যাঘ্রতটী মন্ডল।’ (দেখুন ; প্রাচীন বাংলার জনপদ ও জনজাতিগোষ্ঠী। পৃষ্ঠা;১৪০)
এতক্ষণে বোঝা গেল!
তার মানে বাঘ বা ব্যাঘ্র যে সমুদ্র-তটে বা সৈকতে বাস করে বা চড়ে বেড়ায় তাই ব্যাঘ্রতটী মন্ডল । অর্থাৎ, সুন্দরবন। এর মানে প্রাচীন বাগড়ি দেশ ও জনপদের অন্তর্ভূক্ত ছিল আজকের পৃথিবীবিখ্যাত সুন্দর বন!



মানচিত্রে সুন্দরবন।এ বনে সুন্দরী গাছ বেশি বলে এক সময় পুরনো নামটি বদলে যায়। সাগরের বন বা সমুদ্র-বন-এ থেকেও সুন্দরবন নামের উদ্ভব বলে কেউ কেউ মনে করেন। ১৯৯৯ সালে সুন্দরবন UNESCO World Heritage Site- এর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

বাংলায় প্রাপ্ত তাম্রশাসন ও লেখমালা বিশ্লেষন করে বোঝা যায় যে ৮ম থেকে ১২শ শতক অবধি ‘ব্যাঘ্রতটী মন্ডল’ বা পরবর্তীকালে বাগড়ি ছিল সমুদ্রের কাছাকাছি বাঘ অধ্যুষিত এক বিস্তীর্ণ প্রদেশ। মুসলিম শাসনামলে ওই অঞ্চলটিকে বলা হয়: ‘বাগড়ি মহল’। মুগল কর্তৃপক্ষ বনভূমি সাফ করে আবাদ করে জনবসতি গড়ে তোলার উদ্যেগ নেওয়া হয়। ওই সময়ই, অর্থাৎ মুগল আমলে স্থানীয় এক রাজা পুরো সুন্দরবনের ইজারা নেন বলে জানায় যায় (সুন্দরবন বিষয়ক বাংলা উইকিপিডিয়া দেখুন) ।




সুন্দরবনের প্রাণীকূলের শোভাও অপরূপ

স্থানীয় মুগল শক্তির ক্ষমতা খর্ব করে বাংলার ইতিহাসে আবির্ভূত হয় ইংরেজরা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে মুগল সম্রাট দ্বিতীয় আলমগীরের কাছ থেকে সুন্দরবনের স্বত্বাধিকার পায় ইংরেজ বেনিয়ারা। তারা শাসনশোষন যাই করুক, সুন্দরবনের মানচিত্র তৈরি করতে কিন্তু ভুল করেনি! ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন বাংলা প্রদেশে বন বিভাগ স্থাপনের পর থেকে সুন্দরবন সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আসে। তারপর? তারপর ‘বিশ্বের প্রথম ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে বিজ্ঞানভিত্তিক তত্ত্বাবধানের অধীনে আসে।’ (উইকিপিডিয়া) mangrove forest-এর বাংলাটিও বেশ মজার। ‘জোয়ারধৌত গরান বনভূমি’।



উপকূল সংলগ্ন সুন্দরবন

মুগল ঐতিহাসিক আবুল ফজল-এর ‘আইন-ই আকবরি’ গ্রন্থে বাগড়িকে ‘সরকার-ই-মন্দারণ’ এর অন্তর্গত একটি মহাল বলা হয়েছে। কাজেই সম্রাট আকবরের সময়কার বাগড়িই হচ্ছে ‘বাগড়ি মহাল।’ কাজেই ব্যাঘ্রতটী মন্ডল, বাগড়ি বা বাগড়ি মহাল ছিল বাংলার প্রাচীন নদনদীবহুল জলাভূমিময় বনাঞ্চল।

কীভাবে ব্যাঘ্রতটী মন্ডল যাবেন?
বাংলাদেশের যে কোনও জায়গা থেকে প্রথমে আপনাকে খুলনা পৌঁছতে হবে। এরপর ব্যাঘ্রতটী মন্ডলের গভীরে প্রবেশ করার জন্য আপনাকে মংলা বন্দরে যেতে হবে । কিংবা খুলনার নতুন বাজার লঞ্চঘাট থেকেও ব্যাঘ্রতটী মন্ডলে যাওয়া যায়।



বর্তমান খুলনা শহরের একটি দৃশ্য। (ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত ) এককালে এই শহরটি ছিল প্রাচীন বাগড়ি বা ব্যাঘ্রতটী মন্ডলের অন্তর্গত ।

ঢাকার সদরঘাট থেকে গাজী ও শাহীন বেলায়েত নামক রকেটে ব্যাঘ্রতটী মন্ডলে যাওয়া যায়।



ব্যাঘ্রতটী মন্ডলের একটি ব্যাঘ্র; ভবিষ্যতে হয়তো সুন্দরবনের নাম হবে "টাইগার কোস্ট" ...আলোচনার শুরুতে বলেছিলাম ... ক্লু হিসেবে আপনাদের জানিয়ে রাখি যে ‘ব্যাঘ্রতটী মন্ডল’ এর বর্তমান নামটি যাইই হোক না কেন-বিশ্বের লোকে সেটি এক নামেই চেনে। বাংলার বাঘ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের ক্রিকেট দলকেও এক নামে চেনে বিশ্বের লোকে ...এও কম গর্বের বিষয় নয় কিন্তু।

ব্লগার শামসীর এর সৌজন্যে ব্যাঘ্রতটী মন্ডল-এর আরও ছবি ...
Click This Link

ছবি: ইন্টারনেট।

তথ্যনির্দেশ:

কাবেদুল ইসলাম; প্রাচীন বাংলার জনপদ ও জনজাতিগোষ্ঠী
বাংলাপিডিয়া
উইকিপিডিয়া
Click This Link
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29519805 http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29519805 2012-01-10 12:49:55
আমারও নিবাস জেনো লোহিতাভ মৃত্তিকার দেশে/ পূর্ব পুরুষেরা ছিলো পট্টিকেরা পুরীর গৌরব ... কবি আল মাহমুদ; যিনি তাঁর অত্যন্ত জনপ্রিয় ‘সোনালি কাবিন’ কবিতায় লিখেছেন: ‘আমারও নিবাস জেনো লোহিতাভ মৃত্তিকার দেশে/ পূর্ব পুরুষেরা ছিলো পট্টিকেরা পুরীর গৌরব’। কিন্তু, ‘লোহিতাভ মৃত্তিকার দেশটি’ কোথায়? কোথায়-বা অবস্থিত ছিল পট্টিকেরা পুরী? এই সব প্রশ্নের নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি বোধ করি। কেননা, এই সব প্রশ্নের উত্তরেই নিহিত রয়েছে বাঙালি নামক এক কাজল জাতির আত্মপরিচয়ের চিহ্নটি। কবি আল মাহমুদ- এর ‘সোনালি কাবিন’ কবিতায় বাংলার তেমনই এক বিস্মৃত সময়ের ইঙ্গিতটি বিধৃত রয়েছে । কবির সেই অতীতযাত্রাকালে কবির অর্ন্তলোকে ইতিহাস চৈতন্যের আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছে এক অনাবিস্কৃত কাল। যার অভিঘাত অনিবার্যভাবেই স্পর্শকাতর বাঙালির স্নায়ূতন্ত্রে তোলে আলোড়ন ; আর এখানেই কবি আল মাহমুদ উত্তীর্ণ হয়েছেন। যে কবি সম্বন্ধে বিশিষ্টি মানবতাবাদী তাত্ত্বিক শিবনারায়ণ রায় বলেছেন: Al Mahmud has an extraordinary gift for telescopic discrete levels of experience ... এই কথায় যেন কবির অর্ন্তলোক সম্বন্ধে অনেক কথাই বলা হয়ে যায়।
বলছিলাম যে লোহিতাভ মৃত্তিকার দেশটি কোথায়? কোথায়-বা অবস্থিত ছিল পট্টিকেরা পুরী?
লোহিতাভ মৃত্তিকার দেশটি ছিল বর্তমান কুমিল্লা জেলার লালমাই পাহাড়ে। নবম-দশম শতকে ওখানেই ছিল পট্টিকেরা নগর। আর সে নগরে যে অনুপম সব অট্টালিকা ছিল সে তো অনুমান করাই যায়। ছিল রাজপথ, রাজপথে মন্থর গতিতে চলমান হাতি, শালের বন, দিঘী, দিঘীপাড়ে বৌদ্ধ ভিক্ষু ... সে যাই হোক। আমরা পট্টিকেরা শব্দটির আরও দুটি শব্দ পাই। (১) পট্টিকের; এবং (২) পট্টিকেরক।ইংরেজিতে Pattikera. সেই যাই হোক। প্রাচীন বাংলার দুটি প্রধান ভৌগলিক বিভাগ হল সমতট এবং হরিকেল। ওই সমতট ও হরিকেলজুড়েই ছিল মধ্যযুগের বাংলার পট্টিকেরা রাজ্য অবস্থান।



প্রাচীন বাংলার মানচিত্র। পূর্ব ও দক্ষিণ পূর্বে সমতট ও হরিকেল রাজ্যের অবস্থান । ওই সমতট ও হরিকেলেই ছিল পট্টিকেরা রাজ্যটির অবস্থান।

মধ্যযুগের পট্টিকেরা ছিল একাধারে একটি রাজ্য ও নগর। (অনেকটা ভূমধ্যসাগরে অবস্থিত প্রাচীন ক্রিটের নসস নগরের মতো ) ... পট্টিকেরা নগরটির অবস্থান ছিল বর্তমান কুমিল্লা শহরের ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে। ওখানেই ছিল কবি আল মাহমুদের পূর্ব পুরুষের শিকড়। যে সাহসী এবং অসাম্প্রদায়িক পূর্ব পুরুষকে নিয়ে কবির অনেক গর্ব। তাঁদেরই স্মরণ করে কবি লিখেছেন:

অতীতে যাদের ভয়ে বিভেদের বৈদিক আগুন/ করতোয়া পার হয়ে এক কঞ্চি এগোতো না আর ...

কবির কথায় বোঝা গেল যে মধ্যযুগের বাংলায় (ধর্মীয় অর্থে) সেরকম কোনও বিভেদ ছিল না । বৈদিক আর্যরা পশ্চিম দিক থেকে সে বিভেদের আগুন বাংলায় নিয়ে এসেছিল। সে বিভেদ ঠাঁই নিয়েছিল করতোয়া নদীর পূর্বপাড়ে, অর্থাৎ পুন্ড্রনগরে (বর্তমান বগুড়া)। মৌর্য আমলে বা তারও আগে বরেন্দ্র এবং পুন্ড্রবর্ধনে (বাংলার উত্তরপশ্চিম অঞ্চলে) আর্যসংস্কৃতি বিস্তার লাভ করেছিল। (দিনাজপুরের ‘পুনর্ভবা’ নদীর নামটি সেই স্মৃতিই বহন করে?) কিন্তু, পট্টিকেরা রাজ্যের অধিবাসীগণ ছিলেন সাহসী এবং ধর্মীয় ক্ষেত্রে উদার দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী । কাজেই, বিভেদের বৈদিক আগুন (ধর্মীয় শ্রেণিভেদ বা জাতপাত, যা বাঙালির আধ্যাত্মিক গুরু লালন-এর কাছে ছিল ঘৃন্য) করতোয়া পাড় হয়ে পূর্ব দিকে অগ্রসর হতে পারেনি।



মানচিত্রে ‘লোহিতাভ মৃত্তিকার দেশ’ কিংবা কুমিল্লার ময়নামতী। নবম দশম শতকে এখানেই ছিল পট্টিকেরা পুরী।

লালমাই পাহাড়টির বিস্তার লাল মাটির সমতট রাজ্যে। সে জন্য প্রাচীন কালে পাহাড়টিকে অনেকে বলত ‘লাল মাই’ অর্থাৎ লাল রঙের স্তন। এমন ভাবনাটি নিছকই মা-পৃথিবীর জীবনদায়ী অঙ্গের বর্ণনা। এমনটি ভাবা প্রাচীন বাংলায় বিচিত্র কিছু না। কেননা, প্রাচীনকালেই মাতৃতান্ত্রিক বাংলায় নারীবাদী তন্ত্রের উদ্ভব হয়েছিল। আমরা যে সময়কালের কথা বলছি, সে সময় বাংলার বৌদ্ধ এবং হিন্দুধর্ম উভয়ই বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে হয়ে উঠেছিল তান্ত্রিক-যা একান্তই নারীকেন্দ্রিক গূহ্য সাধনার বিষয়।



ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মানচিত্র। কবি আল মাহমুদ ১৯৩৬ সালের ১১
জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মৌড়াইল গ্রামে জন্মগ্রহন করেছেন। নবম-দশম শতকে বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাটি ছিল পট্টিকেরা রাজ্যের অর্ন্তভূক্ত। মানচিত্রের পূর্বদিকে যে ত্রিপুরা রাজ্যটি দেখছেন, প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র মজুমদারের মতে মধ্যযুগে ত্রিপুরা রাজ্যটি পট্টিকেরা রাজ্যের অর্ন্তভূক্ত ছিল।

চন্দ্র বংশের রাজারা পট্টিকেরা রাজ্য শাসন করতেন। অবশ্য একাদশ শতকের মাঝামাঝি তাদের পতন হয়। তারপর পট্টিকেরায় আরেকটি রাজবংশ গড়ে ওঠে। সেই বংশেরই এক রাজার নাম ছিল রণবঙ্কমল্ল শ্রীহরিকলদেব। এঁর সময়কাল (১২০৪-১২২১) । রাজা রণবঙ্কমল্ল শ্রীহরিকলদেব -এর মন্ত্রীর নাম ছিল শ্রীধড়ি-এব। মন্ত্রীর বাবার নাম ছিল হোদি এব। তৎকালীন সময়ের একটি তাম্রশাসনের লেখকের নাম ছিল মেদিনী-এব। এই নামগুলির সঙ্গে পট্টিকেরা রাজ্যের পার্শ্ববর্তী ব্রহ্মদেশ বা বার্মার অধিবাসীদের নামের গভীর সাদৃশ্য রয়েছে। তাহলে এই বিষয়টি পরিস্কার যে পট্টিকেরা শাসনামলে ভিনদেশি মন্ত্রী হতে পারতেন? এই বিষয়টি
কি বাঙালির সহনশীলতার উদাহরণ হয়ে রইল না? এই সঙ্গে আমাদের মনে পড়ে যায় যে বাংলার বৌদ্ধ পালরাজাদের মন্ত্রীদের অধিকাংশই তো ব্রাহ্মণ ছিলেন। ... অথচ এতকাল পরে মায়ানমার থেকে উৎপীড়িত রোহিঙ্গারা আশ্রয়ের জন্য এলে আমরা আর আনন্দিত হইনা। সেকালে পরিস্থিতি আজকের মতো ছিল না; জনসংখ্যা কম ছিল, ফসলি জমির ভাগ বেশি ছিল ...



বর্তমান বাংলাদেশের মানচিত্র। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত মায়ানমার। তৎকালীন আরাকান এবং বার্মার সঙ্গে পট্টিকেরা রাজ্যের বানিজ্যিক সর্ম্পক ছিল। সেরকম হওয়াই স্বাভাবিক। কেননা, পুবের ব্রহ্মদেশ বা বার্মা রাজ্য ছিল প্রাচীন বাংলার সমতট আর হরিকেল রাজ্যের গা ঘেঁষেই।

মধ্যযুগের বার্মার অধিবাসীরা পট্টিকেরা রাজ্যকে বলত ‘পতিককর’ কিংবা ‘পতেইক্কর’। তারা পট্টিকেরা রাজ্যকে ‘কালাস’ বা ভিনদেশিদের রাজ্য বলত। একাদশ-দ্বাদশ শতকে বার্মার রাজধানী ছিল ‘পাগান’। সেই সময়ের কয়েকজন বর্মি রাজার নাম: অনোরথ (১০৪০); ক্যানজিৎথ(১০৮৬-১১১২) এবং অলৌঙ্গ সিথু (১১১২-৬৭) । এই রাজাদেরই পশ্চিম সীমান্তবর্তী ছিল পট্টিকেরা দেশ।



বার্মার (মায়ানমার) বাগান রাজ্যের একটি বৌদ্ধ মন্দির। খ্রিস্টপূর্ব যুগেই বার্মাতে বৌদ্ধধর্মের প্রচার হয়েছিল। পট্টিকেরা রাজ্যেও ছিল বৌদ্ধধর্মের চর্চা। দুটি রাজ্যের সর্ম্পকের সূত্রটি এখান থেকেও আবিস্কার করা যায়।

পট্টিকেরার প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায় ১০১৫ খ্রিস্টাব্দের একটি বৌদ্ধ পান্ডুলিপি থেকে। সেই পান্ডুলিপির নাম ‘অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা’। এতে বৌদ্ধ দেবী চুন্দার উল্লেখ রয়েছে এভাবে: ‘পট্টিকেরে চূন্দাবরভবনে চূন্দা।’ এর ওপর ভিত্তি করে ঐতিহাসিকেরা মনে করেন,‘সম্ভবত মূর্তিটি ছিল পট্টিকেরা নগরে অবস্থিত চুন্দামন্দিরে পূজিতা চুন্দাদেবীর। (দেখুন; কাবেদুল ইসলাম; প্রাচীন বাংলার জনপদ ও জনজাতিগোষ্ঠী পৃষ্ঠা; ১৪২) এসব কারণে মনে হয় যে একাদশ শতকে পট্টিকেরা নগরে বৌদ্ধধর্মের চর্চা ছিল। ওই সময়কার একটি তাম্রশাসন থেকে জানা যায়: রাজা রণবঙ্কমল্ল শ্রীহরিকলদেব-এর মন্ত্রী শ্রীধড়ি-এব পট্টিকেরানগরে একটি বৌদ্ধমন্দির নির্মানের জন্য জমি দান করেছিলেন। এসব কথা স্মরণ করে কবি আল মাহমুদ লিখেছেন:

রাক্ষুসী গুল্মের ঢেউ সবকিছু গ্রাস করে এসে/ ঝিঁঝির চিৎকারে বাজে অমিতাভ গৌতমের স্তব।

তো, কীভাবে পট্টিকেরা রাজ্যে যাবেন?
বাংলাদেশের যে কোনও জায়গা থেকে প্রথমে কুমিল্লা শহরে পৌঁছবেন। তারপর কান্দিরপাড় যাবেন। কেননা, কান্দিরপাড়ই শহরটির কেন্দ্রস্থল ।



কান্দিরপাড়। (ছবিটি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)

ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। কুমিল্লা শহরের মানুষেরা অত্যন্ত আন্তরিক। যে কাউকে বললেই আপনাকে শহরের ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে কোটবাড়ি যাওয়ার উপায় বলে দেবে। ওই কোটবাড়িতেই রয়েছে শালবন বিহার আর লাল রঙের মাটির ময়নামতী পাহাড়। কবির ভাষায় ‘লোহিতাভ মৃত্তিকা’। তারপর কোটবাড়ি পৌঁছে শালবনের ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আপনি এ কথাগুলি ভাবতে পারেন। ... ১৯৪৩ সাল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলছে। বর্তমান কুমিল্লা জেলাটি সে সময় ব্রিটিশ ভারতেরই অংশ ছিল। ব্রিটিশ সৈন্যদের জন্য কুমিল্লার লাইমাই পাহাড়ে একটি সামরিক স্থাপনা নির্মানের কথা ভাবা হয়। ... তারপর মাটি খোঁড়ার সময়ই মাটির নীচ থেকে বেরিয়ে আসে প্রাচীন সব স্থাপনা , প্রকাশিত হয় বাংলার এক বিস্মৃত অতীত । তারপর গবেষক আর ঐতিহাসিকদের পদচারণায় মূখর হয়ে ওঠে লালমাই পাহাড়ের প্রায় দশ মাইল এলাকাজুড়ে বিস্তির্ণ শালবন। সে যাই হোক । শালবনের ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আপনি একবার ভাবতে পারেন: ... একাদশ-দ্বাদশ শতকে এই জায়গাটিই ছিল পট্টিকেরা রাজ্য; যে রাজ্যটির নাম বাংলা ভাষার এক শ্রেষ্ঠতম কবি অমর করে রেখেছেন ‘সোনালি কাবিন’ কবিতায়।



শালবন বিহারের ওই প্রাচীন বৌদ্ধস্থাপনার সিঁড়িতে বসে ক্ষণিকের জন্য হলেও তো অতীতের দিকে একবার ফিরে তাকানো যায় ...যায় না কি?

কবি আল মাহমুদের জন্মস্থান ব্রাহ্মবাড়িয়া হলেও কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দিতে ছেলেবেলায় কবি লেখাপড়া করেছেন । আর এখানেই বলে রাখি যে, আমার বাবার মামাবাড়ি দাউদকান্দি । অবশ্য আমার পিতৃপুরুষের নিবাস চাঁদপুর জেলার মতলব উপজেলার নায়ের গাঁ। একাদশ-দ্বাদশ শতকে যাঁরা ছিলেন পট্টিকেরা রাজ্যের প্রজা, যাঁরা (হয়তো )রাজা রণবঙ্কমল্ল শ্রীহরিকলদেব কে খাজনা দিতেন। যে রাজা রণবঙ্কমল্ল শ্রীহরিকলদেব তাঁর দরবারে ভিনদেশি মন্ত্রী নিয়োগ দিতেন, এবং বুদ্ধের শান্তিবাদী ধর্মের প্রতিষ্ঠায় জমি দান করতেন। এই সমস্ত কারণে আমিও চিৎকার করে বলতে চাই:

‘আমারও নিবাস জেনো লোহিতাভ মৃত্তিকার দেশে/ পূর্ব পুরুষেরা ছিলো পট্টিকেরা পুরীর গৌরব’

ছবি। বাংলাপিডিয়া এবং ইন্টারনেট- এর সৌজন্যে ।
তথ্যসূত্র:

আল মাহমুদ;শ্রেষ্ঠ কবিতা। (হাওলাদার প্রকাশনী। পৃষ্ঠা; ৬৮।)
কাবেদুল ইসলাম; প্রাচীন বাংলার জনপদ ও জনজাতিগোষ্ঠী
এ কে এম শাহনাওয়াজ; বাংলার সংস্কৃতি বাংলার সভ্যতা
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29519129 http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29519129 2012-01-09 12:35:38
ম্যানডিয়ান (Mandaeans) তরিকার ইতিবৃত্ত
একজন ম্যানডিয়ান সাধু। ম্যানডিয়ান সম্প্রদায়টি নস্টিক তরিকার অর্ন্তভূক্ত।দিন কয়েক আগে নসটিক তরিকা সম্বন্ধে বিস্তারিত লিখেছি। নসিস (Gnosis) শব্দটি গ্রিক। এর মানে হল ‘গুপ্ত অধ্যাত্মরহস্যের’ জ্ঞান। নসিস থেকে নস্টিক শব্দটির উদ্ভব হয়েছে। অবশ্যি নস্টিক (Gnostic) শব্দটির মানে: "গুপ্ত অধ্যাত্মরহস্যের জ্ঞানবাদী খ্রিস্টান গোষ্ঠীবিশেষ।" বস্তুত নস্টিক চিন্তাধারার উদ্ভব খ্রিস্টপূর্ব যুগে । ওই চিন্তাধারা উৎস মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ার ইহুদি সমাজে। আলেকজান্দ্রিয়ায় বসবাসরত চিন্তাশীল ইহুদি সম্প্রদায়ে গ্রিক ধাবধারায় আচ্ছন্ন হওয়াই ছিল স্বাভাবিক। তাইই হয়েছে। নস্টিক ভাবধারার উদ্ভব হয়েছে।




প্রধান ধর্মীয় শাস্ত্রগ্রন্থ ব্যাখ্যা করে যুগে যুগে নতুন নতুন উপ-সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়েছে।

কিছু সংখ্যক খ্রিস্টান সম্প্রদায় আলেকজান্দ্রিয়ার নস্টিক ভাবধারা গ্রহন করে জুদাহ ও গালিল প্রদেশে প্রবর্তন করে; যার বিকাশ হয়েছিল খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শতকে। পন্ডিতেরা মনে করেন যে ম্যানডিয়ান তরিকার উদ্ভবও ওই বিশেষ সময়টায়। হাজার বছর পাড়ি দিয়ে আজও দক্ষিণ ইরাক ও পশ্চিম ইরানে সম্প্রদায়টি টিকে রয়েছে। এ কারণে বলা হয়: Mandaeism is the oldest surviving gnostic religion ...



ইরাকে (প্রাচীন মেসোপটেমিয়া) একটি উপধর্মের উপাসনালয় । বিশ্বের প্রধান প্রধান ধর্মের পাশাপাশি অজস্র উপধর্মের উদ্ভব ও বিকাশ হয়েছে; যে সব লৌকিক ধর্মের ইতিহাস বিচিত্র ও বিস্ময়কর।

এবার আমরা দেখব ম্যানডিয়ান শব্দটির উদ্ভব কীভাবে হয়েছে। যিশু যে ভাষায় কথা বলতেন সেই ভাষার নাম আরামিয়। সেই আরামিয় ভাষায় জ্ঞানকে বলা হয় manda; এই ‘মানডা’ শব্দটি থেকেই ম্যানডিয়ান (Mandaeans) শব্দটির উদ্ভব। আসলে ‘নস্টিক’ বলতে যা বোঝায় আরামিয় ভাষায় ‘ম্যানডিয়ান’ বলতে ঠিক তাই বোঝায়।



ম্যানডিয়ান সম্প্রদায়ের ক'জন সদস্য। প্রকৃতিসংলগ্নতা সম্প্রদায়টির প্রধান বৈশিষ্ট্য বলে মনে হয় ...

অনেক ঐতিহাসিকের মতে ম্যানডিয়ান সম্প্রদায়টি উদ্ভব প্রাচীন ফিলিস্তিনের হারান প্রদেশে। হারান প্রদেশের অবস্থান ছিল মেসোপটেমিয়ার উত্তরে, যা বর্তমান দক্ষিণ তুরস্কের অর্ন্তভূক্ত। সে যাই হোক। মূলধারার সঙ্গে খাপ না খাওয়ায় খ্রিস্টীয় ষষ্ট শতকের পূর্বেই নস্টিক তরিকাটি বিলুপ্ত হয়ে যায় । অবশ্য ইরান ও ইরাকে নস্টিক ম্যানডিয়ানরা আজও টিকে রয়েছে -এ এক বিস্ময়। ম্যানডিয়ানরা সারা বিশ্বেই ছড়িয়ে আছেন। সব মিলিয়ে ম্যানডিয়ান সম্প্রদায়ের সংখ্যা প্রায় ৬৫,০০০ ।



একজন মার্কিন ম্যানডিয়ান।

ম্যানডিয়ান সম্প্রদায়ের উদ্ভব সর্ম্পকে অধ্যাপক এপ্রিল ডি. ডিকোনিক লিখেছেন, Their origins are in antiquity, about the same time as the advent of Christianity. One of their religious heros is John the Baptist, although he is never remembered as their historical founder. They appear to have been originally a Jewish Gnostic baptismal group. Fleeing persecution, they made their way east into Syria and further into ancient Babylonia.




ইরাকের মানচিত্রে নাসিরিয়ার অবস্থান। বর্তমানে ওই অঞ্চলেই ম্যানডিয়ান সম্প্রদায়ের বাস। তবে বাগদাদ শহরেও ম্যানডিয়ানরা বাস করে।

ম্যানডিয়ানরা মনে করেন যে মানবত্মা এই ভৌত বিশ্বে এবং শরীরে বন্দি হয়ে রয়েছে। এ থেকে মুক্তির উপায় হল প্রকাশিত জ্ঞানের উপলব্দি, কঠোর নৈতিক জীবন যাপন করা এবং নানান ধর্মীয় কৃত্য পালন করা। ম্যানডিয়ানরা সম্প্রদায় এক ত্রাণকর্তা বা ‘মধ্যস্থতাকারী মুক্তিদাতায়’ বিশ্বাস করেন। এই ত্রাণকর্তার নাম Manda da Hayye অর্থাৎ ‘জীবনের জ্ঞান’। ত্রাণকর্তার অন্য নাম Hibel-Ziwa. ম্যানডিয়ানরা মনে করেন যে ... একদা এই ত্রাণকর্তা পৃথিবীতে বাস করতেন । যখন পৃথিবীতে ছিল দৈত্যদের শাসন । যে হিংসুক দৈত্যরা আত্মাকে বন্দি করে রেখেছিল। সেই বীর ত্রাণকর্তা প্রবল পরাক্রমে দৈত্যদের পরাজিত করেছিলেন। আত্মাকে পরম ঈশ্বরে রাজ্যে ফিরে যেতে ত্রাণকর্তা সাহায্য করেছিল । কেননা ম্যানডিয়ানরা আত্মদর্শনের পথে স্বর্গরাজ্যের (divine realm) গুপ্তজ্ঞান অন্বেষন করেছে। ক্রমে তারা এই বিশ্বাসে উপনীত হয় যে মানবজ্ঞান ও অভিজ্ঞতার অতীত এক ঐশীরাজ্যের পরম সত্তার (Divine Being) বীজ বা স্ফূলিঙ্গ পতিত হয় ভৌত বিশ্বে (সmaterial universe)-যা কিনা সম্পূর্নরূপে অশুভ। এবং যে ঐশী স্ফূলিঙ্গ বন্দি হয়ে আছে মানবদেহে। এটা ঠিক নয়, এটা অনুচিত। এই ঐশী স্ফূলিঙ্গ যেখান থেকে পতিত হয়েছে সেখানেই তাকে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত। কী ভাবে? জ্ঞানের মাধ্যমে। তাই জ্ঞান দ্বারা পুর্নজাগরিত হয়ে, মানবসত্তার ঐশী উপাদান তার মানবজ্ঞান ও অভিজ্ঞতার অতীত ওই রাজ্যের প্রকৃত ঘরে ফিরে যেতে পারে।



ম্যানডিয়ান নারী। ধর্মে কি উপধর্মে-সর্বত্রই সুন্দর ...

ম্যানডিয়ান সম্প্রদায়ের ভাবধারায় পারস্যের জরথুশত্রবাদের প্রভাব এড়াতে পারেনি। কেননা, According to the Mandeans, cosmos is made up of two forces, the world of light, located to the north, and the world of darkness, located to the south. There is a ruler to both, and around the rulers smaller gods, called kings. তবে ম্যানডিয়ানরা তাদের ত্রাণকর্তার ধারণাটি খ্রিস্টান ধর্মের যিশুর কাছ থেকে পেয়েছেন বলে গবেষকদের ধারণা। অবশ্য ম্যানডিয়ানরা যিশুকে মিথ্যা পয়গম্বর (ফলস প্রোফেট) মনে করেন! তবে অনেক খ্রিস্টীয় বিশ্বাস ম্যানডিয়ান সম্প্রদায়ের ভাবধারায় ধারণা রয়েছে। যেমন: ম্যানডিয়ানরা আদম হাওয়াকেই প্রথম মানব-মানবী মনে করেন।



প্রার্থনারত ম্যানডিয়ান পুরুষও সুন্দর । মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চাপিয়ে দেওয়া ইরাক যুদ্ধে এদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। কাজেই মার্কিন তরুণ সমাজ এবং ম্যানডিয়ান পুরুষদের মধ্যে তুলনা করা যেতেই পারে। ম্যানডিয়ান সম্প্রদায়টি লোভের বশবর্তী হয়ে কখনও কোনও দেশ আক্রমন করেনি ... কারণ Mandaeism is pacifistic and forbids its adherents from carrying weapons ...

ম্যানডিয়ানগণ বাংলার বাউলদের মতোই শান্তিবাদী। বিবিসি-র সিরিয় প্রতিনিধি সাংবাদিক Angus Crawford লিখেছেন,The Mandaeans are pacifists, followers of Adam, Noah and John the Baptist. জন দ্য বাপ্তিষ্ট-এর জন্ম হয়েছিল প্রাচীন ফিলিস্তিনের জুদায়, সর্ম্পকে তিনি ছিলেন যিশু খ্রিস্টের আত্মীয় । জন দ্য বাপ্তিষ্ট কে যিশুর পূর্বে শেষ মহান পয়গম্বর বলে খ্রিস্টানরা মনে করেন । জন দ্য বাপ্তিষ্ট প্রাচীন ফিলিস্তিনের ইহুদি সমাজে প্রচার করতেন: ঈশ্বরের শেষ বিচার আসন্ন । ম্যানডিয়ানগণ জন দ্য বাপ্তিষ্টকে গভীর শ্রদ্ধা করেন এবং তাঁকে পয়গম্বর মনে করেন। ম্যানডিয়ানরা তাঁকে "জাহিয়া" বা "জেহানা" বলে ডাকেন। তবে ম্যানডিয়ান সম্প্রদায়টির উদ্ভব জন দ্য বাপ্তিষ্ট এরও অনেক আগে। সেই যাই হোক। ম্যানডিয়ানরাও বিশুদ্ধতার কৃত্য বা পবিত্র পানিতে অভিসিঞ্চন করে থাকে।কেননা, John baptized Jewish people in the river Jordan on the confession of their sins এ কারণেই ম্যানডিয়ান সম্প্রদায়ে Baptism এর ধারণাটি অন্যতম। ম্যানডিয়ান সম্প্রদায়ে "মানডি" থাকে । আর মানডিতে থাকে Baptism জলাধার । বাপ্তিজম পালন করা হয় রোববার । ইরাক কিংবা ইরানের ম্যানডিয়ান বসতিটি থাকে দেওয়াল দিয়ে ঘেরা । কাছে পিঠে নদী থাকে। যে কোনও নদীই এদের কাছে ‘জর্দান’ নদী! ... আর এভাবেই ধর্মীয় ইতিহাসের পাঠ হয়ে ওঠে বিস্ময়কর ...



সহজ সরল জীবন যাপনই ম্যানডিয়ানদের প্রধান বৈশিষ্ট্য ...

আমরা দেখেছি যে নস্টিকরা বিয়ে বা যৌনসর্ম্পককে নিরুৎসাহিত করলেও ম্যানডিয়ান সম্প্রদায়ে বিবাহকে গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক আচার বলে মনে করাহয়।এটি তাদের ওপর ইসলামের প্রভাব কি? সম্ভবত। যা হোক। খ্রিস্টান ধর্মের প্রভাবের ফলে মৃতের সমাবেশ (মাস ফর ডেড) এদের প্রধান ধর্মীয় কৃত্য। মৃত্যুর তিনদিন পর শরীর থেকে আত্মা নির্গত হয়। এই শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে আহার পর্বটিও গুরুত্বপূর্ণ। ম্যানডিয়ানদের কবর সাধারণত চিহ্নহীন হয়ে থাকে। কেননা, দেহ নামে যা সমাহিত করা হয় তা কেবলি অগুরুত্বপূর্ণ শরীরমাত্র। অবশ্য সম্প্রদায়টির ওপর ইসলামী প্রভাব পড়েছে।



ম্যানডিয়ান নারীপুরুষ

তবে ম্যানডিয়ান নৈতিকতার সঙ্গে ইহুদি নৈতিকতার সাদৃশ্য বেশি। মনে থাকার কথা ... নসটিক চিন্তাধারাটি খ্রিস্টপূর্ব যুগের একটি ধর্মীয় আন্দোলন । ওই চিন্তাধারা উৎস মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ার ইহুদি সমাজে। আলেকজান্দ্রিয়ায় বসবাসরত চিন্তাশীল ইহুদি সম্প্রদায়ে গ্রিক ধাবধারায় আচ্ছন্ন হওয়াই ছিল স্বাভাবিক। তাইই হয়েছে। নসটিক ভাবধারার উদ্ভব হয়েছে।




ম্যানডিয়ান সম্প্রদায়ে পানির গুরুত্ব অপরিসীম ...John baptized Jewish people in the river Jordan on the confession of their sins

ম্যানডিয়ান পুরোহিতকে বলা হয় Nasoreans । এই শব্দটির অর্থ -‘কৃত্যের পালনকারী’। পুরোহিতরা ম্যানডিয়ান সমাজে পৃথক একটি জাত। ম্যানডিয়ানদের ধর্মগ্রন্থের নাম যিনজা (Ginza) যিনজা শব্দটির অর্থ ‘রতানভান্ডার।’ যিনজার বিষয় প্রাচীন উপকথামূলক এবং ধর্মতাত্ত্বিক নীতিকথার বর্ননা। এছাড়া যিনজায় মৃতের সমাবেশে পাঠ করার জন্য পবিত্র পাঠ রয়েছে । আরামিয় ভাষায় লেখা ম্যানডিয়ানদের আরও কিছু গৌণ ধর্মশাস্ত্র রয়েছে। আর রয়েছে যাদুবিদ্যা সংক্রান্ত নির্দেশাবলী এবং ভূতপ্রেত দূর করার জন্য মন্ত্র।



জর্দান নদীর পাড়ে বসে থাকা একটি ম্যানডিয়ান বালিকা

ইসলামী বিশ্বে ম্যানডিয়ান সম্প্রদায় সাবেয়ী (Sabians) নামে পরিচিত। কুরআন শরীফের তিন জায়গায় সাবেয়ীদের কথা বলা হয়েছে। ‘নিশ্চয়ই যারা বিশ্বাস করে, যারা ইহুদি এবং খ্রিস্টান হয়েছে অথবা সাবেয়ী হয়েছে-এদের যে কেউ আল্লাহ এবং শেষ দিবসে বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট পুরস্কার আছে। তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না।’ ( সূরা বাকারাহ। ৮ রুকূ। আয়াত ৬২) অন্যত্র কুরআন শরীফের পঞ্চম সূরা মায়েদাহ-য় আল্লাহতায়ালা এরশাদ করছেন, ‘নিশ্চয়ই, যারা বিশ্বাসী, ইহুদী, সাবেয়ী ও খৃস্টান তাদের মধ্যে কেউ আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করবে, এবং সৎকাজ করবে তার কোনও ভয় নেই এবং সে দুঃখিতও হবে না।’ (৫/৬৯)




ম্যানডিয়ান শিশু ...পিছনে কল্পিত জর্দান নদী

ম্যানডিয়ান সম্প্রদায় বিগত দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে মেসোপটেমিয়ায় বসবাস করে আসছে। প্রাচীন মেসোপটেমিয়াই বর্তমান ইরাক। সেই ইরাকেই ম্যানডিয়ানদের অস্তিত্ব আজ হুমকির সম্মূখীন। ১৯৯০ সালে ইরাকে ৬০,০০০ ম্যানডিয়ান ছিলেন; বর্তমানে এ সংখ্যা ৫ থেকে ৭ হাজার মাত্র! কেন? কারণ- They claim that Islamic extremists in Iraq are trying to wipe them out through forced conversions, rape and murder. ইরাক যুদ্ধের ডামাডোলেও খুন ও অপহরণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। অথচ নরওয়েজিও ঐতিহাসিক Tore Kjeilen লিখেছেন: Sabaeans (Sabians) was a religion mentioned in the Koran as one of the religions that a Muslim ruler could tolerate ...



মূলধারার পাশবিক নির্যাতনে আহত এক ম্যানডিয়ান বালক



তবু ব্যক্তি মানুষের ভিতরে বহমান মানুষের ধর্মীয় কৃষ্টি ... কেননা এই ম্যানডিয়ান বৃদ্ধটি তাঁর তরিকার শিশুদের বলবেন, একদা ত্রাণকর্তা Manda da Hayye পৃথিবীতে বাস করতেন । যখন পৃথিবীতে ছিল দৈত্যদের শাসন । যে হিংসুক দৈত্যরা আত্মাকে বন্দি করে রেখেছিল। সেই বীর ত্রাণকর্তা প্রবল পরাক্রমে দৈত্যদের পরাজিত করেছিলেন। আত্মাকে পরম ঈশ্বরে রাজ্যে ফিরে যেতে ত্রাণকর্তা সাহায্য করেছিল ...

ম্যানডিয়ান সম্প্রদায়ের ওপর নির্মিত একটি তথ্যচিত্র



ইরান ও ইরাকের ম্যানডিয়ান সম্প্রদায়ের ওপর সমস্ত রকম নির্যাতন বন্ধ হোক!

তথ্যসূত্র:

কুরআন শারীফ। অনুবাদ: মাওলানা মোবারক করীম জওহর। (হরফ প্রকাশনী। কলকাতা।)
http://www.farvardyn.com/mandaean.php
http://looklex.com/e.o/mandaeism.htm
http://www.gfbv.de/inhaltsDok.php?id=694
http://news.bbc.co.uk/2/hi/6412453.stm
Click This Link
Click This Link
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29518571 http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29518571 2012-01-08 14:00:15
কামরান গুহার সাধুগণ
মৃত সাগরের পাড়ে কামরান গুহা। The Essenes are known to be among the first groups to condemn slavery, and they are supposed to have bought slaves with the aim of freeing them. Tore Kjeilen
আজ থেকে দু-হাজার বছর আগে কামরান গুহায় এসসেনএস নামে একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রধান আস্তানা ছিল । এসসেনএস সম্প্রদায়ের উদ্ভব এবং বিকাশকাল ছিল খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকে দ্বিতীয় খ্রিস্টাব্দ অবধি। নিভৃতচারী এই তরিকার সদস্যগণ কঠোর সংযম ব্রত পালন করতেন এবং মূলধারার ইহুদিসমাজ এড়িয়ে চলতেন।Pristine Christianity বা আদিখ্রিস্টান ধর্মের শিকড়টিও ওই কামরান গুহার সাধুগণের ভাবাদর্শের মধ্যেই নিহিত ছিল। কেননা, স্বয়ং যিশু ছিলেন কামরান গুহার একজন সাধু।



পরবর্তীতে সাধু পলের ব্যাখ্যায় যিশুর মূল স্বরূপটি অনেকটাই পালটে গিয়েছিল এবং মধ্যযুগে স্বয়ং যিশুর সত্তায় ট্রিনিটি তত্ত্ব আরোপ করা হয়েছিল। এমন কী এসসেনএস সম্প্রদায় মৃতের পনুরুত্থানে বিশ্বাস না করলেও মৃতের পুনুরুত্থানের বিষয়টি খ্রিস্টধর্মের বিশ্বাসের পর্যায়ভুক্ত হয়ে পড়ে।

উপরোক্ত কারণে আদি খৃস্টধর্মের স্বরূপ উপলব্দি করতে হলে আমাদের কামরান গুহার সাধুগণের তত্ত্বদর্শনটি উপলব্দি করা জরুরি। ফিলিস্তিন এবং সিরিয়ায় মোট চার হাজার এসসেনএস সাধু ছিলেন। সাধুদের মূল আস্তানা ছিল মৃত সাগর বা ডেড সি-র পাড়ে ওই কামরান গুহায়।



প্রাচীন ফিলিস্তিনের মানচিত্রে কামরান- এর অবস্থান। এখানেই ছিল এসসেনএস সম্প্রদায়ের প্রধান আস্তানা।

কিছু সংখ্যক ঐতিহাসিকের মতে কামরান গুহার এসসেনএস সাধুদের উদ্ভব হয়েছিল ইহুদি হাসিদিয় সম্প্রদায় থেকে। ঐশী বিধানের প্রতি প্রাচীন ফিলিস্তিনের হাসিদিয়রা প্রবল অনুরক্ত ছিল। এ কারণে তাদের মতাদর্শ ঠিক রাজনৈতিক ছিল না। Sabbath উদযাপনের খুঁটিনাটি নিয়ে তৎকালীন যুগে যে তীব্র বিরোধের সৃষ্টি হত-তাতে হাসিদিয়দের মৃত্যু অবধি ঘটত।



প্রাচীন ফিলিস্তিন

পরবর্তীকালে হাসিদিয়রা এসসেনএস তরিকায় বিলীন হয়ে যায়, যে এসসেনএসরা নিজেদের ‘মানবজাতির শেষ দিবসের অল্পসংখ্যক নির্বাচিত সদস্য’ বলে মনে করতেন । কেননা, তাদের মতবাদে পৃথিবী ধ্বংসের পূর্বাভাসমূলক বা apocalyptic ধারণাটি ছিল প্রবল। অর্থাৎ তাঁরা কেয়ামতে বিশ্বাস করতেন। তাঁরা আরও বিশ্বাস করতেন যে, ইয়াওয়ে ( হিব্রু ঈশ্বর) এবং বেলিয়াল (পৃথিবী ও অন্ধকারের শক্তি=শয়তান?) -এর মধ্যে প্রচন্ড যুদ্ধ আসন্ন। ওই যুদ্ধে এসসেনএস রা ঈশ্বরের পক্ষের সৈন্য। (এসব ধর্মীয় কল্পকাহিনীর কারণে J. R. R. Tolkien (লর্ড অভ দি রিংয়ের লেখক)- এর জন্য প্লটের অভাব হয়নি এবং হলিউডেও মুভি নির্মাণের জন্য থিমের অভাব হয় না) যাই হোক। ঈশ্বরের সৈন্য কামরান গুহার সাধুগণ সেই অত্যাসন্ন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত!



লর্ড অভ দি রিংয়ের একটি দৃশ্য।

কামরান গুহার সাধুগণ মূলত ছিলেন প্রেমবাদী। তারা ঈশ্বর, পুণ্য এবং মানুষের প্রতি তীব্র প্রেম অনুভব করতেন। তারা ধর্মীয় কারণে পশু কুরবানীর ঘোর বিরোধী ছিলেন। এ ছাড়া তাঁরা সাধু বলেই হয়তো অস্ত্র নির্মাণ করা কিংবা ব্যবসাবানিজ্যও এড়িয়ে চলতেন। ফিলিস্তিনের জনজীবনেও তাঁরা অংশ নিতেন না। অবশ্য তারা কঠোরভাবে শনিবারের কর্মবিরতি দিবস অর্থাৎ Sabbath পালন করতেন । (সপ্তাহের এই বিশেষ দিনটিতে ইহুদিগণ প্রার্থনা করে কাটান) ওই দিনটিতে কামরান গুহার সাধুগণ জেরুজালেমের প্রধান উপাসনালয় ( টেম্পল অভ জেরুজালেম) থেকে দূরে থাকতেন। কেন? নির্বোধ পুরোহিতের অধীনে ওই প্রার্থনাগৃহে প্রকৃত প্রার্থনার চেয়ে অসার ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা বেশি হত বলে? যাই হোক। এসসেনএস সাধুগণ শনিবারের দিনটিতে তোরা (ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রথম পাঁচটি অধ্যায়) পাঠ করে কাটাতেন । এ ছাড়া তারা পরিস্কার-পরিচ্ছতার ওপর জোর দিতেন; শপথ করা বা কসম কাটারও বিরোধী ছিলেন।(কারণটি অনুমান করা যায়) ... এছাড়া কামরান গুহার সম্পদের ওপর সম্প্রদায়ের সকলের সমান অধিকার ছিল। প্রত্যেক সদস্য চাহিদা অনুযায়ী যা দরকার, তা পেতেন।



এই দৃশ্যমান কঠোরতা সত্ত্বেও প্রাচীন ফিলিস্তিনের সাধুদের মন কঠোর হয়নি

কামরান গুহার এসসেনএস সাধুরা ছিলেন আত্মনির্ভরশীল। কামরান গুহায় বিশাল আকারের মনস্টারি বা মঠ ছিল না। আয়ের প্রধান উৎস ছিল চাষাবাদ এবং কুঠির শিল্প। অর্থাৎ এসসেনএস সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক কার্যক্রম ছিল তৎকালীন ফিলিস্তিনের অন্যান্য গ্রামের মতোই। কৃষিকাজ এবং কুঠির শিল্প থেকে সামান্য যা আয় হত, তারই একটি অংশ বাঁচিয়ে তাঁরা দাস কিনে তাদের মুক্ত করে দিতেন। এ প্রসঙ্গে নরওজিয় ঐতিহাসিক Tore Kjeilen লিখেছেন The Essenes are known to be among the first groups to condemn slavery, and they are supposed to have bought slaves with the aim of freeing them. ( এবং এই পোস্টটি লিখবার মূল কারণ এটি ...কল্পনা করি একজন এসসেনএস সাধু তীব্র তাপদাহের মধ্যে জমি চষছেন। একদিন রুখু মাটিতে ফসল ফলবে। তারই বিনিময়ে যে অর্থ জুটবে তার একাংশ দিয়ে মুক্ত হবে এক দাস! আমাদের মনে রাখা দরকার সময়টা রোমান শাসন। তাহলে কে শ্রেষ্ঠ? একজন এসসেনএস সাধু না রোমান শাসক? যে রোমান শাসকদের কথাই আমরা বেশি করে বলি ... আসলে মানবতাবাদের চর্চা কোনও গোষ্ঠী কিংবা জাতির একার বিষয় নয়, যুগে যুগেই মানবতাবাদের চর্চা হয়েছে। আমাদের কর্তব্য ইতিহাসের পৃষ্ঠার সে সব মানবিক অধ্যায়গুলিকে হলুদ দাগে চিহ্নিত করা, যা অত্যন্ত জরুরি। কেননা মানবতাবাদের চর্চা আজও অব্যাহত রয়েছে .. যে মুহূর্তে আমি এই পোস্টটি লিখছি, ঠিক সেই মুহূর্তেই মানবতাবাদীগণ নিরাপত্তা কর্মী এবং সরকারের পেটোয়া বাহিনীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ঢাকার শাহবাগে জড়ো হয়েছেন শিক্ষাকে সম্পূর্ণরূপে অবৈতনিক করার আন্দোলনে ...এবং এই অনিবার্য কার্যক্রমটি যে বাংলাদেশের অন্যান্য অনেক ঘটনাবলী থেকে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ... এটি সঠিকভাবে উপলব্দি করাই ইতিহাসের অন্যতম এক শিক্ষা ... )



কামরান- এ নিভৃতচারী মানবতাবাদী সাধুদের হেঁটে যাওয়ার পথ।

ক্ষুদ্র হলেও কামরান গুহায় এসসেনএস সম্প্রদায়টি ছিল সুসংগঠিত । গুহার আশেপাশে সেচ ও পানির সরবরাহ ছিল। অধিকাংশ সাধুগণ ছিলেন অবিবাহিত পুরুষ। যেহেতু কামরান-তরিকায় কৌমার্যব্রত পালনের রীতি ছিল। তবে সাধুদের অনেকই বিবাহ করতেন; এবং তাঁদের পরিবারপরিজনও ছিল। তবে তাদের সবাই যে কামরান গুহায় বাস করতেন তাও নয়; অনেক এসসেনএস সাধু ফিলিস্তিনের বিভিন্ন নগরে বাস করতেন।



কামরান গুহার একটি বিশাল কক্ষের ধ্বংসাবশেষ।এই কক্ষে বসেই মানবতার চর্চা হত।

এসসেনএস সম্প্রদায়ের যে কোনও নতুন সদস্যকে তার সমস্ত সম্পদ সম্প্রদায়কে অর্পন করতে হত। এর পর এক বছর তাকে থাকতে হত পরীক্ষাধীন ( অর্থাৎ এ এক বছর হল প্রোবেশনাল পিরিয়ড)। এর পরের দু বছর ছিল শিক্ষানবিশি পর্ব। এই সময় নতুন সদস্যটি পূর্ণ সদস্যের সঙ্গে বসে আহার করতে পারত না। তবে তাকে প্রচুর পড়াশোনা করতে হত। সাধকরা সাধারণত কৌতূহলী স্বভাবের হয়ে থাকেন। বইপত্রের প্রতি তাঁদের আকর্ষণ থাকে । এসসেনএসগণ কামরান গুহায় বিস্তর বইপুস্তক সংগ্রহ করেছিলেন। ওল্ড টেস্টামেন্টের (অর্থাৎ পুরনো বাইবেলের) টীকাভাষ্য লিখেছিলেন।




কামরান গুহার অবস্থান ডেড সির পশ্চিম পাড়ে। বর্তমানে যায়গাটি ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক নামে পরিচিত।

খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে রোমান শাসনযন্ত্র ফিলিস্তিনে বসবাসরত ইহুদিদের ওপর নানাবিধ নির্যাতন চালাত। এর মধ্যে অন্যতম হল অত্যধিক করারোপ । সুতরাং খ্রিস্টীয় ৬৬ সালে রোমানদের অপশাসনের বিরুদ্ধে প্রথম ইহুদি বিদ্রোহটি সংগঠিত হয় -অর্থাৎ ঘটনাটি ঘটেছিল যিশুর ক্রশবিদ্ধ হওয়ারও প্রায় তিরিশ বছর পর। এরপর ৬৮ সালে রোমান সৈন্যরা কামরান গুহায় অনুপ্রবেশ করে ধ্বংস করে। এসসেনএস সাধুদের ওপর নির্মম হত্যালীলা চালায়। সাধুসন্ন্যাসীদের ওপর সম্রাটগণের নির্যাতন তো নতুন কিছু নয়। তারপরও গভীর আত্মিক শক্তি ছিল বলেই মধ্যপ্রাচ্যে এসসেনএস সম্প্রদায়টি টিকে ছিল। মানুষ যদিও কামরান গুহার কথা পুরোপুরি বিস্তৃত হয়েছিল। ১৯৪৭ সালের পর বিশ্ববাসী আবার কামরান গুহার কথা জানতে পারল।



ডেড সি ক্রল

১৯৪৭ সাল। মৃত সাগরের পাড়ে কামরন-এর ১১ টি গুহায় হিব্রু এবং আরামিয় ভাষায় লেখা কতগুলি প্রাচীন পান্ডুলিপি আবিস্কৃত হয়। পান্ডুলিপির বেশির ভাগই পার্চমেন্টে লেখা, কিছু আবার প্যাপিরাসে।পন্ডিতেরা এসব পান্ডুলিপির নাম দিয়েছেন ডেড সি ক্রল । পান্ডুলিপিগুলির মধ্যে হিব্রু বাইবেলের প্রাচীনতম সংস্করন পাওয়া যাওয়ায় ডেড সি ক্রল-এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। কেবল হিব্রু বাইবেলই নয় – তার বাইরেও সব মিলিয়ে ৯৭২টি পান্ডুলিপি আবিস্কৃত হয়েছে। যা কামরান গুহার সাধুদের সংগ্রহে ছিল। সে যাই হোক। পরিশেষে এটুকু কেবল বলা যায় যে কামরান গুহার সাধুদের ব্যাক্তিগত বিশ্বাস সম্বন্ধে আমরা দ্বিমত পোষন করতে পারি বটে তবে তাঁদের মানবতাবাদী হৃদয়টি কোনওক্রমেই উপেক্ষা করতে পারি না।



নির্জনে ধ্যানরত কামরান গুহার এক সাধু; হয়তো স্বয়ং যিশু ...


ছবি। ইন্টাররেট

তথ্যসূত্র:

Click This Link
http://www.newadvent.org/cathen/05546a.htm
http://www.essenespirit.com/
http://www.essenespirit.com/who.html
http://www.essene.com/
http://looklex.com/e.o/essenes.htm]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29517444 http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/29517444 2012-01-06 17:23:27