somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আপনার সংসার

১৯ শে এপ্রিল, ২০০৯ রাত ৯:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বিয়ের আগে নিমণ্ত্রণের চিঠি দেখে বলেছিলেন আসবেন, আপনার বহুকালের পরিচিত নগরী, আপনার দীর্ঘদিনের সংসার আর কর্মস্থল আপনাদের ফেলে আসা সময়ের শহর--খুলনা । একটা অনুষ্ঠানের সূত্র ধরে ঘুরে যাবেন আবার। ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসছে, একটা তৃপ্তি মেশানো আবেগে বলেছিলেন কথাগুলো। আমরা আশা করে ছিলাম। আপনার চোখের দিকে তাকিয়ে আমার অনাগত ভবিষ্যতের প্রত্যয়ী আবেগে একপলক ডুবে ছিলাম -মনে মনে বলেছিলাম আমি আপনার মত হতে চাই ।


সেই অনুষ্ঠানের বোধহয় মাত্র দিন সাতেক আগে কোমার সাথে লড়ে গেলেন। এবং সেটাই শেষ। লড়াইটা দীর্ঘসময়ের নয়। একটা হেরে যাওয়া যুদ্ধ । আকৈশোর বন্ধু সুহদ আপনার প্রথম সন্তানের কাছে নিরুত্তর শুনে যাওয়া আর শিউরে ওঠা দুতিনটে দিন । তারপর সব শেষ ।

শেষ কি হয় জননী ! গভীর রাতে থেমে গেল সবকিছু । একটা কান্না জড়ানো কন্ঠে কি শুনলাম জানিনা। তারপর রিলে হয়ে আসল সেই ভোর, সেই সকাল, অগণিত বন্ধু স্বজনের উপস্থিতি আর দাফন শেষে আপনার সন্তানের কন্ঠে কিছু প্রশ্ন । 'মামণি আর একটু কেন সময় দিল না ?'

সেদিনের ভোরে আমরা নিজেদের দিকে তাকাইনি ভেঙ্গে পড়ার ভয়ে। সজল বিলাপে তোলা ছিল আসন্ন বিয়েবাড়ির সব কাজ। গোটা শহরের রাজপথে রাজধানী থেকে ভেসে আসা দুঃসংবাদ । আপনাকে মনে করে সেই শহর- যখন হেঁটে ফিরতেন কখনও কখনও জোড়াগেট পেরিয়ে পড়ন্ত বিকেলে। দীর্ঘদেহী এক সুঠাম মানুষের পাশে আপনার ছায়ার মত ললিত উপস্থিতি, অজস্র ঘটনায়-স্মৃতিতে-কতশত সম্পর্কের পরিচিত প্রিয়মুখের মানুষেরা ভেবেছে আপনাকে। খুলনা বেতারে কতদিন ভেসে ওঠেনি আপনার কন্ঠ। তবু স্মৃতিতে আপনি -আপনার সংগ্রাম, নম্র আনত পদক্ষেপ।

কোনদিন তেল নুন হলুদের জটিলতায় এতটুকু মলিন হয়নি -অকলুষ আপনার ব্যক্তিত্ব। এই সংসার তার শত অনিয়মে, অস্থিরতায়, রূঢ়তায় আপনাকে পরীক্ষা করেছে, উত্তরে দেখেছে আপনার অনিঃশেষ সংগ্রামের প্রত্যয়। একজন যোদ্ধা শুধু বর্ম পড়েই যুদ্ধক্ষেত্রে লড়েন না কখনও কখনও যুদ্ধটা হয় নিঃশব্দে। প্রিয়তম মানুষ- স্বামী আর সন্তানের মঙ্গলের মাঝেই আমাদের দেশের মেয়েদের সমস্ত চাওয়া পাওয়া। কিন্তু গত দশটি বছরের তীব্র লড়াইয়ের পরও যে অভিযোগহীন নম্রতা আপনার --রণাঙ্গনের যোদ্ধার অবয়বে তো তা দেখিনা। শুধু ভারবহনের সামর্থ্যেই যার এত গরিমা, কিছুই কি প্রত্যাশা ছিল না তার ? যে বেদনাশুভ্র সর্বংসহা সকল অনুগ্রহ-প্রতিদান- প্রশংসা-প্রাপ্তির উর্ধ্বে উঠে যান, কিংবা ইচ্ছে করেই হয়তো হারিয়ে দেন সমাজ সংসার স্বজনদের-- তার মত ঋজুতা আমি এতখানি আশা করিনা কোন সাহিত্যে বা চলচ্চিত্রেও ।



আপনাকে নিয়ে কি কিছু লেখা যায় - আপনার প্রাত্যহিক সংগ্রাম আপনার নিবেদিত জীবন। কোনটা বলি - সব বুঝি বলারও নয়। যেদিন অনেকদিনের প্রিয় নিজস্ব বাড়িটা ছেড়ে উঠে এলেন একটা ভাড়া ফ্ল্যাটে অনেক কেঁদেছিলেন। ওখানে অনেক স্মৃতি, তিন তিনটে সন্তানের জন্ম, কত বন্ধুদের আসা যাওয়া, নাটকের রিহার্সাল, পুরনো ঘর দরজা কড়ি বর্গা। সাবেকী মসলিনের স্মৃতিগন্ধা সেই নিজস্বতা হারিয়েও আপনি অবিকল একই রকম উপরে উপরে। টিপটপ ধূলো ছেড়ে গুছিয়েসেন বসার ঘর। মানুষ এলে সেই স্নিগ্ধ চিরচেনা ভঙ্গী।

কতদিনের প্রিয় শহরকে ছাড়তে হল। সঙ্গী ইন্দ্রপতনের গ্লানি আর আসন্ন ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা । বাড়ি বদলের সময় মেয়েদের খুব কান্না পায়, সংসারের ছোট খাট খুটিনাটি একরাশ জমানো জিনিস যখন ফেলতে হয়। কত তুচ্ছাতিছুচ্ছ বস্তু আর স্মৃতি থাকে একটা সময়ের সাথে --জানিনা আপনার কেমন লেগেছিল যখন গোটা একটা সংসার আর দেড় যুগের জীবনকে র‌্যাপিং পেপারে মুড়ে তুলে দিলেন রাজধানীর উদ্দেশ্যে। তারপর মীরপুর থেকে শাহবাগ-- প্রতিদিন পাবলিক বাসের সিরিয়ালে দাঁড়ানো শতশত অফিসযাত্রীর ভিড়ে আপনি একটা মুখ। সুগার আর প্রেশারের দাক্ষিণ্য আর বাজারের ক্রূরতার ব্যালান্স মিলিয়ে প্রিয়তম মুখগুলোকে আড়ালে আবডালে সকল আঘাতের তীর হতে সরিয়ে রাখার সেই অদম্য প্রচেষ্টা। তবু মুখ ফুটে বলতে কত দ্বিধা ছিল, কঠিনকে রূঢ় করে না প্রকাশের অক্ষমতা আপনার চিরদিনের।



দৈনন্দিনের ঘটনা-অঘটন-স্বাচ্ছন্দ্য-দায়িত্ব- সংসারের নিয়মে জল অনেকদূর গড়িয়েছে, আপনি অতিক্রম করেছেন এক একটা ধাপ। বড় হয়েছে পরিবারের কাঠামো, বদল হয়েছে ছোটখাট কতকিছু। সন্তানেরা একে একে উজ্জ্বলতর সময়ের পথে এগিয়েছে --আপনার কি থির হয়ে দুদন্ড বসার সময় হলনা?

ঋণগ্রহীতারা বিনাসুদে দায়মুক্তির পর হতবিহ্বল । কেন এই অকালযাত্রা! চলে যাওয়া কি এত সহজ -তিন দশকের সংসার আর স্মৃতি। আর যত একপেশে হিসাব নিকাশ। এত নিষ্কাম কেন জননী! অভিমান না অহমিকা শুধু শেষবেলায় এইটুকু প্রশ্নের উত্তর পেলাম না

আমরা মলিন হয়ে যাই তুচ্ছ রোজনামচায়, আপনি দহন দুঃখ বেদনার অগোচর এক শুচিশুভ্র স্মৃতি আজ -সকলের অনেক অনেক উপরে


[ প্রিয়বন্ধু আদিত্যর জন্য এই লেখাটা
উদ্দেশ্য তাঁকে যিনি আমাদের ছেড়ে গেছেন- শ্রদ্ধেয় লায়লা বিলকিস খান চৌধুরি ]
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে এপ্রিল, ২০০৯ রাত ১০:০৩
৭২টি মন্তব্য ৭২টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×