বিয়ের আগে নিমণ্ত্রণের চিঠি দেখে বলেছিলেন আসবেন, আপনার বহুকালের পরিচিত নগরী, আপনার দীর্ঘদিনের সংসার আর কর্মস্থল আপনাদের ফেলে আসা সময়ের শহর--খুলনা । একটা অনুষ্ঠানের সূত্র ধরে ঘুরে যাবেন আবার। ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসছে, একটা তৃপ্তি মেশানো আবেগে বলেছিলেন কথাগুলো। আমরা আশা করে ছিলাম। আপনার চোখের দিকে তাকিয়ে আমার অনাগত ভবিষ্যতের প্রত্যয়ী আবেগে একপলক ডুবে ছিলাম -মনে মনে বলেছিলাম আমি আপনার মত হতে চাই ।
সেই অনুষ্ঠানের বোধহয় মাত্র দিন সাতেক আগে কোমার সাথে লড়ে গেলেন। এবং সেটাই শেষ। লড়াইটা দীর্ঘসময়ের নয়। একটা হেরে যাওয়া যুদ্ধ । আকৈশোর বন্ধু সুহদ আপনার প্রথম সন্তানের কাছে নিরুত্তর শুনে যাওয়া আর শিউরে ওঠা দুতিনটে দিন । তারপর সব শেষ ।
শেষ কি হয় জননী ! গভীর রাতে থেমে গেল সবকিছু । একটা কান্না জড়ানো কন্ঠে কি শুনলাম জানিনা। তারপর রিলে হয়ে আসল সেই ভোর, সেই সকাল, অগণিত বন্ধু স্বজনের উপস্থিতি আর দাফন শেষে আপনার সন্তানের কন্ঠে কিছু প্রশ্ন । 'মামণি আর একটু কেন সময় দিল না ?'
সেদিনের ভোরে আমরা নিজেদের দিকে তাকাইনি ভেঙ্গে পড়ার ভয়ে। সজল বিলাপে তোলা ছিল আসন্ন বিয়েবাড়ির সব কাজ। গোটা শহরের রাজপথে রাজধানী থেকে ভেসে আসা দুঃসংবাদ । আপনাকে মনে করে সেই শহর- যখন হেঁটে ফিরতেন কখনও কখনও জোড়াগেট পেরিয়ে পড়ন্ত বিকেলে। দীর্ঘদেহী এক সুঠাম মানুষের পাশে আপনার ছায়ার মত ললিত উপস্থিতি, অজস্র ঘটনায়-স্মৃতিতে-কতশত সম্পর্কের পরিচিত প্রিয়মুখের মানুষেরা ভেবেছে আপনাকে। খুলনা বেতারে কতদিন ভেসে ওঠেনি আপনার কন্ঠ। তবু স্মৃতিতে আপনি -আপনার সংগ্রাম, নম্র আনত পদক্ষেপ।
কোনদিন তেল নুন হলুদের জটিলতায় এতটুকু মলিন হয়নি -অকলুষ আপনার ব্যক্তিত্ব। এই সংসার তার শত অনিয়মে, অস্থিরতায়, রূঢ়তায় আপনাকে পরীক্ষা করেছে, উত্তরে দেখেছে আপনার অনিঃশেষ সংগ্রামের প্রত্যয়। একজন যোদ্ধা শুধু বর্ম পড়েই যুদ্ধক্ষেত্রে লড়েন না কখনও কখনও যুদ্ধটা হয় নিঃশব্দে। প্রিয়তম মানুষ- স্বামী আর সন্তানের মঙ্গলের মাঝেই আমাদের দেশের মেয়েদের সমস্ত চাওয়া পাওয়া। কিন্তু গত দশটি বছরের তীব্র লড়াইয়ের পরও যে অভিযোগহীন নম্রতা আপনার --রণাঙ্গনের যোদ্ধার অবয়বে তো তা দেখিনা। শুধু ভারবহনের সামর্থ্যেই যার এত গরিমা, কিছুই কি প্রত্যাশা ছিল না তার ? যে বেদনাশুভ্র সর্বংসহা সকল অনুগ্রহ-প্রতিদান- প্রশংসা-প্রাপ্তির উর্ধ্বে উঠে যান, কিংবা ইচ্ছে করেই হয়তো হারিয়ে দেন সমাজ সংসার স্বজনদের-- তার মত ঋজুতা আমি এতখানি আশা করিনা কোন সাহিত্যে বা চলচ্চিত্রেও ।
আপনাকে নিয়ে কি কিছু লেখা যায় - আপনার প্রাত্যহিক সংগ্রাম আপনার নিবেদিত জীবন। কোনটা বলি - সব বুঝি বলারও নয়। যেদিন অনেকদিনের প্রিয় নিজস্ব বাড়িটা ছেড়ে উঠে এলেন একটা ভাড়া ফ্ল্যাটে অনেক কেঁদেছিলেন। ওখানে অনেক স্মৃতি, তিন তিনটে সন্তানের জন্ম, কত বন্ধুদের আসা যাওয়া, নাটকের রিহার্সাল, পুরনো ঘর দরজা কড়ি বর্গা। সাবেকী মসলিনের স্মৃতিগন্ধা সেই নিজস্বতা হারিয়েও আপনি অবিকল একই রকম উপরে উপরে। টিপটপ ধূলো ছেড়ে গুছিয়েসেন বসার ঘর। মানুষ এলে সেই স্নিগ্ধ চিরচেনা ভঙ্গী।
কতদিনের প্রিয় শহরকে ছাড়তে হল। সঙ্গী ইন্দ্রপতনের গ্লানি আর আসন্ন ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা । বাড়ি বদলের সময় মেয়েদের খুব কান্না পায়, সংসারের ছোট খাট খুটিনাটি একরাশ জমানো জিনিস যখন ফেলতে হয়। কত তুচ্ছাতিছুচ্ছ বস্তু আর স্মৃতি থাকে একটা সময়ের সাথে --জানিনা আপনার কেমন লেগেছিল যখন গোটা একটা সংসার আর দেড় যুগের জীবনকে র্যাপিং পেপারে মুড়ে তুলে দিলেন রাজধানীর উদ্দেশ্যে। তারপর মীরপুর থেকে শাহবাগ-- প্রতিদিন পাবলিক বাসের সিরিয়ালে দাঁড়ানো শতশত অফিসযাত্রীর ভিড়ে আপনি একটা মুখ। সুগার আর প্রেশারের দাক্ষিণ্য আর বাজারের ক্রূরতার ব্যালান্স মিলিয়ে প্রিয়তম মুখগুলোকে আড়ালে আবডালে সকল আঘাতের তীর হতে সরিয়ে রাখার সেই অদম্য প্রচেষ্টা। তবু মুখ ফুটে বলতে কত দ্বিধা ছিল, কঠিনকে রূঢ় করে না প্রকাশের অক্ষমতা আপনার চিরদিনের।
দৈনন্দিনের ঘটনা-অঘটন-স্বাচ্ছন্দ্য-দায়িত্ব- সংসারের নিয়মে জল অনেকদূর গড়িয়েছে, আপনি অতিক্রম করেছেন এক একটা ধাপ। বড় হয়েছে পরিবারের কাঠামো, বদল হয়েছে ছোটখাট কতকিছু। সন্তানেরা একে একে উজ্জ্বলতর সময়ের পথে এগিয়েছে --আপনার কি থির হয়ে দুদন্ড বসার সময় হলনা?
ঋণগ্রহীতারা বিনাসুদে দায়মুক্তির পর হতবিহ্বল । কেন এই অকালযাত্রা! চলে যাওয়া কি এত সহজ -তিন দশকের সংসার আর স্মৃতি। আর যত একপেশে হিসাব নিকাশ। এত নিষ্কাম কেন জননী! অভিমান না অহমিকা শুধু শেষবেলায় এইটুকু প্রশ্নের উত্তর পেলাম না
আমরা মলিন হয়ে যাই তুচ্ছ রোজনামচায়, আপনি দহন দুঃখ বেদনার অগোচর এক শুচিশুভ্র স্মৃতি আজ -সকলের অনেক অনেক উপরে
[ প্রিয়বন্ধু আদিত্যর জন্য এই লেখাটা
উদ্দেশ্য তাঁকে যিনি আমাদের ছেড়ে গেছেন- শ্রদ্ধেয় লায়লা বিলকিস খান চৌধুরি ]
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে এপ্রিল, ২০০৯ রাত ১০:০৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



