somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পুতুল (গল্প)

০৯ ই মার্চ, ২০০৮ সকাল ১১:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অফিসের কাজে রাতে ফ্লাইটে লন্ডন যেতে হচ্ছে। হঠাৎ করেই যাওয়া। সেখানে পুরোনো বন্ধু স্যামের জন্যএকটা কিছু নেওয়া একান্তই প্রয়োজন। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী বা এ দেশে সংস্কৃতি মিশে আছে এমন একটা স্যুভেনির। কী নেওয়া যায়? জিজ্ঞেস করি সহকর্মী শায়নীকে।

-আপনারতো হাতে সময় বেশি নাই, রাতেই ফ্লাইট। এক কাজ করেন বাড়ি ফেরার পথে শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেটে একটা ঢু মেরে যান। সেখানে নানা ধরণের পন্য পাবেন। গ্রাম-বাংলার ছবিসহ টি সার্টি বা ফতুয়াও নিতে পারেন, আজিজ মার্কেটেই এসব পাবেন।

শায়নীর পরামর্শটা মনে ধরে। ধন্যবাদ জানিয়ে দ্রুত বেড়িয়ে পড়ি। গাড়িতে বসেই সেল ফোনে বউকে অনুরোধ করি হ্যান্ড লাগেজটা গুছিয়ে রাখতে। কাল রাতেই অবশ্য বড় ব্যাগটা গুছিয়ে রেখেছি।

আজিজ সুপার মার্কেটে এ দোকান, সে দোকান ঘুরে বেশি কিছু জিনিস কিনে নিলাম। এমনকী লম্বা ফ্লাইটে পড়ার জন্য কয়েকটি বই আর কিছু বাংলা গানের সিডি। মার্কেট থেকে বেড়িয়ে আসার সময় নীচ তলায় কোনার দিকে একটি দোকানে দৃষ্টি আটকে যায়। তেমন আহামরি কোনো আকর্ষণ নেই দোকানটায়। অন্য দোকানগুলোতে যেখানে ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ঝা-চকচকে লাইট আর পণ্যের পশরা, এ দোকানটিতে মৃদু আলোতে সব কিছুই কেমন যেন অগোছালো। বেচা বিক্রিতে যেন খুব একটা গা নেই দোকানীর। দোকানটিতে রাখা কিছু পুতুল আমার দৃষ্টি কাড়ে।

থমকে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষুণ নজর করেই বুঝতে পারি, এমন জীবন্ত আর নিখুঁত পুতুল আমার জীবনে খুব একটা চোখে পড়েনি। এগিয়ে যাই দোকানটির দিকে। জ্বলজ্বলে চোখে বৃদ্ধ দোকানী আমাকেই দেখছিল। চোখে আগ্রহ ফুটে উঠলেও তার বসে থাকার ভঙ্গিটি একেবারেই নিরাষক্ত। যেন পণ্য বিক্রি হওয়া না হওয়ায় তার কিছুই যায় আসে না।

তাকে উপেক্ষা করেই দোকানের তাকে সাজানো দু-আড়াই ফুট উচ্চতার পুতুলগুলো কাছ থেকে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে থাকি। কয়েকটি মুর্তিকে চিনতে পারি। এর মধ্যে অকাল প্রয়াত সঙ্গীত শিল্পী সারোয়ার জাহান, আবৃত্তিকার শাহরিয়ার শাহদাত এবং কথাশিল্পী নিলুফার চৌধুরীকে কে না চেনে! অন্য মুর্তিগুলোর মধ্যে দু-একটিকে চেনা চেনা লাগে, তবে বাকীগুলো অচেনা।

-পুতুলগুলোর দাম কতো করে?
প্রশ্ন করি।
-এগুলো বিক্রির জন্য নয়।
দোকানী জানায়
-কেন?
অবাক হয়ে জানতে চাই।
-এগুলো সবই অর্ডারের মাল। এখানে পুতুল বিক্রি হয় না, কেউ অর্ডার দিলে সে অনুযায়ী পুতুল তৈরি করে দেওয়া হয়।

এবার আমার মাথায় অদ্ভুত এক খেয়াল চাপে। নিজের একটি প্রতিকৃতি তৈরি করালে কেমন হয়! অফিসের ডেস্কে সেটি সাজিয়ে রাখলে কেমন দেখাবে ভেবেই মনে মনে পুলক অনুভব করি। অফিসে সবার জন্য একটা বড় সারপ্রাইজ হবে।

যেই ভাবা সেই কাজ। নিজের একটি মুর্তি গড়ার ফরমায়েশ দিয়ে বসি। কী করতে হবে, জানতে চাই। দোকানী নিজেই পুতুল শিল্পী বা কারিগর, এবার সেটা বুঝতে পারি। তিনি বলেন,
-আপনার এক কপি ছবি লাগবে। আর ডেলিভারি হবে এক সপ্তাহ পর। পুতুলের দামের পুরোটাই কিন্তু আগাম দিতে হবে।

তার শর্তে রাজি হয়ে যাই। ভাগ্যিস ওয়ালেটে একটা পাসপোর্ট সাইজের ছবি ছিল!

এবার তিনি একটা অদ্ভুত কাজ করেন। আমার সামনে দাঁড়িয়ে দু চোখ বন্ধ করে আমার মাথা থেকে পা পর্যন্ত সারা শরীরে হাত বুলাতে থাকেন।আমার সারা শরীরে কেমন যেন একটা শিরশিরে অনুভুতি ছড়িয়ে পড়ে। একটা অদ্ভুত শীতল অনুভুতিতে কেমন যেন কুকড়ে যাই আমি। মনে হয় তার হাড্ডিসার লম্বা আঙ্গুলগুলো আমার শরীরের চামড়া ভেদ করে ধ্বমনীকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। বুঝতে পারি একজন শিল্পী তার সকল অনুভুতি দিয়ে আমাকে পরখ করে নিচ্ছেন। অস্বস্তিকর অনুভুতিটা ঝেড়ে ফেলে দেই।

আগাম টাকা দিয়ে রশিদটা নিয়ে গাড়িতে উঠি। রশিদে লেখা ডেলিভারি তারিখটার দিকে তাকিয়ে দেখি সে সময় আমি লন্ডনে থাকবো। ড্রাইভারের হাতে রশিদটা দেই। নির্ধারিত তারিখে এই দোকান থেকে পুতুলটি সংগ্রহ করতে বলে দেই তাকে।

লন্ডনে প্রথম দুটি দিন বেশ ব্যস্ততায় কাটে। আজ শনিবার, উইকএন্ড। হাতে কোনো কাজ নেই, তাই প্রায় সারাটা দিনই হোটেল রুমে আলস্য করে কাটানোর পরিকল্পনা। লন্ডন শহরে নতুন করে দেখার কিছুই নেই। তাই দুপুরে খাবার পর অনেকদিন পর একটা ছোট্ট ভাতঘুম দেই।

প্রচন্ড অস্থিরতা নিয়ে ঘুম ভাঙ্গে। কোথায় যেন একটা বিরাট উলট-পালট হয়ে গেছে। কিন্তু অসঙ্গতিটা কোথায় ঠিক বুঝতে পারছিনা। একটা অশুভ আতঙ্কে বুকটা ধ্বক ধ্বক করতে থাকে। হোটেল রুমের ভারি পর্দা পুরো কামড়াটিকে আবছা অন্ধকারে মুড়ে রেখেছে। হঠাৎ করেই আমার স্ত্রী রেশমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে হয়। বেডসাইড টেবিল থেকে সেল ফোনটা নেওয়ার জন্য শরীরটা গড়িয়ে বিছানার এক প্রান্তে যাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু কোমড়ের নীচের অংশটুকুর কোনো সাড়া পাচ্ছি না। দ্রুত এক টানে হালকা কম্বলটা শরীরের উপর থেকে সরিয়ে ফেলি। অদ্ভুত এক বোবা আতঙ্কে আমি পাথর হয়ে যাই। কোথায় আমার পা? কোমড়ের নীচে কাঠের তৈরি এক ফুট দৈর্ঘের ছোট দুটি অসার বস্তুর অস্তিত্ব অনুবভ করি।

লন্ডনে যখন বিকেল, গোলকের অন্য প্রান্তে বাংলাদেশে তখন গভীর রাত। এই রাতেও একাগ্রতায় নিমগ্ন পুতুলের কারিগর কাজ করে যাচ্ছেন। ভারি কাঁচের চশমার আড়ালে তার চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে। সকাল নাগাদ এই পুতুলটি তৈরির কাজ শেষ হয়ে যাবে। কোনো সন্দেহ নেই। পুতুলের পা দুটি ইতিমধ্যেই বানানো হয়ে গেছে। এখন বাকি কোমড়, বুক আর মাথা, আর মাত্র কয়েক ঘন্টার মামলা।
৩৫টি মন্তব্য ২৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×