স্ট্যাচু অফ লিবার্টির সামনে দাঁড়িয়ে ডান হাতটা আকাশে তুলে দিলো আমার মেয়ে। এর পর আমার দিকে মাথা ঘুরিয়ে প্রশ্ন করলো, "পাপা এই মুর্তিটার হাতটা এমন নিচু কেনো?” বলার অবকাশ রাখে না, নিচু বলতে সে মুর্তির উঁচু হাতটাকে বোঝাচ্ছে।
আমার আড়াই বছরের আদৃতার এ ধরণের ছোটখাট ভুল কথাগুলো আমার জন্য এক একটা আনন্দের খনি। পিচ্চিটার বয়স এখন সাড়ে তিন। তার মায়ের অফিস শনিবার খোলা, আর আমার বন্ধ। তাই প্রতি শনিবার আমাকে বেবিসিট করতে হয়, শনিবার আমাদের বাপ-বেটির ঈদের দিন। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চলে ননস্টপ হাড়ি-পাতিল খেলা আর ফাঁকে ফাঁকে কার্টুন দেখা।
চোখের সামনে একটু একটু করে আমার মেয়েটাকে বড় হয়ে উঠতে দেখছি, আর প্রতিদিনই বাবা হিসেবে আমি একটু একটু করে পরিণত হচ্ছি। আমার বাবার মতো একজন বাবা হতে পারবো আমি, এতোটা সৌভাগ্য নিয়ে আমার মেয়ে জন্মায়নি।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের বড় পদে থাকা স্বত্ত্বেও আমার আব্বার সম্পত্তি বলতে ১৯৬৯ সালে বাসাবোতে কেনা একটুকরো জমির উপর একটা টিনের ঘর। আব্বা-আম্মার কাছে শুনেছি, তখন এই এলাকার পুরোটাই ছিলো বিল। এর মধ্যেই মাটি ভরাট করে দ্বীপের মতো এক একটা বাড়ি পানির উপর জেগে থাকতো। এরকম একটা ঘরেই আমার জন্ম। পরে ১৯৮০ সালে হাউজ বিল্ডিং লোন নিয়ে একটা চারতলা বাড়ি করেন আমার আব্বা। আব্বার মৃত্যুর পর সমপ্রতি সেই লোন পরিশোধ হয়েছে। অথচ, বিভিন্ন সময় নানা উপলক্ষ্যে আব্বার অফিস কলিগদের বাড়িতে গিয়ে তাদের শান-শওকত দেখে চোখ ধাঁধিয়ে গেছে। গুলশান-ধানমন্ডিতে বাড়ি, দামি গাড়ি, ইউরোপ-আমেরিকায় ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, এসব দেখে মনেই হয়না এদের অধিকাংশের বেতনই আমার আব্বার চেয়ে কম।
কৈশরে যখন আমার অন্য বন্ধুদের দেখতাম বাবার ভয়ে কাঁপাকাঁপি, বেশ অবাক হতাম। কারণ আমার বাবা ছিলেন আমাদের বন্ধুর মতো। আড্ডা-গল্প সবই চলতো বাবার সঙ্গে। আরো ছোটো বেলায়, স্কুল ফাঁকি দিতে ইচ্ছে হলে মায়ের কাছে সেই অন্যায় অব্দার পেশ করার সাহস হতো না। টেলিফোনটা তুলো ডায়াল করতাম আব্বার অফিসের নম্বরে। আর একবার আব্বাকে ফোনে পেয়ে গেলেই ব্যাস, কেল্লা ফতে। জানি, যে কোনোভাবেই আম্মাকে ম্যানেজ করবেন তিনি। সে সময় এক চরম আফসোসের ব্যপার ছিলো, কেন আব্বাকেই প্রতিদিন অফিসে যেতে হয় আর আম্মা বাসায় থাকেন। যদি উল্টোটা হতো তাহলে কী ভালোই না হতো!
শনিবার-শনিবার আমার মেয়ে সারাটা দিন আমার সঙ্গে কাটানোর পর বিকেলে তার মা এলে মুখের উপরই বলে দেয়, “তুমি বাসায় না থেকে যদি পাপা থাকে তাহলে অনেক মজা হয়।”
মেয়ের কথা শুনে মনে মনে ভাবি, এভাবেই ইতিহাস ফিরে ফিরে আসে।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে জুন, ২০০৯ দুপুর ১২:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


