আগামী ৫ মাসে প্রায় ৩০টি ইস্যু পুঁজিবাজারে প্রবেশ করছে বলে আশা প্রকাশ করেন এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে পুঁজিবাজারে প্রবেশের প্রক্রিয়ায় ২১টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ছাড়াও রয়েছে বেসরকারি আরো তিন কোম্পানি। এছাড়া ৪টি মিউচ্যুয়াল ফান্ডও পুঁজিবাজারে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে। এ ইসুগুলো পুঁজিবাজারে প্রবেশ করলে বর্তমানের শেয়ারের চাহিদা পূরণ হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
গত কয়েক মাসে বিপুল সংখ্যক বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজারে প্রবেশ করেছে। কিন্তু একই হারে নতুন ইস্যু আসেনি। এরফলে পুঁজিবাজারে বিদ্যমান কোম্পানির শেয়ারের দর বাড়ছে। আর শেয়ারের এ অব্যহত এর দর বৃদ্ধিতে অনেক কোম্পানির শেয়ারের অতিমূল্যায়িত হয়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) উদ্বিগ্ন। কমিশন লেনদেনের লাগাম টেনে ধরতে একের পর এক সংকোচনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে কার্যত এর কোন ফল আসেনি। বরং লেনদেনের সঙ্গে সঙ্গি হয়েছে রেকর্ড উভয় স্টক এক্সচেঞ্জে।
কমিশন লেনদেনের লাগাম টেনে ধরার চেষ্টার ধারাবাহিকতায় গত ৩ ফেব্র“য়ারি মার্চেন্ট ব্যাংকের মার্জিন ঋণ দেয়ার ক্ষমতা ১:১.৫ থেকে কমিয়ে ১:১ করা নির্দেশ দিয়েছে। আজ রোববার থেকে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো কমিশনের এ নির্দেশনা মেনে চলবে। এর দুই দিন আগে ১ ফেব্রুয়ারি ব্রোকারেজ হাউজের মাজির্ন ঋণ দেয়ার ক্ষমতা ১:২ থেকে কমিয়ে ১:১.৫ করা হয়েছিল। একই দিন শেয়ারের বাজার ম-ল্য ও আয়ের (পিই) অনুপাত ৫০-এর ওপরে থাকা কোনো কোম্পানির শেয়ারের বিপরীতে ঋণ দিতে পারবে না এমন নিদের্শনা দেয় কমিশন। এছাড়া কোনো গ্রাহককে তার মোট পুঁজির ২৫ শতাংশের বেশি ঋণ দেয়া যাবে না। এবং আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি মধ্যে মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজগুলোকে তাদের মার্জিন ঋণ সংক্রান্ত তথ্য জানাতে বলা হয়েছে এসইসির নিদের্শনায়।
অথচ চলতি সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস বাদে প্রতিটি কার্যদিবসে ১৬ কোটি টাকার ওপর লেনদেন হয়। আর ৩১ ডিসেম্বর প্রথম বারে মতো ডিএসইতে ১৬ কোটি টাকার মাইল ফলক অতিক্রম করে। এর পরে দিন ১ ফেব্রুয়ারি এসইসি পিই ৭৫ থেকে ৫০ নামিয়ে ও ব্রোকারেজ হাউজের মাজিন ঋণ দেয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দিলেও লেনদেন ধারা থেকে ছিটকে পড়েনি। ২ ফেব্রুয়ারি ডিএসইতে ১৬৯০ কোটি ৯৯ লাখ টাকার রেকর্ড লেনদেনের হয়।
এর আগে গত ৯ ডিসেম্বর পিই অনুপাত ৭৫-এর ওপরে থাকা শেয়ারের বিপরীতে ঋণ সুবিধা বাতিল করে এসইসি। তবে ওই নির্দেশনা কার্যকর হওয়ার পরও বাজারের ঊর্ধ্বমুখী ধারায় তেমন প্রভাব পড়েনি। কারণ ৯ ডিসেম্বর ডিএসইতে ৯১৮ কোটি ৮০ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়। আর এই পরের দিন ১০ ডিসেম্বর ডিএসইতে লেনদেন বৃদ্ধি পেয়ে হয় ১১৪৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সিদ্ধান্ত কোন কার্যকর সমাধান নয়। এতে লেনদেনের লাগাম ধরে রাখা সম্ভব নয়। কারণ বাজারে চাহিদা তুলনায় শেয়ারের সরবরাহ নেই। এ কারণে অনেক কোম্পানির শেয়ার অতিমূল্যায়িতও হয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে এবি ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল রহমান বলেন, এসইসির সকল নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। সব কিছুর সমাধানে- এ মুহূর্তে বাজারে শেয়ারের প্রবাহ বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই। এ জন্য এসইসিতে যে সব কোম্পানির আবেদন জমা রয়েছে তা দ্রুত সময়ে ছেড়ে দেয়া উচিত। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত যে প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার পুঁজিবাজারে ছাড়ার কথা বলা হয়ে তা যে দ্রুত সময়ে আনা সম্ভব হয় তার জন্য সংশ্লিষ্টদের কাজ করা উচিত। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের মনে রাখতে হবে তাদের লোকসানে দায় কেউই নিবে না। তাই বিনিয়োগের আগে অবশ্যই ভাবতে তারা কোন শেয়ারে বিনিয়োগ করছেন। আর বাজারে এখন ভালো কোম্পানির শেয়ার রয়েছে। সে সব শেয়ারে বিনিয়োগ করলে তাদের বিনিয়োগ ঝুঁকি মুক্ত থাকবে।
এ বিষয়ে এসইসি’র নির্বাহি পরিচালক আনোয়ারুল কবির ভুঁইয়া বলেন, শেয়ারবাজারে অনেক কোম্পানির দর মূল্যায়িত হয়ে গেছে। এ অবস্থায় পুঁজিবাজারের স্বার্থেই মার্জিন ঋণ সংকোচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। এছাড়া বর্তমানে লেনদেন যেভাবে বাড়ছে তা স্বাভাবিক বলে মনে করে এসইসি। আর লেনদেনের এ দ্রুত বৃদ্ধি বাজারে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে এমন আশঙ্কায় কমিশন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে তিনি জানান।
আগামী জুনের মধ্যে পুঁজিবাজারে ২১টি সরকারী প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ছাড়ার প্রক্রিয়া শেষ করতে কাজ শুরু করেছে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)। এরই অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদের মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরির জন্য আজ থেকে মাঠে নামছে রাষ্ট্রায়ত্ত এ সংস্থাটি। চলতি মাসের মধ্যেই সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার ছাড়ার জন্য প্রাথমিক কাজ শেষ করা হবে আইসিবি'র মহাব্যবস্থাপক ইফতেখার-উজ-জামান জানান। একই সঙ্গে আগামী জুনের মধ্যেই সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে বলে তিনি আশা করেন।
শেয়ার ছাড়ায় প্রক্রিয়াকৃত রাষ্টায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- বাংলাদেশ সার্ভিসেস (শেরাটন হোটেল), বাখরাবাদ গ্যাস সিস্টেমস, লিকুইপাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) লিমিটেড, চট্টগ্রাম ড্রাইডক, প্রগতি ইন্ডাস্ট্রি, জালালাবাদ গ্যাস, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাসকোম্পানি, সিলেট গ্যাস ফিল্ডসকোম্পানি, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডসকোম্পানি, রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি, রুরাল পাওয়ার কোম্পানি, হোটেল ইন্টারন্যাশনাল (হোটেল সোনারগাঁও), বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস লিমিটেড (বিটিসিএল), হোয়েকস্ট কোম্পানি লিমিটেড, ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রমোশন ডেভেলপমেন্ট, মিরপুর সিরামিকস এবং এসেনশিয়াল ড্রাগস লিমিটেডের শেয়ার ছাড়ার প্রাথমিক কাজ শুরু হবে। এছাড়া বর্তমানে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন, রেকিট বেনকিজার, পদ্মা অয়েল, ডেসকো এবং পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের শেয়ার সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষে কাজ শুরু করবে আইসিবি।
পুঁজিবাজারে শেয়ার ছাড়ার পূর্বশর্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তর হচ্ছে। ইতোমধ্যে যে সব প্রতিষ্ঠান লিমিটেড কোম্পানিতে রূপানত্মরিত হয়েছে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শেয়ারবাজারে আনা হবে। বাকিগুলো আগামী ৪ থেকে ৬ মাসের মধ্যেই কোম্পানিতে রূপানত্মরের পর শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করা হবে।
জানা গেছে, সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসার লক্ষ্যে করণীয় নির্ধারণে বুধবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) উর্ধতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেন আইসিবি'র শীর্ষ কর্মকর্তারা। ওই বৈঠকে অর্থমন্ত্রীর বেঁধে দেয়া সময়সীমা অনুযায়ী জুনের মধ্যে ২৬টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ছাড়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। তবে সামগ্রিক পর্যালোচনার পর ২১টি প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত তালিকাভুক্ত করতে কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত হয়।
বাজারে ভাল কোম্পানির শেয়ারের সঙ্কট কাটাতে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সম্প্রতি ২৬টি সরকারী প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ছাড়ার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি বর্তমানে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারসংখ্যা বৃদ্ধিরও উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
বর্তমানে এসইসিতে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার পরিমাণে ৫১টি মিউচূয়াল ফান্ডের অনুমতির জন্য আবেদন জমা রযেছে। ৪৬০ কোটি টাকার আকারে চারটি মিউচ্যুয়াল ফান্ড পুঁজিবাজারে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে। কারণ ইতোমধ্যে ওইগুলোর ট্রাস্ট ডিড সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জে কমিশনে (এসইসি) অনুমোদন পেয়েছে। অনুমোদন প্রাপ্তগুলো হলো- জনতা ব্যাংক ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড, আইসিবি এএমসিএল তয় এনআরবি ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড, ফিনিক্স ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড ও ইসলামিক ফাইন্যান্স ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড (আইএফআইএল)। এছাড়া আরো বেশ কয়েকটির ট্রাস্ট ডিড অনুমোদনে অপেক্ষা রয়েছে বলে এসইসি সূত্রে জানা গেছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে আইডিএলসি, যমুনা ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, এবি ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, পুপলার লাইফ ইত্যাদি।
এসইসির সদস্য মনসুর আলম বলেন, কমিশন কোন মিউচ্যুয়াল ফান্ডের অনুমতি আটকে রাখবে না। কারণ কমিশন চায় বাজারে সঙ্গে সংগতি রেখে আরো মিউচ্যুয়াল ফান্ড পুঁজিবাজারে প্রবেশ করুক। তাই যত দ্রুত মিউচ্যুয়াল ফান্ড গঠনের প্রক্রিয়ায় আসবে তত তাড়াতাড়িই সেগুলোর অনুমতি মিলবে। জানা গেছে, জনতা ব্যাংক ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ডের আকার ২০০ কোটি টাকা। এর ব্যাংক স্পন্সর করছে ৫০ কোটি টাকা, ৫০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে প্লেসমেন্টে ও বাকি ১০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে আইপিওতে।
আইসিবি এএমসিএল ৩য় এনআরবি ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড ফান্ডের আকার ১০০ কোটি টাকা। এরমধ্যে আইসিবি স্পন্সর করবে ২০ কোটি টাকা ও বাকি ৮০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে আইপিওতে।
ফিনিক্স ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড ফান্ডের আকার ৬০ কোটি টাকা। এরমধ্যে ব্যাংক স্পন্সর করছে ৫০ কোটি টাকা স্পন্সর করছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ১০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে প্লেসমেন্টে ও বাকি ৩০ কোটি টাকা সংগৃহিত হতে আইপিওর মাধ্যমে। আইএফআইএল ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ডের আকার ১০০ কোটি টাকা। এর ২০ কোটি টাকা ব্যাংক স্পন্সর করছে এ আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি, ৩০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে প্লেসমেন্টে ও বাকি ৫০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে আইপিওতে।
আমাদের অর্থনীতি রিপোর্ট

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



