somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মেঘমালা-আমার তরে না....

০৬ ই অক্টোবর, ২০০৭ বিকাল ৩:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

"আমার ভাই, তোমার ভাই, ওমুক ভাই !! ওমুক ভাই!!!! ...."
দল মত নির্বিশেষে একত্রিত হইয়া জলপাই মার্কায় ভোটের আবেদনে বেতনভুক্ত দলীয় লোকেদের লইয়া যেই মিছিলখানা আমার সামনে দিয়া চলিয়া যাইতেছে তাহা আমি ভুরু কুন্চাইয়া দেখিতে লাগিলাম। পাশের পান-বিড়ি-কাঠি দোকানী সন্দিহাতষূ হইয়া এইদিক ঐদিক চাহিতেছে... তারে কইলাম এক কাপ লাল চা লাগাও। সে আমারে হতাশ করিয়া কইলো, লাল চা হইবেক না। কইলাম কেনো হইবেক না? তাহার কেটলিতে নাকি কড়া চা, তাহা কেবল দুধ চা এর লাগি। কেন হইবেকনা জিগ্গেস করায় বুঝা গেলো তাহার মেজাজ খিটখিটে হইলো আমার উপর...। তাই তাহাকে পুনরায় ঘাটাইলাম না।

"ওমুক ভাইয়ের সালাম নিন... জলপাই মার্কায় ভোট দিন..." এইরূপ সোরগোল শুনিতেছিলাম। এমতাবস্থায় কেউ একজন মিছিলের মধ্য হইতে আমায় লক্ষ্য করিয়া তারস্বরে ডাকিলো!! ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়া ভালো করিয়া চাইতেই দেখি, একজন আমার দিকে উত্ফুল্ল্য নয়নে চিল্লাইয়া যাইতেছে। যাহা কইলো তাহার মানে আমাকে মিছিলে যোগদানের আহবান! উপররে পাটির সর্বাধিক সংখ্যক দন্ত দেখাইয়া তাহাকে ভাবে ভংগিতে বুঝাইলাম আমার গলায় প্রদাহ আছে! তাহাকে হস্ত নাড়াইয়া শুভ কামনা জানইলাম... যে আমায় ডাকিলো, সেই ছেলেটি আমার মামতুত ভাই!! সে আপন মনে হাত পা ছুড়িয়া আপনার আপন পিতাকে ভাই বলিয়া যাইতেছে!! আমার মনে লইলো, সে তো নিজের পিতার ঢোল নিজে পিটাইতেছে, কিন্তু বাকিদের মতন বেতনভুক্ত নয়, যাহাই হউক, তাহার সেকি জোরালো কন্ঠ!! বোধ করি সে প্রাতবেলাতে দার্জিলিং হইতে চা আনিয়া খাইয়াছিলো, তাহা না হইলে ঐরূপ চিল্লায় কি করিয়া!! ভাবিতে ভাবিতে দোকানীর সহিত চোখাচুখি হইলো। আমাকে পার্টির লোক ভাবিয়া সে অপ্রস্তুত হইয়া কইলো, "আলাদা করিয়া লাল চা বানাইয়া দিলে খাইবেন?" মনের কোথায় জানি মৃদু চালাকি জাগিলো, কইলাম, "তোমার চা পাতা কি দার্জিলিং হইতে আনিয়াছো?" মাথা নাড়াইয়া কইলো, "জ্বী না!" এইবারে তাহাকে হতাশ করিয়া ধমকের সুরে কইলাম, "দার্জিলিং এর চা পাতা না তো কি ..... এর চা পাতা!!! যাহাই হউক বানাইতে পারো...."

তড়িঘড়ি করিয়া সে চা বানাইতে লাগিলো। বোধ করি তাহার কর্মজীবনের সেরা চা সে বানাইতেছে এই ভাব তাহার। আমি কিন্চিত বাঁকা হাসিতে এইদিক সেইদিক চাইলাম। অবশেষে কেউ একজন লাল চা এর কাপ আমার হাতে ধরাইয়া দিয়া আবার দোকানের ঐপাশে চলিয়া গেলো। দোকানীর চোখে মুখে সন্দেহের ভাবখানা আরো প্রবল হইলো। আমার বাঁকা হাসি হইলো আরো রহস্যময়!

বিড়াল জাতিয় পশু যখন খুব আহত হয় এবং অসহায় হইয়া পড়ে, তখন তাহাদের চক্ষু কেমন গোল গোল হইয়া একপ্রকার অদ্ভুত মায়াবী আবহ তৈরি করিয়া থাকে। এই ব্যাপারে আমার দেখার বা ধারনার ভুলও হইতে পারে। যাহাই হউক, আমার পার্শ্বে এতক্ষন একজোড়া সেইরকম চক্ষু আমাকে আর আমার আশে পাশের পরিবেশ লক্ষ্য করিতেছিলো। এহেন চক্ষুর মালকিন এক ছোট্ট শিশু। তাহার গত্রের উপরিভাগ হইতে একখানা মলিন বস্ত্র হাটুর নিচ অবধি বিস্তৃত। আমি তবু তাহাকে গুরুত্ব দিলাম না। এইরূপ অনেক শিশু আমি রোজ দেখিয়া থাকি। আমার চা খাওয়া শেষ হইলে শিশুটি হাত বাড়াইয়া কাপ খানি নিতে চাইলে আমি প্রথম তাহার চেহারার অবয়ব লক্ষ্য করিলাম। তাহাকে খুটিয়া দেখার প্রয়োজন হইলো না, এই শিশুর জনক এই দোকানী ব্যাটার, সেটা তাহার অবয়ব দেখিয়াই কওয়া যায়।

মিছিলখানা অপর দিক হইতে প্রদক্ষিন করিয়া আসিলো। আমার মামতুত ভাইটি এইবারে আমার নিকট আসিয়া দুই চারখানা কথা পাড়িলো। দোকানের পাশে বসিলাম। আরেকটা ছোট্ট শিশু আমাদের বসার জায়গা ঝাড়িয়া পরিষ্কার করিয়া গেলো। চকিতে খেয়াল করিলাম, এই নয়া শিশু মনে লয় ঐ বিড়ালচোখা শিশুটির ছোট ভ্রাতা হইবক। আমাদের আলোচনায় আবার আমার ঘরের খোজ-খবরও ছিলো! এই এলাকায় কে জিতেবে, তাহা সকলেই জানে। তাহার পরেও এই বেতনভূক্ত লোকেদের নিয়া লম্ফ-ঝম্ফের কমতি নাই। নয়া শিশুটার হাতে ধরা পানি ভর্তি একখানা গ্লাস, তাহা আমায় দিতে কইয়া, মামতুত ভাইকে কহিলাম, "জলপাই মার্কা জিতিবে, ইহা সকলেই জানে, তো বাসায় নাকে তৈল দিয়া ঘুমাও না কেন??"

"হে হে হে, হা হা হা... আমার ভাই, নির্ঘুম রাত কাটাইতে পারিলে, তাহার ছেলে হইয়া আমি ঘুমাই কি করিয়া....!! আর পার্টির লোকজনকে চান্গা না রাখিলে যে অন্য দলে ভিড় করিবে। জয় লাভ করিলে, আর এই ভয় থাকেনা। কারন ক্ষেমতা আমার!!!!.... ", একনাগাড়ে ভাষন সমাপ্ত করিয়া সে চা শেষ করিয়া তামাক লাঠিখানা আগুন কাঠি দিয়া ধরাইবে, এহেন সময়, তাহার এহেন কথা শুনিয়া কিনা জানিনা, এই নয়া শিশুটির হাত ফসকাইয়া, অনেকখানি পানি আমার গত্রস্থ হইলো। আমার একখানা হাত চায়ের কাপ ধরা আর বাকি হাতে সামলাইবার চেষ্টা। ছোট মানুষ, ইহাতে আমি বিচলিত হইলাম না, কিন্তু আমি বিচলিত হইলাম অন্য দিকে, মামতুতকে কইলাম, "ক্ষেমতা তোমার মাইনে কি???"

আমার কথায় কর্ণপাত না করিয়া, শিশুটির উপর ক্রোধানল নিক্ষেপ করিলো! আমি তাহাকে শান্ত থাকিতে কইলাম। কিন্তু শিশুটির পিতা, এই দোকানী তাহার উপর চড়াও হইলো। কষিয়া একখানা চড় বসাইলো। শিশুটি পড়িতে পড়িতে সামলাইয়া খাড়াইলো। তাহার লক্ষ্য হাতে ধরা গ্লাস যাহাতে ছিটকাইয়া না পড়িয়া যায়! আবার তাহার উপর হানা দিবে, অমনি কোথা হইতে বিড়ালচোখা শিশুটি আসিয়া হাজির। সূর্যের প্রখরতায় জমিন ফাটিতে থাকিলে, মেঘের ছায়া তাহাতে পড়িলে যেমন তপ্ত জমিন বুকে জল পায়... তেমনি করে মেঘমালার মতন বিড়ালচোখা তাহার ভ্রাতাকে আগলাইয়া লইলো! আর তাহাদের পিতার রূক্ষতা মুহুর্তেই মেঘের আড়ালে লুকাইলো। আমার এক হাতে চায়ের কাপ, সামনে অপূর্ব দৃশ্য, পাশে ক্ষিপ্ত মামতুত ভাই... আমি হারাইলাম অন্য চিন্তায়, আমি বসিয়া ভাবিতে লাগিলাম, আমার যদি এইরূপ বিড়াল চোখা কোন ভগ্নি থাকিতো!! মামতুত ভাই চলিয়া গেলো, আমি ভাবিলাম, আমার দেশেরওকি আমার মত দশা? প্রখর তাপে কে আমার দেশকে আগলাইবে?? আমার বুক যখন রুদ্র তপ্ত হইয়া চৌচির হইয়া যায়, কে তখন আমায় আগলাইবে?? হাসিলাম মনে মনে, ভাবিলাম, মেঘমালা-আমার তরে না...
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই অক্টোবর, ২০০৭ দুপুর ১২:২১
১৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×