somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... ভারতের বিএসএফ এর অমানবিকতা এবং আমাদের আত্মমর্যাদাহীনতা
মানুষের জীবনের প্রতি কতোটুকু ঘৃণা থাকলে কেউ কাউকে এভাবে পেটাতে পারে। বিএসএফ এর সেই জওয়ানগুলো নিশ্চয়ই তাদের নিজের দেশ ভারতের কোনো মানুষকে ধরে এভাবে পেটাতো না। কিংবা তারা কি কখনো পশ্চিমা কোনো দেশের সাদা চামড়ার কোনো মানুষকে এভাবে পেটাতো কোনোদিন? কোনো চীনা নাগরিককে? এমনকি ভারতের চিরশত্রু পাকিস্তানী কোনো যুবককে? যতো বড়ই অপরাধ করুক না কেনো সে যুবক?

বিএসএফ যেভাবে বাংলাদেশী মানুষজনদের ধরে মেরে ফেলে, কিংবা পিটিয়ে হাত-পা ভেঙ্গে দেয়, তাতে পরিষ্কার বোঝা যায় বাংলাদেশীদের তারা প্রায় মানুষই মনে করেনা। রাস্তার অপরিচিত কুকুরটিকে গুলি করে মেরে ফেলা যায়, জঙ্গলে সামনে পড়া সাপটিকে পিটিয়ে আধমরা করে ফেলা যায়, একদল পিঁপড়াকে দলিত মথিত করে মেরে ফেলা যায় নিমিষে। ভারতের বিএসএফ ঠিক সেই ব্যবহারটিই করে আমাদের সাথে।

কিন্তু কেনো বিএসএফ এমন করে আমাদের সাথে?

আমরা দেশে বসে যতোই মনে করিনা কেনো বাংলাদেশ ভৌগলিকভাবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে একটা গুরুত্মপূর্ণ দেশ, কথাটা কিন্তু খুব একটা সত্যি না। বাংলাদেশের অবস্থান খুব একটা গুরুত্মপূর্ণ অবস্থানে তো নয়ই, আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বাংলাদেশের আসলে তেমন কোনো গুরুত্মই নাই। বাংলাদেশের কোনো খবর বাইরে খুব বেশি গুরুত্ম সহকারে প্রকাশ পায়না, এবং বাংলাদেশকে মোটের উপর একটা অশিক্ষিত, পশ্চাদপদ, এবং দরিদ্র জাতি হিসেবেই বিবেচনা করা হয় বাইরের পৃথিবীতে।

আমরা ভেবে ভেবে সুখ পেতে পারি যে আমেরিকা, ভারত, ইজরায়েল, এবং বাকী পৃথিবী আমাদের নিয়ে ষড়যন্ত্র করে বসে আছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বাইরের পৃথিবীতে আমাদের নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যাথা নেই খুব একটা। প্রতিবেশি হিসেবে ভারতের কিছুটা মাথাব্যথা থাকতে পারে, কিন্তু সেই পর্যন্তুই। আমাদেরকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করা নিয়ে ভারত বসে থাকলে তাদের বছর বছর জিডিপির হার ৭%-৯% হতো না। তারা নিজেদের স্যাটেলাইট, জঙ্গিবিমান, সুপার কম্পিউটার বানাতে পারতো না।

আর আমেরিকার কাছে বাংলাদেশ এতোই তুচ্ছ একটা দেশ যে আমাদেরকে নিয়ে কোনো সময় ব্যয় করাও আমেরিকার জন্যে সময়ের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। আমার ধারণা বাংলাদেশকে নিয়ে আমেরিকার একমাত্র মাথাব্যথা হচ্ছে আমরা যেনো আত্মঘাতী জঙ্গি তৈরি করার একটা ঘাঁটি না হয়ে উঠি, যারা একদিন একটা বিমান নিয়ে যেয়ে আমেরিকার মাটিতে বিল্ডিং ধ্বংস করতে যাবে। এর বাইরে বাংলাদেশ এর কাছে আমেরিকার কী পাওয়ার আছে আমার ঠিক মাথায় ঢুকেনা।

আমি জানি নিজেদের সমালোচনা-দুর্বলতার কথা শুনতে কারোরই ভালো লাগার কথা না। অনেকেই আমার উপরের লেখাগুলো পড়ে আহত হবেন, ক্ষেপে যাবেন, কিংবা একমত হবেননা। কিন্তু আমি আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং চিন্তাভাবনা শেয়ার করলাম এখানে। পছন্দ না হলে সামনে আর পড়ার দরকার নেই, কারণ সামনে আরো আত্ম-সমালোচনা আছেঃ)

ধরুন, বিএসএফ ওই যুবককে না মেরে বাংলাদেশের কোনো সন্ত্রাসীকে মেরেছে। তাহলে কি আপনি এতো কষ্ট পেতেন? এতোটা ক্রুদ্ধ হতেন? খুব সম্ভবত হতেন। এবার বলেন, আমাদের র‍্যাব যখন বাংলাদেশীদের ধরে পিটিয়ে মেরে ফেলে, গুলি করে লাশ ফেলে রাখে রাস্তায়, তখন আপনার কেমন লাগে? আপনি যদি র‍্যাব দ্বারা বাংলাদেশী নাগরিকদের হত্যা সমর্থন করেন তাহলে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশীদের হত্যা সমর্থন করেন না কেনো?

ব্যাপারটা দেখা যাচ্ছে যে আপনি পিটিয়ে বা আইন বহির্ভূতভাবে মানুষকে হত্যা সমর্থন করেন, কিন্তু কে সেটা করলো সেটার দিকে খেয়াল করেন। বিএসএফ মারলে দোষ, কিন্তু র‍্যাব মারলে দোষ নয়?

২০০৬ এর ২৮শে অক্টোবর শিবির এর একটা ছেলেকে সাপের মতো পিটিয়ে হত্যা করলো আওয়ামী লিগের লোকজন, আপনি (যদি আপনি আওয়ামী লীগ সমর্থক হোন আরকি) নিশ্চয়ই সেটা সমর্থন করেন? শিবির যখন রগ কাটে, কিংবা জামাতী রাজাকাররা যখন আমাদের বাংলাদেশীদের, কিংবা বুদ্ধিজীবিদের একাত্তরে হত্যা করেছিলো তখন ওরা নিশ্চয়ই কোনো মানবিকতা দেখায়নি। অতএব, এখন ওদেরকে অমানবিকভাবে মেরে ফেলার মধ্যে নিশ্চয়ই কোনো অপরাধ নেই?

ছাত্রলীগ এর সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোপাকুপি, খুনাখুনি দেখার পর মনে হয় না ছাত্রদল, কিংবা ছাত্র শিবির, কিংবা র‍্যাব-পুলিশ ধরে যদি এদেরকে পিটিয়ে মেরে ফেলতো আপনার (যদি আপনি বিএনপি কিংবা জামাত সমর্থন হোন আরকি) খুবই খুশি লাগতো। আচ্ছা বিএসএফ যদি ছাত্রলীগ এর এই সব গুন্ডাদের ধরে মেরে ওই যুবকের মতো পিটিয়ে মেরে ফেলতো তাহলে কি আপনার একই রকম খুশি লাগতো?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আসিফ নজরুল সাইদি যুদ্ধাপরাধী নন বলার পর একদল তরুণ যখন তাঁর কক্ষ ভাংচুর করেছে, তখন অনেকে - বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সমর্থক লোকজন - এটাকে সমর্থন দিয়েছেন। একজন মানুষ যুদ্ধাপরাধী নন, এই মতামত দেওয়ার পর তার অফিস কক্ষ ভাঙ্গা তাদের কাছে কোনো অপরাধ নয়। এখানেও সেই একই যুক্তি - এইসব রাজাকার, আলবদরেরা যখন আমাদের বাংলাদেশীদের ধরে কচুকাটা করেছিলো তখন ওরাতো কোনো মানবিকতা দেখায়নি?

বিএনপির দ্বিতীয় দফা শাসনের সময় "অপারেশন ক্লিন হার্ট" নামে সেনাবাহিনী নামিয়ে দেওয়া হয়েছিলো সাধারণ মানুষকে ধরে ধরে উত্তম মধ্যম দেওয়া, কিংবা ক্ষেত্র বিশেষে পিটিয়ে মেরে ফেলার জন্যে। শফিক রেহমানের মতো মানুষেরা সেটার প্রশংসা করে বলেছিলেন সব যুদ্ধে কিছু "কোল্যাটারাল ড্যামেজ" হয়। দেশের ভালো করতে গেলে কিছু মন্দ ঘটতেই পারে। অপারেশন ক্লিন হার্টের সময় সেনাবাহিনী অসংখ্য সাধারণ মানুষকে ধরে নির্যাতন করেছে, রাস্তায় থামিয়ে অপমান করেছে, সন্তানের সামনে পিতাকে কান ধরে উঠবস করিয়েছে। মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলে পরে বলেছে হার্ট এটাকে সেই মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আমরা সাধারণ মানুষেরা হাততালি দিয়েছি আমাদের সেনাবাহিনীর বীরত্ম দেখে।

ব্লগে, ফেইসবুকে আমাদের অসংখ্য মানুষকে (বিশেষ করে পুরুষ মানুষকে) দেখেছি হাসান সাইদ নামক পুরুষটিকে সমর্থন করতে, যে তার স্ত্রী রুমানার নাক কামড়ে ছিড়ে ফেলেছিলো, চোখ অন্ধ করে দিয়েছিলো। কেনো সেই মানুষগুলো হাসান সাইদকে সমর্থন দিয়েছিলো? কারণ রুমানার নাকি এক ইরানী যুবকের সাথে প্রেম ছিলো। অন্য পুরুষের সাথে প্রেম এর শাস্তি হচ্ছে নাক ছিঁড়ে ফেলা, চোখ ঘুঁটে অন্ধ করে দেওয়া! এবং এই মানুষগুলো দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিক্যাল, অর্থনীতি, রাজনীতি, ইত্যাদি পড়ুয়া ছেলেমেয়ে!

আমরা আমাদের রিকশাওয়ালাদের পাঁচ টাকার জন্যে মার দিই, গালি দিই। আমাদের ঘরের কাজের লোকজনের সাথে আমরা কৃতদাসের মতো ব্যবহার করি।

আমাদের রাস্তা দিয়ে মেয়েরা হেঁটে যেতে পারেনা। কয়েক'শ চোখ তাকে ধর্ষণ করে বেড়ায়। অসংখ্য মুখ তার সম্পর্কে বাজে, রসালো মন্তব্য করে। এবং এই ধর্ষণকারী চোখগুলি, মুখগুলি আমাদের দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়া তরুণ।

তো বিএসএফ এর এক বাংলদেশী যুবককে নির্দয়ভাবে পেটানোর সাথে আমাদের দেশের এইসব অমানবিকতার সম্পর্ক কী?

সম্পর্ক হচ্ছে আমরা যদি আমাদের নিজেদের মর্যাদা না রাখতে পারি, আমরা যদি বাংলাদেশী হয়ে অন্য বাংলাদেশীদের এতো নির্দয়ভাবে মারতে পারি, পেটাতে পারি, ধর্ষণ করতে পারি, উত্যক্ত করতে পারি, র‍্যাব-সেনাবাহিনী দিয়ে পেটাতে পারি, এবং এতোকিছুর পর আমাদের রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের কারণে সেই অমানবিকতা, নিষ্টুরতা, নির্দয়তা, অসভ্যতা সমর্থন করতে পারি, তাহলে জাতি হিসেবে আমরা একটা আত্মমর্যাদাহীন, আত্মসম্মানহীন জাতিতে পরিণত হবো এবং সেটা আমরা হচ্ছি।

আমরা যদি আমাদের নিজেদের মর্যাদা নিজেরাই না রাখতে পারি, তাহলে বিএসএফ কি আমাদের সেই মর্যাদা দিবে?

আমি কিন্তু এখানে বিএসএফ এর এই আচরণকে সমর্থন করছিনা, আমি ওদের এই আচরণের কারণ বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছি মাত্র।

বিএসএফ কখনো আমেরিকার একজন নাগরিককে এভাবে পেটাবেনা। কারণ আমেরিকা নিজেদের মর্যাদা রাখার চেষ্টা করে এবং ভারতের এই আচরণের সাথে সাথে ভারত সেটার দাঁতভাঙ্গা জবাব পাবে।

আমেরিকা নিজেদের মাটিতে কাউকে অমানবিক নির্যাতন করতে পারেনা বলে (আইনের কারণে) কিউবার গুয়ানতানামোতে নিয়ে বিদেশীদের সাথে এই নিষ্ঠুর, নির্মম আচরণ করে। (ভাগ্যিস ওবামা এসে মানুষ নির্যাতনের এই কল বন্ধ করে দিয়েছে)।

যতোদিন আমরা নিজেরা নিজেদেরকে সম্মান দেওয়া শিখবোনা, আমার ধারণা বিএসএফও ততোদিন আমাদের সাথে এমন আচরণ করে যাবে।

আমরা যদি একটা মর্যাদাবান যাতি হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে পারি, আমরা যদি নিজেরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই, আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামাত-র‍্যাব-পুলিশ-সেনাবাহিনী-ছাত্রলীগ-ছাত্রদল-ছাত্র শিবির-সাধারণ মানুষ সবাইকে যদি আইনের শাসনের আওতায় নিয়ে বিচার করি, তাহলেই আমরা একটা চমৎকার সমাজ এবং জাতি গড়তে পারবো।

পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং আইনের শাসনের একটা দেশ উন্নত হতে খুব বেশিদিন লাগেনা। এবং আমরা একটা উন্নত দেশ হতে পারলে বিএসএফ আমাদের যুবকদের ধরে নিয়ে পেটানোর পরিবর্তে একজন আমেরিকান নাগরিকের মতো ব্যবহার করবে। আর যদি সেটা না করে তবে বিএসএফকে একটা শক্ত পিটুনী দেওয়ার মতো শক্তিও তখন আমাদের থাকবে। আমাদের সশস্ত্রবাহিনী তখন অপারেশন ক্লিন হার্ট এবং ক্রস ফায়ার বাদ দিয়ে একটা সত্যিকারের শক্তিশালী বাহিনীতে পরিণত হবে, যারা সাধারণ নিরস্ত্র মানুষের সাথে ব্যাটাগিরি না দেখিয়ে ভারতের মতো দেশের সাথে ব্যাটাগিরি দেখানোর সামর্থ্য রাখবে। আর আমাদের তরুণ-তরুণীরা ব্লগে-ফেইসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ ছাড়াও বাংলাদেশে ভারতের মতো পারমানবিক শক্তি-স্যাটেলাইট-জঙ্গিবিমান-সুপারকম্পিউটার তৈরির জন্যে মেধাবী হওয়ার জন্যে কাজ করবে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29527060 http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29527060 2012-01-22 14:02:40
আট বছর ধরে পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়ে যে উনত্রিশটি শিক্ষা আমি পেয়েছি - শেষ পর্ব
১ম পর্ব, ২য় পর্ব

২০। সানস্ক্রীন ব্যবহার করুন

বেশি রোদ পড়লে ত্বকের ক্ষতি হয়, সানস্ক্রীন ব্যবহার করে ত্বকের যত্ন নিন। এবং নিচের ভিডিওটিতে যতো উপদেশ দেওয়া আছে সেগুলো সব অনুসরণ করার চেষ্টা করুনঃ




বাংলা অনুবাদ

২১। বেশি ভাবাভাবি বন্ধ করে কাজ করুন

বেশি ভাবতে যেয়ে জীবনের দরকারী কাজগুলো প্রায়ই করা হয়ে উঠেনা। আমি আমার জীবনে বেশি ভেবেচিন্তে একটা কাজও করতে পারেনি।

বেশি চিন্তা না করে কাজে নেমে পড়ুন। নাহলে কিছুই আর করা হয়ে উঠবেনা।

২২। সুযোগ পেলেই গান গাইতে, নাচতে চেষ্টা করুন

গান এবং নাচ চমৎকার আর্ট এবং মনকে খুব হালকা করে। নাচানাচি কিংবা গান গাওয়া/শুনার পড় মন ভালো না হতে উপায় নেই!

২৩। নতুন বন্ধু বানানো কঠিন কিছু না, এবং বর্তমান বন্ধুদের সাথে সুসম্পর্ক রাখাও জরুরী

আমি আমার গতো আট বছরের ভ্রমণ করে আসছি পুরোপুরি একা। প্রায়ই আমি একটা নতুন দেশে যে পা রাখি যেখানে আমাকে নিতে আসার কেউ থাকেনা। আমার তেমন কোনো কানেকশন নাই, কিন্তু আমি যেভাবেই হোক নতুন কানেকশন তৈরি করি। ইন্টারনেটে কোথাও কোনো পার্টি হচ্ছে দেখলে আমি সোজা যেয়ে সবাইকে "হ্যালো" বলি। এবং একটু লেগে থাকলে আমি কিছু মানুষকে পেয়ে যাই যাদের সাথে আমি গল্প-গুজব-আড্ডা দিতে পারি।

আপনি যদি বন্ধুত্বপরায়ন, অকপট, এবং মোটামুটি মানুষকে আকর্ষণ করার ক্ষমতা রাখেন তাহলে পৃথিবীর যেকোনো জায়গার যেকোনো মানুষের সাথে আপনি বন্ধুত্ব করতে পারবেন।

২৪। আপনার যা যা আছে তা হারিয়ে যাবার আগে সেগুলোর মূল্য বুঝবেন না

কোনো কিছুকেই খুব সহজপ্রাপ্য হিসেবে ধরে নিবেন না। একদিন রাতে আমার হোটেলে থাকার টাকা ছিলোনা এবং আমাকে বাইরে পাথরের উপর ঘুমাতে হয়েছিলো। সেই থেকে আমি আমার ঘুমানোর জন্যে যে একটা বিছানা এবং বাসা আছে সেটা নিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। কারণ আমি জানি পৃথিবীর অনেক মানুষের এই মৌলিক জিনিসগুলোও নাই। কেবল এক রাতের বাইরে ঘুমানোর কষ্ট থেকে আমি এখন প্রতিদিন রাতে আমার বিছানায় ঘুমাতে যাবার আগে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলি!

একবার আমার কানের ইনফেকশনের কারনে আমি প্রায় দুই সপ্তাহ কানে কিছু শুনতে পারতামনা। এরপর থেকে আমি আমার শ্রবণশক্তির জন্যে সবসময় কৃতজ্ঞ থাকি। সুস্থ কান থাকার কারণে আমি চারদিকের এতো সব চমৎকার শব্দ শুনতে পাই!

আমি কখনো আমার খুব কাছের কাউকে মারা যেতে দেখিনি এখনো, কিন্তু আমি আমার পরিবারের কারো সাথে দেখা হলে তাদেরকে জড়িয়ে ধরে বলি আমি তাদের কতোটা ভালোবাসি। বন্ধু-বান্ধব, পরিচিতজনদের সাথে আমি কোনো মনোমালিন্য পুষে রাখিনা, এবং আমার মনের কথাটি আমি সবসময় খোলাখুলিভাবে বলে ফেলি।

২৫। অযাচিত অহম ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে নিজের ভুলের জন্যে ক্ষমা চেয়ে ফেলুন

কারো প্রতি মনে ক্ষোভ পুষে রাখবেননা, এবং সবসময় অন্যের সাথে বিতর্কে জেতার জন্যে মরিয়া হয়ে থাকবেননা। মাঝেমধ্যে নিজের অহমকে ছোট করে মানুষের সাথে মনোমালিন্য এড়ানো যায়। অপরজনের আগে আপনি নিজেই বলে ফেলুন আপনি দুঃখিত। কখনোই যার সাথে সমস্যা হচ্ছে তার ভুল বুঝার জন্যে অপেক্ষা করে থাকবেন না। নিজে থেকেই আগ বাড়িয়ে ভুল বুঝাবুঝির সমাধান করে ফেলুন।

২৬। শুধুমাত্র অন্যদের মুগ্ধ করার জন্যে কিছু করা গাধামি

মানুষকে মুগ্ধ করার জন্যে যা-ই করেন না কেনো মানুষ আপনাকে সেই স্বীকৃতিটুকে দিবেনা। মানুষকে যদি বলে বেড়ান যে আপনি কতোগুলো ভাষা জানেন, কিংবা আপনি কতো ধনী, কতো উঁচু লেভেলের মানুষের সাথে আপনার সম্পর্ক আছে, আপনি কতো ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছেন, আপনি কতো ভালো কাজ করেন, কোনো কিছুতেই আসলে মানুষের থেকে সেই স্বীকৃতিটুকু আপনি পাবেননা যেটা আপনি চাচ্ছেন। মানুষকে চমকিত করে আপনি নিজে গৌরবান্বিত হতে পারবেননা।

মানুষ তাদের দ্বারাই মুগ্ধ হয় যাদের কাছে গেলে তারা মন খুলে কথা বলতে পারে, এবং যাদের কথা এবং কাজ তাদের কাছে ইন্টারেস্টিং লাগে। মোটামুটিভাবে বলা যায় আপনি মানুষ হিসেবে ইন্টারেস্টিং হতে পারলেই মানুষ আপনাকে পছন্দ করবে, আপনার দ্বারা মুগ্ধ হবে।

২৭। পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষ একাকীত্বে ভোগে

একা একা ভ্রমণ করার কারণে যে প্রশ্নটি আমাকে প্রায়ই শুনতে হয় তা হচ্ছে আমার নিজেকে একা লাগে কিনা। এক কথার হচ্ছে - না। আর লম্বা করে উত্তর দিতে গেলে একটা আলাদা পোস্ট লিখতে হবে।

সত্যি কথা বলতে কি পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ একাকীত্বে ভোগে। আর আমি আসলে আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অনেক বেশি একা ছিলাম। এখন আমি এমন অনেক মানুষের সাথে মিশি যাদের অসংখ্য বন্ধু-বান্ধব, সামাজিক-পেশাগত নেটওয়ার্ক আছে। কিন্তু এদের অনেকেই নিজেকে একা ভাবেন কারণ তাদের ধারণা মানুষ তাদেরকে বুঝেনা।

আবার অনেকে পেশাগত কিংবা পারিবারিক কারনে বন্ধু-বান্ধব, পরিচিতজনদের থেকে দূরে সরে গিয়েছেন এবং এখন নিজেকে একা লাগে।

অনেকেই আমাকে বলেন যে পৃথিবীতে তাদের মতো একা আর কেউ নেই। বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, আমার আসলে আমার নিজ বাড়ি থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে যেখানে কেউ আমার নাম পর্যন্ত জানেনা সেখানে বরং আমার অনেক ভালো লাগে। আমি নিশ্চিত এই মুহুর্তে পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষ আমার মতো অবস্থায় আছে যেখানে তারা তাদের প্রিয়জন থেকে অনেক দূরে আছেন।

নিজেকে একা লাগলে ভাববেন না আপনিই একমাত্র এই অবস্থায় আছেন। চারদিকের অনেকেই আপনার মতো একা আছেন এবং তারা নিশ্চিতভাবেই আপনার অবস্থা বুঝতে পারে।

২৮। ভালোবাসা-ই জীবনে সব নয়, তবে কিছু ভালোবাসার মানুষ ছাড়া জীবনটা শূন্য মনে হতে পারে

ভালোবাসা ছাড়াও আপনি বেঁচে থাকতে পারবেন, কিন্তু ভালোবাসা ছাড়া জীবনের একটা অংশ খালি মনে হবে। আপনার জীবনে কিছু মানুষ থাকা দরকার যারা আপনাকে ভালোবাসে - বন্ধুবান্ধব, পরিবার, অথবা আপনার প্রেমিক/প্রেমিকা।

২৯। জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাগুলি কেউ আপনাকে কাগজে লিখে দিতে পারবেনা, আপনাকে অবশ্যই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় মনে হতো আমি প্রায় সবকিছু জেনে গিয়েছি - এবং জীবনের গুরুত্মপূর্ণ প্রায় সবকিছুই বইয়ে লেখা আছে। কিন্তু সত্য হচ্ছে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্মপূর্ণ জিনিসগুলো নির্ভুলভাবে কাগজে লেখা প্রায় অসম্ভব, এবং সেটা আমার এই পোস্ট সম্পর্কেও সত্যি।

যখন সারা পৃথিবীর প্রায় সব জ্ঞান যখন একটা কীবোর্ড এবং মাউস দিয়ে পাওয়া যায়, তখন এটা মনে হতে পারে বাইরের পৃথিবীতে যেয়ে সেই জ্ঞান নিজে অর্জন করার কোনো দরকার নেই। সিনেমা, বই, খবরের কাগজ ইত্যাদির মাধ্যমে এখন মনে হতে পারে আমরা প্রায় সব কিছু সম্পর্কে জেনে যেতে পারি।

এটা একটা ভুল ধারণা। পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় শিক্ষক হচ্ছে মানুষের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা।

ঘরে বসে বসে নাটক, সিনেমা, কম্পিউটার এর মাধ্যমে পৃথিবী সম্পর্কে জানা বন্ধ করে বাইরে যেয়ে নিজের জীবন থেকে সেই অভিজ্ঞতা লাভ করুন।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29471549 http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29471549 2011-10-24 08:40:15
আট বছর ধরে পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়ে যে উনত্রিশটি শিক্ষা আমি পেয়েছি - ২ পর্ব - ১

৬. মানুষকে কোনো কিছু বিশ্বাস করানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে নিজে একটা চমৎকার জীবন যাপন করা

কথা কিংবা যুক্তি-তর্ক দিয়ে মানুষকে যতোটা না বুঝাতে পারবেন, যেটার কথা বলছেন সেটা নিজে করে তার চেয়ে অনেক ভালো বুঝাতে পারবেন। যখন মানুষ আপনাকে দেখবে, আপনার কাজ দেখবে, তখন আপনার ওদেরকে আর আলাদাভাবে বিশ্বাস করানোর দরকার হবে না। তাদেরকে শুধু বলুন আপনি আপনার কাঙ্খিত জিনিসটি অর্জন করেছেন, জীবনে যেখানে পৌঁছাতে চান সেখানে পৌঁছে গিয়েছেন কিংবা সেদিকেই ধাবিত হচ্ছেন। এরপর তাদেরকে জানান কীভাবে আপনি সেটা অর্জন করলেন বা করছেন। তাহলেই সবাই বুঝতে পারবে আপনি আসলে ফাঁকা বুলি আওড়াচ্ছেননা শুধু।

৭। পৃথিবীর কেউই সবকিছু জেনে বা পেয়ে বসে নেই

সবারই কিছু না কিছু সমস্যা আছে, কিন্তু তারা সেটা গোপন করে চলে। আপনি যখন একজন মানুষকে দেখেন তখন শুধু সে তাকে যেভাবে বাইরের পৃথিবীর কাছে দেখাতে চায় সেটাই দেখেন। আপনি হয়তো ভাবতেও পারবেন না তারা কীসের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, কিংবা যে সুখী অবস্থায় তাদের দেখছেন সে অবস্থায় আসতে তাদের কীসের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। এটা সবার জন্যে সত্যি - কোটিপতি, ছাত্রছাত্রী, স্মার্ট তরুণ-তরুণী, লাজুক মানুষটি, এবং আর যেকোনো ধরণের মানুষই বলুন না কেনো, তাদের সবারই ভেতরের একটা জগত আছে - বাইরে থেকে তাদেরকে যেমনই মনে হোক না কেনো।

কারো সম্পর্কে সবকিছু জানার আগে কখনোই ভাববেন না সে খুব সহজে জীবনে সবকিছু পেয়ে গেছে।

৮। "আমি জানিনা" - এটা বলায় কোনো লজ্জা নাই

অনেকে কোনো বিষয়ে অজ্ঞতা প্রকাশ করায় লজ্জা পান। এটা নিয়ে কোনো ভাবাভাবির অবকাশ নাই - জাস্ট বলে ফেলুন "আমি ব্যাপারটা সম্পর্কে জানিনা"। অজ্ঞতা লুকানোর চেয়ে সততা অনেক বেশি স্মার্ট একটা ব্যাপার।

৯। আরো বেশি টাকা কখনোই আপনার সব সমস্যার সমাধান করবে না

আপনার যদি খাবার এবং থাকার জন্যে পর্যাপ্ত টাকা থাকে তাহলে এরচেয়ে বেশি টাকা ছাড়াও আপনি জীবন চালিয়ে নিতে পারবেন। এটা আরো ভালো করে বুঝতে পারবেন যদি আপনি অসচ্ছল অথচ মোটামুটি সুখী এমন মানুষদের সাথে মিশেন। জীবনের সবচেয়ে সুন্দর জিনিসগুলি পেতে কোনো টাকা লাগেনা, আর বাদবাকী জিনিসগুলো আপনি যতো দামী ভাবছেন ততোটা দামী না।

১০। আপনার সম্পদ আপনাকে কিনে নেয়

সত্যিকারের দরকারী জিনিসগুলো ছাড়া মানুষের অন্যান্য দামী সম্পত্তি-সম্পদ আসলে অন্যের কাছ থেকে স্বীকৃতি বা এক ধরণের লোক দেখানো ছাড়া কিছুই না। বেঁচে থাকা এবং জীবন যাপনে সুবিধার জন্যে দরকারী না হলে এসব দামী জিনিসপত্র ছাড়া আপনি অনায়াসে আপনার জীবন কাটিয়ে দিতে পারেন।

যখন আপনি জীবনে দামী জিনিসপত্র ছাড়া চলতে পারবেননা তখন এই জিনিসপত্রগুলি আপনার জীবনকে পরিচালিত করবে। আপনার দামী বাড়ি বা ফ্ল্যাট এবং ঘরের দামী ফার্নিচার থাকার কারণে আপনি অন্য জায়গায় সহজে চলে যেতে পারবেন না, এবং এগুলো পাওয়ার জন্যে আপনাকে সবসময় অনেক বেশি উপার্জন করা নিয়ে চিন্তা করতে হবে। এবং আমার ধারণা এইসব দামী সম্পদ আপনার জীবনকে খুব বেশি সমৃদ্ধ করেনা। জীবনে যতো কম সম্পদ থাকবে ততোই আসলে ভালো।

১১। টেলিভিশনের মতো সময় অপচয়কারী বস্তু পৃথিবীতে আর কিছু নাই

আমার বয়স একুশ হওয়ার আগে আমি টিভি দেখে আমার জীবনের অনেক সময় অপচয় করেছি। আমার মনে হতো "অমুক প্রোগ্রামটি আমাকে দেখতেই হবে"। এখন আমার সেই হারানো প্রতিটি সেকেন্ডের জন্যে খুব দুঃখ হয়। সারা পৃথিবী এগিয়ে চলে যাচ্ছিলো ভবিষ্যতের দিকে আর আমি বসে বসে টিভি দেখছিলাম!

বিংশ শতাব্দীতে টিভি একটা গুরুত্মপূর্ণ জিনিস ছিলো - সাধারণ মানুষের সাথে যোগাযোগ এবং সংবাদ এর জন্যে। কিন্তু এখন টিভির আর তেমন দরকার নেই। টিভির খবরগুলো সাধারণত পক্ষপাতিত্বপূর্ণ হয় যেখানে আমাদের অনেক বিকল্প সংবাদ মাধ্যম রয়েছে। আর টিভির অনুষ্ঠানগুলো থেকে শেখার প্রায় কিছুই নেই, যদিও এগুলো মানুষের দিন থেকে ঘন্টার পড় ঘন্টা নিয়ে নেয়। অথচ আমরা প্রায়ই অনুযোগ করি আমাদের হাতে সময় নেই!

টেলিভিশন মানুষকে ঘরকুনো করে ফেলে। যদি টেলিভিশনে পছন্দের কোনো অনুষ্ঠান বা খেলা দেখতে চান তাহলে কোনো বন্ধুর বাসায় যেয়ে আড্ডা দিতে দিতে একসাথে দেখুন।

ঘরের ভেতরে বসে টেলিভিশনের স্ক্রীন এর মতো জড় একটা জিনিসের দিকে তাকিয়ে থেকে জীবনকে কোনোভাবের সমৃদ্ধ করতে পারবেননা।

১২। ইন্টারনেট হচ্ছে মানুষের তৈরি সবচেয়ে উপকারী জিনিস, কিন্তু এটাকে পরিমিতভাবে ব্যবহার করতে হবে

টেলিভিশন হচ্ছে একটা নির্বোধ জড় স্ক্রীন, তার বিপরীতে ইন্টারনেট হচ্ছে একটা সক্রিয় মাধ্যম। ইন্টারনেট নিয়ে আপনি অনেক কিছু করতে পারবেন, একটা ভার্চুয়াল সামাজিক জগতে ঢুকে যেতে পারবেন। ইন্টারনেট পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে নানাভাবে সংযোগ স্থাপন করে এবং এটা ছাড়া আমার গতো আট বছরের জীবন অনেক কঠিন হতো।

ইন্টারনেটের এতো উপকারিতা সত্ত্বেও এটারো টেলিভিশনের মতোই সময় অপচয় করার সম্ভাবনা আছে। জীবনকে সমৃদ্ধ করার জন্যে ইন্টারনেট ব্যব্যহার করুন, কিন্তু সারাদিন এর মধ্যে পড়ে না থেকে বাইরে যেয়ে সেই সমৃদ্ধ জীবন উপভোগ করুন। টেলিভিশনের জড় স্ক্রীন এর জায়গায় কম্পিউটার এর অনেক কর্মকান্ডভরা স্ক্রীন ব্যবহার করলেই যে আপনার সময়ের সদব্যবহার হবে তা কিন্তু না। বাইরের পৃথিবী অনেক বেশি সুন্দর, বের হোন এবং সেটা উপভোগ করুন।

১৩। বাইরে যেয়ে মানুষের সাথে কিছু সময় কাটান

আমার খুব প্রিয় একটা ওয়েবসাইট হচ্ছে http://www.couchsurfing.org/। যেহেতু আমি নতুন নতুন ভাষা শিখতে আগ্রহী, এই সাইটের মাধ্যমে অনেক ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষকে আমার অতিথি হিসেবে আমার বাসায় থাকতে দিয়েছি এবং বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে তাদের ভাষা শিখতে পেরেছি।

সত্যিকারের পৃথিবী হচ্ছে বাইরের পৃথিবী - বই, টেলিভিশন, এবং ইন্টারনেটে যে পৃথিবী দেখছেন সেটা না। এই পৃথিবীর দেখা পাবেন আপনি বাইরের মানুষের সাথে মিশলে। নিজেকে লাজুক বা ইন্ট্রোভার্ট হিসেবে ভাবা বন্ধ করুন এবং নিজের ঘরের কিংবা দেশের বাইরে যেয়ে অন্য মানুষের সাথে মিশুন।

১৪। শুধু ইংরেজী ভাষা দিয়ে অন্য দেশের মানুষেকে খুব গভীরভাবে জানতে পারবেন না

আপনার বিদেশ ভ্রমণ যদি অল্প কিছুদিনের হয় তাহলে আপনি ইংরেজী দিয়ে অনায়াসে কিছুদিন চালিয়ে নিতে পারবেন। হোটেল বুক করা, রেস্টুরেন্টে খাবার অর্ডার দেওয়া, কিংবা একজন ভ্রমণ গাইডের সাথে ইংরেজীতে কথাবার্তা চালিয়ে নেওয়া - সবই করতে পারবেন। হয়তো কিছু স্থানীয় শিক্ষিত বন্ধুবান্ধবও বানিয়ে নিতে পারবেন। আপনার হয়তো মনে হবে আপনি সে দেশ সম্পর্কে অনেক কিছু জেনে গিয়েছেন

কিন্তু আপনি আসলে সত্যিকারভাবে কোনো দেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারবেননা শুধু সেদেশের ইংরেজী জানা মানুষজনের সাথে কথা বলে। শুধুমাত্র ইংরেজী জানলে আপনি সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন। আমি আমার ভ্রমণ করা দেশগুলো সম্পর্কে এতো বেশি জানতে পেরেছি কেবলমাত্র তাদের নিজেদের ভাষায় কথা বলার কারণে। ওদের ভাষায় কথা বলতে না পারলে এতো গভীরভাবে তাদের সম্পর্কে জানা আমার পক্ষে অসম্ভব হতো।

যে কেউ চাইলেই একটা নতুন ভাষা শিখতে পারে। আমার বয়স যখন ২১ ছিলো তখনো আমি ভাবতাম এটা সম্ভব না। কিন্তু একদিন আমি সব ফালতু অজুহাত দেখানো বন্ধ করলাম এবং একটা নতুন ভাষা শিখে ফেললাম। কোনো ভাষা তাড়াতাড়ি শেখার গোপন উপায় হচ্ছে প্রথম দিন থেকেই সেই ভাষায় অল্প অল্প করে কথা বলা শুরু করা।

১৫। অন্য দেশের মানুষজন সম্পর্কে আপনি যা ভাবেন তারা আসলে সেরকম না

পৃথিবীর প্রত্যেকটা দেশই ধীরে ধীরে আধুনিক হয়ে উঠছে। এর মানে এই নয় যে ওরা সব পশ্চিমা দেশগুলো বা আমেরিকার মতো হয়ে উঠছে। সব দেশই ভিন্ন এবং সেটা ট্যুর বইয়ে তাদের সম্পর্কে যা পড়ে এসেছেন সেরকম নয়। ভিন্ন দেশের, ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ সম্পর্কে প্রথাগত এবং পুঁথিগত ধারণা বাদ দিয়ে খোলা মন নিয় এওদের সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করুন।

আইরিশ মানুষ মানেই যে বিয়ার খায় তা নয়, ব্রাজিলের সবাই ফুটবল খেলেনা কিংবা সাম্বা নাচেনা, এবং জার্মান, ডাচ, ফিলিপিনো সবার সাথে কথা বলে আপনি অবাক হবেন যদি আপনার আগে থেকে পুষে রাখা ধারণা বাদ দিয়ে তাদের সাথে মিশেন।

মানুষের ভিন্নতাকে সম্মান করুন, তাদের কাছে গেলে তাদের সাথে মানিয়ে চলার চেষ্টা করুন। এমনো হতে পারে আপনার সংস্কৃতই ওদের কাছে পশ্চাদপদ মনে হবে!

১৬। জীবন নিয়ে তাড়াহুড়ো করবেন না, সময় নিন

যেসব দেশকে আমাদের কাছে "ধীর গতির" মনে হয়, আমি দেখেছি তারা আসলে তাদের নিজস্ব গতির জীবনে আমাদের চেয়ে অনেক বেশি জ্ঞানী। যেসব মানুষ কিংবা দেশ সবকিছু তাড়াহূড়ো করে করতে চায় তাদের কাজের কোয়ালিটি আসলে ততোটা ভালো হয়না। সবকিছু সহজভাবে নিন এবং ধীরে ধীরে কাজ করুন।

খাবারের প্রতিটি কামড় উপভোগ করুন, হাঁটার সময় চারপাশ দেখে ধীরে ধীরে হাঁটুন, কারো সাথে কথা বলার সময় তাকে তার কথা পুরোপুরি শেষ করতে দিন এবং সে পর্যন্ত মনোযোগ দিয়ে সেটা শুনুন।

দিনের কাজের ভেতর মাঝে মধ্যে কাজ বন্ধ করে বাইরে তাকান, কিংবা চোখ বন্ধ করে একটা বড় নিশ্বাস নিন, বেঁচে থাকার জন্যে নিজেকে সুখী ভাবুন।

১৭। আপনি সবাইকে খুশি করতে পারবেন না

"সফল হওয়ার উপায় হয়তো আমি জানিনা, কিন্তু ব্যর্থ হওয়ার উপায় হচ্ছে সবাইকে খুশি করতে যাওয়া" - বিল কসবি।

নিজের মতামত স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করুন। আপনার যদি আপনার মতামতের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস থাকে এবং সেই মতামত অন্যদের সাথে শেয়ার করেন তাহলে নিশ্চিতভাবে অনেক মানুষ আপনার উপর বিরক্ত হবে, আপনার কথাটা যতোই চমৎকার হোকনা কেনো। যারা আপনার সাথে একমত না এবং আপনার মত পছন্দ করছেনা এটা তাদের সমস্যা, আপনার না।

১৮। Cool হওয়ার চেষ্টা করা কিংবা সর্বশেষ ক্রেইজের পেছনে ছোটা আসলে Uncool

যারা সবসময় অন্যের দেখাদেখি নিজেকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করে তারা আসলে নিজেদের ব্যক্তিত্ব নিয়ে ভয় পায়। নিজের মেরুদন্ড শক্ত করুন, এবং স্রোতের বিপরীতে যাওয়াটাকে যদি আপনার সঠিক পথ মনে হয় তাহলে শক্তভাবে তাই করুন। আজকে যেটা চমকপ্রদ কয়েক বছর পর সেটাই হয়তো সবার অপছন্দের জিনিসে পরিণত হবে।

১৯। ভুল করতে ভয় পাবেন না, জীবনে অনেক ভুল করুন

ভুলের মাধ্যমেই আমরা শিখি। সাফল্য আসে অনেক ভুলের পরেই


(আগামী পর্বে সমাপ্য)
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29440236 http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29440236 2011-08-29 03:20:55
আট বছর ধরে পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়ে যে উনত্রিশটি শিক্ষা আমি পেয়েছি


কিছুদিন আগে একটা ওয়েব সাইটে একটা চমৎকার লেখা পড়ি। ভদ্রলোক গতো আট বছরেরও বেশি সময় ধরে পৃথিবী ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং বিভিন্ন দেশের ভাষা এবং সংস্কৃতি শিখছেন। তার পৃথিবী ভ্রমনের আট বছর পুর্তি উপলক্ষে তিনি তার ভ্রমন থেকে কী শিখেছেন সেটার একটা লিস্ট দিয়েছেন। ভাবলাম অনুবাদ করে ফেলি<img src=" style="border:0;" />

মূল লেখার লিঙ্কঃ http://www.fluentin3months.com/life-lessons/

আট বছর ধরে পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়ে যে উনত্রিশটি শিক্ষা আমি পেয়েছি
===========================================

আট বছর।
৪১৬ সপ্তাহ, যেটা প্রায় ৩০০০ দিন।

এই দীর্ঘ সময় আমার কোনো নির্ধারিত ঘর ছিলোনা। আমি ঘুরে বেড়িয়েছি দেশ থেকে দেশে, এক সংস্কৃতি থেকে আরেক সংস্কৃতিতে। আমার সারা জীবনের অর্জন করা সব সম্বল আমার ট্রাভেল ব্যাগে করে নিয়ে আমি ঘুরে বেড়িয়েছি এই সময়টা। এটা ছিলো আমার জীবনের একটা বড় অংশ, এবং আমি এখনো এটা করে চলেছি।

এর আগেও আমি অবশ্য কয়েকটা জায়গায় ভ্রমন করেছি - দুটো গ্রীষ্ম আমেরিকায়, আর এক মাস স্পেইনে। এবং ২০০৩ সালে, আমার একুশতম জন্মদিনের সপ্তাহটিতে, আমি আমার জন্মস্থান আয়ারল্যান্ড ছাড়ি চিরদিনের জন্যে। এর কয়েকদিন আগে আমি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করি, এবং আমি জানতাম এরপর হয়তো আমি আয়ারল্যান্ডে শুধু বেড়াতে আসবো, যদিও আমি জীবনে কখনো আমার পরিবারের সাথে ক্রিসমাস ডিনার না খেয়ে থাকিনি। কিন্তু আয়ারল্যান্ড আর আমার বাড়ি না। এখন থেকে "যেখানে আমি যাবো সেটাই হবে আমার বাড়ি"।

এর আগে আমার জীবনের প্রায় সবটুকু আমি ব্যয় করেছি বিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনে। কিন্তু সেখানে আমি গুরুত্মপূর্ণ প্রায় কিছুই শিখিনি। বইয়ে লেখা জিনিসগুলো প্রায় সবই আমি আগে থেকে জানতাম, কিন্তু আমি যা হতে চেয়েছি জীবনে সেটা আমি শিখেছি গতো আট বছরে পৃথিবীর পথে পথে ঘুরে বেড়িয়ে। এবং আমার নিশ্চিতভাবে এখনো অনেক কিছু শেখার আছে।

গতোকাল ছিলো আমার ২৯-তম জন্মদিন, এবং এই সপ্তাহে আমার পৃথিবী ভ্রমনের আট বছর পূর্ণ হচ্ছে। তাই ভাবলাম আমার এই আট বছরের অভিজ্ঞতা থেকে ২৯টি শিক্ষা আপনাদের সাথে শেয়ার করি। এগুলো বেশিরভাগই জীবন নিয়ে সাধারণ কথাবার্তা, কিন্তু এগুলো আমি শিখেছি সারা পৃথিবীর অসংখ্য মানুষের সাথে মেশার পরঃ

১। সব জায়গায় সব মানুষ আসলে একই জিনিস চায়

যদিও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি অনেক ভিন্ন, আপনি ইটালিয়ান কোটিপতি থেকে শুরু করে গৃহহীন ব্রাজিলিয়ান, নেদারল্যান্ডস এর জেলে, ফিলিপাইনের কম্পিটার প্রোগ্রামার এর সাথে তাদের নিজের ভাষায় তাদের মতো করে কথা বলে দেখবেন যে তারা সবাই জীবনের গুরুত্মপূর্ণ জিনিসগুলোর ব্যাপারে একই রকম চিন্তা করে।

সবাই চায় স্বীকৃতি, ভালোবাসা, নিরাপত্তা, বিনোদন, এবং একটা ভবিষ্যতের আশা। এই চাওয়াগুলির প্রকাশ এবং এগুলো পাওয়ার জন্যে সবার কাজে পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু এই বাহ্যিক ব্যাপারগুলো উপেক্ষা করলে দেখবেন পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষ আসলে প্রায় একই জিনিস চায়।

২। সুখ ভবিষ্যতের জন্যে তুলে রাখা বড় ভুল

অসংখ্য মানুষ ভাবে "ওই একটা জিনিস" যদি ঠিক হয়ে যায় "তাহলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে"।

এটা একটা ঘোর (ডিলুশন)।

যখন "ওই একটা জিনিস" ঠিক হবে, তখন "আরো একটা" জিনিস আপনার জীবনে বাকি থেকে যাবে। জীবনে কখনো সবকিছু একসাথে আপনার কাছে ধরা দিবেনা। আমি খুব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি জীবনে সুখী হওয়া শুধু একটা জিনিস ঠিক হয়ে যাওয়ার উপর নির্ভর করেনা, এভাবে সুখী হওয়াও যায়না। এরচেয়ে এই মুহুর্তে আপনার যা আছে তা নিয়ে সুখী হোন, বর্তমানকে উপভোগ করুন, এবং একইসাথে ভবিষ্যতের জন্যে জন্যে কাজ করে যান। সাফল্য আসলে একটা ভ্রমন, গন্তব্য নয়!

আপনার জীবনের একটা বড় অংশ যদি একটা বড় কিছুর জন্যে কাজ করে চলে যায় তাহলে সে কাজটি হয়ে যাওয়ার পর আপনার জীবনে আর তেমন কিছুই থাকবেনা। কোনো বড় কিছুর জন্যে কাজ করলেও নিজেকে সুখী হওয়া থেকে বঞ্চিত করবেন না, কাজটি শেষ হওয়া পর্যন্ত সুখী হওয়ার জন্যে অপেক্ষা করে থাকবেন না, কাজ করতে করতেই সুখী হওয়ার চেষ্টা করুন।

ধীরে ধীরে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করুন এবং এই ভ্রমন উপভোগ করুন।

অনুষ্টানটি উপভোগ করুন, শেষ দৃশ্যের জন্যে তাড়াহূড়ো করবেন না।

আমাদের জীবন হচ্ছে এখন - অতীত এবং ভবিষ্যত কোনোটাই না।

৩। "একদিন আমার সময় আসবে আর আমি সুখী হবো" - এটা একটা ফালতু চিন্তা। আপনি কখনোই লটারি জিতবেন না। বাস্তববাদী হোন।

অনেকের ভাগ্য নিয়ে একটা অদ্ভুত ধারণা আছে - আল্লাহ/ঈশ্বর/ভগবান/দেবতা কেউ একদিন কোনোভাবে তাদের ভাগ্য ঘুরিয়ে দিবেন। তারা ভাবেন তারা "সৌভাগ্য পাবার যোগ্য" এবং "একদিন সব এমনি এমনি ঠিক হয়ে যাবে" তাদের জন্যে। কেউ কেউ ভাবেন একদিন তারা লটারি জিতবেন কিংবা ভালো কিছু একটা ঘটবে তাদের জীবনে। অনেক মেয়ে ভাবে একদিন তার রাজপুত্র এসে তাকে নিয়ে যাবে স্বপ্নের দেশে!

এই ধরণের ভাবনা আসে পৃথিবী কীভাবে কাজ করে সেটা সম্পর্কে একটা ভুল ধারণা থেকে। হতে পারে আমি ভুল, হয়তো প্রার্থনা বা আশা থেকে ভালো কিছু ঘটতে পারে, হয়তোবা মানুষ হিসেবে ভালো হয়ে থাকতে পারলে একসময় ভালো কিছু ঘটতে পারে। কিন্তু আশা, প্রার্থনা, এবং ভালো হওয়ার পাশাপাশি কঠোর পরিশ্রম করে চাওয়ার জিনিসটাকে অর্জন করার চেষ্টা করে যেতে দোষ কোথায়?

আমি ব্যক্তিগতভাবে জাদু, জ্বীন-পরী, জ্যোতিষবিদ্যা, কিংবা কোনো অদৃশ্য সত্ত্বায় বিশ্বাস করিনা । এগুলোর ব্যাপারে আমি সন্দিহান এবং আমি বিশ্বাস করি এগুলো সবকিছু অসম্ভব এবং হাস্যকর। এইসব অদৃশ্যে বিশ্বাস না করাটা আমার জীবনকে অনেক সমৃদ্ধ করেছে। একজন বাস্তববাদী মানুষ হিসেবে পৃথিবীকে আমি খুব যুক্তির জায়গা হিসেবে দেখি যেখানে প্রকৃতির তৈরি বৈজ্ঞানিক নিয়ম এবং মানুষের তৈরি সামাজিক নিয়ম অনুসারে সবকিছু চলে। এবং পৃথিবীকে এভাবে দেখার কারণে আমি অনেক সহজভাবে সবকিছু দেখতে পারি।

এই বিশ্বজগত আপনাকে কিছু দেবার জন্যে পণ করে বসে নেই। আপনাকেই আপনার জীবন গুছিয়ে তোলার জন্যে কাজ করে যেতে হবে।

৪। নিয়তি বলে কিছু নাই, এবং এটা একটা সুখবর!

নিয়তি'র দোহাই দিয়ে আমরা অনেকেই জীবনে ভালো কিছু করা থেকে বিরত থাকি। আসল ঘটনা হচ্ছে নিয়তি বলে কিছু নাই

আপনার ব্যর্থতা কিংবা সীমাবদ্ধতা আপনার জন্ম কোথায় হয়েছে সেটার উপর নির্ভর করেনা, কিংবা আপনি কাকে চিনেন, আপনার জিন কেমন, আপনার কতো টাকা আছে, আপনার বয়স, আপনার অতীত, বা অন্য কোনো কিছুর সাথেই এর কোনো সম্পর্ক নাই। কোনো কিছুর দোহাই দিয়ে আপনার সীমাবদ্ধতাকে আপনি জাস্টিফাই করতে পারবেননা।

যদি সত্যিকারভাবে সংকল্পবদ্ধ হন, তাহলে জীবনে অর্জন করার অজস্র সুযোগ আছে - আপনি কে কিংবা আপনার কাছে কতো টাকা আছে এটা কোনো ব্যাপারই না।

৫। আপনার থেকে ভিন্ন বিশ্বাস ও মতের মানুষের সাথে কথা বলুন এবং তাদের বক্তব্য বোঝার চেষ্টা করুন

আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সাথে পৃথিবীর অনেক মানুষের বিশ্বাসের কোনো মিল নাই। কিন্তু মানুষ এই ভিন্ন বিশ্বাসে থেকেও জীবনের তাৎপর্য খুঁজে পায়। যদি সবাই আমার মতো বিশ্বাস করতো এবং ভাবতো তাহলে পৃথিবীটা একটা রসকষহীন জায়গায় পরিণত হতো।

অতএব আমি যখন আমার থেক ভিন্ন বিশ্বাসের কোনো মানুষের সাথে মিশি, তখন তাদেরকে আমার বিশ্বাসে নিয়ে আসার চেয়ে তাদের বিশ্বাস তাদের কাছে রেখে একসাথে মিলে চলার চেষ্টা করাই ভালো।

কেউ যখন তার কোনো বিশ্বাস এর ব্যাপারে "১০০% নিশ্চিত" এবং বহু বছর ধরে সেই বিশ্বাস ধারণ করে আসছে, তখন তাকে কিছু চালাকী কথাবার্তার মাধ্যমে তার বিশ্বাস থেকে সরানো যায় না। সবাই কিছু কিছু ব্যাপারে বদ্ধ মনের মানুষ, আমি নিজেও তাই

কেউ যদি নিজে নিজের বদ্ধ মন থেকে বের হতে না পারে তাহলে তাকে সেটাই বিশ্বাস করতে দেওয়া উচিত। আপনিই ঠিক আর অন্যরা ভুল - পৃথিবীকে এটা বোঝানোর দায়িত্ব নেওয়ার দরকার নাই। কখনো কখনো হয়তো আপনার বিশ্বাসটিই ভুল!

পৃথিবী আরো অনেক বেশি মজার জায়গা হয় যখন সেখানে বিভিন্ন বিশ্বাসের এবং আগ্রহের মানুষ থাকে। আমার নিজের সন্দেহবাদীতা সত্ত্বেও আমি অনেক জ্যোতিষী, হস্তরেখা বিশারদ, অত্যন্ত ধার্মিক মানুষ, রক্ষণশীল মানুষ, এবং প্রযুক্তিকে ঘৃনা করে এমন অনেক মানুষের সাথে মিশেছি। এবং সেজন্যে আমার জীবন অনেক বেশী বৈচিত্রময় এবং সমৃদ্ধ হয়েছে।

আপনি যদি শুধুমাত্র যারা আপনার সব কথায় হ্যাঁ বলে এমন মানুষদের সাথে মিশেন তাহলে আপনি কখনো ভুল করছেন কিনা এটা জানার সুযোগ পাবেন না এবং নতুন জিনিস শিখতেও পারবেন না।

পরবর্তী পর্ব

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29436471 http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29436471 2011-08-22 07:53:25
আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম? মৃত্যু উপত্যকা

প্রতিভাবান চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ এবং এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী মিশুক মুনীরের দূর্ঘটনায় অকালমৃত্যু আমাদের সবার হৃদয় ভেঙ্গে দিয়েছে। এটা এমন এক ক্ষতি আমাদের জাতির জন্যে যেটা সহজে পূরণ হবার নয়। এমনিতেই আমাদের চলচ্চিত্রের যাচ্ছেতাই অবস্থা, এর মধ্যে একজন চরম প্রতিভাবান নির্মাতাকে হারানো মানে আসলে আমাদের চলচ্চিত্রের আরো অনেকখানি পিছিয়ে যাওয়া।

সড়ক দূর্ঘটনা বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। কিছুদিন আগেও আমাদের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক ঢাকা থেকে সিলেট যাওয়ার পথে বাসে বাসে সংঘর্ষের পর অল্পের জন্যে বেঁচে গেলেন, যদিও সেই দূর্ঘটনায় ছয়জন হতভাগা মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলো।

নৌপথেও আমাদের দেশে প্রায়ই লঞ্চডুবি হয়। বছর বছর শত শত মানুষ মারা যায় তাতে।

কয়দিন পরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে গণপিটুনিতে রাস্তায় পড়ে মরে থাকে কিশোরের মৃতদেহ। ইট, রড দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলে রাখি তরুণদের, যে আমাদেরই কারো না কারো স্বজন, পরিচিত জন।

আমাদের র‍্যাব-পুলিশ তো মানুষ মারাকে কৌতুকের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। রাত তিনটার সময় র‍্যাবের গাড়ি থেকে পালাতে যেয়ে গুলি খেয়ে মরে যায় কোনো তরুন, তার মৃতদেহের পাশে পড়ে থাকে কোনো দেশীয় অস্ত্র! বিচার বিভাগ নামে যে একটা প্রতিষ্ঠান আছে সেটা মনে হয় আমাদের র‍্যাব-পুলিশের লোকজন কোনোভাবেই মানতে রাজী নন।

২। এ মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়!

তারেক মাসুদের মৃত্যুর পর খবরের কাগজে, ফেইসবুক, টুইটার, ব্লগে মানুষের হাহাকার উঠেছে। সবারই মোটামুটি এক কথা – এ মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়! এ কোন দেশে আছি আমরা, আমাদের কি সরকার নেই? আমরা কি আফ্রিকার কোন যুদ্ধপীড়িত দেশ? এই লাশের মিছিল থামানোর দায়িত্ব কি কারো নয়?

৩। অযোগ্য রাজনীতিবিদ-আমলা-পুলিশ

রাজনীতিবিদরা আমাদের দেশের চিরকালীন ভিলেন। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে? বানিজ্যমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের সাথে যোগসাজশ করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। সড়ক দূর্ঘটনায় কেউ মারা গেছে? যোগাযোগ মন্ত্রী করেটা কী? জঙ্গিরা বোমা ফাটিয়েছে? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী নিজের দলের উপকার ছাড়া আর কোনো কাজে আগ্রহী না। শেয়ার বাজার পড়ে গেছে? অর্থ মন্ত্রী নিজেই এই চক্রের সাথে জড়িত!

হয়তো ব্যাপারটি সত্যি। আমাদের রাজনীতিবিদদের অদক্ষতা এবং অসততা আমরা আমাদের সামনেই দেখে চলেছি।

রাজনীতিবদদের সাথে আমাদের ভিলেনের তালিকায় আছে দুর্নীতিপরায়ণ এবং অদক্ষ আমলা এবং পুলিশ বাহিনী। রাজনীতিবিদদের সাথে তাল মিলিয়ে এই মানুষগুলোর কর্মকান্ডও দিন দিন আমাদের কষ্টের এবং দেশকে নিয়ে দেখা স্বপ্ন ভঙ্গের পেছনে অনেক অবদান রাখছে।

৪। অযোগ্য আরো অনেকে

শুধু কি রাজনীতিবিদ, আমলা, পুলিশ নিয়ে আমাদের অভিযোগ?

- আমাদের শিক্ষকদের নিয়েও আমাদের অনেক হতাশা, তারা দিনের পর দিন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা বাদ দিয়ে রাজনীতি করে চলেছেন।
- হতাশা আমাদের ক্রিকেট খেলোয়াড়দের নিয়ে যারা আমাদের আশা অনেক উচ্চতায় নিয়ে গিয়ে বারবার নিরাশ করছে। ফুটবল খেলোয়াড়দের নিয়ে আমাদের হতাশা তো এমন পর্যায়ে যে আমাদের আর কোনো আশাই নাই ওদের নিয়ে।
-আমাদের বিজ্ঞানীরা খুব কমই গর্ব করার মতো কিছু আবিষ্কার করতে পেরেছেন এখন পর্যন্ত।
- আমাদের চলচ্চিত্র এমন পর্যায়ে যে আমাদের মধবিত্ত, উচ্চবিত্ত সমাজ চলচ্চিত্র প্রায় বর্জন করে চলেছেন।
- আন্তর্জাতিক কোনো ক্রীড়া প্রতযোগিতায় আমাদের কখনো তেমন কোনো সাফল্য নাই।
- বিজ্ঞান-প্রকৌশলে আমাদের কোনো বড় অর্জন নাই। আমাদের বড় বড় ব্রিজ, বিল্ডিং ইত্যাদি এখনো বিদেশী প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি হয়।
- আমাদের বাস-ট্রাক ড্রাইভাররা খেয়াল খুশি মতো গাড়ি চালায় আর মানুষ মারে?

এই লিস্ট এর অন্ত নেই। মনের সুখে যোগ করুন আপনার অভিযোগটি।

এবং এর প্রতিটির জন্যে আমরা নিয়ম করে বকাঝকা, গালাগাল করে যাচ্ছি অদক্ষ, অযোগ্য মানুষগুলোকে। আমাদের ক্রিকেট খেলোয়াড়দের যে কী পরিমান গালি খেতে হয় সেটা ফেইসবুক, ব্লগিং না থাকলে মনে হয় আমার জানা হতো না!

৫। আমি ছাড়া আর সবাই খারাপ, অযোগ্য?

এই যে চারদিকে এতো খারাপ মানুষ, অযোগ্য মানুষের দল এরা কোথাকার মানুষ, কোন দেশের মানুষ?

এরাই কি “আমরা” নয়? এরা কি আমাদের পরিবার, স্বজন, বন্ধু, পরিচিত কেউ নয়?

আয়নার সামনে দাঁড়ালে যে মানুষটাকে দেখা যায় সে কতোটুকু ভালো? কতটুকু যোগ্য?

নিজের ভালোত্ব বাড়ানোর জন্যে জীবনে কী করেছি? দক্ষতা, যোগ্যতা বাড়ানোর জন্যে কী করেছি? দেশের ভালোর জন্যে কী করেছি? নাকি নিজেকে অযোগ্য রেখে দিয়ে দেশকে আশা করেছি যোগ্য হতে? দেশ কি পনের কোটি মানুষের বাইরের কিছু? পনের কোটি মানুষ যদি যোগ্য হয়ে না উঠে, তাহলে দেশ কিভাবে যোগ্য হবে?

৬। এই মৃত্য উপত্যকা আসলে আমি, আপনি, এবং আমাদের আগের প্রজন্মের তৈরি!

কিশোর এবং তরুণ বয়সে আমার প্রধান দায়িত্ব ছিল পড়ালেখা। এর সাথে খেলাধুলা আর কিছু সাংস্কৃতিক কাজে জড়িত হওয়া। আমি এর কোনোটাই ভালোভাবে করতে পারিনি। আমি বন্ধুদের সাথে আড্ডা মেরে মেরে আলসেমী করে আমার সময় নষ্ট করেছি। সেজন্যেই আজ আমার কাজে দক্ষতা আন্তর্জাতিক মানের না। আমাদের দেশ যে পিছিয়ে আছে অন্য অনেক দেশ থেকে সে ব্যাপারে আমি অবদান রাখছি।

আমার ধারণা একই কথা আপনার ক্ষেত্রেও সত্যি। সেটা না হলে আপনার প্রতি আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা। আপনি এখন আমাদের দেশের জন্যে কিছু করুন এবং আমাদেরকেও পথ দেখান।

আমাদের চেয়ে বড় দোষ আমাদের আগের প্রজন্মের। আমাদের বাবা-মা’র। আমি দুঃখিত আপনার অনুভুতিতে আঘাত লাগলে, কিন্তু আমাদের আগের প্রজন্ম আমাদেরকে একটা জঘন্য বাংলাদেশ উপহার দিয়েছেন।

তারা আমাদের একটা স্বাধীন বাংলাদেশ দিয়েছে সত্যি (সেজন্যে তাদের কাছে সীমাহীন কৃতজ্ঞতা), কিন্তু তারা আমাদের উপহার দিয়েছেন একটা দুর্নীতিতে শ্রেষ্ট দেশ। দেশের প্রতি মায়া-মমতাহীন একদল রাজনীতিবিদ। ছাত্র রাজনীতি নামক ভয়াবহ সন্ত্রাসী এবং পশ্চাদপদ একটা ব্যবস্থা যেটা আমাদের সমাজকে, দেশকে তিলতিল করে ধ্বংস করে দিচ্ছে।

তারা আমাদের মানুষ করার দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করতে পারেন নি। যখনি আমি একটা অযোগ্য বালক-বালিকা কিংবা কিশোর-কিশোরী দেখি, তখনি আমার সেই বালক-বালিকা কিংবা কিশোর-কিশোরীর বাবা-মা’র প্রতি এক ধরনের রাগ কাজ করে। বাবা-মা চাইলে সন্তানদের সঠিকভাবে বড় করে তোলা খুব কঠিন কিছু না। আমাদের সীমিত সম্পদ, কিন্তু এটা দিয়েই আমাদের শুরু করতে হবে। কোনো দেশই প্রথমের উন্নত হয়ে শুরু করেনি!

এই অযোগ্য আমি, আপনি, আর আমাদের আগের প্রজন্ম থেকে তৈরি হয়েছে আমাদের রাজনীতিবিদগন, আমাদের ক্রিকেট খেলোয়াড়রা, আমাদের ফুটবলাররা, চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকারা, ঘাতক বাস ড্রাইভার, খুনী র‍্যাব-পুলিশ।

৭। পরিবর্তন শুরু হতে হবে নিজের থেকে

যে দেশের স্বপ্ন দেখি আমরা (এবং প্রতিনিয়ত সেই স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনায় ভুগি) সে দেশ পেতে হলে আগে নিজেকে ভালো, যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে।

পনের কোটি মানুষের বেশির ভাগ মানুষ যেদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে বলতে পারবে “আমি সত্যিকারভাবে একজন ভালো মানুষ, যোগ্য মানুষ, অন্তত পক্ষে সেরকম হওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি” সেদিন শুধুমাত্র আমরা আমাদের স্বপ্নের দেশ পাবো। তার আগ পর্যন্ত কেবল “নিজে ভালো, অন্যরা খারাপ” বলে গলা ফাটিয়ে যাবো, কিংবা বিভিন্ন উন্নত দেশের এম্ব্যাসিতে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে কোনোমতে এই মৃত্যু উপত্যকা থেকে পালানোর চেষ্টা করে যাবো।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29434774 http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29434774 2011-08-19 08:58:38
সমালোচনা এলবার্ট হাবার্ড একটা দুর্দান্ত উদ্ধৃতি পড়লামঃ "To avoid criticism do nothing, say nothing, be nothing". অর্থ্যাৎ, সমালোচনা এড়াতে চাইলে কিছু করো না, বলো না, হয়ো না। যার জীবনে কোনো অর্জন নেই, যে পৃথিবী ধ্বংস হলো কি গড়লো এটা নিয়ে মাথা ঘামায়না তাকে নিয়ে কেউ সমালোচনা করার তেমন কিছু খুঁজে পায়না। যখনি আপনি কিছু করতে যাবেন, কিছু একটা বলতে যাবেন, কিছু একটা হতে যাবেন, পৃথিবী দুইভাগ হয়ে যাবে। একদল আপনাকে প্রশংসা করবে, আপনি আরো এগিয়ে যান সেই কামনা করবে, আর আরেকদল আপনার মুন্ডুপাত করবে। জীবনের বাস্তবতায় স্বাগতম!

পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষটির বিরুদ্ধেও অনেক সমালোচনা হয়। সত্যিকথা বলতে কি, "সবচেয়ে ভালো মানুষ" নামে কিছুর আসলে অস্তিত্ব নেই। আপনার কাছে যিনি অনেক ভালো মানুষ, অনেক শ্রদ্ধার পাত্র, অন্যের কাছে তিনি হয়তো ততোটাই বাজে লোক।

আমরা মানুষেরা আমাদের পরিবেশের দ্বারা তৈরি। আমরা যে পরিবেশে বড় হয়েছি, আমাদের বাবা-মা আমাদের যে শিক্ষা আর মূল্যবোধ শিখিয়েছেন, আমাদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা যা শিখেছি, চারদিকের পরিচিত আত্মীয়-স্বজন-বন্ধুবান্ধব থেকে আমরা যে জ্ঞ্যান লাভ করেছি, বই-পত্র-টেলিভিশন-সিনেমা ইত্যাদি থেকে আমরা সংস্কৃতি-চেতনা শিখছি, সেসব ব্যবহার করে আমরা আমাদের চারপাশকে বিচার করি, মূল্যায়ন করি। এবং প্রত্যেক মানুষের বড় হয়ে উঠা, শিক্ষার বিষয়বস্তু একে অন্যের চেয়ে ভিন্ন। ফেইসবুক, টুইটারের কল্যানে মানুষের "সামাজিক গ্রাফ " দেখা যায় এখন। এই সামাজিক গ্রাফ থেকেই মানুষ তার বিচার-বিবেচনা তৈরি করে, পৃথিবীকে দেখার লেন্স বানায়।

আমি অনেক মেধাবী এবং গুনী মানুষকে চিনি যারা শুধু উটকো সমালোচনার ভয়ে নিজের নিরাপদ বলয়ের বাইরে বের হননা। "কী দরকার ঝামেলা বাড়িয়ে, ভালোই তো আছি" - এটা হচ্ছে তাদের চিন্তা। এবং তাদেরকে দোষ দিয়ে কোনো লাভ নেই। যোগাযোগ মাধ্যমের উন্নতির সাথে সাথে আমাদের সমালোচনার বারুদও অনেক তাড়াতাড়ি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আপনি হয়তো কোনো গ্রামের ছেলেমেয়েদের জন্যে একটা স্কুল করে দিলেন। দুইটা পত্রিকায় আপনাকে নিয়ে বিশাল প্রশংসাসূচক লেখা ছাপা হতে না হতেই অন্য তিনটা পত্রিকায় আপনার নামে যাবতীয় কুৎসা ছড়ানো হবে। পুঁজিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী, কর্পোরেট শক্তির ইন্ধনে আপনি যে স্কুলের নাম করে তলে তলে বিশাল ষড়যন্ত্র করে বসে আছেন সেটা নিয়ে অনেক কেচ্ছা কাহিনী ছাপানো হবে। অথচ আপনি শুধু ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার একটা ব্যবস্থা করতে চেয়েছেন, এই যা।

আমি যখন প্রথম বিদেশে পড়তে আসি তখন এখানকার একজন বাংলাদেশী অধ্যাপক আমাকে বলেছিলেন বাংলাদেশে একজন মানুষের ক্ষতি করা অনেক সহজ কিন্তু কারো উপকার করা অনেক ঝামেলার ব্যাপার। তাঁর কথাটি ভালো করে বুঝিনি তখন। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি কেনো তিনি ওরকম একটি কথা বলেছিলেন। আমরা বাংলাদেশের মানুষেরা চারদিকের নেগেটিভ জিনিসে এতোটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে এখন আর মানুষের ভালোত্বে বিশ্বাস করি না সহজে। কেউ যে বিনা কারণে ভালো হতে পারে, স্বার্থহীন হতে পারে এটা বিশ্বাস করতে আমাদের কষ্ট হয়।

আমি সবসময় যে উপমাটার কথা ভাবি আমাদের বিচার-বিবেচনা নিয়ে সেটা হলোঃ আমরা আমাদের চারপাশকে হয় গাফফার চৌধুরী কিংবা শফিক রেহমানের দৃষ্টিতে দেখি। এই দুইজন মেধাবী মানুষ বিএনপি এবং আওয়ামীলীগের আইকন সমর্থক। "সূর্য পূর্বদিকে উঠে" এটা নিয়ে রচনা লিখতে দিলে এরা খুব সুন্দর করে প্রমান করতে পারবে সূর্য পূর্বদিকে উঠাটা কিভাবে হাসিনার/খালেদার কৃতিত্ব কিংবা আওয়ামীলীগ/বিএনপির ষড়যন্ত্র। কোনো কিছু সাদাকালো চোখে দেখার ক্ষমতা এরা হারিয়ে ফেলেছেন। স্পেইডকে স্পেইড বলার ক্ষমতা আর এদের নাই। সব দেখেশুনে মনে হচ্ছে আমাদেরও সবসময় একটা পক্ষ নিয়েই পৃথিবীটাকে দেখতে হবে। হয় আওয়ামীলীগ, না হয় বিএনপি, না হয় জামাত, না হয় সমাজতন্ত্র।

আমাদের একদল ডক্টর ইউনুসকে শ্রদ্ধা করি, বিশ্বাস করি তিনি মানুষের ভালো করতে চান। ভালো করতে পারছেন কিনা সেটা নিয়ে আলোচনা হতে পারে, কিন্তু তাঁর উদ্দেশ্য মহৎ সেটা আমরা বিশ্বাস করি। আবার আরেকদল বিশ্বাস করি তিনি পুঁজিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী, কর্পোরেটবাদী, সামন্ততান্ত্রিক বিশ্ব মোড়লদের প্রতিনিধি। তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে দারিদ্র্য দূর করার নামে মানুষের টাকা হাতিয়ে নেয়া এবং সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বের কাছে পাচার করা। আমাদের একদল মানুষ জাফর ইকবাল স্যারের নামে পাগল, আবার আরেকদল তাঁকে ইসলাম এর শত্রু, আওয়ামীলীগের দালাল মনে করে। অনেকে প্রথম আলোকে একটা সৎ পত্রিকা মনে করি, অন্তত সৎ থাকার চেষ্টা করে বলে মনে করি। আরেকদল ভাবি প্রথম আলো সেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির তাঁবেদার। একইভাবে বড় বড় বহুজাতিক কম্পানীগুলোকে আমরা মনে করি শয়তানের দোসর, তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদের গরীব মানুষদেরকএ শোষণ করে সব টাকা বিদেশে পাচার করা।

আমাদের অনেকের রাতের ঘুম হারাম হয় আমেরিকা, ভারত এবং অন্যদের চক্রান্তের কথা ভেবে ভেবে। আজকে আমেরিকা যে এতো উন্নত হয়ে উঠেছে এটা নিশ্চয়ই বাংলাদেশের সব টাকা শোষণ করে হয়েছে। এবং অন্যান্য গরীব দেশেরও। আচ্ছা আমেরিকা না হয় বিশ্ব মোড়ল। সুইজারল্যান্ড এর কথা ধরি। কিংবা ফিনল্যান্ড। অথবা নিউজিল্যান্ড। এরা এতো উন্নত হয়েছে কোন দেশকে শোষণ করে? কখনোতো শুনিনি এই দেশগুলো অন্যে দেশকে মিয়ে মাথা ঘামাতে। কাউকে শোষণ না করে যে শুধুমাত্র একটা চমৎকার গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা, মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা আর বিশ্বাস, মানুষের ভালো কামনা করে যে উন্নত হওয়া যায় সেটা তো আমেরিকা আর ইংল্যান্ড কে বাদ দিয়ে বাদবাকী উন্নত দেশগুলোর দিইকে তাকালেই বুঝা যায়। জীবন যে কতো সুন্দর হতে পারে, জীবন-যাপন যে কতো আরামদায়ক হতে পারে আধুনিক সভ্যতার কল্যানে সেটা এসব উন্নত দেশে গেলে বুঝা যায়। আমরা কবে ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত নিয়ে বেহুদা চিন্তাভাবনা বাদ দিয়ে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশটাকে সেরকম উন্নত করতে পারবো?

আমরা কেনো উন্নত হতে পারছিনা? আমাদের কেনো মনে হয় চারদিকের সবাই খারাপ, সবাই ষড়যন্ত্রকারী, চক্রান্তকারী? আমি আমার সাম্প্রতিক একটা লেখায় বলেছিলামঃ

"যেসব মানুষের নিজের উপর শ্রদ্ধা কম তারা বেশি (কু)সংস্কারে ভোগে। অর্থাৎ যেসব মানুষ আসলে নিজের যোগ্যতা নিয়ে খুশি নয়, নিজের উপর নিজের খুব বেশি শ্রদ্ধা নাই, আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভোগে, তারা সাধারণত মানুষকে নিয়ে বেশি নেগেটিভ কথা বলে। অন্যের ভালো কিছু দেখলে তারা সহজে খুশি হতে পারেনা, তাদের প্রথম চিন্তাটি হয় নেগেটিভ। মানুষকে সহজে বিশ্বাস করতে পারেনা এরা।"

আমরা যদি বিশ্বাস করি ইউনুস খারাপ তাহলে কেনো আমরা নিজেরা একটা নতুন মডেলের প্রতিষ্ঠান গড়ে ভালো কাজটি করে দেখাইনা? প্রথম আলো খারাপ; ঠিক আছে, তাহলে ভালো পত্রিকা কোনটি? একটাও না? আপনি নিজে একটা পত্রিকা বানিয়ে দেখিয়ে দিন ভালো পত্রিকা কেমন হতে পারে। ফোন কম্পানীগুলো খারাপ? দেশের গরীব মানুষের টাকা চুষে বিদেশে নিয়ে যাচ্ছে? চলেন আমরা নতুন একটা ফোন কম্পানী বানাই। কিংবা আমাদের সরকারকে চাপ দেই যাতে এমন আইন তৈরি করে যেটা দিয়ে মানুষের স্বার্থ রক্ষা হবে আরো ভালো করে। হাজার হোক সরকার তো আমাদের, ওরা তো আর বিদেশী শক্তি নয়।

দুঃখজনকভাবে একই কথা খাটে আমাদের রাজনীতির ক্ষেত্রেও। আমরা সবাই (এই লেখকসহ) রাজনীতিবিদদের ঢালাও সমালোচনা করি, কিন্তু আমরা কেউই নিজেরা রাজনীতিতে জড়াতে চাইনা। হাসিনা-খালেদার হাজার দোষত্রুটি সত্ত্বেও ওরাই কিন্তু রাজনীতি নামের কষ্টকর পেশাটি করে যাচ্ছে, এবং আশ্চর্যজনকভাবে বাংলাদেশের জন্যে মোটামুটি সন্তোষজনক একটা জিডিপি বৃদ্ধির হার বজায় রেখেছে গতো দুই দশক ধরে। আমরা আমাদের মেধাবী ছেলেমেয়েদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অর্থনীতিবিদ বানাতে চাই, কিন্তু রাজনীতিবিদ বানাতে চাইনা। মেধাবী ছেলেমেয়েরা যদি রাজনীতিতে না যায়, তাহলে ছাত্রদল-ছাত্রলীগের ছাত্ররাজনীতিবিদ নামের অর্ধশিক্ষিত ছাত্ররা রাজনীতিতে যেয়ে দেশের ভবিষ্যতের আরো বারোটা বাজাবে। আমি জানি রাজনীতিতে যোগ দেওয়া অনেক কঠিন, বর্তমান রাজনীতিবিদ এবং ছাত্ররাজনীতির গুন্ডারা এটাকে আরো কঠিন করে রেখেছে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের জন্যে। কিন্তু তাই বলে তো বসে থাকলে চলবেনা, একটা না একটা পথ বের করতেই হবে এটাকে সংশোধনের জন্যে। রাজনীতির বাইরে থেকে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করে যেতে হবে এই ট্রেন্ড পরিবর্তন করার।

যেটা দিয়ে শুরু করেছিলাম। পৃথিবীতে "নিখুঁত" বলে কিছু নেই। মানুষও নিখুঁত হতে পারেনা। পরম শদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সাইদ স্যারকে নিয়েও কতো বাজে কথা শুনেছি। এবং এটা হবেই। এর একটা ভালো দিক হচ্ছে সমালোচনা আমাদেরকে, আমাদের কাজকে আরো শুদ্ধ করে। "নিখুঁতত্ত্ব" এর দিকে কয়েক ধাপ এগিয়ে যাওয়া যায় সমালোচনার মাধ্যমে। যতোদিন মানুষ থাকবে ততোদিন মানুষের ভিন্ন মত থাকবে। ঘটনাক্রমে এটা গণতন্ত্র নামক শাসন ব্যাবস্থার সৌন্দর্য্য! পৃথিবীর সব উন্নত দেশগুলোতে যে কার্যকর একটা গণতন্ত্র আছে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই!

যারা সমালোচনার ভয়ে বসে না থেকে নিজের মনের কথা বলে ফেলে, দেশের জন্যে কিছু একটা করার চেষ্টা করে ফেলে, নিজে কিছু একটা হতে চেষ্টা করে তাদের নিয়ে প্রয়াত আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট একটা যুগান্তকারী কথা বলেছিলেনঃ

"It's not the critic who counts, not the man who points out how the strong man stumbled, or when the doer of deeds could have done better. The credit belongs to the man who is actually in the arena; whose face is marred by dust and sweat and blood; who strives valiantly; who errs and comes short again and again; who knows the great enthusiasms, the great devotions and spends himself in a worth cause; who at the best, knows in the end the triumph of high achievement; and who at the worst if he fails, at least fails while daring greatly, so that his place shall never be with those cold and timid souls who know neither victory nor defeat।"

অনুবাদঃ

যারা সমালোচনা করছে তারা গুরুত্মপূর্ণ না। যারা আঙ্গুল উঁচু করে দেখিয়ে দিচ্ছে শক্ত মানুষটি কিভাবে হোঁচট খাচ্ছে তারাও গুরুত্মপূর্ণ না। যারা বাইরে থেকে উপদেশ দিয়ে বেড়াচ্ছে কিভাবে কাজটা আরো ভালোভাবে করা যেতো ওরাও গুরুত্মপূর্ণ না। সব কৃতিত্ব হচ্ছে তাঁর যিনি আসলে সত্যিকার মাঠে নেমে যুদ্ধ করছেন। যাঁর মুখ এবং দেহ ধূলা, ঘামে, এবং রক্তে রঞ্জিত। যিনি জীবন দিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। যিনি বারবার ভুল করছেন এবং জয়ের একেবারে শেষ মাথায় এসে পৌঁছাচ্ছেন। যিনি চরম উৎসাহ, আগ্রহ, সাধনা নিয়ে নিজেকে একটা অর্থপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করেছেন। যিনি বিজয়ী হওয়ার কৃতিত্বের কথা জানেন, কিংবা যদি জয়ী হতে নাও পারেন, অন্ততপক্ষে বীরের মতো চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। অতএব, তাঁর স্থান কখনোই সেইসব ভীরু এবং দূর্বল মানুষের সাথে হবেনা যারা জয় কিংবা পরাজয় কোনোটার স্বাদ কখনো পায়নি।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29344027 http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29344027 2011-03-14 02:21:37
আমাদের নেগেটিভ আবেগগুলো

আমরা বাংলাদেশীরা মানুষের প্রশংসা করতে জানিনা। এতো ঢালাওভাবে হয়তো বলা ঠিকনা, কিন্তু আমাদের এতো বড় একটা অংশ এই সমস্যায় ভোগে যে মোটামুটিভাবে বলা যায় আমরা বাংলাদেশীরা মানুষের প্রশংসা করতে পারিনা।

এই ব্যাপারটা আমি সবসময় খেয়াল করে এসেছি, কিন্তু এটা আরো বেশি করে আমার মাথায় এসেছে ডক্টর ইউনুসকে আওয়ামীলীগ সরকারের হেনস্থা করার পর।

সারা পৃথিবীতে যদি একজন বাংলাদেশীর জন্যে মানুষ আমাদেরকে চেনে, আমাদের সুনাম করে, তবে সেই মানুষটি হচ্ছে ডক্টর ইউনুস। দুর্নীতি, দারিদ্র্য এবং ধর্মের নামে জঙ্গীপনার কারণে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশের মর্যাদা খুব বেশি একটা কখনো ছিলো না, কিন্তু ডক্টর ইউনুস প্রায় এককভাবে সেই মর্যাদা অনেকটা ফিরিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশকে। কিন্তু আওয়ামীলীগ এর রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কোপানলে পড়ে সেই মানুষটিকে এতোটা হেনস্থা হতে হবে সেটা কখনো আমি ভাবিনি।

তো ডক্টর ইউনুস এর সাথে বাংলাদেশের মানুষের অন্যকে প্রশংসা করতে না পারার সম্পর্ক কী?

ডক্টর ইউনুসকে দিয়েই শুরু করি। এমনকি হাসিনা সরকার তাঁকে হেনস্থা শুরু করার আগেও তাঁকে নিয়ে আমরা নানারকম সমালোচনা করতাম। তাঁর নোবেল পুরষ্কারকে নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছি অনেকে। অনেকেই বলেছিলো নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার মতো কোনো কাজ তিনি করেন নাই, আমেরিকা এবং পুঁজিবাদী পশ্চিমা দেশগুলো ষড়যন্ত্র করে তাঁকে এই পুরষ্কার দিয়েছে। আমরা সবসময় সবকিছু নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করি, সবকিছুতে ষড়যন্ত্র দেখি। গরীব দেশগুলো থেকে কেউ নোবেল না পেলে বলি আমেরিকা এবং পশ্চিমা বিশ্ব ষড়যন্ত্র করে সব নোবেল নিজেরা নিয়ে যায়। আবার আমাদের কেউ পেলে বলি সেটাও একটা ষড়যন্ত্রের একটা অংশ!

ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়েছে কেউ ডানে গেলে আমরা ভাবি কেনো সে ডানে গেলো বামে যায় নাই, আবার সে বামে গেলে সাথে সাথেই ভাবি কেনো সে ডানে না যেয়ে বামে গেলো, নিশ্চয়ই তার কোনো মতলব আছে!

ধরুন কেউ একটা নতুন গাড়ি কিনলো। আমাদের ততক্ষনাৎ প্রতিক্রিয়া কী হবে? মোটামুটি সবাই সাথে সাথে ভাববো "ব্যাটা অনেক দুই নাম্বারি টাকা কামাইছে, সেই অসৎ টাকা দিয়ে গাড়ি কিনছে", কিংবা "গাড়ি কিনছে লোক দেখানোর জন্যে", "মানুষ ভাত খাইতে ভাত পায়না আর উনি গাড়ি কিনছেন", ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ ভদ্রলোক হয়তো কিছু টাকা জমিয়ে চলাফেরার সুবিধার জন্যে গাড়িটা কিনেছেন, এই যা।

কেউ হয়তো একটা বড়ো বেতনের চাকরি পেয়েছে, কিংবা চাকরিতে প্রমোশন পেয়েছে, আমাদের প্রথম প্রতিক্রিয়া হয় "ব্যাটা একটা চাটুকার লোক", কিংবা "সে খুবই চাল্লু, বসদের ভাঁজ করে প্রমোশন বাগাই নিছে"। খুব কম মানুষই ভাববো সে হয়তো অনেক পরিশ্রম করে চাকুরীটা পেয়েছে কিংবা প্রমোশনটা পেয়েছে।

ইদানিং আরেকটা সমালোচনার বিষয়বস্তু হচ্ছে কর্পোরেট কম্পানীগুলো, বিশেষ করে টেলিকম কম্পানীগুলো। কথায় কথায় ওদেরকে গালি দিয়ে আমরা কেমন যেনো একটা সুখ পাই। ওরা দেশের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ পায় এমন বিজ্ঞাপন, অনুষ্ঠান করলেও ওদেরকে আমরা গালি দিই, বলি যে দেশপ্রেমের বানিজ্যিকিকরণ হচ্ছে। আবার দেশের জন্যে কিছু না করলে বলি যে ওদের কর্পোরেট সোশাল রেস্পন্সিবিলিটি বলতে কিছু নাই। আরে ভাই, ওরা তো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, চ্যারিটি না। ওদের প্রধান কাজ হচ্ছে ব্যবসা, এর ফাঁকে ওরা ওদের মতো করে দেশপ্রেমমূলক বিজ্ঞাপন বানায়, অনুষ্ঠান করে এটাই বা কম কিসের? আপনার পছন্দ না হলে বলেন কিভাবে করলে আপনার পছন্দ হবে। কিংবা আপনি একটা কম্পানী বানান এবং দেখিয়ে দেন কিভাবে বিজ্ঞাপন বানাতে হবে কিংবা অনুষ্ঠান বানাতে হবে।

আমাদের সমালোচনার আরেক নির্বিচার টার্গেট হচ্ছে বিনোদন জগতের মানুষজন। বাংলাদেশে প্রায় সবাই নিয়মিত টিভি দেখে, অনেকেই সিনেমা দেখে, গান দেখে, কিন্তু আমরা প্রায় সবাই নিয়ম করে অভিনয় কিংবা গানের শিল্পীদের সম্পর্কে অনেক বাজে কথা বলি, কটুক্তি করি। "ওই নায়ক কোনো অভিনয় পারে নাকি?", "ওই নায়িকাটার স্বাস্থ্য দেখেছিশ?", "আরে ওই মেয়ে তো একটা রাস্তার মেয়ে ...", "ওই ছেলে মদ-গাঞ্জা খেয়ে বেড়ায়", "ওই মাইয়া তো খালি স্টেইজে উঠে লাফালাফি করে, ও আবার গান গাইতে জানে নাকি" ইত্যাদি ইত্যাদি। আরে বাবা, আপনি যদি এতোই বিনোদন বোদ্ধা হয়ে থাকেন, আপনার কোন গুনটা আছে আমাদের বলেন এবং দয়া করে গান গেয়ে বা অভিনয় করে আমাদের বিনোদন জগতকে সমৃদ্ধ করেন। ধন্যবাদ।

জাফর ইকবাল স্যার এবং অন্যরা মিলে যে গণিত অলিম্পিয়াড করে এটা নিয়ে জামাত-শিবিরের লোকজন বলে যে স্যার নাকি আসলে পলিটিক্স করছেন গণিত অলিম্পিয়াডের নামে। গণিত অলিম্পিয়াড যে কতো গুরুত্মপূর্ণ একটা জিনিস এইটা এইসব জামাতী ব্রেইনে ঢুকার আগে পৃথিবীর মানুষ মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সি ছেড়ে অন্য গ্যালাক্সির দিকে যাত্রা করবে।

দেশে মাঝে মাঝে বিদেশী শিল্পীরা আসে, অনুষ্ঠান করে। এতেও আমাদের অনেকের সমস্যা। শাহরুখ খান এসেছিলো, এটা নিয়ে তো ব্লগ, ফেইসবুক, পত্রিকাজুড়ে সমালোচনার বন্যা। "দেশটা ভারতের দখলে চলে গেলো রে", "দেশের মানুষ ঠিক মতো খেতে পায়না, সেখানে এতো টাকা টিকেট কেটে অনুষ্ঠান দেখা একেবারে অনুচিত" ইত্যাদি। আচ্ছা, বাংলাদেশের রুনা লায়লা বা জেমস যদি ভারতে বা আমেরিকা যেয়ে গান গায় তাহলে বাংলাদেশ ভারত কিংবা আমেরিকা দখল করে ফেলে? আর আমার কষ্ট করে উপার্জন করা দশ হাজার টাকা দিয়ে আমি যদি একটা অনুষ্টান দেখতে যাই, তাতে আপনার সমস্যাটা আসলে কোথায়? আপনার কি ঈর্ষা হচ্ছে আমি অনুষ্ঠান দেখছি বলে?

আমাদের দেশের শতকরা চল্লিশ ভাগ মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। এখান থেকে উপরে উঠতে হলে আমাদের আরো অনেকদূর যেতে হবে। আমরা অনেকটা পথ চলে এসেছি - আমাদের মোটামুটি একটা চলনসই গণতন্ত্র আছে, আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হচ্ছে, আমরা ষোল কোটি মানুষের খাবার উৎপাদন করতে পারি, দেশের বেশির ভাগ মানুষ জঙ্গিবাদকে ঘৃণা করে। আমাদের উন্নতির পথে এখনো অনেকদূর যেতে হবে, কিন্তু তাই বলে আমরা আমাদেরকে বিনোদন থেকে বঞ্চিত করবো কেনো? কিছুদিন আগে কোন একটা ভারতীয় শিল্পী আসলো ঢাকায়, এক বন্ধু দেখলাম সেটা নিয়ে লিখলো যে দেশে মানুষ যেহেতু এখনো লাইন দিয়ে সস্তায় চাল কিনে সেহেতু আমাদের এইসব অনুষ্ঠানে এতো টাকা টিকেট কেটে যাওয়া ঠিক না। ব্লগেও দেখি মানুষজন পোস্ট দিচ্ছে, এইসব অনুষ্ঠানে না যেয়ে একটা গরীব শিশুকে সাহায্য করতে।

এই ধরনের কথাবার্তায় আমি আসলে কোনো যুক্তি দেখিনা। আমার ধারণা এটা অপ্রয়োজনীয় এবং অতিরিক্ত আবেগ। একটা সুস্থ্য জীবনের জন্যে চিত্ত-বিনোদন খুবই দরকারী। আমরা যদি যারা টাকার অভাবে বিনোদন করতে পারছেনা তাদের কথা ভেবে আমাদের নিজেদের বিনোদন করা থেকে বিরত থাকি তাহলে আমাদের কর্মক্ষমতা এবং সৃষ্টিশীলতা কমে যাবে, এবং আমরাও দেশের অর্থনৈতিক অবনতিতে ভুমিকা রাখা শুরু করবো। দেশের দারিদ্য সীমার নিচের মানুষের সংখ্যা তখন আরো বেড়ে যাবে। এইটা একটা নেগেটিভ ফিডব্যাক লুপ। একজন দূর্বল মানুষ আরেকজন দূর্বল মানুষকে সাহায্য করতে পারেনা। অন্যকে সাহায্য করতে হলে আগে নিজেকে শক্ত হতে হবে। আর আমার ধারণা যারা মানুষকে এইসব অনুষ্ঠানে যেতে নিষেধ করে তাদের অনেকেই সুযোগ পেলে সেখানে যেতো এবং তারা নিজেরা ব্যক্তিগত জীবনে খুব বেশি উপকারী মানুষ হয় না।

সম্প্রতি একটা লেখা পড়লাম - "যেসব মানুষের নিজের উপর শ্রদ্ধা কম তারা বেশি (কু)সংস্কারে ভোগে"। অর্থাৎ যেসব মানুষ আসলে নিজের যোগ্যতা নিয়ে খুশি নয়, নিজের উপর নিজের খুব বেশি শ্রদ্ধা নাই, আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভোগে, তারা সাধারণত মানুষকে নিয়ে বেশি নেগেটিভ কথা বলে। অন্যের ভালো কিছু দেখলে তারা সহজে খুশি হতে পারেনা, তাদের প্রথম চিন্তাটি হয় নেগেটিভ। মানুষকে সহজে বিশ্বাস করতে পারেনা এরা।

বাংলাদেশকে উন্নত করতে হলে আমাদেরকে, বিশেষ করে তরুন সমাজকে, অনেক প্রাণশক্তির অধিকারী হতে হবে। বেশ কিছুদিন আগে "প্রাণশক্তি" নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম, যেটার কিছু কথা এখানে প্রাসঙ্গিক হতে পারেঃ

"প্রাণশক্তিতে ভরপুর মানুষ কৌতুহলী হয়, আগ্রহী হয়, সবসময় কিছু একটা করতে চায়, যেকোনো জিনিসের ভালো দিকটা দেখে প্রথমে, নিজের ভুল/দোষ হলে সেটা স্বীকার নেয় সহজে, অন্যের সফলতা দেখে হিংসা করেনা, সবকিছুর পেছনে ষড়যন্ত্র খুঁজে বেড়ায়না, অন্যরা কী করছে সেটা না ভেবে নিজেই এগিয়ে আসে যেকোনো কাজে, ভাগ্যের উপর নির্ভর করে বসে থাকেনা, এবং আশেপাশের সবার মধ্যে নিজের প্রাণশক্তি সঞ্চারিত করে। একজন সফল মানুষ আরেকজন সফল মানুষকে হিংসা করবেনা। যে ছেলেগুলো হরতাল-বিক্ষোভ এর সময় নির্বিচারে অন্যের গাড়ি ভাংগে, সেই ছেলেগুলোর প্রত্যেকের একটা করে গাড়ি থাকলে ওরা কখনো এই কাজটি করতো না। অসফল মানুষ স্বভাবতই কিছুটা হীনমন্যতাবোধে ভোগে, এবং সুযোগ পেলেই তার দুঃখ-কষ্টের কারণ অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে চায়।"

মানুষকে বিশ্বাস করা খুবই দরকারী একটা জিনিস। মানুষের মঙ্গল চিন্তা করা, মানুষের খুশিতে নিজে খুশি হওয়া এগুলো খুব চমৎকার ব্যাপার। মানুষ যতোদিন থাকবে ঈর্ষা ব্যাপারটা ততোদিন থাকবে মানুষের মধ্যে, কিন্তু এটাকে একটা খারাপ বিষয় ভেবে নিজের ভেতরে মেরে ফেলতে হবে। ঈর্ষাকে শক্তিতে রুপান্তরিত করতে হবে। কেউ একটা চমৎকার ফ্ল্যাট কিনেছে দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে তার নামে বদনাম না করে বরং ঈর্ষান্বিত হয়ে বেশি বেশি পরিশ্রম করে নিজে একটা ফ্ল্যাট কিনে ফেলুন না। সেও সুখি তার ফ্ল্যাটে, আপনিও সুখি আপনার ফ্ল্যাটে!

মানুষের প্রশংসা করলে সে প্রশংসা আপনিই ফিরে পাবেন। মানুষের সুখে আপনি সুখী হলে সে সুখ একদিন আপনিও পাবেন। অন্যথায় ঈর্ষা, বদনাম, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ইত্যাদি নেগেটিভ ভাবাবেগ আপনাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাবে, সুখ সোনার হরিণ হয়েই অধরা থেকে যাবে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29339070 http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29339070 2011-03-06 08:23:08
মহাবিশ্বের সৃষ্টি এবং ঈশ্বর নিয়ে স্টিফেন হকিং এর সর্বশেষ বই “দি গ্র্যান্ড ডিজাইন” এর সার-সংক্ষেপ/রিভিউ


পৃথিবীতে মানুষের সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্ন সম্ভবত নিজের অস্তিত্ত্ব নিয়েঃ আমরা কোথা থেকে এসেছি, কোথায় যাবো, আমাদের জীবনের তাৎপর্য কী? সভ্যতার শুরু থেকে মানুষ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে এসেছে। প্রাচীন গ্রীস থেকে শুরু করে হিন্দু ধর্ম, ইসলাম এবং খ্রিস্টান ধর্ম, চীনা এবং জাপানী ধর্মগুরুরা, ইনকা এবং মায়ান সভ্যতার মানুষগুলো - সবাই নিজেদের মতো করে মানুষ এবং বিশ্বসৃষ্টির ব্যাখ্যা দিয়ে এসেছে। এখনো আফ্রিকা কিংবা আমাজনের জঙ্গলে বিভিন্ন গোত্র পাওয়া যাবে যারা বিভিন্ন গাছপালা কিংবা চাঁদ-সূর্যকে তাদের ঈশ্বর মনে করে এবং তারা তাদের এই বিশ্বাস এর জন্যে জীবন দিতেও প্রস্তুত!

ঘটনাক্রমে বিজ্ঞান বিশ্বাস এর চেয়ে যুক্তি, পর্যবেক্ষণ, এবং গণিতকে বেশি প্রাধান্য দেয় এবং যেকোনো প্রশ্নের উত্তর অনেক গবেষণা এবং পরীক্ষা নীরিক্ষা করে বের করে। বিশ্বখ্যাত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং এবং ক্যালটেক পদার্থবিদ লেনার্ড মিলাডনো তাদের সর্বশেষ বই "The Grand Design" এ বিশ্ব সৃষ্টি নিয়ে কিছু চমকপ্রদ তথ্য এবং মতামত প্রকাশ করেছেন। যেহেতু তারা বিজ্ঞানের মানুষ, তাই স্বভাবতই বইটিতে শুধু বিজ্ঞানের কথাই আছে, কারো মনগড়া কোনো বিশ্বাসের কথা সেখানে নেই! হকিং এবং মেলাডনো পদার্থবিজ্ঞানের সর্বশেষ আবিষ্কার এর উপর ভিত্তি করে মহাবিশ্বের সৃষ্টি নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন। যে ধরণের প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে সেগুলো অনেকটা এরকমঃ

১। আমাদের অস্তিত্বের কারণ কী? (Why do we exist?)
২। এই মহাবিশ্ব শূন্য না হয়ে পূর্ণ কেনো হলো? (Why is there something rather than nothing?)
৩। মহাবিশের নিয়ম-নীতিগুলো এরকম কেনো হলো? (Why this set of laws not some other?)

বইয়ের প্রথম অধ্যায়েই লেখকদ্বয় ঘোষনা করেছেন "দর্শনশাস্ত্র মরে গেছে"! মানুষের অস্তিত্ত্ব কিংবা বাস্তবতা (reality) নিয়ে আগে দর্শনশাস্ত্র অনেক বড় বড় তত্ত্ব দিতো, কিন্তু বিজ্ঞান, বিশেষ করে পদার্থবিজ্ঞান, এর অগ্রগতির সাথে সাথে এই সব প্রশ্নের উত্তর এখন দর্শন শাস্ত্রের ধোঁয়াটে ও ঘোলাটে উত্তরের চেয়ে অনেক বেশি পরিস্কার এবং চমৎকারভাবে পাওয়া যায়। অনু পরমানুর কনা জগৎকে ব্যাখ্যা করার জন্যে কোয়ান্টাম মেকানিক্স নামে পদার্থবিজ্ঞানের চমৎকার একটা শাখা আছে। দুর্ভাগ্যক্রমে কোয়ান্টাম মেকানিক্স সম্ভবত বিজ্ঞানের সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলির একটি, কিন্তু এর মাধ্যমে প্রকৃতিকে যতো ভালোভাবে জানা যায় বিজ্ঞানের অন্য কোনো শাখার মাধ্যমে ততোটা ভালোভাবে জানা যায়না। "কমন সেন্স" বলে আমরা যে জিনিসটাকে সযত্নে লালন করি, যেটা না থাকলে মানুষজনকে আমরা উজবুক বলে গালি দেই, দুর্ভাগ্যজনকভাবে কোয়ান্টাম মেকানিক্স সে জিনিসটার বড়ই বিপরীত! একটা উদাহরণ দেইঃ আপনি যদি একটা ফুটবলকে কিক মারেন আপনি আশা করবেন ফুটবলটি কয়েক ফুট দূরে যেয়ে একটা জায়গায় যেয়ে থামবে। ফুটবলটা একটা নির্দিষ্ট পথ দিয়ে যেয়ে তার গন্তব্যে পৌঁছাবে। কিন্তু কোয়ান্টাম মেকানিক্স বলে যে ফুটবলটা আসলে ওই নির্দিষ্ট পথ ছাড়াও আরো অনেক পথে তার গন্তব্যে পৌঁছে থাকতে পারে। কিন্তু আমরা শেষ পর্যন্ত এর একটি পথই দেখি। ফুটবল জিনিসটা অনেক বড় দেখে আমরা এর অন্য পথগুলো দেখিনা। কিন্তু ফুটবলের জায়গায় যদি একটা ইলেক্ট্রন থাকতো তাহলে আমরা একটা এক্সপেরিমেন্ট দাঁড় করিয়ে সত্যি সত্যি দেখতে পারতাম যে ইলেক্ট্রনটি একাধিক পথ পাড়ি দিয়ে তার গন্তব্যে যেয়ে পৌঁছেছে! এটা পরীক্ষিত সত্য!! (উইকি , ইউটিউব ভিডিও)।

আরেকটা আন-কমনসেন্স এর ব্যাপার হচ্ছে স্থান এবং সময় (স্পেস-টাইম), এবং এটি তৈরি করেছে আইনস্টাইন এর জেনারেল থিওরী অব রিলেটিভিটি । আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা স্থান এবং সময়কে যেভাবে দেখি আসলে কিন্তু সেগুলি সেরকম নয়! স্থান এবং কাল বেঁকে যেতে পারে, লম্বা হতে পারে! মহাবিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বল হচ্ছে মহাকর্ষ (gravity), এবং এই বল স্থান এবং কালের বক্রতা ছাড়া কিছুই নয়। আমরা যেমন সময়কে একটা সরল রেখায় চলতে দেখি, আমাদের জীবনে সবকিছুর অতীত, বর্তমান, এবং ভবিষ্যৎকে সময়ের সাথে আবর্তিত হতে দেখি, আইনস্টাইন এর থিওরী অনুসারে সময় ব্যাপারটি সেরকম সরল রেখায় চলেনা। আমরা সেটি টের পাইনা কারণ আমাদের জীবনের প্রায় সবকিছু ঘটে এই ছোট পৃথিবীতে এবং আমাদের চারপাশের সবকিছুই মোটামুটি কাছাকাছি গতিতে চলে। একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবেঃ ধরুণ আমি আর আপনি টিএসসি'র সামনে একটা টং দোকানে বসে চা খাচ্ছি। এই সময় হঠাৎ আমাকে একটা জরুরী কাজে কাছের একটা গ্যালাক্সিতে ছুটে যেতে হলো (কল্পনা শক্তির পূর্ন সদব্যাবহার!)। গ্যালাক্সি বলে কথা, আমি সিএনজি বেবি ট্যাক্সি না নিয়ে আমার স্পেসশিপে করে আমার গ্যালাক্সির দিকে রওয়ানা দিলাম। আপনাকে আমি কথা দিয়ে গেলাম আমি এক ঘন্টার মধ্যে ফিরে আসবো। এক ঘন্টার মধ্যে ওই গ্যলাক্সিতে যেতে হলে আমাকে প্রায় আলোর কাছাকাছি বেগে যেতে হবে। আমি আলোর প্রায় কাছাকাছি বেগে ওই গ্যালাক্সি থেকে আমার কাজ সেরে আপনার কাছে ফিরে আসলাম। আসার পর আপনার দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে বললাম আমি এক ঘন্টার মধ্যেই ফিরে এসেছি। কিন্তু আপনি আপনার ঘড়িতে খেয়াল করলেন আমি প্রায় দেড় ঘন্টা সময় কাটিয়ে এসেছি! আমি আপনাকে আমার ঘড়ি দেখালাম, সত্যি সত্যিই এক ঘন্টা কাটিয়ে এসেছি আমাই আমার ঘড়ির হিসেবে। তাহলে প্যাঁচটা কোথায় লাগলো?

সমস্যাটা হয়েছে আমি যখন আলোর কাছাকাছি বেগে ট্রাভেল করেছি। কোনো কিছুর গতি যখন আলোর গতির কাছাকাছি চলে যায় তখন তার সময় ধীর গতিতে চলতে থাকে, আলোর গতিতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সময় একেবারে থেমে যায়। তাই আমি যখন কাছের গ্যলাক্সিতে আলোর কাছাকাছি বেগে ভ্রমন করে এসেছি তখন আমার সময় আর আপনার সময় আসলে এক ছিলোনা। অতএব, সময় সম্পর্কে আমাদের যে দৈনন্দিন জীবনের ধারণা সেটি আসলে চরম সত্যি নয়। (দেখুনঃ টুইন প্যারাডক্স )।

হকিং এবং মেলাডনো মনে করেন যে "বিশ্ব জগতের শুরু কোথায় এবং কখন হয়েছিলো?" এই ধরণের প্রশ্ন আসলে বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক প্রশ্ন না। "কোথায়" এবং "কখন" বলতে যে স্থান এবং সময় এর কথা বুঝানো হয় সেই জায়গা এবং সময়েরই সৃষ্টি হয়েছিলো বিশ্ব সৃষ্টির সাথে সাথে। অতএব, সময় "কখন" সৃষ্টি হয়েছিলো এবং তার আগে কী ছিলো এই প্রশ্নটি হকিং এর মতে "দক্ষিন মেরুর দক্ষিনে কী আছে?" এর মতো। হকিং (এবং মেলাডনো) এর মতে সৃষ্টির শুরুতে স্থান এবং সময় এর মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিলোনা, তাই অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের ব্যাপারটা সেখানে আসেনা।

প্রতিভাবান পদার্থবিজ্ঞানী রিচার্ড ফিনম্যান এর মতে সব বস্তুকনার প্রায় অসীম সংখ্যক অতীত আছে। কোনো বস্তুর বর্তমান কিংবা ভবিষ্যৎ এর সব অতীতে ইতিহাস থেকে কোয়ান্টাম সমীকরণ দিয়ে বের করা যায়। হকিং ফিনম্যান এর থিওরীকে উলটা দিক থেকে প্রয়োগ করেছেন আমাদের মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ মহাবিশ্বের বর্তমান থেকে এর অতীতকে বের করার চেষ্টা করছেন। ফিনম্যানের থিওরী এর সাথে আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরী অব রিলেটিভিটি মহাবিশ্বের উপর প্রয়োগ করে হকিং এবং মেলাডনো দেখেছেন মহাবিশ্বের সৃষ্টির সময়ে স্থান এবং সময়ের মাত্রার মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিলোনা, দুটোই একই রকম আচরণ করেছিলো সৃষ্টির সময়।

সময়ের শুরু এর ব্যাপারটির মিমাংসা হয়ে যাওয়ার পর যে প্রশ্নটি থাকে সেটি হলো "কেনো এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি হলো?"। হকিং বলছেন, সেটিও বিজ্ঞানের ভেতরে থেকেই উত্তর দেওয়া যায় ঈশ্বর কিংবা দেব-দেবীর সাহায্য না নিয়ে!

পৃথিবীজুড়ে পদার্থবিজ্ঞানীদের স্বপ্ন "সবকিছুর তত্ত্ব" এর সন্ধান পাওয়া। এই তত্ত্ব দিয়ে পদার্থবিজ্ঞানের সবকিছু একই ধরণের সমীকরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে। কিছুদিন আগ পর্যন্তও এটা অনেকটা অধরা মনে হলেও সাম্প্রতিক কালে M-থিওরী নামে একটা তত্ত্ব (এটা আসলে অনেকগুলো তত্ত্বের একটা সেট) বিজ্ঞানীদের সেই আশার আলো দেখাচ্ছে। M-থিওরী এর শুরু স্ট্রিং থিওরী নামে, এটি বলে যে আমাদের মহাবিশ্ব আসলে একটা এগারো মাত্রিক মহাবিশ্ব - দশটি স্থান এবং একটি সময়। আমরা মাত্র তিনটা স্থান মাত্রা দেখি কারণ অন্য সাতটি মাত্রা সংকুচিত হয়ে গিয়েছে মহাবিশ্বের সৃষ্টির সময়। এটা কেনো হয়েছে সেটা নিয়ে এখনো নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছেনা, কিন্তু এই M-থিওরী দিয়ে আমাদের মহাবিশ্বের সবকিছু ব্যাখ্যা করে যায় খুব চমৎকারভাবে!

আমাদের এই মহাবিশ্ব যে প্রাণ সৃষ্টির জন্যে এতো অনুকুল - মহাকর্ষ ধ্রুবক, ইলেক্ট্রন এর ভর এবং চার্জ, মৌলিক বলগুলোর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি কোনো কিছু একটু এদিক ওদিক হলে এই মহাবিশ্বে প্রাণের সৃষ্টি হতে পারতো না- এর মানে এই নয় যে আমরাই একমাত্র সৃষ্ট জগৎ। M-থিওরী অনুসারে কোয়ান্টাম জগতের ফ্লাকচুয়েশনের কারণে আমাদের মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে শূন্য থেকে, এবং আমাদের মহাবিশ্বের সাথে আরো প্রায় ১০^৫০০ মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে। এই মহাবিশ্বের একেকটির একেক রকম পদার্থবিজ্ঞান, যেমন কোনোটার হয়তো মাত্রার সংখ্যা দুইশ, ইলেকট্রন হয়তো একটা ফুটবলের মতো, হয়তো মানুষগুলো মাথার উপর ভর করে হাঁটে (যদি মানুষ থেকে থাকে আর কি)। আমরা এখন মহাবিশ্ব নিয়ে কথা বলছি এর মানে ঘটনাক্রমে আমাদের মহাবিশ্বের পদার্থবিজ্ঞান মানুষ সৃষ্টির অনুকুল! কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন হচ্ছে ভ্যাকুয়াম (শূন্য) থেকে খুবই স্বল্প সময়ের জন্যে শক্তির তৈরি হওয়া। শূন্য থেকে মহাবিশ্ব সৃষ্টির এই ধারণা আসলে বেশ কিছুদিন ধরেই বলা হচ্ছিলো।

অতএব, আমাদের পুরনো প্রশ্নে ফিরে আসিঃ কেনো আমাদের এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি হলো? হকিং এর মতে, কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন এর মাধ্যমে শূন্য থেকে বস্তু তৈরি হতে পারে যার শক্তি হচ্ছে পজেটিভ। সেই পজেটিভ শক্তিকে ব্যলান্স করার জন্যে (শক্তির নিত্যতার সূত্রঃ শক্তির কোনো সৃষ্টি বা বিনাশ নেই, মহাবিশ্বের মোট শক্তির পরিমাণ শূন্য) আছে মহাকর্ষ বল যেটি স্থান এবং সময়ের একটা বৈশিষ্ট্য মাত্র। মহাকর্ষের নেগেটিভ শক্তি বস্তুর পজেটিভ শক্তিকে ক্যান্সেল করে দিয়ে শক্তির নিত্যতা বজায় রাখে। মহাবিশ্বের এই সৃষ্টি প্রক্রিয়া স্বতস্ফুর্ত, কোনো বাহ্যিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন ছাড়াই মহাবিশ্বের সৃষ্টি হতে পারে। অতএব, শূন্য থেকে ইচ্ছা মতো মহাবিশ্ব তৈরি হতে পারে, কোনো ঈশ্বরের দরকার নাই সে জন্যে! হকিং এর মতে ঈশ্বরকে দিয়ে মহাবিশ্বের সৃষ্টি করানো মানে প্রশ্নটাকে এক ডিগ্রী উপরে উঠিয়ে দেওয়া, মহাবিশ্ব কে সৃষ্টি করেছেন সেটি প্রশ্ন না করে এখন প্রশ্ন করা হবে ঈশ্বরকে কে সৃষ্টি করেছেন। তবে সাধারণত ফার্স্ট-কজ আরগুমেন্ট নামে একটি যুক্তি - ঈশ্বর সবসময়ই ছিলো এবং থাকবে, তাকে সৃষ্টি করার প্রয়োজন পড়ে না - দিয়ে ঈশ্বরকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়। হকিং বলছেন, ঈশ্বরকে না এনে কিভাবে বিশ্ব সৃষ্টি ব্যাখ্যা করা যায় সেটাই তাদের এই বই এর উদ্দেশ্য।

বিশ্ব সৃষ্টি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে হকিং এবং মেলাডনো বেশ কয়েকটি অধ্যায় ব্যয় করেছেন কোয়ান্টাম মেকানিক্স এবং কজমোলজির বিভিন্ন বিষয়গুলি বুঝানোর জন্যে। একেবারে শেষ অধ্যায়ে (যেটির নাম বইয়ের নামে - দি গ্র্যান্ড ডিজাইন) একটা ছোট গেইম এর মাধ্যমে দেখানোর চেষ্টা করেছেন কিভাবে কিছু সাধামাটা নিয়ম এবং সূত্র থেকে অনেক জটিল বস্তু তৈরি হতে পারে। এর উদ্দেশ্য ছিলো এটা বুঝানো যে কয়েকটি সাধারণ তত্ত্ব/সূত্র থেকে এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি হতে পারে এবং সেখান থেকে মানুষের মতো জটিল জীবের আবির্ভাব হতে পারে যারা এধরণের জটিল প্রশ্ন করতে পারে - আমাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য কী?

সমালোচনাঃ

বইটাকে আমার সম্পূর্ণ মনে হয়নি। অনেক ভারী ভারী বিষয়ের অবতারণা করে সেগুলোর পুরো ব্যাখ্যা আসেনি বইটিতেঃ

১। M-থিওরী আসলে এখনো পুরোপুরি একটা গাণিতিক মডেল। এটি এখনো ল্যাবরোটরিতে বা অন্য কোথাও কোনো পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়নি। এর মানে এই নয় যে এটা কখনো পর্যবেকক্ষন দ্বারা প্রমাণিত হবেনা, তবে এখনই এই থিওরীর উপর এতো বড় বাজী রাখা সাহসের ব্যাপার বৈকি!
২। হকিং বলেছেন শূন্য থেকে কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন এর মাধ্যমে বস্তু তৈরি হবার কথা এবং মহাকর্ষ বলের মাধ্যমে সেই বস্তুর পজেটিভ শক্তিকে নিউট্রালাইজ করার কথা। এখানে দুটো জিনিস হকিং পরিষ্কার করে বলেননি। ক) শূন্য বলতে কি হকিং একেবারে শূন্য (nothing) বুঝিয়েছেন নাকি কোয়ান্টাম ভ্যাকুয়াম (বস্তুর অনুপস্থিতি) বুঝিয়েছেন সেটি পরিষ্কার করে বলা হয়নি, খ) সৃষ্টির শুরুতে সময় স্থান এর মতো আচরণ করলেও পরবর্তীতে কিভাবে এবং কেনো সময় "সময়" এর মতো আচরণ শুরু করলো সে ব্যাপারেও কিছু বলা হয়নি বইটিতে।
৩। মহাকর্ষ বল ছাড়া মহাবিশ্ব সৃষ্ট হতো না, কিন্তু মহাকর্ষ বল এর সৃষ্টি কিভাবে হয়েছে সেটা নিয়ে হকিং কিছু বলেননি। শূন্য থেকে কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশনের এর মাধ্যমে বস্তুর (শক্তির) সৃষ্টি হতে পারে কিন্তু সেই বস্তুর মহাকর্ষ বল এর বৈশিষ্ট্য থাকবে অন্য কোনো বৈশিষ্ট্য থাকবেনা কেনো?

শেষ কথাঃ

বইটি প্রকাশ হওয়ার পর সিএনএন এর ল্যারি কিং স্টিফেন হকিং এর একটি সাক্ষাতকার নেয়। সেখানে তাকে ল্যারি সরাসরি জিজ্ঞেস করেন - "আপনি কি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন"? "ঈশ্বর থাকতে পারেন, তবে বিশ্বসৃষ্টি ব্যাখ্যা করার জন্যে আমাদের তাঁকে প্রয়োজন নাই" - এটা ছিলো হকিং এর উত্তর।


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29249272 http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29249272 2010-10-04 10:44:13
নিউ ইয়র্ক!


১। যন্ত্রণা

ঘড়িতে অ্যালার্ম দেওয়া থাকে পৌনে সাতটায়। জীবনে কখনো কোনো দরকার ছাড়া এতো সকালে উঠেছি বলে মনে পড়ে না। অথচ এখন রোজ নিয়ম করে এই কাক ডাকা ভোরে (!) উঠতে হয়। উঠে বাথরুম সেরে, ব্রাশ করে, শেইভ করে, গোসল করে, ইস্ত্রি করা সাদা বা নীল রঙের স্ট্রাইপের ফর্মাল শার্ট আর কালো বা অন্য কোনো গাঢ় রঙের প্যান্ট চাপিয়ে টপাটপ একটু সিরিয়াল বা চা-বিস্কুট খেতে খেতে বেজে যায় আটটা। এরপর রীতিমতো দৌড় দিয়ে বের হই ট্রেন স্টেশন এর উদ্দেশ্যে। পাক্কা বারো মিনিটের হাঁটা পথ। ভাগ্য দেবতা সহায় থাকলে কখনো কখনো বের হয়ে বাস পাওয়া যায়। বাস ধরে বা পায়ে হেঁটে পৌঁছাই ট্রেন স্টেশন। এরপর কিউ বা এন ট্রেন ধরে লেক্সিংটন এভিনিউতে যেয়ে ট্রেন পরিবর্তন। ব্রঙ্কস থেকে ছেড়ে আসা চার বা পাঁচ নম্বর ট্রেন ধরে এরপর ডাউনটাউন এর ফুলটন স্ট্রিট স্টেশন। ওখান থেকে দশ মিনিটের মতো হেঁটে এরপর অফিস। বাসা থেকে বের হবার পর নিজের ডেস্কএ পৌঁছাতে পাক্কা এক ঘন্টা চলে যায়। ট্রেনে বেশির ভাগ সময়ই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ডেস্কে বসার সময় দেখতে পাই আমার ম্যানেজার, তার ম্যানেজার, তার ম্যানেজার সবাই অনেক আগে অফিসে এসে গভীর মনোযোগ দিয়ে কাজ করছে। নিজে দেরীতে আসার লজ্জায় মনে মনে বলি, ধরণী দ্বিধা হও। ধরণী দ্বিধা হয়না কোনোদিন, আমাকে বিরস মুখে আমার দিনের কাজ শুরু করতে হয়!
অফিস করতে হয় দশ/এগারো ঘন্টার মতো। আবার এক ঘন্টার যুদ্ধ করে বাসায় ফেরা। সব মিলিয়ে দিনের তেরো/চৌদ্দ ঘন্টার মতো চলে যায় অফিস এর পেছনে!
এই হোলো আমার ইদানিংকার কর্মজীবনের অবস্থা।

২। সুখ

দুই মাস আগেও ব্যাপারটা এরকম ছিলো না। ঘুম থেকে উঠতাম ইচ্ছেমতো। বাসার সামনে থাকতো গাড়ি। ড্রাইভ করে অফিসে যেতে লাগতো ঘড়ি ধরে পাঁচ মিনিট। অফিসে যেয়ে ঢুকতাম নিজের অফিস রুমে। আমি কখন এসেছি কেউই সেটা খবর রাখতোনা। বারোটা বাজতে না বাজতেই লাঞ্চ টাইম। প্রায়ই বাইরে চলে যেতাম বন্ধুদের সাথে কিংবা টিমমেটদের সাথে। আরাম করে খাওয়া দাওয়া শেষ করে ধীরেসুস্থে এসে অফিসে ঢুকতাম। চারটা সাড়ে চারটার দিকে এক টিম মেট এর সাথে ফুজবল (বোর্ড এ প্লাস্টিক এর প্লেয়ার আর বল দিয়ে ফুটবল) খেলতে বের হয়ে যেতাম। পাঁচটা সাড়ে পাঁচটার দিকে মনে হোতো অনেক কাজ হয়ে গেছে এবার বাসায় চলে যাইঃ)
বাসা ছিলো লেকের পাড়ে চমৎকার এক এপার্টমেন্টে। গাছগাছালিতে ভরা চারদিক, প্রায়ই পাখি এসে বসতো পেছনের গাছগুলোয়। লেকের পাড়ে দাঁড়িয়ে দূরে সব উঁচু উঁচু পাহাড় দেখা যেতো।

৩। নিউ ইয়র্ক

প্রায় দুই মাস আগে আমি আমেরিকার পশ্চিম উপকুলের সিয়াটল শহর থেকে প্রায় তিন হাজার মাইল দূরে পুর্ব উপকুলের শহর নিউ ইয়র্কে চলে আসি। সিয়াটল এলাকা সম্ভবত আমারিকার সবচেয়ে সুন্দর এলাকা। বরফে ঢাকা পাহাড়, লেক, পার্ক, চারদিকে চিরসবুজ গাছের ছড়াছড়ি ইত্যাদি মিলে সিয়াটল এক অপূর্ব সুন্দর জায়গা। সেই তুলনায় নিউ ইয়র্ক অনেক বৈচিত্রহীন। নিউ ইয়র্ক পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শহরগুলোর একটি, যেদিকে চোখ যায় খালি ইট পাথরের বিল্ডিং। ব্রুকলিন কুইন্স এক্সপ্রেসওয়ে থেকে রাতের নিউ ইয়র্ক শহর এর দিকে তাকালে পুরো শহরটাকে এক জীবন্ত প্রাণী মনে হয়। শত শত আকাশ ছোঁয়া বিল্ডিং ম্যানহাটান এর এক প্রান্ত থেকে থেকে আরেক প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। রাতের ঝলমলো আলোতে পুরো শহরটাকে মানুষের তৈরি একটা বিশাল জীব মনে হয়।



রাতের নিউ ইয়র্ক শহর

৪। মানুষ
সিয়াটল এর সাথে নিউ ইয়র্ক এর সবচেয়ে বড় পার্থক্য আসলে অন্য জায়গায়। সিয়াটল এতো সুন্দর হয়েও কেমন যেনো খালি খালি। নিউ ইয়র্ক মানুষের শহর। চারদিকে খালি মানুষ আর মানুষ। সাদা-কালো-বাদামী, আমেরিকান-ইউরোপিয়ান-এশিয়ান, ওয়াল স্ট্রিট এর মিলিওনেয়ার, মেক্সিকো থেকে সাগর-নদী-জঙ্গল দিয়ে পালিয়ে আসা অবৈধ অভিবাসী, সারা পৃথিবী থেকে আসা টুরিস্ট - সব মিলিয়ে পুরো নিউ ইয়র্ক শহর সারাক্ষন থাকে সরগরম। নিউ ইয়র্ক এক অর্থে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক শহর বলা যায়। শহরের প্রান-কেন্দ্রে টাইমস স্কয়ার বলে একটা জায়গা আছে যেখানে দিন রাত চব্বিশ ঘন্টা টুরিস্টদের আনাগোনা। রাত তিনটার সময় যেয়েও লাইন ধরে রাস্তার পাশে কার্টে বিক্রি করা মজাদার মধ্যপ্রাচ্যীয় খাবার "ফালাফাল" খাওয়া যায়। টাইমস স্কয়ারে কিছুক্ষণ দাঁড়ালে সারা পৃথিবীর সব ভাষা শোনা যাবে নিশ্চিত!
বাংলাদেশের সবচেয়ে সক্রিয় মানুষগুলো থাকে নিউ ইয়র্কে। এখানে সব সময় কোনা না কোনো প্রোগ্রাম লেগেই থাকে। গান, নাচ, কিংবা রাস্তাঘাট বন্ধ করে মেলা, একটা না একটা কিছু সব সময় চলতে থাকে। আছে বিএনপি-আওয়ামী লীগ দলাদলিও!

৫। জ্যাকসন হাইটস

নিউ ইয়র্ক এর কথা সম্পূর্ণ হবেনা যদি না জ্যাকসন হাইটস জায়গাটার কথা না বলি। জ্যাকসন হাইটস হচ্ছে নিউ ইয়র্ক এর বাংলাদেশী অধ্যুষিত এলাকা। জ্যাকসন হাইটস এ আসলে যে কারো মনে হতে পারে সে আসলে এখন ঢাকার কোনো এলাকায় চলে এসেছে। চারদিকে বাংলা ভাষায় সাইনবোর্ড, লুঙ্গি-পাঞ্জাবী পরা চাচা, বোরকা পরা ধার্মিক মহিলা - এসব দেখে জ্যাকসন হাইটসকে আমেরিকার একটা জায়গা মনেই হয়না।
জ্যাকসন হাইটসএ আছে অসংখ্য বাংলাদেশী রেস্টুরেন্ট। বেশিরভাগই গভীর রাত পর্যন্ত খোলা থাকে। উইকএন্ডএ বন্ধুবান্ধবের সাথে বাংলাদেশী রেস্টুরেন্টএ বসে চা-সিঙ্গারা খেতে খেতে রাজনীতি কিংবা অন্য কোনো রসালো বিষয় নিয়ে গল্প করার মজাই সেরকম!

৬। টুইন টাওয়ার এবং স্ট্যাচু অব লিবার্টি

সারা জীবন নিউ ইয়র্ক এর ছবি দেখলেই দু'টো জিনিস দেখতাম - টুইন টাওয়ার আর স্ট্যাচু অব লিবার্টি। সবসময় ভাবতাম, আহা যদি একবার নিউ ইয়র্ক যেয়ে স্ট্যাচু অব লিবার্টি দেখতে পারতাম! লাদেন মামার কল্যানে টুইন টাওয়ার আর দেখা হোলো না, কিন্তু ভাগ্যের কারসাজিতে আজ আমার অফিস টুইন টাওয়ার এর পাশে, এবং আমার অফিস থেকে পরিস্কার স্ট্যাচু অব লিবারটি দেখা যায়! অফিস থেকে দেখে যেনো সাধ মিটে না, মাঝে মধ্যে বিকেলবেলা অফিস থেকে বের হয়ে হাডসন নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে স্ট্যাচু অব লিবার্ট দেখি।
নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থেকে দেখি কিছুক্ষণ পরপর ফেরী ছেড়ে যাচ্ছে স্ট্যাচু অব লিবার্টি এর উদ্দেশ্যে, একেবারে স্ট্যাচু এর উপরে উঠা যায় নিচ থেকে। আমার আর কখনো স্ট্যাচু অব লিবার্টি এর উপরে ওঠা হোলো না। যে জিনিস চোখে দেখা যায় প্রতিদিন সেটা ফেরী করে যেয়ে দেখার দরকারটা কী? ওই যে বলে না, মক্কার লোকে হজ পায় না!



স্ট্যাচু অব লিবার্টি, পেছনে লম্বা নীল বিল্ডিংটি আমার অফিস!
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29210889 http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29210889 2010-07-30 09:17:42
বিবর্তন এর সরল পাঠঃ বিবর্তন কী এবং কিভাবে কাজ করে?

আমরা অনেকেই বিবর্তন সম্পর্কে জানি বা শুনি। অনেকে এর কথা শুনেই আঁতকে উঠি, ভালো করে না জেনে এর সম্পর্কে অনেক মন্তব্য করি। আসুন দেখি জিনিসটা আসলে কী।

বিবর্তন বুঝতে হলে কয়েকটি জিনিস সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে আগে। এগুলো আগে সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করছি।

কোষঃ

কোষ হচ্ছে প্রাণী বা উদ্ভিদের শরীরের ক্ষুদ্রতম গাঠনিক অংশ। বিভিন্ন ধরণের রাসায়নিক অণু দিয়ে কোষ গঠিত। আমাদের জীবন ধারণের জন্যে যাবতীয় জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়া এই কোষে ঘটে থাকে। আমরা মারা গেলে কোষে আর কোনো কিছু ঘটেনা এবং কোষে রাসায়নিক ক্রিয়া-প্রক্রিয়া থেমে গেলে আমরা মারা যাই।

ডিএনএঃ

ডিএনএ হচ্ছে কোষ এর মধ্যে থাকা একটা জৈব-রাসায়নিক অণু। প্রাণীর জীবন-ধারণের জন্যে, বংশধারা রক্ষা এবং প্রজনন সক্ষমতার জন্যে এ অণুটির ভূমিকা অপরিসীম। একটা প্রাণীর সকল শারীরিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কিত তথ্য এই ডিএনএ নামক অণুতে সংরক্ষিত থাকে। যেমন ধরুণ কেউ লম্বা হবে না বেঁটে হবে সেটা এই ডিএনএ এর একটা অংশের উপর নির্ভর করে। ডিএনএ এর এই অংশকে বলে জিন।




জিনঃ

জিন হচ্ছে কোষে অবস্থিত ডিএনএ এর অংশবিশেষ যেটিতে দেহের জন্যে দরকারী প্রোটিন তৈরি করার কোড (তথ্য) থাকে। এই কোড আসলে কিছু রাসায়নিক অণুর (ফসফেট, সুগার, এবং বেইস) ক্রমাণুমিক অবস্থান ছাড়া আর কিছুই নয়। এই রাসায়নিক অণুগুলো কিভাবে সন্নিবেশিত আছে তার উপর নির্ভর করে কোষে প্রোটিন তৈরি হয়। সবচেয়ে দরকারী প্রোটিনটির নাম হচ্ছে এনজাইম। কোষে যতো ধরণের রাসায়নিক ক্রিয়া-বিক্রিয়া হয় তার সবকিছু সম্ভব হয় এনজাইম এর উপস্থিতির কারণে। শরীরে কী ধরণের প্রোটিন তৈরি হচ্ছে সেটির উপর ভিত্তি করে প্রাণীর শারীরিক বৈশিষ্ট নির্ধারিত হয়। কোনো ডিএনএতে যদি শরীরকে লম্বা করার জন্যে দরকারী জিন না থাকে তাহলে লম্বা হওয়ার জন্যে যে প্রোটিন দরকার সেই প্রোটিনটি তৈরি হবেনা এবং ফলস্রুতিতে সেই শরীরটি লম্বা হবেনা।




অর্গানিজম/মাইক্রোওর্গানিজমঃ

যেকোনো ধরণের ক্ষুদ্রাকৃতির (অণু সদৃশ) প্রাণী/উদ্ভিদ কে মাইক্রোওর্গানিজম বলে। যেমন- ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ইত্যাদি।

বিবর্তন এর সংজ্ঞাঃ

বিবর্তন হচ্ছে বিভিন্ন প্রানী এবং উদ্ভিদের শারীরিক অবস্থায় ঘটে যাওয়া পরিবর্তনের প্রক্রিয়া ব্যাখ্যাকারী তত্ত্ব। বিবর্তন তত্ত্ব অনুযায়ী পৃথিবীর সকল প্রানী এবং উদ্ভিদ একটা এক-কোষীয় মাইক্রোঅর্গানিজম থেকে এসেছে। সবচেয়ে প্রাচীন মাইক্রোঅর্গানিজম এর ফসিল যেটি পাওয়া গিয়েছে সেটি প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন বছর আগের (এর মানে পৃথিবী সৃষ্টি হওয়ার প্রায় এক বিলিয়ন বছর পর এটার সৃষ্টি হয়েছে)। এই মাইক্রোঅর্গানিজম থেকে বিভিন্ন প্রাণী এবং উদ্ভিদ এর উৎপত্তি বিবর্তন ব্যাখ্যা করে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন এই এক-কোষীয় মাইক্রোওর্গানিজমটি কিভাবে এসেছে সেটা বিবর্তনের বিষয় নয়। কিন্তু সেটারও সম্ভাব্য ব্যাখ্যা বিজ্ঞান দিয়েছে । এই প্রাচীনতম মাইক্রোঅর্গানিজম থেকে গতো কয়েক বিলিয়ন বছর ধরে প্রাণী এবং উদ্ভিদের মধ্যে ঘটে যাওয়া শারীরিক পরিবর্তন বিবর্তন ব্যাখ্যা করে। কিভাবে এতো হাজার হাজার রকমের উদ্ভিদ এবং প্রাণীর উদ্ভব হলো সেটি বিবর্তন ব্যাখ্যা করে।

বিবর্তন যেভাবে কাজ করেঃ

বিবর্তন কাজ করে দুইটি প্রধান উপায়ে। এর একটি হচ্ছে ডিএনএ পরিবর্তন(mutation), এবং আরেকটি হচ্ছে প্রাকৃতিক নির্বাচন (natural selection)।

ডিএনএ পরিবর্তনঃ

জীবকোষে অবস্থিত ডিএনএ মাঝে মাঝে পরিবর্তিত হয়। ডিএনএ যেহেতু আমাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে, তাই এর পরিবর্তন হওয়া মানে আমাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন হওয়া।
প্রধানত দুটি কারণে ডিএনএ এর মধ্যে পরিবর্তন ঘটতে পারেঃ ১। কোষ বিভাজনের সময় সময় ডিএনএ এর প্রতিলিপি তৈরি করার সময়, এবং ২। তেজষ্ক্রিয় বিকিরণ, অতিবেগুনি রশ্মি ইত্যাদি কারণে বাইরের পরিবেশের রাসায়নিক পদার্থ শরীরে প্রবেশ করে ডিএনএতে পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে।
এই পরিবর্তনগুলোর উপর যেহেতু আমাদের হাত নেই তাই ডিএনএ এর যেকোনো অংশে (জিনে) এই পরিবর্তন হতে পারে। আর জিন যেহেতু আমাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে দেয়, তাই জিনের এই পরিবর্তন আমাদের শরীরকে প্রভাবিত করে। ডিএনএ এর এমন পরিবর্তন আমাদের জন্যে উপকারী হতে পারে আবার অপকারীও হতে পারে। উদ্ভিদ এবং প্রানীর শরীরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যে পরিবর্তন আমরা দেখতে পাই সেটার কারণ হচ্ছে এই ডিএনএ অর্থাৎ জিন এর পরিবর্তন।

প্রাকৃতিক নির্বাচনঃ

ডিএনএ পরিবর্তন একটি র‌্যান্ডম প্রক্রিয়া। আগে থেকে জানার উপায় নেই যে কোনো পরিবর্তন ভালো, খারাপ, নাকি নিরপেক্ষ হবে। পরিবর্তনটি যদি খারাপ হয় তাহলে সেই প্রানী/উদ্ভিদ এর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমে যায়। উদাহরণস্বরুপ, কোনো বন্য পোকার গায়ের রঙ নির্ধারণকারী জিন যদি এমনভাবে পরিবর্তন হয়ে যায় যে এর গায়ের রঙ বনের লতাপাতা বা গাছপালার রঙ এর চেয়ে অনেক বেশি উজ্জ্বল হয়ে যায় যেটা সহজেই এর খাদক শিকারী প্রাণীর চোখে পড়ে, তাহলে শিকারীর পাল্লায় পড়ে সে পোকাটি আস্তে আস্তে বিলুপ্তির পথে চলে যাবে। অন্যদিকে জিনটি যদি এমনভাবে পরিবর্তন হতো যে পোকাটির গায়ের রঙ বনের অন্যান্য গাছপালা লতাপাতার রঙের সাথে মিশে যেতো যাতে পোকাটিকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়তো, তাহলে পোকাটির বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যেতো। আর এভাবেই নতুন জিনটি বংশ-পরম্পরায় প্রাবাহিত হয়ে যাবে। ডিএনএ এর মাঝে জিন এর র‌্যান্ডম পরিবর্তন থেকে বেঁচে থাকার জন্যে, পরিবেশের সাথে যুদ্ধ করার জন্যে উপকারী জিনটিকে নির্বাচন করার প্রক্রিয়াটিকে বলে প্রাকৃতিক নির্বাচন।

লক্ষ্য করে দেখবেন, ডিএনএ পরিবর্তন এর ব্যাপারটি র‌্যান্ডম হলেও অনেকগুলি র‌্যান্ডম পরিবর্তন থেকে দরকারী বা উপকারী জিনটিই খুব যত্ন করে নির্বাচন করে প্রাকৃতিক নির্বাচন। এর মানে হচ্ছে, কোন জিনটি জীব দেহে বংশানুক্রমিকভাবে প্রবাহিত হবে সেটি খুব জেনে, শুনে, বেছে ঠিক করা হয়। আর এভাবেই জীবের বিবর্তন ঘটে আরো অধিকতর শক্তির শরীর তৈরির দিকে, দুর্বল বা অপ্রয়োজনীয় অংগগুলি আস্তে আস্তে পরিবর্তিত হয় কিংবা বিলুপ্ত হয়ে যায়।

বিবর্তন নিয়ে করা প্রশ্নাবলীর উত্তরঃ

১। বিবর্তন কি শুধু একটা তত্ত্ব যেটি এখনো প্রমাণিত হয়নি?

উত্তরঃ বিবর্তন প্রমাণিত কিনা সেটা জানার আগে প্রমাণ ব্যাপারটা একটু ক্লিয়ার করে নেওয়া ভালো। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রমাণ সবসময় গাণিতিক নাও হতে পারে। উদাহরণস্বরুপ, বিশ্ব সৃষ্টি বিগ ব্যাং তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়। বিগ ব্যাং ঘটেছে প্রায় ১৪ বিলিয়ন বছর আগে। একে কোনো গাণিতিক সমীকরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। কিন্তু বিং ব্যাং এর পর থেকে মহাবিশ্ব কিভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে, কিভাবে মহাবিশ্বের বিভিন্ন গ্যালাক্সি, নক্ষত্র ইত্যাদি কাজ করে এসবের বিভিন্ন গাণিতিক মডেল আছে। মহাবিশ্বে ঘটে যাওয়া ঘটনা সমূহ বিগ ব্যাং দিয়ে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। এখন পর্যন্ত এমন কোনো ঘটনা বা বস্তু পাওয়া যায়নি মহাবিশ্বে যেটা বিগ ব্যাং দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবেনা।
বিবর্তনের ব্যাপারটা তেমনি। জিনতও্ব, ফসিল রেকর্ড, বিভিন্ন উদ্ভিদ এবং প্রাণীর শারীরিক পরিবর্তন ইত্যাদি সবকিছু বিবর্তন দিয়ে খুব চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। ল্যাবরেটরিতে সীমিত পর্যায়ে বিবর্তনকে পরীক্ষা করা হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত বিবর্তন তত্ত্বের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পাওয়া যাওনি।
বিজ্ঞানের কোনো সম্ভান্ত জার্নালে বিবর্তনের বিরুদ্ধে কোনো লেখা কখনো ছাপা হয়নি, বরং নেচার, সায়েন্টিফিক আমেরিকান, এবং জীব বিজ্ঞানের প্রায় সব জার্নালে বিবর্তন এর পক্ষে অহরহই লেখা ছাপানো হয়।

২। বিবর্তন এর প্রমাণ কী?

উত্তরঃ বিবর্তন নিয়ে করা সব ধরনের পর্যবেক্ষণ এবং এক্সপেরিমেন্ট বিবর্তনকেই সাপোর্ট করে। শত কোটি বছর আগে থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের সব ফসিলগুলোকে কালানুক্রমিকভাবে সাজালে পরিষ্কারভাবে বংশ থেকে বংশে ঘটে যাওয়া শারীরিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। বিভিন্ন উদ্ভিদ ও প্রানীর মধ্যে শারীরিক এবং জিনগত সাদৃশ্য এবং পার্থক্য থেকেও বিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায়। ফসিল রেকর্ড দেখে যেসব প্রাণীকে অতীতে একই পুর্বপুরুষ থেকে আগত মনে করা হয়েছিলো পরবর্তীতে জিন বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে তাদের মধ্যে জিনগত মিল প্রচুর। এর মানে ফসিল রেকর্ড সঠিকভাবে বিবর্তন এর প্রক্রিয়াকে সাপোর্ট করে।

৩। বিবর্তন কি প্রমাণ করে ঈশ্বর এর অস্তিত্ত্ব নেই?

উত্তরঃ বিবর্তন আর দশটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের মতোই একটি তত্ত্ব। বিগ ব্যাং তত্ত্ব, মধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব ইত্যাদির সাথে যেমন ঈশ্বর এর কোনো সম্পর্ক নেই বিবর্তন এর সাথেও ঈশ্বর এর কোনো সম্পর্ক নেই।

৪। কিন্তু বানর থেকে মানুষ এসেছে এতে আমাদের মর্যাদা ছোট হয়ে যাচ্ছে না?

উত্তরঃ প্রথমত, মানুষ বানর থেকে আসে নাই। মানুষ এবং বানর জাতীয় প্রাণী লক্ষ কোটি বছর আগে শিম্পাঞ্জীর মতো দেখতে একটি প্রজাতি থেকে বিবর্তিত হয়েছে। আর এতে আমাদের মানুষ হিসেবে মর্যাদা কমে যাওয়ার কিছু নেই। মানুষ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী, মানুষের সংস্কৃতি অনেক সমৃদ্ধ, মানুষের চিন্তা-চেতনা অনেক উন্নত - এগুলোর কিছুই তো মিথ্যা হয়ে যাচ্ছেনা বিবর্তনের কারণে।

৫। বিবর্তন কিভাবে সত্যি হতে পারে? প্রাণহীন নির্জীব বস্তু থেকে মানুষের মতো এতো জটিল প্রাণী কিভাবে তৈরি হতে পারে? এটা কি ঝড়ের কবলে পড়ে লোহা আর প্লাস্টিকের স্তুপ থেকে একটা বোয়িং প্লেন তৈরি হওয়ার মতো না?

উত্তরঃ ব্যাপারটা আপাত দৃষ্টিতে তাই মনে হতে পারে। একটা জিনিস চিন্তা করে দেখুন, আমরা সবাই কিন্তু মায়ের পেটে একটা নির্জীব অণু থেকে মাত্র নয় মাসে একটা জটিল মানব শিশুতে পরিণত হই! সেখানে বিবর্তন ঘটেছে কয়েক বিলিয়ন বছর ধরে। আর প্রাকৃতিক নির্বাচন সবসময় উপকারী পরিবর্তনটি গ্রহণ করার ফলে বিবর্তন আরো ত্বরাণ্বিত হয়। সব ধরণের পর্যবেক্ষণ যেখানে বিবর্তনকে সমর্থন করছে সেখানে শুধু "সত্যি ভাবতে কষ্ট হয়" ভেবে একটা বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে ফেলে দেওয়ার কোনো মানে হয়না।

তথ্যসূত্রঃ
১। Understanding Evolution (Click This Link)
২। How Evolution Works (Click This Link)
৩। The Greatest Show on Earth - Richard Dawkins
৪। Evolution - where we are from (http://www.pbs.org/wgbh/evolution/)
৫। Galileo's Finger - Ten great ideas of science , Peter Atkins
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29153497 http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29153497 2010-05-12 09:56:35
হ্যাক ইয়োরসেলফ – জীবনে সুখী হোন!
মূল লেখটি পাওয়া যাবে এখানে

~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

আপনি চাইলেই সুখী হতে পারেন। আপনি যে ধরণের জীবন চান সেটাই চাইলে পেতে পারেন। আপনি যে ধরণের মানুষ হতে চান সেটাও আপনি হতে পারেন।

আজ পর্যন্ত আমি আমার জীবনে যা যা শিখেছিঃ

১।

অপরকে দোষ দেওয়া বন্ধ করুণ। এটাই হবে প্রথম পদক্ষেপ। অপরকে দোষ দেওয়া বন্ধ করুণ এবং অতীতকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যান।

আপনি জানেন কাদের জন্যে আপনার জীবনে এতো সমস্যা। আপনার বস। আপনার স্বামী বা স্ত্রী। প্রেমিক বা প্রেমিকা। আপনার পরিবার। রাজনীতিবিদরা। যারা আপনাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে, ঝামেলায় ফেলেছে। কিংবা হয়তো আপনি নিজেই।
সারা জীবন নিজেকে বলে এসেছেন "অমুকের" কারণে আজ আপনার জীবনে এতো সমস্যা। অন্যের উপর নিজের জীবনের যাবতীয় দুঃখ-কষ্টের দায় চাপিয়ে দিয়ে নিজের জীবনের দায়িত্ব নিজে নেওয়া থেকে চমৎকারভাবে ফাঁকি দেওয়া যায়!

আমার কথা শুনুন - ভুলে যান সব। অতীত অতীতই, এই মুহুর্তে সেটার কোনো অস্তিত্ত্ব নেই। আপনার অতীত হারিয়ে গেছে সময়ের অতল গহবরে। যেটার অস্তিত্ত্বই নাই, সেটা আপনার বর্তমান জীবনে খুব বেশি ম্যাটার করে না। অতীত নিয়ে আপনার কিছুই করার নেই। আর যেটা নিয়ে আপনার কিছুই করার নেই সেটা নিয়ে সময় ও শক্তি নষ্ট করার কোনো মানে হয়না - আপনার আরো গুরুত্মপূর্ণ কাজ পড়ে আছে!

আমার কথা হয়তো নিষ্টুর শোনাতে পারে, বেশি সরলীকরণ মনে হতে পারে। আমি দুঃখিত সেজন্যে, কিন্তু আপনি অতীত নিয়ে পড়ে থাকলেও আপনার জীবন কিন্তু থেমে থাকবেনা। জীবন ছুটে চলছে মিনিটে ষাট সেকেন্ড গতিতে। হাত-পা ঝেড়ে উঠে দাঁড়ান। গতোকাল কী ঘটে গেছে সেটা নিয়ে আপনি কিছু করতে পারবেননা।

২।

"আমার লেখালেখির সময় নাই।" "আমি গাইতে পারিনা।" "মানুষের সাথে কথা বলতে আমার সমস্যা হয়।" "আমি দেখতে সুন্দর না।"

এগুলো আমি সবসময় শুনি। আমার চারদিকে আমি মানুষজনকে নিজের চারদিকে না পারার দেয়াল তৈরি করে বসে থাকতে দেখি, নিজেকে পিছিয়ে দিতে দেখি।

আমি তাদের জন্যে বলতে চাই - লেখালেখির জন্যে সময় তৈরি করো। কোনোকিছু না ভেবে গান গাও, মানুষের সাথে যেয়ে কথা বলো। নিজেকে সুন্দর বানাও!

হ্যাঁ, আমার কথাগুলো অতি সরলীকরণ মনে হতে পারে, কিন্তু আপনি "পারি না" বলেও কিন্তু অতি সরলীকরণ করছেন!

আমরা আমাদের জীবনে চমৎকার প্যাটার্ন তৈরি করতে পারি। মানুষ এটা অহরহই করে চলেছে। আমরা আমাদের জীবনের দিকে তাকাই, অতীতের দিকে তাকাই, অতীত কর্মকান্ডের দিকে তাকাই, এবং এগুলোর মধ্যে সরলরেখা টানি। আমরা ধরে নিই যেহেতু অতীতে আমরা কোনো কাজ একভাবে করেছি অতএব আমাদের বাকী জীবনেও একইভাবে কাজটি করে যেতে হবে। আমরা যেহেতু অতীতে ব্যর্থ হয়েছি, আমরা ভবিষ্যতেও ব্যর্থ হবো।

এই চিন্তা থেকে বের হয়ে আসুন।

নিজেকে চমকে দিন। না - নিজেকে মুগ্ধ করুণ।

যে কাজগুলি পছন্দ করেন না সেগুলি প্রতিনিয়ত করে যাওয়ার কোনো মানে হয়? একজনকে আপনার পছন্দ হচ্ছে, অথচ ভয়ে কিংবা লজ্জায় বলতে পারছেন না। প্রতিদিন তার কাছাকাছি যাচ্ছেন, কিন্তু কিছু বলছেন না, করছেন না। এরপর বাসায় ফিরে এসে কষ্ট পাচ্ছেন। কেনো? যে কাজটি আপনাকে কষ্ট দিচ্ছে, কেনো সে কাজটি প্রতিদিন করে চলেছেন? একবার সাহস করে তাকে মুখ ফুটে বলে ফেললেই তো আপনি এই কষ্ট থেকে বেঁচে যেতেন। সে যদি আপনাকে প্রত্যাখ্যানও করে সেটা কি এই প্রতিদিনের কষ্টের চেয়ে বেশি হতো?

মনে সাহস আনুন, যা করতে চান করে ফেলুন। প্রতিদিন একটা অশান্তি নিয়ে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার কোনো মানে হয়না। নতুন ব্যবসা করতে চান, শুরু করে দিন। কোনো কোর্সে ভর্তি হতে চান, ভর্তি হয়ে যান। কারো কোনো আচরণ আপনাকে কষ্ট দিচ্ছে, তার সাথে এটা নিয়ে কথা বলে ফেলুন। কিছু লিখতে ইচ্ছে হচ্ছে, লিখে ফেলুন। গান গাইতে ইচ্ছে হচ্ছে, গেয়ে ফেলুন। নিজেকে সুন্দর দেখতে ইচ্ছে করছে, শরীরের যত্ন নিন।

৩।

নিজের ভেতরের দানবটাকে বের করুণ।

আমি কার কথা বলছি বুঝতে পারছেন? এটা হচ্ছে আপনার ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা কন্ঠটি যেটি আপনি কিছু করতে গেলেই সবসময় পেছন থেকে বলতে থাকে - "তুমি এই কাজটা করতে পারবেনা।" আপনি এই দানবটাকে চেনেন। আপনি মনে করতে পারেন আপনি এই দানবটাকে ঘৃণা করেন, আসলে কিন্তু তা নয়। আপনি একে ভালোবাসেন। এমনকি আপনি এই দানবটাকে আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করতেও দিচ্ছেন। এটা যা বলে আপনি তাই করেন। যখনি আপনি কিছু করতে চান, পেতে চান আপনি আগে আপনার ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা দানবটির পরামর্শ নেন, দেখতে চান সে কি এটা বলে কিনা - "তুমি এটা করতে পারবেনা, এটা পেতে পারবেনা!"

যেটা আপনি বুঝতে পারছেননা তা হলো এই দানব আসলে কিছুই জানেনা। এটা একটা আহাম্মক। এটা একটা তোতা পাখি ছাড়া আর কিছু নয়। অতীতে আপনার ব্যর্থতাগুলোর কথা আপনাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া ছাড়া এর আর কনো কাজ নেই। অতীতে আপনার বাবা-মা, শিক্ষক কিংবা অন্য কেউ আপনাকে যখনি বলেছে আপনি কিছু করতে পারবেন না, তখনি এই দানব সেই কথাগুলো জমা করে ফেলেছে। এবং যখনি আপনি নতুন কিছু করতে যাবেন এই দানবটি সেই নেগেটিভ কথাগুলো আপনার দিকে ছুঁড়ে দিবে। আপনাকে পিছিয়ে দেয়াই এর লক্ষ্য।

দানবটাকে ঝেড়ে ফেলুন।

এরপর যখনি আপনি আপনার ভেতর থেকে কাউকে বলতে শুনবেন যে আপনি কোনো একটি কাজ করতে পারবেন না, কোনো কিছু চেয়ে পাবেন না, তখনি এই দানবটিকে আপনার সামনে কল্পনা করবেন। এরপর কল্পনায় একে মেরে কেটে ধ্বংস করে দিন। আপনার ভেতর থেকে যে কোনো ধরণের নেগেটিভ কন্ঠকে বের করে ছুঁড়ে ফেলে দিন। আপনার উপর আপনি ছাড়াআর কেউ যাতে কোনো নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে সেটা নিশ্চিত করুণ।

আপনি অবশ্যই যা চান তাই করতে পারবেন। আপনার ভেতরের দানবটি আপনাকে বলবে আপনি পারবেন না। আমাকে বিশ্বাস করুণ, আপনি পারবেন!

৪।

আপনার অস্তিত্ত্বই নেই।

আপনি ভাবছেন আপনার অস্তিত্ত্ব আছে। আপনার অস্তিত্ত্ব আসলে আপনার মনের ভেতর!

আসলে নিজেদেরকে নিজের সম্পর্কে যা বলি আমরা তাই। আমরা মনে মনে জানি আমরা কেমন মানুষ, আমরা কী করতে পারি, আমরা কী করতে পারিনা। যেহেতু আমরা মনে মনে সবসময় বলে এসছি আমরা কী পারি আর কী পারিনা, আমরা আসলে শক্তি এবং দূর্বলতার একটা লিস্ট। উদাহরণস্বরুপ, আত্মবিশ্বাস এর মতো বায়বীয় জিনিস আপনি শুধুমাত্র ভেবে ভেবেই নিজের মধ্যে নিয়ে আসতে পারবেন!

আপনার নিজের সম্পর্কে নিজের যেসব ধারণা আপনাকে কষ্ট দেয়, আপনার ক্ষতি করে, সেসব ধারণা যে আপনাকে ধরে রাখতে হবেই তার কোনো মানে নেই। যদি নিজের সম্পর্কে কোনো ধারণা আপনার পছন্দ না হয়, তাহলে সেটা বাদ দিয়ে আরেকটা ভালো ধারণা পছন্দ করে নিন নিজের জন্যে!

ব্যাপারটা ছেলেমানুষী মনে হতে পারে, কিন্তু এটা খুবই কার্যকর একটা জিনিস! আপনি যে ধরণের মানুষ হতে চান সেরকম অভিনয় করুণ। নিজেকে সেই কল্পনার মানুষ ভাবুন। তার মতো চিন্তা করুণ। তার মতো কাজ করুণ, না পারলে বানিয়ে বানিয়ে অভিনয় করুণ।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, আপনি যখন আপনার কল্পনার মানুষটির মতো অভিনয় করা শুরু করবেন, তখন চারপাশের সবাই ধীরে ধীরে আপনার সাথে সেই মানুষটির মতোই ব্যবহার করবে।

এবং আপনিও ধীরে ধীরে সেটা বিশ্বাস করা শুরু করবেন। এবং এক সময় আপনি সেই মানুষে পরিণত হবেন।

আপনার নতুন "আমি"তে স্বাগতম!

৫।

আপনি আসলে আপনার পরিবেশের একটা প্রডাক্ট।

প্রায় সবাই এটা জানে, তবে সাধারণত নিজের ভাগ্যের জন্যে পরিবেশকে দায়ী করেন। কিন্তু তারা একটা গুরুত্মপূর্ণ কথা ভুলে যানঃ

মানুষ তার পরিবেশ নিজের মতো করে ভেঙ্গে গড়তে পারে!

এর মানে হচ্ছে, যদি পরিবেশ আমাদের প্রভাবিত করতে পারে এবং আমরা পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারি তাহলে আমরা আমাদের নিজেকে প্রভাবিত করতে পারি।

- আপনার পরিবেশে মানুষ আছে। ভেবে দেখুন কাদেরকে আপনি পছন্দ করেন এবং কাদেরকে আপনি অপছন্দ করেন। যারা আপনার জীবনে নেগেটিভ প্রভাব তৈরি করেন তাদের থেকে দূরে সরে যান। হতে পারে তাদের কেউ কেউ আপনার কলিগ, বস, আপনার বন্ধু, কিংবা আপনার আত্মীয়, কিন্তু তাতে কিছু যায় আসেনা। আপনার জীবনে ক্ষতির কারণ হয়ে যদি কেউ দাঁড়ায় তাহলে তাদের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকাই আপনার জন্যে ভালো। হয় আপনি তাদের সাথে আপনার সম্পর্ক আগাগোড়া বদলে ফেলবেন না হয় তাদেরকে পুরোপুরি এড়িয়ে যাবেন।

- আপনার পরিবেশে আছে লক্ষ্য! জীবনের লক্ষ্যগুলি খুব বেশি যাতে অসম্ভব না হয় সেদিকে খেয়াল রাখবেন। এমন সব লক্ষ্য ঠিক করবেন যেগুলো আপনি অর্জন করতে পারবেন। লক্ষ্য ঠিক করুণ এবং সেগুলো অর্জন করুণ। একবারের জন্যেও নিজেকে বলবেন না যে আপনি আপনার লক্ষ্য অর্জন করতে পারবেন না। সেটা হচ্ছে পুরনো আপনি। নতুন আপনি যেকোনো যৌক্তিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারবেন। পুরনো আপনি ছিলেন আপনার দানবের নিয়ন্ত্রণে, যে সবসময় আপনাকে পেছনে টেনে ধরে রাখতো, সবসময় আপনাকে বলতো আপনি কিছু করতে পারবেন না। আপনার ভেতরের দানবটিকে আপনি মেরে ফেলেছেন, আপনার নতুন ব্যক্তিত্বে "পারবো না" কথাটি আর নেই!

বাসা কিংবা রুম গোছানো দরকার? কাপড় চোপড় অনেক দিন ধরে ধোয়া হচ্ছে না? যান কাজটি আজই করে ফেলুন। একটা পরিষ্কার ঘর এবং পরিষ্কার কাপড় চোপড় আপনার মনকে অনেক প্রফুল্ল রাখে। কিন্তু তাই বলে একসাথে পুরো বাসা ধুয়ে মুছে ফেলা, কিংবা সব কাপড় চোপড় ধুয়ে ফেলার চিন্তা করবেন না। যতোটুকু কাজ করতে পারবেন একেবারে সেটারই দায়িত্ব নিবেন, বেশি কিছু করতে গেলে আবার কিছুই করা হয়ে উঠবেনা। কোনোভাবেই আপনার ভেতরের দানবটিকে সুযোগ দিবেন না।

একেবারে পুরো একটী বই লিখে ফেলার প্ল্যান করবেন না। বরং ঠিক করুণ আজকে আমি প্রথম পাঁচ পৃষ্ঠা লিখবো। এবং সেটা করে ফেলুন, প্রথম পাঁচ পৃষ্ঠা লিখে ফেলুন। আপনার স্বপ্ন ঠিক করুণ এবং একে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করুণ। এরপর ছোট ছোট অংশগুলোকে অর্জনের জন্যে কাজ শুরু করে দিন।

এবং যখন আপনি আপনার ছোট ছোট লক্ষ্যগুলো অর্জন করা শুরু করবেন, দেখবেন আপনি এটা পছন্দ করছেন। ছোট অর্জগুলো আপনাকে সুখী করছে, আপনার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যাচ্ছে। এবং স্বপ্ন পুরণের জন্যে কাজ করার প্রতি আপনার এক ধরণের আকর্ষন তৈরি হবে।

- আপনার পরিবেশের মধ্যে আপনিও আছেন। নিজের যত্ন নিন। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করুণ, ব্যায়াম করুণ।আমি বলছিনা যে মাঝে মধ্যে রাত জাগা যাবেন, চকলেট খাওয়া যাবেনা, আরাম করে বসে টিভি দেখা যাবেনা, আড্ডা দেওয়া যাবেনা। মূল ব্যাপারটি হচ্ছে যে কাজগুলো আপনাকে সুখী করে, আপনার জন্যে একটা নিরাপদ বর্তমান আর ভবিষ্যৎ তৈরি করে দেয় সে কাজগুলো করা শুরু করুণ। শরীরের যত্ন নিন বেশি করে, কারণ একটা সুস্থ সবল শরীর থাকলে আপনার মনও সুস্থ থাকবে। আর মন সুস্থ থাকলে আপনি আপনার চারপাশকে সুস্থ সুন্দর করার জন্যে কাজ করার উদ্দীপনা পাবেন।

- নিজের চেহারার যত্ন নিন। আপনি যদি নিজেকে নিয়ে খুশি না হন, যদি আয়নায় আপনার চেহারা দেখে আপনি বিরক্ত হন, তাহলে আপনার চেহারা নিয়ে কিছু করাটা আপনার জন্যে জরুরী। আপনার চেহারাকে সুন্দর করার চেষ্টা করুণ - চুলের একটা নতুন স্টাইল ট্রাই করুণ, একটা নতুন চশমা পরে দেখুন, নতুন জুয়েলারি, নতুন ফ্যাশনের জামা পরে দেখুন। খুব যে দামী কিছু পরতে হবে তা না, সাধারণ দামে অনেক ভালো চমৎকার পোষাক পাওয়া যায় মার্কেটে। নিজে যে ধরণের মানুষ হতে চান ঠিক করুণ সেই মানুষটি দেখতে কেমন হবে। সেই মানুষটির পোষাক কেমন হবে। সে ধরণের পোষাক পরুণ। এটা সঙ্কীর্ণতা নয়, আত্মম্ভরিতাও নয়। এতা হচ্ছে নিজেকে বদলে দেওয়া, নিজের স্বপ্নের মানুষটিতে রুপ নেওয়া। এমনকি পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন আদিবাসী গোত্রও জানে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, নতুন পরিবেশে, নতুন দায়িত্বে মানুষের নতুন ধরণের সাজ-সজ্জা গুরুত্মপূর্ণ।

মানুষ কোনো নির্জীব বস্তু না। মানুষ একটা সিস্টেম। যেকোনো সিস্টেম এর মতোই, যদি ইনপুট পরিবর্তন করে দেন তাহলে আউটপুটও পরিবর্তন হয়ে যাবে!

৬।

শেষ কথাঃ

আত্ম-বিশ্লেষণ অনেক সময় কাজে নাও লাগতে পারে।

আপনাকে নিশ্বাস নিতে হবে - এটা মনে করে নিশ্বাস নেওয়ার দরকার নাই। জাস্ট নিশ্বাস নিন। এটা টাও দর্শন।

সবকিছুর মূলে হচ্ছে এই প্যারাডক্স। "আমি কি আমি যেই মানুষটি হতে চাই সেই মানুষের মতো জীবন যাপন করছি?" - যেদিন আপনার নিজেকে আর এই প্রশ্ন করার প্রয়োজন পড়বেনা, সেদিন বুঝবেন আপনি আপনার স্বপ্নের মানুষে পরিণত হয়েছেন।

সবশেষে, যদি আমি আপনাকে একটা শেষ কথা বলে বিদায় নিতে চাই সেটি হবেঃ

নিজেকে সুখী দেখতে না পেয়ে অশান্তি করা বন্ধ করুণ। জাস্ট সুখী হয়ে যান।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29146660 http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29146660 2010-05-02 03:18:10
দেশের বাইরে দেশ
সেই পৃথিবীর শেষ সীমানার দেশ(!) আমেরিকায় পড়তে যাওয়ার ইচ্ছে ছিলো সবসময়। তাই বিশ্ববিদ্যালয় এর পড়ালেখা শেষ করে আমেরিকার কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়এ উচ্চশিক্ষার জন্যে ভর্তির আবেদন করি। ভাগ্যক্রমে কয়েকটি থেকে অফারও পেয়ে যাই। এবং অবশেষে ২০০৬ সালে ওহাইও অঙ্গরাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগে পড়তে চলে আসি।

আমেরিকা বিশাল দেশ। এর পূর্ব দিকে আটলান্টিক আর পশ্চিম দিকে প্রশান্ত মহাসাগর। এ দুই মহাসাগর এর মধ্যে প্রায় তিন হাজার মাইল কিংবা সাড়ে চার হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত আমেরিকা। উত্তর দক্ষিনেও প্রায় দেড় হাজার মাইল লম্বা এই দেশ। পূর্ব দিকে নিউ ইয়র্ক শহরে যখন সকাল নয়টা বাজে পশ্চিমের সিয়াটল শহর তখনো ঘুমিয়ে আছে ভোর ছয়টায়। আমি যে জায়গাটায় এসেছি তার নাম ওহাইও, শহরের নাম কলাম্বাস। ওহাইও স্টেইট ইউনিভার্সিটি আমেরিকার বৃহত্তম ইউনিভার্সিটি, পঞ্চাশ হাজার এর বেশি ছাত্রছাত্রী এখানে লেখাপড়া করে।

আমার প্রফেসর আমাকে নির্ধারিত সময়ের এক সেমিস্টার আগে গ্রীষ্মকালীন সেমেস্টারে নিয়ে এসে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের একটা ন্যাশনাল ল্যাবে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। জীবনে প্রথমবারের মতো আমেরিকায় পড়তে এসেছি, ঠিকমতো ইংরেজী বলতে পারিনা, এর মধ্যে প্রায় মরুভূমির মতো (পুরো ওয়াশিংটন এর ওই অংশটুকুই বৈচিত্র্যহীন মরুভূমির মতো) জায়গায় ওই ল্যাবটরিতে যেয়ে পড়লাম মহা ফাঁপরে। উঠলাম ওই ল্যাবের গেস্ট হাউজে। অফিস এর সময় চারদিকে অনেক মানুষ থাকে, কিন্তু বিকেল হয়ে গেলে একটা কাকপক্ষীও চোখে পড়েনা। নতুন বিদেশে এসেছি, গাড়ি কেনার প্রশ্নই ওঠেনা অথচ গাড়ি ছাড়া এককদম চলারও উপায় নাই। এখানে আসার আগে ইন্টারনেট ঘেঁটে এখানকার বাংলাদেশী কমিউনিটি সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছিলাম। অনেক খোঁজাখুঁজির পর আমার ল্যাবের পাশেই অবস্থিত ওয়াশিংটন স্টেইট বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে একজন বাংলাদেশী অধ্যাপক এর নাম পেয়েছিলাম। ওনাকে ইমেইল করে এসেছিলাম আমি আসার আগে। তাই একদিন বিকেল বেলায় যখন উনি গাড়ি নিয়ে আমার গেস্ট হাউজের সামনে এসে হাজির হলেন তখন আমার মনে হলো স্রষ্টা আকাশ থেকে ফেরেশতা পাঠিয়েছেন! কয়েকদিন ভাত খেতে না পেরে আমার অবস্থা হালুয়া টাইট। উনি আমাকে ওনার বাসায় নিয়ে যেয়ে ঘরে রান্না করা তরকারী দিয়ে পেট ভরে খাইয়ে দিলেন। গরম গরুর মাংশের ঝোল দেখে আমার চোখ চকচক করে উঠেছিলো! এরপর উনি আমাকে প্রায়ই গাড়ি করে ওনার বাসায় নিয়ে যেতেন, মজার মজার খাবার খাওয়াতেন। গ্রোসারী স্টোরএ নিয়ে যেতেন। সেখানকার ছোটখাট বাংলাদেশী কমিউনিটির সাথে পরিচয় করে দিয়েছিলেন। প্রায় মাস তিনেক ওই ল্যাবে কাটিয়ে ফিরে আসি বিশ্ববিদ্যালয়ে সত্যিকারের ক্লাস করার জন্যে!

বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম সেমিস্টারে একদিন অ্যালগরিদম ক্লাস থেকে বের হয়ে লিফটএ উঠেছি। আমার সাথে কয়েকটি ভারতীয় ছেলেমেয়েও ঢুকলো লিফটে। আমাকে অবাক করে দিয়ে দেখি ওরা বাংলায় কথা বলা শুরু করলো নিজেদের মধ্যে! আমি সাথে সাথেই ওদের জিজ্ঞেস করলাম - "তোমরা বাংগালী?" "হ্যাঁ, আমরা কোলকাতার" - ওদের উত্তর। এরপর আমি আমার পরিচয় দিলাম, বললাম আমি বাংলাদেশের ছেলে। সেই থেকে ওদের সাথে আমার বন্ধুত্ব। ঘটনাক্রমে ওরা আমার পাশের অ্যাপার্টমেন্টএ থাকতো, তাই ওদের সাথেই হতো আমার যাবতীয় ওঠাবসা।

আরেকদিন হাই পারফরমেন্স কম্পিউটিং ক্লাস থেকে বের হয়েছি, একটা ছেলে এসে জিজ্ঞেস করলো ওই ক্লাসের একটা টপিক আমার কাছে আছি কিনা। আমি জবাব দেওয়ার পর ও জিজ্ঞেস করলো "হয়ার আর ইউ ফ্রম?" আমি বললাম, "আই এম ফ্রম বাংলাদেশ"। আমাকে প্রচন্ড অবাক করে দিয়ে ও তখন বললো সেও বাংলাদেশের ছেলে! যদিও ও বড় হয়েছে আমেরিকায়, ওরা বাবা-মা বাংলাদেশের। কাকতাল আর কাকে বলে!

কলাম্বাস শহরে প্রায় হাজারখানেক বাংলাদেশীর বসবাস। আমেরিকার খুব কম শহরেই এতো ফ্রেন্ডলি এবং আন্তরিক মানুষ দেখেছি আমি। আমেরিকায় নতুন হিসেবে আমার যেসব সমস্যা হতে পারতো সেটি অনেক কম হয়েছে কলাম্বাস শহরের কিছু চমৎকার মানুষের ভালোবাসা, আন্তরিক সাহায্যের কারণে।

আমেরিকায় সামারের (গ্রীষ্মকাল) সময়ে সাধারণত স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস বন্ধ থাকে। ছাত্রছাত্রীরা তখন বিভিন্ন কম্পানীতে ইন্টার্নশীপ করার চেষ্টা করে থাকে। ভাগ্যক্রমে আমি মাইক্রোসফটএ একটা ইন্টার্ণশীপ পেয়ে যাই। মাইক্রোসফট এর প্রধান অফিস ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের সিয়াটলে অবস্থিত। তাই আমার দ্বিতীয় সামারও কাটে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যে। ওয়াশিংটন অপূর্ব সুন্দর একটা জায়গা। আমি ইন্টার্ণশীপ করার জন্যে সিয়াটল যাচ্ছি এটা শুনে জাফর ইকবাল স্যার লিখেছিলেন - "ওয়াশিংটন আমেরিকার সবচেয়ে সুন্দর জায়গা, ভালো করে ঘুরে ফিরে দেখো জায়গাটা। একটা ভালো ম্যাপ বই কিনে পাহাড়-পর্বত, বনভূমি সব ঘুরে দেখো"। জাফর ইকবাল স্যার আঠারো বছর আমেরিকায় ছিলেন, অতএব স্যারের কথা যে ভুল হবেনা সেটা আমি নিশ্চিত ছিলাম। ওয়াশিংটন এর সৌন্দর্য্য দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম! ঘরের কাছেই বরফে ঢাকা পর্বতমালা, চমৎকার সব পার্ক, মনমুগ্ধকর লেক, চারদিকে খালি সবুজ আর সবুজ!

ওয়াশিংটনে পা রাখার দু'একদিনের মধ্যেই ছুটলাম উইনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটন এর উদ্দেশ্যে। জাফর ইকবাল স্যার এখান থেকেই পিএইচডি করেছেন কিনা! ক্যাম্পাসে হাঁটছি আর ভাবছিলাম এই ক্যাম্পাস দিয়ে আজ থেকে প্রায় ত্রিশ বছর আগে জাফর স্যার হেঁটেছিলেন! খুঁজে খুঁজে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগটি বের করে সেখানে যেয়ে হাজির হলাম। জাফর স্যার এর সময়কার প্রফেসরদের বের করার চেষ্টা করলাম। একজনের অফিস রুমও খুঁজে পেলাম! ফটাফত কয়েকটি ছবিও তুলে নেওয়া হলো!

আমেরিকার মন্টানা আর ওয়াইওমিং অঙ্গরাজ্যের মাঝে অবস্থিত ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্ক। ওয়াশিংটন এর সিয়াটল শহর থেকে এটি প্রায় নয়'শ মাইল বা পনের'শ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ইন্টার্ণশীপের সময় আমি আর আমার স্ত্রী মিলে ইয়েলোস্টোন পার্ক দেখতে গেলাম। আশি থেকে নব্বই মাইল বেগে ড্রাইভ করার পরেও মন্টানার বোজম্যান শহরে পৌঁছাতে আমাদের প্রায় ১২ ঘন্টা লেগে গেলো। এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ একটানা ড্রাইভ করার রেকর্ড। পথে যদিও মাঝে মাঝে থেমেছিলাম। বোজম্যানে আমাদের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন পিএইচডি স্টুডেন্ট ছিলেন। বোজম্যান পৌঁছার পরদিন সকালবেলা আমাদের পাঁচজনের দল নিয়ে বের হয়ে পড়লাম ইয়েলোস্টোন পার্ক এর উদ্দেশ্যে। বোজম্যান থেকে এটি প্রায় এক/দেড় ঘন্টার রাস্তা। বোজম্যান থেকে ইয়েলোস্টোন যাওয়ার রাস্তাটা খুবই সুন্দর। আমরা পথে একটা সুন্দর লেক এর পাড়ে থেমে ছবি তুললাম বেশ কিছু। এরপর পার্কে ঢুকে আমি রীতিমতো স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। একটা জায়গা কি করে এতো সুন্দর হতে পারে আমার মাথা ঢুকে না। বিখ্যাত ওল্ড ফেইথফুল গেইসার বিশ্বস্ত বন্ধুর মতো প্রতি আশি-নব্বই মিনিট পরপর প্রায় দেড়শ ফুট উপরে ছুঁড়ে মারছে ভূগর্ভস্ত পানি। এর সামনে গেলেই দেখা যাবে পরবর্তী কখন এটি ফুঁসে উঠবে সেটা লেখা আছে। একটা জায়গায় যেয়ে দেখলাম পানির বিচিত্র সব রঙ। নিজের চোখে না দেখলে সেটি বিশ্বাস করা কষ্টকর, পানি আর মাটির যে এতো বিচিত্র রঙ হতে পারে সেটা এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার!

ইয়েলোস্টোন পার্কে আছে অপরুপ সুন্দর ইয়েলোস্টোন লেক। আমার জীবনে আমি এতো স্বচ্ছ পানির জলাধার দেখিনি কখনো। লেক এর পেছনে দিগন্ত বিস্তৃত বরফে মোড়া পর্বতমালা। সে এক অবর্ণনীয় সৌন্দর্য্য! লেক এর পাড়ে যেয়ে আমার শুধু মনে হচ্ছিলো "আহা, এখানে বসে যদি জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারতাম"!

ভাগ্যের পরিক্রমায় পড়ালেখা শেষ করার পর আমার জীবনের প্রথম চাকুরীটি পাই ওয়াশিংটন এর একটি কম্পানীতে। সুযোগ পাই জাফর স্যার এর কথামতো জায়গাটা ভালো করে ঘুরে ফিরে দেখার! ওয়াশিংটন এর বিভিন্ন জায়গা নিয়ে লিখতে গেলে অনেকগুলো লেখা লিখতে হবে। সেটা আগামী পর্বগুলোর জন্যে তোলা থাকলো।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29139123 http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29139123 2010-04-21 13:24:03
লাইফ ইজ এ গেইম অফ ইঞ্চেস

১৯৯৯ সালে মুক্তি পাওয়া "এনি গিভেন সানডে " তে আল পাচিনো একটা ফুটবল দলের কোচ এর চরিত্রে অভিনয় করেন। ফাইনাল খেলার আগে কোচ হিসেবে তিনি একটি অসাধারণ বক্তৃতা দেন। সেই বক্তৃতাটি যেকোনো প্রতিযোগিতার জন্যে প্রচন্ড অনুপ্রেরণামূলক। হয়তো আমাদের ক্রিকেট দলকে এই বক্তৃতার ভিডিওটি দেখানো উচিৎ!
মূল ইংরেজীটি পাওয়া যাবে এখানে
ইউটিউব ভিডিওঃ http://www.youtube.com/watch?v=9rFx6OFooCs

ইউটিউবে ভিডিওটি দেখলে বুঝা যাবে তাঁর এক বক্তৃতায় খেলোয়াড়রা কিভাবে জেতার জন্যে পাগল হয়ে উঠে!

=============================

আমি আসলেই জানিনা কী বলবো।
আর মাত্র তিন মিনিট পরেই আমাদের খেলোয়াড় জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ শুরু হচ্ছে।
হয় আমরা সবাই টিম হিসেবে জয়ী হবো, অথবা প্রতিপক্ষ আমাদের ভেঙ্গে চুরমার করে দিবে -
ইঞ্চি ইঞ্চি করে, কৌশলের মাধ্যমে ওরা আমাদের ধূলোয় মিশিয়ে দিবে।
বিশ্বাস করো, আমরা এই মুহুর্তে একটা নরকে আছি।
এখন আমরা প্রতিপক্ষের মার খেয়ে খেয়ে এই নরকে আটকা পড়ে থাকতে পারি, অথবা -
আমরা আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে যুদ্ধ করে এখান থেকে বের হয়ে যেতে পারি।
একটু একটু করে, ইঞ্চি ইঞ্চি করে এগিয়ে যেয়ে।

এখন কথা হচ্ছে, আমি তোমাদের জন্যে এই যুদ্ধটা করে দিতে পারবো না।
আমার অনেক বয়স হয়ে গেছে।
চারদিকে তাকিয়ে এতো তরুণ বয়সীদের দেখে আমি বুঝতে পারি আমি জীবনে কতো ভুল করেছি -
আমি আমার সব টাকাকড়ি নষ্ট করেছি এবং আপনজনদের দূরে ঠেলে দিয়েছি।
এবং ইদানিং আয়নার সামনে দাঁড়ালে যে মানুষটিকে আমি দেখতে পাই তাকে কেনো যেনো সহ্য করতে পারিনা।
আসলে যখন তুমি বুড়ো হতে শুরু করো তখন তোমার জীবন থেকে অনেক কিছু হারিয়ে যায়।
কিন্তু বুড়ো হবার আগে এই জিনিসটা তেমন চোখে পড়েনা।

একসময় তুমি বুঝতে পারো জীবনটা হচ্ছে একটা ইঞ্চির খেলা।
এবং ফুটবলও তাই।
কারণ, ফুটবল কিংবা জীবন, দুটোতেই ভুল করার সুযোগ খুবই কম।
ফুটবলে তুমি বলের কাছে আধা কদম আগে বা পরে আসলে বলটা মিস করে ফেলো।
আধা সেকেন্ড আগে বা পরে পৌঁছালে প্রতিপক্ষের পায়ে চলে যায় তোমার বল।
এই যে একটুর জন্যে, এক বা আধা ইঞ্চির জন্যে হেরে যাওয়া, এটা জীবনের সবক্ষেত্রে সত্যি।
পুরো খেলাজুড়ে, প্রতিটি সেকেন্ড জুড়ে এই ইঞ্চির ব্যাপারে তোমাকে সচেতন থাকতে হবে।

আজকের এই খেলায়, আমরা আমাদের টিম নিয়ে এই এক ইঞ্চির জন্যে যুদ্ধ করবো।
এই ইঞ্চির জন্যে আমরা আমাদের প্রতিপক্ষকে ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলবো।
আমরা আমাদের হাতের থাবা এবং বজ্রমুষ্টি শক্ত করে সেই ইঞ্চি ছিনিয়ে নেবো।
কারণ আমরা জানি - এই ইঞ্চিগুলোর সমষ্টিই নির্ধারণ করবে জয় পরাজয়।
এই ইঞ্চিগুলোই নির্ধারণ করবে কে বাঁচবে কে মরবে।

শুনো -
যেকোনো যুদ্ধে এই ইঞ্চি সেই পাবে যে এটা পাওয়ার জন্যে জীবন দিতে প্রস্তুত।
এবং আমি জানি, আমি বেঁচে থাকতে চাই এই জন্যে যে আমি সেই ইঞ্চির জন্যে যুদ্ধ করতে এবং জীবন দিতে প্রস্তুত।
কারণ এটাকেই বলে সত্যিকারের বেঁচে থাকা।

কথা হচ্ছে, আমি তোমাদের জোর করে এই যুদ্ধ করাতে পারবো না।
তোমাকে তোমার চারদিকে তাকাতে হবে।
তোমার টিমমেটদের চোখের মধ্যে যুদ্ধে জয়ী হবার আগুন দেখতে হবে।
আর এটা তখুনি দেখবা যখন তোমার টিমমেটরা তোমার মধ্যে সেই আগুন দেখতে পায়।
এবং এটাকেই বলে সত্যিকারের টিম।
অতএব, আমরা হয় একটা টিম হিসেবে আজকের খেলায় জয়ী হবো, অথবা -
আমরা প্রত্যেকে ব্যক্তিগতভাবে পরাজয়ের লজ্জায় ডুবে মরবো।
আর এটাই হচ্ছে ফুটবল।

এখন বলো - তোমরা কী জয়ের জন্যে জীবন দিতে প্রস্তুত?
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29102950 http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29102950 2010-02-22 06:01:54
বোধ - জীবনের নতুন মানে
মূল ইংরেজীটি পাওয়া যাবে এখানে

===========================================

জীবনে একটা সময় আসে যখন তোমার সত্যিকারের একটা বোধ জন্ম নেয়, যখন তুমি জীবনকে সত্যিকারভাবে বুঝতে পারো। তীব্র হতাশা আর দুঃখের একটা পর্যায়ে একসময় তোমার ভেতরের "আমি" জেগে ওঠে এবং চিৎকার দিয়ে বলে - যথেষ্ট হয়েছে! নিজের সাথে নিজে যুদ্ধ করতে করতে একসময় তুমি শান্ত হয়ে আসো, তোমার কান্না থেমে যায়, তুমি আয়নায় তোমাকে দেখো, তুমি জানালা খুলে বাইরের আকাশটাকে দেখো। আর তখন আস্তে আস্তে তুমি জীবনকে আবিষ্কার করো একটু অন্যরকমভাবে, পৃথিবীটাকে দেখো একটু অন্য চোখে।

এটা হচ্ছে তোমার নতুন জীবন বোধঃ

তুমি বুঝতে পারো তোমার চারপাশের সবকিছু বদলে যেয়ে তোমার সব আশা আর স্বপ্নগুলি সত্যি করে দিবে এটা কখনোই হবার নয়। তুমি যে সুখ, শান্তি, আর নিরাপত্তা চাচ্ছো সেটা এমনি এমনি তোমার কাছে ছুটে আসবেনা। তুমি মেনে নিতে শেখো যে তুমি কোন রাজপুত্র কিংবা রাজকন্যা না এবং বাস্তব জীবনে "দি এন্ড" সবসময় সুখকর হয়না। "অতঃপর তাহারা সুখে শান্তিতে বাস করিতে লাগিলো" এই ব্যাপারটা শুরু করতে হবে তোমার নিজের কাজের মাধ্যমে এবং এটা মেনে নেওয়ার মাধ্যমেই শান্তি ও সুখ আসার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

তুমি আনুধাবন করতে পারো যে তুমি নিজে পারফেক্ট না এবং সবাই সবসময় তোমাকে পছন্দ নাও করতে পারে, তোমার সব কাজে খুশি নাও হতে পারে - এবং এতে দোষের কিছু নেই। সবার নিজস্ব দৃষ্টিকোন এবং মতামত থাকতে পারে। তখন তুমি নিজের অবস্থানকে শক্ত করার জন্য, নিজেকে আরো পরিপূর্ণ করার জন্য কাজ শুরু করো। এভাবে তোমার মধ্যে তৈরি হয় এক নতুন আত্মবিশ্বাস।

অন্যরা তোমার জন্য কী করলো কিংবা কী করে নাই সেটা নিয়ে তুমি অভিযোগ অনুযোগ করা বন্ধ করো। এবং তুমি বুঝতে পারো জীবনে অনিশ্চয়তার উপর ভর করেই তোমার এগিয়ে যেতে হবে। তুমি আবিষ্কার করো যে মানুষ সবসময় যা বুঝাতে চায় তা বলেনা এবং যা বলে তা বুঝাতে চায়না এবং তোমার প্রয়োজনের সময় সবাই তোমার পাশে নাও থাকতে পারে। সবার নিজের জীবনে ব্যস্ত থাকার অনেক জিনিস আছে, অতএব তোমাকে নিজের উপর নির্ভর করা শিখতে হবে। আর স্বনির্ভর হওয়ার মাধ্যমে তোমার নিজের জীবনে নিরাপত্তাবোধ আসবে।

তুমি মানুষের দিকে আঙ্গুল তাক করা বন্ধ করো এবং তাদের দুর্বলতা ও ভুলত্রুটি মেনে নিতে শেখো। আর এভাবে মানুষের ভুলত্রুটি ক্ষমা করার মাধ্যমে তোমার মনে একধরণের প্রশান্তি জন্ম নেয়।

তুমি বুঝতে পারো যে তুমি নিজেকে এবং তোমার চারপাশের পৃথিবীকে যেভাবে মূল্যায়ন করো সেটা এসেছে তোমার মনের মধ্যে চারপাশ থেকে ঢুকানো অসংখ্য তথ্য ও তত্ত্বের মাধ্যমে। তুমি তখন তোমার মগজে ঢুকানো এইসব হাজার হাজার তথ্য ও তত্ত্বের যাচাই বাছাই করতে থাকো। তোমার নিজের সম্পর্কে মূল্যায়ন, তোমার কী পরা উচিৎ কী পরা উচিৎ না, তোমার কী ভালো লাগে কী ভালো লাগেনা, তোমার কী বিশ্বাস করা উচিৎ কী বিশ্বাস করা উচিৎ না, তুমি কোথায় থাকবা কোথায় থাকবানা, কী পেশা হবে তোমার, কাকে বিয়ে করবে, বাব-মা কিংবা সন্তানের সাথে তোমার সম্পর্ক কেমন হবে - এই সবকিছু নিয়ে তুমি নতুন করে ভাবতে বসো। তুমি তোমার চিন্তাভাবনার বদ্ধ পৃথিবীকে খুলে দাও এবং নতুন ধরণের, ভিন্ন ধরণের দৃষ্টিকোন এবং মতামতকে গুরুত্ম দিতে শেখো। তুমি জীবনের মানেকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করো।

জীবনে তোমার কী লাগবে এবং তুমি কী চাও এটা তুমি আরো ভালোভাবে বুঝতে পারো, এবং পুরনো, ভুল বিশ্বাস এবং তত্ত্ব থেকে তুমি বের হয়ে আসো। আর এভাবেই তুমি অন্যের মতামত ও কন্ঠ থেকে বের হয়ে এসে তোমার সত্যিকারের সত্ত্বার কথা শুনো।

তুমি শেখো যে দানের মধ্যে বড় প্রাপ্তি থাকে এবং সৃজনশীলতা এবং অন্যদের সাহায্য করা একটা চমৎকার মর্যাদাকর ব্যাপার।

তুমি শেখো যে সততা এবং সত্যবাদিতা পুরনো যুগের নীতিকথা নয় শুধু। জীবনের মূল ভিত্তি হতে হবে সততা এবং সত্যবাদিতা।

তুমি বুঝতে শেখো যে সবকিছু তোমাকে জানতে হবে এমন কোনো কথা নেই; পৃথিবীকে বাঁচানো তোমার একার দায়িত্ব নয়, এবং গাধা পিটিয়ে মানুষ করাও তোমার পক্ষে সম্ভব নয়। তুমি দোষ এবং দায়িত্ব এর মধ্যে পার্থক্য করতে শেখো, বিভিন্ন জিনিসের সীমারেখা টানতে শেখো, এবং অন্যকে প্রয়োজনে "না" বলতে শেখো।

এরপর তুমি ভালোবাসা সম্পর্কে জানতে পারো - রোমান্টিক ভালোবাসা এবং পারিবারিক ভালোবাসা। তুমি শেখো কতোটুকু ভালোবাসা উচিৎ, কতোটুকু স্যাক্রিফাইস করা উচিৎ, কখন স্যাক্রিফাইস বন্ধ করে দেওয়া উচিৎ, কখন ভালোবাসাবাসি বন্ধ করে দেওয়া উচিৎ।

তুমি সম্পর্ককে যেমন আছে তেমনই দেখতে শেখো, কল্পনায় তুমি কী চাও তেমনভাবে নয়। তুমি মানুষকে নিয়ন্ত্রণ না করা শেখো। তুমি শেখো যে মানুষ সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন হয়, তাদের ভালোবাসাও কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে। তুমি তোমার মতো করে, শুধু মাত্র নিজেকে সুখী করার জন্যে নিজের মতো করে ভালোবাসা দাবী করতে পারোনা।

তুমি বুঝতে শেখো নির্জনতা মানেই একাকীত্বতা নয়। আয়নার দিকে তাকিয়ে তুমি অনুধাবন করো তুমি কখনোই তোমার মনমতো সুন্দর হতে পারবেনা; অতএব তুমি তোমার মাথার ভেতরে থাকা তোমার মডেল চেহারাটি সরিয়ে ফেলো।

তুমি তোমার শরীরের মূল্য বুঝতে শেখো। তুমি স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে শুরু করো, ব্যায়াম করা শুরু করো। তুমি বুঝতে শেখো যে ক্লান্তি আমাদের প্রানশক্তি কমিয়ে দেয় এবং আমাদের মনে দূর্বলতা এবং ভয় ঢুকিয়ে দেয়। অতএব তুমি প্রয়োজনীয় বিশ্রাম নেয়া শুরু করো। খাবার যেমন শরীরকে চালু রাখে, হাসি তেমনি আত্মাকে চালু রাখে। তাই তুমি আরো বেশি বেশি হাসো এবং খেলাধুলা করো।

তুমি বুঝো যে নিজেকে যতোটা যোগ্য মনে করো ঠিক ততোটাই তুমি পাও। জীবনে পরিশ্রম না করলে কিছু পাওয়া যায়না, অতএব তুমি চাওয়া এবং পাওয়ার মধ্যে পার্থক্য বোঝ এবং চাওয়াগুলিকে পাওয়ার জন্যে সত্যিকারের পরিশ্রম করো। সফলতার জন্যে সঠিক লক্ষ্য ঠিক করে কাজ করে যেতে হয় এবং দরকার হলে অন্যের কাছে সাহায্য চাওয়া যায়।

তুমি জানতে পারো পৃথিবীতে যদি কিছুকে ভয় করতে হয় সেটা হবে ভয়কে। যে মুহুর্তে তুমি কোনো কিছুকে ভয় পাওয়া শুরু করবে সেই মুহুর্তে আসলে তুমি নিজের মতো করে বেঁচে থাকার সুযোগ হারাচ্ছো। তোমাকে ভাবতে হবে যে যাই ঘটুকনা কেনো তুমি এটা সামলে নিতে পারবে এবং তুমি যা সিদ্ধান্ত নিবে তোমার জীবনে তাই ঘটবে।

তুমি জীবনে যুদ্ধ করতে এবং জীবনটাকে দুশ্চিন্তা এবং ভয় এর মধ্য দিয়ে পার না করে দিতে শেখো। তুমি মেনে নিতে শেখো যে জীবন সবসময় ফেয়ার না এবং মাঝে মাঝেই সবচেয়ে ভালো মানুষগুলোকে অনেক দুঃখ কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এর জন্যে তুমি ভাবো না যে ঈশ্বর তোমাকে শাস্তি দিচ্ছে অথবা তিনি তোমার প্রার্থনা শুনছেন না। এই ঘটনাগুলো জীবনেরই অংশ।

তুমি এ জীবনের ছোটখাট সুখগুলোর জন্যে কৃতজ্ঞ হতে শেখো। তোমার জন্ম আফ্রিকার কোনো যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বা দুর্ভিক্ষপীড়িত দেশে হয়নি এটা ভেবে তুমি শান্তি পাও। ধীরে ধীরে তুমি নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ নেয়া শুরু করো। তুমি কান পেতে তোমার মনের কথা শুনো এবং মন যা চায় তাই পাবার জন্যে পরিশ্রম করতে শুরু করো। তুমি জানালা খুলে বুক ভরে শ্বাস নাও এবং মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলো। তুমি জীবনকে নতুন করে শুরু করার প্রস্তুতি নাও এবং সবসময় পজিটিভ চিন্তাভাবনা করার সিদ্ধান্ত নাও।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29088897 http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29088897 2010-01-31 14:27:58
আনফেয়ার লাইফ, বিউটিফুল লাইফ এমন একটা জীবন আমরা যাপন করি যে জীবনে প্রবেশের আগে আমাদেরকে কেউ জিজ্ঞেস করেনি এই জীবন আমরা চাই কি চাইনা। আমাদের ইচ্ছার কোনো খবর না নিয়েই আমাদেরকে এ জীবনে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

শুধু যে আমাদের অজান্তে আমাদেরকে এ জীবনে ঠেলে দেওয়া হয়েছে তাই নয়, আমাদেরকে ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্যে দৌড়ের উপর রাখারও ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। এবং সেটা যাতে যথেষ্ঠ না হয়, তার সাথে দেওয়া হয়েছে রোগ-বালাই, ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়, দুর্ভিক্ষ, বন্যা, নদী ভাঙ্গন, সুনামি ইত্যাদি। ভয়ংকর সব ব্যাকটেরিয়া আর ভাইরাস ঘুরে বেড়াচ্ছে চারদিকে, যেকোনো সময় আঘাত করে লন্ডভন্ড করে দিতে পারে অনেক কষ্টে গড়ে তোলা একটা জীবন!

একটা শিশুর জন্ম হয় খুবই অসহায়ভাবে। বাবা-মা এবং অন্যান্য আপনজনের আদর-যত্ন ছাড়া শিশুটি বেড়ে উঠতে পারেনা। এক দেড় যুগ ধরে বাবা-মা'কে অনেক কষ্ট স্বীকার করে বড় করতে হয় একটা সন্তানকে। সেই অনেক যত্ন করে বড় করা মানুষটিকে তখন প্রবেশ করতে হয় বড় মানুষদের জীবনে, যুদ্ধ করতে হয় জীবনের পদে পদে। পড়ালেখায় ভালো করার যুদ্ধ। ভালো একটা চাকুরী কিংবা ব্যবসা করার যুদ্ধ। পরিবেশের সাথে মানিয়ে চলা/এড়িয়ে চলার যুদ্ধ। চারদিকে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য রোগজীবানুর সাথে যুদ্ধ। এইডস, ক্যান্সার, হার্টের অসুখ, চোখের অসুখ, দাঁতের অসুখ, প্যারালিসিস, পঙ্গুত্ব - কতো রকম অসুখ আর দূর্ঘটনা ওঁত পেতে আছে মানুষের জীবনটা দুর্বিষহ করে দেওয়ার জন্যে।

এরপর আছে সামাজিক এবং মানসিক কতো অসংখ্য যন্ত্রণা। স্বামীর অত্যাচার, স্ত্রীর সীমাহীন আবদার, নানারকম সম্পর্কের নানারকম টানাপোড়ন, এর ওর এটাসেটা কতো রকম চাওয়া পাওয়া পূরণের চাপ। আছে সমাজের বেঁধে দেওয়া নানান নিয়ম। আছে ধর্মের এটা করো ওটা কোরোনা। পরিবার এর ব্যাপারগুলি মোটামুটি সবজায়গায় দেখা গেলেও সমাজ এবং ধর্মের নিয়মকানুনগুলি মূলত জন্মের স্থান এর উপরই নির্ভর করে। একজনের জন্ম আফ্রিকার জঙ্গলে নাকি আমেরিকায় নাকি আফগানিস্তানে - এর উপর নির্ভর করে সমাজ এবং ধর্ম তার জীবনে কতোটা সুখ কিংবা কতোটা যন্ত্রণা দিবে। এই নিয়মগুলিও আমাদের জন্মের আগেই ঠিক হয়ে থাকে, আমাদেরকে কেউ জিজ্ঞেস করেনা কখনো আমরা সেগুলো চাই কিনা! এবং আমাদের চাওয়ার উপর ভিত্তি করে আমাদের জন্মস্থান নির্ধারণ করা হয়না।

অবশ্যই জীবনে অনেক সুখও আছে। আনন্দ আছে। কিন্তু জীব হিসেবে আমার মনে হয় সুখের তীব্রতার চেয়ে যন্ত্রণার তীব্রতা অনেক বেশি। একটা মানুষ সারা জীবন অনেক সুখ পেয়ে যদি পঞ্চাশ বছর বয়সে এসে অসুখে কিংবা দূর্ঘটনায় বিকলাঙ হয়ে যায় তাহলে তার সেই সারা জীবনের সুখের কোনো মূল্য আছে তার জীবনে? আমাদের গ্রামের অসংখ্য মানুষ - নারীরা বিশেষ করে - সারা জীবন যে কষ্ট সংগ্রাম করে জীবন যাপন করে এবং সেভাবেই সংগ্রাম করতে করতে নিদারুণ দারিদ্র্যে মৃত্যুবরন করে পরিণত বয়সে, সেটা তো আমার নিজের চোখে দেখা। সেইসব মানুষের জীবনের কী মূল্য? জন্মের আগে তাদেরকে যদি বলা হতো "তোমরা এইভাবে দুঃখ-কষ্টে তোমাদের জীবন অতিবাহিত করবে, তোমরা কি এই জীবন নিতে চাও?", কয়জন সেই জীবন নিতে রাজী হতো?

এরকম একটা অযাচিত, অজিজ্ঞাসিত জীবন আমরা যাপন করি। যে জীবনের বড় বড় নিয়মগুলি বেশিরভাগই আমাদের জন্মের আগে কিংবা জন্মের স্থানের সাথে ঠিক হয়ে যায়। জন্মের আগের সময় অথবা জন্মের স্থান - কোনোটির উপরই আমাদের কোনো ধরণের নিয়ন্ত্রণ নেই। রোগ-ব্যাধির উপর নিয়ন্ত্রণের অনন্ত চেষ্টায় আছে আমাদের চিকিৎসা বিজ্ঞান। কিন্তু দূর্ঘটনার উপর কতোটুকু নিয়ন্ত্রণ আছে আমাদের? সুনামি কিংবা ভূমিকম্পের উপর?

পুরো ব্যাপারটিকে সবচেয়ে জটিল করে দেওয়া হয়েছে জীবনের প্রতি আমাদের সীমাহীন ভালোবাসা দিয়ে। এতো কষ্ট, এতো অনিশ্চয়তা, সমাজ আর ধর্মের এতো নিয়মের বেড়াজাল, জীবানুরুপী ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়ার এতো আক্রমণ, সুনামি আর ভূমিকম্পের আঘাত - এতো কিছুর পরও বেঁচে থাকার সেকি আকুলতা আমাদের, বেঁচে থাকতে কি যে সুখ! যতো যাই ঘটুক, "লাইফ ইজ বিউটিফুল" বলে এগিয়ে যাই আমরা। সব শক্তি একত্র করে যুদ্ধ করে যাই বেঁচে থাকার জন্যে, জীবনকে "বিউটিফুল" করার জন্যে।

হ্যাঁ, লাইফ মে নট বি ফেয়ার। বাট ইট ইজ বিউটিফুল। অন্তত আমরা সে চেষ্টাই করে যাই অবিরাম। আনফেয়ার প্রকৃতির বিরুদ্ধে অসহায়, ভঙ্গুর মানুষের জীবনকে বিউটিফুল করার যুদ্ধে মানুষ যাতে জয়ী হয় সবসময় সেজন্যে সবার জন্যে অনেক অনেক শুভকামনা।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29050426 http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29050426 2009-11-27 13:24:07
"সানস্ক্রিন ব্যবহার করো" - মেরি শ্মিক এর বিখ্যাত কল্পিত সমাবর্তন বক্তৃতা


মেরি শ্মিক (Mary Schmich) ছিলেন একজন কলামিস্ট। ১৯৯৭ সালে তিনি শিকাগো ট্রিবিউনএ "উপদেশ তারুণ্যের মতোই তরুণদের কাছে অপচয় হয়েছে " নামে একটি বিখ্যাত কলাম লিখেন। এই কলামটি পরে "সানস্ক্রিন ব্যবহার করো " নামে ব্যাপক পরিচিত পায়। কলামটির পরিচিতি পর্বে মেরি শ্মিক লিখেছিলেন যে তাকে যদি কখনো কেউ সমাবর্তন বক্তৃতা দিতে বলতেন তাহলে তিনি তার এই কলামটি বক্তৃতা আকারে দিতেন। কলামটি প্রকাশিত হবার পরপরই এটা ইন্টারনেট এর মাধ্যমে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এবং এটা প্রচারিত হয়ে পড়ে যে কেউ একজন ১৯৯৭ সালের এমাআইটি (MIT) এর সমাবর্তনে এই বক্তৃতাটি দেন। আসলে এটা ছিলো একটা ভুল প্রচারণা, ওই বছর এমআইটি এর সমাবর্তন বক্তা ছিলেন তৎকালীন জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনান।

আমি বক্তৃতাটি প্রথম দেখি ইউটিউবে । ভিডিওটি দেখেই আমার প্রচন্ড ভালো লেগে যায়। জীবন নিয়ে এতো উৎসাহমূলক বক্তৃতা আমি জীবনে খুব কমই দেখেছি/শুনেছি। ইংরেজী থেকে অনুবাদ করার সময় প্রায় সবসময়ই ভাবটা অনেকটাই হারিয়ে যায়, কিংবা সামাজিক-সাংস্কৃতিক পার্থক্য থাকার কারণে আমাদের দেশের সাথে অনেক কিছুই মিলেনা, তবু মূল কথাগুলি এতো চমৎকার যে ভাবলাম অনুবাদটা করেই ফেলিঃ


১৯৯৭ সালে পাশ করা ছাত্রছাত্রীগণঃ

সানস্ক্রিন ব্যবহার করো।

সানস্ক্রিনের দীর্ঘমেয়াদী উপকারীতা সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা প্রায় নিশ্চিত, কিন্তু আমি যে উপদেশ দিতে যাচ্ছি সেটি আমার জীবন চলার পথে অর্জন করা
অভিজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই না।

এখন আমি আমার উপদেশগুলো দিবো।

তারুণ্যের শক্তি এবং সৌন্দর্য্যকে পুরোপুরি উপভোগ করো। তারুণ্যের শক্তি আর সৌন্দর্য্যের মূল্য তোমাদের পরিণত বয়স হবার আগে বুঝবেনা। কিন্তু বিশ্বাস করো, আজ থেকে বিশ বছর পর যখন তোমার আজকের ছবির দিকে ফিরে তাকাবা তখন মনে হবে কী প্রচন্ড সম্ভাবনা ছিলো তোমার মধ্যে, কী চমৎকার ছিলো তোমার চেহারা। তুমি নিজেকে যতোটা মোটা ভাবো আসলে তুমি ততোটা মোটা না।

ভবিষ্যতের কথা ভেবে খুব বেশি দুশ্চিন্তা কোরোনা। আর দুশ্চিন্তা আসলে মনে রাখবে দুশ্চিন্তা হচ্ছে চুইংগাম চিবুতে চিবুতে বীজগণিতের অংক সমাধান করার মতো। জীবনের সত্যিকারের বড় সমস্যাগুলো কখনো দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মনে আসেনা, ওগুলো যখন আসে তখন তোমার দুশ্চিন্তা করার সুযোগই থাকবেনা!

প্রতিদিন একটা করে কাজ করো যেটা করতে সাহসের প্রয়োজন হয়, যেটা তোমাকে ভয় পাইয়ে দেয়।

গান গাও।

মানুষের মন নিয়ে খেলা কোরোনা, এবং যারা তোমার মন নিয়ে খেলে তাদের সংস্পর্শে থেকোনা।

দাঁতের যত্ন নিও।

অন্যের সফলতায় ঈর্ষান্বিত হয়ে নিজের সময় নষ্ট কোরো না। জীবনে কখনো তুমি এগিয়ে থাকবে, কখনো পিছিয়েঃ দিনের শেষে প্রতিযোগিতা আসলে নিজের সাথেই!

প্রশংসাগুলোর কথা মনে রেখো, অপমানের কথা ভুলে যেও। আর এটা সত্যি সত্যি করতে পারলে আমাকে জানিও কিভাবে করলে।

পুরনো প্রেমপত্রগুলো রেখে দিও। পুরনো ব্যাংক স্টেটমেন্টগুলো ফেলে দিও।

নিয়মিত ব্যায়াম কোরো।

জীবনে কী করতে চাও সেটা এখনো না জানলেও কোনো চিন্তা কোরোনা। আমার দেখা সবচেয়ে চমৎকার মানুষগুলোর অনেকেই তোমাদের বয়সে
জানতোনা তারা তাদের জীবন নিয়ে কী করতে চায়। এমনকি অনেক চমৎকার মানুষ যাদের বয়স চল্লিশ হয়ে গিয়েছে তারাও জানেনা জীবনে তারা কী করতে চায়।

বেশি করে ক্যালসিয়াম খেও। হাঁটুর প্রতি যত্ন নিও। না হলে বয়সকালে ওগুলো অনেক ভোগাবে।

একদিন হয়তো তুমি বিয়ে করবে, হয়তো করবেনা। হয়তো একদিন তোমার সন্তান হবে, কিংবা হয়তো কোনোদিন তোমার সন্তান হবেনা। হয়তো চল্লিশ বছর বয়সে তোমার ডিভোর্স হয়ে যাবে, কিংবা হয়তো একদিন তুমি তোমার পঁচাত্তরতম বিয়ে বার্ষিকী পালন করবে। যাওই করোনা কেন, নিজেকে খুব বেশি অভিনন্দিত কোরোনা, কিংবা ছোটও কোরোনা। তোমার জীবনের প্রায় সব সিদ্ধান্তই ৫০/৫০ সম্ভাবনার মাধ্যমে নেওয়া। অনেকগুলো সম্ভাব্য ঘটনার মধ্যে অন্য ঘটনাগুলিও তোমার জীবনে ঘটতে পারতো। এবং এটা সবার জন্যই সত্যি।

নিজের শরীরকে উপভোগ কোরো। যতোরকমভাবে সম্ভব ব্যবহার কোরো নিজের শরীরকে। অন্যরা কী ভাববে বা বলবে এটা নিয়ে ভেবোনা। তোমার শরীর হচ্ছে পৃথিবীতে তোমার প্রতি দেওয়া সবচেয়ে বড় উপহার।

নাচো। যদি কোথাও নাচার সুযোগ না পাও তাহলে নিজের ড্রয়িং রুমে কিংবা বেডরুমে একা একা নাচো।

সৌন্দর্য্য ম্যাগাজিন পড়ার দরকার নাই। ওগুলো পড়লে নিজের চেহারাকে কুৎসিত মনে হবে, যেটা কখনোই সত্যি নয়।

বাবা-মা'র সাথে ভালো যোগাযোগ রেখো। তুমি জানতেও পারবেনা ওরা কখন এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে। তোমার ভাই-বোনদের সাথে চমৎকার
সম্পর্ক রেখো। ওরা তোমার অতীতের সাথে তোমার সবচেয়ে বড় যোগসূত্র, এবং তোমার ভবিষ্যতে ওরাই তোমার সবচেয়ে কাছে থাকবে।

জীবনে অনেক বন্ধু হবে এবং হারিয়েও যাবে, কিন্তু কয়েকজন খুব কাছের বন্ধুর সাথে তোমার সবসময় একটা ভালো সম্পর্ক রাখা উচিৎ। ভৌগলিক
কিংবা সামাজিক দূরত্ব ঘুচিয়ে বন্ধুদের কাছে থেকো, কারণ তোমার যতোই বয়স হবে, ততোই তোমার চিরপরিচিত মানুষগুলোকে তোমার কাছে দেখতে মন চাইবে।

একবারের জন্য হলেও নিউ ইয়র্ক শহরে থেকো। কিন্তু এই শহর তোমার মনকে কঠিন করে দেওয়ার আগেই অন্য কোথাও চলে যেও। উত্তর
ক্যালিফোর্নিয়ায় থেকো একবার। কিন্তু তোমার মন খুব নরম হয়ে পড়ার আগেই সরে পড়ো।

নতুন নতুন জায়গায় ভ্রমণ কোরো।

কিছু সত্যকে চিরন্তন বলে জেনোঃ দ্রব্যমূল্য সবসময় বাড়বে; রাজনীতিবিদরা সবসময় নারীসং পছন্দ করবে; তুমিও একদিন বুড়ো হবে। এবং যখন তুমি বুড়ো হবে তখন তুমি অতীতের কথা ভেবে নস্টালজিক হবে এবং ভাববেঃ দ্রব্যমূল্য অনেক কম ছিলো; রাজনীতিবিদরা ছিলেন অনেক মহান; এবং ছোটরা বড়দের অনেক সম্মান করতো।

বড়দের সম্মান কোরো।

অন্য কেই তোমার জীবনধারণের ব্যয় বহন করবে এটা আশা কোরোনা। হয়তো তোমার জমানো টাকা আছে, কিংবা হয়তো তোমার স্বামী বা স্ত্রী
অনেক ধনী। কিন্তু এগুলো যেকোনো সময় শেষ হয়ে যেতে পারে।

চুল নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি কোরোনা। পরে দেখা যাবে চুল পড়ে চল্লিশ বছর বয়সেই তোমাকে পঁচাশির মতো লাগছে।

কার উপদেশ গ্রহণ করছো সেটা নিয়ে সজাগ থেকো। কিন্তু যারা উপদেশ দিতে আসেন তাদের ব্যাপারে ধৈর্যশীল থেকো। উপদেশ এক ধরণের
নস্টালজিয়া। আর অন্যকে উপদেশ দেওয়া হচ্ছে আসলে অতীতকে ধুয়ে মুছে, রংচং দিয়ে, ভুল অংশ বাদ দিয়ে, চকমকে করে এর প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি মূল্যের হিসেবে চালিয়ে দেওয়া।

কিন্তু সানস্ক্রিন এর ব্যাপারটায় আমাকে বিশ্বাস কোরো!

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29000438 http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/29000438 2009-08-27 14:46:56
"সান্সক্রীন ব্যবহার করুন" - একটি অসাধারণ মোটিভেশনমূলক ভিডিও "Wear Sunscreen" মেরি শ্মিক নামের একজন কলামিস্ট একটি কলামের নাম। কলামটি তিনি ১৯৯৭ সালের জুন মাসের ১ তারিখে শিকাগো ট্রিবিউনএ লিখেছিলেন। কলামের ভূমিকায় তিনি উল্লেখ করেছিলেন কেউ যদি তাঁকে কখনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন বক্তৃতা দেওয়ার জন্য আমন্ত্রন জানাতো তাহলে তিনি কলামটি বক্তৃতা হিসেবে দিতেন। কিন্তু তাঁর আসলে কখনোই এই বক্তৃতাটি দেওয়া হয়নি।

তাঁর বক্তৃতাটি নিয়ে অনেকগুলো ভিডিও তৈরি হয়েছে। এর একটি হলোঃ



বক্তৃতাটির টেক্সট ভার্শন পাওয়া যাবে এখানে

এই ভিডিওটি আমার দেখা মোটিভেশনমূলক সেরা ভিডিওগুলির একটি। আশা করি আপনাদেরও ভালো লাগবে।

(আমি বক্তৃতাটি অনুবাদ করেছিলাম, কিন্তু কেমন যেনো খাপছাড়া লাগছিলো বাংলাতে। ভিডিওটি হচ্ছে এই বক্তৃতার সেরা প্রকাশিত মাধ্যম!)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/28998439 http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/28998439 2009-08-23 13:22:09
প্রাণ "জীবন পরিমাপ করা হয় এর তীব্রতা দিয়ে, দৈর্ঘ্য দিয়ে নয়"

দুখী স্বদেশঃ

আমরা সবাই জানি বাংলাদেশ কেনো উন্নত নয়, ধনী নয়।

এটা আমেরিকার ষড়যন্ত্র। ভারতের ষড়যন্ত্র। ইসরায়েলী জায়নিস্টদের ষড়যন্ত্র, যারা কোনো মুসলিম দেশকে উপরে উঠতে দিবেনা। আমাদের সব দুঃখ কষ্ট শুরু হয়েছে যেদিন বৃটিশরা আমাদের দেশ দখল করেছিলো। আমাদের ছিলো গোলাভরা ধান, দীঘিভরা মাছ, বৃটিশরা এসে সব নিয়ে গেছে বিলেতে। বৃটিশরা রেখে গেছে কেরাণী বানানোর শিক্ষা ব্যবস্থা যাতে আমরা আর কখনো উপরে উঠতে না পারি। পুঁজিবাদী সামন্তবাদী শক্তিগুলো আমাদের কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে দিবেনা।

আমাদের দেশ এতো অসুখী কারণ আমরা ইসলামকে ঠিকভাবে মানিনা। একমাত্র সত্যিকারের ইসলামী শাসন-ব্যবস্থাই পারে আমাদের একটি সুখী ও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করতে। একটি ইসলামী দেশে সব ধর্মের মানুষের অধিকার রক্ষা হবে চমৎকারভাবে। সৌদি আরব, পাকিস্তান, কিংবা আফগানিস্তানের তালেবান, কেউই সত্যিকারের ইসলামী শাসন ব্যবস্থা চালু করে নাই। আমাদের সেই সত্যিকারের আসল ইসলামী শাসন ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যেখানে পরকালের অনন্ত জীবন হবে আমাদের সকল কর্মকান্ডের মূল লক্ষ ও উদ্দেশ্য।

আমাদের দেশের প্রধান সমস্যা আসলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, নদী ভাঙ্গন ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের দেশের মতো আর কোথাও নেই। এগুলো না থাকলে আমরা নিশ্চই আরো এগিয়ে যেতে পারতাম। এইসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ এর সাথে যুদ্ধ করতে করতে আমাদের বিশাল শক্তি ক্ষয় হয়ে যায়, যেটা অন্যথায় আমরা আমাদের উন্নতির কাজে লাগাতে পারতাম।

কিংবা হয়তো আমাদের মূল সমস্যা অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ। এতোটুকুন একটা দেশে এতো মানুষের দরকারী খাদ্য এবং জীবন ধারণের রসদ যোগাতে সমস্যা তো হবেই। আমরা যে বেঁচে আছি এটাই কি কম না?

আমাদের সমস্যা আসলে দেশপ্রেমের অভাব। বিশেষ করে আমাদের কর্তাব্যক্তিদের। আমাদের রাজনীতিবিদরা, সামরিক-বেসামরিক আমলারা, শীর্ষ ব্যবসায়ীরা, সুশীল সমাজ আর পা-চাটা বুদ্ধিজীবিরা যদি দেশের প্রতি আরো মমতাময়ী হতো তাহলে নিশ্চয়ই দেশটা এতোদিনে অনেক বদলে যেতো! তার খালি নিজেদের দিকটাই দেখেন, দেশের সাধারণ মানুষের দিকটা দেখেননা। এদের সীমাহীন দুর্নীতি আর অসততা আমাদেরকে দিন দিন অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

দেশটা জলে যাচ্ছে আসলে জঙ্গীবাদ আর রাজাকারদের কারণে কারণে। জঙ্গী, কাঠমোল্লারা দেশটাকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এদের মধ্যযুগীয় চিন্তাভাবনাকে প্রতিরোধ করতে পারলে দেশটা হয়ে উঠতো অনেক সুখী আর সমৃদ্ধশালী। দেশটাকে উন্নত করতে হলে জঙ্গীবাদের এর এই অন্ধকার টানেল থেকে বের হতে হবে আমাদের।

প্রাণঃ

আমার মনে হয় আমাদের মূল সমস্যা অন্য কোথাও। আমাদের মূল সমস্যা আমাদের প্রাণ এর অভাব। "প্রাণ" শব্দটা এখানে কতোটুকু যথার্থ আমি জানিনা, কিন্তু ইংরেজীতে একে বলে যায় "স্পিরিট", কিংবা "স্ট্যামিনা", কিংবা "এনার্জি"। ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য দরকার অদম্য প্রাণশক্তি, জীবনের প্রতি দরকার সীমাহীন ভালোবাসা।

প্রাণ এর সাথে চলে আসে কয়েকটি জিনিস। এর মধ্যে প্রধান হচ্ছে আনন্দ উপভোগ করা। আমরা যে কতোটা প্রাণহীন জাতি এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হচ্ছে আমাদের দেশে "উপভোগ" কিংবা ইংরেজীতে "enjoy" শব্দটিকে খুব একটা ভালো চোখে দেখা হয়না। কেউ যদি তার জীবন "enjoy" করে তাহলে তাকে কেমন যেন বাঁকা চোখে দেখা হয় আমাদের দেশে। অবধারিতভাবে "উপভোগ" শব্দটাকে শারীরিক সুখের বাইরে ভেবে অভ্যস্ত নই আমরা। জীবনকে কতোরকম করে উপভোগ করা যায়, জীবনে কতো রকমের আনন্দ করা যায়। পশ্চিমের মানুষেরা কতোভাবে তাদের জীবন উপভোগ করে, জীবনে কতো রকম আরাম আয়েশের আয়োজন করে রাখে। আমরা ওদের মতো জীবন উপভোগ করিনা এর মানে এই নয় যে আগামী একশ বছর আমাদের এভাবে থাকতে হবে। আমাদেরকে জীবনটাকে উপভোগ করা শিখতে হবে। বিদেশের মাটিতে "have fun" কথাটা উঠতে বসতে ব্যবহার করা হয়। খাঁটি বাংলায় যার মানে "মজা করো, আনন্দ করো"। আমাদের রক্তে এই "মজা করা" ব্যাপারটি তেমন তীব্রভাবে নেই। প্রতিদিন এর কাজে, শপিংএ, বাসায়, রাস্তাঘাটে, গাড়িতে, সব কাজে যে মজা করা যায় এই ধারণাটাই আমাদের নাই। আমি এটা বলতে চাচ্ছিনা যে মানুষের জীবনে দুঃখ-কষ্ট নেই কিংবা উন্নত দেশের মানুষেরা দিনরাত শুধু মজাই করে। আমি বলতে চাচ্ছি জীবনকে উপভোগ করা নিয়ে আমাদের চিন্তাভাবনা খুবই সীমিত। আমাদের কাছে জীবনকে উপভোগ করা একটা ভালো চাকুরী এবং সন্তান লালন করার জন্য যথেষ্ট টাকা উপার্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

যেহেতু আমাদের জীবনের প্রধান লক্ষ হয় একটা ভালো চাকুরী এবং ব্যাংকে কিছু টাকা, তাই এটা অর্জন করার পর আমাদের জীবনটা মোটামুটি থেমে যায়। আমাদের স্বপ্নের দৌড় ওই পর্যন্তই। একটা চমৎকার জীবন যাপন করা, স্ত্রী কিংবা প্রেমিকাকে নিয়ে সুইজারল্যান্ড কিংবা নিদেনপক্ষে কাছের সিংগাপুর-মালেয়শিয়া ঘুরে আসা (সাধারণত ছেলেরাই এটা করে দেখে এভাবে লিখেছি), একটা ভালো গাড়ী আর একটা ভালো বাড়ি কিংবা ফ্ল্যাট কেনা, সপ্তাহান্তের ছুটিতে নিজের গাড়িতে করে কক্সবাজার কিংবা নেপাল ঘুরে আসা - এসবই আমাদের কাছে রাতের স্বপ্ন, দিনেও এই স্বপ্ন দেখতে আমরা অভ্যস্ত নই। আর এই স্বপ্নের দৈন্যতা সৃষ্টি করে আমাদের চেষ্টার দৈন্যতা। আমরা ভাবি শুধুমাত্র যাদের বাবার কিংবা মামার কিংবা চাচার টাকা আছে শুধু তারাই উপভোগ করবে এই পৃথিবীটা আর আমরা বাকীরা শুধু একটা ভালো চাকুরী আর ব্যাংকে লাখখানেক টাকা নিয়ে জীবনটা পার করে দিবে। এটা ভুল। বড় ভুল।

এই পৃথিবীতে প্রত্যেকটা মানুষ সমানভাবে সমান অধিকার নিয়ে জন্ম নেয়। এটা ঠিক, ভালো পরিবেশে এবং/অথবা ধনী পরিবারে জন্ম নেওয়া সন্তানেরা অনেক বেশি সুবিধা পেয়ে থাকে জীবন চলার পথে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে বাকীরা সারা জীবন পিছিয়ে থাকবে। কিন্তু সে জন্য সবার আগে স্বপ্ন দেখতে হবে। ঠুনকো প্রাণ নিয়ে জীবনে কিছু অর্জন করা যায়না। আমাদের প্রাণে শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। আমরা হয়তো টিউশনি করে জীবন চালাচ্ছি, কিংবা হয়তো একটা ছোট চাকুরী করে সংসার চালাচ্ছি - কিন্তু এটাকে আমাদের নিয়তি হিসেবে মেনে নেওয়ার কোনো মানে নাই। আমাদের ক্রমাগত চেষ্টা করে যেতে হবে আরো ভালো এবং উপভোগ্য একটা জীবন পাওয়ার জন্য। আমেরিকাতে কতো সাধারণ মানের ভারতীয় এবং চাইনিজ ছেলেমেয়েরা পড়ালেখা করতে চলে আসে। পড়ালেখা শেষ করে এখানেই চাকুরী শুরু করে যার বেতন ভারতে কিংবা চায়নাতে যা পেতো তার কমপক্ষে দশগুন! আমাদের ভিসা পেতে ওদের চেয়ে বেশি সমস্যা হয় এটা সত্যি, কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা আমাদের উদ্যোগের অভাব। আমাদের সাহসের অভাব। আমাদের ছেলেমেয়েরা বেশিরভাগ ভারতীয় এবং চাইনিজ ছেলেমেয়েদের চেয়ে কোনো অংশেই কম মেধাবী নয়, কিন্তু আমাদের উদ্যোগ এবং সাহস ওদের চেয়ে এক'শগুন কম। একটু উদ্যোগ আর সাহস নিয়ে চেষ্টা করলে আমেরিকাতে পড়তে আসা কোনো ব্যাপারই হবার কথা না। ভারতীয় আর চাইনিজদের মতো লাখে লাখে বাংলাদেশী ছেলেমেয়ে আমেরিকাতে পড়তে আসলে এবং এরপর চাকুরী করলে কী পরিমাণ টাকা এবং বিভিন্ন ধরণের জ্ঞান এবং প্রযুক্তি আমাদের দেশে ট্রান্সফার করা যেতো সেটা ভেবে দেখেছে কেউ?

প্রাণশক্তিতে ভরপুর মানুষ কৌতুহলী হয়, আগ্রহী হয়, সবসময় কিছু একটা করতে চায়, যেকোনো জিনিসের ভালো দিকটা দেখে প্রথমে, নিজের ভুল/দোষ হলে সেটা স্বীকার নেয় সহজে, অন্যের সফলতা দেখে হিংসা করেনা, সবকিছুর পেছনে ষড়যন্ত্র খুঁজে বেড়ায়না, অন্যরা কী করছে সেটা না ভেবে নিজেই এগিয়ে আসে যেকোনো কাজে, ভাগ্যের উপর নির্ভর করে বসে থাকেনা, এবং আশেপাশের সবার মধ্যে নিজের প্রাণশক্তি সঞ্চারিত করে। একজন সফল মানুষ আরেকজন সফল মানুষকে হিংসা করবেনা। যে ছেলেগুলো হরতাল-বিক্ষোভ এর সময় নির্বিচারে অন্যের গাড়ি ভাংগে, সেই ছেলেগুলোর প্রত্যেকের একটা করে গাড়ি থাকলে ওরা কখনো এই কাজটি করতো না। অসফল মানুষ স্বভাবতই কিছুটা হীনমন্যতাবোধে ভোগে, এবং সুযোগ পেলেই তার দুঃখ-কষ্টের কারণ অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে চায়।

আমাদের প্রাণের বড়ই অভাব। এ অভাব মনে যেমন, শরীরেও তেমন। আমাদের সাধারণত মিলিটারির লোকজন ছাড়া অন্যদের স্বাস্থ্য তেমন ভালো হয়না, অথচ ইওরোপ আমেরিকায় সবার কি চমৎকার স্বাস্থ্য! আমরা দশ কদম দৌড়ালে হাঁপাতে শুরু করি; অথচ এখানে জিমে, পার্কে, এমনকি রাস্তাঘাটে লোকজনকে ঘন্টার পর ঘন্টা দৌড়াতে দেখি, সাইকেল চালাতে দেখি। আমেরিকার একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ তাদের জীবনে বিভিন্ন দৈর্ঘের ম্যারাথন দৌড় দিয়ে থাকেন এবং এটা বেশি ঘটে ওদের মধ্য বয়সের পর থেকে। আর আমাদের বয়স চল্লিশ ছাড়িয়ে পঞ্চাশ হতে না হতেই আমরা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হওয়া শুরু করি। আমাদের তিনটা কথার একটা হয় মৃত্যু নিয়ে, দোজখ নিয়ে কিংবা বেহেশত নিয়ে। অথচ বিদেশে দেখি ষাট, সত্তর, এমনকি আশিতে পড়া বৃদ্ধরা প্রখর রৌদ্রে জগিং করছেন, কিংবা ফিশিং করছেন, কিংবা বাড়ির পেছনের উঠানে বাগানের কাজ করছেন। কিছুদিন আগে আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট সিনিয়র বুশ তার পঁচাশিতম জন্মদিন পালন করেছেন একটি প্লেইন থেকে ঝাঁপ দিয়ে স্কাই ডাইভিং এর মাধ্যমে! এখানে মানুষের শরীরের বয়স বাড়ে কিন্তু মনের দিক থেকে মানুষ থাকে তরুণ। আর এটা সম্ভব হয় শুধুমাত্র যখন মানুষ তরুণ বয়সে সত্যিকারের তরুণ থাকে - জীবনটাকে যতোটা সম্ভব উপভোগ করে।

কার্ণেগী মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরলোকগত অধ্যাপক র‌্যান্ডি পশ ক্যান্সারে অকালমৃত্যুর আগে একটি শেষ লেকচার (পিডিএফ লিঙ্ক) দেন। তাঁর কয়েকটি লাইন ছিলো এমনঃ "ঠিক করো তুমি কি টিগার নাকি ইওর । টিগাররা হচ্ছে প্রাণশক্তিতে ভরপুর, প্রচন্ড আশাবাদী, চরম কৌতুহলী, প্রায় সব ব্যাপারে প্রচন্ড আগ্রহী, এবং ওরা জীবনে অনেক আনন্দ করে। জীবনে আনন্দ করাকে কখনোই কম গুরুত্মপুর্ণ মনে কোরোনা। আমি কিছুদিনের মধ্যে মারা যাচ্ছি কিন্তু আমি এখনো প্রতিদিন জীবনে আনন্দ করতে চাচ্ছি। আমি আজ আনন্দ করতে চাই, কাল করতে চাই, এবং আমার বাকী জীবনের প্রতিটি দিন আনন্দ করতে চাই"।

প্রাণের মাধ্যমে সুখী স্বদেশঃ

আমি জানি আমরা একাত্তরে আমাদের প্রাণশক্তির প্রমাণ দিয়েছি, আমরা বছরের পর বছর বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, গ্রীষ্মের ভয়াবহ দাবদাহ মোকাবেলা করে চলছি। একাত্তরে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আমাদের গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছিলো, আমরা আমাদের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে সে হায়েনাকে পরাজিত করেছি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের লন্ডভন্ড করে দিয়ে যায় প্রায় প্রতি বছর, সেই ধ্বংস্তুপ থেকে আমরা আবার উঠে দাঁড়াই। আমাদের কই মাছের প্রাণ, এতো সহজে মরতে রাজী নই আমরা।

কিন্তু না মরে বেঁচে থাকাই একমাত্র বেঁচে থাকা নয়। এখানেই আসে "প্রাণ"। এখানেই আসে জীবনের প্রতি পরম ভালোবাসা। আমাদের খুব ভালোভাবে বেঁচে থাকতে হবে। আমাদের বেঁচে থাকাকে উদযাপন করতে হবে। যতোদিন বেঁচে থাকবো এই পৃথিবীতে আমাদের বেঁচে থাকতে হবে খুব ভালোভাবে। নিদেন পক্ষে আমাদের চেষ্টা করে যেতে হবে।

একাত্তরে যুদ্ধ করে পাকিস্তানীদের হাত থেকে বেঁচে যাওয়াই জীবনের শেষ কথা নয়। আর ১৯৭১ পৃথিবীর শেষ বছর নয়। ১৯৭১ এর পর প্রায় চল্লিশটি বছর চলে গিয়েছে কিন্তু আমরা এখনো ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারছিনা। আমারা ভালোভাবে বাঁচতে চাই কিন্তু সেটি আমরা যে অর্জন করতে পারিনি আমাদের দেশে তার একটি প্রমাণ হচ্ছে আমরা অনেকেই বিভিন্ন কারণে দেশ ছাড়ার জন্য উদ্গ্রীব। ডিভি লটারীতে সবচেয়ে বেশি আবেদন পড়ে বাংলাদেশ থেকে। নৌকা দিয়ে অবৈধ পথে স্পেইন যাওয়ার পথে অথৈ সাগরে মরে পড়ে থাকে আমাদের লাশ। মধ্যপ্রাচ্যে, মালেয়শিয়াতে আমরা লক্ষে লক্ষে পাড়ি জমাই গায়ের শ্রম বিক্রি করতে। সেই শ্রমের টাকায় বেঁচে থাকে আমাদের দেশ। আজকে এই মধ্যপ্রাচ্য আর মালেয়শিয়ার রক্ত ঝরা টাকা বন্ধ হয়ে গেলে দুর্ভিক্ষে পড়বে বাংলাদেশ।

জাপানও যুদ্ধ করেছিলো। বিশ্বযুদ্ধ। কিন্তু সেই যুদ্ধের ধ্বংস্তুপ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ওরা আজ পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশগুলোর একটি। আমেরিকা সেদিনের একটা দেশ। মাত্র কয়েকশ বছরে আজ ওরা পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী আর ধনী দেশ। ইউরোপ পনের'শ ষোড়শ শতকের শিল্প বিপ্লব এর পর থেকেই সভ্যতাকে নিয়ে গিয়েছে এর আধুনিকতম পর্যায়ে।

আর আমরা সেই শত শত বছর থেকে পিছিয়ে আছি তো আছিই। আমাদের কিসের অভাব? আমাদের প্রাণ এর অভাব। শীত আমাদের কাবু করে ফেলে। আমরা শীত থেকে বাঁচার জন্য ঘরে ঘরে হিটার লাগাতে পারিনা। গরমে আমাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে যায়, কিন্তু আমাদের ঘরে ঘরে শীতাতপ যন্ত্র কেনার মতো অর্থনৈতিক অবস্থা আমরা তৈরি করতে পারিনি। আমাদের আশি ভাগ মানুষ কখনো বিদ্যুৎ পায়নি। বাকি বিশ ভাগ দিনের মাত্র কয়েক ঘন্টা বিদ্যুৎ পায়। কে যেনো একজন বলেছিলেন, "গণতন্ত্রের চেয়ে বিদ্যুৎ বেশি দরকার আমাদের"। আহা, কতো খাঁটি কথা। বিদ্যুৎ না থাকলে মানুষ বাঁচবে কেমন করে। এতো আর গুহাযুগ না যে আমরা গুহায় বাস করি। সবকিছু এখন বিদ্যুতে চলে।

কিন্তু এ বিদ্যুৎ আমাদের কে দিবে? যাদের আমরা ভোট দিয়ে ক্ষমতায় পাঠাই, তারা। কিন্তু তারা তো আমাদেরই অংশ। আমরা যেমন প্রানহীন, স্বপ্নহীন; তারাও তেমনি! হাসিনা, খালেদা, সৈয়দ আশরাফ, খন্দকার দেলোয়ার, তারেক, জয়, হাজী সেলিম, পিন্টু, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, মওদুদ, সব মন্ত্রী আর এমপি - এরা সবাই তো সেই আমাদেরই লোক। এরা দুর্নীতি করে এটা বড় সমস্যা না, বড় সমস্যাটি হচ্ছে এদের প্রাণ এর অভাব। প্রাণ নেই বলে এরা এখন এক'শ টাকার একটা অর্থনীতি বানিয়ে সেখান থেকে নব্বই টাকা নিজেরা মেরে দেয়, বাকী দশ টাকা জনগণের জন্য রাখে। প্রাণ থাকলে এরা দেশের অর্থনীতির আকার বানাতো এক লক্ষ টাকার, আর সেখান থেকে নব্বই হাজার টাকা ওরা মেরে দিলেও আমরা এরপরও দশ হাজার টাকা পেতাম জনগনের জন্য! যেটা দশ টাকার থেকে অনেক অনেক ভালো!

আমাদের বিদ্যুৎ পেতে হলে বিদ্যুৎ চাইতে হবে, পার্ক পেতে হলে পার্ক চাইতে হবে; একইভাবে আমাদের লেক চাইতে হবে, গাড়ি চাইতে হবে, বাড়ি চাইতে হবে, ফ্ল্যাট চাইতে হবে, সুইজারল্যান্ড-হাওয়াই বেড়াতে যাতে চাইতে হবে, রকেট সায়েন্টিস্ট হতে চাইতে হবে, মহাকাশে উপগ্রহ পাঠাতে চাইতে হবে, নোবেল পুরস্কার পেতে চাইতে হবে, ফিল্ডস মেডাল/টুরিং পুরস্কার পেতে চাইতে হবে। মোটকথা, পাওয়ার প্রাথমিক ধাপ হচ্ছে চাওয়া। এই পাওয়ার স্বপ্ন দিয়েই সব কিছু শুরু হয়। আমরা অবশ্য অনেক কিছুই চাই, কিন্তু আমরা চাওয়ার সাথে সাথে মনে মনে হাসি আমাদের চাওয়া দেখে। কারণ আমরা মনে মনে নিশ্চিত এই চাওয়া শুধু চাওয়াই, কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। আর এখানেই আমরা ভুলটা করি। আমাদের স্বপ্ন দেখতে হবে এটা ভেবে যে এই স্বপ্নের বেশিরভাগই পূরণ হবে। এবং সে অনুযায়ী প্রচুর প্রাণশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে সে স্বপ্ন পূরণের জন্য।

আমাদের জীবন যখন প্রাণশক্তিতে ভরপুর হবে, আমরা যখন আমাদের জীবনকে আরো বেশি ভালোবাসবো, আমরা যখন আরো বেশি সাহসী আর অ্যাডভেঞ্চারাস হয়ে উঠবো তখন আমরা সবাই ধীরে ধীরে একটা সুখকর, আরামদায়ক, এবং উপভোগ্য জীবন পাবো। আর এভাবে আমরা একটা ধনী আর সমৃদ্ধশালী সমাজ এবং দেশ পাবো। তখন হরতাল-ভাংচুর করার জন্য আর টোকাই কিংবা রাজনৈতিক কর্মী পাওয়া যাবেনা, ছাত্ররাজনীতির নামে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আর দুর্বৃত্ত তৈরি হবেনা, কোনো কাজ না থাকায় রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে বখাটে ছেলেরা মেয়েদের আর উত্যক্ত করবেনা, রাজনীতিবিদরা দলীয় গুন্ডা-মাস্তান দিয়ে প্রতিপক্ষকে আর ঠেঙ্গাতে পারবেনা। সবচেয়ে বড় কথা আমাদের ভবিষ্যৎ রাজনীতিবিদ হবে এই প্রাণশক্তিসম্পন্ন টগবগে তরুণ-তরুণীরা, যারা জীবনকে ভালোবাসে, মৃত্যকে নয়। তাই জীবনকে সুন্দর ও সুখী করার জন্য ওরা ছাত্রজীবনে নিজেদের প্রচন্ড প্রাণশক্তি নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করবে এবং ছাত্রজীবন শেষ করে স্ব স্ব ক্ষেত্রে নিজের মেধা ও মননের চমৎকার ব্যবহার করে দেশকে এগিয়ে নিবে সামনের দিকে।

জীবনের প্রতি পরম ভালোবাসাঃ

একটা উন্নত সমাজ পেতে হলে, দেশ পেতে হলে, আমাদের জীবনকে ভালোবাসতে হবে। জীবনকে উপভোগ করা শিখতে হবে। জীবনের অধিকারী মানুষগুলোকে ভালোবাসতে হবে, শ্রদ্ধা করতে হবে। জীবনকে প্রচন্ড ভালোবাসে এবং উপভোগ করে এরকম প্রাণশক্তিতে ভরপুর একটা জাতিই পারে একটা উন্নত দেশ উপহার দিতে। অন্যথায় পৃথিবীর প্রাণশক্তিতে টগবগ করা অংশ যখন পারমানবিক যুগ, রকেট যুগ পার করে ক্লোনিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদির যুগে চলে যাবে, আমরা তখনো আফ্রিকান দেশগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে এক কদম এগিয়ে আরেক কদম পিছিয়ে পড়তেই থাকবো।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/28989710 http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/28989710 2009-08-06 14:24:03
মাইক্রোসফট এর সাতকাহন - পর্ব ৩ (মাইক্রোসফট এর সেকাল একাল) পর্ব ২ (ইন্টার্ণশীপ অভিজ্ঞতা)

শুরুর ঘটনাঃ

মাইক্রোসফট পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কম্পিউটার সফটওয়ার প্রস্তুতকারী কম্পানী। এবং এটি সবচেয়ে পুরনো সফটওয়ার কম্পানীগুলোরও একটি।
মাইক্রোসফট এর শুরু হয় ১৯৭৫ সালে আমেরিকার নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের আলবাকার্কি শহরে। যদিও মাইক্রোসফট এর মূল প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস এর বাড়ি ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যে (যেখানে মাইক্রোসফট এর বর্তমান প্রধান অফিস), তিনি এর শুরুটা করেন প্রায় পনের'শ মাইল দূরের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের একটি শহরে। এর কারণ হচ্ছে মাইক্রোসফট এর প্রথম সফটওয়ারটি ছিলো আসলে একটি BASIC ইন্টারপ্রিটার যেটা প্রথমে কাজ করতো
আল্টেয়ার নামক একটি কম্পিউটারএ। আল্টেয়ার এর অফিস ছিলো নিউ
মেক্সিকোতে। বিল গেটস ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এর লেখাপড়া ছেড়ে নিউ মেক্সিকো চলে যান আল্টেয়ার এর মালিক কম্পানীকে তার ইন্টারপ্রিটার কেনার জন্য রাজী করাতে। আল্টেয়ার এর মালিক ইন্টারপ্রিটারটি কিনতে রাজী হওয়ার পর গেটস সেখানেই মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠা করেন তার বন্ধু পল অ্যালেনকে সাথে নিয়ে। আমার ধারণা বিল গেটস তখনো ভাবতে পারেননি তার এই কম্পানীটি একদিন পৃথিবীর সভ্যতার তথ্য যুগে প্রবেশএ একটা বড় ভূমিকা রাখবে।

সফটওয়ার সাম্রাজ্যঃ

চৌত্রিশ বছর পর আজ ২০০৯ সালে এসে মাইক্রোসফট হয়ে উঠেছে এক প্রযুক্তি সাম্রাজ্য। কিছু হার্ডওয়ার বাদ দিলে কম্পিউটারের এমন কোনো দিক নেই যেটা তারা প্রস্তুত করে না। বিশ্বের সর্বাধিক ব্যবহৃত অপারেটিং সিস্টেম, সর্বাধিক ব্যবহৃত অফিস প্রডাক্টিভিটি সফটওয়ার, সর্বাধিক ব্যবহৃত চ্যাট মেসেঞ্জার, সর্বাধিক ব্যবহৃত ওয়েব ইমেইল, সর্বাধিক ব্যবহৃত ডেভেলপমেন্ট এনভায়রনমেন্ট ইত্যাদি ছাড়াও অন্যান্য অসংখ্য সফটওয়ার পণ্য আছে মাইক্রোসফট এর যেগুলো প্রতিদিন ব্যবহৃত হচ্ছে সারা পৃথিবীর কোটি কোটি কম্পিউটারএ। মাইক্রোসফট এর মোট কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৯৫,০০০। এর একটা বড় অংশ হচ্ছে সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার।
ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের রেডমন্ড শহরের বিশাল এক এলাকা জুড়ে মাইক্রোসফট এর অফিস। প্রায় এক'শ এর মতো বিল্ডিং জুড়ে চলে এর কাজকর্ম। কম্পানীর ইঞ্জিনিয়ারিং কাজকর্ম করা হয় পাঁচটি বড় ডিভিশন এর মাধ্যমে - উইন্ডোজ এবং উইন্ডোজ লাইভ ডিভিশন, অনলাইন সার্ভিসেস ডিভিশন, ডিভাইস এবং এন্টারটেইন্টমেন্ট ডিভিশন, মাইক্রোসফট বিজনেস ডিভিশন, এবং সার্ভার এবং টুলস ডিভিশন। এছাড়াও আইন, এইচআর, মার্কেটিং, ফাইন্যান্স ইত্যাদি আরো অনেক গ্রুপ তো আছেই।

প্রত্যেকটি ডিভিশন এর রয়েছে একজন প্রেসিডেন্ট যারা সরাসরি সিইও স্টিভ বালমার এর কাছে রিপোর্ট করেন। উইন্ডোজ এবং উইন্ডোজ লাইভ ডিভিশন কাজ করে উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম এবং এর অনলাইন ফিচার নিয়ে। উইন্ডোজকে বলা হয় মাইক্রোসফট এর ফ্ল্যাগশিপ পণ্য। মাইক্রোসফট এর সবচেয়ে বেশি আয় হয় এর মাধ্যমে। ২০০৭ সালের মধ্যেই বিশ্বজুড়ে উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম ইন্সটল করা কম্পিউটার এর সংখ্যা এক বিলিয়ন হয়ে যায়। বলা হয়ে থাকে পৃথিবীতে রাস্তাঘাটে যতো কার চলাচল করে তার চেয়ে বেশি উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম চলে দুনিয়াজোড়া কম্পিউটারগুলোতে। বিজনেস ডিভিশন এর পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে মাইক্রোসফট অফিস (ওয়ার্ড, পাওয়ার পয়েন্ট, এক্সেল ইত্যাদি), সার্ভার ডিভিশন এর প্রধান পণ্যগুলো হচ্ছে উইন্ডোজ সার্ভার, এসকিউএল সার্ভার, ডট নেট ইত্যাদি। অনলাইন সার্ভিসেস এর প্রধান পণ্য (বা সেবা) হচ্ছে সার্চ ইঞ্জিন বিং, অনলাইন পোর্টাল এমএসএন ইত্যাদি। ডিভাইস এবং এন্টারটেইনমেন্ট ডিভিশন এর প্রধান পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে আইপড এর প্রতিদ্বন্ধী জুন মিউজিক প্লেয়ার, উইন্ডোজ
মোবাইল, এক্সবক্স গেইম কনসোল ইত্যাদি। এই ডিভিশনগুলির প্রত্যকটিই অন্য অনেক স্বয়ংসম্পূর্ণ কম্পানীর চেয়ে অনেক বড়।

মাইক্রোসফট এর রয়েছে বিশাল গবেষণা গ্রুপ। "মাইক্রোসফট রিসার্চ " হচ্ছে কম্পিউটার বিজ্ঞান এর সবচেয়ে নামকরা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। ২০০৯ সালে এর বাজেট এর পরিমাণ ছিলো ৯ বিলিয়ন ডলার এর বেশি! গবেষণার পেছনে এ পরিমাণ টাকা পৃথিবীর খুব কম্পানীই খরচ করে। এমনকি গতো এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা অর্থনৈতিক মন্দার সময়ও মাইক্রোসফট তার গবেষণা বরাদ্দ কমায়নি। এখানে কাজ করেছেন এবং করছেন টুরিং এবং ফিল্ডস মেডাল প্রাপ্ত বিজ্ঞানীরা!

মাইক্রোসফট এর অফিসগুলিকে চিহ্নিত করা হয় নাম্বার দিয়ে (ইদানিং অবশ্য এই রীতি থেকে বের হয়ে এসে অন্যান্য নাম দিয়েও বিল্ডিং চিহ্নিত করা হচ্ছে)। সাধারণত একই ডিভিশন এর বিল্ডিংগুলো কাছাকাছি থাকে। আমাদের উইন্ডোজ ডিভিশনের অফিসগুলো বেশির ভাগই বিল্ডিং ২৬, ২৭, ২৮, এবং ৩৭ এ অবস্থিত। তবে অন্যান্য বিল্ডিংএও উইন্ডোজ এর অফিস আছে। মাইক্রোসফট এর অফিসগুলো সাধারণত দরজাওয়ালা ব্যক্তিগত অফিস রুম টাইপের। কিউবিকল অফিস মাইক্রোসফটএ নাই বললেই চলে। আমি এখানকার অনেকের সাথেই এটা নিয়ে কথা বলেছি, এবং প্রায় সবাই বলেছে যে প্রোগ্রামিং কাজের জন্য কিউবিকলের চেয়ে ব্যক্তিগত অফিস রুমই ভালো। প্রত্যেক রুমেই থাকে কমপক্ষে দুটি সাদা বোর্ড, এক বা একাধিক বইএর সেলফ, এবং অফিস ডেস্ক। কিউবিকলে এই সাদা বোর্ড টানানোর সুবিধা থাকেনা। যেকোনো ধরণের ডিজাইন আলোচনার জন্য সাদা বোর্ডের বিকল্প নেই। এখানকার যে কারো অফিস রুমে ঢুকলেই অবধারিতভাবে সাদা বোর্ডটিতে নানারকম ফ্লোচার্ট কিংবা কোড দেখা যাবেই। অনেক বিল্ডিংএ রুম এর বাইরে করিডোরএও সাদা বোর্ড থাকে। কিংবা চা-কফি খাওয়ার, আড্ডা দেওয়ার জায়গাটিতেও সাদা বোর্ড থাকে। এর ফলে যে কোনো অবস্থাতেই ইঞ্জিনিয়াররা কোনো আইডিয়া কিংবা ডিজাইন নিয়ে ততক্ষণাৎ একটা ব্রেইন স্টর্মিং করতে পারে।

বহুমাত্রিক যুদ্ধঃ

বহু ধরণের সফটওয়ার পণ্য থাকার কারণে মাইক্রোসফটকে বহুমুখী যুদ্ধ করতে হচ্ছে দুনিয়ার সেরা সব কম্পানীর সাথে। মাইক্রোসফট এর চির প্রতিদ্বন্ধী হচ্ছে স্টিভ জবস এর অ্যাপল। অ্যাপল এর পণ্য সমূহের নয়নাভিরাম এবং নিখুঁত ডিজাইন এর জন্য কম্পিউটার মার্কেট এর বিশাল একটা অংশ দখল করে নিয়েছে। এবং এই অংশ দিন দিন বাড়ছে। অ্যাপল এর সম্প্রসারণশীল বাজার মাইক্রোসফটকে যারপরনাই ভাবাচ্ছে। এ যুদ্ধে সর্বশেষ সংযোজন বিজ্ঞাপন যুদ্ধ । অ্যাপল এবং মাইক্রোসফট উভয়েই একে অপরকে সরাসরি আক্রমন করে বিজ্ঞাপন বানিয়ে প্রচার করছে সম্প্রতি। উইন্ডোজ এর আরেক প্রতিদ্বন্ধী ওপেন সোর্স অপারেটিং সিস্টেম লিনাক্স। যদিও বাজার দখলের দিক থেকে লিনাক্স এখনো অনেক পিছিয়ে উইন্ডোজ কিংবা অ্যাপল এর থেকে। কিন্তু লিনাক্স এর উৎসাহীর সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকায় মাইক্রোসফট এর শংকা একেবারে কম নয়।

সফটওয়ার ডেভেলপমেন্ট এর দিক থেকে মাইক্রোসফট এর মূল প্রতিদ্বন্ধী জাভা প্রস্তুতকারী সান কর্পোরেশন (সম্প্রতি ওরাকল সানকে কিনে নিয়েছে)। মাইক্রোসফট এর ভিজুয়াল স্টুডিও নির্ভর ডট নেট ডেভেলপমেন্ট এনভায়রনমেন্ট এর জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সান এর জাভা প্লাটফর্ম। ডেটাবেজ এর দিক থেকে মাইক্রোসফট এর এসকিউএল সার্ভার এর শক্ত প্রতিদ্বন্ধী হচ্ছে ওরাকল এর ওরাকল ডেটাবেজ এবং আইবিএম এর ডিবি২ ডেটাবেজ সিস্টেম।

কিন্তু সব প্রতিদ্বন্ধীকে ছাড়িয়ে ইন্টারনেট যুগে মাইক্রোসফট এর সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্ধী হচ্ছে গুগল। গুগল এর ব্যবসার ধরণ, সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং মেধা, মাইক্রোসফট এর চেয়ে বেশি ইন্টারনেটভিত্তিক পণ্য এবং সেবায় বিনিয়োগ করা ইত্যাদি সবকিছু মিলিয়ে গুগল হয়ে দাঁড়িয়েছে মাইক্রোসফট এর ইতিহাসে সবচেয়ে শক্ত প্রতিদ্বন্ধী। মাইক্রোসফট ইন্টারনেট এর গুরুত্ম অনেক আগে বুঝলেও এতে বিনিয়োগ করতে অনেক দেরি করে ফেলে। গুগল যেখানে ১৯৯৮ সালে সার্চ নিয়ে কাজ শুরু করে, মাইক্রোসফট সেখানে সত্যিকারের সার্চ নিয়ে আসে ২০০৬ সালে ("লাইভ" সার্চ নাম নিয়ে)। এতো দেরীতে শুরু করার ফল মাইক্রোসফটকে হাড়ে হাড়ে দিতে হচ্ছে - সার্চ এর বাজার দখলের ক্ষেত্রে মাইক্রোসফট গুগল থেকে যোজন যোজন পিছিয়ে!

সিইও স্টিভ বালমার ভালো করেই জানেন দিন দিন মানুষ ইন্টারনেটএ বেশি বেশি সময় ব্যয় করছে এবং ওয়েব সাইটে বিজ্ঞাপনের পরিমাণও প্রতি বছর বাড়ছে দ্রুত গতিতে। তাই ইন্টারনেটেও মাইক্রোসফটকে ভালো করতে হবে। সার্চ হচ্ছে ইন্টারনেটএ প্রবেশদ্বার। তাই সার্চ এর শক্ত খেলোয়াড় হওয়ার জন্য মাইক্রোসফট মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর সর্বশেষ সংযোজন হচ্ছে বিং . একই সাথে সার্চএ দ্বিতীয় স্থানে থাকা ইয়াহুকে কিনে নেওয়ার জন্য চেষ্টা চালায় মাইক্রোসফট। গতো বছর পুরো ইয়াহুকে কিনতে না পেরে এখন ইয়াহু এর সার্চ অংশটুকু কিনতে আগ্রহী মাইক্রোসফট। দেখা যাক গুগলকে মোকাবেলার মাইক্রোসফট এর এই চেষ্টা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।

অ্যাপল, সান, ওরাকল, লিনাক্স, গুগল ইত্যাদি ছাড়াও আরো অসংখ্য ছোটবড় কম্পানী এবং পণ্য এর সাথে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হচ্ছে মাইক্রোসফটকে। সিসকো এর সাথে কমিউনিকেশন সফটওয়ার নিয়ে, ভিএমওয়ার এর সাথে ভার্চুয়াল অপারেটিং সিস্টেম নিয়ে, অ্যামাজন এবং সেলসফোর্সের সাথে ক্লাউড কম্পিউটিং নিয়ে প্রতিযোগিতা চলছেই!

বিল গেটস এবং স্টিভ বালমারঃ

২০০৮ সালের জুন পর্যন্ত কম্পানীর প্রধান ছিলেন চেয়ারম্যান বিল গেটস। কিন্তু তারপর থেকে তিনি অবসরে যাওয়ার কারণে সিইও স্টিভ বালমার এখন মাইক্রোসফট এর প্রধান কর্ণধার। বিল গেটস এখনো চেয়ারম্যান, কিন্তু তিনি এখন আর পুরো কম্পানীর দায়িত্বে নেই। তিনি শুধু মাত্র উইন্ডোজ এবং সার্চ এর মতো দুএকটি প্রধান পণ্য এর সাথে পরামর্শদাতা হিসেবে জড়িত থাকেন। বিল গেটস এখন মূলত তার বিল এন্ড মেলিন্ড গেটস ফাউন্ডেশন নিয়ে ব্যস্ত। তার ফাউন্ডেশনটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দাতব্য প্রতিষ্ঠান। বিল গেটস তার বন্ধু স্টিভ বালমারকে মাইক্রোসফটএ নিয়ে আসেন ১৯৮০ সালে। ২০০০ সালে বিল গেটস সিইও পদ থেকে সরে গিয়ে স্টিভ বালমারকে সে পদে নিয়োগ দেন। বিল গেটস হচ্ছে মাইক্রোসফট এর টেকনিকাল গুরু আর স্টিভ বালমার হচ্ছেন মার্কেটিং
গুরু। তবে অনেকেই মনে করেন স্টিভ বালমার মাইক্রোসফটকে বিল গেটস এর মতো ভালোভাবে পরিচালিত করতে পারছেননা।

বিল গেটস এর প্রথম দিককার মন্ত্র ছিলো "বিশ্বের প্রতিটি ডেস্কে একটি করে কম্পিউটার যেটিতে মাইক্রোসফট এর সফটওয়ার চলবে"। বলা যায়, গেটস তার এ স্বপ্ন পূরণে মোটামুটি সার্থক হয়েছেন। ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে মাইক্রোসফটকে একটু একটু করে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে আসার জন্য বিল গেটস এবং তার বিশাল কর্মী বাহিনী অবশ্যই কৃতিত্বের দাবীদার। তাদের এই ক্রমাগত প্রযুক্তি আবিষ্কার আর উদ্ভাবন তথ্য প্রযুক্তিকে দিন দিন আরো সমৃদ্ধ করছে, মানুষের জীবনকে করছে আরো আরামদায়ক।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/28984386 http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/28984386 2009-07-27 09:13:21
মাইক্রোসফট এর সাতকাহন - পর্ব ২ (ইন্টার্ণশীপ অভিজ্ঞতা) প্রথম পর্ব...

মাইক্রোসফটএ যারা ফুল টাইম সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে জয়েন করে তাদের ওরিয়েন্টেশন হয় সোমবারে আর যারা ইন্টার্ণ হিসেবে জয়েন করে তাদের ওরিয়েন্টেশন হয় মঙ্গলবারে। গতো বছরের (এবং এই বছরেরও) অর্থনৈতিক মন্দার আগ পর্যন্ত সাধারণত এই ছিলো রেওয়াজ এবং সেই জন্য দেখা যেতো প্রতি সপ্তাহের সোম এবং মঙ্গলবার মাইক্রোসফট এর বিল্ডিং ৪৩ এর একতলার বড় কনফারেন্স রুমটি সবসময় নতুন জয়েন করা ইন্টার্ণ এবং ফুল টাইমারদের দ্বারা গিজগিজ করতো। (প্রসঙ্গক্রমে, গুগলেরও একটি বিল্ডিং ৪৩ আছে, এবং সম্প্রতি বিখ্যাত প্রযুক্তি ব্লগার রবার্ট স্কবল তার নতুন ব্লগ এর নাম রেখেছেন বিল্ডিং ৪৩(http://www.building43.com/about-building43/))। গতো বছর এবং এই বছরের অর্থনৈতিক মন্দার কারণে মাইক্রোসফট এর হায়ারিং অনেক কমে গেছে, তাই হয়তো সেখানে এখন আর অতো বেশি নতুন ইন্টার্ণ আর ফুল টাইমারদের দেখা যাবেনা।

তো ২০০৭ সালের জুন মাসের ১২ তারিখ মঙ্গলবার সকাল ৯ টায় আমাদের ওরিয়েন্টশনে যোগ দেওয়ার জন্য বিল্ডিং ৪৩ এর নির্ধারিত কনফারেন্স রুমটিতে যেয়ে পৌঁছাই। আলরেডি সেখানে হুলস্থূল অবস্থা। অসংখ্য ইন্টার্ণ এর ভিড়ে গিজগিজ অবস্থা। হরেক রকম লাইন সেখানে। কেউ হয়তো প্রাথমিক ফর্ম পূরণ করছে, কেউ হয়তো ব্যাংক সম্পর্কিত ফর্ম পূরণ করছে, কেউ কেউ আইডি কার্ড বানানোর জন্য ছবি তুলছে। আমিও একটার পর একটা লাইনে দাঁড়িয়ে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করছিলাম। আমরা যারা বিদেশী ছাত্র/ছাত্রী ছিলাম তাদের কিছু অতিরিক্ত ফর্ম পূরণ করতে হয়েছিলো। ফর্ম পূরণের আনুষ্ঠানিকতা শেষে আমাদের মূল অনুষ্ঠান শুরু হলো।

মাইক্রোসফটএ একটা টিমই থাকে ওরিয়েন্টশন করার জন্য। তারা একে একে মাইক্রোসফট এর কম্পানী পলিসি, নিরাপত্তা, বিভিন্ন বেনেফিট (স্বাস্থ্য/বীমা/জিম/স্টক ইত্যাদি), এম্পলয়ীদের দায়িত্ব, আধিকার এবং তার সীমা, কম্পানী কালচার, ম্যানেজার এর সাথে সম্পর্ক, ক্যারিয়ার এডভান্সমেন্ট, ইত্যাদি যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে বলে যান এবং অংশগ্রহনকারীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে খাবার-দাবার চলতে থাকে। নতুন আগতরা পরস্পরের সাথে পরিচিত হন। নতুন আসার কারণে সবারই মনে অসংখ্য প্রশ্ন থাকে, এবং আয়োজনকারীরা ধৈর্য ধরে সব প্রশ্নের উত্তর দেন।

ওরিয়েন্টেশন সাধারণত দেড়দিন এর মতো হয়। আমার ওরিয়েন্টেশন শেষে পরদিন দুপুরে আমি আমার নির্ধারিত অফিস বিল্ডিং ৪০ এ গেলাম। নিচে রিসেপশনিস্টকে আমার পরিচয় দিয়ে বললাম আমি আমার ম্যানেজার ক্যারেন এর সাথে দেখা করতে চাই। ঘটনাক্রমে আমার ম্যানেজার ক্যারেন অফিস এ ছিলো না। তখন আমাদের টিম এর আরেকজন আ্যলেক্স (গতো পর্বে যার কথা উল্লেখ করেছিলাম - আমার প্রথম ইন্টারভিউয়ার!) এসে আমাকে উপরে নিয়ে গেলো। এখানকার সব অফিস ইলেক্ট্রনিক আইডি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, দরজার সাথে লাগানো ছোট মডিউলটাতে নিজের আইডি মেলে ধরলে ক্লিক করে দরজা খুলে যায়। যেহেতু তখনো আমার আইডি হয়নি তাই কী একজন এসে আমাকে নিয়ে যেতে হয়েছিলো।

আ্যলেক্স হচ্ছে আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে মজার মানুষদের একজন। সবসময় হাসিখুশি, প্রায় সময়ই চিৎকার চেঁচামেচি করে কথা বলে। আমাকে নিয়ে ও আমার রুম দেখিয়ে দিলো। সৌভাগ্যক্রমে সেই রুমটি তখন খালি ছিলো এবং রুমটি ছিলো জানালার ধারে। এখানে নতুনদের সিঙ্গেল অফিস রুম পাওয়া একটা বিশাল ভাগ্যের ব্যাপার, আর পেলেও সেটি যে জানালার পাশে হবেনা সেটি প্রায় নিশ্চিত! মাইক্রোসফট অফিস এর ব্যাপারে কিউবিকল এর চেয়ে ব্যক্তিগত অফিস রুম এর পক্ষে। আমিও প্রোগ্রামারদের জন্য কিউবিকল এর চেয়ে ব্যক্তিগত রুম বেশি পছন্দ করি। কিউবিকলএ শব্দ বেশি হয় এবং সূক্ষ কাজে মনোনিবেশ করা কঠিন হয়ে পড়ে বলে আমার ধারণা। তাই জীবনের প্রথম ব্যক্তিগত রুম পেয়ে আমি যারপরনাই খুশি হয়ে উঠি!


আ্যলেক্স আমাকে টিম এর অন্য সদস্যদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো। এরপর আমাদের নেটওয়ার্কিং টিম এর এডমিনিস্ট্রেটিভ এসিসট্যান্ট এসে আমার কম্পিউটার দিয়ে গেলো। আ্যলেক্স এর সাহায্য নিয়ে আমি আমার কম্পিউটার, নেটওয়ার্ক ইতাদি সেটাপ করলাম। একটু পরেই আমার ম্যানেজার ক্যারেন আসলো আমার রুমএ। মাইক্রোসফটএ যেকোনো এম্পলয়ী (ইন্টার্ণ বা ফুল টাইমার) এর একজন ম্যানেজার থাকে। সোজা বাংলায় বস! তবে এখানে বস শব্দটির চল নেই। সবাই সবার নাম ধরে ডাকে। শুধু অপিরিচিত কেউ হলে Mr অমুক বলে ডাকে। আ্যলেক্স এর মতো আমার ম্যানেজার ক্যারেনকেও আমার বেশ পছন্দ হয়ে গেলো। আমাদের গ্রুপটি http নিয়ে কাজ করার কারণে ক্যারেন আমার জন্য http প্রোটকল এর উপর একটা বই নিয়ে এসেছিলো আমার জন্য।

এর পরের কয়েকদিন ক্যারেন আর আমার মেন্টর (mentor) আরি এসে আমার কাজ ঠিক করে দিলো। মাইক্রোসফটএ প্রত্যেক ইন্টার্ণ এর একজন ম্যানেজার এবং একজন মেন্টর থাকে। ম্যানেজার দেখেন ক্যারিয়ার এর দিকটা, আর মেন্টর দেখেন টেকনিকাল দিকটা। আমার মেন্টর আরি হচ্ছে আমার দেখা সবচেয়ে প্রতিভাবান সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারদের একজন। উইন্ডোজ এর এমন কোন দিক নেই যেটা সম্পর্কে ওর ভালো ধারণা নেই। আমার ভাগ্য ভালো আমি ওর মতো একজনকে আমার মেন্টর হিসেবে পেয়েছি। ও আমার সাথে প্রতিদিন সকাল নয়টায় আধঘন্টার একটা মিটিং করতো, যেটা প্রায়ই আধঘন্টার জায়গায় দুই/তিন ঘন্টা ধরে চলতো। আমার কাজের অংশ হিসেবে আমি ডাউনলোড ম্যানেজারের মতো একটি আ্যপলিকেশন লিখছিলাম, যেটির কী করতে হবে সেটা বলে দিতো আরি, আর কিভাবে করতে হবে সেটা আমি ঠিক করতাম। কিন্তু আমার অনভিজ্ঞতার কারণে প্রায় সময়ই আরি আমার ডিজাইনটি করে দিতো। ওর (এবং আমার) রুম এর সাদা বোর্ডটিতে কতো যে আঁকিজুঁকি করেছি আ্যপলিকেশন এর ডিজাইন এর বিভিন্ন দিক নিয়ে! ঘন্টার পর ঘন্টা চলতো আমাদের ব্রেইন স্টর্মিং। আ্যপলিকেশনটির ডিজাইন এবং ডেভেলপমেন্ট এর বিভিন্ন পর্যায়ে আরি টিম মিটিংএ আমাকে দিয়ে তখন পর্যন্ত যা যা করেছি সেটা উপস্থাপন করাতো।

যেহেতু সময়টা ছিলো গ্রীষ্মকাল তাই সবসময় এটা সেটা প্রোগ্রাম লেগে থাকতো ওখানে। সবচেয়ে সেরা প্রোগ্রামটি ছিলো বিল গেটস এর বাসায় একটা ডিনারের দাওয়াত। সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখেছি এখানে । এছাড়া প্রডাক্ট ফেয়ার হয়েছিলো যেখানে মাইক্রোসফট এর সব প্রডাক্ট গ্রুপ তাদের প্রডাক্ট উপস্থাপন করেছিলো। প্রত্যেকটি গ্রুপ তাদের প্রডাক্ট এর টেকনিকাল এবং বাণিজ্যিক দিক সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলো। প্রডাক্ট ফেয়ার এর একটা প্রোগ্রাম ছিলো সিইও স্টিভ বালমার এর বক্তৃতা ও প্রশ্নোত্তর পর্ব। মনে পড়ে এই প্রশ্নোত্তর পর্বে একজন ইন্টার্ণ স্টিভ বালমারকে প্রশ্ন করেছিলো মাইক্রোসফট এর এম্পলয়ীদের ফ্রি লাঞ্চ দেওয়া যায় কিনা। প্রশ্ন শুনে সবাই হেসে উঠেছিলো কারণ প্রশ্নটি করা হয়েছে গুগলের কথা মাথায় রেখে - গুগল তাদের এম্পলয়ীদের ফ্রি লাঞ্চ এবং ডিনার দেয়! স্টিভ বালমার বেশ স্মার্টলি উত্তর দিয়ে বলেছিলো মাইক্রোসফট এম্পলয়ীদের যথেষ্ট বেতন দেয় এবং তারা ঠিক করবে তারা কোথায় লাঞ্চ করবে এবং কী লাঞ্চ করবে। এরপর তিনি ইন্টার্ণদের প্রশ্ন করেন কারা চায় তাদের বেতন কিছুটা বাড়িয়ে দেওয়া হোক আর কারা চায় বেতন ঠিক রেখে ফ্রি লাঞ্চ দেওয়া হোক! দেখা গেলো সবাই হাত তুলেছে বেতন বাড়ানোর পক্ষে! তিনি প্রমাণ করে ছাড়লেন এম্পলয়ীরা ফ্রি লাঞ্চ এর চেয়ে বেশি বেতন পছন্দ করে। মাইক্রোসফট এর বার্ষিক টেকনোলজি টাউনহল কনফারেন্সগুলি গ্রীষ্মকালে হয়। এই কনফারেন্সগুলির মূল বিষয় হচ্ছে পৃথিবীর প্রযুক্তি কোন দিকে যাচ্ছে এবং তার সাথে তাল মিলিয়ে মাইক্রোসফট কী কী পণ্য কিংবা সেবা আনছে, অথবা মাইক্রোসফট এর সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা। এইসব কনফারেন্সএ প্রায়শই মাইক্রোসফট এর উপরের দিকের ভাইস প্রেসিডেন্ট বা প্রেসিডেন্টরা উপস্থিত থাকেন এবং মাইক্রোসফট এর ব্যবসায়িক এবং টেকনিকাল বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন। আরেকদিন মাইক্রোসফট সারফেইস টিম একটি সারফেইস কম্পিউটার নিয়ে এসে ডেমোনেস্ট্রেশন করে গেলো ইন্টার্ণদের জন্য। সারফেইস কম্পিউটার তখনো সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি (এখন অল্প কিছু কম্পানী এটি ব্যবহার করে), তাই বাইরের মানুষের আগে এটি দেখতে পেরে বেশ রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম! যারা সারফেইস সম্পর্কে জানতে চান তারা এখানে ক্লিক করুণ।

আগস্ট এর ৩১ তারিখ ছিলো আমার ইন্টার্ণশিপ এর শেষ দিন। তার প্রায় এক সপ্তাহ আগে আমাকে আমার কাজের পূর্ণ ডেমন্সট্রেশন করতে হয় আমাদের টিম এর সামনে এবং উইন্ডোজ ডিভিশন এর কয়েকজন ভাইস প্রেসিডেন্টদের সামনে। টিম এর সাথে আগে থেকে পরিচয় থাকায় সহজেই ডেমন্সট্রেশন করতে পারি। কিন্তু ভাইস প্রেসিডেন্টদের সামনে যেয়ে রীতিমতো ঘাম ছুটে যাবার অবস্থা! ভাগ্যিস আরি আমার পক্ষে অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আমাকে অনাবশ্যক লজ্জার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলো!

মাইক্রোসফটএ সাধারণত গ্রুপএ খালি পজিশন থাকলে এবং ইন্টার্ণশীপ এর সময় ইন্টার্ণদের কাজ পছন্দ হলে তাদেরকে ফুল টাইম সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকুরীর অফার দেওয়া হয়। এবং এটা করা হয় কোনো ধরণের নতুন ইন্টারভিউ নেওয়া ছড়াই। সেজন্যই মাইক্রোসফট এর ইন্টার্ণশীপ ইন্টারভিউ প্রায় ফুল টাইম ইঞ্জিনিয়ারদের ইন্টারভিউ এর মতো হয়ে থাকে। চাকুরীর অফার দেওয়ার ঘটনাটি ঘটে ইন্টার্নশীপ এর শেষ সপ্তাহে।কম্পিউটার বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমার সারা জীবনের স্বপ্ন মাইক্রোসফট বা এ জাতীয় কোনো কম্পানীতে চাকুরী করা। তাই ইন্টার্ণশীপ এর শেষ সপ্তাহে এসে আমার হার্ট বিট নিয়ম করে অনিয়মিত হয়ে গেলো! কাজেই আমার সাথে যোগ দেওয়া ইন্ডিয়ান ছাত্রটিকে ফুল টাইম জব অফার দেওয়ার পর আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না। আমার ম্যানেজারকে ইমেইল করলাম এই বলে - "আমি আমার ইন্টার্ণশীপ এর শেষ সপ্তাহে এসে পড়েছি। আমি জানিনা তোমরা আমাকে ফুল টাইম জব অফার দিবে কিনা। না দিলে কোনো সমস্যা নাই, আমি জানি মাইক্রোসফট এর মতো কম্পানীতে টেকনিকাল স্কিলস ছাড়াও অনেক কিছু দেখে ফুল টাইম জব অফার দেওয়া হয়। কিন্তু অন্তত আমাকে জানিয়ে দাও অফার না দিলেও। তাহলে আমি এই সপ্তাহে অন্যান্য গ্রুপ যারা হায়ার করছে তাদের সাথে ইন্টারভিউ দিবো"। ইমেইল দেওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পরও কোনো উত্তর না পেয়ে ভাবলাম ছোট মুখে বড় কথা বলে ফেললাম নাতো! কিন্তু আরো কিছুক্ষণ পর আমাকে অবাক করে দিয়ে ক্যারেন ইমেইল করলো - "আমরা তোমাকে আমাদের গ্রুপ এ ফুল টাইম সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে জয়েন করার জন্য অফার দিচ্ছি! শীঘ্রই তোমার রিক্রুটার এ ব্যাপারে তোমার সাথে যোগাযোগ করবে।"

এর পরদিন আমার নতুন রিক্রুটার ড্যানিয়েল আমাকে বিল্ডিং ১৯ এ ডেকে নিয়ে মাক্রোসফটএ ফুল টাইম এম্পলয়মেন্ট এর জব অফার দেয়। যদিও এখানকার আবহাওয়া আমার একেবারে অপছন্দ (গ্রীষ্মকাল ছাড়া প্রায় সারাবছর গুঁড়িগঁড়ি বৃষ্টি কিংবা মেঘলা আকাশ থাকে), কিন্তু মাইক্রোসফট এর অফার বলে কথা! অফার এর সময় কম্পানীর নানারকম প্রশংসা ছাড়াও অন্যান্য কম্পানী থেকে যে কতো বেশি সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে ইত্যাদি নানা রকম কথাবর্তা বললো রিক্রুটার। আমার শেষ দিনটিতে ক্যারেন আমার জন্য ছোটখাটো একটা কেক-আইসক্রিম এর পার্টি দিয়েছিলো আমাদর অফিস এর বারান্দায়। গ্রুপ এর সবাই এসে আমাকে বিদায় জানালো আর কবে জয়েন করছি এইসব খোঁজখবর নিলো। আগস্ট মাসের ৩১ তারিখে প্রায় পৌনে তিনমাস ইন্টার্ণশীপ শেষে আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসি।

মাইক্রোসফটএ ফুল টাইম এম্পলয়ী হিসেবে জয়েন করি ২০০৮ সালের জানুয়ারীতে এক প্রচন্ড তুষারপাত এর সকালে। পরের পর্বগুলোতে থাকবে মাইক্রোসফট এর ব্যবসা, প্রযুক্তি, এবং কম্পানী কালচার নিয়ে টুকিটাকি - ব্যক্তিগত কথাকে এখানেই বিদায়!

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/28975626 http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/28975626 2009-07-09 11:02:17
কর্পোরেটকে ঘৃণার সংস্কৃতি - এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ এবং কর্পোরেট না থাকলে কি সভ্যতার চাকা ঘুরতো?
কর্পোরেট বলতে আমরা সাধারণত বড় কম্পানীগুলোকেই বুঝাই। এগুলোর অনেকগুলোই আবার বহুজাতিক কম্পানী। কর্পোরেট এর প্রতি আমাদের ঘৃণা যতোই হোক না কেনো, আমাদের একটা মুহুর্তও কর্পোরেট এর উৎপাদিত পণ্য ছাড়া চলবেনা। আঠারো শতকের দিকে যে শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিলো ইউরোপে, আজকের কর্পোরেট তারই বিশ শতকীয় সংস্করণ। এই যে আমি যেই কম্পিউটার ব্যবহার করে এই লেখাটি লিখছি সেটি ডেল নামক বহুজাতিক কম্পানীর তৈরি, ইন্টারনেট কানেকশন নেওয়া হয়েছে আরেক বিশাল কম্পানী কমকাস্ট থেকে, আমার ঘরের প্রায় প্রত্যেকটি জিনিসপত্র কোনো না কোনো কম্পানীর তৈরি। পানি, বাতাস, আর মাটি ছাড়া বেঁচে থাকার জন্য যা যা দরকার তার সবই আসে কর্পোরেট থেকে। আমার নিজের চাকুরীটাও একটা বহুজাতিক কম্পানীতে! এবং এ চাকুরী পেয়ে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি! এবং সেটাই কি আমাদের সবার জন্য সত্যি নয়? আমাদের সবাই কি একটা ভালো কম্পানীতে একটা ভালো চাকুরী পেলে নিজেদের ধন্য মনে করি না?

পৃথিবীর সভ্যতার চাকা ঘুরানোর মূল রসদগুলো আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানী, গণিতবিদ, অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এঁরা। কিন্তু এগুলো পৃথিবীর ছয় বিলিয়নেরও বেশি মানুষের কাছে তাদের ব্যবহারের মতো পণ্য বা সেবা হিসেবে প্রস্তুত করে নিয়ে যায় মূলত বিভিন্ন বেসরকরারী প্রতিষ্ঠান এবং কম্পানীগুলো (কিছু ক্ষেত্রে সরকারও এই কাজটি করে থাকে)। কম্পানীগুলো এই কাজটি কোনো জনসেবার চিন্তা থেকে নয়, বরং পুরোপুরি মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে। কিন্তু এই মুনাফা লাভ করতে গিয়ে ওরা অসংখ্য মানুষকে চাকুরী দেয় আর মানুষের জীবনকে করে দেয় অনেক বেশি আরামদায়ক। এখন ওরা কতোটুকু লাভ করবে, কিংবা কী প্রক্রিয়ায় ব্যবসা করবে এই আইনগুলি ঠিক করে দিবে দেশের সরকার, যেই সরকারকে নির্বাচন করে ক্ষমতায় আনবে সেই দেশের জনগন। জনগন যেহেতু সরকারকে ক্ষমতায় আনবে, তাই সরকার এমনভাবে আইন করবে যাতে জনগনের স্বার্থ সবার আগে রক্ষা হয়। এক্ষেত্রে এটাও মনে রাখতে হবে যারা ওই কম্পানীগুলোর মালিক/অংশীদার তারাও এই জনগনের অংশ, এবং তারাও অসংখ্য মানুষের চাকুরীর ব্যবস্থা করে দেশের অর্থনৈতিক চাকাকে সচল রাখছে।

আমরা যারা বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়এ পড়ছি বা পড়ে পাশ করে বের হয়েছি, আমাদের সবার লক্ষ্য কী? প্রায় সবাই কি একটা ভালো চাকুরী করতে চাই না? বড় বড় টেলিকম কম্পানীগুলো, কিংবা বড় বড় বুহুজাতিক কম্পানী-ব্যাঙ্কগুলো হয় আমাদের প্রথম টার্গেট, কারণ সেগুলো সবচেয়ে বেশি বেতন দেয়। একটা স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য সবারই টাকা দরকার হয়, টাকা নিয়ে যতোই বড় কথা বলি না কেনো আমরা। আর সেই টাকার একটা বড় অংশ অর্থনীতিতে পাম্প করে এই কম্পানীগুলো। অর্থনীতিকে সচল রাখতে কম্পানীগুলোর কোনো বিকল্প নেই।

উন্নত দেশগুলিতে এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপকে প্রচন্ড উৎসাহ দেওয়া হয়। বৈদ্যুতিক বাল্বসহ অসংখ্য আবিষ্কারের জনক থমাস আলভা এডিসন ছিলেন একজন সফল উদ্দোক্তা (এন্ট্রাপ্রেনিউর)। মাইক্রোসফট এর বিল গেটস, গুগলের ল্যারি এবং সের্গেই, এইচপি এর হিউলেট এবং প্যাকার্ড - এরকম অনেক কম্পানীর প্রতিষ্ঠাতারা আক্ষরিক অর্থেই জিনিয়াস পর্যায়ের মানুষ। এই কম্পানীগুলো বিংশ এবং একবিংশ শতকের সভ্যতার পরিবর্তনের অন্যতম চালক। তেমনি করে সারা পৃথিবী জুড়ে খেলাধুলা, ইলেক্ট্রনিক্স, কম্পিউটার, টেলিকম, পেট্রোলিয়াম, কসমেটিক্স, খাদ্যদ্রব্য, যানবাহন, উড়োজাহাজ, স্বাস্থ্য - ইত্যাদি বিভিন্ন খাতে অসংখ্য শিল্প প্রতিষ্ঠান নির্ভর কম্পানী নানারকম পন্য এবং সেবা দিয়ে পৃথিবীতে আমাদের জীবন যাপনকে করে দিয়েছে অনেক বেশি সুবিধাজনক আর আরামদায়ক। আমাদের আজকের এই মোবাইল ফোন বিপ্লব, মিডিয়া বিপ্লব এগুলোর পেছনেও রয়েছে কর্পোরেট। মোবাইল ফোন ছাড়া কি একটা দিনও থাকার কথা ভাবা যায়? আর কর্পোরেটকে বাদ দিয়ে সরকারীভাবে ফোন সেবা দিতে চাইলে যে কী অবস্থা হয় সেটা টিএন্ডটি আর টেলিটককে দেখলেই বুঝা যায়!

দেশের অর্থনীতির স্বাস্থ্য অনেকাংশেই নির্ভর করে এই কম্পানীগুলোর স্বাস্থের উপর। কম্পানীগুলোর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে টাকা কামানো, সরকার সঠিক আইনের মাধ্যমে এই কম্পানীগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে। কম্পানীগুলোকে ঘৃণা করে দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন ঘটানো যাবে না। দুঃখের বিষয় এমনকি বিয়ে করার সময় পাত্র ব্যবসা করে এমন কথা শুনলে আমাদের অভিভাবকরা তাদের মেয়ে বিয়ে দিতে চায়না অনেক সময় সেই পাত্রের কাছে। ব্যবসা মানেই মুদির দোকানী বা এরকম কিছু, কিংবা ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে না পেরে কিছু একটা করার চেষ্টা - এই ধারণা থেকে আমাদের বের হতে হবে। মেধাবী ছেলেমেয়েরাও ব্যবসা করে, এবং সেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অনেক মেধাবী ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-ব্যবসা প্রশাসন গ্র্যাজুএট কাজ করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে - এটাকে একটা বাস্তবতা হিসেবে আমাদের মেনে নিতে হবে।

আমাদের দরকার অনেক অনেক ব্যবসায়ী উদ্দোক্তা, অনেক অনেক কর্পোরেট কম্পানী। সিলিকন ভ্যালীর মতো সভ্যতা পরিবর্তনকারী ব্যবসা'র জায়গা তৈরী হয়েছে শুধুমাত্র উদ্দোক্তাদের মাধ্যমে। সিলিকন ভ্যালীর উদ্দোক্তারা প্রায় সবাই কোটিপতি, কিন্তু তাদের পন্য ব্যবহার করে আরো বেশি মানুষ কোটিপতি হয়েছে এবং তার চেয়েও বেশি মানুষ আরামদায়ক জীবন যাপন করছে তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করে। "কর্পোরেট" শব্দটাকে একটা ভালো শব্দ হিসেবে দেখতে হবে। কর্পোরেটএ চাকুরী পাবার জন্য একের পর সিভি জমা দিবো কিন্তু ব্লগে বসে কর্পোরেটকে গালি দিবো সেটা হওয়া উচিত নয়। এরচেয়ে গণহারে সমালোচনা না করে স্পেসিফিক সমালোচনা করলে ব্যাপারটা অনেক বেশি ঠিক হয়। কর্পোরেট যেনো আমেরিকার মতো হয়ে না পড়ে - আমেরিকাকে সবাই গালি দেয় কিন্তু সবাই সেখানে যেতে চায়, ডিভি লটারিতে সবচেয়ে বেশি আবেদন পড়ে বাংলাদেশ থেকে! কর্পোরেট যেনো একটা আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়, এন্ট্রাপ্রেনিউর হওয়া ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-ম্যানেজার হওয়ার চেয়ে কম স্মার্ট ব্যাপার না। একটি সফল পণ্য তৈরি ও বাজারজাত করা এবং সেটিকে সবার নিত্যদিনের ব্যবহার্য করে তোলা একটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার, এবং এই কাজের জন্য দরকার ভিশন এবং এক্সিকিউশন। আজকের দিনের সেরা ব্র্যান্ডগুলি তৈরির পেছনে অসংখ্য প্রতিভাবান মানুষের অনেক বছরের পরিকল্পনা আর পরিশ্রম রয়েছে। এই পরিশ্রমকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।

তবে কর্পোরেট যেনো মানুষের ক্ষতির কারণ না হয়ে দাঁড়ায় তার জন্য থাকতে হবে শক্ত আইন এবং তার শক্ত প্রয়োগ। বন উজাড় করে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, চাষাবাদের জমি এবং নদী দখল করে আবাসিক প্রকল্প গড়ে তোলা, সেবার তুলনায় টাকা বেশি নেওয়া ইত্যাদি ব্যাপারে সরকারকে থাকতে হবে তৎপর। কিন্তু এসব যাতে কর্পোরেট এর বিরুদ্ধে নির্বিচার ঘৃণার কারণ না হয়ে উঠে সেটি খেয়াল রাখতে হবে। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে কর্পোরেট এর বিকল্প নেই। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বছর বছর যে হাজার হাজার ছেলেমেয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং, বিবিএ, অর্থনীতি, রাজনীতি বিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞান, ইত্যাদি অসংখ্য বিষয় থেকে পাশ করে বের হচ্ছে তাদের পর্যাপ্ত চাকুরীর জন্য দরকার অনেক অনেক কর্পোরেট কম্পানী। শুধু খেয়াল রাখতে হবে আমাদের সরকার যেনো দেশের আইনটা ঠিকমতো প্রয়োগ করে আর সাধারণ মানুষের স্বার্থের দিকটা ঠিক রাখে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/28973404 http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/28973404 2009-07-04 12:10:05
মাইক্রোসফট এর সাতকাহন - পর্ব ১ (ইন্টার্ণশীপ ইন্টারভিউ)
মাইক্রোসফট এর স্টল খুঁজে পেতে একটু সময় লাগলো। মাইক্রোসফট থেকে আসা কয়েকজন সেখানে ছিলো যারা সিভি ড্রপ করতে আসা বিভিন্ন ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে কথা বলছিলো। তো একসময় আমার পালা আসলো। ইন্ডিয়ান একটা ছেলে আমার দিকে এগিয়ে এসে হাত বাড়ালো। আমিও হাত বাড়িয়ে হাত মেলালাম। আমি তখনো ছাত্র, মাত্র আমার মাস্টার্স শুরু করেছি, বললাম আমি সামনের গ্রীষ্মের ছুটিতে মাইক্রোসফটএ ইন্টার্ণশীপ করতে আগ্রহী। সে আমার সিভিটি নিলো। ভালো করে দেখলো সেটি। এরপর আমার কিসে আগ্রহ, কী ধরণের কাজ ভালো পারি এসব জিজ্ঞেস করলো। আমিও আমার মতো করে উত্তর দিয়ে গেলাম। এরপর সে বললো সে আমার সিভি সঠিক জায়গায় পৌঁছে দিবে এবং আমার যোগ্যতার সাথে ম্যাচ করে এমন পজিশন খালি থাকলে আমার সাথে যোগাযোগ করবে। বিদায় নেবার সময় আমার হাতে একটা সুডকু (একধরণের পাজল গেইম) বই ধরিয়ে দিয়ে বললো - "তুমি যেহেতু প্রব্লেম সল্ভিং পছন্দ করো, তাই তোমাকে এই পাজল এর বইটি দিচ্ছি। আমার ধারণা তুমি এটা উপভোগ করবে"।

সেদিন ল্যাবে ফিরে এসে আমি মোটামুটি এই ক্যারিয়ার ফেয়ার এর কথা ভুলেই গেলাম। নতুন পরিবেশে পড়ালেখার চাপে আমার তখন ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা। এরমধ্যে একদিন ইমেইল পেলাম মাইক্রোসফট থেকে। "নভেমবর মাসের অমুক তারিখে আমাদের ক্যাম্পাস ইন্টারভিয়ার এর সাথে তোমার একটা ইন্টারভিউ এর ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমাদের জানাও তুমি সেসময় এটায় উপস্থিত থাকতে পারবে কিনা"। আমি মনে মনে বললাম, "আবার জিগায়!"। সাথে সাথে ইমেইল এর উত্তর দিলাম - "ধন্যবাদ আমাকে ইন্টারভিউএ আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। আমি ওইদিন যথাসময়ে জায়গামতো উপস্থিত থাকবো"। এরপর ওরা জায়গা ও সময় কনফার্ম করে আরেকটা এমেইল দিয়েছিলো। আমি মনে মনে দিন গুনতে লাগলাম।

ইন্টারভিউ এর দিন ঘনিয়ে আসতে থাকায় আমি ইন্টারনেট ঘেঁটে প্রাথমিক ইন্টারভিউয়ে আসতে পারে এমন প্রশ্ন ডাউনলোড করে পড়া শুরু করলাম। টুকটাক প্রোগ্রাম লিখে ভুলে যাওয়া প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ এর সিনট্যাক্স ঝালাই করে নিলাম। ইন্টারভিউ এর জায়গাটি ছিলো আমাদের কম্পিউটার সায়েন্স বিজ্ঞান বিভাগের উলটা দিকের বিল্ডিং, তাই সেটি খুঁজে পাওয়া নিয়ে কোনো চিন্তা করতে হলো না। ইন্টারভিউ এর দিন আমি যথাসময়ে ইন্টারভিউ এর নির্ধারিত ভবনে যেয়ে পৌঁছালাম। ওখানে ডেস্কে থাকা মেয়েটিকে বললাম আমি কেনো এসেছি। ও কম্পিউটারে আমার নাম দেখে নিশ্চিত হয়ে নিয়ে আমাকে একটা ফর্ম ধরিয়ে দিলো। ফর্মটি পূরণ করে আমি সোফায় বসে অপেক্ষা করতে থাকলাম আমার ইন্টারভিউয়ার এর জন্য।

একসময় আমার ইন্টারভিউয়ার আসলো। লম্বা মতোন এক আমেরিকান ভদ্রলোক এসে হাত বাড়িয়ে আমার নাম জিজ্ঞেস করলো আর নিজের পরিচয় দিলো? ও জানালো ও ভিজুয়াল স্টুডিও গ্রুপ এর একজন ম্যানেজার। আমি ওকে অনুসরণ করে ছোট একটি কক্ষে প্রবেশ করলাম। এখানেই আমার ইন্টারভিউ হবে। ও আমার সিভি বের করলো। আমার সিভি দেখে আমাকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলো। সিভিতে যেসব স্কিলস এর কথা লিখেছি ওগুলো নিয়ে কয়েক মিনিট আলোচনা করলো। এরপর আমাকে স্ট্রিং সম্পর্কিত একটা প্রোগ্রামিং সমস্যা সমাধান করতে বললো। আমি কাগজে সেটির কোড লিখলাম। আমার কোড নিয়ে আমাকে প্রশ্ন করলো। কিভাবে আমার এই কোড আমি ব্রেক করবো সেটা জিজ্ঞেস করলো। এই কোডকে টেস্ট করার জন্য টেস্ট কেইস লিখতে বললো। এরপর আরো কিছু টুকটাক প্রোগ্রামিং প্রশ্ন করে আমার ইন্টারভিউ শেষ করলো। শেষ করার আগে এখানে যা নিয়ম, আমাকে জিজ্ঞেস করলো আমার কোনো প্রশ্ন আছে কিনা তার জন্য। আমি প্রস্তুত ছিলাম। তাকে মাইক্রোসফট এর সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট নিয়ে দুএকটা প্রশ্ন করলাম। ও আমাকে সেগুলোর ব্যাখ্যা দিলো। এভাবে শেষ হলো সেদিনের ইন্টারভিউ পর্ব।

ইন্টারভিউ শেষে আবার আমার ব্যস্ত পড়ালেখার জীবনে ফিরে গেলাম। কিন্তু মনে মনে ভীষণ অপেক্ষা করতে থাকলাম একটা ইমেইল এর জন্য! ওরা যদি আমাকে পছন্দ করে থাকে তাহলে আমাকে ওরা মাইক্রোসফট এর প্রধান অফিস ওয়াশিংটন স্টেইট এর রেডমন্ড নামক শহরে নিয়ে যাবে একদিন সারাদিন ইন্টারভিউ এর জন্য। আমার ইন্টারভিউ মোটামুটি ভালোই হয়েছিলো, কিন্তু সবাই নিশ্চয়ই এখানে ভালো ইন্টারভিউ দেয়! সবাই বলছিলো সাধারণত দুই সপ্তাহের মধ্যে ওরা রেজাল্ট জানিয়ে দেয়, কিন্তু ২ সপ্তাহ চলে গেলেও ওদের ইমেইল এর কোনো দেখা মিললো না। এ পর্যায়ে আমি সব আশা ছেড়ে দিলাম। অবশেষে তিন সপ্তাহ পর আমাকে অবাক করে দিয়ে আমার মেইলবক্সে মাইক্রোসফট থেকে একটা ইমেইল আসলো যে আমাকে মাইক্রোসফট এর প্রধান কার্যালয়ে একদিন সারাদিন ইন্টারভিউ এর জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। এই ইমেইল পেয়ে আমার খুশি আর দেখে কে। ইন্টার্ণশীপ না পাই, নিদেনপক্ষে মাইক্রোসফট এর খরচে ওদের প্রধান কার্যালয় দেখে ঘুরে তো আসা যাবে!

সামনে ক্রিসমাসের ছুটি থাকায় আমার ইন্টারভিউ ওরা ঠিক করে ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে। রেডমন্ড যাওয়া-আসার প্লেইন টিকেট, হোটেল এর বিল, থাকা-খাওয়া সবই মাইক্রোসফট বহন করবেঃ-) আমার ফ্লাইট এর দিন ঠিক করি ইন্টারভিউ এর আগেরদিন। কিন্তু ফ্লাইট এর দিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই ভয়েস মেইল পাই এয়ারলাইন্স থেকে যে মত্রারিরিক্ত তুষারপাতের ফলে আমার ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এর নামই মনে হয় কপাল। আরেকটু বেলা গড়ানোর পর আমি যোগাযোগ করি মাইক্রোসফটএ আমার রিক্রুটার এর সাথে। সে তখন একটু সময় নিয়ে দুই সপ্তাহ পর আমার ইন্টারভিউ এর দিন পুননির্ধারণ করে। আমার অনুরোধে ওরা আমেরিকার তুষারপাতপ্রবণ এলাকা (মিড-ওয়েস্ট এলাকা) এড়িয়ে অন্য শহরের মধ্য দিয়ে কানেক্টিং ফ্লাইট ঠিক করে দেয়।

সৌভাগ্যক্রমে আমার নতুন ইন্টারভিউ এর দিন কোনো ঝামেলা ছাড়াই সিয়াটল এয়ারপোর্ট এসে পৌঁছাই। সিয়াটল এয়ারপোর্ট থেকে ট্যাক্সি নিয়ে সোজা রেডমন্ডে আমার হোটলে চলে আসি। বিকেলে মাইক্রোসফট এর সাইদ ভাই আমাকে মাইক্রোসফট ক্যাম্পাস ঘুরিয়ে নিয়ে আসেন। মাইক্রোসফট ক্যাম্পাস একটা বিশাল এলাকা। একশ'র মতো বিল্ডিং আছে এখানে। উইন্ডোজ আর অফিস (ওয়ার্ড, এক্সেল, পাওয়ার পয়েন্ট ইত্যাদি) এর সবচেয়ে বড় দুটি প্রডাক্ট হলেও সার্চ, এমএসএন, এক্সবক্স, জুন মিউজিক প্লেয়ার, উইন্ডোজ সার্ভার, এসকিএল সার্ভার, ভিজুয়াল স্টুডিও - ইত্যাদি অসংখ্য গ্রুপ এর অফিস ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পুরো এলাকা জুড়ে। সে যাক, মাইক্রোসফট এর অফিস এবং সফটওয়্যার ব্যবসা নিয়ে আরেকদিন লিখবো। আজ আমার ইন্টারভিউ নিয়ে লেখা যাক।

তো পরদিন আমি সকাল দশটার সময় বিল্ডিং ১৯ এ চলে যাই। বিল্ডিং ১৯ হচ্ছে মাইক্রোসফট এর রিক্রুটিং বিল্ডিং। সকল নতুন চাকুরীপ্রার্থীকে সবার আগে এখানে চেকইন করতে হয়। তো রিসেপশনে যেয়ে নাম বলতেই আমাকে বলা হলো আমার রিক্রুটার একটু পরে এসেই আমাকে নিয়ে যাবে। আমি লবিতে সোফায় বসে অপেক্ষা করতে থাকলাম। একটু পরই আমার রিক্রুটার ডেভিড এসে নিজের পরিচয় দিলো এবং আমাকে নিয়ে ওর অফিসএ নিয়ে গেলো। সেখানে আমার নন-টেকনিকাল ইন্টারভিউ হলো। আমি কেনো মাইক্রোসফটএ কাজ করতে চাই, আর কোন কোন কম্পানীতে এপ্লাই করছি, আমার স্যালারি এক্সপেক্টেশন কেমন, কী ধরণের কাজ আমার পছন্দ এই সব। ঘন্টা খানেক ওর সাথে থেকে ও আমাকে আমার প্রথম টেকনিকাল ইন্টারভিউয়ার এর কাছে পাঠিয়ে দেয়। মাইক্রোসফটএ বিভিন্ন বিল্ডিং এর মধ্যে সারাক্ষণ অনেক শাটল কার চলাচল করে। ও আমাকে সেরকম একটা কারে করে বিল্ডিং ৪০ এ আমার প্রথম ইন্টারভিউয়ার এর কাছে পাঠিয়ে দেয়।

বর্ণনা অনেক লম্বা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমার প্রথম ইন্টারভিউয়ার এর গল্প না বললেই নয়। যেহেতূ তখন লাঞ্চ এর সময় হয়ে গিয়েছেলো, তাই আমার প্রথম ইন্টারভিউটি ছিলো একটা লাঞ্চ ইন্টারভিউ। লাঞ্চ ইন্টারভিউ মানে হচ্ছে ইন্টারভিউয়ার চাকরীপ্রার্থীকে লাঞ্চএ নিয়ে যাবে এবং খাবার খেতে খেতে বিভিন্ন প্রশ্ন করবে। আমার প্রথম ইন্টারভিউয়ারের নাম ছিলো আ্যলেক্স। ও একজন চাইনিজ-আমেরিকান। গতো প্রায় বিশ-পঁচিশ বছর ধরে আমেরিকাতে আছে। তো ও আমাকে ক্যাফেটারিয়ার দিকে নিয়ে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করলো আমার কী ধরণের খাবার পছন্দ। আমি মাছে ভাতে বাঙ্গালী। ওকে বললাম ঝাল মশলা দেওয়া ইন্ডিয়ান (বাংলাদেশী খাবার বললে ওরা চিনেনা, আমাদের টাইপের খাবারকে ওরা ইন্ডিয়ান খাবার বলে) খাবার আমি পছন্দ করি, আমেরিকান খাবার তখনো আমার মুখে রচে না। ও আমাকে অবাক করে দিয়ে বললো, "চলো আমার সাথে"। আমাকে নিয়ে সোজা পার্কিং গারাজে যেয়ে ওর বিশাল জীপ গাড়িতে উঠলো। এরপর আমাকে নিয়ে গেলো মায়ুরি নামের এক ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টএ! মায়ুরিতে ভাত আর মশলা দেওয়া মুরগীর তরকারী খেতে খেতে দিলাম আমার মাইক্রোসফট এর প্রথম ইন্টারভিউ!

এরপর একে একে আরো তিনটি ইন্টারভিউ দিই। প্রত্যেক ইন্টারভিউয়ার তার ইন্টারভিউ শেষ হওয়ার পর পরবর্তী ইন্টারভিউয়ার এর কাছে পাঠিয়ে দেয়। চার ইন্টারভিউয়ারের প্রথম দুইজন ছিলো উইন্ডোজ নেটওয়ার্কিং গ্রুপ এর, আর শেষের দুজন ছিলো উইন্ডোজ ফান্ডামেন্টালস গ্রুপ এর। শেষ ইন্টারভিউ নেন উইন্ডোজ গ্রুপ এর একজন ডিরেক্টর। তাঁর সাথে কথা বলার সময়ই মনে হয়েছিলো আমার ইন্টারভিউ মনে হয় খারাপ হয়নি। ইন্টারভিউ এর শেষে তিনি যে কথাগুলি বলেছিলেন সেটা এখনো আমার মনে আছে - "ঠিক আছে তুমি তোমার বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যাও আর মনযোগ দিয়ে লেখাপড়া করো। দেখি আমি তোমার জন্য কী করতে পারি"। তাঁর এ ধরণের কথা আমার কাছে খুব পজিটিভ মনে হয়েছিলো!

এর এক সপ্তাহ পরেই আমার সেমেস্টার ফাইনাল পরীক্ষা থাকায় আমি ওইদিন রাতেই ওহাইও ফিরে আসি। পরেরদিন সকালবেলা আমার দাঁতের ডাক্তার এর সাথে এপয়েন্টমেন্ট ছিলো। সকালে আমি আমার দাঁতের স্কেলিং করাচ্ছিলাম। আমার ফোন বন্ধ ছিলো। দাঁতের ক্লিনিক থেকে বের হয়ে মোবাইল অন করতেই দেখি একটা ভয়েস মেইল। মাইক্রোসফট থেকে আমার রিক্রুটার ডেভিড ফোন করেছে। ভয়েস মেইলএ ও জানালো আমার ইন্টারভিউ এর রেজাল্ট রেডি ওর কাছে, আমি যেনো ওকে কল ব্যাক করি। আমারতো তখন বুকের ভেতর ড্রামের বাড়ি হচ্ছে। আমি সাথে সাথেই ওকে কল করি। আর তখনি ও আমাকে আমার জীবনের সবচেয়ে ভালো খবরগুলির একটি জানালোঃ মাইক্রোসফট এর দুটি গ্রুপ - উইন্ডোজ ফান্ডামেন্টালস আর উইন্ডোজ নেটওয়ার্কিং - আমাকে সামনের সামারের জন্য একটি ইন্টার্ণশীপ অফার করছে!! গ্রুপ দুইটির ডিরেক্টর দুজন আমাকে ফোন করে তাঁদের গ্রুপ সম্পর্কে বলবেন, এরপর আমি যে গ্রুপ পছন্দ করি সেটিতেই জয়েন করতে পারবো।

এটা ছিলো আমার জীবনের একটা শ্রেষ্ঠ সময়। নেটওয়ার্কিং এর প্রতি আমার আগ্রহ থাকায় আমি নেটওয়ার্কিং গ্রুপকেই সিলেক্ট করি। অবশ্য ফান্ডামেন্টালস গ্রুপ আমাকে ঘুষ হিসেবে এক্সবক্স গেমস, ওয়েব ক্যাম, বিভিন্ন ধরণের মাক্রোসফট কম্পানী স্যুভেনীর পাঠিয়েছিলো ওদের গ্রুপ এর দিকে আকৃষ্ট করার জন্য! কিন্তু ঘুষ দিয়ে কি আর সবকিছু হয়ঃ-)

২০০৭ এর জুন মাসের ১২ তারিখে আমি মাইক্রোসফটএ উইন্ডোজ নেটওয়ার্কিং গ্রুপ এর ওয়েব ক্লায়েন্ট টিম (যারা http প্রটোকল implement করে) এর একজন ইন্টার্ণ হিসেবে জয়েন করি। শুরু হয় আরেক বিচিত্র আনন্দ যাত্রা। সে যাত্রার খবর আগামী পর্বে। এইবেলা এখানেই ইতি টানি!
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/28971226 http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/28971226 2009-06-29 14:01:09
ওয়াইল্ড ওয়াইল্ড ওয়েব - ইন্টারনেট প্রযুক্তি কোন দিকে যাচ্ছে? টিম বার্নার্স-লি যে ওয়েব (Web) নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন, সেই ওয়েব যে আজকে এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়াবে সেটা তিনি নিজেই ভেবেছিলেন কিনা সন্দেহ আছে। ওয়েব প্রযুক্তি দিনদিন সমৃদ্ধ হচ্ছে, আমাদের জীবনের যাবতীয় প্রয়োজন মেটানোর প্রায় সবকিছুই এখন ওয়েবএ পাওয়া যায়। মানুষের সাথে মানুষের এতো সহজ যোগা্যোগ এবং তথ্যের আদান-প্রদান পৃথিবীর ইতিহাসে আগে কখনো হয়নি।

আমরা অনেকেই ইন্টারনেট বলতে যা বুঝি সেটা হচ্ছে আসলে ওয়েব। ওয়েব হচ্ছে ইন্টারনেট এর অনেকগুলো আ্যপ্লিকেশন এর একটি। অন্যান্য আরো কিছু আ্যপ্লিকেশন হচ্ছে ইমেইল, এফটিপি (ফাইল ট্রান্সফার প্রোটোকল), এসএসএইচ (SSH) ইত্যাদি। ইন্টারনেট বলতে বস্তুত এই পৃথিবীব্যাপী নেটওয়ার্কেই বুঝায়। ওয়েবই আসলে সবচেয়ে দৃশ্যমান এবং সবচেয়ে বেশি ব্যাবহৃত ইন্টারনেট আ্যপ্লিকেশন। ওয়েব এর মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে তথ্যের সহজলভ্যতা। তথ্য বলতে যে শুধু জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কিত বিষয় বুঝায় তা কিন্তু নয়। দৈনন্দিন জীবনে আমাদের যাকিছু জানার প্রয়োজন তাই তথ্য। আমার বন্ধু সেন্ট মার্টিন দ্বীপে বেড়াতে গেছে সেটি একটি তথ্য, সেখানে ও অনেক ছবি তুলেছে সেই ছবিগুলোও একধরণের তথ্য, সেখানে কোথায় ভালো খাবার পাওয়া যায় সেটাও তথ্য। তথ্যের এই বহুমাত্রিকতা শুরু হয় বিশেষ করে সোশাল নেটওয়ার্কগুলোর প্রচলন শুরু হওয়ার পর থেকে।

তথ্য আদান-প্রদানই হয়ে উঠছে ওয়েব ভিত্তিক কম্পানীগুলোর মূল ব্যবসা। গুগলের মূল মিশন হচ্ছে বিশ্বজগতের সব তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। ওয়েব এর প্রথম দিকে ব্যাপারটি ছিলো আমাদের নিজেদের দরকারী তথ্য খুঁজে নিতে হবে। কিন্তু এখন ধীরে ধীরে ব্যাপারটি এমন হতে চলেছে যে দরকারী তথ্য আমাদেরকে খুঁজে নিবে . গুগল, মাইক্রোসফট, ইয়াহু, ফেইসবুক, টুইটার , উইকিপিডিয়া, ফ্রেণ্ডফিড , মাইস্পেস , অরকুট, ডিগ , টেকমিম সবাই এই তথ্য প্রবাহ এবং যোগাযোগকে মানুষের আরো কাছে নিয়ে আসার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। আরএসএস এবং রিয়াল টাইম আপডেট এর মতো প্রযুক্তিগুলো আবিষ্কার হয়েছে এধরণের সেবা দেওয়ার জন্য। গতো কয়েক বছরে একটা জিনিস স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে মানুষ সংবাদের জন্য টেলিভিশন-সংবাদপত্র ইত্যাদির চেয়ে ওয়েব এর কাছেই বেশি যাচ্ছে । সংবাদ পড়ার জন্য আগে মানুষ সিএনএন, নিউইয়র্ক টাইমস, গুগল নিউজ ইত্যাদি সাইটে গেলেও ইদানিং সোশাল নেটওয়ার্ক এবং ব্লগ হয়ে উঠছে সংবাদের নতুন উৎস।

এ ব্যাপারটা প্রথম আমি খেয়াল করি গতো মার্চ মাসে আমেরিকান এয়ারলাইন্স এর একটি প্লেইন নিউ ইয়র্কের হাডসন নদীতে জরুরী অবতরণ করার পর। এই ঘটনার খবর সবার আগে জনসম্মুখে আসে টুইটারের মাধ্যমে। প্রত্যক্ষদর্শীদের (এবং উদ্ধারকারীদের) মধ্যে অনেকেই টুইটার ব্যবহারকারী ছিলেন এবং তারা প্রতিনিয়ত ছোট ছোট টুইট (১৪০ শব্দের ভেতর এসএমএস এর মতো অনলাইন মেসেজ) দিয়ে ঘটনার আপডেট দিচ্ছিলেন। টুইটারের সুবিধা হলো এটি ব্যবহার করে রিয়াল টাইম সংবাদ দেয়া যায়। এটাকে বলা যায় এসএমএস এর অনলাইন ভার্শন। কিন্তু এসএমএস দিয়ে যেখানে একসাথে একজনকে মেসেজ পাঠানো যায়, টুইটারের সাহায্যে সেখানে আক্ষরিক অর্থেই কয়েক মিলিয়ন মানুষের কাছে মেসেজ পাঠানো যায়। টুইটারের এমন উত্থানের পর সিএনএন, নিউ ইয়র্ক টাইমস এর মতো সংবাদ মাধ্যমগুলো অনেক দুশ্চিন্তায় আছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে সিএনএন (@cnnbrk) এবং নিউ ইয়র্ক টাইমস (@nytimes) দুটি'রই টুইটার একাউন্ট আছে! টুইটারকে অনেকেই বলছে গুগল এবং ফেইসবুকের নতুন প্রতিদ্বন্ধী। ফেইসবুকের সর্বশেষ ডিজাইনটি করা হয়েছে আসলে টুইটারকে নকল করে এবং একে টপকে যাওয়ার জন্য। খেয়াল করে দেখবেন ফেইসবুক সারাক্ষণ সবার স্টেটাস আপডেট আপনার পেইজে নিয়ে আসে। অনেক খবর, যেমন মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যু, মানুষ প্রথম জেনেছে ফেইসবুকে বন্ধুদের স্টেটাস মেসেজ থেকে!

টুইটার সর্বশেষ সবাইকে টপকে যায় সাম্প্রতিক ইরানের সাধারণ নির্বাচনের সময়। ইরান সরকারের নানারকম সেন্সরশীপের কারণে ইরানের ভেতরের খবর বাইরে যাবার পথ প্রায় বন্ধ তখন। ইরানের জনগণ তখন টুইটার ব্যবহার করে নির্বাচন পরবর্তী আন্দোলন-সহিংসতার খবর ওয়েবে পোস্ট করতে থাকে। সিএনএন এর মতোন সংবাদ সংস্থা যখন সংবাদ সরবরাহে ব্যর্থ হচ্ছিলো টুইটারের মতো অনলাইন মেসেজিং সাইট তখন হয়ে উঠলো সংবাদের প্রধান উৎস। এমনকি টুইটার তাদের নিয়মিত রক্ষনাবেক্ষণ কাজ পিছিয়ে দেয় ইরানের সংবাদ প্রবাহ চালু রাখার জন্য। টুইটারের এমন একচেটিয়া আধিপত্য দেখে গুগল আর ফেসবুক তড়িঘড়ি করে চালু করে ফার্সী সার্ভিস

সারা বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর ব্যবহার কমে আসছে ওয়েব এর কারণে। এমনকি বিজ্ঞাপন এর একটা বড় অংশ চলে যাচ্ছে ওয়েবএ। ওয়েব এর বিজ্ঞাপন বাজার যে কতো বড় সেটার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে গুগল। কেবলমাত্র বিজ্ঞাপন এর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে কম্পানীটি। মাইক্রোসফট প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এই বাজারের একটা অংশ ধরার জন্য, যার সর্বশেষ সংযোজন হচ্ছে তাদের বিং সার্চ ইঞ্জিন এবং উইন্ডোজ আজুর ওয়েব অপারেটিং সিসটেম। সংবাদমাধ্যমগুলো যদি ওয়েবএ তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত না করে তাহলে তাদের ভবিষ্যত যে অন্ধকার সেটা প্রায় নিশ্চিত!

পৃথিবীজুড়ে ওয়েবএ প্রাপ্ত সার্ভিসগুলো মানুষের জীবনকে অনেক সহজ করে দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরো দিবে। অনলাইনে কেনাকাটা, হারিয়ে যাওয়া বন্ধুকে ফেইসবুকের মাধ্যমে ফিরে পাওয়া, বাসার যাবতীয় বিল কম্পিউটারে কয়েকটি ক্লিকের মাধ্যমে সেরে ফেলা, বাস-ট্রেইন-প্লেইন এর টিকেট কয়েক মিনিটের মধ্যে অনলাইনে কিনে ফেলা, যে কোন ঘটনা-দুর্ঘটনার খবর কয়েক মিনিটের মধ্যেই ব্লগ ও সোশাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পেয়ে যাওয়া ইত্যাদি সুবিধা ইতোমধ্যে সবাই পেতে শুরু করেছে। এই গতিতে প্রযুক্তি চলতে থাকলে আর দশ-বিশ বছরের মধ্যে জীবন যে কতো সহজ হয়ে যাবে সেটা এখন কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। ওয়েব সেবা'র ব্যাপ্তি কয়েকগুন বেড়ে যাচ্ছে মোবাইল ফোনের সাহায্যে। ওয়েব একসেস সমৃদ্ধ মোবাইল ফোনকে এখন বলা হয় স্মার্ট ফোন। কপমিউটার এর চেয়ে অনেক বেশি বহনযোগ্য হওয়ায় মোবাইল এর মাধ্যমে আরো বেশি মানুষকে ওয়েব সেবার আওতায় নিয়ে আসা যাচ্ছে। আ্যপলের আইফোন, গুগলের এন্ড্রয়েড, মাইক্রোসফট এর উইন্ডোজ মোবাইল - এগুলো সবই প্রায় ডেস্কটপ কম্পিউটার এর সমান ক্ষমতা সম্পন্ন অপারেটিং সিসটেম মোবাইল এর জন্য। এভাবে মোবাইল ফোনগুলো হয়ে উঠছে একেকটি বহনযোগ্য কম্পিউটার। আমার জীবনের প্রথম কম্পিউটার ছিলো এএমডি কে৬ টু যার প্রসেসর স্পিড ছিলো ৪৫০ MHz. আ্যপলের সর্বশেষ আইফোন এর প্রসেসর স্পিড হচ্ছে ৬৫০ MHz!

ওয়েব কম্পানীগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার ফলে মানুষ বেশি বেশি সেবা পাচ্ছে কম মূল্যে বা (প্রায়ই) বিনা মূল্যে। গুগল, মাইক্রোসফট, ফেইসবুক, টুইটার, ফ্রেন্ডফিড এর মতো কম্পানীগুলো বাঘা বাঘা কম্পিউটার বিজ্ঞানী এবং সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে প্রযুক্তিকে আরো বেশি মানুষের কাজে লাগানোর জন্য। এতে ওদের ব্যবসা হচ্ছে ঠিক, কিন্তু পৃথিবীর সভ্যতার চাকাও ঘুরছে সামনের দিকে। মানুষের জীবন হয়ে উঠছে আরো আরামদায়ক। দুখের বিষয় আমরা বাংলাদেশে থেকে এর অনেক কিছুই পাচ্ছিনা শুধুমাত্র ভালো গতির ইন্টারনেট আর নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুত সরবরাহ এর অভাবে। আর এভাবেই আমরা পিছিয়ে পড়ছি বাকী পৃথিবী থেকে। আমাদের শীর্ষ রাজনীতিবিদ, সামরিক-বেসামরিক আমলা, ব্যবসায়ী - এরা যেদিন নিজেদের পরিবারের বাইরে দেশের মানুষের কথা ভাবা শুরু করবেন এবং যেদিন আমাদের দেশের মানুষেরা জীবনকে আরো বেশি ভালোবাসা শুরু করবে, আরো সাহসী আর এডভেঞ্চারাস হয়ে উঠবে, সেদিন থেকে বদলে যাওয়া শুরু করবে আমাদের দেশ!



]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/28970685 http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/28970685 2009-06-28 12:34:01
“ভালোবাসার কাজটি খুঁজে নিতে হবে” – স্টিভ জবস এর বিখ্যাত সমাবর্তন বক্তৃতা Click This Link

ভালোবাসার কাজটি খুঁজে নিতে হবে
======================

পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে আসতে পেরে আমি খুবই সম্মানিত বোধ করছি। আমি কখনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করিনি। সত্যি কথা বলতে কি, আজকেই আমি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠান সবচেয়ে কাছ থেকে দেখছি। আজ আমি তোমাদেরকে আমার জীবনের তিনটি গল্প বলবো। তেমন আহামরী কিছু না। শুধু তিনটা গল্প।

প্রথম গল্পটি কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা এক সূতোয় বাঁধা নিয়ে (connecting the dots)।

রিড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার ছয় মাসের মাথায় আমি মোটামুটি পড়ালেখা ছেড়ে দিই। অবশ্য পুরোপুরি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দওয়ার আগে প্রায় বছর দেড়েক এটা সেটা কোর্স নিয়ে কোনমতে লেগেছিলাম। তো কেনো আমি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিয়েছিলাম?

ঘটনার শুরু আমার জন্মের আগে থেকে। আমার আসল মা ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অবিবাহিতা তরুণী গ্রাজুয়েট ছাত্রী। আমার জন্মের আগে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন আমাকে কারো কাছে দত্তক দিবেন। মা খুব চাচ্ছিলেন আমাকে যারা দত্তক নিবেন তাদের যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী থাকে। তো একজন আইনজীবি এবং তাঁর স্ত্রী আমাকে দত্তক নেওয়ার জন্য রাজি হলো। কিন্তু আমার জন্মের পর তাঁদের মনে হলো তাঁরা আসলে একটা কন্যা শিশু চাচ্ছিলেন।

অতএব আমার বর্তমান বাবা-মা, যারা অপেক্ষমাণ তালিকাতে ছিলেন, গভীর রাতে একটা ফোন পেলেন - "আমাদের একটা অপ্রত্যাশিত ছেলে শিশু আছে, আপনারা ওকে নিতে চান?" "অবশ্যই!" - আমার বাবা-মা'র তড়িৎ উত্তর। আমার আসল মা পরে জানতে পেরেছিলেন যে আমার নতুন মা কখনো বিশ্ববিদ্যালয় আর নতুন বাবা কখনো হাই স্কুলের গন্ডি পেরোননি। তিনি দত্তক নেবার কাগজপত্র সই করতে রাজী হননি। কয়েক মাস পরে অবশ্য তিনি রাজী হয়েছিলেন, আমার নতুন বাবা-মা এই প্রতিজ্ঞা করার পর যে তারা একদিন আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবেন।

১৭ বছর পর আমি সত্যি সত্যি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমি বোকার মতো প্রায় স্ট্যানফোর্ডের সমান খরচের একটা বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নিয়েছিলাম। এবং আমার নিম্ন মধ্যবিত্ত পিতামাতার সব জমানো টাকা আমার পড়ালেখার খরচের পেছনে চলে যাচ্ছিলো। ছয় মাস এভাবে যাওয়ার পর আমি এর কোন মানে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। জীবনে কী করতে চাই সে ব্যাপারে আমার তখনো কোন ধারণা ছিলোনা, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা এ ব্যাপারে কিভাবে সাহায্য করবে সেটাও আমি বুঝতে পারছিলাম না। অথচ আমি আমার বাব-মা'র সারা জীবনের জমানো সব টাকা এর পেছনে দিয়ে দিচ্ছিলাম। তাই আমি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিলাম এবং আশা করলাম যে সবকিছু আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে। ওই সময়ের প্রেক্ষিতে এটা একটা ভয়াবহ সিদ্ধান্ত মনে হতে পারে, কিন্তু এখন পেছন ফিরে তাকালে মনে হয় এটা আমার জীবনের অন্যতম সেরা সিদ্ধান্ত ছিলো। যেই মুহুর্তে আমি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিলাম সেই মুহুর্ত থেকে আমি আমার অপছন্দের অথচ ডিগ্রীর জন্য দরকারী কোর্সগুলো নেওয়া বন্ধ করে দিতে পারলাম, এবং আমার পছন্দের কোর্সগুলো নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়ে গেলো।

অবশ্য ব্যাপারটি অতোটা সুখকর ছিলোনা। ছাত্রহলে আমার কোন রুম ছিলোনা, তাই আমি আমার বন্ধুদের রুমে ফ্লোরে ঘুমাতাম। ব্যবহৃত কোকের বোতল ফেরত দিয়ে আমি পাঁচ সেন্ট করে পেতাম (প্রতি বোতল) যেটা দিয়ে আমি আমার খাবার কিনতাম। প্রতি রবিবার আমি সাত মাইল হেঁটে শহরের অপর প্রান্তে অবস্থিত হরে কৃষ্ণ মন্দিরে যেতাম শুধুমাত্র একবেলা ভালো খাবার খাওয়ার জন্য। কিন্তু আমি এটাকে পছন্দ করতাম। আমার কৌতুহল এবং ইনটুইশন অনুসরণ করে আমার জীবনে আমি যতোকিছু করেছি পরবর্তীতে সেটাই আমার কাছে মহামূল্যবান হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। একটা উদাহরণ দিইঃ

সেই সময় রীড কলেজ সম্ভবত দেশের সেরা ক্যালিগ্রাফী কোর্সগুলো করাতো। ক্যাম্পাসের প্রত্যেকটি পোস্টার, প্রতিটি লেবেল করা হতো হাতে করা ক্যালিগ্রাফী দিয়ে। যেহেতু আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম না, তাই আমি যেকোনো কোর্স নিতে পারতাম। তাই ভাবলাম ক্যালিগ্রাফী কোর্স নিয়ে ক্যালিগ্রাফী শিখবো। আমি সেরিফ এবং স্যান সেরিফ টাইপফেইস শিখলাম, বিভিন্ন অক্ষরের মধ্যে স্পেস কমানো বাড়ানো শিখলাম, ভালো টাইপোগ্রাফী কিভাবে করতে হয় সেটা শিখলাম। ব্যাপারটা ছিলো দারুণ সুন্দর, ঐতিহাসিক, বিজ্ঞানের ধরাছোঁয়ার বাইরের একটা আর্ট। এবং এটা আমাকে বেশ আকর্ষণ করতো।

এই ক্যালিগ্রাফী জিনিসটা কখনো কোনো কাজে আসবে এটা আমি কখনো ভাবিনি। কিন্তু, দশ বছর পর যখন আমরা আমাদের প্রথম ম্যাকিন্টস কম্পিউটার ডিজাইন করি তখন এর পুরো ব্যাপারটাই আমাদের কাজে লেগেছিলো। ম্যাক কম্পিটার টাইপোগ্রাফী সমৃদ্ধ প্রথম কম্পিটার। আমি যদি দশ বছর আগে সেই ক্যালিগ্রাফী কোর্সটা না নিতাম তাহলে ম্যাক কম্পিউটারে কখনো মাল্টিপল টাইপফেইস এবং আনুপাতিক দুরত্মের ফন্ট থাকতো না। আর যেহেতু উইন্ডোজ ম্যাক এর এই ফন্ট নকল করেছে, বলা যায় কোনো কম্পিউটারেই এই ধরণের ফন্ট থাকতো না। আমি যদি বিশ্ববিদ্যালয় না ছাড়তাম তাহলে আমি কখনোই ওই ক্যালিগ্রাফী কোর্সে ভর্তি হতাম না, এবং কম্পিউটারে হয়তো কখনো এতো সুন্দর ফন্ট থাকতো না। অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা অবস্থায় এই সব বিচ্ছিন্ন ঘটোনাগুলোকে এক সুতোয় বাঁধা অসম্ভব ছিলো, কিন্তু দশ বছর পর সবকিছু একেবারে পরিস্কার বোঝা গিয়েছিলো!

তুমি কখনোই ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোকে এক সূতায় বাঁধতে পারবেনা। এটা শুধুমাত্র পেছনে তাকিয়েই সম্ভব। অতএব, তোমাকে বিশ্বাস করতেই হবে বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো একসময় একটা ভালো পরিণামের দিকে যাবে ভবিষ্যতে। তোমাকে কিছু না কিছুর উপর বিশ্বাস করতেই হবে - তোমার মন, ভাগ্য, জীবন, কর্ম, কিছু একটা। এই বিশ্বাস আমাকে কখনোই ব্যর্থ করে দেয়নি, বরং আমার জীবনের সব বড় অর্জনে বিশাল ভুমিকা রেখছে।

আমার দ্বিতীয় গল্পটি ভালোবাসা আর হারানো নিয়ে।

আমি সৌভাগ্যবান ছিলাম। আমি আমার জীবনের প্রথম দিকেই আমার ভালোবাসার কাজ খুঁজে পেয়েছিলাম। ওজ আর আমি আমার বাবা-মা'র বাড়ির গারাজে অ্যাপল কম্পানী শুরু করেছিলাম। তখন আমার বয়স ছিলো ২০ বছর।

আমরা কঠিন পরিশ্রম করেছিলাম - ১০ বছরের মাথায় অ্যাপল কম্পিউটার গারাজের ২ জনের কম্পানী থেকে ৪০০০ এম্পলয়ীর ২ বিলিয়ন ডলারের কম্পানীতে পরিণত হয়। আমার বয়স যখন ৩০ হয় তার অল্প কিছুদিন আগে আমরা আমাদের সেরা কম্পিউটার - ম্যাকিন্টস - বাজারে ছাড়ি। আর ঠিক তখনি আমার চাকরি চলে যায়। কিভাবে একজন তার নিজের প্রতিষ্ঠিত কম্পানী থেকে চাকরিচ্যুত হয়? ব্যাপারটি এমনঃ অ্যাপল যখন অনেক বড়ো হতে লাগলো তখন আমি কম্পানীটি খুব ভালোভাবে চালাতে পারবে এমন একজনকে নিয়োগ দিলাম। প্রথম বছর সবকিছু ভালোভাবেই গেলো। কিন্তু এরপর তার সাথে আমার চিন্তাভাবনার বিভাজন স্পষ্ট হওয়া শুরু হলো। এবং পরিচালনা পর্ষদ তার পক্ষ নিলো। অতএব, ৩০ বছর বয়সে আমি কম্পানী থেকে আউট হয়ে গেলাম। এবং খুব ভালোভাবে আউট হলাম। আমার সারা জীবনের স্বপ্ন এক নিমিষে আমার হাতছাড়া হয়ে গেলো। ঘটনাটা আমাকে বেশ ভেঙ্গে দিয়েছিলো।

এরপরের কয়েক মাস আমি বুঝতে পারছিলাম না আমি কী করবো। আমার মনে হচ্ছিলো আমি আগের প্রজন্মের উদ্যোগতাদের মনোবল ভেঙ্গে দিয়েছি - আমার হাতে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সেটা আমি করতে পারিনি। আমি ডেভিড প্যাকার্ড এবং বব নয়েস এর সাথে দেখা করে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইলাম। একবার ভাবলাম ভ্যালী ছেড়ে পালিয়ে যাই। কিন্তু ধীরে ধীরে আমি একটা ব্যাপার অনুভব করতে লাগলাম - আমি আমার কাজকে এখনো ভালোবাসি! এপলের ঘটনাগুলি সেই সত্যকে এতোটুকু বদলাতে পারেনি। আমাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, কিন্তু আমি এখনো আমার কাজকে ভালোবাসি। তাই আমি আবার একেবারে গোড়া থেকে শুরু করার সিদ্ধান্ত নিলাম।

প্রথমে এটা তেমন মনে হয়নি, কিন্তু পরে আবিষ্কার করলাম অ্যাপল থেকে চাকরিচ্যুত হওয়াটা ছিলো আমার জীবনের সবচেয়ে ভালো ঘটনা। সফল হবার ভার চলে যেয়ে আমি তখন নতুন করে শুরু করলাম। কোন চাপ নেই, সবকিছু সম্পর্কে আগের চেয়ে কম নিশ্চিত। ভারমুক্ত হয়ে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে সৃজনশীল সময়ে যাত্রা শুরু করলাম।

পরবর্তী পাঁচ বছরে আমি নেক্সট এবং পিক্সার নামে দুটো কম্পানী শুরু করি, আর প্রেমে পড়ি এক অসাধারণ মেয়ের যাকে আমি পরে বিয়ে করি। পিক্সার থেকে আমরা পৃথিবীর প্রথম এনিমেশন ছবি "টয় স্টোরী" তৈরি করি। পিক্সার বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে সফল এনিমেশন স্টুডিও। এরপর ঘটে কিছু চমকপ্রদ ঘটনা। অ্যাপল নেক্সটকে কিনে নেয় এবং আমি অ্যাপলএ ফিরে আসি। এবং নেক্সটএ আমরা যে প্রযুক্তি তৈরি করি সেটা এখন অ্যাপল এর বর্তমান ব্যবসার একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে। অন্যদিকে লরেন আর আমি মিলে তৈরি করি একটা সুখী পরিবার।

আমি মোটামুটি নিশ্চিত এগুলোর কিছুই ঘটতো না যদি না আমি অ্যাপল থেকে চাকরিচ্যুত হতাম। এটা ছিলো খুব তেতো একটা ওষুধ আমার জন্য, কিন্তু আমার মনে হয় রোগীর সেটা দরকার ছিলো। কখনো কখনো জীবন তোমাকে মাথায় ইট দিয়ে আঘাত করে। তখন বিশ্বাস হারাইওনা। আমি নিশ্চিত যে জিনিসটা আমাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো সেটা হচ্ছে - আমি আমার কাজকে ভালোবাসতাম। তোমাকে অবশ্যই তোমার ভালবাসার কাজটি খুঁজে পেতে হবে। তোমার ভালোবাসার মানুষটিকে যেভাবে তোমার খুঁজে পেতে হয়, ভালোবাসার কাজটিকেও তোমার সেভাবে খুঁজে পেতে হবে। তোমার জীবনের একটা বিরাট অংশ জুড়ে থাকবে তোমার কাজ, তাই জীবন নিয়ে সন্তুস্ট হওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে চমৎকার কোনো কাজ করা। আর কোনো কাজ তখনি চমৎকার হবে যখন তুমি তোমার কাজকে ভালোবাসবে। যদি এখনো তোমার ভালোবাসার কাজ খুঁজে না পাও তাহলে খুঁজতে থাকো। অন্য কোথাও স্থায়ী হয়ে যেওনা। তোমার মন আর সব জিনিসের মতোই তোমাকে জানিয়ে দিবে যখন তুমি তোমার ভালোবাসার কাজটি খুঁজে পাবে। যে কোনো সম্পর্কের মতোই, তোমার কাজটি যতো সময় যাবে ততোই ভালো লাগবে। সুতরাং খুঁজতে থাকো যতক্ষন না ভালোবাসার কাজটি পাচ্ছো। অন্য কোন কাজে স্থায়ী হয়ো না।

আমার শেষ গল্পটি মৃত্যু নিয়ে।

আমার বয়স যখন ১৭ ছিলো তখন আমি একটা উদ্ধৃতি পড়েছিলামঃ "তুমি যদি প্রতিটি দিন এটা ভেবে পার কর যে আজই তোমার জীবনের শেষ দিন, তাহলে একদিন তুমি সত্যি সঠিক হবে"। এই লাইনটা আমার মনে গভীর রেখাপাত করেছিলো, এবং সেই থেকে গতো ৩৩ বছর আমি প্রতিদিন সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করি - "আজ যদি আমার জীবনের শেষ দিন হতো তাহলে আমি কি যা যা করতে যাচ্ছি আজ তাই করতাম, নাকি অন্য কিছু করতাম?" যখনি এই প্রশ্নের উত্তর "না" হতো পরপর বেশ কিছু দিন, আমি জানতাম আমার কিছু একটা পরিবর্তন করতে হবে।

"আমি একদিন মরে যাবো" - এই কথাটা মাথায় রাখা আমার জীবনে আমাকে বড় বড় সব সিদ্ধান্ত নিতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে। কারণ সবকিছু - সকল আশা-প্রত্যাশা, গর্ব, ব্যর্থতার ভয় বা লজ্জা - এইসব কিছু মৃত্যুর মুখে নাই হয়ে যায়, শুধুমাত্র সত্যিকারের গুরুত্মপূর্ণ জিনিসগুলোই টিকে থাকে। তোমার কিছু হারানোর আছে এই চিন্তা দূর করার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে এটা মনে রাখা যে একদিন তুমি মরে যাবে। তুমি নগ্ন হয়েই আছো।

অতএব নিজের মনকে না শোনার কোনো কারণই নাই।

প্রায় এক বছর আগে আমার ক্যান্সার ধরা পড়ে। সকাল ৭:৩০ এ আমার একটা স্ক্যান হয় এবং এতে পরিস্কারভাবে আমার প্যানক্রিয়াসএ একটা টিউমার দেখা যায়। আমি তখনো জানতাম না প্যানক্রিয়াস জিনিসটা কী। আমার ডাক্তাররা বললেন এই ক্যান্সার প্রায় নিশ্চিতভাবে অনারোগ্য, এবং আমার আয়ু আর তিন থেকে ছয় মাস আছে। আমার ডাক্তার আমাকে বাসায় ফিরে যেয়ে সব ঠিকঠাক করতে বললেন। সোজা কথায় মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হওয়া।

এরমানে হচ্ছে তুমি তোমার সন্তানদের আগামী দশ বছরে যা বলবে বলে ঠিক করেছো তা আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বলতে হবে। এরমানে হচ্ছে সবকিছু গোছগাছ করে রাখা যাতে তোমার পরিবারের সবার জন্য ব্যাপারটি যথাসম্ভব কম বেদনাদায়ক হয়। এরমানে হচ্ছে সবার থেকে বিদায় নিয়ে নেওয়া।

এভাবে সেদিন সারাদিন গেলো। সেদিন সন্ধ্যায় আমার একটা বায়োপসি হলো। তারা আমার গলার ভেতর দিয়ে একটা এন্ডোস্কোপ নামিয়ে দিলো, এরপর আমার পেটের ভেতর দিয়ে যেয়ে আমার ইনটেস্টাইন থেকে সুঁই দিয়ে কিছু কোষ নিয়ে আসলো। আমাকে অজ্ঞান করে রেখেছিলো তাই আমি কিছুই দেখিনি। কিন্তু আমার স্ত্রী পরে আমাকে বলেছিলো যে আমার ডাক্তাররা যখন এন্ডোস্কোপি থেকে পাওয়া কোষগুলি মাইক্রোস্কোপ এর নিচে রেখে পরীক্ষা করা শুরু করলো তখন তারা প্রায় কাঁদতে শুরু করেছিলো, কারণ আমার যে ধরণের প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সার হয়েছিলো সেটার আসলে সার্জারীর মাধ্যমে চিকিৎসা সম্ভব। আমার সেই সার্জারী হয়েছিলো এবং এখন আমি সুস্থ্য।

এটাই আমার মৃত্যুর সবচেয়ে কাছাকাছি যাওয়া, এবং আমি আশা করি আরো কয়েক দশকের জন্যও এটা তাই যেনো হয়। মৃত্যুর খুব কাছাকাছি যাওয়ার এই বাস্তব অভিজ্ঞতার কারণে মৃত্যু সম্পর্কে এখন আমি অনেক বেশি জানি, যেটা আমি জানতাম না যদি না এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে না যেতামঃ

কেউই মরতে চায় না। এমনকি যারা বেহেশতে যেতে চায়, তারাও সেখানে যাওয়ার জন্য তাড়াতাড়ি মরে যেতে চায় না। কিন্তু এরপরও মৃত্যুই আমাদের সবার গন্তব্য। কেউই কখনো এটা থেকে পালাতে পারেনি। এবং সেটাই হওয়া উচিৎ, কারণ মৃত্যু সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে বড় আবিস্কার। এটা জীবনের পরিবর্তনের এজেন্ট। মৃত্যু পুরনোকে ধুয়ে মুছে নতুনের জন্য জায়গা করে দেয়। এই মুহুর্তে তোমরা হচ্ছো নতুন, কিন্তু খুব বেশিদিন দূরে নয় যেদিন তোমরা পুরনো হয়ে যাবে এবং তোমাদেরও ধুয়ে মুছে ফেলা হবে। নাটকীয়ভাবে বলার জন্য দুঃখিত, কিন্তু এটা খুবই সত্যি।

তোমাদের সময় সীমিত, অতএব, অন্য কারো জীবন যাপন করে সময় নষ্ট করো না। কোনো মতবাদের ফাঁদে পড়ো না, অর্থ্যাৎ অন্য কারো চিন্তা-ভাবনা দিয়ে নিজের জীবন চালিয়ো না। তোমার নিজের ভেতরের কন্ঠকে অন্যদের চিন্তা-ভাবনার কাছে আটকাতে দিও না। আর সবচেয়ে বড় কথাঃ নিজের মন আর ইনটুইশন এর কথা শোনার সাহস রাখবে। ওরা ঠিকই জানে তুমি আসলে কি হতে চাও। বাকী সব কিছু ততোটা গুরুত্মপূর্ণ নয়।

আমি যখন তরুণ ছিলাম তখন একটা পত্রিকা বের হতো যার নাম ছিলো "The Whole Earth Catalog" (সারা পৃথিবীর ক্যাটালগ). এটা ছিলো আমার প্রজন্মের একটা বাইবেল। এটা বের করেছিলেন স্টুয়ার্ড ব্র্যান্ড নামে এক ভদ্রলোক যিনি মেনলো পার্কের কাছেই থাকতেন। তিনি পত্রিকাটিকে কাব্যময়তা দিয়ে জীবন্ত করে তুলেছিলেন। এটা ছিলো ষাট এর দশকের শেষ দিককার কথা - কম্পিউটার এবং ডেস্কটপ পাবলিশিং তখনো শুরু হয়নি। তাই পত্রিকাটি বানানো হতো টাইপরাইটার, কাঁচি, এবং পোলারয়েড ক্যামেরা দিয়ে। পত্রিকাটিকে ৩৫ বছর আগের পেপারব্যাক গুগল বলা যায়ঃ অনেক তত্ত্ব-তথ্যে সমৃদ্ধ আর মহৎ উদ্দেশ্যে নিবেদিত।

স্টুয়ার্ট এবং তার টিম পত্রিকাটির অনেকগুলি সংখ্যা বের করেছিলো। পত্রিকাটির জীবন শেষ হয় একটা সমাপ্তি সংখ্যা দিয়ে। এটা ছিলো সত্তর এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে, আমার বয়স ছিলো তোমাদের বয়সের কাছাকাছি। সমাপ্তি সংখ্যার শেষ পাতায় একটা ভোরের ছবি ছিলো। তার নিচে ছিলো এই কথাগুলিঃ "ক্ষুধার্ত থেকো, বোকা থেকো"। এটা ছিলো তাদের বিদায় বার্তা। ক্ষুধার্ত থেকো। বোকা থেকো। এবং আমি নিজেও সবসময় এটা মেনে চলার চেষ্টা করে এসেছি। এবং আজ তোমরা যখন পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি ছেড়ে আরো বড় জীবনের গন্ডিতে প্রবেশ করছো, আমি তোমাদেরকেও এটা মেনে চলার আহবান জানাচ্ছি।

ক্ষুধার্ত থেকো। বোকা থেকো।

সবাইকে ধন্যবাদ।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/28965380 http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/28965380 2009-06-16 14:56:44
ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালকে শিক্ষা মন্ত্রী (বা প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা) হিসেবে চাই
আমাদের দেশে শিক্ষা মন্ত্রনালয় তেমন গুরুত্মপূর্ণ মন্ত্রনালয় হিসেবে দেখা হয় না। কিন্তু বাংলাদেশকে যদি সত্যি সত্যি একটা সুখী ও আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়তে হয় তাহলে শিক্ষা হবে এক নম্বর ক্ষেত্র যেটাকে ঠিক করতে হবে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে জাফর ইকবাল স্যারের চেয়ে বেশি চিন্তিত এবং উদ্যোগী আমি কাউকে দেখিনি। ওনাকে শিক্ষা মন্ত্রী বানালে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় যে আমূল পরিবর্তন হবে এতে কোন সন্দেহ নাই। শিক্ষা ব্যবস্থা ঠিক হলে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো থেকে বের হয়ে আসবে আধুনিক বিজ্ঞানমনষ্ক বিজ্ঞানী, গণিতবিদ, অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ, সংস্কৃতিবান মানুষ ইত্যাদি। ওরাই পারবে বাংলাদেশকে একটি সুখী এবং ধনী দেশে পরিণত করতে।

আসুন আমরা ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালকে শিক্ষা মন্ত্রী বানানোর জোর দাবী জানাই।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/28890788 http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/28890788 2008-12-31 04:57:20
বিল গেটস এর বাড়িতে এক সন্ধ্যা
অবশেষে সেই বহু প্রত্যাশিত ইমেইলটি পেলাম। আমাকে অন্য সব ইন্টার্ণদের সাথে ২৮ শে জুন (যতোদূর মনে পড়ে) সন্ধ্যাবেলা মহামতি(!) বিল গেটস এর বাসায় ডিনার এর নিমন্ত্রণ করা হয়েছে! মাইক্রোসফট রেডমন্ড হেডকোয়াটার্সে প্রতি বছর প্রায় চার পাঁচ'শ ইন্টার্ণ গ্রীষ্মের ছুটিতে কাজ করতে আসে। সংখ্যাটা বড় মনে হতে পারে, কিন্তু মনে রাখতে হবে সারা পৃথিবীতে মাইক্রোসফট এর প্রায় ৯৫,০০০ এম্পলয়ী আছে, যার মধ্যে রেডমন্ড এর হেডকোয়াটার্সেই আছে প্রায় ৩৫,০০০। এক জায়গায় ৩৫,০০০ লোক কাজ করা মানে বিশাল ব্যাপার। মাইক্রোসফট এর রেডমন্ড ক্যাম্পাস ঢাকার অনেক আবাসিক এলাকার চেয়ে বড় হবে। প্রায় শ'খানেক বিল্ডিং জুড়ে এর অফিস, শ'খানেক শাটল কার দিনরাত চলাচল করে এই বিল্ডিংগুলোর মধ্যে মানুষ পারাপার করে।

যাই হোক। মাইক্রোসফট নিয়ে আরেকদিন লিখবো। আজকে বিল গেটস মামা'র সাথে মোলাকাতের গল্প বলি। ওই দিন বিকাল তিন টার দিকে বিল্ডিং ৩৩ এর সামনে চলে যাই। বিল্ডিং ৩৩ হচ্ছে মাইক্রোসফট এর কনফারেন্স সেন্টার। অনেকগুলো কনফারেন্স রুম আছে এখানে। বিল গেটস এর ৩০ শে জুন ২০০৮ এর বিদায়ী মিটিংও এখানে হয়েছিলো। আমার সাথে আমার দুই ইন্ডিয়ান বন্ধু ছিলো। ওরাও আমার মতোই ইন্টার্ণ। একজন রচেস্টার ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করছে আরেকজন টেক্সাস অস্টিনএ মাস্টার্স করছে। আমরা তিন জনই উইন্ডোজ নেটওয়ার্কিং গ্রুপ এ ছিলাম। তো বিল্ডিং এর সামনে অনেকগূলো বাস দাঁড়ানো ছিলো যেগুলো আমাদের বিল গেটস এর বাসায় নিয়ে যাবে। ইন্টার্ণরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে গল্পগুজব করছে। একে অন্যের সাথে পরিচিত হচ্ছে। আমাদের লাইনে অনেকের মধ্যে ক্যালটেক থেকে আসা দুই বন্ধু ছিলো যাদের সাথে আমি অনেক্ষন কথা বলেছি। একজন কম্পিউটার সায়েন্সে আরেকজন গণিতের উপর পড়ছে ক্যালটেকে। একজন এখন আমাদের গ্রুপ নেটয়ার্কিংএ, আর আরেকজন উইন্ডোজ কার্নেল গ্রুপএ ইন্টার্ণশীপ করছে। ওদের সাথে কথা বলে বুঝতে পারলাম মানুষ কেন ক্যালটেক এর এতো সুনাম করে। দুজনই অসম্ভব প্রতিভাবান। যে নেটয়ার্কিং গ্রুপ এর সে এর আগের বছর ইন্টার্ণশীপ করেছে গুগলএ, তার আগের বছর ইয়াহু তে! এবার মাইক্রোসফটএ এসেছে দেখার জন্য মাইক্রোসফট তার কেমন লাগে! আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, তিনটাই তো দেখলে, কোন কোম্পানীতে কাজ করতে চাও? আমি আশা করছিলাম ও গুগল বা মাইক্রোসফট এর নাম বলবে। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে ও আমাকে বললো ও একটা স্টার্ট-আপ, মানে নিজেই নতুন একটা কোম্পানী খুলতে চায়! তখন আমি বুঝলাম কিভাবে আমেরিকাতে সিলিকন ভ্যালীর জন্ম হয়। এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপকে এরা খুব দাম দেয়। এরা ঝুঁকি নিতে পারে।

সে যাক, বারবার অন্যদিকে চলে যাচ্ছি। তো একসময় আমাদের সবাইকে বাসে উঠানো হলো। বাসে ইন্টার্ণদের গল্পগুজবে একটা হাউকাউ অবস্থা। বিল গেটস এর বাসা মাইক্রোসফট অফিস থেকে খুব দূরে নয়। জ্যাম না থাকলে ১০/১২ মিনিটের ড্রাইভ হবে বড়জোর। তাই মিনিট দশেক পরে যখন বাস থেমে গেল ভাবলাম চলে এসেছি বোধহয়। বাস থেকে নেমে ভুল বুঝতে পারলাম। আমাদের আসলে নিয়ে আসা হয়েছে একটা বড় গীর্জার সামনে। অবাক হলাম। বিল গেটস এর বাসায় ডিনার খেতে যাওয়ার আগে গীর্জায় প্রার্থনা করতে হবে নাকি? আস্তে আস্তে ব্যাপারটি পরিস্কার হলো। আমাদের এখানে নিয়ে আসা হয়েছে সিকিউরিটি চেক এর জন্য! গীর্জার সামনে পেছনে যেহেতূ অনেক খোলা জায়গা, তাই আমাদের এখানে লাইন ধরে মেটাল ডিটেকটর এর মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। আমাদের আগেই বলে দেওয়া হয়েছিলো কোন মোবাইল ফোন বা ক্যামেরা সাথে আনা চলবে না (এর চেয়ে দুঃখের ব্যাপার আর কী হতে পারে!)। আর এখন মেটাল ডিটেকটর দিয়ে শেষবারের মতো চেক করে নেওয়া হলো কোন ধাতব জিনিস আছে কিনা কারো সাথে।

সিকিউরিটি চেক করা শেষ হবার পর আমাদের এবার ছোট ভ্যানের (মাইক্রোবাস এর মতো) মতো গাড়িতে তোলা হলো। বিশাল সাইজের বাস যেহেতূ বিল গেটস এর বাড়িতে ঢুকবেনা, তাই ছোট গাড়ির ব্যবস্থা। গীর্জা থেকে বিল গেটস এর বাড়ী ছিলো খুব কাছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমাদের গাড়িটি বাড়ির মূল গেইট দিয়ে ঢুকে পড়লো। বাড়িটি চারদিকে গাছগাছালীতে ঢাকা। তাই তেমন কিছু খেয়াল করতে পারিনি বাড়ির বাইরের অংশের। গাড়ি থেকে নেমেই আমাদের একটা দরজা দিয়ে বিল গেটস এর বাড়িতে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ঢুকেই আমাদের একটা সিঁড়ি দেখিয়ে দেওয়া হয়।। কাঠের সিঁড়ি। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেখান থেকে সে সিঁড়ি নেমে গেছে প্রায় চার-পাঁচ তলা সমান নিচের দিকে।



সিঁড়ি বেয়ে নামা শুরু করলাম আমরা। একপাশে মূল বাড়ির ভেতরের অংশ আর আরেকপাশে একটা বিশাল ড্রয়িং রুম দেখলাম। যেহেতু আমাদের ডানেবামে কোথাও ঢুকার অনুমতি নাই, তাই সোজা নিচে নেমে যেতে হলো। নিচে নেমে দেখতে পেলাম বিশাল ঘাসে ঢাকা বাড়ির ব্যাক-ইয়ার্ড। জায়গাটা ছিলো লেক ওয়াশিংটন এর পাশে। লেক এর পাড়ে বিল গেটস এর প্রাসাদপ্রম বাড়ি। সবুজ ঘাসে ঢাকা উঠানের এখানে সেখানে টেবিল এর উপর নানা রকম খাবার রাখা। সবই আমেরিকান খাবার। আমেরিকানরা লতাপাতা (সালাদ হিসেবে) টাইপের অনেক খাবার খায় সেগুলো ছিলো, বিভিন্ন ধরণের বার্গার ছিলো, স্যান্ডউইচ ছিলো, সামুদ্রিক মাছের কিছু আইটেম ছিলো, নানারকম ড্রিঙ্কস ছিলো। আরো অনেক রকম খাবার ছিলো যেগুলোর নাম মনে নাই।

সেদিন কোম্পানীর অনেক বড় এক্সিকিউটিভরা ছিলেন সেখানে। সবাই মাইক্রোসফট এর ভাইস প্রেসিডেন্ট কিংবা সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট বা এই গোছের কিছু। ইন্টার্ণরা কেউ কেউ খাবার নিয়ে নিজেদের মধ্যে আড্ডা দিচ্ছিলো, আবার কেউ কেউ কোম্পানীর সিনিয়র এক্সিকিউটিভদের ঘিরে ধরে নানারকম প্রশ্ন করছিলো। আমি আমার ইন্ডিয়ান বন্ধুদের সাথে বসে গল্প করছিলাম। আর কয়েকজন এক্সিকিউটিভ এর কথা শুনছিলাম। এদের মধ্যে একজন হচ্ছেন উইন্ডোজ ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট স্টিভেন সিনফস্কি। ইন্টার্ণরা ওনাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করছিলো আর উনি প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন। আমি কথা বলেছিলাম আমাদের কোর অপারাটিং সিস্টেম গ্রুপ এর একজন জেনারেল ম্যানেজার এর সাথে। উইন্ডোজ নিয়ে টুকটাক কথা বলেছিলাম আমরা ওনার সাথে। এদের সাথে কথা বললে বুঝা যায় এরা কতো স্মার্টভাবে একটা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। টেকনিকাল এবং মার্কেটিং উভয় দিকে এদের দারুন দখল।

প্রায় আধঘন্টা-পৌণে একঘন্টা পর মুল বাড়ির সাথে সংলগ্ন অপর একটি সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসেন বিল গেটস। আর যায় কোথায়। এখানকার বেশির ভাগ ইন্টার্ণই বিশ-বাইশ বছর বয়সের। সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়লো তাঁর উপর। ওনার চারদিকে তৈরি হয়ে গেলো বিশাল ভিড়। প্রথমে উনি ইন্টার্ণদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিলেন। ইন্টার্ণরা দুনিয়ার সব প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছিলো তাকে। অনেক্ষণ ওদের সাথে কাটিয়ে উনি ভিড় থেকে বের হয়ে একটু উঁচুমতো একটা যায়গায় গিয়ে মাইক এর মাধ্যমে সবাইকে স্বাগতম জানালেন। বললেন তাঁর স্বপ্নের কথা, পরিশ্রম করে মাইক্রোসফটকে এই পর্যায়ে নিয়ে আসার কথা। গুগলের কথা বললেন। ওরা যে সার্চএ ভালো করছে আর আমাদের জন্য যে এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ সেটি বললেন। প্রায় মিনিট পনের মাইক্রোসফট সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে কথা বললেন।

সেদিন অনেক কাছে থেকে ওনাকে দেখেছি আর কথা শুনেছি। মাইক্রোসফট এর ব্যাবসায়ীক পলিসি নিয়ে অনেকরকম মতামত থাকতে পারে, কিন্তু "সফটওয়ার শিল্প" বলতে আমরা যা বুঝি এটা প্রায় এককভাবে মাইক্রোসফট তথা বিল গেটস এবং তাঁর টিম প্রতিষ্ঠা করেন। বিল গেটস একজন চরম প্রতিভাবান ব্যক্তি। তার ব্যাবসায়ীক এবং প্রযুক্তিগত দুই দিকেই অভাবনীয় দখল। মানবতার প্রতিও তাঁর অনেক টান। সেজন্য এই বছর তিনি মাইক্রোসফট থেকে অবসর (পুরোপুরি নয়, কিন্তু উনি এখন মূলত উপদেষ্টা ধরণের ভূমিকায় আছেন) নিয়ে মনোনিবেশ করেছেন মানবসেবায়। তাঁর বিল এন্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দাতব্য প্রতিষ্ঠান। অনেকে বলছেন বিল গেটস হয়তো একদিন শান্তির জন্য নোবেল প্রাইজ পাবেন তাঁর মানবতাবাদী কাজের জন্য। গতো বছর হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া তাঁর সমাবর্তন বক্তৃতার একটা মূল বিষয় ছিলো মানবসেবা।

বিল গেটস চাল-চলনে একেবারে সাধারণ। কেউই তাকে দেখে মনে করবে না কতো ক্ষমতাধর, কতো স্মার্ট উনি। সেদিন একটা সাধারণ জিন্স আর টিশার্ট পরে এসেছিলেন তিনি। তাঁর কথাবার্তা খুবই সহজসরল। এই বছর যেদিন তিনি মাইক্রোসফট থেকে বিদায় নেন, মঞ্চে সবার সামনে অনেকটা ঢুকরে কেঁদে উঠেছিলেন। তাঁকে দেখেই বুঝা যায়, তিনি বাইরে আর দশজন সাধারণ মানুষের মতন হলেও ভেতরে তাঁর অগাধ জ্ঞান। এই সারল্য, বুদ্ধি, আর জ্ঞানের বলেই তিনি আজ মাইক্রোসফট এর মতো এক বিশাল কোম্পানী প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন।

খাওয়া-দাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে আমি ঘুরে দেখেছিলাম বাড়িটি। চারদিকে সিকিউরিটির লোকজন ছিলো, তার উপর আমাদের বাড়ির ভেতরে যাবার অনুমতি ছিলো না। তাই বাইরে থেকে যতোটুকু দেখা যায় তাই দেখেছি। লেক এর পাশে বাড়ি হওয়ায় লেক এর উপর কাঠের পাটাতন ছিলো। সেখানে একটা বড় স্পীডবোট বাঁধা ছিলো। লেক এর অপর পাড়ে সিয়াটল শহরের উঁচু উঁচু বিল্ডিং এর আকাশরেখা দেখা যাচ্ছিলো। যতোদূর মনে পড়ে ওনার ব্যক্তিগত জিমনেশিয়ামটি দেখেছিলাম যেটি মূল বাড়ি থেকে বাইরে অবস্থিত। বাড়িটি আকারে বেশ বড়। অনেক টাকা খরচ করে বানানো। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তির বাড়ি বলে কথা!

সব মিলিয়ে ঘন্টা দুই এর মতো থাকা হলো ওখানে। ফেরার সময় হয়ে এলো। ইন্টার্ণরা ধীরে ধীরে বের হওয়া শুরু করলো বাড়ি থেকে। এক সময় আমিও বের হলাম। আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম আমার ভাগ্যের কাছে। এমনিতে আমার সৌভাগ্য জিনিসটা পাওয়া হয়ে উঠেনা কখনো। তাই এমন একটা সু্যোগ পেয়ে নিজেকে অনেক ধন্য মনে করেছি। তার উপর ওই বছরই ছিলো বিল গেটস এর শেষ ইন্টার্ণ ডিনার। এটাকে নির্দ্বিধায় বড় ধরণের সৌভাগ্য বলা যায়, কী বলেন?

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/28886544 http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/28886544 2008-12-23 03:46:54
ঝাপসা নীল বিন্দু
মজার ব্যাপার ঘটলো যখন বিজ্ঞানীরা ছবিগুলোর দিকে ভালো করে তাকালেন। বিশেষ করে পৃথিবীর যেই ছবিগুলো তুলেছে ভয়েজার ১। ছবিগুলো তোলা হয়েছিলো প্রায় চার বিলিয়ন (চার'শ কোটি) মাইল দূর থেকে। ভয়েজার ১ তখন ছিলো সৌরজগতের এক প্রান্তে। পৃথিবীর একটা ছবিটি এসেছে একটা আলোর বিন্দু হিসেবে। ন্যারো এঙ্গেল ক্যামেরা দিয়ে তোলার কারণে ছবিটাতে কয়েকটি আলোর রেখা (সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে) চলে এসেছে। ওই রকম একটা আলোর সরু রেখার মধ্যে একটা অতি ক্ষুদ্র ঝাপসা নীল বিন্দু হিসেবে এসেছে পৃথিবী।

পৃথিবীর ওই ছবিটি সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করেছিলো বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, কার্ল সাগানকে। এমনিতেই সাগান পৃথিবী আর বিশ্বজগৎ নিয়ে গবেষণা করতেন। তাই চার বিলিওয়ন মাইল দূর থেকে তোলা পৃথিবীর বিন্দুসম ছবিটি দেখে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। ১৯৯৬ সালে এক সমাবর্তন বক্তৃতায় (ওই বছরই তিনি মারা যান) তিনি পৃথিবীর ওই বিন্দুর মতো ছবিটিকে "Pale Blue Dot" আখ্যা দেন এবং খুব মর্মস্পর্শীভাবে পৃথিবীর প্রতি তার ভালোবাসা প্রকাশ করেন। আমি এখানে তার বক্তৃতার প্রাসঙ্গিক অংশটুকু বাংলায় তুলে দিচ্ছি।

"এই বিন্দুটির দিকে তাকান। এটা এই পৃথিবীর ছবি। এটাই আমাদের বাড়ী। এটাই আমরা। আমরা যাদের ভালোবাসি, আমরা যাদের চিনি জানি, আমরা যাদের কথা শুনেছি, সবাই এই বিন্দুতেই থাকে। সৃষ্টির শুরু থেকে যতো মানুষ বেঁচে ছিলো সবাই এই বিন্দুতেই বেঁচে ছিলো। আমাদের সারা জীবনের সব দুঃখ কষ্ট, হাজার হাজার আত্মবিশ্বাসী ধর্ম, মতবাদ, এবং অর্থনৈতিক তত্ব, যারা শিকার করেছে এবং যারা লুন্ঠন করেছে, সাহসী বীর এবং ভীরু মানুষেরা, যারা সভ্যতা সৃষ্টি করেছে এবং যারা সভ্যতা ধ্বংস করেছে, সব রাজা এবং প্রজা, সব প্রেমে মগ্ন তরুণ তরুণী, সব পিতা ও মাতা, স্বপ্নে বিভোর কিশোর কিশোরী, আবিষ্কারক এবং পরিভ্রমক, নৈতিকতার শিক্ষক, দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, তারকা শিল্পী-খেলোয়াড়, মহামান্য নেতা, সাধু এবং পাপী; আমাদের মানবজাতীর ইতিহাসে যারাই বেঁচেছিলো সবাই বাস করতো ওই আলোর রেখায় ভাসমান ক্ষুদ্র ধুলাবিন্দুতে। মহাবিশ্বের বিশালত্বের মাঝে পৃথিবীটা একটা ক্ষুদ্র মঞ্চ। কতো শত সম্রাট আর সমরনায়ক রক্তের নদী বইয়ে দিয়েছেন শুধুমাত্র এই ক্ষুদ্র বিন্দুর একটা ক্ষুদ্র অংশের বিজয়ী বীর হওয়ার জন্যে। এই বিন্দুর এক প্রান্তের মানুষেরা নৃশংসতা চালিয়ে ধ্বংস করেছে আরেক প্রান্তের মানুষদের। কী ভয়াবহ দ্বন্ধ তাদের মধ্যে, কী তীব্রভাবে একে অন্যকে হত্যা করতে চায়, কী গভীর ঘৃণা তাদের পরস্পরের প্রতি। আমাদের নিজেদের সম্মন্ধে উঁচু ধারণা, কল্পিত অহম, এই ধারণা যে আমরা এই বিশ্বজগতে অন্য প্রানীদের থেকে বেশি মহান কোন অবস্থানে আছি - এর সবকিছু এই ঝাপসা নীল বিন্দু দ্বারা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আমাদের এই গ্রহ মহাবিশ্বের মহাঅন্ধকারের মধ্যে একটা নিঃসঙ বিন্দু। এই বিশাল বিশ্বজগতের মধ্য থেকে কেউ এসে আমাদেরকে নিজেদের নিজেরা ধ্বংস করা থেকে বাঁচাবে না। এখন পর্যন্ত পৃথিবীই একমাত্র জানা জায়গা যেখানে জীবন বেঁচে থাকতে পারে। মানুষের আর কোন যাওয়ার জায়গা নেই। অন্তত নিকট ভবিষ্যতে নয়। ভ্রমণ সম্ভব, কিন্তু যেয়ে বসতি গড়া? খুব শীঘ্রই সেটি হচ্ছে না নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। আমাদের ভালো লাগুক বা না লাগুক, এই মুহুর্তে পৃথিবীই একমাত্র যায়গা যেখানে আমরা জীব হিসেবে টিকে থাকতে পারি। বলা হয়ে থাকে জ্যোতির্বিজ্ঞান মানুষকে বিনয়ী করে আর চরিত্র গঠনে সাহায্য করে। চার বিলিয়ন মাইল দূর থেকে তোলা পৃথিবীর এই ছবির চেয়ে আর কিছুই সম্ভবত মানুষের অহমিকাকে এতো খাটো করে দেয় নাই। আমার মনে হয়, এটা আমাদের একজনের সাথে আরেকজনের আরো সহানুভূতি নিয়ে চলার কথা মনে করিয়ে দেয়, আরো মনে করিয়ে দেয় এই ঝাপসা নীল বিন্দুটিকে যত্ন এবং সংরক্ষণ করার কথা, যেটা আমাদের একমাত্র বাসভূমি।"

সত্যি কথা বলতে কি মূল ইংরেজীতে লেখাটির যে গভীর আবেগ ছিলো সেটা বাংলা অনুবাদের সময় পুরোটা ফুটিয়ে তোলা যায়নি। অনুবাদ নিয়ে এই সমস্যাটা প্রায়ই হয়।

সে যাই হোক। আজকের পৃথিবীর মানুষে মানুষে যে ঘৃণা আর দ্বন্ধ তার দিকে তাকালে খুবই আফসোস হয়। পৃথিবীর সব বালুকণার মধ্যে একটি কণা যেমন অতি ক্ষুদ্র তুচ্ছের মতো, তেমনি আমাদের পৃথিবী এই মহাবিশ্বের অসীম সংখ্যক নক্ষত্র আর বস্তুপিন্ডের মধ্যে ক্ষুদ্র একটি বালুকণা। ঝড়, বন্যা, খরা, গ্রীন হাউজ এফেক্ট, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, মাত্রারিরিক্ত জনসংখ্যার তুলনায় অপ্রতুল খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান, পারমাণবিক বোমার হুমকি, ভূ-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি - ইত্যাদি হাজারো প্রাকৃতিক এবং মানুষের সৃস্টি সমস্যার মুখে আমাদের পৃথিবী। নিজেদের ভেতরের বানানো দ্বন্ধের চেয়ে বেশি গুরুত্মপূর্ণ এই মুহুর্তে আমাদের একমাত্র বাসভূমি এই পৃথিবীকে বাঁচানো।

ভয়েজার ১ এর তোলা ঝাপসা নীল বিন্দুটি আমাদের বিপন্ন পৃথিবীর প্রতি আরো মমতাময়ী হতে বলে, নিজেদের ভেতরের ঘৃণা কমিয়ে ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার কথা বলে।

উইকিপেডিয়া লিঙ্কঃ Pale Blue Dot on Wikipedia


কার্ল সাগানের নিজের কন্ঠে বানানো ভিডিওঃ



]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/28885594 http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/28885594 2008-12-21 07:59:03
প্রজাপতি মন
একেবারে ছোটকালে, যখন ক্লাস সেভেন এইট এ পড়ি, তখন সেবা প্রকাশনীর তিন গোয়েন্দা পড়তাম। তিন গোয়েন্দার দল - কিশোর, রবিন, আর মুসা - রোমাঞ্চকর সব রহস্য সমাধান করে বেড়াতো। আমার কিশোর মন কী যে শিহরিত হতো ওদের এডভেঞ্চার এর কাহিনী পড়ে। কল্পনায় ভিড়ে যেতাম ওদের দলে আর সমাধান করে বেড়াতাম চাঞ্চল্যকর সব রহস্যের! ওদের সাথে আমিও ঘুরে বেড়াতাম লস এঞ্জেলেসের রকী বীচ এলাকায়। কিশোরদের বাসার পাশের গারাজের হেডকোয়াটার্সে ওদের সাথে আমিও যে রহস্য সমাধানে আমার মাথা খাটাতাম এটা ওরা কোনদিন জানতে পারবে না! সে এক অদ্ভুত যাদুকরী রোমাঞ্চকর জীবন। দুষ্ট মানুষদের সকল চক্রান্তের জাল ছিন্ন করে তিন গোয়েন্দার দল আর আমি মিলে সমাধান করে দিতাম জটিল সব রহস্যের…

আরেকটু বড় হবার পর, নাকের নিচে যখন গোঁফের হালকা কালো রেখা দেখা দিতে শুরু করলো, তিন গোয়েন্দার বই এর জায়গা ধীরে ধীরে দখল করা শুরু করলো মাসুদ রানার বই। সে এক অন্য জগত। বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স এর এক দুর্ধষ স্পাই, মাসুদ রানা ক্রমেই হয়ে উঠলো আমার স্বপ্নের নায়ক। গোপন মিশন নিয়ে দেশ থেকে দেশে ঘুরে বেড়ায় রানা। কোমলে কঠোরে মেশানো, অসম্ভব বুদ্ধিদীপ্ত চির সবুজ এক যুবক মাসুদ রানা। প্রথম বই ধ্বংস পাহাড় থেকে শুরু করে প্রায় দুইশ’র মতো বই পড়ে ফেলেছি বছর দুয়েকের মধ্যেই। আমাদের বাসার কাছেই ছিল একটা বইয়ের দোকান যেখানে সেবা প্রকাশনীর বই ভাড়া পাওয়া যেত। প্রতি বই দুই টাকা করে। পড়ে দুই-তিন দিনের মধ্যে ফেরত দিতে হতো। রানা’র বুদ্ধি, শক্তি, স্মার্টনেস, আর সুন্দরী রমণীদের সাথে রোমান্টিকতা, সবকিছু মিলে ওকে মনে হতো স্বপ্নের দেশে থাকা এক পুরুষ। কতো অসংখ্যবার প্রতিজ্ঞা করেছি বড় হলে স্পাই হবো, ঘুরে বেড়াবো দেশ থেকে দেশে, সমাধান করে বেড়াবো জটিল সব রহস্যের, সান্নিধ্যে আসবো রুপবতী সব নারীদের, কোমরের হোলস্টারে লুকানো থাকবে পিস্তল…

এসএসসি পাশের পর ভর্তি হই নটর ডেম কলেজে। ততোদিনে আমার চিন্তাভাবনা আর আগ্রহের পরিধি আরো বেড়ে গেছে। অর্থনীতি, রাজনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ইত্যাদির প্রতি অনেক আগ্রহ বোধ করতাম। বিশেষ করে বিজ্ঞানের প্রতি। অণু-পরমাণু কিভাবে কাজ করে, পৃথিবীর সৃষ্টি হলো কিভাবে, প্রাণ এর সৃষ্টি হলো কিভাবে, প্লেইন কিভাবে আকাশে উড়ে, কম্পিউটার কিভাবে কাজ করে - এরকম রাজ্যের প্রশ্ন আমার মাথায় খেলা করতো তখন। নটর ডেম এ পরিচয় হয় আমার বন্ধু তানভীর এর সাথে। বিজ্ঞান এর বিভিন্ন ব্যাপারে ওর ছিলো অনেক জ্ঞ্যান। ওর সাথে কতো যে তর্ক বিতর্ক করেছি বিজ্ঞ্যানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে! তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ভেতর ফুলার রোডে ছিলো ব্রিটিশ কাউন্সিল এর লাইব্রেরী। ওখানে সদস্য হলে বিভিন্ন ধরণের বই আনতে পারা যায়, এটা শোনার পর দেরী না করে সদস্য হয়ে যাই। এরপর কতো যে বই এনেছি ওখান থেকে! যে বইটি বিশেষভাবে আমার এখনো মনে আছে সেটার নাম হলো “প্ল্যানেট আর্থ”, লেখকের নাম সিজার এমিলিয়ানি। এই বইটি আমার জীবনকে অনেকটাই বদলে দিয়েছিলো। বইটির বিষয়বস্তু ছিলো অনেক ব্যাপক - বিশ্বজগতের সৃষ্টি, প্রাণের সৃষ্টি, পৃথিবীর জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত চার বিলিয়নেরও বেশি সময়ের ভূতাত্বিক ইতিহাস, ইত্যাদি। এইসব বইপত্র পড়ে পড়ে আর সেগুলো নিয়ে ভাবতে ভাবতে আমি বড় হলে বিজ্ঞানী হওয়ার কথা ভাবতাম। পদার্থবিজ্ঞান আমাকে খুব টানতো। কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর বিচিত্র জগৎ, কসমোলজির অবিশ্বাস্য ঘটনাপ্রবাহ, রিলেটিভিটি’র “আপেক্ষিক সত্য” - এসবকিছুর কারণে আমি মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম বড় হলে একজন পদার্থবিজ্ঞানীই হবো।

আইডিয়ালে (আমার হাই স্কুল) থাকতেই আমার আরেকটা স্বপ্ন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিলো ধীরে ধীরে। সেই স্বপ্নের নাম হলো “আমেরিকা”! সেই ছোটবেলা থেকে মনে হয় এমন কোন দিন যেতো না যেদিন কোন না কোন ব্যাপারে আমেরিকা’র নামটা শুনিনি। পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশন সংবাদ, টেলিভিশন সিনেমা, ভিসিআর এর সিনেমা, তিন গোয়েন্দা, মাসুদ রানা, এফবিআই-সিআইএ, ম্যাডোনা, মাইকেল জ্যাকসন, হলিউড, টারমিনেটর টু, বেসিক ইন্সটিঙ্কট, বিজ্ঞান-প্রযুক্তির যতো আবিষ্কার, হার্ভার্ড-এমআইটি, নাসা, সারা পৃথিবী জুড়ে যতো যুদ্ধ-বিগ্রহ - সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিলো এই আমেরিকা। আমেরিকা ক্রমেই ঢুকে যাচ্ছিলো আমার উৎসুক মনের গভীরে। আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম প্রচন্ডভাবে। এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই ছুটলাম মতিঝিলের ইউসিস অফিসে। সেখান থেকে আমেরকার যতো বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিকানা নিয়ে ভর্তির জন্য এপ্লাই করলাম। ভর্তির অফারও পেলাম কয়েকটি থেকে। ভিসা’র জন্য দাঁড়ালাম ঢাকার বনানীর সবচেয়ে বড় লাল দালানটিতে - স্বপ্নের দেশের এম্ব্যাসিতে। তখন ভিসা নিয়ে ছিলো ভয়াবহ রকমের কড়াকড়ি। যথারীতি ভিসা পাইনি। তিনবার দাঁড়ানোর পর রণে ভঙ দিলাম। কিন্তু আমেরিকা যাবার স্বপ্ন তাতে এতোটকু কমেনি!

শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার শুরু হলো এক নতুন জীবন। সেখানে ছিলেন আমার স্বপ্নের মানুষ - মুহম্মদ জাফর ইকবাল। আমার জীবন যে কয়জন মানুষ দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে তাদের মধ্যে একেবারে প্রথম সারিতে আছে জাফর স্যারের নাম। মাঝে মাঝে যখন খুব বেশি মন খারাপ থাকে, নিরাশ হয়ে থাকি, জীবনের কোন মানে খুঁজে পাই না, তখন একটা কথা ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিই - জাফর স্যারের মতো মানুষেরা যখন বেঁচে আছে তখন বেঁচে থাকার নিশ্চয়ই কিছু একটা অর্থ আছে!

বিশ্ববিদ্যালয়ে এসিএম প্রোগ্রামিং করতাম। কম্পিউটার দিয়ে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করা। খুবই আনন্দদায়ক একটা ব্যাপার ছিলো এই প্রবলেম সলভিং। প্রোগ্রামিং করতে করতে স্বপ্ন দেখতাম একদিন খুব বড় প্রোগ্রামার হবো, খুব বড় প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানীতে পৃথিবী বদলে দেওয়া যায় এমন সব কম্পিউটিং প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করবো। কখনো বা হ্যাকার হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। জটিল সব ভাইরাস লিখে বড় বড় কম্পিউটার এর নিরাপত্তা ভেঙ্গে সেখানের সব তথ্য বের করে ফেলবো আর সবাই আমার প্রোগ্রামিং দক্ষতার প্রশংসা করবে!

আরো একটা স্বপ্ন ছিলো বিশেষ করে কলেজ জীবন থেকে - দেশের জন্য কিছু একটা করা। সেই ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি জ্বালাও-পোড়াও, ভাংচুর, হরতাল-অবরোধ, হত্যা-প্রতিহত্যার রাজনীতি, ঘুষ, অনিয়ম, ট্রাফিক জ্যাম, পানি-বিদ্যুতের অভাব - আরো কতো কী! কলেজ-বিশ্ববিদ্যালগুলোতে পড়ালেখা ছাড়া আর যা যা করা যায় তার সবকিছুই চলে অবিরাম। খুব ইচ্ছে হয় দেশের জন্য কিছু একটা করতে। আমি আর আমার বন্ধু রাজু কমলাপুর রেল স্টেশনের কাছে রেল লাইনের উপর বসে বসে কতো বিকেল পার করেছি দেশের জন্য স্বপ্ন দেখে দেখে! কতো প্ল্যান করেছি কিভাবে দেশের জন্য কিছু করা যায়। একটা খুব ভালো বিশ্ববিদ্যালয় বানাবো যার উপাচার্য হবেন জাফর স্যার। সেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যেসব ছেলেমেয়েরা বের হবে তারা একেকজন হবে একেকটা বারুদের মতো। অসম্ভব সেই প্রতিভাবান ছেলেমেয়েরা কেউ হবে বিজ্ঞানী, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেই ডাক্তার, কেউ আর্কিটেক্ট, কেউ দেশের প্রতি পরম মমতাসম্পন্ন রাজনীতিবিদ, কেউ ভবিষ্যৎ নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ, কেউ বিখাত গণিতবিদ… ভাবতাম বড় হয়ে রাজনীতি করবো। একদিন এই দেশের সরকার প্রধান হবো আর বদলে দিবো দেশটাকে…

স্বপ্ন আর পরিকল্পনার এখনো শেষ নেই। কতো নতুন নতুন স্বপ্ন দেখি, কতো কিছু করতে চাই, কতো কিছু পেতে চাই এই জীবনে। এক জীবনে মানুষ কতো বছর বাঁচে? সত্তর, আশি, নব্বই, কিংবা বড়জোর একশ বছর? এই সময়ের মধ্যে কি সব কিছু পাওয়া যায়? প্রজাপতির মতো আমাদের মন খালি উড়ে বেড়ায়। কতো স্বপ্ন পূরণ হয়, কতো চাওয়া পূরণ হয়, তবু কি স্বপ্নগুলো থেমে থাকে? আমাদের চাহিদা কি কখনো কমে আসে?

সবকিছুর শেষে এই স্বপ্নগুলোই, চাওয়াগুলিই আমাদের জীবনটাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। প্রজাপতি মন-ই আমাদের জীবনের সম্পুর্নতার দিকে টেনে নিতে থাকে। জীবন চলতে থাকে…


(also posted at http://bilash.wordpress.com/ )
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/28867094 http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/28867094 2008-11-10 10:40:28
ঘর আমার ঘর
প্রথমবার ১৯৮৯ সালে। আগের বছর ক্লাস ফাইভ পাশ করে ঢাকা বেড়াতে এসেছিলাম ডিসেম্বর মাসে। আব্বা আইডিয়াল হাই স্কুলের একটা ভর্তি পরীক্ষার ফর্ম নিয়ে আসলো। ভর্তি পরীক্ষাও দেওয়া হলো। এবং কিভাবে কিভাবে যেন সত্তর জনের মধ্যে ছেষট্টিতম হয়ে টিকেও গেলাম। আমার আম্মা আল্লার কাছে দোয়া করেছিলেন আমি যাতে না টিকি। আম্মা ভাবলেন আমরা গ্রামে থাকি, বেড়াতে এসেছি খালাদের বাসায়, এর মধ্যে এত ভাল একটা স্কুলে টিকে গেলে না আমাকে গ্রামে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে গ্রামের সাধারণ স্কুলগুলায় ভর্তি করাতে পারবেন (মানে খুব কষ্ট হবে আইডিয়ালে না দিয়ে গ্রামের স্কুলে দিতে), না ঢাকায় আমাকে রেখে আইডিয়াল স্কুলে পড়াতে পারবেন। তো টিকে যাওয়ার পর আম্মা পড়লেন মহা মুশকিলে, ছেলেকে তিনি কোথায় রেখে পড়াবেন।

ঘটনাক্রমে আমরা যে খালার বাসায় বেড়াতে এসেছি উনি ছিলেন দাতা হাতেম তাই এর মহিলা সংস্করণ। উনি আমার আম্মাকে বললেন কেউ আইডিয়ালে এত সহজে চান্স পায় না, ও পেয়েছে, আমি ওকে আমার বাসায় রাখবো।

খালাদের দুই রুম এর বাসাটাতে খালার তিন সন্তান ছাড়াও একজন টিউটর থাকতেন। এর মধ্যে খালা আমাকে রেখে দিলেন। আমার আম্মা তার বোন আর আল্লার হাতে আমাকে ছেড়ে দিয়ে গ্রামে ফিরে গেলেন।

আমার বয়স তখন সবে দশ ছেড়ে এগারোতে পড়েছে। যে ছেলেটি দশটি বছর গ্রামের পথে-ঘাটে-মাঠে, বনে-বাদাড়ে, পুকুরে, ধান ক্ষেতে, বাঁশ বাগানে, কাঁঠাল-তেঁতুল-কাম্রাঙ্গা গাছে তার উত্তাল শৈশব কাটিয়েছে মায়ের শাসন আর সোহাগের ভেতর, হঠাৎ করে সেই ছেলেটি আবিষ্কার করলো তার জীবনে এখন সেই গ্রামও নেই, আর তার মাও নেই। ঘর ছাড়ার কষ্টে, বেদনায় কাটতো আমার প্রতিটি দিন। আইডিয়াল স্কুলের কড়া শাসন আর মাকে ছেড়ে দূরে থাকার কষ্ট আমার শিশু হৃদয়কে ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছিল। মনে পড়ে আমি আমার ফুপুদের দোতলা বাসার ছাদের উপর যেয়ে দক্ষিন-পূর্ব দিকে তাকিয়ে থাকতাম ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের দিকে। ওই সড়ক দিয়েই আমাদের নোয়াখালীর বাসগুলো যেতো। বাসগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতাম আর কল্পনা করতাম ওই বাসগুলোর একটা দিয়ে আমি নোয়াখালীর চাটখিলে আমাদের গ্রামের বাড়িতে চলে যাচ্ছি। গ্রামে যেয়ে আমি অদৃশ্য হয়ে আমার আম্মাকে
দেখছি। যেহেতু আম্মা চায়না আমি গ্রামে যাই তাই আমি কল্পনায় শুধু আম্মাকে দূর থেকে দেখে আসার কথা ভাবতাম। আরো মনে পড়ে আইডিয়াল স্কুলের জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতাম আর ভাবতাম বাইরের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষগুলো কতো সুখী। আইডিয়াল স্কুলে আমার প্রতি মুহুর্তে দম বন্ধ হয়ে আসতে চাইতো।

সৌভাজ্ঞক্রমে আমার সেই ভয়াবহ দুস্বপ্নের দিনগুলো প্রায় দেড় বছরের মাথায় শেষ হয়ে আসে। ক্লাস সেভেন এর মাঝামাঝি সময়ে আমাদের পুরো পরিবার ঢাকায় চলে আসে। আমি ফিরে পাই আমার ঘর।

দ্বিতীয়বার ঘর ছাড়ি ১৯৯৮ সালে।

আমি সিলেটের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হই। আমাদের ক্লাস শুরু হয়েছিল নভেম্বর মাসের পনের তারিখে। আমি অক্টোবরের ঊনত্রিশ তারিখে তল্পিতল্পা গুছিয়ে সিলেটের উদ্দেশ্য ঘর ছাড়ি। আমার আম্মা চোখের জলে তার সন্তানকে বিদায় জানালেন। আমার প্রাণের বন্ধুদের একজন আশিক আমাকে কমলাপুর স্টেশনে বিদায় দিতে গেল। ও বিদায় নেওয়ার আগ মুহুর্তে চোখের পানি ফেলল। আমার বুকে প্রিয় বন্ধুদের ছেড়ে থাকার বেদনায় মোচড় দিয়ে উঠল। আমার এখনো মনে আছে আমি আশিককে বলেছিলাম, "দোস্ত, আমি যাচ্ছি অনেক ভালোভাবে (মানে অনেক সফল হয়ে) ফিরে আসার জন্য"। হায়, ভালো অনেক কিছুই আমি অর্জন করেছিলাম সিলেটে যেয়ে, কিন্তু আমার আর ফেরা হয়নি। আসলে ফেরা হয়েছে, কিন্তু সেটা খুব স্বল্প সময়ের জন্য। সিলেটে থেকেই আমি আবার, আরো লম্বা সময়ের জন্য ঘর ছাড়ার ব্যবস্থা করে ফেলেছি।

সিলেটের পাট চুকাই ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে। চার বছরের ডিগ্রী অর্জন করি প্রায় সাড়ে ছয় বছরে। এরপর আবার ঘরে ফিরে আসি।

সর্বশেষ ঘর ছাড়ি ২০০৬ সালের মে মাসে।

আমেরিকার ওহাইও স্টেইট বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিটার বিজ্ঞানে পিএইচডি করার জন্য যোগ দিই ২০০৬ সালের জুন মাসে।

এরপর ঘটে গেছে আরো কতো ঘটনা। আমি পিএইচডি প্রোগ্রাম থেকে মাষ্টার্স এ পরিবর্তন করে চলে আসি। এরপর মাষ্টার্স শেষ করে চাকরীতে জয়েন করি। আমার স্ত্রীও এখানে চাকরী করে, কিন্তু সে আমার থেকে তিন হাজার মাইল দূরে থাকে। প্রায় আড়াই বছরের বিবাহিত জীবনে আমাদের সত্তিকারের ঘর বেঁধে একসাথে থাকা এখনো হলো না।

ঘরে ফেরা এখনো আমার কাছে একটা বড় স্বপ্ন। অবশ্য এখন ঘরে ফেরার চেয়ে বড় ব্যাপার হলো ঘর বাঁধা। প্রায় তিন দশকের জীবনের একটা বড় অংশ ঘরের বাইরে কাটিয়ে দেয়ায় বুকের ভেতর থেকে শঙ্কা আর যায় না।

কবে পাবো আমার ঘর?

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/28859021 http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/28859021 2008-10-24 12:33:58
প্রথম পাতায় আগমন! এখন বাংলা লেখা প্র্যাকটিস করতে হবে!]]> http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/28831151 http://www.somewhereinblog.net/blog/bilashbdblog/28831151 2008-08-15 14:18:33