তারপর ছাতা মাথায় মাইলের পর মাইল পাহাড়ি রাস্তা ধরে দ্রুত বেগে অবিরাম পথ চলা। কষ্টকর যাত্রার পুরো সময়টা ছাতা দিয়ে মাথা ঢেকে ক্যামোফ্লাজ করতে হয়; যেনো পাহাড়ের ওপর বসানো সেনা বাহিনী আর বিডিআর এর ওয়াচ পোস্ট থেকে দূরবীনে এই সাংবাদিক ধরা না পড়ে।
পথে এক পাহাড়ির বাড়িতে সামান্য সময়ের জন্য বিশ্রাম। কথা হয় ত্রিপুরা গাইডের সঙ্গে। মন পরীক্ষা জন্য প্রশ্ন করা হয়, আচ্ছা, আপনারা জুম্মল্যান্ড (পাহাড় আঞ্চলিক সায়ত্ত্বশাসন) প্রতিষ্ঠা করবেন কবে? জবাবে তিনি মুচকি হেসে বলেন, মাওসেতুং তো গেরিলা যুদ্ধের মহানায়ক, তাই না? তিনি কিন্তু কখনোই বলেননি, অমুক বছর চীনে রাষ্ট্র বিপ্লব হবে। রাজনীতিতে এ রকম দিনক্ষণ বলা যায় না।
গ্রামের স্বল্প শিতি সাধারণ এক গেরিলা যোদ্ধার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দেখে চমকিত হতে হয়।
এরপর আবারো হন্টন।...পার হতে হয় লোগাং, পুচগাঙসহ নানা নাম না জানা পাহাড়ি জনপদ। মাঝে মাঝে পথের ধারে অপেক্ষমান সাদা পোষাকে শান্তি বাহিনীর সদস্যরা গাইডকে 'কিয়ারেন্স' দেন।
হাঁটতে হাঁটতে পথে পড়ে এক গহিন খাদ। খাদ পার হওয়ার জন্য এ পার -- ওপার একটি গাছের গুড়ি ফেলা। তা ও আবার কাদায় মাখামাখি হয়ে পিচ্ছিল। শহুরে সাংবাদিকের আশঙ্কা হয়, হয়তো পা পিছলে গহিন খাদে মৃত্যূ আসন্ন প্রায়। ইতস্ততা দেখে কিছু বোঝার আগেই গাইড যুবক এক ঝটকায় এই অধমকে তুলে নেন কাঁধে। অবলীলায় পার হয়ে যান খাদ।
তিনি বলেন, আমাদের সব ধরণের ট্রেনিং আছে। দয়া করে একটু জলদি হাঁটুন। সন্ধ্যার আগেই ক্যাম্পে পৌঁছাতে হবে। সন্ধ্যা হলে আর পথ দেখা যাবে না। টর্চ জ্বালানোও ঝুঁকিপূর্ণ। কেননা বিডিআর জানে শান্তিবাহিনীর গতিপথ কোনগুলো। টর্চের আলো দেখলে দ্বিধা ছাড়াই ওরা গুলি করতে শুরু করবে।
আরো কিছুটা এগিয়ে সন্ধ্যার আগে আগে পৌঁছে যাওয়া গেলো ভারত সীমান্তে শান্তিবাহিনীর সদর দফতর দুদুকছড়ায়। বনের ভেতর পাহাড়ি টিলায় অসংখ্য জলপাই রঙের তাঁবু ফেলে তৈরি হয়েছে গেরিলা ছাউনি। একে -- ৪৭, জি থ্রি আর নানান রকম সয়ংক্রিয় বন্দুকে বিভিন্ন গাছের আড়ালে সতর্ক প্রহরায় রয়েছে জলপাই পোষকে শান্তি বাহিনীর সদস্যরা।
সাদা পোষাকে শান্তি বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড সুধা সিন্ধু খীসা এগিয়ে এসে স্বাগত জানান। হ্যারিকেনের আলোয় হাতমুখ ধুয়ে একটি ছোট্ট তাঁবুর ভেতর বসা গেলো। ফাক্স খুলে খেতে দেওয়া হলো কফি। সঙ্গে বিস্কুট আর গোল্ড লিফ সিগারেট।
সুধা সিন্ধু বললেন, শুনেছি, আপনার চা -- কফির খুব নেশা। আর আপনি গোল্ডলিফ সিগারেট খান। তাই জঙ্গলের ভেতর অনেক কষ্ট করে এসব যোগাড় করতে হয়েছে!
একটু পরে একজন শান্তিবাহিনীর সৈনিক এসে সেলুট করে সুধা সিন্ধুকে চাকমা ভাষায় বলেন, 'স্যার' আসছেন।
বলা ভাল, এই 'স্যার' হচ্ছেন শান্তি বাহিনী প্রধান (ফিল্ড কমান্ডার) জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা। শান্তি বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা, প্রয়াত নেতা এমএন লারমা, সন্তু লারমা, সুধা সিন্ধু খীসাসহ শীর্ষ নেতারা সকলেই ছিলেন স্কুল শিক্ষক। এ কারণেই শান্তিবাহিনীর গেরিলা যুদ্ধকে বলা হয়, মাস্টার্স রেভ্যুলেশন। আর সেই থেকে শীর্ষ নেতাদের অনুসারীরা 'স্যার' সম্বোধন করেন। তবে সাধারণ অর্থে 'স্যার' বলতে সন্তু লারমাকেই বোঝায়।
খুবই সাদাসিদা পোষাকে বয়স্ক মতোন শুকনো গোছের একজন মানুষ আট -- দশজন গেরিলা যোদ্ধা পরিবেষ্টিত হয়ে কাছে এগিয়ে আসেন। হাত বাড়িয়ে বললেন, আমিই সন্তু লারমা!...
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে জুলাই, ২০০৭ সন্ধ্যা ৬:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


