somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমাদের তাজ ভাই...

২৯ শে আগস্ট, ২০০৮ সকাল ১০:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দুর্ধর্ষ ক্রাইম রিপোর্টার আমিনুর রহমান তাজকে চেনেন না, গণমাধ্যমে এমন মানুষ বোধকরি আর নাই। চাকুরী জীবনের শুরুতে আমার সৌভাগ্য হইয়াছিল তাহার অধীনে তিন হাজার দুইশত টাকার অনিয়মিত বেতনে শিক্ষানবীশ ক্রাইম রিপোর্টার হিসেবে কিছুদিন দৈনিক আজকের কাগজে তালিম গ্রহণ করিবার।

ইতিপূর্বে লাশকাটা ঘর নামক লেখায় তাজ ভাইয়ের কথা সামান্য বলিয়াছি। আজ তাহার আরো কিছু কথা বলিতে চাই।...

মধ্য বয়সী মানুষ হইলে কি হইবে, বরাবরই দেখিতেছি, তাজ ভাই বড়ই সৌখীন। বেশভূষায় একটা ফুটবাবু, ফুটবাবু ভাব। সাদা শার্ট, শাদা প্যান্ট, চকচকে সাদা জুতা পরিয়া, চোখে সবুজাভ রেবান সানগ্লাস দিয়া যখন বেবি ট্যাক্সি উঠিতেন, আমি তাহার পাশে বসিয়া সুন্দর একটা গন্ধ পাইতাম। পরে শুনিয়াছি, ইহা ফরাসী ওডিকোলন -- চার হাজার সাত শত এগারো; তাহার কোন এক ভগ্নী নাকি বিদেশ হইতে আনিয়া দিয়াছে। আর তাহার মুখে প্রায়ই ঝুলিবে সোনার হোল্ডারে জ্বলন্ত বেনসন সিগারেট। মুঠি করিয়া সিগারেটে টান দিয়া টুশকি মারিয়া তাহার ছাই ফেলিবার কায়দাটিও দেখিবার মতো!

*

অর্থাভাবে প্রায়শই তাজ ভাইয়ের দ্বারস্থ হইতাম। তিনিও উদার হস্তে বিশ - পঞ্চাশ টাকা ধার দিতেন। বলিতে দ্বিধা নাই, নামেই ধার, আসলে ইহা ছিল সম্প্রদান কারকে শুন্য বিভক্তি। সেই রবি বাবুর খেরো খাতার কথা: এক ব্যাক্তি নাকি রবীন্দ্রনাথের নিকট হইতে টাকা ঋণ লইয়া বলিয়াছিল, কবিগুরু, আপনার কাছে চীরঋণী রইলাম!

১৯৯৪ - ৯৫ সালের কথা, তখন আমার মতো জাতীয় প্রেসক্লাবের ‘অসভ্য’ পুঁচকে সাংবাদিকদের দুদণ্ড বসিবার জায়গা ছিল না। মোবাইল টেলিফোনও এতটা প্রচলিত হয় নাই। তথ্য - সংবাদের সন্ধানে ঝড় - বৃষ্টি, কি খর রৌদ মাথায় লাইয়া সকাল হইতে ডিবি পুলিশ অফিস, ঢাকা মেডিকেলের মর্গ অথবা সংবাদের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করিয়া দুপুর নাগাদ আমরা ক্রাইম রিপোর্টাররা ভীড় করিতাম প্রেসক্লাবের সম্মুখ ফটকের নিকটস্থ বাগানে। বাগানের রেলিং এর ওপর বসিয়া একে অপরের সহিত নোট মিলাইয়া দেখিয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই করিতাম। প্রেসক্লাবে সভ্যরা আমাদের কহিতো, রেলিং - সাংবাদিক। আর তাজ ভাই কহিতেন, তোরা হচ্ছিস সঙ্গবদ্ধ তথ্য চোরাচালান দল।

বলিয়া রাখি, সেই সময় ক্রাইম রিপোর্টারদের পুলিশের ঘুষের বখরা খাইবার জন্য বেশ একটা দুর্নাম ছিল। অবশ্য বরাবরই ব্যতিক্রম আছে।

কিন্তু একদিন তাজ ভাই বখরা খাইবার পক্ষে ছবক দিয়া ঘোষণা করিলেন, এ দেশে হেরাল্ড ট্রিবিউনের সাংবাদিকতা চলবে না, বুঝলি! ক্রাইম রিপোর্টিং তো কোনো ভদ্র লোকের পেশা না। পুলিশের ওপর চাঁদাবাজী করতে না পারলে জীবনে বড় ক্রাইম রিপোর্টার হতে পারবি না। পুলিশের ওপর চাঁদাবাজী করা মানে হচ্ছে, খোদার ওপর খোদকারী করা। আর তখনই পুলিশ তোকে ভক্তি করে সবার আগে নিউজ দেবে, নইলে নিউজ পাবি না। ভয় থেকেই ভক্তির উদ্ভব!

ভয়ে ভয়ে বলিলাম, তাজ ভাই, শেষে সততার আদর্শ বিসর্জন দেবো?

-- আরে রাখ তোর আর্দশ। যে দেবতা যে ফুলে তুষ্ট হয়, তাই তো করতে হবে না কি? পুলিশের টাকা না খেলে তারা তোকে বিশ্বাস করবে না, নিউজও পাবি না। শুধু দেখবি, যেনো কোনো দুর্নাম না হয়।...

তো প্রায়ই দুপুরে ভাত খাইবার মতো টাকাও পকেটে থাকিতো না। প্রেসক্লাব হইতে বাস ধরিয়া হাজির হইতাম তাজ ভাইয়ের মতিঝিলের বাসায়। তার শিশুকণ্যা তাজিন আর ভাবী আমার খুবই ভক্ত। ছোট একখানি একতলার বাসা, একেবারে সুখের নীড় বলিতে যাহা বুঝায়, তাহাই। বরাবরই দুপুরের খাবার হইতো জম্পেশ; মাছ - মাংস, শাক - সব্জি থাকিবেই। আহার শেষে ফল - ফলাদী, না হয় কিছু মিষ্টান্ন।

আমি চেষ্টা করিতাম ছোট্ট তাজিনের জন্য চকলেট, কি আইসক্রিম, বা বিস্কুটের প্যাকেট লইয়া যাইবার।

একদিন ভুল বশতঃ খালি হাতে ভর দুপুরে তাজ ভাইয়ের বাসায় হাজির হইয়াছি। আমাকে দেখিয়াই শিশুটি ‘কাকা, কাকা’ করিয়া কোলে ঝাঁপাইয়া পড়িল। লজ্জিত হইয়া কহিলাম, তাজ ভাই, তাজিনের চকলেট আনতে ভুলে গেছি।

-- চকলেট আনিসনি তো, ভাল করেছিস। তুই তো আবার দেশি চকলেট আনতি। আর ও আজকাল বিদেশি চকলেট ছাড়া খেতেই চায় না। ক্রাইম রিপোর্টারের মেয়ে তো!...

*

অনেকের মনে আছে নিশ্চয়, বিএনপির সেই সময় বিরোধী আওয়ামী লীগের আহ্বানে কঠিন - কঠোর হরতাল হইতো। হরতালে দিনভর এখানে - সেখানে বোমা ফাটিতেছে, পুলিশের সহিত দাঙ্গা বাধিতেছে, প্রায়শই দু-একটা লাশও পড়িতো। ফলে আমাদের এই সব তাজা খবর সংগ্রহ করিতে ব্যপক ছুটাছুটি করিতে হইতো।

আমার হরতালের ডিউটি পড়িতো তাজ ভাইয়ের সহিত। বলাবাহুল্য, ‘খোদার ওপর খোদকারীর’ ওই বিষয়টুকু বাদ দিলে তাজ ভাই এক অতি চমৎকার মানুষ, আমার খুবই প্রিয় ব্যক্তিত্ব। তাছাড়া উনার সহিত সারাদিন ডিউটি করা মানে, হাতে কলমে ক্রাইম রিপোর্টিং এর তালিম লওয়া। খাওয়া - দাওয়া, চা - সিগারেট একদম ফ্রি!

এই রকম হরতালের এক সকালে দোয়েল চত্বরে অফিসগামী এক ব্যক্তিকে দিগম্বর করিয়া ছড়িল ছাত্রলীগের সোনার ছেলে আলম। দেখাদেখি সারাদেশে হরতালের মৌসুমে অফিসগামীদের দিগম্বর করিবার ধূম পড়িল।... ছাত্রলীগের ক্যাডার নাম কামাইল ‘দিগম্বর আলম’।

একদিন সন্ধ্যায় তাজ ভাই আমাকে ভরা নিউজ রুমে সকলের সামনে ডাকিয়া জিজ্ঞাসিলেন, এই শোন, তোর মোট কয়টা আন্ডারওয়্যার আছে, বলতো?

আমি তো লজ্জায় মরি আর কি! কিছুতেই মুখে বাক্য সরে না।

তাজ ভাই বলিলেন, কাল তোর আর আমার হরতালের ডিউটি। তুই যে কয়টি আন্ডারওয়্যার আছে, সব ক’টি একসঙ্গে পরে ডিউটিতে নামবি; যাতে ইউনিভার্সিটির দিকে গেলে দিগম্বর আলমদের তোর কাপড় খুলতে খুলতেই হাত ব্যথা হয়ে যায়, বুঝলি!

*

আরেক হরতালের ভোরে অফিসের বেবি ট্যাক্সি লইয়া তাজ ভাইয়ের বাসায় গিয়াছি। উনাকে বাসা হইতে তুলিয়া এক সঙ্গে ডিউটিতে বাহির হইবো।

একতলার বাসা খানির নীচে আসিয়া অনেকক্ষণ ঘন্টা বাজাইলাম, ‘তাজ ভাই, তাজ ভাই’ বলিয়া ডাকাডাকি করিলাম, কোনো সাড়াশব্দ নাই।

খেয়াল করিয়া দেখিলাম, সদর দুয়ার সামান্য খোলা। উঁকি মারিয়াই সরিয়া আসিলাম, খাটের ওপর ভাবী খোলা পিঠে পেছন ফিরিয়া শুইয়া আছেন, পরনে শুধু পেটিকোট।

এদিকে ডিউডিতে যাইবার দেরি হইতেছে দেখিয়া খানিক পরে আবার হাঁকডাক শুরু করিলাম। এইবার চোখ ডলিতে ডলিতে তাজ ভাই নিজেই বাহির হইলেন। খালি গা, পরনে পেটিকোট!

--তাজ ভাই, এ কি অবস্থা?
-- আর বলিস না। কাল অফিস থেকে অনেক রাতে বাসায় ফিরেছি। বৌ - বাচ্চা সবাই গভীর ঘুমে দেখে কাউকে আর ডাকিনি। কিন্তু কিছুতেই লুঙ্গি খুঁজে পেলাম না। শেষে তোর ভাবীর একটা পেটিকোট পরে শুয়ে পড়েছি!...

(শেষ)

১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×