somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কিছু মনে কোরো না ফয়সাল, আমরা এমনই

০২ রা ডিসেম্বর, ২০০৮ রাত ১০:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাংলাদেশে ব্যাপারগুলো এভাবেই ঘটে। প্রথম প্রথম সবাই খুব আবেগপ্রবণ হয়ে যায়। পত্রিকার প্রথম পাতায় নিউজ আসে। ভাষার চাকচিক্য-সমৃদ্ধ কলাম লেখা হয় সম্পাদকীয় পাতায়। টানা কয়েকদিন রিপোর্ট করা হয়। তারপর সন্তর্পণে নিউজটাকে ঠেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয় শেষের পাতায়। তারপর ভেতরের পাতা। তারপর সেখান থেকে একদিন কোথায় যেন মিলিয়ে যায় নিউজ, 'সাবজেক্টে'র মুখাবয়ব।

৬ নভেম্বর কুমিল্লার ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টের কাছাকাছি একটা জায়গায় নাসির গ্রুপের জন্য এসিড বয়ে নিয়ে যাওয়া ট্রাকের সঙ্গে চট্টগ্রামমুখী একটি যাত্রীবাহী বাসের সংঘর্ষ ঘটে। কিন্তু সরাসরি সংঘর্ষের ফলে কোন হতাহতের ঘটনা ঘটে না। বাসে যাত্রী ছিল ৩৮ জন। সংঘর্ষের পর বাসের ড্রাইভার এবং তার সহকারী জানলা দিয়ে বেরিয়ে হেঁটে হেঁটেই এলাকা ত্যাগ করে। কিন্তু নাসির গ্রুপের জন্য এসিড বহন করা ট্রাকটিতে ৮৮ টি প্লাস্টিকের কন্টেইনারে মোট ১০ টন এসিড ছিল। ৪৪ টা কন্টেইনারের ওপর আরো ৪৪ টা। তাদের ওপর কিছু নেই। মোটা কাপড়ের ত্রিপলও না। স্বভাবতই, সংঘর্ষের পরপর বাসের অধিকাংশ যাত্রীকে এসিড একেবারে স্নান করিয়ে দেয়। গ্যাসের সিলিন্ডারটা ফেটে যায় তুমুল শব্দে। তৎক্ষণাৎ মৃত্যু ঘটে কয়েকজনের। এই বাসেই ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাচ্ছিল বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের ৪র্থ বর্ষের ছাত্র আহমেদ আল ফয়সাল। সে এই ঘটনার শিকারে পরিণত না হলে এটা আমার অজানাই থেকে যেত হয়ত। ফয়সালসহ বাসের অন্য যাত্রীরা সড়কের আশেপাশের খানাখন্দগুলোতে যতটুকু পাওয়া যায় ততটুকু পানিতেই নিজেদের চুবিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। এলাকার লোকজন ধরাধরি করে তাদেরকে আশপাশের হাসপাতালগুলোতে নিয়ে যায়। ফয়সালের পরিবারের কাহিনী আমি পত্রিকায় লিখেছি। তার বাবা প্যারালাইজড্ হয়ে শয্যা নিয়েছেন। আর আছেন মা, একটা ছোট বোন। খবর পেযে ছুটে আসেন ফয়সালের এক মামা। ফয়সালসহ আরো কয়েকজনতে ততক্ষণে মাইক্রো করে ঢাকা মেডিকেল কলেজে নিয়ে আসা হয়েছে।
আস্তে আস্তে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটটি ভরে উঠতে থাকে এই দুর্ঘটনার আক্রান্তদের দ্বারা। বুয়েটের ছাত্ররা ফয়সালকে বাঁচাতে অর্থ সংগ্রহে নামে। এদেরই একজন রাশেদ। রাশেদের মুখ থেকে শুনি মৃত্যুর সঙ্গে এই মানুষগুলোর অমানুষিক পাঞ্জা লড়ার কেচ্ছা। রাশেদ খুব বেশি করে জড়িয়ে পড়েছিল ফয়সালের চিকিৎসার সহায়তা কর্মকাণ্ডে। প্রতিদিনই ওকে যেতে হতো বার্ন ইউনিটে। প্রতিদিন ও খালি হতে দেখত একটা করে বেড। গুনে গুনে দেখতো ও। প্রতিটি সকালে, প্রতিটি সন্ধ্যায়, প্রতিটি দুপুরে - কখন যে ব্যাপারটা ঘটবে তা কেউ জানত না, কিন্তু সবাই জানত ঘটবেই ব্যাপারটা - মৃত্যু আক্রমণ চালাতো। সেনাবাহিনী প্রধান আসছেন। ফটোসাংবাদিকরা আসছেন। ছবি নিয়ে যাচ্ছেন। সাংবাদিরা এসে প্রশ্ন করছেন দুর্ঘটনা নিয়ে, অব্যবস্থা নিয়ে। কিন্তু মৃত্যুর সেদিকে খেয়াল নেই। মৃত্যু নিয়ম বজায় রেখে করে যেতে থাকে তার কাজ। ৭ দিনের লড়াই চালিয়ে ১৩ তারিখ মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করে ফয়সালও। ফয়সালের শরীরের ৩৮ ভাগ পুড়ে গিয়েছিল। ডাক্তাররা ওর একটা অস্ত্রপচার চালিয়েছিল। সেখানে কেটে ফেলতে হয় ওর কান। মৃত্যুর একদিন আগে অবশ্য ওকে একটা বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। সেখানেই ১৩ নভেম্বর মরে যায় ফয়সাল। ওর পুরো পরিবার তাকিয়ে ছিল ওর দিকে। কারণ পাশ করে প্রকৌশলী হয়ে সংসারের হাল ধরার কথা ওর। অর্থের উৎস তো এখন কেবল চলচ্ছক্তিহীন বাবার অবসর-ভাতা।

ফয়সাল যেদিন মারা গেল সেদিন সন্ধ্যাবেলায় ওর পাশের বেডে যে বয়সী ব্যক্তিটি শুয়ে ছিলেন, যার মেয়েটি সারাক্ষণ তার বিছানার পাশে বসে তার জন্য খানিক নিভৃতি নিশ্চিত করতে চাইত, যাতে তিনি একটু নির্বিঘ্নে শ্বাস নিতে পারেন - তিনি চলে গেলেন। এভাবে এক জন এক জন করে ৩৮ জনের মধ্যে ৩৩ জন মানুষ মরে গেল।

সেইসঙ্গে হারিয়ে গেল নিউজটাও। নিউজের 'সাবজেক্টরা'ই তো আর নেই! কিন্তু ভাবতে গেলে কেমন দমবন্ধ লাগে, ঘটনাটার একট তদন্ত পর্যন্ত হলো না। সবাই কত সহজে ঘটনাটা ভুলে গেলাম। রাস্তায় খোলা ট্রাকে বয়ে নিয়ে যাওয়া এসিডের কন্টেইনার দেখলে হয়তো ঘটনাটা আবার মনে পড়বে আমাদের। কিংবা সেই এসিডে স্নাত হলে হয়তো আমাদের জীবনের সঙ্গেও সেঁটে যাবে ঘটনাটা। কিন্তু, তারপরও হাত শিরশির করে, চোখের তারা কাঁপে - এতই মূল্যহীন তেত্রিশটি মানুষের জীবন?

সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা ডিসেম্বর, ২০০৮ দুপুর ১:১৯
১৫টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×