somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... যূথীর আটকে পড়া মুখ (গল্প) এই অফিসে আশকার কাজ শুরু করেছে দশ দিনও হয়নি। অথচ এর মধ্যেই বস তাকে দুইবার ঝাড়ি দিয়ে ফেলেছেন। বসের চরিত্র এখনো ঠিক বুঝে উঠতে পারল না সে। যখন হাসছেন তিনি, শিশুদের মতো সামান্য রসিকতাতেও মাথা ঝুঁকিয়ে ঝুঁকিয়ে এমন হাসি হাসছেন যে আশকারের কেমন জানি ভয়ই ধরে যায়। আবার কথা নেই বার্তা নেই সেদিন সকালে আশকার অফিসে আসতে না আসতেই নিজের চেম্বারে তলব করে বসলেন। তারপর দুম করে আশকারের প্রথম অ্যাসাইনমেন্টটা নিয়ে ঝাড়ি। অথচ এমন কোনো গুরুপাপ আশকার করেনি।...
দ্বিতীয় অ্যাসাইনমেন্টা নিয়ে তাই শুরু থেকেই সে ভীষণ সিরিয়াস ছিল। অথচ আর বাকি মিনিট চল্লিশেক, এখনো সে কাজটা শেষ করে আনতে পারে না। অবশ্য আর ত্রিশ মিনিটের মাথায় লিফটে আটকা পড়তে যাচ্ছে সে।
আশকারের সামনে ছাই রঙের ল্যাপটপের স্ক্রিনে একগাদা হিসাব-নিকাশ আর রেখাচিত্র। তার হাত একবার কী-বোর্ডে, আরেকবার মাউসে যাতায়াত করছে। ঘর ভরে আছে এয়ার কন্ডিশনারের পরিশুদ্ধ বাতাসে। তারপরও আশকারের শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খোলা। এর মধ্যে আবার হঠাৎ করে বিদ্যুৎ চলে যায়। পুরো অফিস ভরে ওঠে ইউ পি এসের বিপ বিপ শব্দে। হঠাৎ আশকারের মনে হয় একপাল ঝিঁ ঝিঁ পোকা অফিসে ঢুকে পড়েছে। একটা সময় ছিল যখন সে আর যূথী কেবল ঝিঁ ঝিঁ পোকা নিয়ে কথা বলেই রাত পার করে দিতে পারত। দুজন মানুষের কথা বলার বিষয় কীকরে 'ঝিঁ ঝিঁ পোকা' হতে পারে!
এর মধ্যেই ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক থেমে যায়। আশকারের মাথাটা ঝিম ঝিম করতে থাকে। তার সামনে একটা বোর্ড মিটিং রুম। চওড়া একটা টেবিলের চারপাশ ঘিরে বসে থাকা গম্ভীর কিছু মুখ। একটা মাঝারি সাইজের শাদা পর্দার ওপর এসে পড়া প্রজেক্টরের নীলচে আলো। আশকার প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসে বদলাচ্ছে একের পর এক স্লাইড। সবার চোখে কেমন এক মুগ্ধতা, পরাজয়।
আশকার কাজ গুটিয়ে আনে। একটা পেনড্রাইভে পুরো ফাইলটা কপি করে টয়লেটে যায়। আয়নায় নিজেকে আরেকবার দেখে নেয়। টাইটা ঠিকমতো আঁটে। আয়নার সামনে উল্টো হয়ে নিজের পিঠের দিকে তাকায়। ইনটা ঠিকই আছে। তারপর আয়নার সামনে মুখটা এনে চোখের নিচের চামড়াটা আঙুল দিয়ে নামিয়ে এনে চোখ দেখতে থাকে। চোখের শিরা-উপশিরা বেয়ে মনে হচ্ছে রক্ত চলাচল করছে। অবশ হয়ে যাওয়া মাথার উপস্থিতি আরেকবার টের পায় সে। মিটিংয়ে ঢোকার আগে এককাপ চা খেয়ে যাওয়া দরকার।
ক্যান্টিনটা আটতলায় আর আশকারের রুম ষোলো তলায়। হঠাৎ খেয়াল হয় আশকারের, সকাল থেকে সে প্রায় না খেয়েই আছে। কিন্তু হাতে মাত্র পনের মিনিট। কী করা যায়? এক কাপ চা তার খেতেই হবে। এই ঝিম ঝিম করতে থাকা মাথা নিয়ে মিটিংয়ে যাওয়াটা বোকামি।
আশকার লিফটের বাটন চাপে। ফাঁকা একটা লিফট মুখ হা করে তার সামনে দাঁড়ায়। আশকার ঢুকে পড়ে লিফটের পেটে। আট নম্বর ফ্লোর চিহ্নিত বাটনটায় হাত রাখে সে। আনুগত্যপ্রবণ একটা শব্দ কোথা থেকে যে ভেসে আসে কে জানে; লিফটের দরজা দুটো এঁটে যায়। আশকারের একটু ছটফট ছটফট লাগে। সে পকেটে হাত ঢুকিয়ে লিফটের মসৃণ দেয়ালে আর মেঝেতে নিজের প্রতিফলন খেয়াল করতে থাকে। একটার চেয়ে আরেকটা বিম্বকে যেন বেশি আত্মবিশ্বাসী মনে হচ্ছে। একটা বিম্বের চোখে চোখ রেখে আশকার কিছুক্ষণ আটকে থাকে। না, যূথীর কাছে এবার ফিরবে না সে। এবার যূথীই ফিরুক। কিন্তু যূথী ফিরবে তো?
লিফটের লাল রঙের অক্ষরগুলো ষোলো, পনের, চৌদ্দ হয়ে তেরো হয়। এবং হঠাৎই অক্ষরগুলো মুছে যায় আর ক্যাঁক করে একটা শব্দ হয়ে লিফটটা একটু যেন লাফিয়ে ওঠে; এবং লিফটের আলোটুকুও নিভে যায়। ঘটনাটা এত দ্রুত লয়ে ঘটে যে আশকারের বুঝে উঠতেই বেশ কিছুটা সময় লেগে যায়। অতঃপর যখন সে পুরোপুরি বুঝে ওঠে যে তার লিফটটি তের ও বারো তলার মাঝামাঝি একটা জায়গায় ঝুলে আছে, প্রথম সে যে কাজটা করে তা হলো হাতঘড়িটার দিকে চোখ দেয়। ঘড়ির কাঁটা দুটোয় রেডিয়াম লাগানো, তাই জ্বলজ্বল করতে থাকে। ২:৫০। আর দশ মিনিট। উপস্, ভালো যন্ত্রণায় পড়া গেল।
আশকার প্যান্টের ডানপকেট থেকে তার মোবাইলটা বের করে। মোবাইল আনলক করতেই চারকোনা জায়গাটা একটা যান্ত্রিক আলোয় কেঁপে ওঠে। আশকার লিফটের অ্যালার্ম বাটনে একটা চাপ দেয়। চাপ দিয়ে কিছুক্ষণ ধরে রাখে। একটা মৃদু শব্দ তার কানে আসে। এই শব্দের জোর কি এতটুকুই? আরও কিছুক্ষণ চাপ দিয়ে ধরে রাখে সে। না, শব্দের তীব্রতায় কোনো হেরফের হয় না। মোবাইলের আলোটুকুও হঠাৎ নিভে যায়। আশকারের মনে হয়, আরে, এই লিফটে তো হাওয়া-বাতাস ঢোকার কোনো উপায় নাই। এই প্রথম সে শীতল হতে থাকে। মোবাইলটা আবার খোলে সে। কলিগদের ফোন করে ব্যাপারটা জানানো দরকার। মিটিংটাও পেছাতে হবে খানিক সময়ের জন্য। তার পাশের ডেস্কে বসে কাজ করে যে, শাহরিয়ার, তার নাম্বার বের করে ডায়াল করতে গিয়ে মনে পড়ে আশকারের - লিফটের ভেতর মোবাইলের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। তারপরও আশকার নাম্বারটা ট্রাই করে। মোবাইলটা একটা যান্ত্রিক শব্দ করে, যার অর্থ হলো নেটওয়ার্ক পাওয়া যাচ্ছে না। আশকার কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে যন্ত্রটা দিকে। তারপর শান্তভঙ্গিতে সেটা প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে ধাম ধাম করে দুটো লাথি লাগায় লিফটের দরজায়। লাথির শব্দে যেন অন্ধকারটুকু কেঁপে ওঠে। আশকারের ভয় করতে থাকে। টাইয়ের বাঁধনটা আবার ঢিলে করে দেয় সে।
আবার অ্যালার্মে হাত রাখে আশকার। আবার সেই একই শব্দ। তাকে উদ্ধার করতে কি কোনো তৎপরতা শুরু হয়েছে? নাকি কেউ বুঝতেই পারেনি এখনো যে লিফটে সে আটকা পড়ে আছে ? যদি বুঝতে না পারে কেউ? ধরা যাক পনেরো মিনিটের মধ্যে চালু হলো না এই লিফট। তখন কী হবে? পনেরো মিনিট আলো-বাতাসহীন একটা জায়গায় টিকে থাকা সম্ভব? আশকার অ্যালার্ম বাটন থেকে হাত না সরিয়েই ভাবতে থাকে এবং এক পর্যায়ে চিৎকার করা শুরু করে - 'ঐ...কেউ কি শুনতেসেন...আছেন কেউ...ঐ...লিফটটা আটকে গেসে...শুনতেসেন কেউ...?'
এরপর আরো কয়েকটা লাথি মারে সে লিফটটার দরজায় এবং হঠাৎই খুব বেশি করে যূথীর চেহারা মনে করতে পারে সে। যূথীর সঙ্গে খুব পরিচিত একটা জায়গায় হেঁটে বেড়াতে ইচ্ছা করে। হুড ফেলা রিকশাতেও কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়ানোর কথা ভাবতে গিয়ে তার দমবন্ধ ভাব শুরু হয়। তার মনে হতে থাকে এই মৃত্যুকূপ থেকে রেহাই পেয়ে প্রথমেই সে জুথিকে ফোন করবে - 'যূথী, বিলিভ মি, এইমাত্র আমি মরতে নিসিলাম...আমি তোমারে একটু দেখতে চাই...আই স্টিল লাভ ইউ...বিলিভ মি...চলো আজ আমরা হুড ফেলা রিকশায় করে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শুনতে কোথাও যাই...।'
যতো সে ভাবে তার দমবন্ধ ভাব তত বাড়তে থাকে। টুকরো টুকরো যূথী তার ভেতর জেগে উঠতে থাকে এবং সে ক্রমশ নিশ্চিত হতে থাকে এভাবে আর মাত্র পাঁচ মিনিট থাকলে সে দমবন্ধ হয়ে মারা পড়বে। আবার সে অ্যালার্ম বাটনে চাপ দেয়, লাথি লাগায়, চিৎকার করে - ভাই কেউ আছেন? কিন্তু কোথাও থেকে কোনো সাড়া ভেসে আসে না; বরং অন্ধকার আরো গাঢ় হয়ে ওঠে, বাতাস আরো কমে আসে।
হঠাৎ আশকারের মনে হয় সে আর কিছু মনে করতে পারছে না। নিজেকে তার স্মৃতিশূন্য মনে হয়। তার হাত কোনো কিছু কখনো স্পর্শ করেনি - এমনকি 'স্পর্শ করা' ব্যাপারটা কী সেটাও সে মনে করে উঠতে পারে না, যূথীর চেহারা সে মনে করতে পারে না, সে কখনো যূথি নামের কাউকে দেখেনি - কিংবা যূথী বলে কাউকে সে ছোঁয়নি। তবুও তার মনে হয় যূথির হাত ধরে আরেকবার যদি হেঁটে আসা যেতো। এরকম তার মনে হয়, সে তীব্রস্বরে চিৎকার করতে গিয়ে আবিষ্কার করে তার গলা এমন শুকিয়ে এসেছে যে সেখান দিয়ে কিছু আর বের হচ্ছে না, এবং সে নিশ্চিত হয়ে যায়Ñহয় সে মরে গেছে অথবা মৃত্যু তার খুব বেশি কাছে।
এরপর কী কারণে কে জানে, আশকারের ভেতর ধরলা নদীটা তার চর, নতুন হওয়া সেতু, বেশ কিছু অংশ খেয়ে ফেলা বাঁধ এবং টলটলে বালু-চিকচিকে পানিসমেত জেগে ওঠে। আশকার কতবার এই নদীর গল্প বলেছে যূথীকে! এই নদীর পাড় ধরে তাদের হেঁটে বেড়ানোর কল্পনা কতদিন তাদের রাতগুলোর ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে! আশকারের মনে হয়, যূথীর নাম সে তার মোবাইলে সেভ করেছিল 'ধরলা' নামে। তারপর ধরলার তীর ধরে একটা ইটভাটা চিমনিসমেত গজিয়ে ওঠে। ইটভাটার অদ্ভুত পোড়া গন্ধ আশকারের নাকে এসে লাগে। ইটভাটার পশ্চিমে সবুজ ধানের জমির পাশে আশকারদের ইটের তৈরি টিনশেড বাড়ি। সে বাড়ির ইট এসেছিল সম্ভবত ওই ইটভাটা থেকেই। আশকারদের বাড়ির সামনে ছিল একটা লম্বা রাস্তা, যার দুধারে সবুজ মেঘের মতো ধানক্ষেত। আশকার সেই রাস্তা দিয়ে প্রতি সকালে ছুটে যেত ভাটার আগুন দেখতে। গলগল গলগল করা লাল আগুন। ক্যাটক্যাটে রঙের কাঁচা ইট পোড়াচ্ছে সে আগুন। ইট পোড়ানো দেখাটা আশকারের নেশা হয়ে গেছিল। তারপর একদিন আশকারকে কে যেন গল্পটা শোনালো। ওদের বাসায় কাজ করা মহিলাটাই বোধ হয়। গল্পটা ইটভাটায় পোড়ানো শিশুদের নিয়ে। ভাটার মালিকরা ভালো আর শক্তপোক্ত ইট তৈরির জন্য ভাটার চুলায় একজন করে শিশু পোড়ায়। তারপর থেকে আশকার আর সে ভাটায় ইট পোড়ানো দেখতে যায়নি। কিন্তু বহুবার স্বপ্নে সে সেই চুলায় নেমেছে। লাল আগুন তার সঙ্গে ঠাট্টা মশকরা করেছে। বলেছে, কী খবর ছোটবাবু? কদ্দিন দ্যাখোঁ না তোমারে বাহে! আইসো অ্যালা, তোমাক একনা আদর করি। তারপর আগুন তার গা চেটে চেটে দিয়েছে। হলহল হলহল করতে করতে তার সারা বিশ্ব লালে লাল হয়ে গেছে। চুলার প্রতি ধার তার দিকে এগিয়ে এসেছে। এক পর্যায়ে আগুন কোথায় যে লাপাত্তা হয়ে গেছে কে জানে। চুলার ভেতরটা কালো অন্ধকার বাতাসবিহীন একটা জায়গা হয়ে উঠেছে। আশকার সেখানে দু হাতে কান চেপে, মেঝের কাছাকাছি মাথাটা এনে, বমি করার আগে মানুষ যে বিবমিষায় নিজেকে নুইয়ে আনে সেরকমই নিজের ভেতর থেকে ইটের ভাটাটা উগড়ে দিতে চেয়েছে...
এবং এমন সময় হঠাৎ করেই দপ করে আগুনটা আবার জ্বলে ওঠে। একটা মিহি শব্দ করে এয়ার কন্ডিশনারটা চালু হয়ে যায়। লিফটটা আরেকটা যান্ত্রিক শব্দ করে একটা দোল খায়। লাল অক্ষরগুলো আস্তে আস্তে ভেসে উঠতে থাকে এবং সেখানে হঠাৎই '৮' ভেসে ওঠে এবং লিফটের দরজাটা আনুগত্যপ্রবণতা বজায় রেখেই অষ্টম ফ্লোরে এসে হা হয়ে যায়।

লিফট থেকে বেরিয়ে আশকার কিছুক্ষণ বেকুবের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। তাকে ঠেলে লোকজন লিফটে ঢোকে। লিফটের দরজা বন্ধ করে দেয়। সে হাতঘড়িটার দিকে তাকায়। ২:৫৩। মিটিংয়ের আরো সাত মিনিট বাকি। লিফটের সামনে থেকে সরে এসে সে সিঁড়ির মুখে দাঁড়ায়। কিন্তু বোঝা যায় না সে ঠিক কী করবে, ইট আর মার্বেল পাথরের এই সিঁড়িগুলো বেয়ে ওপরে উঠবে নাকি এক ছুটে নেমে যাবে নিচে...
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/biponnobishshoy/28878431 http://www.somewhereinblog.net/blog/biponnobishshoy/28878431 2008-12-05 01:13:04
কিছু মনে কোরো না ফয়সাল, আমরা এমনই
৬ নভেম্বর কুমিল্লার ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টের কাছাকাছি একটা জায়গায় নাসির গ্রুপের জন্য এসিড বয়ে নিয়ে যাওয়া ট্রাকের সঙ্গে চট্টগ্রামমুখী একটি যাত্রীবাহী বাসের সংঘর্ষ ঘটে। কিন্তু সরাসরি সংঘর্ষের ফলে কোন হতাহতের ঘটনা ঘটে না। বাসে যাত্রী ছিল ৩৮ জন। সংঘর্ষের পর বাসের ড্রাইভার এবং তার সহকারী জানলা দিয়ে বেরিয়ে হেঁটে হেঁটেই এলাকা ত্যাগ করে। কিন্তু নাসির গ্রুপের জন্য এসিড বহন করা ট্রাকটিতে ৮৮ টি প্লাস্টিকের কন্টেইনারে মোট ১০ টন এসিড ছিল। ৪৪ টা কন্টেইনারের ওপর আরো ৪৪ টা। তাদের ওপর কিছু নেই। মোটা কাপড়ের ত্রিপলও না। স্বভাবতই, সংঘর্ষের পরপর বাসের অধিকাংশ যাত্রীকে এসিড একেবারে স্নান করিয়ে দেয়। গ্যাসের সিলিন্ডারটা ফেটে যায় তুমুল শব্দে। তৎক্ষণাৎ মৃত্যু ঘটে কয়েকজনের। এই বাসেই ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাচ্ছিল বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের ৪র্থ বর্ষের ছাত্র আহমেদ আল ফয়সাল। সে এই ঘটনার শিকারে পরিণত না হলে এটা আমার অজানাই থেকে যেত হয়ত। ফয়সালসহ বাসের অন্য যাত্রীরা সড়কের আশেপাশের খানাখন্দগুলোতে যতটুকু পাওয়া যায় ততটুকু পানিতেই নিজেদের চুবিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। এলাকার লোকজন ধরাধরি করে তাদেরকে আশপাশের হাসপাতালগুলোতে নিয়ে যায়। ফয়সালের পরিবারের কাহিনী আমি পত্রিকায় লিখেছি। তার বাবা প্যারালাইজড্ হয়ে শয্যা নিয়েছেন। আর আছেন মা, একটা ছোট বোন। খবর পেযে ছুটে আসেন ফয়সালের এক মামা। ফয়সালসহ আরো কয়েকজনতে ততক্ষণে মাইক্রো করে ঢাকা মেডিকেল কলেজে নিয়ে আসা হয়েছে।
আস্তে আস্তে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটটি ভরে উঠতে থাকে এই দুর্ঘটনার আক্রান্তদের দ্বারা। বুয়েটের ছাত্ররা ফয়সালকে বাঁচাতে অর্থ সংগ্রহে নামে। এদেরই একজন রাশেদ। রাশেদের মুখ থেকে শুনি মৃত্যুর সঙ্গে এই মানুষগুলোর অমানুষিক পাঞ্জা লড়ার কেচ্ছা। রাশেদ খুব বেশি করে জড়িয়ে পড়েছিল ফয়সালের চিকিৎসার সহায়তা কর্মকাণ্ডে। প্রতিদিনই ওকে যেতে হতো বার্ন ইউনিটে। প্রতিদিন ও খালি হতে দেখত একটা করে বেড। গুনে গুনে দেখতো ও। প্রতিটি সকালে, প্রতিটি সন্ধ্যায়, প্রতিটি দুপুরে - কখন যে ব্যাপারটা ঘটবে তা কেউ জানত না, কিন্তু সবাই জানত ঘটবেই ব্যাপারটা - মৃত্যু আক্রমণ চালাতো। সেনাবাহিনী প্রধান আসছেন। ফটোসাংবাদিকরা আসছেন। ছবি নিয়ে যাচ্ছেন। সাংবাদিরা এসে প্রশ্ন করছেন দুর্ঘটনা নিয়ে, অব্যবস্থা নিয়ে। কিন্তু মৃত্যুর সেদিকে খেয়াল নেই। মৃত্যু নিয়ম বজায় রেখে করে যেতে থাকে তার কাজ। ৭ দিনের লড়াই চালিয়ে ১৩ তারিখ মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করে ফয়সালও। ফয়সালের শরীরের ৩৮ ভাগ পুড়ে গিয়েছিল। ডাক্তাররা ওর একটা অস্ত্রপচার চালিয়েছিল। সেখানে কেটে ফেলতে হয় ওর কান। মৃত্যুর একদিন আগে অবশ্য ওকে একটা বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। সেখানেই ১৩ নভেম্বর মরে যায় ফয়সাল। ওর পুরো পরিবার তাকিয়ে ছিল ওর দিকে। কারণ পাশ করে প্রকৌশলী হয়ে সংসারের হাল ধরার কথা ওর। অর্থের উৎস তো এখন কেবল চলচ্ছক্তিহীন বাবার অবসর-ভাতা।

ফয়সাল যেদিন মারা গেল সেদিন সন্ধ্যাবেলায় ওর পাশের বেডে যে বয়সী ব্যক্তিটি শুয়ে ছিলেন, যার মেয়েটি সারাক্ষণ তার বিছানার পাশে বসে তার জন্য খানিক নিভৃতি নিশ্চিত করতে চাইত, যাতে তিনি একটু নির্বিঘ্নে শ্বাস নিতে পারেন - তিনি চলে গেলেন। এভাবে এক জন এক জন করে ৩৮ জনের মধ্যে ৩৩ জন মানুষ মরে গেল।

সেইসঙ্গে হারিয়ে গেল নিউজটাও। নিউজের 'সাবজেক্টরা'ই তো আর নেই! কিন্তু ভাবতে গেলে কেমন দমবন্ধ লাগে, ঘটনাটার একট তদন্ত পর্যন্ত হলো না। সবাই কত সহজে ঘটনাটা ভুলে গেলাম। রাস্তায় খোলা ট্রাকে বয়ে নিয়ে যাওয়া এসিডের কন্টেইনার দেখলে হয়তো ঘটনাটা আবার মনে পড়বে আমাদের। কিংবা সেই এসিডে স্নাত হলে হয়তো আমাদের জীবনের সঙ্গেও সেঁটে যাবে ঘটনাটা। কিন্তু, তারপরও হাত শিরশির করে, চোখের তারা কাঁপে - এতই মূল্যহীন তেত্রিশটি মানুষের জীবন?

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/biponnobishshoy/28877428 http://www.somewhereinblog.net/blog/biponnobishshoy/28877428 2008-12-02 22:54:53
পদ্য শব্দেরও নোনাধর্ম থাকে। প্লাস্টিকের মতো নিঃশব্দে একটি দুপুর ওড়ে এবং আমাদের অন্তরালবর্তী অ্যাকিউরিয়ামে শ্বাস নেয় তারামাছ। রাজহাঁসের মতো ক্লান্তি আমাদের যৌথ আয়নায় সাঁতরায়। ফলত আমরা আরো বেশি অস্পষ্ট হয়ে উঠি। অরণ্যাকীর্ণ লোকালয়ে কাকদের যৌনমিলনে অর্থের অপচয় ঘটে না। অথচ প্রেতায়িত হতেও তোমার টাকার প্রয়োজন! এইসব দুপুরের মরিচীকা বোঝে কেবল কাক আর কুকুর। বহুকাল হলো মানুষ সূর্যে কেবল দগ্ধ হতে শিখেছে। অথচ, আমরা শুনেছি মানুষের নিঃশ্বাসে দুপুরের পুড়ে খাক্ হওয়ার গল্প! ...আজ আমাদের বিশীর্ণ হাতে সন্দেহ স্বেদবিন্দু হয়ে ফোটে।

২.
ছবি মানুষের একেকটি বিভ্রান্ত মুহূর্ত। এরকম অনবরত বিভ্রান্তির সমাপতনকে আমরা 'মানুষ' বলে ভুল করি। তোমাকে শব্দে চিনি আমি; তারপরও, ছবিতে চিনতে চেয়েছি। কারণ ছায়া, যদ্দুর বোঝা যায়, রেখা দিয়েই তৈরি।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/biponnobishshoy/28870359 http://www.somewhereinblog.net/blog/biponnobishshoy/28870359 2008-11-17 20:01:01
বাউল ভাস্কর্য বিষয়ক হুমায়ূন আহমেদের কলাম এবং ধর্ম নিয়ে আবারো কিছু প্রশ্ন ''ভাস্কর্য : আমি খুব ভালো করেই জানি যে মূর্তিপূজা প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে ইসলাম ভাস্কর্য নিমার্ণের বিপক্ষে। কিন্তু ভাস্কর্য-নির্মাণ যদি কেবল শিল্পপ্রেরণা প্রকাশের লক্ষ্যে হয় সেক্ষেত্রে ইসলামের অবস্থানটি কী? মিকেলেঞ্জেলো ছিলেন একজন শ্রেষ্ঠ ভাস্কর, তাঁর কর্ম জগদ্বিখ্যাত, কিন্তু কই, কেউ তো তার নির্মিত ভাস্কর্যগুলোকে পূজা করে না? তাহলে একজন মুসলিম যদি তাঁর শিল্পস্পৃহা থেকে ভাস্কর্য-নির্মাণে মনোনিবেশ করে ইসলাম কি তা অনুমোদন করবে?

''পেইন্টিং : আমি খুব ভালো করেই জানি, ভাস্কর্য-নির্মাণের মতোই, পেইন্টিংও একটি কবিরা গুনাহ। এর একটি কারণ হলো মানুষ চিত্রের পুজা শুরু করে দিতে পারে। কিন্তু এমন যদি হয়, পেইন্টিংয়ে আমার অনন্যসাধারণ দক্ষতা আছে, এবং পেইন্টিং আমাকে আমার পরিপক্ষার্শ এবং প্রকৃতিকে আরো গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করছে তখন কী বলবেন? এবং এভাবে কি আমি আল্লাহর ক্ষমতাকেই আরো ভালোভাবে অনুধাবন করব না, এবং তাঁর আরো বেশি নৈকট্য অর্জন করব? ছবি আঁকা আমাদের একটি সহজাত প্রকাশপ্রবণতা এবং এটাকে অস্বীকার করা যাবে না। তাহলে আল্লাহ এটা নিষেধ করেন কেন? বিখ্যাত চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের জীবনী আমি পড়েছি। তিনি ভীষণ অসুখী মানুষ ছিলেন, কিন্তু পেইন্টিং তাকে শান্তি দিতে পেরেছিল, তিনি বলতেন পেইন্টিংই তাঁর ধর্ম, অর্থাৎ এটি তাকে ঈশ্বরের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। তাহলে ইসলাম কেন সেই জিনিসটাকে বাতিল করে দেয় যা কোনো ব্যক্তিবিশেষকে আল্লাহকে অনুধাবনের সুযোগ করে দেয়?''

এরপর প্রশ্নকর্তা একে একে সংগীত, চলচ্চিত্র, আলোকচিত্রশিল্প প্রভৃতি নিয়ে তাঁর প্রশ্নগুলো রেখেছেন। উত্তরদাতা উত্তর দিয়েছেন দুই ধাপে। তাঁর মতে ইসলাম এই প্রশ্নের মোকাবেলা করে দুইটি ধারায়। প্রথম ধাপে তিনি রেফারেন্স হিসেবে উ্েল্লখ করেছেন আল-শক্বানির (অষ-ঝযধশিধহর) ইরশাদ আল-ফুহুল এবং আবু জাহরার উসুল আল-ফিকাহ্ । সরাসরি উত্তরদাতার উত্তরের প্রথম অনুচ্ছেদটাই তুলে দিই।

The basis for banning these activities, according to most scholars, is 'blocking the means' (sadd al-dharai), which entails forbidding, or blocking, an action (that is lawful in its own right) because it could be means that lead to unlawful actions as a result or consequence. (Al-Shawkani, Irshad Al-Fuhul, p 246, Abu Zahra, Usul Al-Fiqh, p 268)

অর্থাৎ পরিণতিকে প্রতিরোধ করতে তিনি উপায়কে খারিজের কথাই বলছেন তিনি। এরপর একটা চমৎকার উদাহরণও দিয়েছেন। ''মানুষের ক্ষতি করতে পারে এমন একটি কাজের উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হচ্ছে জনসাধারণের ব্যবহৃত রাস্তায় কূপখনন, যা অবশ্যই মানুষের ক্ষতিসাধন করবে। ওলামাগণ একমত যে এক্ষেত্রে ক্ষতির উপায়টিকেই অবরুদ্ধ করতে হবে, কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, কূপখননকারী কি তবে তার পেশার কারণে অভিযুক্ত হবে - যেহেতু মানুষ কূপ খোঁড়ার কারণেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে? মতপার্থক্যটা হলো আসলে মানুষকে কি সেসব কাজ থেকে বিরত রাখা উচিৎ যেগুলো তার অনিচ্ছাতেও অন্যের ক্ষতি করে?''
এরপর বলেছেন : ''আরেকটি কাজের উদাহরণ, যা খুব কম সময়ই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, আল-শাতিবির মতামত, কাজটা হলো আঙুর বিক্রি, যদিও অল্প কিছু সংখ্যক মানুষ এ দিয়ে মদ উৎপাদন করে থাকে। এ ধরনের কাজের ক্ষেত্রে উৎসের অবরোধ প্রযোজ্য নয়। ওলামারা একমত হয়েছেন, 'যেহেতু কাজটির উপকার এর অপকারের তুলনায় বেশি, এবং অপকারটি ঘটেও সামান্য কিছু ক্ষেত্রে, তাই এটা বৈধ'।

''আরো কিছু ঘটনার উল্লেখ করেন ইসলামী পণ্ডিতগণ যেগুলো শিল্পের বিভিন্ন উপাদানকে বাতিলের পক্ষে রায় দেয়, যেমন : (১) আলি ইবন তালিবের সহি বয়ানে আছে নবী (সা.) তাকে মক্কাজয় করে মক্কার ভাস্কর্যগুলো ভেঙে ফেলতে বলেছিলেন; (২) আরেকটি সহি হাদিসে পাওয়া যায় নবী আয়েশাকে বলছেন দেয়াল থেকে একটি পেইন্টিং সরিয়ে ফেলতে এবং এটা দিয়ে একটা কার্পেট তৈরি করতে; (৩) আরেকটি সহি হাদিস নবী যেখানে বলছেন ‘সেসব চিত্রকরকে আল্লাহ অভিশাপ দিয়েছেন, যারা দাবি করে খোদা যেভাবে সৃষ্টি করে তারাও সেভাবে সৃষ্টি করতে পারে; (৪) আয়াত ৩১:৪, যেটি সংগীতকে বাতিল করে বলে জনমত আছে।

''তাই, কিছু পণ্ডিত বলেন : (১) ভাস্কর্য-নির্মাণ সাধারণ অর্থে নিষিদ্ধ, (২) ছবি আঁকা বাতিল, (৩) একই কথা ফটোগ্রাফির ক্ষেত্রে, (৪) এবং সংগীতের ক্ষেত্রেও।

যাহোক, উপরোক্ত বর্ণনা/হাদিসগুলোতে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত আছে, যেগুলোর অর্থ দাঁড়ায় এইসব নিষেধাজ্ঞা সার্বজনীন নয় : (১) মক্কার ভাস্কর্যগুলো ঈশ্বর হিসেবে পূজিত হতো, (২) নবী যে পেইন্টিংটি সরাতে বলেছিলেন তা ছিল কিবলার দিকে এবং প্রার্থনাকালে এটি তাঁর মনোযোগহানির কারণ হয়েছিল, (৩) চিত্রকরেরা দাবি করেছিল, 'খোদার মতো তারাও সৃষ্টি করতে পারে', (৪) সংগীত, আয়াতটির মতে, তখনই নিষিদ্ধ যখন এটি 'খোদার পথ থেকে মানুষকে সরিয়ে দেয়'।''

অর্থাৎ উত্তরদাতা বলছেন, এইসব ফলাফলের আশংকা যদি না থাকে তো ইসলাম শিল্পের এসব মাধ্যমকে অনুমতি দেয়। হুমায়ূন আহমেদের সুর তাহলে, এই উত্তরদাতার কথাবার্তা যদি বিবেচনায় নিই, এখনো অক্ষুণ্ণ থাকে। কিন্তু এই পর্যায়ে এসে আমি নিজের কিছু মতামত তুলে ধরতে চাই।

বেশ কিছুদিন আগে যতীন সরকারের একটি প্রবন্ধ পাঠের সুযোগ হয়েছিল। প্রবন্ধটির বিষয়বস্তু ছিল ধর্মতন্ত্র ও মৌলবাদ। সে প্রবন্ধের এক পর্যায়ে লেখক লেভ তলস্তয়ের একটি তত্ত্বের শরণ নিয়েছিলেন। লেভ তলস্তয় ময়াশয় ধর্মের তিনটি উপাদান নির্ণয় করেছিলেন। এসেনশিয়াল অব রিলিজিয়ন, ফিলোসফি অব রিলিজিয়ন এবং রিচুয়ালস্ অব রিলিজিয়ন। রিচুয়ালস্ হলো আচার, আর ফিলোসফির মধ্যে নানান ধর্মের নানান পণ্ডিতদের পর্যবেক্ষণ। যতীনবাবু বলেছিলেন, সব ধর্মেই একটা জিনিস একই। এসেনশিয়াল অব রিলিজিয়ন। অর্থাৎ ধর্মের সারবস্তু। এ হলো, তাঁর এবং তলস্তয়ের মতে, এক সার্বজনীন মানবিক মঙ্গলাকাক্সক্ষা। সকল ধর্মের সার মানুষের বিজয় ঘোষণা করে। মানবিক মূল্যবোধের চূড়ান্তই হচ্ছে এসেনশিয়াল অব রিলিজিয়ন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ধর্মতন্ত্র যদি এমন নখরহীন তত্ত্বীয় একটা ব্যাপারেই সীমিত থাকত তাহলে ধর্মের নামে মানুষে মানুষে এত বিভাগ-উপবিভাগ, শ্বাপদীয় হিংস্র দাঙ্গা, দেশভাগ, লুঠ, হত্যা, ধর্ষণ - এ সবের অস্তিত্ব কি সম্ভব হতো?

হতো না। তারপরও কেন হলো? কারণ রিচুয়ালস্ এবং ফিলোসফি। সুফিবাদ, সহজিয়া পন্থা কিংবা আমাদের বাউলদের দর্শন ধর্মের অন্তঃসারকে যেভাবে ধারণ করতে পেরেছে, প্রশ্ন হলো, একইভাবে প্রচলিত ধর্মতন্ত্রগুলোর বাহক 'অবতার'গণ সারবস্তু আগলে থেকেছেন কতটা, আচারপ্রবণতাতেই বা জোর দিয়েছেন কতটা? ধর্মের সারবস্তু নিযে যদি কথা হয়, তাহলে শিল্পের সৌন্দর্য, ভ্যানগঘের ঈশ্বর, আর মুহাম্মদের আল্লাহ্Ñসবই তো মিলেমিশে একাকার হওয়ার কথা। বিরোধের তো প্রশ্নই নাই। কিন্তু মনে রাখতে হবে, মুহাম্মদকে হেরায় বসে ধ্যান যেমন করতে হয়েছে, বদরে গিয়ে তেমন তলোয়ার হাতে বাহাদুরিও দেখাতে হয়েছে। অর্থাৎ তিনি তো কেবল ধর্মের নায়ক নন, রাষ্ট্রনায়কও। তাই, বিপুল জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করতেই, তাকে জোর দিতে হয়েছে ধর্মের আচারেও। বারবার সামনে এসেছে ধর্ম অনুযায়ী জীবনাচারের কথা। এবং একটা সময় তাঁর ধর্মকে 'প্রতিষ্ঠা' করতে গিয়ে আচারটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে মূখ্য, সারবস্তু চাপা পড়ে গেছে। ধর্ম অসাধারণ থেকে সাধারণের হাতে পড়লে তা আর ভাব থাকে না, তা হয়ে যায় আচরণ।

এখন একটু হুমায়ুন আহমেদ সাহেবের মনস্তত্ত্বটা খেয়াল করি। তিনি ধর্মের এই মূলভাবমূলক এলাকাটাতেই হাঁটাচলা করেছেন। একারণেই তাঁর কাছে ধর্ম সুন্দরের প্রতিনিধি হয়ে উঠেছে। ধর্ম যেন কেবল মানুষকে ভালোবাসতেই শেখায়। মহাত্মা গান্ধীও তাঁর মানবতার চিন্তাকে ধর্মের মূলভাবের সঙ্গে একাট্টা করেছিলেন। এটা অনেক ভয়ঙ্কর একটা ভুল ছিল। উপমহাদেশীয় রাষ্ট্রচিন্তা এবং রাজনীতিতে প্রথম ধর্মচিন্তাকে টেনে এনেছিলেন তিনি। পরিণাম কী হয়েছিল আমরা সবাই জানি। ধর্মের স্পর্শকাতরতা বড় ভয়াবহ জিনিস। ধর্মের ভাবমূলক অংশটা মানুষকে একধরনের শান্তি দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো এ পর্যন্ত পৃথিবীতে যত লক্ষ মানুষ কেবল ধর্মের কারণে প্রাণ দিয়েছেন, বিপন্ন হয়েছেন, আর কি কোনো কারণে হয়েছেন?

হুমায়ূন আহমেদের কলামটা পড়ার পর থেকেই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে - ধর্মের তত্ত্বরূপ দিয়ে ধর্মের উন্মাদরূপকে কি কোথাও কখনও নিবৃত করা গেছে? মঙ্গলময়তার প্রতিশ্রুতিবাহী কিন্তু হিংস্র বিভাজনের উদগাতা ধর্ম থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকাটাই কি মানুষের জন্য শ্রেয় নয়?



]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/biponnobishshoy/28861050 http://www.somewhereinblog.net/blog/biponnobishshoy/28861050 2008-10-28 14:37:44
তিনটি কবিতা আত্মচেতনার মতন মাঝেমধ্যে ধরা পড় তুমি। নিজের সঙ্গে যখন নিজের গভীর ইতরামি, চেহারা বদলে আত্মলিঙ্গ বিপ্রতীপকামী, লিঙ্গের যোগবিয়োগে ব্যস্ত অবচেতনভূমি, আমি হইয়া কেমনে জানি ধরা পড় তুমি!

১৬.
ধবল জ্যোৎস্নার রাতে হঠাৎ দেখি,
ফুটো হয়ে গিয়েছে আকাশ!
এত অর্থহীনতা নিয়ে ঘুরি ফিরি
জীবনের দিকে এতবার জিজ্ঞাসার চোখে তাকালাম
অথচ কী অদ্ভুত
ফুটো দিয়ে দেখছি
অনন্ত অর্থহীনতার ঐ পারে
রুপোলি সার্থকতার আরেক মহাকাশ...

২.
সবকিছু গড়ায় মাঝেমধ্যেই
সামনের টেবিল টেবিল থেকে
দেয়াল দেয়াল থেকে
প্রাচীর প্রাচীর থেকে
কনক্রিট - সবকিছু -
সবকিছু গড়াতে গড়াতে তৈরি হয় খাদ,
আশ্চর্য সব খাড়ি
ডুবতে থাকি
ডুবতে থাকি
তলিয়ে তলিয়ে যাই
অতল থেকে অতলে
এইমাত্র যে মাটিতে ছিলাম দাঁড়িয়ে
অপসৃয়মাণ আসন্নের মত
তাও হয়ে যায় দূরপাল্লার বাসের জানলায়
ভেসে ওঠা সবুজ শস্যের চেয়েও
দ্রুতগামী কোন অতীত...


(কবিতাগুলো বছর দুই-তিন আগে, যখন আমি শেরে বাংলা হলের বাসিন্দা, তখন লেখা।)
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/biponnobishshoy/28857119 http://www.somewhereinblog.net/blog/biponnobishshoy/28857119 2008-10-20 01:17:31
ব্লগার সীমান্ত আহমেদের আম্মা...
শিমুল আমার বন্ধু। পৃথিবীতে ওর সব থেকে ভালো বন্ধু ওর আম্মা। কোথায় কোন অপকর্ম করল, কোন মেয়েকে দেখে ভালো লাগল, কোন বন্ধুটাকে আর একদম সহ্য করা যচ্ছে না - সব গিয়ে সে বলত তার মাকে। এইতো কয়েকদিন আগে, এই সামহয়্যারে ব্লগিং সঙ্ক্রান্ত একটা ব্যাপার নিয়েই শিমুলের ওপর আমি খুব ক্ষেপে গেলাম। শিমুল গিয়ে মাকে সব বলল। মা বললেন, বাবা কাউকে নিজের অজান্তেও কষ্ট দিস না। তুই ওর সঙ্গে যা-ই করে থাকিস না কেন, মাফ চেয়ে নে। শিমুল আমার কাছে যখন ফোন করে মাফ চাচ্ছে ওর আম্মা তখন হাসপাতালের বিছানায়। কোনো কথা বলতে পারছেন না, কাউকে চিনতে পারছেন না। পেশায় উনি শিক্ষিকা ছিলেন। অচেতন অবস্থায় একা একা হাত নাড়াচ্ছিলেন, যেন পরীক্ষার খাতা কাটছেন। শিমুল আমাকে ফোনে বলছে, দোস্ত তুই আমারে বদ-দোয়া দিস না। যা করসি, করসি ফান হিসেবে। আম্মা বলসিল, কাউরে কষ্ট দিলে সে মনে মনে বদদোয়া দেয়। আম্মা তর কাসে মাফ চাইতে বলসে। দোস্ত, আম্মার অবস্থা খুবই খারাপ। তুই আমারে মাফ কইরা দে দোস্ত। আমি তখন বাসে। বাড়িতে ঈদ করে ঢাকায় ফিরছি। শিমুলের কথায় আমি কথা হারালাম।

মাকে আমি প্রথম দেখি শিল্পকলার এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটারে। শিমুলরা প্রায় প্রায়ই পারিবারিকভাবে, মানে ওর মামা, মামী, মামতো ভাই-বোন, সবাই মিলে বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যায়। নাটক দেখাটাও ওদের একটা পারিবারিক উপলক্ষ। শিমুল আমাকেও নিয়ে গেছিল আমাদের ভার্সিটির হল থেকে। সেই একবারই আমি শিমুলের আম্মাকে দেখি, যাকে নিয়ে এত গল্প আমি শিমুলের মুখে শুনেছি। শিমুলের আম্মা আমাকে দেখে এমন একটা হাসি দিলেন যেটাতে সব থেকে বেশি মিশে ছিল দুষ্টুমি। তুমিই তানিম? এই একটা কথাই তিনি বলেছিলেন আমাকে। বাদ বাকিটা জেনেছিলাম শিমুলের মুখেই। শিমুল আমাকে যতটা জানে ওর আম্মাও ঠিক ততটাই জানতেন। কারণ শিমুল তার কাছে ডিটেইলে সব কিছু বলে দিত। হায়, আমার ছ্যাকা খাওয়ার ঘটনাও নিশ্চয়ই এই মহিলার জানা! ক্লাসে সবাই আমাকে কী নিয়ে ক্ষেপায় তাও নিশ্চয়ই তিনি জানতেন! আমি তার দুষ্টুমি মাখা হাসিটা ভুলতে পারি নি। ওইদিন থেকেই, শিমুল তুই যদি এই লেখা পড়িস তুইও জেনে রাখ, তিনি আমার চেনা সেরা মা।

আজ সকালে আমার ঘুম ভেঙ্গেছে মায়ের মৃত্যুসংবাদে। গতকাল সারাদিন তিনি আইসিইউতে কোমার ভেতর ছিলেন। আজ সকালে মা চলে গেলেন। অথচ বিজয়া দশমীর এখনো একদিন বাকি...

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/biponnobishshoy/28852408 http://www.somewhereinblog.net/blog/biponnobishshoy/28852408 2008-10-08 18:47:05
রায়হান যেভাবে বেওয়ারিশ হয় (গল্প) বিছানায় শুয়ে শুয়ে কলিংবেলের অপেক্ষা করতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু উপায় নাই। হাতে সময় কম। রায়হানের ফ্ল্যাটটাকে বলা উচিত দেড়-রুমের। সে যে ঘরটায় থাকে তার পাশের ঘরটা আসলে পুরা ঘর না। তার ঘরটার তুলনায় এর সাইজ অর্ধেক; এবং প্রথম যেদিন এ বাসায় আসে সে, তালা খুলে বাড়িওয়ালি ভদ্রমহিলা যখন ফ্ল্যাটটা দেখায়, অস্বস্তির মত একটা গুমোট হাওয়া দরোজা ঠেলে, একেবারে রায়হানের নাক-মুখ ঘেঁষে চলে যায়। একটা শাদা বেড়াল একতাড়া পুরানা পত্রিকার অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে এসে ছুট লাগায়; আর একটা ভাঙা খাটের কঙ্কাল, পুরানা তুলা বের হওয়া তোশকের পাশে পড়ে থাকে বাচ্চাদের চালানো তিন চাকার একটা ভাঙা সাইকেল। বাড়িওয়ালি ভদ্রমহিলা, যেন কিছুটা লজ্জামেশানো গলায়, রায়হানকে বলে - সে উঠলেই এগুলা সরায়া ফেলা হবে। কিন্তু সেই পুরানা খাট, পত্রিকার - তূপ, ট্রাই-সাইকেল পরে আর নাড়া হয় না, রায়হানও ভালোই মানায়া নেয় ওগুলার সঙ্গে, যেন তার সংসারের সদস্য।
পাশের ঘরের দরোজার নিচ দিয়া আজকের দৈনিকটি দিয়া যাওয়া হয়েছে। রায়হান টুথব্রাশে পেস্ট ভরাতে ভরাতে, আয়নায় দিনের প্রথমবারের মত নিজের চেহারা দেখতে দেখতে, দরোজার নিচ থেকে রঙচঙে দৈনিকটি টেনে নিয়া তাতে চোখ বসাতে বসাতে কলিং বেলের পাখির কিচ-কিচ শব্দটা ভেসে ওঠে - যে ব্যাটারি দেওয়া কলিংবেলটা গত মাসের শেষদিকে একটা টিউশনির টাকা হাতে পেয়েই রায়হান কিনে ফেলেছিল; এবং সে খুব অভ্যস্ত ভঙ্গিতে দরোজাটা খুলে ময়লা জমায়া রাখা সবুজ বাল্টিটা ময়লাওয়ালা ছেলেটার দিকে আগায়া দেয় এবং ময়লাওয়ালা সেই ছেলেটা তার দিকে খুবই অনভ্যস্ত আর অস্বস্তিকর একটা দৃষ্টি হেনে জিজ্ঞাস করে - রায়হান সারে নাইক্কা?
রায়হান প্রথমবারে কিছু বুঝে ওঠে না। তারপর ছেলেটার দিকে ঠিকঠাক তাকায়া দেখে। না, এই ছেলেই প্রতিদিন আসে ময়লা নিতে। এ আজ তারে চিনতে পারে না ! রায়হানের মুখে এখন টুথব্রাশ। সে ময়লাওয়ালা ছেলেটারে পাত্তা না দিয়া, ময়লার বাল্টিটা আগায়া দিয়া বাথরুমে গিয়া ঢোকে, এবং আবার তার মনে পড়ে, সাড়ে সাতটা বেজে গেছে, রামপুরা থেকে টিএসসি পৌঁছানো ৪৫ মিনিটের কমে হবে না, জুথির আসার কথা ৮ টায়, জুথির সঙ্গে তার সকালের রোদ পোহানোর কথা, এই আইডিয়া জুথির, এবং জুথি এসে ফিরে গেলে তার আজকের দিনটা কেমন কুৎসিত হয়ে যাবে এটা ভাবতে ভাবতে তার বিষ্ঠাত্যাগ শেষ হয়ে যায়, সকালের ঠাণ্ডা পানি যখন তাকে বিভক্ত করে করে আগায়, তার জুথির চুলের নরম মনে আসে, এবং ময়লাওয়ালা ছেলেটার নির্বিকার প্রশ্নটাও কেন জানি মনে ভাসে, সে তাড়াহুড়া করে গিয়ে দাঁড়ায় আন্ডারওয়্যারের স্টিকারে প্রায় পুরাটা ভরে ওঠা বেসিনের আয়নার সামনে, নিজেকে দেখে, আশ্বস্ত হয়, জুথি তারে চিনে ফেলবেই...

টিএসসির ফুটপাথের পাশে, দেওয়ালে, পা ঝুলায়া বসে থাকে জুথি। জুথি আসে হলুদ জামায়। জুথির চশমার রূপালি ফ্রেমে রোদ ঠিকরায়া পড়ে। জুথি বসে হাঁটুর সঙ্গে আরেক হাঁটু কাত করে লাগায়া। হাত দুইটা, দুইটা হাঁটুর উপর দিয়া লম্বা করে দেয়। জুথির কালো রঙের হাতব্যাগটা পাশে বসে ঝিমায়। জুথি কি টায়ার্ড, এই সম্পর্কটা টানতে টানতে? জুথিকে দেখতে দেখতে রায়হান আশেপাশে ফ্লেক্সিলোডের দোকান খুঁজতে থাকে। এবং পূর্ব রামপুরার সেই গলি ধরে আগাতে আগাতে, ডানদিকে যে মোবাইল ফোনের দোকানটা পড়ে, শরীরের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে আটকে থাকা গেঞ্জি পরে যেসব মডেল হাতে মোবাইল নিয়া টগবগ করতে থাকা বুকের দিকে তাকায়া থাকে যেখানে, সেই দোকানটার মোটা টালি খাতা হাতে বসে থাকা ষোল-সতের বছরের ছেলেটার ঝকঝকে দাঁত তার চোখে ভাসে এবং প্রতিদিনের মত আজও, যে দোকানটায় ঢুকতে ঢুকতে তার মাথায় খেলে, এই ছোকরা কি রাতের বেলা দোকানের ঝাঁপি ফেলার আগে আগে, এই লাল গেঞ্জির মডেলদের বুকে মাথা গুঁজতে গুঁজতে মাস্টারবেশন করে -সে দোকানটায় আজ ভিড় থাকে কম । রায়হান ঢোকার পর অন্য অন্য দিন যেমন হয়, সেই ছেলে রায়হানের দিকে তাকায়া চোখে চোখে একটা হাসি দেয়, সম্ভবত নিয়মিত গ্রাহককে চোখের অভ্যর্থনা জানায়, মার্কেটিং পলিসি হিসাবেই হয়তো - আজ সেটা ঘটে না...
রায়হানের আগে আগে আরও জনাতিনেক কাস্টমার দোকানটায় ভিড় জমায়। ছেলেটা লোকগুলার কাছ থেকে তাদের মোবাইল নাম্বার শুনে শুনে টালি খাতাটায় টুকতে থাকে, তারপর তাদের জিজ্ঞাস করে যে, তারা তাদের বলার অধিকার কতটুকু বাড়াতে চায়, এই ফাঁকে রায়হান দোকানটায় ঢুকে চতুর্থ ব্যক্তি হয়ে দাঁড়ায়া থাকে, ছেলেটার হাতের অজানা রঙের বলপেনটার দিকে তাকায়া থাকে এবং দেখতে থাকে: সে ছেলেটার সামনে গিয়া ৫০ টাকার একটা নোট আগায়া দিয়া বলতেছে ফ্লেক্সি - ৫০, ছেলেটা তার দিকে না তাকায়াই জিজ্ঞাস করে, নাম্বার কন। অথচ এই নাম্বার, রায়হান জানে, সে নিজে ভুলে গেলেও এই ছোকরা ভুলবে না, এত এত বার সে ফ্লেক্সি করাইছে এখান থেকে। দলা পাকানো একটা চিন্তা গিলে ফেলে রায়হান ঠায় দাঁড়ায়া থাকে এবং তৃতীয়, দ্বিতীয় হয়ে যখন তার পালা চলে আসে আসে, রায়হান ধুম করে বের হয়ে এসে, দোকানের বাইরে, লাগালাগি দুইটা কদাকার নকশার দালানের মধ্যে জায়গা করে নিয়া, অবাঞ্ছিত দুইটা নারিকেল গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে কাঁপতে কাঁপতে, বিদ্যুতের তারেদের জটিলতা গলে যে আকাশটুকু কোনমতে নেমে আসে নিচে, শ্বাস নিয়া সেটা একেবারে শুষে নিতে চায়।
রায়হান জুথির দিকে আগাতে থাকে। জুথি মোবাইল বের করে। কারে ফোন করে জুথি? রায়হানের মোবাইলে ভাইব্রেশন দেওয়া। মোবাইল তার বুকপকেটে। বুকপকেট কাঁপে। রায়হান আগায়। আর দশ গজ দূরে জুথি মাথা ঝুঁকায়া বসে থাকে। কী করবে রায়হান জুঁথির কাছে গিয়া? কী বলবে? অন্য অন্য দিন যা বলে তা-ই? একজন অপরিচিত লোক এসে কাছ ঘেঁষে বসলে কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে জুথি? ব্যাপারটা নিয়া কৌতুহল হয় রায়হানের। আবার ব্যাপারটা ঘটার সম্ভাবনা ঠাহর করে সে ভেতরে ভেতরে কেঁপেও ওঠে । চিনবে না আমারে জুঁথি? না। হইতেই পারে না এটা। পুরা পৃথিবী আমারে ভুইলা যাইতে পারে। জুথি আমার ফেস্ চিনবেই। আর আমার মোবাইল নাম্বার? এইটাতো আছে জুথির কাছে। রায়হান আগায়। টিএসসির রাস্তায় টুংটাং করতে করতে তিনটা রিকশা চলে যায়। রায়হান আগায়...

২.
রায়হান জুথির থেকে হাত পঁচিশেক দূরে, মুখ ঘুরিয়ে টিএসসির প্রাচীরে বসা। আড়চোখে সে জুথিরে দেখে। জুথি একটা বাদামঅলা ছোকরারে ডাক দেয়। অদ্ভুত ব্যাপার তো - রায়হান ভাবে। জুথি এরকম অপেক্ষার টাইমে বাদাম চিবাবে? ওয়েট করাটা কি ও এনজয় করে? নাকি জুথি প্রতীক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে প্রতীক্ষা থামায়া দিছে? কিংবা জুথি কি আদৌ প্রতীক্ষা করে? রোদ অনেকটা জাঁকায়া ওঠে। টিএসসি রোদের বলকে ভেসে যেতে থাকে। অন্যদিন হলে এতক্ষণে জুথির সঙ্গে রোদ পোহানো সাঙ্গ করে জুথিকে নিয়ে উদ্দেশ্যবিহীনভাবে কোনো বাসে উঠে পড়ত রায়হান। কিন্তু জুথি কেন এখনো এই ঝাঁঝালো রোদে বসে আছে? ও কি এখনো বিশ্বাস করছে, ঠিকই চলে আসবে রায়হান? নাকি নিজের ভিতর ডুবে ডুবে বাদাম চিবানোর এক ধরনের আনন্দ নেয় সে?
একটা কাক এসে রায়হান আর জুথির মাঝের ফাঁকা জায়গাটায় বসে। তারপর ছোট্ট একটা লাফ দিয়ে উড়ে চলে যায়। এরপর এসে বসে আরেকটা কাক। রায়হান ভাবে সে জুথির কাছে এসেই অপরিচিত মানুষের মত বলবে, আপনি কি কারো অপেক্ষায় আছেন? যদি জুথির কাছে সত্যি সত্যিই অপরিচিত হয়ে ওঠে সে, তাহলে এটাই সবচেয়ে নিরাপদ প্রশ্ন। আর যদি সে সেই পরিচিত রায়হানই থাকে তাহলে জুথি এটাকে তার আর দশটা ফাজলামির একটা হিসাবেই নিবে এবং এই ফাজলামি তো এর আগেও সে করেছে জুথির সঙ্গে। তাই জুথি সন্দেহ করবে যে রায়হান পরীক্ষা করে দেখছে জুথি তারে চিনতে পারছে কি-না, এই সম্ভাবনা আর থাকে না। কিন্তু রায়হান জুথির কাছাকাছি, মানে বিশ-পঁচিশ হাত দূরত্বে এসে, কী কারণে জানি দেয়ালটায় বসে পড়ে। জুথিকে মোকাবেলা করার সাহসের অভাব থেকেই এটা করে কি-না নিশ্চিত হতে পারে না সে। এই দূরত্ব থেকে পালায়া যাওয়াও যায় না। সে বসে থাকে। জুথি তাকায় না তার দিকে। ঘড়ি দেখে। বাদামঅলারে ডাক দেয়। জুথির দিকে আগানোর সাহস হয় না রায়হানের।
৩.
রায়হান হাঁটতে শুরু করে। ঢাকা ছুটে যায়। রিকশা-রিকশা-রিকশা। কার-কার-কার। ধুলা। হকার। লটারি-লটারি। ভাই, বাম্পার ড্র। আর মাত্র আটচল্লিশ ঘন্টা। ওভারব্রিজ। আব্বা এবং আম্মাজান, আমার কিডনিতে পাথর জমছে। অথচ, আব্বা এবং আম্মাজান, জেবনেও ভাবতে পারি নাই, কারো সামনে হাত পাততে হইবে। আমি একজন বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছেলাম। আইজ আমার কিডনিতে পাথর। ১০-১১-১২। ১০-১১-১২। মিরপুর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া। ১০-১১-১২। নিয়া যান ভাই, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের লটারি। রায়হান হাঁটতে থাকে। হাঁটতে থাকে। হাঁটা থামায়। রামপুরার একটা বাসে ওঠে। তাকে ব্রাইট স্টার কিন্ডার গার্টেন-এর সাইনবোর্ড লাগানো বাড়িটার নিচতলায় গিয়া খুঁজে দেখতে হবে, সেখানে এখন আছে কে।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/biponnobishshoy/28843162 http://www.somewhereinblog.net/blog/biponnobishshoy/28843162 2008-09-14 20:16:00
আবার সে গল্প টিভি বিতর্ক ব্যাপারটা যেন একটা স্বপ্নই হয়ে উঠেছিল। তাই চতুর্থ পিরিয়ডের ঘণ্টা শুনেই, যে ঘণ্টা মানে টিফিন, যে ঘণ্টা মানে গরম সিঙাড়া আর জিলেপি, হুড়োহুড়ি করে পৌঁছে গিয়েছিলাম আর্দ্র অতীতের গন্ধযুক্ত লম্বা হলরুমে। গিয়ে দেখি হলরুম ভর্তি ছাত্র। বড় ভাইয়েরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ডিবেটিং ক্লাবের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বয়ান করছেন। এরপর তারা একটা কমিটি তৈরির ঘোষণা দিলেন। আমার মতো অত্যুৎসাহী কয়েকজন নিজেই নিজের নাম প্রস্তাব করে বসল! (পরে ভোট হয়েছিল। দুইটিমাত্র কণ্ঠভোট পেয়ে বিশাল ব্যবধানে হেরেছিলাম!) বড় ভাইয়েরা আমাদের মতো যারা নতুন তাদেরকে ‘এই তুমি’, ‘এই তুমি’ করে সম্বোধন করছিলেন। এর মধ্যেই দেখি কয়েকটি মুখকে তারা আগে থেকেই চেনেন। তাপস ছিল ফার্স্টবয়। স্কুলের সবাই ওকে এমনিতেই চিনত। আরেকটি মুখকে নিয়ে বড় ভাইদের খুব আগ্রহ খেয়াল করলাম। বারবার ডেকে ডেকে ওকে সামনে নিয়ে আসা হচ্ছিল। আমার পাশে ছিল আদনান। আদনানকে জিজ্ঞেস করলাম, ওটা কে? জুয়েল, চেননা জুয়েলকে?
হুমম্। জুয়েলকে চিনলাম। এরপর কীভাবে কীভাবে যেন বিতর্ক নিয়ে আমি খুব সক্রিয় হয়ে উঠেছিলাম। একবছর পর, আমরা যখন ক্লাস নাইনে, টিভি বিতর্কের দলে সুযোগও পেয়ে গেলাম। আমি, তাপস আর সেই জুয়েল। টিভি বিতর্কের প্রস্তুতি চলল একমাস। রংপুর জিলা স্কুলের সব ধরনের সাংস্কৃতিক কাজকর্মের মূল উদ্যোগী ছিলেন সুবোধ স্যার। প্রতিদিন তিনি স্ক্রিপ্ট লিখে নিয়ে আসতে বলতেন। কোনোটাই তাঁর পছন্দ হতো না। স্যার তাঁর বিখ্যাত সম্বোধনগুলো আমাদের উদ্দেশ্যে আওড়াতেন। মারতেনও কম না। আমাদের তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে গালাগালি আর মার হজম করেছিল জুয়েল। কোনোদিনই সে নতুন স্ক্রিপ্ট করে আনত না। স্ক্রিপ্ট ছাড়াই কোথা থেকে নতুন নতুন সব তত্ত্বের আমদানি করতো সে।
প্রস্তুতিপর্ব সমাপ্ত হলো। আমরা বাসে করে সদলবলে রওনা দিলাম ঢাকা। আমাদের দলপ্রধান, বলা বাহুল্য, সুবোধ স্যার। রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশনের ছোট-বড়-মাঝারি কয়েকশ’ বাতি ঝোলানো স্টুডিওতে পা রেখেই আমি তো ভয়ে অর্ধেক। দলের প্রথম বক্তা ছিলাম আমি। আমার স্ক্রিপ্টের শুরুতেই ছিল চর্যাপদের একটা শ্লোক। বিতর্কের বিষয় ছিল ‘শহরকেন্দ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থাই আমাদের চিকিৎসা সেবার অবনতির মূল কারণ’। এই বিষয়ের সঙ্গে চর্যাপদের শ্লোকের কী সম্পর্ক - পরে অনেকবার ভেবেও আমি এ প্রশ্নের কোনো উত্তর পাইনি! যদিও সুবোধ স্যার পুরো স্ক্রিপ্ট আমাকে দিয়ে কম করে হলেও পঞ্চাশবার প্র্যাকটিস করিয়ে নিয়েছিলেন তারপরও শুরুতেই সে শ্লোক বলতে গিয়ে আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। ভুলভাল একটা কিছু বলে চালিয়ে দিলাম। বাদবাকি স্ক্রিপ্টটুকু মুখস্ত ঝাড়লাম! আমাদের প্রতিপক্ষ ছিল কুষ্টিয়া জিলা স্কুল। আমার পরের বক্তা জুয়েল, তারপর তাপস। তাপস বরাবরের মতোই ধুন্দুমার বিতর্ক করল। কিন্তু আসল কাজটা নাকি করে দিয়ে গিয়েছিল জুয়েল। বিতর্কে জিতবার পর সুবোধ স্যার ওকে জড়িয়ে ধরে বারবার এটা বলছিলেন। কুষ্টিয়ার টিমের দ্বিতীয় বক্তার নম্বরের সঙ্গে ও অবশ্য বড় একটা ব্যবধান তৈরি করে দিয়ে গিয়েছিল। সবচেয়ে কম প্রস্তুতি ছিল ওরই। কিন্তু বলার স্টাইলের জন্যই সম্ভবত ওর বক্তব্যের সময়ই বিচারকেরা আমাদের দিকে ঘুরে তাকায়। সেরা বক্তার খেতাবটা তাপস পেলেও, সুবোধ স্যার জুয়েলের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, হি মেইড দ্য ডিফারেন্স। আমার খুব হিংসা হচ্ছিল।
প্রথম রাউন্ডে জিতলেও টিভি বিতর্কের হর্তাকর্তারা পরের রাউন্ডের জন্য আমাদের আর ডাকেননি। বছর দুয়েক পর আমি, জুয়েল, তাপস - আমাদের সেই টিম আবার আবির্ভূত হলো বিতর্কের ময়দানে। কারমাইকেল কলেজ আয়োজন করল ‘আন্তঃ রংপুর বিতর্ক উৎসব’। আমরা তখন পড়ি রংপুর সরকারি কলেজে। ‘আন্তঃ রংপুর বিতর্ক উৎসব’-এ অংশ নিতে আসল রংপুরের সব কলেজ আর কারমাইকেল কলেজের প্রতিটি ডিপার্টমেন্ট। আমরা মাত্র ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র। কারমাইকেলের টিমগুলোর সদস্যরা ছিল অনার্স-মাস্টার্সের। আমাদের টিম প্রবল বিক্রম দেখিয়ে সব বুড়ো বুড়ো দলগুলোকে হারিয়ে ফাইনালে উঠে গেল। ফাইনালে আমাদের প্রতিপক্ষ হলো কারমাইকেল কলেজের ইংরেজি বিভাগ। তাদের তিন বিতার্কিকই মাস্টার্সের। মিলনায়তন উপচে পড়ছিল মানুষে। আমাদের কলেজের স্যার-ম্যাডামদের ফেভারিট বিতার্কিক ছিল জুয়েল। পুরো প্রতিযোগিতাতেই জুয়েল দর্শক মাতানো বিতর্ক করে এসেছে। তাপসও ভালো করছিল খুব। সবাই ভেবে রেখেছিল ফাইনালেও আমরা জিতে যাব। কিন্তু আমরা হেরে গেলাম। এই পুরো টুর্নামেন্টে আমি জুয়েলকে কাছ থেকে দেখেছি। ওর চিন্তাকে কখনই আমার প্রখর মনে হয়নি। তাৎক্ষণিকভাবে এমন কিছু কথা বলত ও, আর এমনই ছিল ওর ভঙ্গি যে দর্শকরা পলকহীনভাবে ওর কথা গিলতে বাধ্য হতো। আমি ভেবেছিলাম ওর এই দক্ষতা বুঝি বিতর্কের মঞ্চেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু অনেক পরে বুঝেছিলাম আমার এই ধারণা ভুল ছিল। সামনাসামনি কথোপকথনেও মানুষকে তাক লাগিয়ে দেওয়াটা ওর জন্য খুব সহজ একটা ব্যাপার। ওর এই বাকদক্ষতার জন্যই সম্ভবত আমাকে এই লেখা লিখতে হচ্ছে।

ফার্স্ট ইয়ারের শেষাশেষি জুয়েল কলেজে আসা বন্ধ করে দিল। পুরো সেকেন্ড ইয়ারে কোনো ক্লাস করল না। সেকেন্ড ইয়ারে অবশ্য এমনিতেই ক্লাস-ট্লাস তেমন হয় নি। তারপরও দীর্ঘদিন জুয়েলকে আমরা আর খুঁজেই পাইনি। ও কী করে, কোন স্যারের কাছে পড়ে কেউ-ই জানে না। এরপর ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার সময় জুয়েল পরীক্ষা দিতে আসল হাতে ব্যান্ডেজ বেঁধে। প্রথম পরীক্ষাটা এভাবেই দিল। এরপর আর একটা পরীক্ষাও দিতে আসল না সে। এবং এ সময় থেকেই জুয়েলের দিকে সবাই কেমন একটা চোখে তাকানো শুরু করে - বাসে কিংবা ট্রেনে চতুর মলম-বিক্রেতার দিকে আমরা যে চোখে তাকাই, অনেকটা তেমন; আমরা বিক্রেতার কথায় আমোদ পাই আবার মনে মনে এটাও নিশ্চিত থাকি যে এর কথার কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। জুয়েল যে হাতে সাদা ব্যান্ডেজ বেঁধে পরীক্ষা দিতে আসল, অনেকে বিশ্বাসই করল না সত্যি সত্যিই ওর হাতে কিছু হয়েছে। এটা নিয়ে ফাজলামিও হলো। আমি কেবল মেলাতে পারলাম না কবে থেকে জুয়েল সবার মধ্যে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা হারাতে শুরু করেছে। এর পেছনে কারণ কি এটাই যে ও তাৎক্ষণিকভাবে অনেক চমক লাগানো কথাবার্তা বলে? মানে ব্যাপারটা কি এমনই যে এতদিন ওর বিতর্কের শ্রোতারা খুব আগ্রহ নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থেকেছে, কথাগুলোর চমৎকারিত্বে এবং তাৎক্ষণিকতায় অভিভূত হয়েছে, আমোদিতও হয়েছে, কিন্তু একটা বর্ণও বিশ্বাস করেনি?
ইন্টারিমিডিয়েট পরীক্ষার পর আমরা রংপুর ছেড়ে ছড়িয়ে পড়লাম। বিভিন্ন জন ভর্তি হলো বিভিন্ন খানে। ছুটিতে বাড়ি গেলে কাচারিবাজারের আড্ডায় জুয়েলকে নিয়ে অনেক চটকদার আলোচনা শুনতাম। জুয়েল নাকি ব্যবসা শুরু করেছে। একটা বাইক কিনেছে। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলেই নাকি বলে, গত পরশু সিঙ্গাপুর থেকে ফিরেছি কিংবা আগামী সপ্তাহে মালয়শিয়া যাচ্ছি। এগুলো আলোচিত হতো মশকরার মেজাজে। আমাদের যখন হাসাহাসি করার মতো বিষয়ের অভাব হতো তখন আমরা জুয়েলকে নিয়ে আলাপ জমাতাম। আমাদের ব্যাচের রিইউনিয়নে জুয়েল ঘোষণা দিল ও-ই আমাদের ব্যাচের মধ্যে সবার আগে পি.এইচ.ডি করেছে! আশ্চর্য, যে ছেলে ইন্টামিডিয়েটের সিঁড়িই ডিঙোতে পারল না সে পি.এইচ.ডি করল কি স্বপ্নে! ওর হইছেটা কী? খোঁজ নিয়ে জানলাম জুয়েলের ধান্দার নাম ‘ডেসটিনি ২০০০’। ‘ডেসটিনি’র একজন এজেন্ট হয়েছে সে। তার কাজ ডেসটিনির গ্রাহকসংখ্যা বাড়ানো। তাকে ডক্টরেট করিয়েছে ডেসটিনিই!
জুয়েলকে নিয়ে আমাদের হাসি-তামাশার ধার অবশ্য রি-ইউনিয়নের শেষে এসে কিঞ্চিৎ কমল। অনুষ্ঠান আয়োজনের বাকি-বকেয়া মেটাতে আয়োজকরা যখন গলদঘর্ম তখন জুয়েল ঘোষণা দিয়ে আয়োজক কমিটিকে কয়েক হাজার টাকা ডোনেশন দিয়ে ফেলল। এরপর আরো দুয়েকটা অনুষ্ঠানে জুয়েল এরকম ডোনেট করেছে। ডোনেশনের পরিমাণও আস্তে আস্তে বেড়েছে। এবং মজার ব্যাপার ওর পসার যতই বাড়তে থাকল বন্ধুদের মধ্যেও ওর একরকম গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হতে থাকল। ওর এজেন্ট হিসেবে রংপুরের এমন কিছু মানুষের নাম শোনা যেতে থাকল যে আমাদের চোখ প্রায় কপালে ওঠার দশা। জুয়েলের খালি পসারই পসার। এমনিতেই সে কেতাদুরস্থ। এখন আরো বেশি ফ্যশনেবল হয়ে উঠল। বাইক নিয়ে শহর দাপিয়ে বেড়ায় সে। শহরের কেন্দ্রে তার তাক লাগানো একটা অফিস। দেখতে দেখতে প্রেমও হয়ে গেল রূপবতী একজনের সঙ্গে। ঢাকঢোল পিটিয়ে বিয়ে হলো। একবছরের মাথায় দুটো জমজ মেয়ে হলো তাদের। জুয়েলের খবর মানেই শুধু শনৈ শনৈ। গতবার রংপুর গিয়ে শুনলাম গাড়ি কিনেছে জুয়েল।
এইবার, এতক্ষণ থেকে যারা ধৈর্য নিয়ে নিয়ে এই লেখা পড়েছেন তাদের জন্য পরিবেশিত হবে গল্পের টুইস্ট। তার আগে কয়েকটা কথা বলা দরকার। এমন না যে আমি জুয়েলের ভালো বন্ধু ছিলাম। আমি বরাবর ওকে ঈর্ষা করেছি। সেটা বিতর্কে ওর মঞ্চ কাঁপানোর জন্য কিংবা ওর প্রতি স্যারদের স্নেহের পক্ষপাতের জন্য। কিন্তু তারপরও যে অনুভূতিটা হচ্ছে জুয়েলের জন্য সেটাকে কি সহানুভূতি বলে? আমি জানি না। কেবল অবাক হই, দেখতে দেখতে কেমন একটা গল্পের চরিত্রই হয়ে গেল সে! সেই জুয়েল - ঢাকা যাবার পথে আমার ভীষণ বমি পেলে আর মাথা ধরলে আমি যার ঘাড়ে অনেকক্ষণ হেলান দিয়ে ছিলাম - এখন কেমন যেন ধোঁয়াটে আর দূরবর্তী একটা নাম। জুয়েল রংপুরের মানুষদের বলত, আপনারা আমাকে এখন পাঁচ হাজার টাকা দিন, পাঁচ বছর পর, দেখবেন, আপনার টিনের বাড়ির পাশের এই চারতলার মত, আপনারও একটা বাড়ি হবে। এইসব প্রতিটি মানুষই তো আসলে একেকটা গল্প। যারা যারা ওকে বিশ্বাস করে টাকা দিয়েছে তাদের সবাইকে ঐ এক মুহূর্তটার জন্য হলেও - যে মুহূর্তে ও চোখে চোখ রেখে বক্তব্যের প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে শ্রোতাকে অভিভূত করে ফেলত - ও অন্য আরেকটা জীবনে নিয়ে যেতে পারত। যে জীবনটার ঝাপসা একটা স্বপ্ন এই লোকগুলো দেখে, কিন্তু কোনোদিনই তাকে পাওয়ার সাহস করে নি। জুয়েলের সুবাদে একবার হলেও সে সাহসটা তো তারা দেখিয়েছে! যদিও, আপনারা জানবেন, জুয়েলের তৈরি সে পৃথিবীতে কখনই তারা পা রাখতে পারে নি ।

মূল গল্প :
৯ সেপ্টেম্বর ২০০৮, দৈনিক প্রথম আলো।
রংপুরে ডেসটিনির তিন পরিবেশক গ্রেপ্তার, প্রতারণার অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর
বৃক্ষরোপণ কর্মসূচীর নামে প্রতারণার অভিযোগে রংপুরে ডেসটিনি ২০০০-এর তিন পরিবেশককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা হচ্ছেন ডেসটিনির পরিবেশক ও শহরের সেন্ট্রাল রোডের সাদেকুজ্জামান জুয়েল, তাঁর ভাই সাহেদুজ্জামান সোহেল ও বাবা সালাউদ্দিন আহমেদ। জেলা প্রশাসন জানায়, রংপুরে ডেসটিনি বিভিন্ন ধরনের মুনাফার আশ্বাসে লোকজনের কাছ থেকে এ পর্যন্ত চার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে।
গত রোববার কোতয়ালি থানায় মামলা দুটি করেন গোমস্তাপাড়া এলাকার শফিকুল ইসলাম ও পাকপাড়ার হাবিবুর রহমান। গ্রেপ্তার সাদেকুজ্জামান জুয়েলের ভাই আতিকুজ্জামানও ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের উচ্চপর্যায়ের একজন পরিবেশক।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, রংপুরে ডেসটিনির বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম নিয়ে অভিযোগ পেয়ে জেলা প্রশাসন তদন্ত করে। তদন্তে ডেসটিনি ট্রি প্লান্টেশন লিমিটেডের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা মিলেছে উল্লেখ করে বলা হয়, রংপুরের কোথাও ডেসটিনির বৃক্ষরোপণ কর্মসূচী বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
গত ৩ আগস্ট অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) কল্লোল কুমার চক্রবর্তী স্বাক্ষরিত তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, রংপুরে জনগণকে বিভিন্নভাবে মুনাফার আশ্বাসে প্রায় চার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, সাদেকুজ্জামান জুয়েল ‘ডেসটিনি ট্রি প্লান্টেশন প্যাকেজ’-এর নামে মুনাফা দেওয়ার আশ্বাসে শফিকুল ইসলামের কাছ থেকে ১৬ লাখ টাকা ও হাবিবুর রহমানের কাছে দুই লাখ টাকা নেয়। একপর্যায়ে সন্দেহ হওয়ায় টাকা প্রদানকারীরা সুদসহ টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য চাপ দেয়। এরপর জুয়েল দুজনকেই শহরের ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের চেক দেন। এর মধ্যে শফিকুলকে ১৭ লাখ ছয় হাজার এবং হাবিবুরকে দুই লাখ ৭০ হাজার চেক দেওয়া হয়। তবে পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় দুটি চেকই ফেরত দেয় ব্যাংক। এরপর শফিকুল ইসলাম ও হাবিবুর রহমান থানায় পৃথক মামলা দায়ের করেন।
কোতয়ালি থানার উপপরিদর্শক (এস আই) আজিজুল ইসলাম জানান, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ তাঁরা মৌখিকভাবে পেয়েছেন। ...






]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/biponnobishshoy/28842383 http://www.somewhereinblog.net/blog/biponnobishshoy/28842383 2008-09-13 01:49:58
গল্পই http://www.somewhereinblog.net/blog/biponnobishshoy/28841906 http://www.somewhereinblog.net/blog/biponnobishshoy/28841906 2008-09-12 01:22:02 অণুগল্প
এরপর দেবী বদলে গেলেন আবার।
দেবীর আঙ্গুলে আমি নখর গজাতে দেখলাম।
তাকে লোমশ হয়ে উঠতে দেখলাম।
পেশল হয়ে উঠতে দেখলাম।
উত্থিত হয়ে উঠতে দেখলাম।
দেবী হয়ে উঠলেন শয়তান।

সেই শয়তান আমাকে ধর্ষণ করল।
নিজের চোখ উপড়ানোর কোনো সুযোগ আমার আমার হলো না। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/biponnobishshoy/28831581 http://www.somewhereinblog.net/blog/biponnobishshoy/28831581 2008-08-16 18:58:15
চুম্বন - পত্রিকার পাতা থেকে থেকে ঢাকার রাস্তায় তো, এদেশের কোনো এক ইন্টেলেচুয়াল 'খবরের কাগজ'-এ একবার একটা কলাম লিখেছিলেন। সেটার কথা আমার এখনো মনে আছে। কলামটা ছিল একটি কাপল'কে নিয়ে। লেখক সাহেব একদিন ঢাকার রাস্তায় বেবিট্যাক্সি করে যাচ্ছিলেন। তার সামনের আরেকটি ট্যাক্সিতে সেই কাপল বসে ছিল। ভীষণ জ্যাম। হঠাৎ করে জ্যাম ছাড়ল। কাপলদের ট্যক্সির পেছন পেছন লেখকের ট্যাক্সি। কাপলরা হঠাৎ ঘনিষ্ঠ হওয়া শুরু করল। এক পর্যায়ে শুরু করল চুমু খাওয়া। লেখকের মতো আশপাশের সব যাত্রীই নাকি ভীষণ বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিলেন। কোনো এক দৈব কারণে পুরো রাস্তা লেখকের ট্যাক্সিটি সেই কাপলদের ট্যাক্সির পেছন পেছনই গেছিল এবং লেখককে এই 'বিব্রতকর' দৃশ্যটি হজম করতে হয়েছিল। এরপর কলামের শেষদিকে লেখক সামাজিক মুল্যবোধ এবং তার অবক্ষয় সংক্রান্ত বুদ্ধিজীবীয় খোলোশে ঢুকে গিয়েছিলেন। সেটুকু আমার আর পড়া হয়নি।
এই কলাম পড়ে আমি হাজারো প্রশ্নের উত্তর খুঁযে পাচ্ছিলাম না। পরে, ৯৪-৯৫ এর দিকে, বাংলাদেশ টেলিভিশন দিনে দুই দুই চার ঘণ্টা করে সিএন
এন আর বিবিসির প্রোগ্রাম দেখাতো। সেসব প্রোগ্রাম নিয়ে মা-খালাদের ফিসফাস শুনেছি। সিএনএন-এ হঠাৎ হঠাৎ ইউরোপ আমেরিকার রাস্তাঘাট দেখায়, সেখানে ছেলে মেয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একজন আরেকজনকে চুমু খায়। এ নিয়েই এত ফিসফাস। চুমু খাওয়ার ব্যাপারটা আমি চাক্ষুষ প্রথম ওখানেই দেখি। তবে এ নিয়ে এত ফিসফাসের কী আছে বুঝে উঠতে পারিনি।
আমদের মফস্বল শহর রংপুরে ছেলে আর মেয়ে হাত ধরাধরি করে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে - এ দৃশ্য সম্ভব ছিল না। অমুক মেয়েকে আজ কারমাইকেল কলেজের সামনে অমুক ছেলের সঙ্গে এক রিকশায় দেখা গেছে - এ নিয়ে খালাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা করতে শুনেছি। চুম্বন নিশ্চয়ই সে মফস্বলে মহাবিপর্যয় ঘটাতো।
এর পরে, অনেক পরে, মৈত্রয়ী দেবীর 'ন হন্যতে' ততদিনে আমার পড়া, সে সুত্রে 'ফ্রেঞ্চ কিস' নিয়েও যথেষ্ট শিক্ষিত হয়ে গেছি, শুনেছিলাম যে রংপুরের উদ্যানগুলোয় 'লাভার'-রা কিস করে। কোনোদিন নিজে গিয়ে 'যাচাই' করার সৌভাগ্য অবশ্য হয় নি!
সময় এগোচ্ছিল। প্রেমিকরাও এগোচ্ছিলো প্রেমিকাদের দিকে। এর মধ্যে ঢাকায় চলে এসেছি। এখানে এসে দেখি রিকশায় ঘন হয়ে বসা কাপলদের। ফার্স্ট কি সেকেন্ড ইয়ার তখন। সন্ধ্যায় বুয়েটের সামনের রাস্তায় বন্ধুদের সঙ্গে উদ্দেশ্যহীন হাঁটাচলা করি। হুডতোলা রিকশা দেখলেই তা অনুসরণ করে আমাদের কৌতুহলী চোখ। হঠাৎ হঠাৎ কোনো বন্ধু বলে ওঠে, দেখ দেখ কী করে...!
আস্তে আস্তে আমার মফস্বলে চোখ শহুরে হয়ে ওঠে। টিএসসির সামনে দিয়ে রিকশা করে যাবার সময় দুপাশের ফুটপাথে আর ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি না। হুডতোলা রিকশার কৌতুহলও কমে আসতে থাকে। কিন্তু প্রেমিকরা প্রেমিকাদের চুম্বন করেই যয়। রিকশায়, উদ্যানের ছায়ায়, সোডিয়াম আলোর নিচে, হঠাৎ অন্ধকারে।
আমাদের সবার চোখই কি আসলে সয়ে যায়? দুজন ফ্রেঞ্চ তরুণ-তরুণীকে প্যারিসের রাস্তায় চুম্বনরত দেখলে আমরা খুব সহজেই পাশ কাটিয়ে যেতে পারি। কিন্তু ঢাকার রাস্তায় হুডতোলা ছেলেমেয়েদের দিকে আমরা দ্বিতীয়বার তাকাই কেন? ভালোবাসার মধ্যে শরীর থাকবেই। কিন্তু রাস্তায়, গলিতে মেয়েটার মুখ টেনে ধরে ছেলেটা যখন চুমু খায় - ব্যাপারটা শিল্পিত লাগে না কেন? বাধাটা কি ঐতিহ্যে? আমাদের সংস্কৃতিতে? আমাদের রক্তে?
একটা সময় রাস্তায় কেউ চুমু খেলে তা নিয়ে পত্রিকায় কলাম লেখা হয়ে যেতো। খুব বেশিদিন মনে হয় লাগবে না, কাপলদের যখন আর কষ্ট করে রিকশার হুড তুলতে হবে না!






]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/biponnobishshoy/28823786 http://www.somewhereinblog.net/blog/biponnobishshoy/28823786 2008-07-24 18:04:53
মৃত্যু মৃত্যু ভালোবাসা বাস্তবতা এবং সভ্যতার আবাল্য প্রতিনিধি হিসেবে
যাদেরকে আমরা শরীর বলে ভাবি।
আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল চাপ চাপ অন্ধকার;
সময় গেছিল বিক্রি হয়ে
তবুও, আমাদের হাতঘড়ি আমরা খুলে রেখেছিলাম...

সময়ে আসলে বিশ্বাস ছিল না
তোমার এবং আমার
কেননা ভাঙা জানলার কাচের ওপ্রান্তে
অপেক্ষারত সবুজ ধূসর হচ্ছিল,
আর মৃত্যুময় ছিল তোমার চোখ
যেরকম মৃত্যু আমি শরীরে জড়াতে ভালোবাসি...
আমি আবদার করছিলাম -
তোমার চোখগুলা ধার দিবা আমারে?
মৃত্যুর মতো তোমায় ছুঁইতে ইচ্ছা করে
মৃত্যুরও অধিক।

নোনাখাওয়া দেয়ালের বিক্রি হওয়া ছায়ায়
আমি তোমার ভিতর মৃত্যুর খানাখন্দ হাতড়ে হাতড়ে
যখন ফিরে আসছিলাম নিজের গর্তে -
তখনই প্রশ্ন উঠল,
মৃত্যুর অধিক কে তোমায় ভালোবাসে প্রিয়ে!]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/biponnobishshoy/288227