somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... নির্বাসিতা এক নারীর প্রলাপ নির্বাসিতা এক নারীর প্রলাপ

__মূল : কারিমা শিমাখি
__অনুবাদ : ফয়সাল বিন খালেদ

ভৎসনা

বেড়ে গেছি বয়সের সাথে সাথে
লালিমার ছোপ পড়েছে গালে গালে
ছুটেছি কত বাতাসের সাথে পাল্লা দিয়ে
অন্যদের নিয়ে হেসেছি কখনো কখনো

উৎসাহ

কতবার জেলে পুরলাম আমার শব্দগুলোকে
অবিরাম বুনে গেলাম আবেগগুলো
বঞ্চনার কুয়োর ধারে
তারপর এক রাতে হঠাৎ তন্দ্রা এলে
থেমে গেল সব
একটা ফুলের তোড়ার পাশে
বিস্মৃতির আতর মেখে


এবং বাজ পাখিটা মারা গেল

ফিরে আসে খেজুর বৃক্ষের মত মৃত দেহগুলো
চিৎকার করতে করতে
সেই জলাভূমিটায়
কার মুখ দেখা যায় তার দিগন্ত চূড়োয় ?
জন্মের রাতেই নবজাতক খুঁজে তার মাকে
কেঁদে কেঁদে মেঝে ভিজিয়ে


ভাঙ্গা জালানা

পচা পানির মত ও গড়াতে থাকে
গোত্রের চূড়া থেকে চূড়ায়
গোত্রপতির পায়ে হুমড়িয়ে পড়ে।
আমি নিরাপত্ত্বাকে তালাশ করে ফিরছি মেয়ে !
আস আমার শয্যায়
এখানে তুমি নিরাপদ



ধূর্ত

হয়ত তুমি জান না
একদিন কেটে যাবে তোমার এই মেঘ
শুকিয়ে যাবে এক দিন
আমার জখম
তবে আর কোন দিন তোমার জায়গা হবে না
আমার হৃদয় নীড়ে
কারণ তুমি একটা বিশপিঁপড়ে
মাড়িয়ে গেছে ক্রোধের মুহূর্ত যাকে
তারপর থেকে তুমি কাঁদছ কাঁদছ কাঁদছ


অসহায় হুদহুদ

সময়ের টিলার ওপারে
দেখা যায় প্রাচীন এক ফানুছের অবশেষ
এক সময় যা ছিল সাধকদের সূর্য
চোখের চূড়াগুলোর ওপারে লাফিয়ে ওঠে একটা নাঙ্গা তরবারি
এগিয়ে আসে বাতাস কেটে কেটে
বর্শার ফলায় বসে থাকা প্রজাপতিটাকে হত্যা করতে
প্রজাপতির রক্ত ঝরে রক্ত ঝরে রক্ত ঝরে


আমার মায়ের রুমাল

মায়ের রুমালটা নিংড়ালে
অশ্রু ঝড়ে চোখ ছাপিয়ে
আমার শব্দরা ডুবে যায়
জীবনের তিমিরে
এর নামই জীবন মেয়ে আমার !
কেঁদে যাও একদিন ভালবাসা পাবে
কিংবা চিৎকার জুড়ে দাও


তন্দ্রাচ্ছন্ন শিয়াল

তুমি এমনই থেকে যাবে
যত উপরেই ওঠ নগ্নই থেকে যাবে তুমি
আমার সামনে পড়ে আছে তোমার চিঠি
আবেগুলো ডুবে যায়
এক পৃথিবী প্লাবনে
ভালবাসার তরঙ্গে তরঙ্গে
হাবুডুবু খায় তোমার পদধ্বনির সমুদ্রে
তখন বুঝতে পারি নি
ধীরে ধীরে আমাকে নিয়ে যাচ্ছ
ভীষণ কোনো শোক যাপন করতে
আর একটা কথা ...
তুমি কিন্তু ঠিকানা ভুল লিখেছ
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bishoyvabna/28894437 http://www.somewhereinblog.net/blog/bishoyvabna/28894437 2009-01-07 23:54:51
প্রতারক নারী প্রতারক নারী

___মূল : হিলডা ইসমাইল
___অনুবাদ : ফয়সাল বিন খালেদ


জানালার ডান কপাটে
লিখেছিলাম,
হাইতোলা সুরমার রেখা টেনে :
'আমার ঘুম পায় নি
কিংবা আমার শব্দগুলো
হয়ে যাই নি কোনো মাতৃভূমি '

একটা প্রজাপতি...
ঘন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে,
আমার আঙ্গুলগুলোর দিকে
ঘোরলাগা কন্ঠে বলে :
'কবে হব আমি
তোমার মত নারী ?'

সমুদ্র..
আমাকে টানে না,
কারণ তা নীল,
এবং কারণ আমি
আমার প্যান্টের মত নীল
কয়েকটি কামড় এঁকে দেই,
রাতের রোমশ বুকের উপর।

সিগারেট...
আমি সিগারেট পছন্দ করি না,
ধূম পানের অভ্যাস নেই,
তামাকের স্মৃতিটা ঝাপিয়ে পড়লে
শুধু ফুকে যাই এক তোড়া গোলাপ।

দাদীজান তার হৃদয় দিয়ে
চুল আচড়ে দেন আমার কবিতার
আমাকে শোনান,
'চতুর কষ্টের' কবিতা

কেননা আমি নিজেকে ছাড়া
কারো সাথে শেয়ার করি না,
দু:খ তাই
আমাকে খুব নি:সঙ্গ করে দেয়

স্বপ্নের কফিনের উপর,
খোদাই করে একটা কৌতুক এঁকে দেই
আমার প্রত্যাশাগুলোর চোখ ফুড়ে দেই
তারপর..
মুখ উপচে হাসতে থাকি খুব।

বাতাসেরও কোনো মায়া-দয়া নেই
ছুটে এসে আমকে চাবকায় খুব
ক্ষতগুলো ফুলে ফুলে ওঠে
নিশ্চুপ হতে থাকে ক্রমশ।

বিদ্যুৎ চমক...
বার বার ছবি নেয় আমার
আর অবিরাম বদলে যেতে থাকে আমার অশ্রুরা
নতুন অশ্রু আসে,
বিদ্যুৎ চমক কেবলই ছবি তুলে যায়..
আমার দু:খগুলোর পর্ণ ছবি।

ঘৃণা ধরে গেছে এই দেহটার প্রতি
এই দেহটাই তাদের সব সূচনার সূত্রপাত
এবং আমার সমাপ্তির কারণ।

২৫ টা বছর...
কাটিয়ে দিয়েছি একই আসনে বসে
একই ইঞ্জিনের উপর,
আমাকে কেবলি নিয়ে গেছে
পিছনের দিকে।

বাবা ...
আমার নার্গিসি ঘড়িটার কথা মনে আছে ?
চোর কালটা তা চুরি করে নিয়ে গেছে
আমার বা' হাতে কামড়ে দাও
তোমার দাঁতে এঁকে দাও
দুটি বিচ্ছুর উলকি
সময় যা মুছে দিতে পারবে না কোনো দিন।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bishoyvabna/28894426 http://www.somewhereinblog.net/blog/bishoyvabna/28894426 2009-01-07 23:12:42
নিস্তব্ধতা অনুবাদ: ফয়সাল বিন খালেদ


মৃত আমাদের শব্দগুলো
খুনীদের বিবেকের মত,
যে বিবেক কখনো গোসল করে নি জীবনের সরোবরে
কখনো জানে নি প্রসববেদনা কাকে বলে,
কি কঠিন বর্শার ফলায়-ফলায় হাঁটা

*

স্বপ্ন দেখি : শৃঙ্খলহীন একটা জগৎ
জন্ম নিচ্ছে আমাদের অবশ কবিতার গর্ভে,
স্বপ্ন দেখি : একটা গোলাপ-মৌসুম
ফুটছে আমাদের যক্ষ্মাক্রান্ত বুকে,
সবাই মিলে স্বপ্ন দেখি : পৃথিবীর নতুন কোনো মাজেযা
তেতে ওঠছে কবিতার কার্তুজে

*

ইসরাইল আমার মসজিদ জুড়ে হল্লা করে
উপড়ে ফেলে আমার পিতাজির চিবুক
আর আমি ইঁদুরের মত
তাড়াতাড়ি লুকিয়ে পড়ি আমার কাবিতার গর্তে

*

অগ্রজ কবি যখন মৃতু্যকে ভয় পেতে শুরু করেন
তার সবচেয়ে সুন্দর কবিতাটাও তখন হয়ে যায় নিস্তব্ধতা।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bishoyvabna/28831838 http://www.somewhereinblog.net/blog/bishoyvabna/28831838 2008-08-17 15:23:44
মাহমুদ দারউইশ : শেষ আকাশের পর মাহমুদ দারউইশ, ফিলিস্তিনীদের জাতীয় কবি, অজস্র ফিলিস্তিনীদের মত, হারিয়ে ছিলেন তার গৃহ, গ্রাম, শৈশব। হানাদার ইসরায়েলী সৈন্যরা তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিল তার স্বদেশ-মাতৃভূমি, পরিচয়। কিন্তু পরিচয় ও ভূমিহীন মাহমুদ দারউইশ দেখিয়েছেন একজন কবি, ভাষা-কবিতার মাঝে কিভাবে নির্মাণ করে নিতে পারে তার মাতৃভূমি-স্বদেশ পরিচয়, হারানো শৈশব ও মায়ের ভালবাসা। 'আমি ভূমির জন্য গান গাই না' একটি কবিতায় দারউইশ বলেছেন 'কারণ আমিই ভূমি'। অস্ত্রহীন ফিলিস্তিনী তরুণরা ইসরায়েলী সৈন্যদের রাইফেলের গুলি ও টেংকের গোলার মুখে ছুঁড়েছে নির্বাক পাথর। মাহমুদ দারউইশ দেখিয়েছেন নিরীহ ভাষা-কবিতা কিভাবে পরাজিত করে করে দিতে পারে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিধর পরাশক্তিকে। জিব-ছেড়া ফিলিস্তিনীদের চিৎকার ও বিজয়ী ভাষার নাম মাহমুদ দারউইশ। ফিলিস্তিনহীন পৃথিবীর মনিচিত্রে দারউইশের কবিতা লাল ফিলিস্তিন।

মাহমুদ দারউইশ জন্মগ্রহণ করেন, ১৯৪২ সালে, ফিলিস্তিনের এক অখ্যাত গ্রাম 'আল-বোরোতে'। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েলী সৈন্যদের ফিলিস্তিন দখলের সময়, এক ভয়াবহ রাতে আক্রান্ত হয় দারউইশের এই ছোট্ট গ্রামটিও। সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় দারউইশের পরিবার। ইসরায়েলী সৈন্যদের চোখ ফাঁকি দিয়ে তারা প্রায় ছত্রিশ ঘন্টা লুকিয়ে ছিলেন ক্ষেতের মাঝে। পরে শরণার্থী হয়ে আশ্রয় নেন লেবাননে। এক বছর পর, সাত বছর বয়সে, দারউইশ লেবাননের সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করেন ফিলিস্তিনে, তার হারানো জন্মভূমিতে। কিন্তু শিশু দারউইশ দেখলেন ইসরায়েলী গোলার আগুনে পুরে গেছে তার বাড়ি-গ্রাম্তফিলিস্তিনের মানচিত্র। দারউইশ লিখেছেন : 'এক রাতে আমার চাচা এবং একজন পথপ্রদর্শকের সাথে লেবাননের সীমান্ত দিয়ে আমি প্রবেশ করলাম ফিলিস্তিনে। সকালে উঠে দেখি আমি একটি ইস্পাতের দেয়ালের মুখোমুখি : আমি ফিলিস্তিনে। কিন্তু কোথায় আমার ফিলিস্তিন? আমি কখনো আমার বাড়িতে ফিরে যেতে পারিনি। প্রচন্ড কষ্ট নিয়ে আমি দেখতে পেলাম আমার গ্রাম বিধ্বস্ত-ভস্ম।'

ফিলিস্তিনের সন্তান মাহমুদ দারউইশ ফিলিস্তিনে প্রবেশ করেন অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হয়ে। ১৯৬৯ সালে ইসরায়েলী কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা 'জো হাদারেক'-এ এক সাক্ষাৎকারে দারউইশ বলেছেন : 'সেই একটি রাত সবাইকে শরনার্থী বানিয়ে দেয়... লেবনানে আমি শরনার্থী ছিলাম। ফিলিস্তিনেও আমি শরনার্থী হয়ে আছি।' এটা কোন কাব্যিক দীর্ঘশ্বাস ছিল না। ইসরায়েলী রাষ্ট্রের প্রথম আদমশুমারিতে যে সব ফিলিস্তিনী অন্তর্ভুক্ত হয়নি, নতুন ইসরায়েলী সরকার তাদেরকে পরিচয় পত্র দেয়নি। তাদের চিহ্নিত করে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে। ফলে দারউইশের মত অজস্র ফিলিস্তিনী নিজ জন্মভূমিতে হয়ে থাকে অবৈধ অভিবাসী।

লেবানন থেকে ফিরে আসার পর তার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় 'দাইরুল আছাদ'-এ, আত্মপরিচয় গোপন করে। কারণ ইসরায়েলী সরকারের দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন অবৈধ অভিবাসী। তিনি জানতেন ধরা পড়লে তাকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়া হবে। তার মাধ্যমিক শিক্ষা 'কাফার ইয়াসিফ' গ্রামে। মাধ্যমিক শিক্ষার পরই তিনি জড়িয়ে পড়েন নানা তৎপরতায়। তার জীবন হয়ে উঠে শুধু কবিতা লেখা এবং কবিতার মাধ্যমে লড়াই করা।

দারউইশ তখন এই বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়ায়ের পথ খুঁজছিলেন। এই সময় তিনি ইসরাইলী কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন এবং পার্টির পত্রিকার সম্পাদক হিসাবে কাজ শুরু করেন। সেই ফিলিস্তিনীদের মুক্তি সংগ্রামের একটি শক্তিশালী অস্ত্র হয়ে ওঠেছিল কবিতা। 'আমছিয়া' বা সান্ধ্য কবিতা পাঠ অনুষ্ঠানগুলোতে গ্রামে গ্রামে গিয়ে দারউইশ কবিতা পাঠ করতেন, যা ফিলিস্তিনীদের দারুণ প্রভাবিত করেছিল। ইসরাইলী সরকার শংকিত হয়ে পড়ে এবং তার আমছিয়াগুলোর উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করে। সেই সময় ইসরাইলী সৈন্যরা সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত দারউইশকে গৃহবন্দী করে রাখত।

স্বাভাবিক কারণেই ইসরাইলে দারউইশের এই রাজনৈতিক তৎপরতা নির্বিঘ্ন হয় নি। ১৯৬১, ১৯৬৫, ১৯৬৭_ তে তিনি তিনবার জেলে গিয়েছিলেন। সত্তুরের দশকের শুরুতে তিনি বাইরুত চলে যান। ততদিনে কবি হিসেবে দারউইশ বেশ বিখ্যাত হয়ে ওঠেছেন। ১৯৭৭ সালে বের হয় তার বিখ্যাত জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ 'আবিরুনা ফি কালামিন আবিরীন', যা ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। এই সময় দারউইশ 'আল্লাজনাতুত্তানফিযা লি মুনাজ্জামাতিত তাহরীরির ফিলিস্তিনী'-তে যোগ দেন। এই প্রতিষ্ঠানে তিনি দীর্ঘদিন আরাফাতের ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে কাজ করেছিলেন। ফিলিস্তিনী সরকার গঠন কালে আরাফাত তাকে সাংস্কৃতি কমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন। দারউইশ তা গ্রহণ করেন নি। দারউইশ বলেছিলেন, আমার একমাত্র আকাংখা বারুদের ধোঁয়া মুক্ত ফিলিস্তিনে বসে কবিতা লেখা। কিন্তু ১৯৯৩ সালে অসলো চুক্তির পর দারউইশ এই দল থেকে বের হয়ে যান। এরপর তিনি আরাফাতের সাথে আর কোনো সম্পর্ক রাখেন নি। তিনি প্রতিবাদ করে বলেছিলেন : 'এই চুক্তিতে ইনসাফ নেই, এই চুক্তিতে ফিলিস্তিনী পরিচয়ের ন্যুনতম অনুভূতি এবং তার ভৌগলিক অবস্থানের প্রতি কোনো ল্য রাখা হয় নি। এই চুক্তি ফিলিস্তিনীদের একটি যাযাবর জাতিতে পরিণত করবে।' তারপরও দারউইশ আরাফাতকে ভালবাসতেন। আরাফাতের মৃত্যুর পর এক সাক্ষাতকারে দারউইশ বলেছিলেন : 'পৃথিবীর কানে যারা 'ফিলিস্তিন' শব্দটি তুলেছেন আরাফাত তাদের অন্যতম। আরাফাত তার জীবনকে এর জন্য উৎসর্গ করে দিয়ে ছিলেন। আরাফাত কখনো নিজের জন্য বাঁচেন নি্ত আমি চাই আমার স্মৃতিতে আরাফাতের এই চিত্রটি জেগে থাক । আরাফাতকে আমরা খুব মিস করি কিন্তু আমরা আর কোনো আরাফাত চাইনা...'

দারউইশ ফিলিস্তিনী মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে মাঠে ছিলেন। তবে তিনি লড়েছেন ভাষা কবিতা দিয়ে। এই সময় দারউইশের কবিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বদল ঘটে। তিনি, তার এর পূর্বেকার কবিতায় যে কাব্যিক জটিলতা ছিল তা থেকে ফিরে আসেন। তিনি দেখতে পান তার এই ধরণের কবিতাগুলো সাধারণ মানুষ-যোদ্ধারা বুঝতে পারে না। দারউইশ কবিতা লিখতে শুরু করলেন সরল ভাষায়, সহজ করে, যা বুঝতে পারে সাধারণ মানুষ, উদ্দীপ্ত করে সাধারণ মুক্তিসংগ্রামীদের। এই সংকলনের চোদ্দটি কবিতার তেরোটিই এই সময়, মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে অবস্থান কালে, লেখা।

নানা দেশ ঘুরে ১৯৯৪ সালে দারউইশ ফিলিস্তিনের রামাল্লায় ফিরে আসেন এবং ইসরায়েলী সৈন্যরা তাকে গৃহাবোরোধ করে রাখে। অবরোধ কালে দারউইশ নিরন্তর লিখেছেন, ইসরায়েলী সৈন্যদের বিরুদ্ধে লড়েছেন ভাষা-কবিতা দিয়ে। ২০০২ এর মার্চে বিখ্যাত কবি সাহিত্যিকদের একটি দল গৃহবন্দী দারউইশের সাথে সাক্ষাত করতে রামাল্লায় গিয়েছিলেন।

দারউইশ কবিতাকে গ্রহণ করেছিলেন শিশুকালেই। স্কুল জীবনে তিনি কাসিক আরবী কবিতার সবটুকু পড়ে ফেলেছিলেন। দারউইশ জীবনে প্রথম কবিতা পাঠ করেন নতুন ইসরায়েলী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রথম উদযাপন অনুষ্ঠানে। দারউইশ তখন স্কুলের ছাত্র। প্রধান শিকের নির্দেশে দারউইশ স্বরচিত কবিতা পাঠ করেছিলেন। তিনি বলেন 'সেখানেই জীবনের প্রথম বারের মত আমি মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে কবিতা পাঠ করি। কবিতাটি ছিল এক ইহুদী বালকের প্রতি এক ফিলিস্তিনী বালকের আর্তনাদপূর্ণ আহ্বান। পুরো কবিতাটি আজ আর মনে নেই। তবে তার মূল ভাবনাটি ছিল এই : 'তুমি চাইলেই সোনালি রোদে খেলা করতে পার, তুমি চাইলেই পাও উজ্জ্বল পুতুল, কিন্তু আমার তা নেই। তোমার আছে ঘর, আমার কিছুই নেই। তোমার আছে উৎসব আর উদযাপন, কিন্তু আমি তার দেখা পাইনা। বল কেন আমরা একসাথে খেলতে পারি না? পরদিন ইসরায়েলী সামরিক সরকারের লোকেরা তাকে ডেকে নিয়ে শাসায়। তাকে বলা হয় 'যদি আর এই ধরণের কবিতা লেখ তো তোমার বাবার কাজ করতে যাওয়া বন্ধ করে দেয়া হবে।' দারউইশ লিখেছেন 'আমি বুঝতে পারিনি একটি কবিতা কেন এই সামরিক সরকারকে এমন ব্যতিব্যস্ত করে তুলল। সেই ছিল প্রথম ইহুদী সন্তান, যার সাথে আমার দেখা এবং কথাবার্তা। আমি খুব হতাশ হয়ে পড়ি, এই যদি হয় তাহলে ইহুদী বালকের সাথে কথা বলে আর কি লাভ হবে?'

লেনিন সাহিত্য পুরষ্কারসহ দারউইশ তার কাব্যকীর্তির জন্য অনেক পুরষ্কার পেয়েছেন। তবে তার সবচেয়ে বড় পুরষ্কার তার প্রতি ফিলিস্তিনীদের ভালবাসা। দারউইশ প্রধানত কবিতা লিখেছেন, লিখেছেন নিরবধি। বিপুল তার আলোচনা।

মাহমুদ দারউইশের পাঁচটি কবিতা

শেষ আকাশের পর

এই দুনিয়ায় আমাদের কোন জায়গা নেই এবং আমাদের হাশর-নশর হবে পথের শেষ প্রান্তে
সংকীর্ণ পথটা পার হওয়ার জন্য আমরা তখন খুলে ফেলব আমাদের হাত-পা
দুনিয়াটা আমাদের নিংড়াচ্ছে
আহা ! আমারা যদি হতাম পৃথিবীর গমদানা !
মৃত্যুর পর আবার জন্মাতাম বারবার,
দুনিয়াটা যদি হত আমাদের মা_ মমতাময়ী কোনো মা !
যদি আমরা হতাম পাথরের গায়ে আঁকা ছবি, একদিন যা বেড়ে ওঠবে আমাদের স্বপ্নের গর্ভে !

আয়না
- ওদের মুখগুলো চিনে রাখছি আমরা, প্রাণ রার শেষ লড়াইয়ে যাদের খুন করবে
আমাদের শেষ ব্যক্তিটি
আমরা কেঁদেছি তাদের শিশুদের উৎসবে
চিনে রাখছি সেই মানুষদের,
শেষ প্রান্তের জানালা দিয়ে যারা ছুড়ে ফেলে দিবে আমাদের শিশুদের
আর এই সব আয়নাগুলোকে ঝুলিয়ে রাখবে আমাদের নত্র।

শেষ প্রান্তগুলো পার হয়ে যাওয়ার পর কোথায় যাব আমরা ?
শেষ আকাশের পর কেথায় উড়বে চড়ুইরা ?
শেষ বাতাস বয়ে যাওয়ার পর কোথায় ঘুমাবে গাছেরা ?
লাল ধুঁয়া দিয়ে আমরা লিখে দিব আমাদের নাম
আমাদের মাংসে আবার ভরে উঠব্তেতাই কেটে দিব সংগীতের হাত
এখানে আমরা মারা যাব, এখানে... পথের শেষ প্রান্তে ...
এখানে, কিংবা এখানে, আমাদের খুন বুনে দিবে জলপাই গাছ।


যখন শহীদরা ঘুমাতে যাবে

শহীদরা ঘুমাতে যাবে যখন, আমি তাদের পাহারা দিব
প্রফেশ্যানাল রুদালীরা যেন ওদের ঘুম বিঘি্নত করতে না পারে
ওদের বলব : তোমরা জেগে ওঠবে মেঘ-গাছ এবং বালি-মাটির এক মাতৃভূমিতে।
খোদার শুকরিয়া, এখন ওদের আর কোনো ভয় নেই, ওরা নিরাপদ,
ও'রা আর কখনো অবিশ্বাস্য কোনো ঘটনা হবে না, বা কসাইখানার সারপ্লাসভ্যালু।
আমি কিছু সময় চুরি করি, ওরা যাতে আমাকে
সময়ের কাছ থেকে চুরি করে নিতে পারে। আমরা সবাই কি শহীদ ?
কানে কানে বলব : বন্ধুরা ! কাপড় শুকানোর দড়ির জন্য একটা দেয়াল রেখে যাও
আর গানের জন্য একটি রাত।
কথা দিচ্ছি, আমি তোমাদের নামগুলো টানিয়ে রাখব, যেখানে তোমরা চাও।
এখন টক আঙ্গুরের মইয়ের উপর ঘুমিয়ে থাক কিছুণ
আমি পাহারা দিব তোমাদের স্বপ্নগুলো,
তোমাদের দেহরীদের ছোরা এবং মাথা নিচে দিয়ে থাকা আসমানী কেতাবগুলো থেকে।
যার কোনো গান নেই, তোমরা হও তার গান, এই সন্ধ্যায় যখন তোমরা ঘুমাতে যাবে
শোন ! তোমরা জেগে ওঠবে মাতৃভূমির মাটিতে,
যাকে ওরা চড়িয়ে দিয়েছে এক পাগলা ঘোড়ার পিঠে
ওদের কানে কানে বলব : বন্ধু ! তোমরা আর হবে না আমাদের মত
... প্রতিদিন সকালে আমরা জেগে ওঠি অজানা এক মঞ্চের ফাসির রজ্জু হয়ে।

ওরা আমার মরণ কামনা করে

ওরা সবসময় আমার মরণ কামনা করে। কারণ আমি মরলেই তারা বলতে পারবে : ওতো আমাদেরই একজন ছিল, আমাদের পরে লোক।
আমি সেই পদধ্বনিগুলো শুনছি। বিশ বছর ধরে ওরা রাতের দেয়ালে করাঘাত করছে। ওরা আসে কিন্তু দরজা খুলে না। তবে আজ তারা ভিতরে ঢুকবে। ওদের মধ্যে থেকে তিনজন এগিয়ে আসবে : একজন কবি, একজন খুনী আর একজন পাঠক। ্ত'তোমরা মদ পান করবে?' আমি জিজ্ঞেস করলাম। 'অবশ্যই' তারা বলল। 'কখন তোমরা আমাকে গুলি করবে?' আমি জিজ্ঞেস করলাম। তারা উত্তর দিল 'একটু অপো কর'। তারা পানপাত্রগুলো সাজিয়ে রেখে জাতীয় সংগীত গাইতে শুরু করল। আমি বললাম 'আমাকে কখন খুন করতে শুরু করবে?' তারা বলল 'শুরু করে দিয়েছি তো!' ... 'তুমি আত্মাকে জুতো দিলে কেন?' 'যেন সে মাটিতে হাঁটা-হাঁটি করতে পারে' আমি বললাম। তারা বলল 'তুমি কেন সাদা কবিতা লিখেছ, মাটি তো কালো !'। আমি উত্তর দিলাম 'কারণ ত্রিশটি সমুদ্র বয়ে গেছে আমার হৃদয়ের উপর দিয়ে।' তারা বলল 'তুমি কেন ফরাসী ওয়াইন পছন্দ কর?' আমি বললাম 'কারণ সবচেয়ে রূপসী নারীটি আমার অধিকারেই আসা উচিৎ...' তুমি কেমন মৃত্যু চাও?' 'নীল, ছাদ থেকে চুয়ে চুয়ে পড়া নত্রের মত।' 'তোমরা আরো মদ চাও?' তারা বলল : 'অবশ্যই'। আমি বললাম : তোমাদের কাছে আমার একটি অনুরোধ, তোমরা আমাকে খুন কর ধীরে.. ধীরে.. ধীরে-ধীরে, আমি লিখব আমার শেষ কবিতাটি, আমার হৃদয়ের বধূর উদ্দেশ্যে। কিন্তু তারা হেসে উঠবে। ওরা ঘর থেকে আর কিছুই নিবে না। চুরি করে নিবে সেই শব্দগুলো আমি যা বলব আমার হৃদয়ের বউকে...।

বিনামূল্যের মৃত্যু

আমার মাংসে শরৎ আসে কমলার লাশের মত
বালি মাখা এবং পাথরের আঘাতে টেপখাওয়া তামার চাঁদের মত
এবং পুরুষ হৃদপিণ্ডের মত আমার বুকে ঝড়ে পরে শিশুরা
আহারে ! আমার চোখের কপালেই পড়ল পৃথিবীর সব জমাটবদ্ধতা... সব কিছু বলা যায় না...
তাজা রক্তমাখা উত্তলিত হাতগুলো আমাকে ডাকে : আস !
আরো উপরে ওঠে যাও, মেহদী পরা সূর্যের চিবুক পর্যন্ত
আর তোমাদের মরাদের কবর দিও না... তারা থাক আলোর মিনার হয়ে
আমার গলা কাটা রক্তগুলোকে এভাবেই থাকতে দাও...
এই তাজা রক্ত বিদ্রোহীদের গোধূলী বেলার কথা মনে করিয়ে দিবে
শূন্য প্রান্তের বুকে বসে থাকা সবুজ পাহাড়ের প্রতিপ হয়ে থাকবে
আর কবিদের বল না আগাছার বাচ্চাদের মৃতু্যগাঁথা গাইতে।
শৈশবের সবচেয়ে বড় গুণটা কি জান ?
- শৈশব সবসময় গোত্রের নিরাপত্বার জন্য হুমকি হয়ে থাকে,
আমি তাদের বলি রক্ত আর জুলুমের বুকের দুধ খেয়ে বেড়ে ওঠা এক নতুন ইতিহাসের কথা
শাবাশ জল্লাদ ! শাবাশ !
সুরমাচোখা কিশোরীটাকে খুন করে ও তার বেণীর গরম চাদরটা ছিনিয়ে নেয়
মারহাবা ! মারহাবা গ্রাম বিজয়ী... মারহাবা শৈশবখুনী !
হে নিষ্ঠুর কুফুরী ! ... কবরের কপালে আছে শুধু শেকল বাঁধা হাত
আর অনেক গভীরে চলে যাবে আমার আর এতীমদের চারার শেকড়গুলো
আমাদের চারা... আমরা যারা এখনো বেঁচে আছি ...
হে উত্তলিত বাহু ! আমাদের গান গাওয়া শেখাও
আমরা যারা এখনো বেঁচে আছি ... শেকল আর দু:খ মুক্ত স্বাধীন আলো ও শব্দের মত
হে নিষ্ঠুর কুফুরী !
কবরের কপালে আছে শুধু কড়া পরা হাত... !

এই ধরনের গানে

এই ধরনের গান দিয়েই কি কোনো নাইটের বুকের উপর স্বপ্ন বিছিয়ে দিব?
আর ছিনিয়ে নিব তার শেষ শার্টটা, বিজয়ের স্মারক এবং শেষ দুয়ারের চাবি ?
যাতে আমরা প্রথম সমুদ্রে ঢুকতে পারি ?
তোমাকে সালাম হে পথিক ! যে তুমি ঘর ভালবাস, যে তোমার কোনো বাড়ি নাই
সালাম তোমার পদযুগলে/রাখালরা নিশ্চই বালির উপরে তোমার চোখের অশ্রুর চিহ্ন খুজে পাবে না,
সালাম তোমার দুই বাহুতে/এখান থেকেই আবার উড়বে কাতা পাখীরা
সালাম তোমার দুই ঠোঁটের উপর/নামাজ আবার রুকু দিবে শস্যক্ষেতের উপর
কি বলব আমরা তোমার চোখের অঙ্গারকে ?
তুমিহীনতা কি বলবে তোমার মাকে ?
- ও কূপে ঘুমিয়ে আছে ?
কি বলবে যোদ্ধারা ?
- আগষ্ট মাসে আমরা শব্দের মেঘ জয় করেছি ?
জীবন কি বলবে মাহমুদ দরবেশকে ? - জন্মেছ.. প্রেম করেছ.. অনেক কিছু জেনেছ
এবং যাদের তুমি ভালবাসবে তারা সবাই নিহত হয়েছে ?
এই ধরনের কোনো গানের বুকেই কি স্বপ্ন বিছিয়ে দিব, বিজয় সাজ আর শেষ দুয়ারের চাবি নিয়ে বের হব,
চিরদিনের জন্য আমাদের কানের উপর এই গানের দুয়ার বন্ধ করে দেওয়ার জন্য ?
কিন্তু আমরা আবার জন্ম নিব .. বেঁচে উঠব.. কারণ জীবনের একমাত্র অর্থ জীবন।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bishoyvabna/28830430 http://www.somewhereinblog.net/blog/bishoyvabna/28830430 2008-08-13 14:08:16
৩৬ নং ওয়ার্ড মুহাম্মাদ যাফযাফ
অনুবাদ : ফয়সাল বিন খালিদ


আমি তোমার সাথে মিথ্যে বলব না। কারণ আমার বাবা আমাকে মিথ্যে বলা শেখাননি। কাউকে নিজের সাথে বা অন্যের সাথে মিথ্যে বলা না শিখিয়েই তিনি মারা গেছেন। আমার দাদাও মিথ্যে বলা জানতেন না।
দাদা ছিলেন নিরীহ এক বৃদ্ধ। সবসময় চুপচাপ থাকতেন এবং গাছতলায় বসে তামাক ফুকতেন। সেই গাছটা এখনো আছে আমাদের বাড়ির উঠোনে, মানে সন্যাসিনীদের স্কুলের উঠোনে। দাদা সেই স্কুলে দারোওয়ানের কাজ করতেন। দাদার বয়স হয়ে গেলে আমার বাবা সেই স্কুলে দারোওয়ানীর কাজ নিয়ে ছিলেন। মানে তিনি দাদার স্থান নিয়ে ছিলেন। আমি এখন সেই স্কুলেরই একটা ঘরে থাকি।
আমি ফরাসীতে কথা বলছি বলে রাগ কর না। আমি আরবী পড়তে পারি। তবে ছোটবেলা থেকেই আমি ফরাসীতে কথাবার্তা বলে অভ্যস্ত। কারণ আমি সন্যাসিনীদের স্কুলে বড় হয়েছি। এটা ঠিক যে তারা ভাল আরবী জানে। কিন্তু সাধারণত তারা ফরাসীতে কথা বলে। মাঝে মাঝে তারা অন্য আরেকটা ভাষায় আলাপালোচনা করে। আমার ধারণা সেটা ল্যটিন ভাষা। না বরং আমি নিশ্চিত সেই অন্য ভাষাটা ল্যাটিন ভাষা। তোমাকে তো বলেছি আমি ওখানের একটা ঘরে থাকি। তবে আমি একা থাকি না। তোমার সাথে মিথ্যা বলব না, আমি আমার মায়ের সঙ্গে থাকি। আমার একজন বিবাহিত ভাই আছে। ও মাঝে মাঝে আমাদের বাসায় আসে। তবে একা। কারণ অমার মা তার বউকে পছন্দ করে না। আমি আর ভাই সারা দিন সেই গাছতলায় খেলা করতাম। গ্রীস্মকাল এলে গাছতলায় পাটি বিছিয়ে সারা দিন সেখানেই পড়ে থাকতাম। এবং মাঝে মাঝে হাশীশ ফুকতাম। বিশ্বাস কর, এই সবই, এর বেশী কিছু ঘটে নি।

আমার ভাই আমার ছেলে বন্ধুর মত, এটা বলতে আমার লজ্জা করে না। আমার দাদা ও বাবাও গাছতলায় বসে তামাক খেতেন। দাদা আরেকটা অদ্ভুত কাজ করতেন। তিনি সেই গাছটার গড়ায় কিছু মিছরী পুতে রেখেছিলেন। এবং সবসময় তিনি তাতে পানি দিতেন। দাদা মারা গেলে বাবা সেই কাজটা করতে লাগলেন। এবং বাবার মৃত্যুর পর থেকে আমি সেই কাজটা করে যাচ্ছি। আমার অনুরোধ তুমি একদিন আমাদের বাড়িতে, অর্থাৎ সন্যাসীনিদের স্কুলে গিয়ে সেই গাছটা দেখে আসবে, যার নিচে আমি প্রতি সপ্তায় একবার এক টুকরো মিছরী পুতি এবং তাতে নিয়মিত পানি দেই। আমি জানি না কেন আমি এই কাজট করি। পূর্বপুরুষের প্রথা। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, আমাদের পূর্বপুরুষরা আমাদের থেকে অনেক ভাল ছিলেন এবং তারা আমাদের চেয়ে অনেক বেশী জানতেন এবং ভাল বুঝতেন। তবে এটাও সত্য যে, তারা অনেক খুনোখুনি করতেন। সন্যাসিনী স্কুলের পাঠাগারের বই পড়ে আমি এটা জানতে পেরেছি। পৃথিবীতে অনেক যুদ্ধ হয়ে গেছে। তবে যারা খুনোখুনি করেছে, যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে আর যারা করেনি, সবাই মারা গিয়েছে। তুমি নিশ্চয় জান, আমাদের গায়ে যদি একটি গুলিও না লাগে এবং কেউ বুকে ছুড়িও না বসায় তবুও আমরা সবাই একদিন মারা যাব। আমরা সবাই মারা যাব। তুমি এই ব্যাপারে নিশ্চিত থাক, আমি তোমার সাথে মিথ্যে বলছি না। কারণ আমি আমার বাবার কাছ থেকে মিথ্যে বলা শিখিনি, আমার বাবা আমার দাদার কাছ থেকে মিথ্যে বলতে শিখেননি এবং আমার দাদা তার দাদার কাছ থেকে যে জিনিসটা শেখেননি তা হল, এই জীবনে মিথ্যে বলার লোকের অভাব নেই। তবে আমি সেই দলের কেউ নই। তার প্রমাণ গতকাল আমি তোমাকে বলেছি যে, আমি আমার বাইসাইকেলটা বিক্রি করে দিয়ে দেরীতে বিয়ে হওয়া আমার এক বান্ধবীর জন্য সোনার চুড়ি কিনেছি। সাইকেল বিক্রির কিছু টাকা এখনো রয়ে গেছে। তা দিয়ে দুই বোতল মদ কিনে আমি আর তুমি এক সাথে মাতাল হব। তবে আমি মাতলামো করা পছন্দ করি না। আমি শুধু পান করতে পছন্দ করি, বিশেষত তোমার মত মানুষের সাথে। লোকে বলে ইসলাম ধর্মে নাকি মদ হারাম। কিন্তু সবাই তো দেখি মদ খাচ্ছে।

সান্যাসিনীদের সাথে থেকে থেকে আমার মদের অভ্যাসটা হয়েছে। তারা প্রচুর পান করে। তবে তারা কখনো মাতলামো করে না। তুমি নিজেই দেখে থাকবে মুসলমান ভদ্র মহিলারা মদ পান করে, মাতাল হয়ে, গ্লাস-বোতল বেঙ্গে চেয়ার-টেবিল উলটে সব এলোমেলো করে, খিস্তিখেউড়-ঝগড়াঝাটি করে কি কাণ্ডটাই না করে। নিশ্চিত থাক, আমি তাদের মত নই, আমার পক্ষে এমন কিছু করা কোন ভাবেই সম্ভব নয়। মাতাল হয়ে তারা তো তাদের বন্ধুদের সাথেও ঝগড়া করে। আমার বন্ধু তুমি এবং তোমার সাথে ঝগড়ার কথা কখনো আমার কল্পনাতে আসবে না। তাছাড়া আমি তো সর্বক্ষণ তোমার পাশেই আছি। এটা ঠিক যে, এখন আমি সেই অসুস্থ ছেলেটার দেখাশোনা করছি। কিন্তু আমার কাছে তোমার গুরুত্ব অনেক বেশী_ খোলামেলাই বলছি। তোমার আর তার মাঝে অনেক পার্থক্য।

ও খুব ভাল ছেলে। তবে বোকা। আমি তাকে দেখাশোনা করা বাবদ মাসে মাসে একটা সম্মাজনক মাইনে পাই এবং আমি ভাল করেই জানি, তার অসুস্থতার কারণ তার বাবা-মায়ের সেপারেইশান। তার বাবা নামকরা সার্জন ডাক্তার। এখন ফ্রান্সে আছেন। কিন্তু তার মা এখনো মরোক্কেতেই আছেন এবং বাপ-দাদার আত্মার কিড়ে কেটে বলেছেন তিনি কখনো ফ্রান্সে যাবেন না। তিনি একটি স্কুলে চাকরি করেন। তার অনেক বন্ধুবান্ধব। এত যে আমি তাদের সবার নাম-চেহারা মনে রাখতে পারি না। তারা প্রচুর পান করে। মনে হয় ওই বাড়িটা যেন হুইস্কির খনি। এই সব তো তুমি আমার চেয়ে ভাল জান। তার ছেলেটা এখন ড্রাগ নেওয়া বন্ধ করেছে। এখন আর ও ঘুমাপাড়ানি ইঞ্জেকশান নিচ্ছে না। তবে ও যখন বেশী পাগলামো শুরু করে, আবোলতাবোল প্রলাপ বকতে থাকে তখন তাকে শান্ত করার জন্য আমি একটা ঘুমপাড়ানি ইঞ্জেকশান দেই : নিজ হাতে তার মুখে ঔষধ তুলে দেই, দীর্ঘক্ষণ ধরে তাকে চুমো দেই এবং ও ধীরে ধীরে আমার কোলে ঘুমিয়ে পড়ে। তুমি আবার ভেবে বস না যে, আমার সাথে তার সেই ধরনের কোন সম্পর্ক আছে। ছেলেটার বয়স উনিশ এবং তার একজন ইহুদী বান্ধবী আছে। আমি শুধু তাকে শান্ত করার জন্য মাঝে মাঝে তাকে চুমো খাই। মানুষের পক্ষে কল্পনা করা সম্ভব, তার সাথে আমার এমন কোন সম্পর্ক নেই। তবে তুমি জান মানুষের কল্পনা শক্তি অসীম। সে অন্যদের সম্পর্কে এবং নিজের সম্পর্কে সব কিছুই কল্পনা করতে পারে। উদাহরণত : মাঝে মাঝে আমি কল্পনা করি আমি এই ছেলেটার মা এবং ভুলে থাকি আমার একমাত্র সন্তানের কথা, যাকে নিয়ে তার বাবা বিদেশ চলে গেছে। মোটকথা আমার ছেলে এখন তার বাবার সাথে অন্য কোন দেশে আছে এবং ওই দেশে সম্ভবত এমন অনেক কিছু পাওয়া যায় যা এই দেশে নেই। ভেব না যে, এই সব হচ্ছে মাতালের প্রলাপ। কারণ তুমি জান প্রচুর পান করেও আমি মাতাল হই না। আমি তোমাকে আমার জীবনের বাস্তবতাগুলো বলছি। এগুলো যখন আমার জীবনের বাস্তব সত্য তখন সেগুলো লুকিয়ে রেখে কী লাভ। মানুষ তাদের এই সব বিষয়গুলো গোপন করে রাখে। বাদ দাও মানুষের কথা, তারা যা ইচ্ছে তা করুক। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তোমাকে ছাড়া আমার আর অন্য কোন ইচ্ছে নেই। আমি তোমার সাথে মিথ্যে বলব না। আমার বাবা আমাকে মিথ্যে বলা শেখান নি। খুব বকবক করছি তাই না ? বিরক্ত হয়ো না। সারা দিন একটা অসুস্থ ছেলের প্রলাপ শুনি। হতে পারে তারই প্রতিক্রিয়া। তুমিই তো একদিন বলেছিলে, এই জীবনকে গ্রহণ ও সহ্য করার জন্য আমাদেরকে অনেক উদার দিল হতে হবে, কারণ নিজেদের পছন্দ ও ইচ্ছা অনুসারে আমরা এই জীবনে আসতে পারেনি। মনে আছে তোমার ? নিশ্চয় ! কারণ তুমি কোন কিছুই ভুল না। এই কারণেই আমি তোমাকে এত পছন্দ করি। আমি তোমাকে শিখিয়ে দিব কিভাবে গাছতলায় হাশীশ (গাজা) পুততে হয় তারপর আমরা এক সাথে প্রতি দিন সন্ধ্যায় তাতে পানি দিব, যেমন করতেন আমার দাদা ও বাবা। সম্ভবত তাদের পূর্বেও অন্যরা এই কাজটা করেছে। সেই কথাটা আমি আবার বলতে চাই না যে, আমাদের উচিৎ পূর্বপুরুষদের মেনে চলা, তারা মহা বিজ্ঞ বা নির্বোধ যাই হোন। তুমি ভালোবাসা শব্দটা শুনতে পার না, আমি তোমাকে ভাল করেই বুঝি। তারপরও বলছি, আমি তোমাকে ভালোবাসি। তুমি নিশ্চই জান ভালোবাসা আর মায়া এক জিনিস নয়। সেই ছেলেটার জন্য আমার খুব মায়া হয়, যেমন মায়া লাগে তার মায়ের জন্য, যে মদে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে চাইছে। মাঝে মাঝে আমি ভাবি কেন তিনি এমন করছেন, তিলে তিলে আত্মহত্যা করছেন। তারা তাকে কতবার হাসপাতালে ভর্তি করল। কিন্তু ফিরে এসে আবার মদ ধরলেন। কিন্তু তার ছেলে এখন আর নিজে ড্রাগ নিচ্ছে না। তবে আমি তো তোমাকে বলেছি, আমি তাকে ঔষধ খাওয়াই, তার গালে কপালে চুমো দেই এবং দুধের শিশুর মত বুকে নিয়ে ঘুম পড়াই। ওর জন্য আমার খুব মায়া হয়। কারণ আমি নিজেও একদিন ওই অবস্থায় পড়েছিলাম, যখন আমার স্বামী আমাকে ফেলে আমার একমাত্র সন্তানটাকে নিয়ে বিদেশ চলে যায়। তারা আমাকে মানসিক হাসপাতাল ভর্তি করে দিল। ৩৬ নং ওয়ার্ডে শুয়ে আমি শুনলাম ডাক্তার নার্সকে বলছেন, আমার রোগটার নাম হচ্ছে সাইকোসিস। এই রোগ সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না। আমি শুধু একটা তীব্র বেদনা বোধ করছিলাম। যে আমাকে বুঝতে পারে না, আমি কখনো এমন মানুষকে সহ্য করতে পারি না, সে ক্ষেত্রে ভুল আমার হলেও না। তুমি বলতে পার এটা আমার এক ধরনের স্বার্থপরতা। হতে পারে। কিন্তু শেষ বিচারে মানুষের স্বভাব-প্রকৃতির দায় তো আর মানুষের ঘাড়ে পড়ে না। তাই না ? তুমি একদিন আমাকে বলেছেলে যে, জগতে এমন অনেক কিছু আছে যা আমরা বুঝতে পারি না। কারণ তা আমার বুদ্ধির ক্ষমতার ঊর্ধ্বের বিষয়। সুতরাং, কোন ভুল করে আমি যদি ভাবি যে, অন্যদের তা মেনে নিতে হবে তাহলে, তুমি আমাকে স্বার্থপর বলতে পার না। কারণ এটা আমার স্বভাব এবং আমার বুদ্ধি-ঊর্ধ্ব বিষয়। তেমনি যে জিনিসটা সেই তরুণ ও তার মাকে ড্রাগ নিতে বাধ্য করেছে, তা তাদের ক্ষমতার সীমার বাইরের জিনিস। আমি সেটা বুঝতে পারি, তোমার কাছ থেকেই শিখেছি। তাই আমি তোমাকে যতটুকো ভালোবাসি, সেই ছেলেটার প্রতি ততটুকো মায়া বোধ করি।

আমি আমার স্বামীকে ভালোবেসে ছিলাম। কিন্তু দেখ সে আমার সাথে কি আচরণটা করল। কোন নরীর পক্ষে তোমাদের পুরুষদেরকে_সরি ওই সব পুরুষদেরকে_ বিশ্বাস করা সম্ভব নয়। যেই নারী পুরুষকে বিশ্বাস করতে শুরু করে, তার উপর নির্ভর করে, ওমনি সে ফুলে ওঠে রোমান মোরগ কিংবা ... ময়ূরের মত। বলছ এর বিপরীতও ঘটে ? ঠিক, আমি তোমার সাথে এক মত। পুরুষের ক্ষেত্রে যা প্রযোজ্য নারীর বেলাতেও তা খাটতে পারে। সেই সন্যাসিনী স্কুলের বাগানে একটি বিড়াল ও একটি বিড়ালনী ছিল। তারা সবসময় এক সাথে থাকত। কিন্তু একদিন দেখলাম কোত্থেকে জানি আরেকটা বিড়ালনী এসে উপস্থিত। সম্ভবত তা লোহার প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে ওপার থেকে এসেছিল। বিড়ালটা এই নতুন বিড়ালনীর প্রেমে পড়ে গেল ? বিড়ালদেরও কি প্রেম-ভালোবাসা আছে ? তুমি বলছ, হা.. তাই হবে তাহলে। আমি তোমার সব কথার সাথে এক মত। তারপর কয়েক দিন সেই বিড়ালনীটা আর কিছু খেল না, সারাদিন মেউ মেউ করে এদিক ওদিক ঘুড়ে বেড়াল এবং শুকিয়ে গিয়ে এক দিন মারা গেল। সুবহানাল্লাহ ! কিন্তু আমার সন্তান ছিনিয়ে নেওয়ার পরও আমি মারা যাইনি। আমিও খানাপিনা ছেড়ে দিয়েছিলাম, সারাদিন কাঁদতাম, বিড়ালের মেউ মেউ শুনলে ব্যাকুল হয়ে ছুটি যেতাম। কিন্তু তোমার সাথে দেখা হওয়ার পর সব ভুলে গেলাম।

এই সব তো তোমাকে আগেও বলেছি। এই ছেলেটার জন্য আমার খুব মায়া লাগে। কারণ ও এখন যে অবস্থায় আছে আমি যে অবস্থাটা পার হয়ে এসেছি। তবে তার মা এখনো মাতাল হয়ে যাচ্ছে এবং কেঁদে যাচ্ছে অবিরাম। যা ঘটেছে তিনি তা ভুলার চেষ্টা করছেন না। হয়ত তিনি কিছু ভুল করেছেন, হতে পারে অন্যরা তার উপর কিছু অন্যায় করেছে। কিন্তু তিনি সেই সব ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করেননি। কি বলছ ? আমি তোমার কথা ঠিক শুনতে পাই নি ! ওহ !! খোদ জীবনটাই একটা ভুল ? কে করলেন এই ভুলটা ? মাঝে মাঝে আমি তোমার কথা বুঝতে পারি না। যেমন তুমি বল অনেক মানুষ এমন আছে, যাদের জন্মটা মূলত একটা ভুলের ফল। আশা করি আমি তেমন কেউ নই। তার প্রমাণ আমি এখন সেই অসুস্থ ছেলেটার দেখাশোনা করছি। আমি যদি না জন্মাতাম তাহলে কে তার দেখাশোনা করত ? ডাক্তাররা জন্ম না নিলে কে তার ও তার মায়ের চিকিৎসা করত ? তুমি মাঝে মাঝে বল, কিছু কিছু মানুষ জন্মগ্রহণ করে অন্যদের ভুলগুলো শোধরাবার জন্য। এই কথাটা আমি ভাল বুঝতে পারি। কিন্তু আবার তুমিই দেখি জোর দিয়ে বল যে, গোটা জীবনটাই একটা মস্ত ভুল। তোমার কথা শুনতেই আমার ভাল লাগে, যখন আমি তোমার কথাগুলো বুঝতে পারি না তখনও। যা কিছু বলা হচ্ছে তার সব বুঝতে হবে এমন তো কোন কথা নাই এবং অনেক দুর্বোধ্য কথাও সুন্দর হতে পারে। যেমন তোমার দুর্বোধ্য কথাগুলো। তোমার কথাগুলো সুন্দর। কারণ তুমি তা শোন তোমার ভালাবাসার মানুষের কাছ থেকে। যাকে আমরা পছন্দ করি তার সে সব কথাও আমরা বুঝতে পারি যা বুঝা সম্ভব নয়, অন্তত তার কথাগুলো আমাদের কাছে সুন্দর এবং যুক্তিসঙ্গত মনে হয়, আমরা ব্যাখ্যা করে তার অর্থ বের করার চেষ্টা করি এবং তা যেমনই হোক তাতে অনেক সত্য খুঁজে পাই। উদাহরণত : তোমার অনেক কথা আমার কাছে দুর্বোধ্য ঠেকে, কিন্তু আমি তোমাকে বুঝতে পারি। তাই আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমি যে মাঝে মাঝে কাঁদি সেটা শুনে রাগারাগি কর না। ঝাপসা কিছু স্মৃতি মাঝে মাঝে আমাকে কাঁদায়। কখনো কখনো আবার বিনা কারণে কাঁদি। এটা অস্বাভাবিক আচরণ ? কিন্তু তুমিই তো একদিন বলেছ এই জীবনে অস্বাভাবিক বলে কিছু নেই। তোমার পূর্বে অনেক পুরুষের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে এবং একসময় যে তাদের সাথে আমার সম্পর্ক হয়েছিল, সেটা মনে পড়লে আমি কুকড়ে যাই। কারণ তারা আমার কোন কথা শুনত না। বরং তারা একই কথা বার বার বলে যেত। যেমন 'বার নয়, তোমার উপযুক্ত জায়গা দার (ঘর)'। পুরুষগুলো সবাই কেন এত নিখুঁতভাবে একই রকম ? কেন তুমি ব্যতিক্রম ? বলছ, সেটা আল্লাহর ইচ্ছা ? কিন্তু আল্লাহ কেন এক জনের জন্য যেটা ইচ্ছা করেন অন্যদের জন্য সেটা করেন না ? এটা নাস্তিক মার্কা কথা ? না.. না.. আমি নাস্তিক নই। আমি শুধু বিষয়টা বুঝতে চাইছি। আমি নাস্তিক নই সেই ব্যাপারে যাতে নিশ্চিত হতে পার তাই বলছি, আমি ঠিক করেছি শেষ জীবনে আমি একবার হজ্ব করতে যাব। নিশ্চই আল্লাহ তখন আমার সব পাপ মাপ করে দিবেন !! তাই না ? বলছ আমরা সবাই আসলে পাপী ? কিন্তু সম্ভবত আমি প্রায় নিষ্পাপ। আমি তো তেমন কোন পাপ করেনি। এমনকি তারা যখন আমাকে ৩৬ নং ওয়ার্ডে রেখে এল তখনও আমি বুঝতে পারিনি তারা কেন আমাকে এখানে নিয়ে এল। তারা অন্য কাউকে নিয়ে আসতে পারত যার আসলেই সেই সব ঘুমপাড়ানি ইঞ্জেকশানগুলো দরকার। তবে স্বীকার করতে হবে তখন আমারও ঘুমপাড়ানি ইঞ্জেকশানগুলোর দরকার ছিল। সেগুলো গায়ে ঢুকার পর আমার খুব আরাম লাগত। মনে আছে সেই সময় আমি একবার ফেরেশতা দেখেছিলাম। তুমি কি কখনো ফেরেশতা দেখেছ ? কি বললে ? বরং তুমি শয়তান দেখেছ, মানুষের বেশে ?! আল্লাহ মাফ করুক !! কি বলছ এই সব। আল্লাহ হেফাজত করুক, আমি কখনো শয়তান দেখতে চাই না, মানুষের রূপে হলেও না। তবে শয়তান বলে তুমি কি বুঝাতে চাইছ মনে হচ্ছে আমি সেটা বুঝতে পেরেছি। কারণ আমি দেখেছি সেই ছেলেটা ও তার মা মাঝে মাঝে খালী ঘরে একা একা বলতে থাকে 'যাও.. যাও !! আমাকে একা থাকতে দাও' তখন আসলে তাদের সাথে শয়তান থাকে ? তারা ওই শয়তানের সাথেই কথা বলে ? মাগো !! কি ভয়ংকর ব্যাপার। আমি শয়তান দেখতে চাই না। যদি কখনো দেখে ফেলি তাহলে আমি জানালা দিয়ে বা ঘরের কোন ফাঁক দিয়ে পালিয়ে যাব। ওহ .. কেন আমাকে ভয় দেখাচ্ছ ? শয়তান ইচ্ছে করলে আমাকে ধরে ফেলতে পারবে ? সে আল্লাহর সাথেই অবাধ্যতা করেছে তাই মানুষ-টানুষ ধরা তার কাছে নস্যি ? কিন্তু আমি জানি আল্লাহ অনেক শাক্তিশালী। তিনি তাকে ধরে কেয়ামত পর্যন্ত কোন খাচায় বন্দী করে রাখতে পারবেন। বন্ধু ! তুমি মাঝে মাঝে এমন কিছু কথা বল, আমার ভয় হয় সেগুলো আমাকে আবার ৩৬ নং ওয়ার্ডে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। তোমার সেই সব কথাগুলো অমার মাথায় কুলোয় না। তবে আমি নিশ্চিত যে, আমি আর কখনো ৩৬ নং ওয়ার্ডে ফিরে যাব না। কারণ আমি খেলাটা বুঝে গেছি এবং যেহেতু আমি বোকা নই তাই আমি আর কখনো সেখানে ফিরে যাচ্ছি না। জান কেন তারা আমাকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল ? কারণ আমি তাদের বুঝতে পারিনি এবং তারা আমাকে বুঝতে পারেনি। তোমাকে তাদের নির্বুদ্ধিতাগুলো বুঝতে হবে। অন্যথায় তুমিই তাদের দৃষ্টিতে নির্বোধ হয়ে যাবে এবং তারা তোমার মাঝে সাইকোসিস নামের রোগটা আবিষ্কার করে ফেলবে। আহহহ !!! অনেক বকবক করলাম। এটা আমার অভ্যাস এবং তুমি সবসময় তা সহ্য করে যাও এবং আমার কথা শোন। এই জন্যই আমি তোমাকে এত পছন্দ করি। সব পুরুষ যদি তোমার মত হত এবং তাদের স্ত্রীদের সন্তান নিয়ে দূর দেশে পালিয়ে না যেত !!। যাইহোক। এ সম্পর্কে আমরা আরো অনেক দিন আলোচনা করব, সম্ভবত মৃত্যু পর্যন্ত করে যাব। আমার বিশ্বাস মৃত্যুর পর আমাদের দু জনের ঠিকানা অভিন্ন হবে। আমি নিশ্চিত। এই নিয়ে আমি অনেক স্বপ্নও দেখেছি। স্বপ্নে তোমার আস্থা নেই ? কিন্তু আমার বাবা বলেতেন কোরানে স্বপ্নের কথা এসেছে। তুমি তো কোরান খুব ভালোবাস। সবসময় বল কোরান এক মহা গ্রন্থ। তোমার কাছ থেকে আমি কত কিছু যে শিখলাম!! মাফ করবে, এবার আমাকে উঠতে হবে। এরমধ্যে ছেলেটা নিশ্চয় জেগে গেছে। তাকে ঔষধ খাওয়াতে হবে এবং আমার সেই ঘুমপাড়ানিটাও কিছু দিতে হবে। তার মাও নিশ্চয় ইতিমধ্যে হুইস্কির বোতল ভাঙ্গতে শুরু করেছেন। সেই ভুল শোধরাতে আমাকে এখন যেতেই হবে। এটা আমার ক্ষমতার বাইরের ব্যাপার। আমার কিছু করার নেই। না.. তুমি তো সব সময় দিয়ে যাচ্ছ। আজ মদের বিল আমি দিব। এই ব্যাপারটাও তেমনি তোমার ক্ষমতার বাইরের। ঠিক আছে.. দেখা হবে... শুভ সন্ধ্যা ... বাই বাই !!

“Fais moi une grande bise”
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bishoyvabna/28827421 http://www.somewhereinblog.net/blog/bishoyvabna/28827421 2008-08-04 21:54:19
আখেরাতে বুরখিছ মুহাম্মাদ যাফযাফ
অনুবাদ : ফয়সাল বিন খালিদ

বুরখিছ তার বিখ্যাত ছোট গল্পগুলোতে মূলত ইতিহাস বিচার করেছিলেন, ব্যক্তি বা কোন ঐতিহাসিক চরিত্রের বিচার করেন নি। ইতিহাসের বিভিন্ন সময় আদালত অনেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে। কিন্তু পরে দেখা গেল, সেই রায় সঠিক ছিল কিনা সেই প্রশ্ন উঠছে এবং অনেকে তার পুনর্বিবেচনার কথা বলছেন। তবে ততক্ষণে মৃত্যু, বিচারক, বাদি-বিবাদী মিথ্যে সাক্ষী সেনানায়ক শাসক এবং বিঁঝি পোকা- সবার সম্পর্কে চুড়ান্ত রায় দিয়ে দিয়েছে। ইতিহাসের মঞ্চে এই ধরনের অসংখ্য চরিত্রের আগমন ঘটেছে এবং বুরখিছের পক্ষে তাদের সবার বিচার করা সম্ভব ছিল না। কারণ তার জীবন ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। তিনি বেঁচে ছিলেন মাত্র আশি বছর। তার জীবনের এই সংক্ষিপ্ততার সাথে সাথে স্বাভাবিকভাবেই সংক্ষিপ্ত হয়ে গেছে তার ছোট গল্পের তালিকাটাও। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমার সবসময় মনে হয় বুরখিছ যদি এই ধরনের আরো কয়েকটা ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে কাজ করতেন তাহলে খুব ভাল হত। কিন্তু তিনি যেহেতু মারা গিয়েছেন তাই তিনি খলিফা মুতাছিমের প্রধান সেনাপতী আফশিনের বিচার প্রক্রিয়ায় উপস্থিত থাকার সুযোগ পেলেন। বাবুক বিদ্রোহ দমনকারী আফশিন, কবি আবু তাম্মাম তার সম্পর্কে বলেছিলেন :

'বর্শার ফলার মত সেনাপতী আফশিনের সংকল্প'

বুরখিছ তার সংক্ষিপ্ত জীবনে কখনো মহান সেনাপতী আফশিন সম্পর্কে কোন কিছু জানার সুযোগ পান নি। তবে তিনি 'এক সহস্র রজনি' নিয়ে কাজ করেছিলেন এবং সেই সূত্রে আব্বাসী যুগ নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং সেই পর্বের অনেক ঐতিহাসিক ব্যক্তিকে তার বিচারের মুখামুখী দাঁড় করান। এই যোগাযোগের ফলেই মৃত্যুর পর, নাস্তিকতার অভিযোগে অভিযুক্ত আফশিনের বিচার প্রক্রিয়ায় তাকে উপস্থিত থাকার আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেই বিচার মজলিসে বুরখিছ অদ্ভুত কিছু অভিযোগ শুনতে পান। এই সব অভিযোগগুলো দ্বারা যে কারো নাস্তিকতা প্রমাণ করা যায় সেটা তার মাথায় কোনভাবেই আসা সম্ভব ছিল না। কারণ তিনি ছিলেন খৃষ্টান। আফশিনের বিরুদ্ধে তোলা সেই সব অভিযোগগুলো তাবারী ও মাসউদীর মত ঐতিহাসিকগন তাদের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।

পশ্চিমা কেতাদুরস্ত পোষাক পড়া বুরখিছ আদালত কক্ষে প্রবেশ করলেন (তখন তার সাথে তার তরুণী স্ত্রী ছিলেন না) এবং প্রথম যে বিষয়টা তার নজর কাড়ল সেটা হচ্ছে উপস্থিত সবাই জমকালো পোশাক পরে আছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, দুনিয়াতে অন্ধ থাকলেও আখেরাতে গিয়ে বুরখিছ তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়ে ছিলেন। মনে হয় বুরখিছ তার জীবনে নাস্তিকতার অর্থটা ভালভাবে ধরতে পারেন নি। অবশ্য এটা জোড় দিয়ে বলা যায় যে, বুরখিছ এটা জানতেন, যার একটা মাত্র সিদ্ধান্ত থাকে তার অবাধ্য হওয়া মানেই নাস্তিক হয়ে যাওয়া এবং অযৌক্তিক কথা বলা মানেও নাস্তিকতা করা। সিন্ধু, হিন্দুস্তান, চীন, আরব দেশ এবং বুরখিছের জন্মস্থান ল্যাটিন আমরিকা, সবখানেই এই বিষয়টা ছিল। জীবৎকালে বুরখিছ তার দেশের এমন অনেককে জানতেন যারা নাস্তিকতার অভিযোগে কঠিন সাজা ভোগ করেছিলেন বা প্রাণ দিয়ে ছিলেন। সম্ভবত তাদের জন্য কেঁদে কেঁদেই বুরখিছের চোখ দুটি অন্ধ হয়ে গিয়ে ছিল।

তার পাশে বসে থাকা একজন বলল :
- মিষ্টার বুরখিছ ! এমন অবাক হয়ে কি দেখছেন ? অবাক হওয়ার কিছু নেই। সাধারণ একটা মামলা এবং বিচার নিশ্চয় ইনসাফপূর্ণ হবে। সম্ভবত আপনাদের ল্যাটিন আমেরিকাতে যেমন ঘটত তেমনই কিছু একটা হবে। কোন সন্দেহ নেই বিষয়গুলো দুনিয়ায় যেমন ছিল তেমন থেকে যাবে। তাই না, আপনার কি মনে হয় ?!

- ঠিক বলতে পারছি না, কারণ আমার তো সে দিন মাত্র মৃত্যু হল। তাছাড়া আমি এখনো আপনাদের আখেরাতী আচার-আচরণে অভ্যস্ত হয়ে উঠি নি।

প্রধান বিচারপতি বলে ওঠলেন : আমরা সব শুনব, মন খুলে সব বলবেন। কারণ আমরা এখন আখেরাতে আছি। এখানে পুলিশ, সাংবাদিক বা রাষ্ট্রপতী বলে কেউ নেই। আমরা সবাই সমান। আমরা এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি আপনাকে খানিকটা আনন্দ দেওয়ার জন্য এবং দুনিয়ার সম্পর্কে কিছু স্মৃতিচারণ করতে, যার অধিবাসী মানুষজন এখনো ভেবে যাচ্ছে তারা সেখানে চিরদিন থাকবে।

অপ্রতিভভাবে ছোট একটা কাঁশি দিয়ে বুরখিছ বললেন :
- মাফ করবেন মহামান্য বিচারপতি ! আপনি আমার নাম জানেন ?

- অবশ্যই। আখেরাতে সবাই সবার নাম জানে। উদাহরণত: আমি আপনার পাশের ওই লোকটার নাম জানি। তিনি ইয়াজদান বিন বাযান। তিনি আফশিনের কালের লোক এবং তিনিও নাস্তিকতার অভিযোগ মৃত্যুদণ্ডের সাজা পেয়েছিলেন। তাই আমার ধারণা, অতীতের স্মৃতি চারণ করতে এবং কিভাবে নাস্তিকদের বিচার করা হয়- আরো সঠিক ভাষায় বললে, নিজেরা বাঁচার জন্য কিভাবে আমরা নাস্তিকদের বিচার করি, তা দেখার জন্য তিনি এখানে উপস্থিত হয়েছেন।

- কিন্তু মহামান্য বিচারপতি ! আমরা কি ইতিমধ্যেই মারা যাইনি ?

হা ! ঠিক, আমি সেটা জানি। আর মিষ্টার বুরখিছ ! আমাকে মহামান্য বিচারপতি-টতী বলার দরকার নেই। কেউ মহামান্য আর কেউ অমান্য, কেউ রাজা কেউ প্রজা- এই ব্যাপারগুলো এখানে আর নেই। আমরা শুধু আপনাকে আনন্দ দেওয়ার জন্য এবং দুনিয়ার ভুলগুলো শোধরানোর জন্য এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি। হায় দুনিয়ার মানুষজন কী নির্বোধ জীবনযাপন করে যাচ্ছে। বেঁচে থাকার জন্য ওরা খেটে মরছে, যুদ্ধ-বিগ্রহ, খুনোখুনি করছে। অথচ তারা জানে না, যে মারা যায় এবং আমাদের সাথে এসে মিলিত হয় সেই আসলে বেঁচে যায়। আপনার পিছনে দেখুন বুরখিছ, যদিও আমি আব্বাসী যুগের লোক কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি ওই লোকটাকে চিনি। তার নাম হিলাছি লাছি। তিনি হাবশী সাম্রাজ্যের মহারাজা ছিলেন।

- হা.. হা.. আমি তাকে ভাল করেই চিনি। তিনি আমার কালের লোক। কিন্তু তাকে যে চিন্তিত দেখাচ্ছে !

- না তিনি মোটেও চিন্তিত নন। তিনি তার কুকুরগুলো নিয়ে নতুন কোন কবিতা রচনার কথা ভাবছেন। হতে পারে তিনি এখান থেকে, যাদের সাথে দুনিয়াতে যুদ্ধ করেছিলেন, সেই ইটালিয়ানদের ক্যাম্পে গিয়ে পানসভায় যোগ দিবেন।

বুরখিছ বললেন :
- আমার জনা মতে দুনিয়াতে তিনি কখনোই কবিতা লেখতেন না।

- আখেরাতে কোন কিছুই অসম্ভব নয়। যাইহোক, আলোচনা অন্য দিকে চলে যাচ্ছে। এই নিয়ে আরেক সময় কথা বলব। আগে আজকের কাজটা সেরে ফেলা যাক।

বিচারপতি গলা খাকাড়ি দিয়ে উপস্থিত সবার দিকে তাকালেন এবং সবাই তাতে সম্মতি জানালেন। মুহাম্মাদ বিন আব্দুল মালেক আয-যাইয়্যাত আহমাদ বিন আবু দাউদকে লক্ষ্য করে বললেন :

- মুতাছিমের সেনাপতী আশফিনের বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগগুলো সংক্ষেপে উল্লেখ করুন। আর প্রসঙ্গত: তারা দুইজনই কিন্তু এখন জান্নাতে একসাথে নিয়মিত শরাব পান করে যাচ্ছে- আল্লাহ মহা দয়ালু ও মেহেরবান।

আহমাদ বিন আবু দাউদ বললেন :
- তার বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ, যেমন খুনখারাবি, ছিনতাই, বাড়ি-ঘর ও ক্ষেত-খামার জালিয়ে দেওয়া। তবে আমরা এখানে নির্দিষ্টভাবে ছয়টি অভিযোগ নথিভূক্ত করেছি, যেগুলো এখনো দুনিয়ার মানুষের নথিপত্রে সংরক্ষিত আছে। সদ্য আমাদের সাথে যোগ দেওয়া দুই হাজার সনের লোক মহান লেখক বুরখিছের সামনে আমরা সংক্ষেপে সে ছয়টি অভিযোগ উল্লেখ করব।

মুহাম্মাদ বিন আব্দুল মালেক আয-যাইয়্যাত আহমাদ বিন আবু দাউদকে বললেন :
- আমরা আফশিনের বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ তুলে ছিলাম আপনি শুধু সেগুলো উল্লেখ করুন। আমরা আমাদের মহান লেখককে বেশিক্ষণ বিরক্ত করতে চাই না। তার অন্য কোনও প্রোগ্রাম থাকতে পারে।

জো হুকুম ! আমরা আফশিনের বিরুদ্ধে মৃত্যু পরওয়ানা জারি করলাম। এবং যারা তার মৃত্যুদণ্ড বাস্তবায়ণ করেছিল তারা সবাই এখন এই অনন্ত বিস্তৃত জগতেই ঘুড়ে বেড়াচ্ছে।

বুরখিছ বললেন :
নিশ্চই তারা হাবিয়া দোজখে আছে, তাদের গলা ও পায়ে পেচিয়ে আছে নরকের জলন্ত শিকল ? তোমাদের ধর্মগ্রন্থ পড়ে আমি যা বুঝেছি তাতে এই ধরনের লোকদের শাস্তি এমনটাই তো হওয়ার কথা।

প্রধান বিচারপতি হেসে ওঠলেন এবং আহমাদ বিন দাউদকে বললেন :
আফশিনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো পড়ে শোনান।

আহমাদ বললেন :
-আমরা তো এখানে একটা প্রীতি-অনুষ্ঠানে মিলিত হয়েছি এবং আমাদের নতুন সাথীর সাথে পরিচিত হচ্ছি, তাই না ?!
-ঠিক, ভাল কথা। আফশিনের বিরুদ্ধে মোট ছয়টি অভিযোগ উত্থাপন করা হয়, লেখক আহমদ আমীন তাবারী এবং মাসউদীর বরাত দিয়ে তা উল্লেখ করেছেন (এরা সবাই এখানে উপস্থিত আছেন)।

প্রথম অভিযোগ : আফশিন দুই জন লোককে চাবুক মারতে মারতে পিঠের মাংস খসিয়ে ফেলেছিলেন। তাদের অপরাধ, তারা উভয়ে মিলে একটি মন্দিরকে মসজিদ বানিয়ে একজন সেই মসজিদের ইমাম এবং অপরজন তার মুআজ্জিন হন।
দ্বিতীয় অভিযোগ : তার বাড়িতে সোনা-মুক্তা খচিত রেশমে মোড়া একটি কিতাব পাওয়া যায়। তা ছিল কুফুরী কালামে ভরা। এই অভিযোগের উত্তরে আফশিন বলেছিলেন, কেতাবটি তিনি তার বাপ-দাদা থেকে মিরাছ সূত্রে পেয়েছেন এবং তিনি এই বইয়ের সাহিত্য রস উপভোগ করতেন। তিনি কখনো তাতে উল্লেখিত কুফুরী কালাম গ্রহণ করেননি।
তৃতীয় অভিযোগ : তিনি গলা চেপে মারা পশুর মাংস খেতেন এবং বলতেন তার মাংস জবে করা পশুর মাংসের চেয়ে অনেক সুস্বাদু ও পবিত্র। এটা সম্পূর্ণই ইসলামী বিধান বিরুদ্ধ আচরণ।
চতুর্থ অভিযোগ : তার বিরুদ্ধে এই অভিযোগও করা হয় যে, মক্কার তার কিছু অনুসারী তার কাছে আশরোসতী ভাষায় চিঠি লিখত, তাতে তাকে সম্বোধন করা হয় এই ভাবে : 'হে উপাস্যদের উপাস্য ! ..' এ তো ফেরাউনের চেয়েও বড় কাফের। ফেরাউন বলেছিল, 'আমি তোমাদের সর্বোচ্চ রব'।

প্রধান বিচারপতি কেশে ওঠে বললেন :
- নাউজু বিল্লাহ !! আহমাদ শেষ করেন, শেষ করেন !
- পঞ্চম অভিযোগ : আফশিনের ভাই তার কাছে একটা চিঠি লিখেছিলেন। ফোহিয়া যাওয়ার পথে চিঠিটি ধরা পড়ে। তাতে ছিল 'একমাত্র আমি, তুমি এবং বাবুকই পারে এই শুভ্র দ্বীন (মাজুছী ধর্ম)-কে রক্ষা করতে। আমার সাথে আছে পারাস্য, নাজদ এবং বাছের লোকজন। আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে যাই তাহলে আমাদের সাথে লড়ার জন্য বাকি থাকে আরব, মাগরেবী এবং তুর্কীরা। আরবরা হচ্ছে কুকুরের মত। এক টুকরো রুটি ছুড়ে দাও তারপর তার মাথায় ছুড়ে মার দাব্বুছ আর ওই মাছিগুলো তো (মাগরেবীরা) হচ্ছে মাথাখোর এবং তুর্কীরা শয়তানের আওলাদ। যুদ্ধ বাঁধার কিছুক্ষণ পরই তাদের তীর ফুরিয়ে যাবে, তাপর তাদের উপর, শেষ ব্যক্তিটি পর্যন্ত, ঘোড়া দাবড়ে দিবে।'
একজন সাকী এসে সবার হাতে হাতে শরাবের পাত্র দিতে লাগল। বুরখিছ হতভম্ব হয়ে বসে রইলেন। এই সব কী হচ্ছে তিনি তার কিছুই বুঝতে পারছেন না। তবে তিনি আহমাদকে বললেন :
- কিন্তু কি অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে নাস্তিক সাব্যস্ত করা হল এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল ?

আহমাদ এক চুমুক গিলে বললেন :
- মিষ্টার বুরখিছ ! মনে হচ্ছে আপনি ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলছেন। ষষ্ঠ যেই অভিযোগটা পাত্র উপচে দিয়েছিল তা হল : আফশিন ছিলেন আ-কাটা, তার খৎনা করানো হয়নি... হাসিতে ফেটে পড়ল বিচার কক্ষ। বুরখিছও হাসতে লাগলেন, এমনকি হাসতে হাসতে তার চোখে পানিও এসে পড়ল। হাসি থামিয়ে তিনি আহমাদকে বললেন :

- এটাও অপরাধ ?! আমি নিজেই তো দুনিয়ার আশি বছরের জীবনের গোটাটাই খৎনাহীন ছিলাম। আফশিন কি এই অভিযোগের উত্তরে কিছু বলেছিলেন ?

আহমাদ বলেলেন :
- হা মিষ্টার বুরখিছ। আত্মপক্ষ সমর্থন করে সেনাপতি আশফিন বলেছিলেন, তিনি খৎনা করাননি, কারণ তার ভয় হত সেটা কাটাতে গিয়ে তিনি মারা যেতে পারেন। কিন্তু আফশিন বুঝতে পারেননি খৎনা না করা মানে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাওয়া।

বুরখিছ বললেন :
- তোমাদের সময়ে নিশ্চই এই অদ্ভুত বিচারটা খুব সাড়া জাগিয়ে ছিল। তারপর তোমরা তাকে নিয়ে কি করলে ?

প্রধান বিচারপতি বললেন :
- তারপর তারা তাকে বন্দী করে খাবার-পানি দেওয়া বন্ধ করে দিল। এভাবে ক্ষুধা-পিপাসায় সে একসময় মারা গেল। তারপর তার মৃতদেহ শূলে চাড়ানো হল এবং পুড়িয়ে ফেলা হল/ তাবারী, ইবনুল আছির, ইবনে খালদুন সবাই এখানে এই পরোকালেই (যেটা আসলে প্রথম কাল) আছেন। আপনি তাদের জিজ্ঞেস করে দেখুন।

বুরখিছ ওঠে প্রধান বিচারকের মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন :
- তোমাদের অনেক ধন্যবাদ। খুব আনন্দ পেলাম। তোমরা আসলেই খুব ভালমানুষ এবং তোমরা জান কিভাবে মৃতদের স্বাগত জানাতে হয়। এই জগৎ এত সুন্দর, এটা আগে জানলে তো অনেক আগেই আমি আত্মহত্যা করতাম। তবে যেভাবেই হোক এই গল্পটা গোপন রাখাই ভাল। কারণ দুনিয়ার মানুষজন তা জানতে পারলে দল বেঁধে সবাই আত্মহত্যা করবে। তবে লাভ নেই। আসলে তো অন্য পদ্ধতি তারা সবসময় অবিরাম এই কাজটাই করে যাচ্ছে। বেচারা মানুষ !!

১২/৫/২০০৮ ইং
ফায়সাল বিন খালেদ
প্রথম বর্ষ, ত্রিপলী ইসলামিক ইউনিভার্সিটি (ত্রিপলি, লিবিয়া)
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/bishoyvabna/28827377 http://www.somewhereinblog.net/blog/bishoyvabna/28827377 2008-08-04 19:36:14
ত্রিপলীর ইহুদীরা ত্রিপলীর ইহুদীরা

"মূল : যিয়াদ আলী
অনুবাদ : ফায়সাল বিন খালিদ




ইহুদী লাউ

পশ্চিম ত্রিপলিতে বিভিন্ন প্রকারের সবজী পাওয়া যায়। তার অন্যতম লাউ, নানা প্রকার ও নামের লাউ। যেমন : লাল লাউ, বেটে লাউ। কোন কোন অঞ্চলে লাউকে বলা হয় আছালিয়া। মিশরীরা লাউকে বলে কুছা। তখন ত্রিপলীতে বিশেষ এক ধরনের লাউ পাওয়া যেত। তার আকৃতি ছিল লম্বাটে। কখনো কখনো তা বাঁকাও হত। এই লাউ ছিল সবচেয়ে সস্তা। স্থনীয় লোকজন এই লাউকে বলত ইহুদী লাউ।
ইহুদী লাউ কেন ? কারণ, স্থানীয় লোকজন বলে, এই লাউ সবচেয়ে বেশী খেত ইহুদীরা। ইহুদী লাউ ছিল ইহুদীদের সবচেয়ে পছন্দের তরকারী। তাছাড়া স্থানীয় ইহুদীদের সাথে, বিশেষত ইহুদী মেয়েদের সাথে, এই লাউয়ের অনেক চরিত্রগত ও গুণগত মিল পাওয়া যায় : যেমন ইহুদী মেয়েরা ছিল ইহুদী লাউয়ের মত সস্তা, বক্র, শ্লীম। নগ্ন ঘুড়ে বেড়ানো ইহুদী বাচ্চা মেয়েগুলোকে অনেকটা এই লাউয়ের মতই দেখাতো।
ইহুদী লাউ বৃত্তান্ত সম্পর্কে পশ্চিম ত্রিপলীর সাধারণ স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে যতটুকো জানা যায় তা হচ্ছে ইহুদীরা এই লাউ খুব পছন্দ করত। সস্তা ইহুদী লাউ ছিল তাদের সবচেয়ে পছন্দের এবং নিত্যদিনকার বাঁধা তরকারী। কিন্তু ইহুদীদের এই লাউ প্রেমের সাথে যে তখন বিশ্বব্যাপী চলতে থাকা ইহুদীদের নিজস্ব ভূমি ও রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনার সাথে গভীর যোগাযোগ ছিল সেটা স্থানীয় লোকজনের জানার কথা না। ইহুদী লাউ যে জায়োনিষ্ট লাউও সেটা তারা বুঝতে পারেন নি।
কীভাবে ? আমার মায়ের মুখে শুনেছি : ইহুদীরা বাজার করার সময় ইহুদী দোকানী ছাড়া অন্য কারো কাছ থেকে সদাই করত না। এবং তারা এক বিশেষ পদ্ধতিতে সদাই করত। তারা অধিকাংশ সময় ইহুদী লাউয়ে-র মত সস্তা সবজি কিনত। এবং দরাদরি করি প্রয়োজনীয় সবজি খরিদ করা পর তারা পুরো লাউটা নিত না। তার যতটুকো প্রয়োজন কেটে ততটুকো নিয়ে বাকি অংশ রেখে যেত। এর পর অন্যান্য ইহুদী খরিদদার এসে অনুরূপ বাজার দামে লাউ কিনে প্রয়োজন পরিমাণ নিত এবং বাকি টুকো রেখ যেত দোকানীর নিকট।
দিন শেষে দোকানী, প্রথম খরিদদার যে টাকা দিয়ে ছিল তা নিজের জন্য রেখে (তাতেই সে তার মূলধন ও লাভ দুটিই পেয়ে যায়) পরবর্তী খরিদদারদের দেওয়া বাকি টাকাগুলো একটি বিশেষ ব্যাংক-এ জমা রাখত। ওই ব্যাংককে ওরা বলত জেল আবীব বাঙ(তেলআবীব)।

ইহুদী গায়ীকা খানাফির

ত্রিপলীর সংগীত চর্চার খ্যাতি অনেক পুরোনো। সংগীত পুরান ত্রিপলীর লোকাল সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তখন ত্রিপলী ছিল নানা গোত্র, সমপ্রদায়, ধর্মের সম্মেলনে মুখরিত। যাদের অন্যতম ইহুদী সমপ্রদায়। স্বাভাবিকভাবেই ত্রিপলীর সংস্কৃতি, বিশেষত সংগীত চর্চায় স্থানীয় ইহুদীরাও অংশ গ্রহণ করেছিলেন এবং তাতে তাদের অবদানও আছে। তখন কয়েকজন ইহুদী গায়ীকা খুব খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তাদের অন্যতম মালু খানাফির।
ত্রিপলী তখন বিশ্বব্যাপী মূল ধারার ঘটনাবলী থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করছিল। তাই তার সংস্কৃতি, সংগীত এবং গায়ক গায়ীকাদের খ্যাতি ত্রিপলী পেরিয়ে বেশী দূর ছড়াতে পারে নি। কিন্তু সেই দিনগুলোতে আশেপাশের অন্যান্য আরব অঞ্চলের কয়েক জন স্থানীয় গায়ক বেশ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। সেই সময় আরব দেশগুলোতে যে সব ইহুদী গায়ক-গায়ীকা বিখ্যাত ছিলেন তাদের অন্যতম তিউনিসের রাউল জোরনো। মুসলমানীর অনুষ্ঠানে গান করার ক্ষেত্রে রাউলের জুড়ি ছিল না। তার কয়েকটা গানের কলি খুব প্রসিদ্ধ ছিল, মানুষের মুখে মুখে ঘুড়ে বেড়াত। উদাহরণত :

"হাজাম ! খাতনা করাও আমার সন্তানকে"
মিশরী গায়কদের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ছিলেন দাউদ হাসানী। সিরিয়ার কয়েকজন ইহুদী গায়ক-গায়ীকাও প্রায় আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ইরাক এবং আশাপাশের অন্যান্য অঞ্চলের গায়ক-গায়ীকাদের নামও আমরা শুনতে পেতাম।
কিন্তু ত্রিপলীর গায়ক-গায়ীকাদের খ্যাতি সীমাবদ্ধ ছিল পুরান ত্রিপলী এবং আশাপাশের শহরগুলোর মাঝেই।
খানাফির শব্দের অর্থ নাক। সম্ভবত নাক বড় হওয়ার কারণে তার নাম হয়ে গিয়েছিল খানাফির। খানাফিরের নিজস্ব গানের দল ছিল। একজন তবলাবাদক, বাশীবাদক, গিটার বাদক এবং গায়ীকা খানিফর নিজে-- তার গানের দল ছিল এই চার সদস্যের। তাদের নিয়ে তিনি বিভিন্ন উৎসব, পালা, সমাবেশে গান করে বেড়াতেন। তিনি সাধারণত গান করতেন ইহুদীদের জীবনের নানা বিষয় নিয়ে এবং ইহুদীরাও মুগ্ধ হয়ে, ভীড় করে তার গান শুনতে আসত। বিশেষত বুখা-র (এক জাতীয় স্থানীয় মদ) সান্ধ্য পান বা রাত্রি পানের অনুষ্ঠানে খানাফির যখন গান করতেন তখন তার গান শোনার জন্য প্রচুর মানুষ সমাবেত হত।
এই সব গানের অনুষ্ঠানগুলো হত খোলা মাঠে বা বাড়ির আঙ্গিনায়। মানুষজন বাড়ির ছাদে চড়েও গান শুনত। কোন কোন উৎসব উপলক্ষ্যে তারা খেজুর পাতা দিয়ে এক ধরনের ছোট ছোট কুটির বানাত। তাতে হত গানের অনুষ্ঠান। সমাবেত কণ্ঠে তারা গাইত :

"ধৈর্য্য তুমি থাক সূচের চোখে
তোমার পিছনে ছুটে জীবনকে করেছি ধূসরিত "

খানাফির কিছু কিছু গান রচনা করতেন এবং গাইতেন বিশেষ এক উদ্দেশ্য সামনে রেখে। স্থানীয় লোকজন তখন তার মর্ম ধরতে পারে নি। যেমন তার একটি গান ছিল এমন :

"তৈরী হও জাহাজে চড়ার জন্য
একাকী এই বিরান মরুতে পড়ে থেক না যেন !!"

তখনকার বিশ্বব্যাপী ইহুদীদের যাবতীয় তৎপরতার কেন্দ্রে ছিল "হিজরত "প্রতিশ্রুত ভূমিতে প্রত্যাবর্তণ। ইহুদী সংগঠনগুলো, পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা ইহুদীদেরকে প্রতিশ্রুত ভূমিতে সমাবেত করতে এবং তার উদ্দেশ্যে সফরে উৎসাহিত করার জন্য সম্ভাব্য যাবতীয় পদ্ধতি ব্যাবহার করেছিল। এই কাজে তারা শিল্পকেও নিয়োগ দিয়েছিল। সম্ভবত আমাদের গায়ীকা খানাফিরও এই দায়িত্ব পেয়েছিলেন। গানে গানে তিনি ইহুদীদের বলে বেড়াতেন : যাত্রার জন্য প্রস্তুতি নাও, জাহাজে চাড়ার জন্য তৈরি হও, অন্যথায় এই বিরান চড়ে একাকী পড়ে থেকে আজীবন আফসোস করে কাটাবে...
কিন্তু, প্রতিশ্রুত ভূমি ফিলিস্তিনে পৌঁছার পর খানাফিরের স্বপ্ন ভঙ্গ হল। খনাফির দেখলেন, বুঝতে পারলেন তিনি যেই পুণ্যভূমি, ইহুদীরাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন তার সাথে এর কোন মিল নেই। হতাশ খানিফর বেঁকে বসলেন, ইহুদী সংগঠনগুলোর সাথে কাজ করতে অস্বীকার করলেন, ত্রিপলীতে ফিরে আসতে চাইলেন এবং স্বাভাবিকভাবেই নিহত হলেন ত্রিপলীর গায়ীকা খানাফির। কে বা কারা তার খাবারে বিষ দিয়ে ছিল।
তেলআবীব পৌঁছার পর যে কয়জন ইহুদী ইটালী ফিরে আসতে পেরেছিলেন তাদের কাছে শোনা যায়, ফিলিস্তেন পৌঁছে হতাশ খানাফির বলেছিলেন :
"ত্রিপলীর রাস্তায় রাস্তায় হেঁটে হেঁটে ভুট্রা সিদ্ধ খাওয়া আমার নিকট ইসরাঈল ও তার সব কিছু থেকেও অনেক প্রিয়।"

অস্থায়ী আবাস

সেই সময়ের ত্রিপলীর ইহুদী বাড়ীগুলোর একটি অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে তার যে কোন স্থানে একটি বড়, চোখের পড়ার মত ফাঁটল দেখা যায়।
ওরা কখনো তার মেরামত করে না, বরং সচেতনভাবেই সেটা এই অবস্থায় রেখে দেয়।
কেন ? কারণ এর মধ্য দিয়ে ওরা নিজেদের মনে সবসময় এই ভাবনাটা জাগুরূক রাখে যে, এটা তাদের স্থায়ী আবাস নয়। এখানে তারা থাকছে অস্থায়ীভাবে। সময় হলে তাদের ফিরে যেতে হবে প্রতিশ্রুত ভূমিতে।



নিষ্ঠুরতা

হালু নামে আমাদের এক ইহুদী প্রতিবেশীনী ছিল। মহিলা ছিল খুবই নিষ্ঠুর কিসিমের, পুরুষ মার্কা স্বভাবের। তার জ্বীব ছিল খুবই ধারালো, মুখ যেন কঠিন সব গালাগালীর অফুরন্ত খনি।
কোন কারণে মেয়ের উপর ক্রদ্ধ হলে নেচে-কুদে চেচামেচি করে পাড়া মাথায় তুলে ফেলত। মেয়েকে সে এই বলে শাপ দিত :
"ইয়াজআলাকা আরুছা ফী বুরিম
ওয়া হাজ্জালাতান ফী বিসাহ "
অর্থাৎ ঈশ্বর তোকে শোক সভার নব বধু এবং উৎসব সভার তালাকপ্রাপ্তা বধু বানিয়ে দিক। অর্থাৎ সে তার মেয়েকে এই বলে অভিশাপ দিত যে, অন্যের আনন্দে ও হবে দু:খিত, অন্যের দুখের সময় আনন্দিত। এ থেকে ওদের কঠোর মানসিকতা কিছুটা আন্দাজ করা যায়।
তবে শেষে এই মহিলা বেচারীকে অনেক ভোগান্তি সহ্য করতে হয়েছিল। যখন ইহুদীরা ত্রিপলী ছেড়ে "প্রতিশ্রুত ভূমিতে "পারি জামাতে লাগল। তখন তাকে নেয়া হল না। তাকে ও তার সাথে তার ছেলেকে এখানেই থেকে যেতে হল।
কারণ তার ছিল যার রোগ। প্রত্যাবর্তনের দায়িত্বশীল ইহুদী সংগঠনগুলো এই যাতীয় কোন রোগীকে প্রতিশ্রুত ভূমির উদ্দেশ্যে যাত্রা করা কাফেলায় নিত না।


কালিমায়ে শাহাদাৎ

প্রসুতী নারীর প্রসব বেদনা ওঠলে ইহুদী নারীরা তার মুখের সামনে একটি কাচের কৌটা ধরে বলত : দুর্ভাগিনী কালামায়ে শাহাদাৎ বল, বল
"আমি সা দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই
আমি সা দিচ্ছি মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল "
সে তা বলার সাথে সাথে তারা শিশিটা ভাল করে বন্ধ করে দূরে ছুড়ে ফেলে দিত। তারা এই প্রথা পালন করত এই বিশ্বাস থেকে যে, গর্ভের ইহুদী সন্তান যখন তার মাকে এই সাক্ষ্য দিতে শুনবে যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, তখন সে অস্থির হয়ে সে গর্ভ থেকে পালাতে চাইবে। এর ফলে গর্ভপাত সহজ হয়ে যাবে।
এই আচরণের আরেকটা বাস্তব ফায়দা ছিল। ইহুদী নারী বাধ্য হয়ে কালিমা পড়া এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল এই সা দিলে তার মধ্যে এক ধরনের তীব্র অনুশোচনা ও অপরাধ বোধ তৈরী হয়। যার ফলে তার ভেতরে প্রসব বেদনা সহ্য করার মত অদম্য এক শক্তি জন্ম নেয়।
মুহাম্মাদ নামটার প্রতিই ইহুদীদের প্রচণ্ড বিদ্বেষ-ঘৃণা আছে। কোন কারণে এই শব্দটার উচ্চারণ করতে হলে তারা মুহাম্মাদ বলে বলত "মুহামহাম", স্থানীয় ভাষায় যার অর্থ নোংরা। আমি এই গল্প শুনিছি আমার খালার কাছ থেকে। তার এক নি:সন্তান ইহুদী পরশিনী ছিল। সে খালার ছেলে মুহাম্মাদকে নিজের ছেলের মত আদর করত। সে খালাকে বলেছিল অন্যান্য ইহুদী নারীরা মুহাম্মাদকে "মুহামহাম" বলে ডাকে।

শনির জন্য মাতম

ইহুদীদের শোক প্রকাশের নিজস্ব পদ্ধতি আছে। নিজেদের কেউ মারা গেলে ত্রিপলির ইহুদী সমপ্রদায় বিশেষ এক ধরনের বিলাপ-মাতম করে তার জন্য শোক করত। শনিবার ইহুদীদের কাছে একটি শুভ দিন। তাদের বিশ্বাস শনিবার হচ্ছে ঈশ্বরের বিশ্রাম দিবস। ছয় দিনে পৃথিবী সৃষ্টি করার পর ক্লান্ত ঈশ্বর এই দিন বিশ্রাম নিয়েছিলেন। তাই এই দিনটি শুভ দিন।
শনিবারে মৃত্যু শুভ লক্ষণ। তাই কেউ যদি শনিবারের পর মারা যেত তারা তার জন্য বিশেষভাবে শোক করত। তারস্বরে চিৎকার করে মাতম করত :

"হায় হায় দুর্ভাগা ...
তোমার মৃত্যু হল শনিবারের পর ..."

স্থানীয় দুষ্ট ছেলেরা কোন ইহুদী দেখলে, তাদের মাতম অনুকরণ করে এই গান গেয়ে ভেঙ্গাত। ইহুদী পল্লীগুলোতে ছিল নানা মাতম দল। কেউ মারা গেলে বিলাপ বিশেষঙ্গ পেশাদার মাতমকারী এই নারীদের ভারা করে নিয়ে যাওয়া হত। এমনকি ইহুদী সমপ্রদায়ে মাতম এক সময় বেশ লাভজনক পেশা হয়ে দাঁড়ায়। এই কাজে তুর্কী বংশদ্ভুত ইহুদী নারী বেশ খ্যাতি লাভ করে ছিলেন।

প্রভাত প্রার্থনা

সাকালে ঘুম থেকে উঠার পর ইহুদীদের সর্বপ্রথম কর্মটি ছিল আরবদের ধর্ম এবং পুর্বপুরুষদের গোষ্ঠী উদ্ধার করা। আরবদের ধর্ম এবং পুর্বপুরুষদের অভিশাপ দিতে দিতে সকালে তারা কাজে বের হত।
পথ চলার সময়, বিশেষত একা হলে, ইহুদীরা গা বাঁচিয়ে চলে। কারো সাথে ঝগড়া বা তর্কে জাড়াতে চায় না। কিন্তু মাঝে মাঝে আরবদের অভিশাপরত পথচারী ইহুদীর সাথে কোন আরবের দেখা হয়ে যায়। কিন্তু সে ক্ষিপ্ত হয়ে তার সাথে ঝগড়া শুরু করলে সাথে সাথে ইহুদী চুপসে যায়। শান্ত নিরীহ ভাব করে নিচু স্বরে বলে : আরে ভাই আমি ত