somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জীবনটা আসলেই অনেক সুন্দর।

১৯ শে মে, ২০১২ বিকাল ৪:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার প্রথম গার্লফ্রেন্ড যখন আমাকে ছেড়ে চলে যায় তখন কিছুদিনের জন্য আমি খুব ডিপ্রেসড হয়ে গিয়েছিলাম। প্রথম ধাক্কা তো, তাই একটু বেশি জোরে লেগেছিল। ব্যাপারটাকে আমি খুব স্বাভাবিকভাবে নিতে চাইলাম। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়া, গান শুনা, মুভি দেখা, ব্লগিং এসব নিয়ে জীবনটাকে পার করে দিতে চাইলাম। কিন্তু ব্যাপারটা খুবই অসহ্য পর্যায়ে চলে গেল। তবে সেই কঠিন সময়টা আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে, আজ আমি আপনাদের সেই গল্প বলব।


সবাই বলে থাকে ডিপ্রেসড অবস্থা কাটাতে বাইরে কোথাও থেকে ঘুরে আসাটা সবচেয়ে ভাল। আমিও সেই পথ ধরলাম। আমার ফুপাত বোনের সাথে ফোনে ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলতেই সে বলল তার শ্বশুর বাড়িতে চলে যেতে। আমার ফুপাত বোন যদিও দুলাভাই আর বাচ্চা কাচ্চাদের নিয়ে চিটাগাং থাকে, কিন্তু তাদের নাকি গ্রামে বিশাল বাড়ি খালি পড়ে আছে। আমি পরের দিনই রওনা দিলাম ব্যাগ ট্যাগ নিয়ে। বাড়িটা খুজে পেতে খুব বেশি কষ্ট করতে হল না। কিন্তু বাড়ির সামনে গিয়ে আমি বেশ অবাক হলাম। বাড়িটা দক্ষিন দিকে মুখ করানো। বাড়ির পিছনে জমিতে পানি দেয়ার জন্য বিশাল একটা নালার মত বয়ে যাচ্ছে। পশ্চিম দিকে একটা ছোট ডোবা পুকুর, পূর্ব দিকে একটা দিঘী আর তার ঠিক পাশেই আরেকটা ছোট পুকুর। বাড়ির সামনের দিকে উঠানের সামনে দুইটা খড়ের গাদা, আর গরুর ঘর। তার পিছনে বিশাল এলাকা জুড়ে ধানি জমি যা পানিতে ডুবে আছে। এরপরেই আছে একটা খাল। বৃষ্টির দিন বাড়ির চারিদিকে পানি আর পানি, মাঝখানে বাড়ির উঠানটাকে একটা দ্বিপ মনে হচ্ছিল। আগেই ফোনে বলা ছিল যে আমি আসব তাই অনেকটা রাজার মত সম্মান পেলাম! যাইহোক এত বড় বাড়ি কিন্তু মানুষ থাকে মাত্র তিনজন। দুলাভাইয়ের চাচা চাচী আর কাজ করার জন্য ছোট একটা ছেলে। আমি আসার দুই দিনের মাথায় সেই ছেলেও তার মায়ের অসুস্থতার জন্য বাড়ি চলে গেল।


নিঃসঙ্গতা দূর করার জন্য এসেছি আর এই অবস্থা এখানে, আমার নিঃসঙ্গতা আরো বেড়ে যাবার কথা হলেও দিনগুলো খুব ভালভাবেই কেটে যেতে লাগল। যারা এইরকম পরিবেশ দেখেননি তাদের কাছে অবাস্তব মনে হতে পারে। প্রতিদিন চাচার সাথে মাছ ধরতে যেতাম। পানিতে নেমে দাপাদাপি। জাল দিয়ে মাছ ধরা, নৌকা নিয়ে ঘুড়ে বেড়ানো, আমি তখন পুরোপুরি এক মৎস্য মানব! চাচা চমৎকার গল্প বলতে পারতেন।

তার গল্পগুলো শুরু হত অনেকটা এভাবে, “বুঝলা ভাতিজা, ওইদিন সকালে উইঠা জানালা দিয়া বাইরে তাকায় দেখি বাড়ির উঠানে একটা বোয়াল মাছ হাটে! আমি তো পুরা অবাক, মাছ এতদূর আইলো ক্যামনে? পরে বাইরে গিয়া দেখি পানি উথাল পাথাল করতাছে দিঘীতে। আর ব্যাঙ, কাকড়াসহ আরো অনেক কিছু দেখি পানির উপরে উইঠা গেছে!”
একদিন সকালে উঠে দেখি গোয়াল ঘরে প্রায় দুই হাত লম্বা সিলভার কালার সাপ মেরে চাচা আমাকে ডাকছেন। গিয়ে শুনলাম, এই সাপ নাকি চুরি করে গরুর দুধ খেয়ে চলে যেত! যাইহোক এভাবে মাছ ধরে, চাচীর রান্না করা খাবার খেয়ে আর চাচার আজগুবি গল্প শুনে দিনগুলো ভালই কেটে যাচ্ছিল। মনে হত এখানেই বাকি জীবন কাটিয়ে দেই। একদিন সন্ধার ঠিক আগে ফোন এল যে চাচীর বোন নাকি ভয়ানক অসুস্থ, তাকে দেখতে যেতে হবে। এদিকে আমি বাড়িতে একা, পিচ্চিটাও বাড়িতে নেই। আমাকে একা ফেলে যেতে চাইছেন না চাচা। আমি একরকম জোর করেই তাদের পাঠিয়ে দেই। আমাকে খাবার দাবার রান্না করে দিয়ে তারা চলে গেলেন আর বললেন পরের দিনই ফেরত আসবেন। পরের দিন প্রচণ্ড বৃষ্টি সারাদিন, একবারে মাগরিবের আজানের পরে ভিজে চুপচুপে হয়ে চাচা চাচী ফেরত আসলেন। কিছুক্ষণ তাদের ঝাড়লাম, এত বৃষ্টির মাঝে আসার কি দরকার? আমি তো আর ছোট বাচ্চা না। কোন কথা না বলে তারা শুধু মুচকি হাসলেন। পরের দিন সকালে আমি ঘুম থেকে উঠার পরে দেখি চাচা চাচী কেউ নেই ঘরে। কি ব্যাপার? এত সকালে কই গেলেন, তাও আমাকে একদম না জানিয়ে! আমি আমার দিন পার করে দিলাম টিভি দেখে আর ইন্টারনেটে গুতাগুতি করে। সেইদিন মাগরিবের আজান দেয়ার পরে তারা আবার বাড়িতে ফেরত আসলেন। জিগ্যেস করে মন মত কোন উত্তর পেলাম না, মনে হল তারা একটা ব্যাপার আমার থেকে লুকাতে চাইছেন। এরপরের দিনও একই কাহিনী! আরে তারা সকাল হবার আগে আগে কই যায়?

আমি বাড়িতে বসে না থেকে বাইরে ঘুরে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম। সাথে নিলাম জাল আর একটা কোচ (মাছ মারার জন্য এক ধরনের জিনিষ)। আজকে একটু দুরেই মাছ ধরব ভেবে খাল পর্যন্ত হেটে যাচ্ছিলাম। বৃষ্টিতে জমিজমা সব ডুবে গেছে, নৌকাটাও নেই ভেলাও নেই কোন। প্রায় কোমর পানিতে সাবধানে হেটে যাচ্ছিলাম। মৎস্য মানব হয়ে পানির প্রতি আমার ভয়-ডর কমেই গেছে বলা যায়। সামনে মানুষের একটা জটলা দেখতে পেলাম। খালের ওখানে অনেক মানুষ নৌকা নিয়ে জড়ো হয়েছে। আমি কাছে যেতে চাইলে রসুল নামক ছেলেটা আমাকে আটকায়। বলে, “যাইও না সহ্য করতে পারবা না। মিজান চাচা আর চাচী দুইজনের লাশ পাওয়া গেছে। তিনদিন আগের পঁচা লাশ। তিনদিন ধইরা তুমি বাড়িতে একা, আমাগো কিছু জানাও নাই ক্যান মিয়া?” আমার মাথাটা ঘুরে উঠল, তিনদিন আগের লাশ মানে? এই তিনদিন আমার সাথে তাহলে কারা থাকত রাতে?


পরের ঘটনা টেনে লম্বা না করে সংক্ষেপে বলি। আমাকে বেশ কিছুদিন সাইক্রিয়াটিক ট্রিটমেণ্টের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। বাঘ যেমন একবার রক্তের সাধ পেলে মানুষখেকো হয়ে উঠে তেমনি স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পরে আমি আবার প্রেমে পড়লাম। মেয়েটা সব জেনে শুনেই আমার সাথে জড়াল। আমি আবার ছেড়ে দেয়া পড়ালেখাটা শুরু করলাম সাথে দুই একটা টিউশনী, আর আমার বউ পড়া শেষ করে জব করছে ৬ মাস হল। ছোট্ট বাসাটায় আমাদের জীবন ভালই কেটে যাচ্ছিল। একদিন সন্ধায় ঠিক মাগরিবের আজানের সময় আমার বউ বাসায় এল। ভিজে চুপচুপে অবস্থা। কি হল? এভাবে ভিজে আসার কি দরকার ছিল? জবাবে শুধু একটু মুচকি হাসি দিল। সেই হাসিটা দেখে আমার বুকটা ধক করে উঠল, কারণ এই হাসির সাথে আমি পরিচিত! পরদিন আমি ঘুম থেকে উঠার আগেই সে চলে গেল। আমি জানতাম সে চলে যাবে। এখন আমার কাজ তার লাশ অন্য কেউ পাবার আগে নিজেই খুজে বের করা, আর সেটা সৎকার না করে অন্য কোনভাবে সংরক্ষন করা যাতে মৃত্যুর পরও আমার বউ যাতে আমার সাথে থাকতে পারে! নেটে বসে সব পেপারে তন্ন তন্ন করে খুজে কোন মৃত্যু সংবাদ পেলাম না। অযথা ফোন করলাম বউয়ের মোবাইলে, বউ তো দিনের বেলায় ফোন ধরবে না, সে তো মৃত! কিন্তু কি আশ্চর্য! সে ফোন ধরল, আর বলল তাড়াতাড়ি বের হতে হয়েছে তাই আমাকে জানায় নি। হাফ ছেড়ে বাচলাম আর বুঝলাম পুরোটাই আমার ভয় আর কল্পনা।



রাতে বউ বাসায় আসার পর বারান্দায় বসে আড্ডার সময় তাকে পুরো ব্যাপারটা বললাম। সে শুনে হাসতে হাসতে বলল, “দুটো ব্যাপার শিওর হলাম। এক, তোমার পাগলামিটা ব্যাক করছে, আবার আমাদের ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। দুই, তুমি আমাকে অনেক অনেক ভালোবাসো”। “এখন এই পেত্নির(!) হাতটা একটু শক্ত করে ধরো”- বলে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। আমি তার হাতটা ধরে বসে রইলাম। আর ভাবলাম, জীবনটা আসলেই অনেক সুন্দর।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে মে, ২০১২ বিকাল ৪:৫৬
২৩টি মন্তব্য ২৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এমন কেন?

লিখেছেন তাই-ফি, ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৪

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×