সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে যে কোনো অনুষ্ঠান হলেই আমরা সেখানকার ছবি তুলে আপলোড করে থাকি, যাতে বন্ধুরা বা পরিচিত সবাই দেখতে পারে। নিজের অনুভূতিকে সবাই যেন একটু হলেও অনুভব করতে পারে। বর্তমানে প্রযুক্তির এই সহজলভ্যতাকে যেমন ভালো পথে ব্যবহার হচ্ছে, ঠিক তেমনি খারাপ পথেও ব্যবহার হচ্ছে। একজনের ছবি বিকৃত করে তাকে হেয় করা হচ্ছে, ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছে। আর এটা এখন হরহামেশাই হচ্ছে। কিন্তু আমরা কি একটিবারও খেয়াল করি, যে ছবিগুলো ইন্টারনেটে আপলোড করছি সেগুলো সেখানে কতটুকু নিরাপদ? সেই সঙ্গে ছবিতে উপস্থিত মানুষগুলো কতটুকু নিরাপদ? এ নিয়েই আমাদের এবারের আয়োজন-
যা হয়
আমরা অনেক সময় ফেইসবুক অথবা অন্য কোথাও কোনো ছবি আপলোড করে সেগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করি না। এটা আমাদের সতর্কতার অভাবে হয়ে থাকে। যখন কোনো ছবিতে নিরাপত্তা না দেওয়া হয় সে ছবি যে কেউ নিতে পারবে, দেখতে পারবে। এখন মজার কথা, যার সঙ্গে আপনার বন্ধুত্ব, সে কতটুকু নিরাপদ আপনার জন্য। এটাও মাথায় রাখতে হবে। আপনার কোনো বন্ধু চাইলেই তো কোনো ছবিকে বিকৃত করতে পারে, যা আপনার জন্য বিব্রতকর হতে পারে। এ ছাড়া আমরা অনেকেই ব্লগ পোস্ট করার সময়ে ছবি ‘আপলোড’ করে থাকি। লেখার প্রসঙ্গে হলে ছবিটা পোস্টটাকে বুঝতে সাহায্য করে, প্রসঙ্গে না হলে নিদেনপক্ষে পোস্টটার আকর্ষণ বাড়ায়। কিন্তু সেটাও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়।
ইন্টারনেট যা বলে
আপনি ছবি যখন ইন্টারনেটে আপলোড করবেন তখন এ ছবিগুলোর কপিরাইট বা মেধাস্বত্ব নিয়ে ইন্টারনেট জগত্ কী বলে তা জেনে নেওয়া যাক। তার আগে একটু জেনে নিই যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের আইন অনুযায়ী কোনো কপিরাইটসহ ছবি ইন্টারনেটে ‘আপলোড’ করার নিয়ম নেই। এর মানে হল আপনি যে ছবি ইন্টারনেটে আপলোড করবেন, করার পর ওই ছবির মালিক বা স্বত্বাধিকারী আপনি নন। ওই ছবি তখন উন্মুক্ত হয়ে যাবে। এই উন্মুক্ত করার নীতি হল তথ্যকে মুক্ত করা। এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছড়িয়ে দেওয়া। যে ছবিতে আপনার আপত্তি আছে সে ছবি আপনি আপলোড থেকে বিরত থাকবেন। তা না হলে আপনার কিছু করার নেই। যদিও কপিরাইট বা মেধাস্বত্ব আইন যা বলে তা মোটেই কার্যকর নয় এই ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের যুগে। ছবির কোনো কপিরাইট আছে বলে খুব বেশি যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা নেই, যা আছে তা হল ছবিটি সম্পাদনা করা বেআইনি। আর যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি কোনো ছবিকে রেজিস্ট্রেশন করবেন না ততক্ষণ পর্যন্ত আপনার কোনো ক্ষমতাই নেই ওই ছবিটির ওপর।
আবার ওপেন সোর্সের ক্ষেত্রে ফেয়ার ইউজ বলে একটা কথা আছে, যার আওতায় শিক্ষামূলক কাজে যে কোনো কিছু ব্যবহার করা যাবে। লিমিটেশন অন এক্সক্লুসিভ রাইটস ওপেন সোর্সেরও প্রচুর লাইসেন্স আছে, যা কিনা ওপেন সোর্সকে রক্ষা করার জন্যই তৈরি করা হয়েছে ওপেন সোর্স লাইসেন্স।
কিছু ঘটনাপ্রবাহ
এ বছরের জুন মাসে চুয়াডাঙ্গা জেলার এক কলেজছাত্রীর একটি ছবি তার কাছের বন্ধু কম্পিউটারের দোকান থেকে সংগ্রহ করে। এরপর সে ছবিটির মুখ কেটে অন্য একটি মেয়ের বিবস্ত্র ছবিতে যুক্ত করে ছড়িয়ে দেয় ইন্টারনেটে। মুহূর্তের মধ্যেই তা ছড়িয়ে পড়ে অসংখ্য মানুষের হাতে। পরে আইনের মাধ্যমে গ্রেফতার করা হয় বন্ধুটিকে। আইন সালিশের মাধ্যমে তার জেলও দেওয়া হয়। কিন্তু মেয়েটি? মেয়েটি লোকলজ্জার ভয়ে ঘর থেকেই বের হয় না আর। থেমে গেছে তার স্বাভাবিক জীবন।
ফারহানা (ছদ্মনাম), বাংলাদেশের নামকরা এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। হঠাত্ করেই সে জানতে পারে তার একটি ছবি বাংলাদেশি এক পর্নো ওয়েবসাইটে পোস্ট করা হয়েছে, যেখানে উপস্থাপন করা হয়েছে কলগার্ল হিসেবে। সেখানে তার কিছু ব্যক্তিগত ছবিও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে তার মোবাইল ফোন নম্বরও দিয়ে দেওয়া হয়। অতি অল্প সময়েই এ খবর পুরো ক্যাম্পাসে রটে যায়। ফলাফল, মেয়েটির পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর লোকলজ্জা থেকে বাঁচতে সে পাড়ি জমায় বিদেশের মাটিতে।
মিথিলা নামের এক কলেজছাত্রী জানতই না কীভাবে ফেইসবুকে প্রবেশ করতে হয়। কিন্তু তার নামে ফেইসবুকে একটি অ্যাকাউন্ট বিদ্যমান। যেটিতে বিভিন্ন আপত্তিকর স্ট্যাটাস, ছবি এবং ভিডিও নিয়মিত পোস্ট করা হয়। সে যখন জানতে পারে তখন সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বন্ধুদের সহায়তায় অ্যাকাউন্টটি ডিলিট করতে সমর্থ হয়।
এরকম ঘটনা অস্বাভাবিক হারে বেড়েই চলেছে। যার আপাত অর্থে কোনো প্রতিকার নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মেয়েরা ভিকটিম হওয়ায় যত দ্রুত সম্ভব সামাজিক কারণে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়। ইন্টারনেটের ওয়েবসাইট থেকে ছবি হয়তো অপসারণ করা যায় দ্রুতই, কিন্তু মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে অসংখ্য কম্পিউটারে, মোবাইল ফোনে সেটি ছড়িয়ে পড়ে। যেহেতু শাস্তির কোনো নজির নেই, তাই পরবর্তী সময়ে আরেকজন একই কাজ করে কোনো মেয়ের বা তার পরিবারের জন্য সংকট তৈরি করে সহজেই।
শেষ কথা
যেহেতু অঘোষিতভাবে বলা আছে ইন্টারনেটে যে ছবি আপনি আপলোড করবেন তখন সে ছবিটি উন্মুক্ত হয়ে যাবে। সুতরাং যা করবেন ভেবেচিন্তে করবেন। কোনো ছবি ইন্টারনেটে প্রকাশের আগে নিশ্চিত হয়ে নিন সেটি আপনার আদৌ ক্ষতি করতে পারবে কি না। ইন্টারনেটে যে ছবি ও ডাটা থাকবে তার ওপর অধিকার হয়ে যায় সবার। কেউ যদি ছবি চুরি অথবা ক্ষতিসাধন করে, তবে এ ক্ষেত্রে বলার কিছু নেই।
ইন্টারনেট যেমন আপনার জীবনকে সর্বাঙ্গীণ সুন্দর করবে, সেই সঙ্গে আপনার জীবনে ডেকে নিয়ে আসতে পারে ভয়াবহ বিপর্যয়। তাই ইন্টারনেটে ছবি আপলোড করতে আরও বেশি সতর্ক হোন।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জুলাই, ২০১১ ভোর ৪:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



