রাখতে ভাল লাগে, এক কুৎসিত বিলাসিতা।
হঠাৎ আগের কোর্সের এক ছাত্র সালাম দিয়ে বসে। সিড়ির দিকে তাকিয়ে অলাইকুম বলি।খুব মিশুক ধরনের ছাত্র। হঠাৎ বলে বসে,
"স্যার আপনাকে বিধস্ত লাগছে, কোন সমস্যা?"
আমি বিচলিত হই। কি বলব ঠোট কাটা এই ছাত্রকে?
বাবা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা পোস্ট ডক্টরেটধারী প্রফেসর। শতাধিক পাবলিকেশন ও গন্ডা খানেক পুস্তক প্রণেতা। মামা চাচারা কেউ ডিপার্টমেন্ট চেয়ার, কেউ বা ভিসি দেশে বিদেশে।
"টাকার জন্য গবেষণা", এই নীতিকে ঘৃণা করেছি সারা জীবন। ওতে সুখ বা স্বতঃস্ফূর্ততা নেই। পদার্থ বিজ্ঞানের ছাত্র হয়ে কোটি টাকার ফেলোশিপ দিলেও আমি রসায়ন শাস্ত্র নিয়ে অধ্যয়ন বা গবেষণা করতে রাজি নই। আজকাল কার মেধাবীরা ফান্ডের লোভের একাজটাই করছে অবলীলায়। আমেরিকায় ডিগ্রি আর আমেরিকায় চাকুরি পাওয়া নিয়ে কথা, এর বাইরে ঐ মোটিভেশনের দাম মার্কিনিরাও দেয় না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে সেরা দশ ভাগে ছিল আমার নাম। প্রথম দিকে খারাপ লাগতো আমার চেয়ে লো রেংক এর ছেলেরা ফান্ড পেয়ে পিএইচডি করতে চলে যাচ্ছে, আমার হচ্ছেনা গবেষণার পরিধিকে ফান্ডের সুযোগের দিকে না তাকিয়ে নিজের মত স্পেশালাইজ করাতে। এমনকি বুয়েট পাশ ছোট ভাই আমেরিকা যাচ্ছে পিএচডি করতে।সহপাঠী-সহকর্মীরা অভয় দেয়, তুই পদার্থের ছাত্র, ভৌতবিজ্ঞানের আরেক শাখা রসায়ন কেন পারবিনা? রসায়নে ফান্ড বেশি, বোকামি করিসনে, চলে যা, ওটাতেই এপ্লাই কর।তুই তোর মেধা নষ্ট করিসনা। দেশে থেকে পড়াশোনা হয়না, হবেনা।
প্রবল জেদ ধরে বসে থাকলাম নিজের পছন্দের বিষয় নিয়ে। স্রষ্টা এ হতভাগা পাগলকে ঢেলে দিয়েছেন সব কিছু। দেন নি ধৈর্য, করেননি আশা বাদী একজন।
সব ভেঙ্গে খবর এলো, আমি ফান্ড পেয়েছি একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। বুঝলাম আনন্দিত হতে পারিনি।চোখের জল নেই। নৈরাশ্যবাদীদের চোখে অল্প সাফল্যেই পানি চলে আসে, তাদের আনন্দের অশ্রুর মিষ্টতা অভুতপূর্ব অপার্থিব।
পরের দিন সকাল ঘুম ভাঙ্গল সকাল পাচটায়। মশার কামড় খেয়ে কোন রকম ফ্লোরিং করে ঘুমাই। ঘুম ভাঙ্গার সাথে সাথে অনেক ঘটনা-কথা এক সাথে ভিড় করে মাথায়।ফান্ডের ব্যাপারে কিছু জটিলতা আর শর্ত ছিল।বাবা উজাড় করে দিতে চেয়েছিলেন সব কিছু ছেলের উচ্চ শিক্ষার জন্য।
শত কিলোমিটার দূরে মা কে ফোন করে বললাম, "মা, আমি কোথাও যাবনা। আমার পিএইচডির দরকার নাই। তোমাদের সাথেই আছি দেশে।নিজের পেট চালানোর জন্য স্রষ্টা আমাকে অনেক দেন।আমি সুস্থ হয়ে দেশেই বেচে থাকতে চাই।"
মা শুধু বলেন, 'তোর যাতে সুখ বাবা, আমি তাতেই সুখি।'
জানি মেধাবী ছেলে কে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখা বাবার আশা ভঙ্গ হবে। কষ্ট পাবেন। বাবা মার অবাধ্য হইনি, না বলিনি কখনও, পড়াশোনার আগ্রহ হারায়নি এখনও। বাবাকে সামনা সামনি বলার সাহস হয়না।
বাবাকে বলতে চাই,
"থাক না। কি দরকার? সবাই কে কি পিএইচডি করতে হয়!! আমি বরং নাই বা করলাম। আমার ফান্ড অন্য কেউ পেল, যার ডিগ্রিটা হয়তো আমার চেয়ে তার বেশি দরকার।"
বাকি টা জীবনে, নিভৃতচার চাই, নির্জনতা চাই, নীরবতা চাই। কারও অযাচিত কটু মন্তব্য শুনতে চাইনা আমার ভবিষ্যতও সিদ্ধান্ত নিয়ে।
এখন আমি মুক্ত, স্বাধীন নিজের পায়ে দাড়িয়ে নিজের উপার্জনে খেতে পারি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

