কাঁপা কাঁপা হাতে বৃদ্ধের ডাল মাখা ভাত তুলে খাওয়ার দৃশ্য ভুলতে পারিনি আজও।
কলেজে পড়ার সময় ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত সেই হতভাগা বৃদ্ধের কথা। রাতের বেলায় কাঁদতে কাঁদতে মানুষের ঘরে ঘরে বাঁচার আকুতি নিয়ে হাত পাতা। মহা আদরের সন্তানরা ঘর থেকে বের করে দিয়েছে বৃদ্ধ বাপ কে, তাই সে আজ রোগের মেডিক্যাল রিপোর্ট নিয়ে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছে। আমি ভাত খেতে দিতে চাইলাম।
বলল, "বাবা, ক্যান্সারে ঝোল ভাত খেতে পারিনা, পাউরুটি পানিতে ভিজিয়ে খাই।"
প্রতি রাতে তার অশ্রু রুদ্ধ বাঁচার আকুতি শোনা যেত বহুদূর থেকে। একদিন সেটাও বন্ধ হয়ে যায়। হয়ত লাশ হয়ে পড়ে থেকে আশ্রয় হয়েছে বেওয়ারিশ লাশ কাটা ঘরে।
মানসিক রোগ বৃদ্ধির দায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা থেকে অব্যহতি পাবার পর স্রষ্টার কৃপা, মানুষের দানের সন্ধান করি পথে পথে, আমার জীবন মানেই ক্ষুধা মেটানোর সংগ্রাম। ঘোর যৌবনে এসে স্বাস্থ্য হানি ও মানসিক সুস্থতা হারিয়ে এক অকাল পক্ক বৃদ্ধ ভিক্ষুকের কাতারে আমি। নিজের বিশ্বাস বাচিয়ে রাখতে নিজের জীবন বাচানোর অন্ন চেয়েছি শুধু স্রষ্টার কাছে।
অক্ষতিকর বলে আমার স্থান উন্মাদ আশ্রমে হয়নি, মানুষের করুণা আমি এখনও পাই, সাথে অকৃতজ্ঞ হয়ে স্রষ্টাকে ভুলে যাই বার বার। স্রষ্টাই আমার জন্য ব্যবস্থা করলেন মাসিক ১১০০ টাকার ভিক্ষুক ভাতা। আমি আজ বস্তিতে মাথা গুজে থাকি ৫০০ টাকার ঘর ভাড়া করে। বাকি টা দিয়ে দুবেলা খেয়ে থাকি। খরচ বাড়লে রোজা রেখে দিই।
নারী বিদ্বেষী শেরিফের কোন সুখের অন্বেষা ছিলনা। তার জীবনে 'সে' এসেছিল কিভাবে তার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়না। শীতাতপ ঘরে আর গাড়িতে মানুষ হওয়া 'সে', আল্লাদ আর জীবনে গা ভাসাবার সবই সুযোগ ছিল তার সামনে। আমি বামন হয়ে চাঁদ দেখার চেষ্টা দূরে থাক, ইচ্ছাও কখনও আসেনি মনে। নিজের রক্ত মাংসের স্বত্ত্বাটাকে আবিষ্কার করার পর বুঝলাম, স্রষ্টা কতটা যত্ন করে 'সে' কে বানিয়েছেন। নিজের অনুভূতিতে নিজেই লজ্জিত হতাম বার বার।
'সে' সামনে এসে দাড়ালে আমি লজ্জায় কুকড়ে অন্য দিকে চেয়ে কথার উত্তর দিতাম মাত্র। শারীরিক, মানসিক, আর্থিক কোন যোগ্যতাই নাই আমার তার পাশে দাড়ানোর, এক ভীষণ অস্বস্তি যেটা এড়িয়ে চলেছি এ জীবনে সব সময়।
আমার ভিক্ষুক ভাতা পাওয়ায় 'সে'র প্রতিক্রিয়াটা বোঝা গেল না। কথার আকুতিতে বুঝলাম আমাকে পেতে চায় সারা জীবনের জন্য। আমি বলি,
"আপনাকে আমি সেই প্রেমিক প্রবরদের মত এক বাটি ফুচকাও খাওয়াতে পারিনি কোন দিন, চাইনিজ রেস্তোরা তো দূরের কথা। ফোন করে খোজ নিতে পারিনি, নিই নি কোন দিন। আপনাকে মুগ্ধ করতে পারিনি কোন কথা বা কাজে। বিশাল দাড়ি গোফের কু দর্শন আমি, ভাল ভাবে ভাল সুষ্থ মানুষের ঘরে বেঁচে থাকার আপনার অধিকার ষোল আনা।
"আমার ঘরে কোন ফ্যান নাই, অনেকটাই খোলা আকাশের নিচে।আপনি শীতাতপ যন্ত্র ছাড়া বাঁচতে শিখেন নি। দুবেলা খাবার এক বাটি খাবার দুজনে খেলে ক্ষুধা মিটবেনা কারো। আপনি ফিরে যান আপনার বাবা মার কাছে, আমি একাই সুখে আছি, নিজের অসুস্থ মস্তিস্কের ভার কারো উপর চাপিয়ে তার জীবন টা নষ্ট করতে চাইনা।"
'সে' র অশ্রু রুদ্ধ কিছু কথা বুঝে নির্বিকারভাবে পাল্টা প্রশ্ন করলাম,
"আপনি থাকতে চান আমার সাথে?"
'সে'র দুচোখে সবেগে জল নামতে লাগলো সাথে ফোপানির মত শব্দ, মাথা নিচু করে 'হ্যা' সূচকভাবে মাথা নাড়ল, বরাবরের মতই সলজ্জ 'সে' ।
আমি সাথে সাথে মাথা ঘুরিয়ে অন্য দিকে তাকালাম। ভালবাসার এ প্রচন্ড জ্বালাকর সৌন্দর্যটার উপলব্ধি আমার ছিলনা কোন দিনও, সাথে অশ্রু আর একজনের সমর্পিত অস্তিত্ব সহ্য করার মত মন আর চোখ কেনটাই ছিলনা আমার।
এক নারী অস্তিত্বের কাছে শেরিফের সার্বিক পরাজয় হবে, এটা দুঃস্বপ্নেও দেখা হয়নি তার।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

