somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দুবাইয়ে ভিক্ষাবৃত্তি, লন্ডনের রাস্তায় রাত্রি যাপন কিংবা নিউইউর্কে ক্ষুধার্ত সন্ধ্যা

০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০০৮ ভোর ৫:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সেই হাজী রহিমুদ্দীন উচ্চ বিদ্যালয় , অজ পাড়া গ্রামের কথা। স্কুলের ইতিহাসের ৩ টা রেকর্ড ভাঙ্গার খ্যাতি থাকার পরেও প্রথম তিনটি স্থান থাকত নারীদের দখলে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত। সে বছর ঢাকার গভঃ বয়েজ থেকে গ্রামে বেড়াতে আসে সে স্কুলের মাঝারি মানের এক ছাত্র। তার কাছ থেকে কিছু টিপস নিয়ে পরবর্তী বার্ষিক পরীক্ষায় কাজে লাগাই। ফলাফল প্রথম স্থান এবং বিপুল ব্যবধানে ছিটকে পড়ে নারী প্রতিদন্দ্বীরা।

নারী কূলের কাছে মূর্তিমান ত্রাস এবং সেই সাথে "পাথর মুখো" শেরিফ উপাধী। গোটা ব্যাচ এক দিকে আমি আরেক দিকে বাস করি, নিভৃতচারে। ওরা ঠিক বুঝে উঠতে পারতোনা এক্ই গুরুর শিষ্য হয়ে এত নম্বরের ব্যবধান কেন হচ্ছে। নারীদের পুরনো কায়দা, প্রেমে ফেলে অগ্রসরমান পুরুষকে রাস্তার ফকির বানানো। মুখ ফসকে অন্য স্কুল থেকে আসা এক সহপাঠিনী বলে উঠল, "আচ্ছা শেরিফ ছেলেটা কি কখনও প্রেমে পড়তে পারেনা?"
সামনে দাড়ানো এক ছেলের মুখ গম্ভীর হয় গেল, " হি ইজ নট এ হিউম্যান, হি ইজ আ ম্যাশিন।"

সে আমলে ঢাকার আইডিয়াল, গভঃল্যাব, ভিকারুন নিসা নুন, হলিক্রসের দোর্দন্ড প্রতাপ, পাবলিক পরীক্ষা গুলোতে। ঢাকার শহরের মাঝেই সব মেধা স্থান। আমাকে বলা হল একটা অসম্ভব কাজ করতে, কিশোরগঞ্জের রহিমুদ্দীন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ঢাকা বোর্ডে স্ট্যান্ড করতে হবে। অনুভূতি শূণ্য হয়ে খাটতে লাগলাম, ২ জন শিক্ষকের অনুপ্রেরণায়। একটা ফলাফলের জন্য টানা ৬ বছর ঘর থেকে বের হয়নি খেলা ধূলা বা কোন উৎসবে।
ফলাফলঃ ৮ লেটার সহ স্টার, স্কুলের রেকর্ড ভঙ্গ। সবাই খুশি, দৌড়ে এল স্কুলে। শেরিফ কোথায়? বিশ্বকাপ ফুটবলে পেনাল্টি মিস করার অপরাধে কাতর হয়ে স্কুলের মাঠে শুয়ে আছে। সবার চোখে মুখে বিস্ময়, কেন এমন পাগলামি এত ভাল ফলাফলের পরেও? ও কি স্ট্যান্ড আশা করেছিল? ফলাফল মেনে নিতে পারেন নি আমার বাংলা ও ইংরেজির শিক্ষক। মাত্র ২ নম্বরের জন্য ঢাকা বোর্ডে স্ট্যান্ড করা হয়নি শেরিফের। মোহ ভঙ্গ হল সবার।

বাবার পক্ষে সম্ভব ছিলনা নটর ডেমে পড়ানোর, তাই আবার সরফউদ্দীন বেসরকারি কলেজ। টিনের চালা দিয়ে মাত্র কলেজের শুরু। এইচ এস সি পরীক্ষায় আবার মেধা তালিকায় নাম লেখানোর জন্য শেরিফ কে উটের জকি বানানো হল। যেদিন এস এস সি পরীক্ষা শেষ হয়, সেদিন সন্ধ্যায় এইচ এস সির বাংলা বই নিয়ে এলাম পড়া শুরু জন্য। শুরু হল নিখুত করার পরিশ্রম, প্রতিটা নম্বরের জন্য যুদ্ধ। স্ট্যান্ড আর কপালে জুটেনি। তবে এর মাঝে দু পাবলিক পরীক্ষা মিলিয়ে ১৮০৬ নম্বর ধারী শেরিফ।

ভর্তি পরীক্ষার জন্য আবার যুদ্ধ। ১১০ গ্রীন রোডের মিউ হোস্টেলে এক সপ্তাহ থাকার অনুরোধ রইল যদি জানতে চান কতটা অমানবিক পরিবেশের মাঝে শেরিফকে বেচে থাকতে হয়েছিল, পড়াশোনা গোল্লায় যাক যখন বেচে থাকাটাই দায়। গাজা খোর দের সাথে দোতলা বিছানা শেয়ার করে,ফার্মগেটের লোড শেডিং , গরম অন্ধকার ঘরে, সারাদিন গান-অশ্লীল আড্ডা। বাবার টাকা ছিলনা এত, কোন রকম সানরাইজে ৫০০০ টাকায় ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন।

জানিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিভাবে চান্স পেলাম। চোখের সামনে দেখেছি দেশের সেরা মেধা যাদের অনেকে আজ গুরুদেব রাগিব ভাইয়ের শ্যাম্পেন বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যালিফোরনিয়া বার্কেলে, অস্টিন, পারডু তে আছে। প্রতাপশালী নটরডেমিয়ান , ক্যাডেটদের বিরুদ্ধে যতটা সম্ভব জোরে বল করতাম। দু চার টা উইকেট পড়লে চোখে পানি চলে আসত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুতেই দেখা যেত অভিজাত কলেজ থেকে আসা ছাত্রদের সাথে শেরিফের বিপুল "কনসেপ্ট" এর পার্থক্য। শুরুতে খাপ খাওয়াতে না পেরে হতাশ হয়ে পড়া লেখা এক প্রকার ছেড়ে দিয়েছিলাম। সেখান থেকেই নৈরাশ্যবাদ জেকে বসে শেরিফের মাঝে, যেটা সে আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি, মানসিক অসুস্থতার সূত্রপাত ওখানেই। প্রতিদন্দীতার সংজ্ঞা জানা ছিলনা শেরিফের। কলেজের টেস্ট পরীক্ষায় ২য় বাছাই ছাত্রটি ছিল তার চেয়ে ১০৭ নম্বর দূরে।

দাতে দাত চেপে শেরিফ পড়েছে আরও কিছু বছর, বিশ্ববিদ্যালয়ে সেরা দশ ভাগে নাম লিখিয়ে শিক্ষকতা করেছিল কিছু দিন।এখন মানসিক রোগ বৃদ্ধির দায়ে কর্মচ্যুত, সমাজ চ্যুত, দেশ চ্যুত।

শেরিফের ঘর নেই, ছিলনা, বন্ধু-বান্ধব নেই, ছিলনা, প্রেম-ভালবাসার মানুষ নেই, ছিলনা, ঈদ নেই, ছিলনা, আশে পাশে কোন আত্মীয়-স্বজন নেই, ছিলনা। যুদ্ধ, কাজ, মেধা স্থান নিয়েই শেরিফের পরিচিত জগত। শেরিফ দেখেছে বাংলার গ্রামের শূণ্য বদ্ধ আন্ধার রাত থেকে নিউইয়র্কের ঝলমরে সকাল। শেরিফ ভাগ্য বিশ্বাস করে, তবে তার আগে পরিশ্রম। ভাগ্যে বিশ্বসের সাথে স্রষ্টার উপর বিশ্বাসটা ওতো প্রতোভাবে জাড়িত।

শেরিফ তাই নাস্তিক হতে পারেনি। নৈরাশ্যবাদের ধ্বংসাত্মক মোড়কে মোড়া শেরিফ কিভাবে শূণ্য থেকে অসম্ভব দিকে যাত্রা করল সেটা বিস্ময়। শ্রম দিয়ে কতজনের কপালে সাফল্য হয়?

সফল হলে আমার নিজের কৃতিত্বের কথা ভেবে পুলকিত হই, নিয়তি নিয়ন্ত্রক স্রষ্টাকে ভুলে যাই। আর ব্যর্থতা এলে স্রষ্টাকে দায়ী করে এক গাল কষে গালি দিয়ে নাস্তিক হয়ে যাই। কি অদ্ভুত মানুষের বিচার বিবেচনা।

নিউইয়র্কের রাস্তা থেকে সাঈফ শেরিফ, শূণ্য থেকে আবার যাত্রা শুরু। এবার শুধু নিজের সাফল্য নয়, দেশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনামের কথা মাথায় থাকবে ভীষণ। নিজের সাফল্যের পাশে দেশের নামটা উচ্চারিত হতে শুনে যে আনন্দ অশ্রু হবে সেটা স্বাদ বোঝার ক্ষমতা স্বদেশী "চেতনা ব্যবসায়ী"দের কমই আছে।

শেরিফ সবার দোয়া প্রার্থী।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০০৮ ভোর ৫:৫৫
৩২টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×