নারী কূলের কাছে মূর্তিমান ত্রাস এবং সেই সাথে "পাথর মুখো" শেরিফ উপাধী। গোটা ব্যাচ এক দিকে আমি আরেক দিকে বাস করি, নিভৃতচারে। ওরা ঠিক বুঝে উঠতে পারতোনা এক্ই গুরুর শিষ্য হয়ে এত নম্বরের ব্যবধান কেন হচ্ছে। নারীদের পুরনো কায়দা, প্রেমে ফেলে অগ্রসরমান পুরুষকে রাস্তার ফকির বানানো। মুখ ফসকে অন্য স্কুল থেকে আসা এক সহপাঠিনী বলে উঠল, "আচ্ছা শেরিফ ছেলেটা কি কখনও প্রেমে পড়তে পারেনা?"
সামনে দাড়ানো এক ছেলের মুখ গম্ভীর হয় গেল, " হি ইজ নট এ হিউম্যান, হি ইজ আ ম্যাশিন।"
সে আমলে ঢাকার আইডিয়াল, গভঃল্যাব, ভিকারুন নিসা নুন, হলিক্রসের দোর্দন্ড প্রতাপ, পাবলিক পরীক্ষা গুলোতে। ঢাকার শহরের মাঝেই সব মেধা স্থান। আমাকে বলা হল একটা অসম্ভব কাজ করতে, কিশোরগঞ্জের রহিমুদ্দীন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ঢাকা বোর্ডে স্ট্যান্ড করতে হবে। অনুভূতি শূণ্য হয়ে খাটতে লাগলাম, ২ জন শিক্ষকের অনুপ্রেরণায়। একটা ফলাফলের জন্য টানা ৬ বছর ঘর থেকে বের হয়নি খেলা ধূলা বা কোন উৎসবে।
ফলাফলঃ ৮ লেটার সহ স্টার, স্কুলের রেকর্ড ভঙ্গ। সবাই খুশি, দৌড়ে এল স্কুলে। শেরিফ কোথায়? বিশ্বকাপ ফুটবলে পেনাল্টি মিস করার অপরাধে কাতর হয়ে স্কুলের মাঠে শুয়ে আছে। সবার চোখে মুখে বিস্ময়, কেন এমন পাগলামি এত ভাল ফলাফলের পরেও? ও কি স্ট্যান্ড আশা করেছিল? ফলাফল মেনে নিতে পারেন নি আমার বাংলা ও ইংরেজির শিক্ষক। মাত্র ২ নম্বরের জন্য ঢাকা বোর্ডে স্ট্যান্ড করা হয়নি শেরিফের। মোহ ভঙ্গ হল সবার।
বাবার পক্ষে সম্ভব ছিলনা নটর ডেমে পড়ানোর, তাই আবার সরফউদ্দীন বেসরকারি কলেজ। টিনের চালা দিয়ে মাত্র কলেজের শুরু। এইচ এস সি পরীক্ষায় আবার মেধা তালিকায় নাম লেখানোর জন্য শেরিফ কে উটের জকি বানানো হল। যেদিন এস এস সি পরীক্ষা শেষ হয়, সেদিন সন্ধ্যায় এইচ এস সির বাংলা বই নিয়ে এলাম পড়া শুরু জন্য। শুরু হল নিখুত করার পরিশ্রম, প্রতিটা নম্বরের জন্য যুদ্ধ। স্ট্যান্ড আর কপালে জুটেনি। তবে এর মাঝে দু পাবলিক পরীক্ষা মিলিয়ে ১৮০৬ নম্বর ধারী শেরিফ।
ভর্তি পরীক্ষার জন্য আবার যুদ্ধ। ১১০ গ্রীন রোডের মিউ হোস্টেলে এক সপ্তাহ থাকার অনুরোধ রইল যদি জানতে চান কতটা অমানবিক পরিবেশের মাঝে শেরিফকে বেচে থাকতে হয়েছিল, পড়াশোনা গোল্লায় যাক যখন বেচে থাকাটাই দায়। গাজা খোর দের সাথে দোতলা বিছানা শেয়ার করে,ফার্মগেটের লোড শেডিং , গরম অন্ধকার ঘরে, সারাদিন গান-অশ্লীল আড্ডা। বাবার টাকা ছিলনা এত, কোন রকম সানরাইজে ৫০০০ টাকায় ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন।
জানিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিভাবে চান্স পেলাম। চোখের সামনে দেখেছি দেশের সেরা মেধা যাদের অনেকে আজ গুরুদেব রাগিব ভাইয়ের শ্যাম্পেন বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যালিফোরনিয়া বার্কেলে, অস্টিন, পারডু তে আছে। প্রতাপশালী নটরডেমিয়ান , ক্যাডেটদের বিরুদ্ধে যতটা সম্ভব জোরে বল করতাম। দু চার টা উইকেট পড়লে চোখে পানি চলে আসত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুতেই দেখা যেত অভিজাত কলেজ থেকে আসা ছাত্রদের সাথে শেরিফের বিপুল "কনসেপ্ট" এর পার্থক্য। শুরুতে খাপ খাওয়াতে না পেরে হতাশ হয়ে পড়া লেখা এক প্রকার ছেড়ে দিয়েছিলাম। সেখান থেকেই নৈরাশ্যবাদ জেকে বসে শেরিফের মাঝে, যেটা সে আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি, মানসিক অসুস্থতার সূত্রপাত ওখানেই। প্রতিদন্দীতার সংজ্ঞা জানা ছিলনা শেরিফের। কলেজের টেস্ট পরীক্ষায় ২য় বাছাই ছাত্রটি ছিল তার চেয়ে ১০৭ নম্বর দূরে।
দাতে দাত চেপে শেরিফ পড়েছে আরও কিছু বছর, বিশ্ববিদ্যালয়ে সেরা দশ ভাগে নাম লিখিয়ে শিক্ষকতা করেছিল কিছু দিন।এখন মানসিক রোগ বৃদ্ধির দায়ে কর্মচ্যুত, সমাজ চ্যুত, দেশ চ্যুত।
শেরিফের ঘর নেই, ছিলনা, বন্ধু-বান্ধব নেই, ছিলনা, প্রেম-ভালবাসার মানুষ নেই, ছিলনা, ঈদ নেই, ছিলনা, আশে পাশে কোন আত্মীয়-স্বজন নেই, ছিলনা। যুদ্ধ, কাজ, মেধা স্থান নিয়েই শেরিফের পরিচিত জগত। শেরিফ দেখেছে বাংলার গ্রামের শূণ্য বদ্ধ আন্ধার রাত থেকে নিউইয়র্কের ঝলমরে সকাল। শেরিফ ভাগ্য বিশ্বাস করে, তবে তার আগে পরিশ্রম। ভাগ্যে বিশ্বসের সাথে স্রষ্টার উপর বিশ্বাসটা ওতো প্রতোভাবে জাড়িত।
শেরিফ তাই নাস্তিক হতে পারেনি। নৈরাশ্যবাদের ধ্বংসাত্মক মোড়কে মোড়া শেরিফ কিভাবে শূণ্য থেকে অসম্ভব দিকে যাত্রা করল সেটা বিস্ময়। শ্রম দিয়ে কতজনের কপালে সাফল্য হয়?
সফল হলে আমার নিজের কৃতিত্বের কথা ভেবে পুলকিত হই, নিয়তি নিয়ন্ত্রক স্রষ্টাকে ভুলে যাই। আর ব্যর্থতা এলে স্রষ্টাকে দায়ী করে এক গাল কষে গালি দিয়ে নাস্তিক হয়ে যাই। কি অদ্ভুত মানুষের বিচার বিবেচনা।
নিউইয়র্কের রাস্তা থেকে সাঈফ শেরিফ, শূণ্য থেকে আবার যাত্রা শুরু। এবার শুধু নিজের সাফল্য নয়, দেশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনামের কথা মাথায় থাকবে ভীষণ। নিজের সাফল্যের পাশে দেশের নামটা উচ্চারিত হতে শুনে যে আনন্দ অশ্রু হবে সেটা স্বাদ বোঝার ক্ষমতা স্বদেশী "চেতনা ব্যবসায়ী"দের কমই আছে।
শেরিফ সবার দোয়া প্রার্থী।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

