আমার প্রিয় পোস্ট

প্রবাসে আরেকটি দিন

০২ রা মে, ২০০৯ সকাল ৭:৫৭

শেয়ারঃ
0 0 0

'উদ ইউ লাইক তু হ্যাভ সাম কেইক?'

ফেডের শিশু সুলভ কন্ঠে সম্বিৎ ফিরে পেলাম।

'নো থ্যাঙ্কস!'

জানালাম মুড ভাল নেই, আজ আমার নানী মারা গিয়েছেন। একবার 'না' বললে দ্বিতীয়বার খাবারের জন্য এরা সাধেনা।

হঠাৎ একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখা গেল কাউকে চেনা যাচ্ছেনা। আলঝেইমার রোগের শুরু টা এমনি হয়ত! কিছু পরেই দূরবর্তী কোন স্মৃতির সাথে মিলতে থাকে খুব কাছের মুখ গুলো। তারপর আস্তে আস্তে সেটাও ম্লান হতে থাকে। এভাবে নির্বাক হয়ে ৮ টি বছর স্মৃতি শূণ্যতার প্রকোপ ধরে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে যাওয়া। মৃত্যু শয্যায় থেকে প্রিয়জনের সাথে শেষবারের মত দুটো কথা বলার সৌভাগ্য কতজনরই বা হয়! আকস্মাৎ কোন দুর্ঘটনা কিংবা বহুল পরিচিত হার্ট এটাক! মরার আগে কিছু বলার ছিল প্রিয় মানুষদের, সে সুযোগ ও নেই।

আলঝেইমারের ব্যাপারটি নীরব নিশ্চিত দুর্ঘটনার মতই। স্মৃতি হারানো পর থেকেই কার্যত তিনি মৃত, বলার বা ভাববার কিছু মাত্র শক্তি আর থাকেনা। এভাবে ৮ টি বছর অথবা সঠিক করে বলতে আট বছর আগেই তিনি আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিয়েছেন কিছু বলার সুযোগ না পেয়ে। হয়ত বা বলারও কিছু ছিলনা। কিন্তু আমার মত তরুণ হঠাৎ ধাবমান ট্রাক টিকে সামনে দেখে স্রষ্টার কাছে কিছুটা সময় চেয়েছিল ভালবাসার মানুষটিকে জানাতে যে তাকে কত ভালবাসে সে, হয়ত কখনই মুখ ফুটে বলা হয়নি লোক লজ্জার ভয়ে। মগজ ছিটকে যাবার সাথে সাথে ভালবাসার অনুভূতি গুলো অনস্তিত্বে চলে যায়। গল্পের পাঠক ভালবাসা বিমুখ এক বর্বর স্রষ্টার মূর্তি একে নাস্তিক হয়ে পড়ে।

আর দশ বছর পরেই আমি পঞ্চাশের বৃদ্ধ ভাবলেই ভর পেটে ধরানো সিগারেট টা ভীষণ তিতকুটে লাগতে থাকে। সিড়ি ভেঙ্গে নামার সময় চোখাচোখি হয় কোন দেবী দর্শন রক্ষণশীল আরব যুবতীর সাথে, অনধিকার চর্চার ভয়ে চোখ নামিয়ে ফেলি। বাইরে গিয়েই নিকোটিনের ধোয়ায় শ্বাস টেনে অস্থির নিজেকে শান্ত করি। নাহ্, বয়স আমার বেশি নয়, তবু এ যাবৎ ক্ষুধা, শ্রম, কাগজ কালির পিছনে যে সময় ব্যায় হয়েছে বিরতি ও ক্লান্তিহীনভাবে নির্বান্ধব পরিবেশে, মনে হয় এ যেন চল্লিশ বছরের জীবন দাহ।

দেশের মানুষ তাপ দাহে আছে জানি, তবুও টানা হেচড়ার জীবনটাতে ক্লান্তি-শ্রান্তি নেই। দেশ ছাড়ার কিছু দিন আগেই মুম্বাই আই আই টির ছেলে রাকেশের সাথে পরিচয়, একই স্কুলে গন্তব্যের সূত্র ধরে। হঠাৎ এক রাতে শুধাল আমি ম্যাট ল্যাব পারি কিনা? জানাল ম্যাট ল্যাবে একটা ফাংশন লিখে দিতে হবে, প্রোজেক্টের মাঝে এসে আটকে গিয়েছে। কালকেই আমার কোর্স প্রোজেক্ট জমা, তবু বন্ধুত্বের খাতিরে নয়, দেশের কথা ভেবে খুব সাহস করে কাজটা নিলাম। চল্লিশ মিনিটের মাথায় কোড টা মেইল করে দিলাম। তার মুগ্ধতা আর কৃতজ্ঞতা দেখে ভীষণ তৃপ্তি পেলাম নিজের দেশটাকে আরেকটু তুলে ধরতে পেরে। এ ছোট ছোট অর্জন গুলোই বাচিয়ে রাখে কাজের স্পৃহা, এক জন নৈরাশ্যবাদীর জীবন চলা।

প্রথম দর্শনেই রাকেশের মত আমি দেখতে পাকি অথবা সাউদীদের মত! প্রায় ছ'ফুটি বাঙালি সে আশা করেনি। বিব্রত হবার কথা জানাতেই দেখি সালাম দিচ্ছে। আমিও নিয়মিত নমস্কার দিয়ে জানলাম কংগ্রেসের ঘোর সমর্থক সে, রাজনীতিতে নামার প্রবল ইচ্ছে তার। অথবা পাশের বিল্ডিং এ পরিচয় মাইক রিচার্ড কে দেখি একদিন মসজিদে জুম্মার নামায়ে, বিস্ময়ে হতভম্ভ হয়ে তার ল্যাবেরই আরেকজন কে শুধালাম। জানাল তিন সপ্তাহ আগে সে নতুন মুসলিম হয়েছে!

ফেড ততক্ষণে ল্যাবের অন্যদের কেক সাধা শুরু করেছে। খুব রহস্য করার পর জানাল তার গার্ল ফ্রেন্ড সুদূর জার্মানি থেকে কেক বানিয়ে পার্সেল করে পাঠিয়েছে। খুব গম্ভীরভাবে বললাম,

"ইউ নো ফেড, আই শুড বি জেলাস অফ ইউ নাও!"

ফেড আমার আগা গোড়া মনস্তত্ব জানে, জেনেই হেসে বলল,

"ইউ আর সো ফানি!"

স্মিত হাসিটা চেপে চোখ ফিরিয়ে নিলাম মনিটরে আবারও কাজের দঙ্গলে যার কোন অন্ত নেই, শব যাত্রার কাল ঠিক হবার আগ পর্যন্ত ।

 

সর্বশেষ এডিট : ১২ ই মে, ২০০৯ রাত ৩:৩২ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

৫. ০২ রা মে, ২০০৯ সকাল ৮:৪১
নিরক্ষর বলেছেন: লেখাটা আপনার মতই হয়েছে। :(
০২ রা মে, ২০০৯ সকাল ৮:৪৪

লেখক বলেছেন: বাহ্, সাপের লেজ সাপের মুখেই ঢুকিয়ে দিলেন। তা মুখ ভার কেন?

৭. ০২ রা মে, ২০০৯ সকাল ৯:৩৮
এস.আর.এফ খাঁন বলেছেন: আর দশ বছর পরেই আমি পঞ্চাশের বৃদ্ধ
আমার শরীরকে গচ্ছিত রাখি কালের দ্রোনিতে,
অনধিকার চর্চার ভয়ে চোখ নামিয়ে ফেলি,
দেখি মাটির বক্ষে আমার পা ফেলার চিন্হে অনধিকার আঁকা।

ভালো লাগলো আপনার কষ্টটুকু। কষ্ট নেই হয়তো।
০২ রা মে, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:৩৮

লেখক বলেছেন: দেখি মাটির বক্ষে আমার পা ফেলার চিন্হে অনধিকার আঁকা। বাহ্!

কবিতা বানানোর চেষ্টা করলেন নাকি, ওটা আমার মাথার উপর দিয়ে যায়।কষ্ট যদি না থাকে তবে কি সুখ এসব লিখে বলুন তো?

৮. ০৪ ঠা মে, ২০০৯ বিকাল ৫:১১
প্রসূন বলেছেন: "আর দশ বছর পরেই আমি পঞ্চাশের বৃদ্ধ ভাবলেই ভর পেটে ধরানো সিগারেট টা ভীষণ তিতকুটে লাগতে থাকে।"

"বাইরে গিয়েই নিকোটিনের ধোয়ায় শ্বাস টেনে অস্থির নিজেকে শান্ত করি। "

"প্রথম দর্শনেই রাকেশের মত আমি দেখতে পাকি অথবা সাউদীদের মত! প্রায় ছ'ফুটি বাঙালি সে আশা করেনি।"

"চল্লিশ মিনিটের মাথায় কোড টা মেইল করে দিলাম। "

বাহ্ ! কি চমৎকার !!
৯. ১০ ই মে, ২০০৯ রাত ১২:৫০
শ্রাবনসন্ধ্যা বলেছেন: এ লেখাটা নৈরাশ্যবাদী র মত মনে হল না। ভীষণ প্রাণশক্তির সুবাস পাওয়া যাচ্ছে এতে।

প্রবাসের দিনগুলো সাফল্যের সাথে কাটুক, এ প্রত্যাশা।
আপনার বন্ধু তার বান্ধবীর কাছে ফিরে গেছিল, এমনটি জেনেছিলাম একবার, এখন আবার কি করছে আপনার ওখানে?
১০ ই মে, ২০০৯ রাত ৩:২২

লেখক বলেছেন: প্রচন্ড দ্বিধা দ্বন্দ্বের মাঝে ফেড সিদ্ধান্ত নিয়েছে শুরু করা পিএইচডি প্রোগামের ১ বছরের মাথায় চলে যাওয়াটা ঠিক হবেনা তার। তাই সে থেকে গেল আমাদের মাঝে। তারপরেও এ সামারে ফ্রাঙ্কফুটের টিকিটের দাম দর দেখছে, সেই মানবীর মুখ দেখার তর সইছেনা আর।

১০. ১১ ই মে, ২০০৯ রাত ১১:৩৮
নাহিন বলেছেন: "ছোট ছোট অর্জন গুলোই বাচিয়ে রাখে কাজের স্পৃহা, এক জন নৈরাশ্যবাদীর জীবন চলা।"

জটিল একটা কথা বলেছেন ভাইয়া।
লেখাটা ভালো লাগলো বেশ।
১১. ১৮ ই মে, ২০০৯ দুপুর ১২:৫৭
কে এম তানভীর আহম্মেদ বলেছেন: যাক আপনার মুখেই শোনা গেল যে আপনি নৈরাশ্যবাদী। নাহলে আমিই বলতাম। এতো নিরাশার কথা শুনতে ইচ্ছা করেনা, তবুও কেন যেন আপনার ব্লগে ঢুকি! কারণটা মনে হয় আপনার লেখাতে সামান্য আশার আলোও থাকে!!
১২. ১৮ ই মে, ২০০৯ রাত ৮:৩৯
আমড়া কাঠের ঢেকি বলেছেন: নাহিন বলেছেন: "ছোট ছোট অর্জন গুলোই বাচিয়ে রাখে কাজের স্পৃহা, এক জন নৈরাশ্যবাদীর জীবন চলা।"

জটিল একটা কথা বলেছেন ভাইয়া।
লেখাটা ভালো লাগলো বেশ।

 

মোট সময় লেগেছে ০.৯৮৮২ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
পরিত্যক্ত মানসিক রোগীরা ভাব প্রকাশের ক্ষুধা নিবৃত্তির দায়ে হয়তবা ব্লগের আশ্রয় নেয়। সেখানেও সামাজিক, বাস্তববাদীরা হানা দেয়। ভাব বিনিময়ের আদিম...
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ