somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মোহাবিষ্টতার কাল

২২ শে মার্চ, ২০১০ রাত ১:১২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সভা কক্ষের গোল টেবিলের চারপাশে ছড়িয়ে বসা দশজনের মাঝে আমি আর মিতালি বাদে বাকি সবাই সাদা। সাদাদের সাথে সংস্কৃতিগত তফাত থাকার কারণে নিজে থেকে যোগাযোগ করা বা পরিচিত হবার মত স্বস্তি থাকেনা।মিতালিকে প্রথমবার দেখে ভারতীয় মনে করেছিলাম।আমার বিদঘুটে চেহারার কারণে আমাকে তিনি অন্তত বাংলাদেশি মনে করেননি। উগান্ডা বা মাদাগাস্কারের জঙ্গলি বামন ভাবা অন্যায় কিছু ছিলনা।

তাই গুরুতর "প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ" মাথায় রেখে আগ বাড়িয়ে প্রশ্ন করলাম, "আপনি কি ভারতীয়?".... "নো, আই এ্যাম বাংলাদেশি।" চমকটা তাড়াতাড়ি হজম করতে গিয়ে পাল্টা প্রশ্ন, "এন্ড ইউ"? পাঁচ ফুটি গোলগাল শিশু সুলভ চেহারার মাঝে বয়সের কারণে খানিকটা আভিজাত্য এসেছে। উজ্জ্বল বাদামী চোখ। কোলকাতার টানে শুদ্ধ বাচনভঙ্গির উৎস জানতে গিয়ে দেখি যশোরের মানুষ।তারপর হঠাৎ নির্বিকারভাবে, "আপনি আমার বয়সে বড়, আমাকে তুমি করে ডাকবেন।" এ ধরনের ভদ্র অনুরোধ রক্ষায় আমার বরাবরের মত আপত্তিটা সরাসরি জানাতে ইচ্ছে করেনি। যোগাযোগের পরিসরটা তখনও প্রাতিষ্ঠানিক, তাই নিয়মমত আপনি করে সম্বোধনটাই শিষ্টাচার মনে করি।

তারপর টেবিল বৈঠকগুলোতে কখনও বা অন্যদের সাথে নিয়ে, কদাচিৎ শুধু এই দু'জনের বসা হত। খুব পেশাদার কারণে আলাপের প্রসঙ্গ চ্যুতি হবার সুযোগ ছিলনা, বা দৃষ্টি সীমা ছড়ানো ছিটানো কাগজ, ল্যাপটপের পর্দার বাইরে যেতনা। কিন্তু সভা কক্ষ ছেড়ে বেরুলেই কিছু অপ্রাসঙ্গিক ব্যক্তিগত আলাপনের ভদ্র শ্রোতা হওয়া লাগত। গত ক্রিসমাসে ঐমুক শহরে গিয়েছিলাম, এই বসন্তের ছুটিতে খরগোশের বার্বিকিউ করলাম, সামনের বার ভাই-বোনরা এলে সাথে নিয়ে ক্যাম্পিং এ যাব। "আপনি কী ঔমুক শহরে গিয়েছেন?", বিব্রত হয়ে বললাম, "না, এখনও যাওয়া হয়ে ওঠেনি, দেখি সামনের বার কখনও সুযোগ পেলে...",...

"আপনি কি তাহলে কোথাও যাননি?" এবার একদম লজ্জিত হয়ে বললাম, "আসলে যাওয়া উচিত জেনেও যাওয়া হচ্ছেনা, হয়ত গণসংযোগের অভাব, একলা একলা তো বেরিয়ে পড়া যায়না। "..."এ কী কথা! এত বড় দেশ, না দেখে চলে যাবেন?" প্রসঙ্গ পাল্টাতে প্রশ্ন করলাম, "মাঝে দেশে গিয়েছেন কতবার? দেশে ফিরতে ইচ্ছে করে কখনও?" দেশ সংক্রান্ত প্রসঙ্গগুলো মিতালির কাছে অতীত এবং ভুলে থাকার মত বিষয়। প্রকাশভঙ্গি বলে দেয়, তাই কথা আর বেশিদূর এগোয়না। কিন্তু নিয়ম করে সপ্তাহে একবার সভা কক্ষে আসা এবং যাওয়া বাবদ যোগাযোগটা চালু ছিল। মাঝে খুব জরুরি প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনে ফোনালাপ এবং ইমেইল আদান প্রদান চলত।

হঠাৎ একদিন ঘরে ফেরার পথে, "চলুন আজ ঐ থাই রেস্টুরেন্টে আপনাকে খাওয়াই।" সিনিয়র হিসেবে সহকর্মীকে খাওয়ানোর প্রস্তাব আমারই আগে দেয়া দরকার ছিল, কিন্তু বিদেশি খাবারের মেন্যুতে "নীতিগত অরুচি" এবং সম্পর্কের মোড়, দূরত্ব পরিবর্তনের "আশংকা" মনের মাঝে খচ খচ করতো। "কফি চলতে পারে, বা কোন ভেজি ডিশ, এর বাইরে কিন্তু নয়।" রেস্তোরায় খাবারের পরিবেশটা "প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের" মত গুরুতর থাকেনা। সেখানো সুযোগ মত ব্যক্তি, পরিবার, ক্যারিয়ার নিয়ে আলোচনা চলে আসে।পছন্দ-অপছন্দের মিল অমিল গুলো নিয়ে কথা প্রসঙ্গ চলে আসে। এভাবে বেশ কয়েক মাস যোগাযোগের দূরত্বে স্থিতি থাকার পরে , মিতালির এই শহর ছেড়ে অন্যত্র স্থায়ী হবার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। আমাকে কার্ড দিয়ে জানায় আমার ব্যাপারে তার অব্যক্ত মূল্যায়ণ,

ট্রী কে দেখলে মনে হয় , স্থির , নিশ্চল , ভাবলেশহীন , একটা প্রাণহীন জিনিস , কিন্তু আসলে এর ভিতরেও প্রাণ আছে , অনুভূতি আছে , ব্যথা আছে , আনন্দ আছে , ট্রী ও কষ্ট পায় , আরাম পায় , প্রাণ এর সব সঞ্চার হয় , আপনি এরকম না ?, উপর দিয়ে একটা যন্ত্র , কিন্তু ভিতরে সব অনুভূতিই আছে , তাই , সাঈফ শেরিফ = ট্রী

বিদায় জানানোর সৌজন্য দেখাতে গিয়ে দেখি একটা শূণ্যতাবোধ থেকে কষ্ট হচ্ছে, যেটা আগে বুঝিনি, বুঝবার ইচ্ছা বা চেষ্টা ছিলনা। এমনি হয়। দেশে ফেরার জন্য পাগল লোকটিরও একটা মোহ তৈরি হয় ভিনদেশে এত বছর থাকা শহরটির জন্য। এটিও সেরকম। কোন প্রকার আবদার, আবেদনহীন আবেগ--- একটা মোহাবিষ্টার কাল। কিন্তু সমস্যা হল, আবেগটা অনুভূত হয় একটা কাল অতিবাহনের পরে। তারপর সময়ের দৈর্ঘ্য বাড়লে বেযোগাযোগের হাত ধরে সেই মোহাবিষ্টতার ধোয়াশা কেটে যায়।

সর্বশেষ এডিট : ২২ শে মার্চ, ২০১০ সকাল ৯:২৯
১৬টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এমন কেন?

লিখেছেন তাই-ফি, ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৪

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×