বেশ ক'দিন ধরে গা গরম। বিছানায় কম্বল মুড়ে শুয়ে থাকলে মনে হয় গায়ের জ্বলুনিটা আরো বাড়ে। তাই পুরনো অভ্যেস বশত গায়ের উত্তাপ উপেক্ষা করে হাটা চলা ফেরা করি, রাত না এলে বিশ্রাম করিনা। ব্যস্ততার কারণে সেলুনে যাওয়া হচ্ছেনা, চুল দাড়ির জঙ্গলের মাঝে নিজের চোখ দেখতে খারাপ লাগেনা। জঙ্গলের ভেতরের মানুষ, ঐ যে দুটো খোলা চোখ দেখা যায়।
জরুরি কিছু কাগজ পত্র তৈরি করার সময় ফিরতি ঠিকানা বসাতে গিয়ে আটকে গেলাম বরাবরের মত। বাসা বদলের ঝামলা, ঠিকানা তো স্থায়ী থাকেনা।দেশে ফিরলে যে দেশের ঠিকানা দিব, তারও কোন স্থায়ীত্ব নেই। ভাড়াটিয়াদের বাসা বদলের কারণে জরুরি দাপ্তরিক কাগজপত্র প্রায়শই এদিক সেদিকে খোয়া যায়। বিভিন্ন কাজে বৈধতার মেয়াদ ঘন ঘন উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়াটা ভীষণ বিরক্তিকর। অলসতার কারণে পুনঃ নবায়ণ না করে ক'টা দিনের জন্য দেশে গিয়ে বেড়িয়ে আসাটা ভাল।কিন্তু দেশে ফিরলে ক'টা মাসের জন্য বাড়ি ভাড়া নেয়া দরকার। ব্যাচেলর পুরুষ, বাড়িওয়ালার শ্যেন দৃষ্টি এবং অনিবার্য প্রত্যাখানের ব্যাপারটি ভাবলে গা শিউরে ওঠে। সংসার ধর্ম না করার পাপে নিজের দেশেও মাথা গোজার ঠাই নেই। গেলবার যে বাসায় ছিলাম, তার ত্রি সীমানায় কোন তরুণী নেই এটা নিশ্চিত হবার পরেই ভাড়া পেলাম। বাড়িওয়ালা আমার পূর্ব পরিচিত বিধায় চরিত্রের সনদ পেতে সমস্যা হয়নি, কিন্তু কন্যাওয়ালা প্রতিবেশীদের প্রবল আপত্তির মুখে নিজের এপার্টমেন্টটা অন্যদিকে বাছাই করতে হল।
এইবার এত ঝামেলা করার ইচ্ছে নেই। ঢাকার মানুষ টাকা চিনে। অগ্রিম এক লাখ ধরিয়ে সন্তুষ্ট করতে না পারলে, নিরাপত্তা জামানত হিসেবে আরো এক লাখ ধরিয়ে দিতে রাজি আছি।বুয়া আসবেনা বাসায়, রান্না বাড়া, ধুয়া মোছার কাজ আমি একাই সানন্দে করতে পারি। টাকা দিয়ে মাথা গোজার ঠাই পাবার পুরো অধিকার আমার আছে। এখানে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, দল, মতের কোন বিভেদের কথা সংবিধানে নেই। তাই কষ্ট করে হলেও কিছু টাকা জমানো লাগলো, দেশে ফিরলে কাজে দিবে।
কাগজ গুলো খামে ভরে স্থানীয় একটা ঠিকানা বসিয়ে দিলাম। কিছু পরেই জনৈক উনার তাৎক্ষণিক বার্তা এল।
--কী ভাইয়া, বড়দিনে দেশে যাচ্ছেন, জানালেন না, একবার দেখা টেখা দিবেন নাকি।
জ্বি, আপাতত দেশে মাথা গোজার ঠাই নিয়ে চিন্তিত, বাসাটা ঠিক হয়ে গেলে পকেটে টাকা থাকবে কিনা, সেটা নিয়েও ভাবতে হচ্ছে। অতিথিকে দাওয়াত করে খাওয়াতে পারবো কিনা এখনই নিশ্চিত করে বলতে পারিনা।
--সে কী, টাকার ভয় করেন কেন! আপনি আসলেই একটা ছোটলোক। আমি দাওয়াত দিলাম, আপনি এসে খেয়ে যাবেন।
জ্বি, যদি বাসা থেকে নিজে রান্না করে পাঠান, তবে রাজি আছি। প্রথমত জনৈক উনার রান্না চেখে দেখা, দ্বিতীয়ত, বাসার রান্না স্বাস্থ্যকর হবে। হোটেল মোটেলের খাবার পেটে সইবেনা আমার।
--তাহলে বলেন, খাবার নিয়ে কোথায় দেখা করতে হবে?
দেখা করার প্রশ্ন আসছে কেন? আপনি নিরন্নকে এক বেলা রেধে খাওয়াবেন, সেটা যথাস্থানে, যথা উদর পূর্তি করলেই তো যথেষ্ঠ। নাকি খাওয়ানোর সাথে দেখা করার কঠোর শর্ত বা উছিলা আছে? (ডিজিটাল হাসিমুখ) ।
--আপনি আসলেই একটা ছোট লোক, কথার ঢং জানেন না। ধুর! কার সাথে যে কথা বলে সময় নষ্ট করি।
রাগছেন কেন? আপনার বাসায় বরং বেয়ারা গোছের এক টোকাইকে পাঠিয়ে দিই। আপনি না হয় আপনার মা কে বলে রাখবেন একটা টোকাইকে খাওয়ানোর মানত করেছিলেন, তাই খাবারটা একটা টোকাইকে দিচ্ছেন। এইবার হল তো?
--(ডিজিটাল রাগী মুখ)। থাক দরকার নেই। আপনি আপনার মত থাকেন।
অতঃপর বিরক্তিকর দীর্ঘ নিরবতা শেষে, কোন বিদায় সম্ভাষণ ছাড়াই ডিজিটাল জগত থেকে উনার প্রস্থান। পরে কোন এক সময় ডিজিটাল জগতে ফিরে এলে যে বার্তাটা পাবেন তা আমার তরফ থেকে এমন হওয়া উচিৎ।
শারীরিক ও মানসিক অপবিত্রতার সুবাদে আপনাদের মত বড়লোকের (ছোট লোকের বিপরীতে, টাকা ওয়ালা অর্থে নয়) সামনে অস্তিত্বমান হওয়াটা আমার জন্য মানায়না।শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা দুটোই বেশ ছোয়াচে, তাই নিরাপদ দূরত্বে থেকে ডিজিটাল পরিসরেই যোগাযোগ থাকাটা কর্তব্য। ডিজিটাল যোগাযোগে একটা 'আনডু' বোতামও থাকে, কিন্তু বাস্তবে এসে কেউ ভুল সিদ্ধান্তে, ভুল ধারণা নিয়ে বাস্তব জীবনটাকে বিপর্যস্ত করুক, এটা আমি চাইনা। দুবাইয়ে ভিক্ষাবৃত্তি শেষে লন্ডনের রাস্তায় রাত্রি যাপন করলেও এই ডিজিটাল আমাকে অস্তিত্বমান পাবেন। কিন্তু বাস্তব শেরিফের খোজ, তার কোন বাস্তব ঘর, ঠিকানা, যেখানে বাস্তব শেরিফকে পাওয়া যাবে, সেটার চেষ্টা করলে শুধু শুধু ব্যর্থতার কষ্ট পাবেন।
বাস্তব শেরিফের অস্তিত্বের কোন স্থায়ী ঠিকানা নেই, আজ রাতের জন্য নিশ্চিত কোন ঘর নেই যে সেখানে গেলেই বাস্তবের শেরিফকে পাওয়া যাবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

