ক্ষুধা উপসর্গটা বেশ ক'দিন ধরে যন্ত্রণা দিচ্ছে। দুপুরে ভর পেটে খেয়ে ওঠার পরেও বিকেল না গড়াতেই আবার ক্ষুধা। এটা কী পুষ্টিহীনতা? হরমোনের সমস্যা? নাকি অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফল, বুঝবার উপায় নেই। যবের ছাতু হলে ভাল হতো, গুড় দিয়ে খেয়ে পেট ভারি রাখা যায় কিছুক্ষণ।
আমার নিজেকে নিয়ে নিশ্চয়ই কোন গোলমাল হয়েছে। দরজার পাশে দাড়িয়ে থাকা তরুণীটি ক'দিন আগেও আমাকে দেখলেই, সহোৎসাহে "ভাইয়া, কেমন আছেন" বলে কুশল জানতে চাইতো। রোজকার নিয়মে ব্যতায় ঘটলে অস্বস্তি লাগা স্বাভাবিক। আজ দু'দফা সামনে পড়তেই মাথা ঘুরিয়ে নিরবে সরে দাড়ালো।
আমার কি উচিত ছিল আজকের মত নিজের তরফ থেকেই কুশল বিনিময় করতে চাওয়া? নাকি সেটার মাঝেও আমার স্বভাবজাত সৌজন্য সংকট থাকবে বলে বিরত থাকাই মঙ্গল? নাকি পুরুষের অগ্রবর্তী হওয়াটা ব্যক্তিত্বহীনতা? নাকি বাইরের জগতে এমন কিছু বেফাস হয়েছে, যার কারণে এমন অবহেলিত সাক্ষাৎ! আমি তাই কোন মনোযোগী দৃষ্টি সংযোগ ছাড়াই সরে এলাম।
কিংবা আমি লঙ্গরখানায় একবেলা খাই, সেটা সে তার অতি কৌতূহল বা আগ্রহের বশবর্তী হয়ে জেনেছে। লঙ্গরখানার একটা অঘোষিত নিয়ম আছে। আমার সারা দিনের উপার্জন হয়ত ২ মুঠো চাল, সেটা বিনা শর্তে জমা দিয়ে ৪ মুঠো চালের সমপরিমাণ ভাত মিলে, সাথে কিছু নিরামিষ। দিনমজুরেরা যে যা পারে এনে জমা দিয়ে এক বেলা পেট ভরে খেয়ে ঘুমায়।আমার কি তবে লজ্জা পাওয়া উচিত? পেটের ক্ষুধা যে বড় কষ্ট দেয় জীবনের উপর।
কিংবা মাস প্রতি টাকা জমা নেয়া এক্সিম ব্যাঙ্কের গম্ভীর তরুণীটিকে আজ অস্বাভাবিকভাবে হাস্যোজ্জ্বল লাগছিল। অবশ্যই তার সহকর্মীদের সাথে। আমাকে বহুবার দেখেও না দেখার ভান করা মানুষটিও আজ হাসি মুখে "স্যার" সম্বোধন করতেই খেয়াল করলাম, হাত মেন্দি রাঙানো। এটা কি তবে সুসংবাদের ইঙ্গিত? হতেও পারে। সমাজ-সংস্কারের বিধিগুলো ঠিক জানা হয়ে ওঠেনি। সেগুলো বুঝবার জন্য ফ্যান্টাসি কিংডম বা বসুন্ধরায় বেহুদা চক্কর দেবার ফুসরতও হয়নি।
কারো আকস্মাত প্রকাশ্য অবহেলা, হঠাৎ মেন্দি রাঙানো হাত দেখে বেলা শেষে ঘরে ফেরার পথে মন কেমন যেনো খচখচ করে।অজ্ঞাত রোগের চিকিৎসায় এ ডাক্তার ও ডাক্তার করে বেহিসাবি বহু খরচ হয়ে যায়, ভাল হয়, সাময়িক।খরচ বন্ধ করলে, সেই পুরনো রোগ ফিরে আসে। রোগ, অর্থকষ্টের বাস্তবতার বাইরেও কারো মেন্দি রাঙা হাত, হাসিমুখ দেখে বেদনাতুর হতে পারি, নিজে এমন হীনমন্য ভেবে আরেক দফা কষ্ট হচ্ছিল।
আমার টাকা নেই, রোগ আছে। আমি নিরোগ নই। কথা গুলো কি বলতে গিয়ে হীনমন্যতায় ভোগা উচিত? কিংবা কোন মানুষ, মানবীর কাছে এসব অজুহাতে দয়া প্রার্থী হতে চাওয়াটা কতটুকু শোভন? আমার ঔষধ গুলো অস্বাভাবিক দামি, একদিনের ঔষধ বেচা টাকায় কোন তরুনীকে নিয়ে ভাজা মুরগির রেস্তোরায় এক সন্ধ্যা আড্ডা দেয়া যাবে।
কিংবা আমার কাছে আল্লাদ-আব্দার করার জন্য একটা পালক পিচ্চি আছে, শুনলেই তারা ঘৃণায় ছি ছি করে উঠবে। কিংবা তিথিদের কথা, কতইনা গতানুগতিকভাবে সুযোগ-সুবিধার সন্ধানে ওৎ পেতে থাকে শিকারী গুলো। সাড়ে তিন বছর ধরে পরিবারের জ্ঞাতসারে চুটিয়ে প্রেমের সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া অবৈধ তো কিছু না। বরং ভদ্র সমাজে একটা মানবীকে শারীরিক মানসিকভাবে সুরক্ষিত করে রাখা। "এদিকে নজর দিবেন না, উনার একজন সঙ্গী আছেন।"
তথাপি পরকীয়ার স্বর্ণযুগে "এনগেজড", "কমিটেড", "ইন রিলেশান শিপের" ব্যবসা, বিনিময়, বদল-অদল, কখনও বা "ভন্ডামি" বা নেহায়েৎ 'ভাত ছিটিয়ে নোংরা' করে খাওয়ার মত অপরাধ। পরিচ্ছন্নভাবে ভাত খাওয়াটা একটা শিল্প বৈকি! বিবাহপূর্ব সকল সম্পর্কের আবদার, আবেগ, অভিমান তাই এক দান ক্যাসিনোতে খেলে আসার মতই তুচ্ছ।
তিথিরা সুরক্ষিত ও সঙ্গীধারী জেনেই, তারই আরেক সহকর্মীকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল, "ভীতু" মানবীদের ভয় দূর করার। সহকর্মীর বংশ উচু , ভাল, ভদ্র, লম্বা, সুদর্শন। এসব চটকদার স্ট্যাটাসে তিথির প্রবল আগ্রহের কারণে বিয়ের আগে ওসব বহু দিনের তুচ্ছ কমিটমেনট, বিশ্বাস, এনগেজমেন্টের মাকড়সার জাল কোন ভুল ছাড়াই ঝুল ঝাড়ু দিয়ে মুছে ফেলা যায়। পেটের সন্তানকে উপেক্ষা করে যদি রক্ত-মাংসের পূজো দেয়, তবে বিয়ের আগে এত শত প্রতিশ্রুতির কী দাম?
আমরা তারপরেও সামাজাকিভাবে,পারিবারিকভাবে পারস্পারিক প্রগাঢ় অবিশ্বাস থেকে "এনগেজমেন্ট" নামক একটা নোংরামিকে উদযাপন করি, যেটা ভঙ্গ হলে কারো কোন অভিযোগ, দায়, ক্ষতিপূরণ, মামলা নেই। অবিশ্বস্ত মানুষের মন-ভালবাসা-চিন্তাকে এক কেন্দ্রীক করার একটা লৌকিকতা মাত্র। সম্পর্কের একটা অন্যোন্যোপায় কিংবা "স্ট্যান্ড বাই" দশা। গাট ছড়া বাধার নির্দিষ্ট বয়সসীমার মাঝে আরো উপযুক্ত কেউ না আসলে, শেষ গতিটা এমনি হয়।
আমার হাজার বিশেক টাকা মাইনে থেকে দিন প্রতি এক প্যাকেট করে বেনসনের খরচ বাচিয়ে বাচিয়ে ফিরতি বিমানের খরচ তুলতে হবে। প্রবাসের সঞ্চয় প্রায় শেষের পথে। রুটি-রুজির তাগিদে ভিনদেশে ভিক্ষাবৃত্তির পেশাটা শুরু করতে হবে খুব শীঘ্রই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

