লেপটা আমার সব ক্লান্তি শুষে নিত। সাথে বাড়ি ওয়ালার দেয়া স্প্রিং এর ম্যাট্রেস। আমি গুটি শুটি শুয়ে বহুদূর আটলান্টিকের ওপারের দেশটার কথা ভেবে কাতর হতাম। প্রবাস তো ঘোর লাগা স্বপ্ন, দেশের স্মৃতিটাই আসল।
আচমকা ঘুম ভেঙ্গে যেতেই দেখি আমি যাত্রাবাড়ির কোন এক রাস্তায় ভিড় ঠেলে এগোচ্ছি। পুরনো এক ছাত্রের সাথে দেখা। কথা বিমর্ষ। দশ দিন আগেও তার ছোট বোনটা সুস্থ ছিল, জি পি এ ৫ পাবার আনন্দ ছিল। তারপরেই জ্বর, বিরামহীন, ক্যান্সার, কেমো, অচেতন । আমার কি স্বান্তনা দেবার ভাষা থাকা উচিৎ ছিল?
ক্যান্সারের ঘুমন্ত ম্যাচ বাক্স আমাদের সবারই শরীরে, কিংবা আমাদের ঘরের নিচে সুপ্ত ভূমিকম্প দানব। আমি তো পুরনো ঢাকার বৃদ্ধাশ্রমে একা ভাল আছি, কাজ করি, খাই। পিচ্চিটা ফোন করে মাঝে মাঝে আব্বু আব্বু করে। আমার তো অভাব অভিযোগ থাকা উচিৎ না। তারপরেও ম্যাচ বাক্সের কথা স্মরণ হয়, একবার জ্বলে উঠলেই ডি এন এ গুলো বিদ্রোহ করবে, লোহিত রক্ত কণিকা করবে আমরণ অনশন, বর্ধিষ্ণু কোষ গুলো মুহূর্তের মাঝেই ছড়িয়ে দিবে দৈহিক বিপ্লব।
তার আগেই আমি বিমর্ষ হয়ে পড়ি। মৃত্যুদন্ডের সাথে মরণব্যাধীর তফাৎ কোথায়? আয়োজন করে মৃত্যুর দিন গুণা! আমি দরজা বন্ধ করে দিই। রাস্তার মানুষ পাগল দেখলে কুকুরের মত লাঠি সোটা দিয়ে পিটিয়ে মারবে। তাহলে কি আচমকা মৃত্যুটাই ভাল, কম যন্ত্রণার?
এত অল্প বেতনে আমার চলেনা, পিচ্চিকে তাও ৫ হাজার করে দিই। পিচ্চি নিতে চায়না, তবুও। আমার কি নিজের কোন জীবন ছিল? কাউকে বিধবা করার চেয়ে নিজের মৃত্যুর ব্যাপারে স্বার্থপর হওয়াটা কি অন্যায়? পেটের দায়ে যখন দুবাই গেলাম, আমার কি বর্বরদের দাস হবার নৈতিক শক্তি ছিল? আমি তো দাসই, আরো ভালভাবে দিনমজুর। দেশ মাতা রুটি রুজি দিতে পারেনি, তাই দুর্মূল্যের বাজারে এ দেশ সে দেশ ভিক্ষা করি।
তারপরেও ভিনদেশে বর্ণবাদী দাঙ্গায় পড়ে হয়তো আমি লাশ হবো, বা মাথার রক্ত নামাতে, জীবন বাঁচাতে কাউকে লাশ করবো। ক্ষমতাবান মাত্রই বর্বর। আমৃত্যু বর্বরদের দাসত্ব করার পরেও সন্ত্রাসবাদীর তালিকায় নাম উঠবে, ভেড়ার পালের মত জল্লাদখানায় নেয়া হবে। সমাজচ্যুত থাকি বলে হয়তো সন্দেহের বশে দেশের পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে, গুম করবে ।
গুম করলে তার হদিসই বা কোথায় থাকবে, আমার তো ভোটার আইডি নাই, জাতীয় পরিচয় পত্র না্ই। আমি না হয় এবার চুপচাপ পালিয়ে যাই, লন্ডনের রাস্তায় সামনের শীতে পুরনো কম্বল গায়ে গুটিশুটি দিয়ে থাকবো। তারপর আবার ক্যান্সার, গ্রেফতারের দুঃস্বপ্ন দেখবো।
আমার নিজের কাছে নিজের অস্তিত্ব কি অনুভূত হয়? নাকি আপন আধাঁরে জেগে জেগে আমি অন্তহীন সিজোফ্রেনিক দুঃস্বপনকেই বাস্তবতা মনে করে ভুল করছি?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

