--পৌছেছেন?
--হুমম!
আমি জানি শক্ত সমর্থ তমাও আড়ালে কাঁদে। কান্নার দায়টা অবশ্যই আমার উপর চাপাবেনা, নিয়ম মাফিক নিজের উপরেই দিবে। পরাবাস্তবতা তিন বছরের হলে সেটা আর যান্ত্রিক থাকেনা, বিমূর্ত থাকেনা। তমা তাই বাস্তবে নিজের ঘর শুরু করতে পারেনা, অন্যায়, অযৌক্তিক আশায় থাকে। আমি আমার সমস্তঅক্ষমতার অনুযোগ নিয়েও তাকে ফেরাতে পারিনা। আমি চাই "হুমম" এর মাঝেই সব অনুভূতি সীমাবদ্ধ থাকুক।
তারপরেও মানুষের জীবনে একাকীত্ব আসে, আমার নৈরাশ্যবাদের মস্ত চিড়িয়া খানায় মড়ক লাগে, আমি হয়ত বেদনাতুর হয়ে, ভীষণ স্বার্থপরের মতই তমার কাছে কোনদিন মানসিক আশ্রয় চেয়েছি।প্রতিশ্রুতি নেই, সম্পর্কের কোন সঙ্গা অগ্রগতি নেই। হয়তবা সব কিছুর পরেও আমাদের ধর্ম আলাদা, সমাজ আলাদা বিবিধ বৈষয়িক অজুহাত দাড় করানো যাবে। পেটের দায়ে আজ বার্লিন, কাল টোকিও, পরশু সিডনি দৌড়ে নিজেকে প্রবোধ দিই, প্রতি বারেই পুরনো ম্যাট্রেসে ততোধিক পুরনো কুষ্টিয়ার কুমারখালির চাদর বিছিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।
নিজের আর্থিক, মানসিক দৈন্যদশার মাঝে কাউকে পণ বন্দী, পাণি বন্দী করারটা অপরাধ। আমি তাই তমার কোন মেইলের জবাব দেইনা। বিশাল মেইলের উত্তরে শুধু 'গুড লাক' জানিয়ে প্রস্থান করি।
--আপনি পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, প্রতারকের মত!
আমার মাসিক উপার্জন জানো কত, তমা? সঙ্গিনী পোষবার মত যোগ্যতা নেই, যখন হবে, স্থিতি হবে কোন এক শহরের কোণায় ততদিন আমার দ্রুত পড়ে যাওয়া চুল গুলোর অনুপস্থিতি জানিয়ে দিবে বার্ধক্যের কথা, চকচকে টাক শুধু তোমাদের অস্বস্তিই বাড়াবে।
আমাদের আর এ জীবদ্দশায় সাক্ষাতের কোন সুযোগ নেই, তমা। তুমি তোমার দেশের চাকুরিটা চালিয়ে যাও, পদোন্নতি হোক, দেশ প্রেমিক কোন উচু অফিসারকে পণ বন্দী করে সুখি হও। আমাকে দেখ, নিতান্তই এক দেশদ্রোহী।তারপরেও কী অদ্ভুত! ভিন দেশী ডিগ্রি নিয়ে আর শত সহস্র জনের মত চাকুরি করতে পারতাম, কিন্তু চাকুরি খোঁজারও প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করিনি। এতদিনে আমার হয়ত একটা বিদেশি চাকুরি থাকতো, গাড়ি থাকতো, ভাড়া করা সুন্দর বাসা থাকতো, সঙ্গ দেবার মত সহধর্মিনী থাকতো।আমার পুরনো সহকর্মীরা আমাকে উন্মাদই বলে, অথবা উচ্চাভিলাষী।
ব্যাপারটা কি এমন তমা, যে তোমাকে আড়াল করতে, ফিরিয়ে দিতে স্বার্থপরের মত ভিন দেশে নিজের জীবন গুছানোর চেষ্টা করেছি।করিনি। সেটা করলেই বরং সব চুকে যেত, তোমার মাঝে কোন আশা, শূণ্যতা, মায়া ভর করতোনা। কিন্তু বাবার সাথে আমার পুরনো চুক্তি। তিনি চান আমি যুদ্ধে নাম লেখাই। তাই পৃথিবীর পথে প্রান্তে আমি ভিক্ষা করি।পাশে সঙ্গিনী রেখে কি এই ভবঘুরে, দায়হীন জীবন কি সম্ভব ছিল?
যুদ্ধে গেলে নিজের জীবনকে অস্বীকার করার বাস্তব প্রয়োজনীয়তা আছে। আমি স্বার্থপরের মত কাউকে দু'দিনে জন্য কাছে টেনে বিধবা করতে চাইনা ।অথবা ভাজা মুরগি চিবানোর রেস্তোরায় যে তরুনীর সাথে প্রচন্ড মোহাচ্ছন্নতায় এক ঘন্টার সদালাপ করেছিলাম, সেখানের সংসার ধর্ম শুরু করার জীবনবাদী কথা উচ্চকিত ছিল।
দু'দিন বাদেই ওসবের কথা ভুলে, বিমানে চেপে মস্কোর রাস্তায় শীতে ঠকঠক করে কাঁপি। ঘর, সংসার, কথা, শ্রুতি, প্রতিশ্রুতি ভুলে নতুন শহরে নতুন মাথা গোঁজার ঠাই খুজি। কম্বলের সন্ধানে নামি।ছেলে যোদ্ধা হবে জেনেই হয়ত বাবা আমার অনুভূতিশূণ্য অমানুষ বানিয়েছেন।
দিনের পর দিন হয়তো এক বেলা খেয়ে থেকেছি, মাসের পর মাস ক্ষৌর কর্ম হয়নি । কিংবা বঙ্গোপসাগর, বসুন্ধরা সিটি, সেইন্ট মার্টিনে তোমরাই যাও ফি বছর, আমার কোন দিন অকাজে কোথাও যাবার ফুসরৎ হয়নি। বাঙালি হয়ে বঙ্গোপসাগর দেখিনি, কিন্তু অতলান্ত, প্রশান্ত মহাসাগর দেখবার দুর্ভাগ্য হয়েছে। সেটাও কোন আনন্দ ভ্রমণ ছিলনা, সঙ্গী ছিলনা।
বাবার পুরনো স্বপ্ন পূরণের দায়িত্ব আমার কাঁধেই, সেটা নিজের বিলাস-ব্যাসন ত্যাগ করে, আধা পেটা খেয়ে, নির্ঘুম অর্ধ যুগ পার করে হলেও শেষ করতে হবে।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জানুয়ারি, ২০১২ বিকাল ৪:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



