somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হঠাৎ লাউয়াছড়ার বনে

০৯ ই অক্টোবর, ২০০৮ রাত ১২:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

গত মাসের পুরোটাজুড়ে শুধু ঘুরে বেরিয়ে কাটিয়েছি। প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার বেরিয়ে পড়তাম, ঘুরেফিরে শনিবার রাতে বাসায় এসে ঘুম - রবিবার সকালে অফিস! এভাবেই একদিন হঠাৎ বেরিয়ে পড়লাম সিলেটের উদ্দেশ্যে, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ বন্ধু। প্ল্যান ছিল সিলেটে যাব - এরপর যদি সময় কুলায় তবে জাফলংটা দেখে আসব। যেমন ভাবা তেমনি কাজ। শুক্রবার ভোররাতে সেহরি করে গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নামলাম সিলেটের পথে। ভোরে রাস্তা একেবারে ফাকা, আধা ঘন্টার ভিতরে ঢাকার শেষ সীমায় পৌছে গেলাম, চিটাগাং রোডে উঠে গ্যাস নিলাম। পথে আমাদের একটাই চিন্তা ছিল, সিলেট পর্যন্ত গ্যাস পাওয়া যাবে কিনা- কেননা তেলের খরচ দিয়ে সিলেট গেলে আমাদের সারা মাস উপাস দিতে হতো! যাহোক, সারা রাস্তা আমরা গ্যাসেই পার করেছি।

ভৈরব গিয়ে একটা স্টেশন থেকে গ্যাস নিচ্ছি, তখন আমার মনে হল যেহেতু সিলেট যাচ্ছি - একটু পাহাড়- চাবাগান না দেখলেই নয়। এই ভেবে এক লরি ড্রাইভারের কাছে জানতে চাইলাম এমন কোন রাস্তা আছে কিনা যেটা চাবাগান, টিলা ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে গেছে। সে আমাকে জানালো যদি সরাসরি সিলেট না গিয়ে শ্রীমঙ্গল হয়ে যাই তবে চাবাগান দেখতে পাব। আমি আমার বন্ধুদের সে কথা বলতেই ওরা রাজি হয়ে গেল। আমরা নতুন উৎসাহে আগে সিলেট না গিয়ে হবিগঞ্জ-মৌলভীবাজারের পথ ধরলাম। পথে হবিগঞ্জে ফিনলের চা বাগান দেখা হল, তারপর কিছুটা বন, রাবার বাগান - এক কথায় মসৃন পীচঢালা অসাধারন এক রাস্তা। এমন একটা পথ বাংলাদেশের মধ্যে আছে না দেখলে বিশ্বাস হয় না। হবিগঞ্জের মধ্য দিয়ে যখন যাচ্ছি তখন এক জায়গায় লাউয়াছড়া বনের ডিরেকশন বোর্ড দেখলাম। তখনই ঠিক হল এতদূর যখন এসেছি তখন লাউয়াছড়া না দেখে ফিরবো না। সবাই হৈ হৈ করে সমর্থন জানালো। আমরা ছুটে চললাম আমাদের নতুন গন্তব্যে। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে লাউয়াছড়ার বন গাড়িতে মিনিট দশেকের দূরত্বে। চলতে চলতে হঠাৎ একসময় বনের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। রাস্তাটা বনের ভেতর এমন আকষ্মিক ঢুকে পড়েছে যে সবাই অবাক হতে বাধ্য। দুপাশে উচু উচু গাছের ঠাসবুনট। মাটিতে সূর্যের আলো প্রায় পড়েনা বললেই চলে। দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল, চারদিকে সুনসান নিরবতা, তবে মাঝে মাঝে দু-একটা বাস-মটরসাইকেল বনের নিরবতা ভেঙ্গে ছুটে যাচ্ছে। আমরা গাড়ি থেকে নেমে রাস্তা ধরে খানি হাটাহাটি করলাম, কিছু ছবি তুললাম। এবং তখনই ঠিক করলাম যে করেই হোক বনের মধ্যে ট্রেকিং করবো। লাউয়াছড়ার বনে হাটার জন্য কিছু ট্রেইল আছে, এসব ট্রেইল ধরে নিসর্গ প্রজেক্টের গাইডদের সহায়তায় বনের ভেতরে যাওয়া যায়। আমরা সেই উদ্দেশ্যে নিসর্গ প্রজেক্টের অফিস খুজে বের করলাম। সেখানে ঢোকার মুখে পরিচয় হল ধীরাজ সিংহর সাথে। ও একজন মনিপুরী এবং নিসর্গ প্রজেক্টের প্রশিক্ষিত গাইড। ওর সাথে নিসর্গের অফিসে গিয়ে অনুমতি নিয়ে এক ঘন্টার ট্রেইলে হাটার জন্য বনের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। বনে ঢোকার মুখেই চোখে পড়লো হনুমান!! আমরা যেদিকটা দিয়ে বনে ঢুকবো ঠিক সেখানটাতেই একটা উচু গাছের ঢালে বসে আছে, সাধারণ ডিজিটাল ক্যামেরা দিয়ে খুব ভাল ছবি তোলা গেলনা। এরপর একে একে আরো দুটা হনুমান দেখলাম। আমাদের ভাগ্য ভাল ছিল, অনেকে সারাদিন ঘুরেও কিছু দেখতে পায়না। তবে আমাদের লক্ষ্য ছিল লাউয়াছড়ার বিখ্যাত উল্লুক দেখা। লাউয়াছড়াতে উল্লুকদের ১৪ টা পরিবার আছে। আমরা যে ট্রেইলে হাটবো সেটাতে নাকি একটা পরিবার থাকে। তবে দেখা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু যখন বনে প্রবেশ করলাম তখন দেখি আমাদের সামনে বনের বেশ ভেতরে উল্লুকের চিৎকার-চেচামেচি। তখন মনে হল হয়তো এযাত্রা উল্লুকের দেখা পেয়ে যেতে পারি।

বনের ভেতর দিয়ে রাস্তা চলে গেছে, সেখানে পোজ দিয়ে দাড়িয়ে ;)


হনুমানের ছবি তুলতে গিয়েছিলাম, কিন্তু শুধু পেছনটা তোলা গেছে, বান্দর প্রজাতিতো, কিছুতেই স্থির থাকেনা!

আমরা সবাই বনের ট্রেইল ধরে সার বেশে হাটছি, হাটার পথ হলেও প্রকৃত অর্থে এই ট্রেইলগুলো বন্য জীবজন্তুর করা, মানুষ চলাচলের জন্যকিছুটা পরিস্কার করা হয়েছে, কিছুটা পথ গেছে পাহাড়ি ছড়ার পাশ ঘেষে। মাঝে মাঝে কাঠের পুল তৈরি করা। পথে নানা প্রজাতির মাকড়শা, কীট পতঙ্গ দেখলাম। চলতে চলতে হঠাৎ ধীরাজ ট্রেইল ছেড়ে একটা ছড়ার মধ্য দিয়ে গভীর বনে ঢুকে গেল উল্লুকের ডাক লক্ষ্য করে। আমরা সবাই ওর পিছু নিলাম। কিন্তু বন এত ঘন যে চলাই মুশকিল। সূর্যের আলো মাটিতে পড়েনা তাই স্যাতস্যাতে আবহাওয়া। গাছের পাতা পড়ে মাটি ঢেকে গেছে - অনেকটা স্পঞ্জের মত হয়ে আছে। কাটাঝোপ মরাগাছ ডিঙ্গিয়ে হাটতে গিয়ে শরীরে জায়গায় জায়গায় ছিলে গেল। এর মধ্যে শুরু হয়েছে জোকের উৎপাত। পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি জায়গায় জায়গায় রক্ত ঝরছে। এদিকে শব্দ হলেই উল্লুকের ডাকাডাকি থেমে যাচ্ছে, তাই যতটা সম্ভব শব্দ না করে চলতে হচ্ছে। একবার টিলা বেয়ে ওপরে উঠছি, আবার ছড়ায় নামছি, কিন্তু উল্লুকের দেখা মেলেনা। একসময় ধীরাজ ইশারা করল থামার, আমরা সবাই ওপরে তাকালাম উল্লুকের খোজে। ধীরজ একটা উচু গাছের মগডালের দিকে ইশারা করছে। আমরা তখন দেখতে পেলাম, দুইটা উল্লুক!! চকচকে কালো গায়ের রঙ, অদ্ভুত সুন্দর। উল্লুক গুলোও আমাদের দেখতে পেয়েছিল। তখন ডাকাডাকি বন্ধ, অবাক চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ছবি তোলার চেষ্টা করলাম, কিন্তু এতউচুতে ওগুলো যে ক্যামেরাতে কিছুই বোঝা যায়না। এরপর ফেরার পালা। ঘনঝোপ, বাশঝাড় আর কাটাগাছ থেকে গা বাচিয়ে আবার ট্রেইলে ফিরার পথ ধরলাম। একটা ছড়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম, একজায়গায় মনে হল বালু বেশ শক্ত- কিন্তু পা দিতেই দেবে গেলাম। চোরাবালি!! এক পা হাটুর ছাড়িয়ে বালুতে দেবে গেছে। নড়াচড়াকরতেই আরো দেবে যাচ্ছিলাম। পরে এক হাতে বাশের গোড়া ধরে অন্যহাতে এক বন্ধুর হাত ধরে উঠে আসলাম। উত্তেজনায় যখন কাপছি তখন শুনি কি যেন ডাকছে, কিছুটা কুকুরের মত। ধীরাজ বলল ওটা বার্কিং ডিয়ার! আমাদের তো পোয়া বারো। আব্দার ধরলাম ওটাও দেখবো, কিন্তু ধীরাজ জানালো তা সহজ নয়- যদি হঠাৎ সামনে এসে পড়ে তো আরেক কথা। যা হোক, তৃপ্ত নয়নে বনের মধ্যে একটা ফাকা জায়গায় এসে দাড়ালাম। পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি রক্তারক্তি কান্ড। আংগুলের চিমটি দিয়ে পাচ-ছটা জোক ছাড়ালাম। আমার প্যান্ট বালু আর পানিতে মাখামাখি। ট্রেইলের শেষের দিকে একটা পাহাড়ি ছড়া, পরিস্কার টলটলে ঠান্ডা পানি। তাতে হাতমুখ আর প্যান্ট পরিষ্কার করে নিলাম। খুব ইচ্ছা করছিল ওই পানি খাব; রোজা না রাখলে নির্ঘাৎ ওই পানি খেয়ে ফেলতাম, কারন আমার পাহাড়ি ছড়ার পানি খাবার অভিজ্ঞতা আছে, অসাধারন সুপেয় পানি সেগুলো। একসময় ট্রেইল শেষ হয়ে এলো। আমরা নিসর্গের অফিসে এসে খানিক বিশ্রাম নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম মাধবপুর লেক দেখার জন্য।

গভীর বনে আমরা.............

মাধবপুর লেকের কথা ধীরাজের মুখেই প্রথম শুনেছিলাম। এটি নাকি ফয়েস লেকের চাইতেও সুন্দর, কিন্তু বেশি কেউ এটার নাম জানেনা বলে অতট পরিচিত নয়। লাউয়াছড়া থেকে ছুটলাম মাধবপুর লেকের উদ্দেশ্যে। সে ভ্রমণ কাহিনী পরে কোনদিন।


জোকের খানাপিনা শেষ, এরপর আমাদের রক্তাক্ত পা...


লাউয়াছড়ার বনের কিছু ছবি দিয়ে দিলাম।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই অক্টোবর, ২০০৮ রাত ১২:১৬
২০টি মন্তব্য ১৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×