এখানে কথা আসে ইসলামের মূলসূত্র তাওহীদ নিয়ে। একক, একচ্ছত্র ক্ষমতাধর, সর্বজ্ঞানী, সর্বশক্তিমান কোন সত্বাকে নিজের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে মেনে নেয়া আর কোন এক প্রাচীন আরবের নিরক্ষর মরুযুবকের পক্ষ থেকে পৌছানো কথাকে সত্য মেনে তার ওপরেই নিজের মনন, চিন্তা, আচরণ, সমাজ আর ভবিষ্যতকে আত্মসমর্পন করা। এক দিক থেকে চিন্তা করলে পাগলামি আর অবিশ্বাস্যই মনে হয়। অন্য দিক থেকে ভাবি যে, মহাকালের তুলনায় ক্ষূদ্র স্ফুলিঙ্গের মত এই পৃথিবীর জীবনকেই বানানো হয়েছে পরীক্ষার জন্য। আর এই জীবনের মাঝেই তাঁর ইচ্ছা সৎ ও অসৎ কর্মশীলদের পৃথক করার। তাই যারা স্রষ্টার অনস্তিত্বের প্রমাণ খুঁজেছে হাজারো বছর ধরে, তারা তাদের প্রশ্ন আর যুক্তির ভান্ডারে যথেষ্ট প্রমাণ জড়ো করেছেন স্রষ্টাবিহীন সৃষ্টিতত্বের, আর অপর দিকে, যারা নিজেস্ব কৌতুহলেই হোক আর ধর্মপ্রবক্তার কথাকে মেনে নিয়েই হোক খুঁজতে চেয়েছেন সৃষ্টিকর্তাকে, তারা পেয়েছেন তাদের বিশ্বাসকে সুদৃড় করার জন্য অপূর্ব সব প্রমাণ আর নিদর্শনরাজি। নিজেকে সম্পুর্ণভাবে প্রকাশিত না করার ভিতরে নিশ্চই মহাস্রষ্টার বিজ্ঞতা রয়েছে, আমার ক্ষূদ্রবুদ্ধিতে ধরণীতে মাথা ঠেকিয়ে নিজের হীনতা প্রকাশ করা ছাড়া আর বেশী কিছু জানি না।
বিষয় হিসেবে ইসলাম আমার কাছে এক মেগা সাবজেক্ট মনে হয়, এখন আমার দেখা হল অন্ধের হাতীদর্শনের মতই, ইসলামের জ্ঞান মানে এর মাঝে আসে, কোরান, হাদীস, ফিকাহ, শরিয়া, তারিখ, সীরাহ, আকায়েদ আর এর যেকোন একটিতে বিজ্ঞতা অর্জনের জন্য মনে হয় এক জীবনকাল যথেষ্ট নয়। তার পরেও নুবুওয়াতের নূরের মাধ্যমে আল্লাহ রব্বুল ইজ্জত যে জ্ঞানের ঝর্ণাধারা পৃথিবীর বুকে প্রস্রবিত করেছেন তার ধারক আর বাহক হলেন সত্যপন্থী আলেমগণ। কারণ সম্পুর্ণ না হলেও, উক্ত বিষয়সমূহে উনারা অফিশিয়ালি কোয়ালিফাইড। তাই আমার ব্যাক্তিগতভাবে কোন প্রশ্ন থাকলে, কোন সন্দেহ থাকলে, কোন অভিযোগ থাকলে আমি বেশিরভাগ সময়েই চেষ্টা করি তাদের থেকেই ব্যাখ্যা নেয়ার জন্য। অনেক সময়েই উনাদের মত আমার পছন্দ হয়নি, সিদ্ধান্ত ভাল লাগে নাই, তাই গাঁইগুই করেছি, তর্ক করেছি ঘন্টার পর ঘন্টা, জিদ ধরেছি, কিন্তু বেশিরভাগ সময়েই একটা সমঝোতামূলক অবস্থানে আসা গেছে। আমার হিসাবে কোন রোগনিরাময়ের জন্য চিকিৎসকের বদলে প্রকৌশলী বা একজন শ্রমিকের ব্যাবস্থাপত্র নেয়াতে রুগীর অবস্থা শোচনীয় হয় বা মারা যায়, তাহলে এর জন্য দায়ী হল ভূল মানুষকে ব্যাবস্থাপত্রের জন্য মনোনায়ন করা। কারণ যায় ভিতরে এক দিক থেকে স্ট্যান্ডার্ড ইসলামীক কারিকুলাম হিসেবে প্রশিক্ষণ নাই (মরহুম আবুল আলা এই গ্রুপের), আর অপরদিকে যার ব্যাক্তিগত জীবনে আকিদা আর আমলে পছন্দসই না, এই ধরণের মানুষকেই আমরা অনেক সময়ে মডেল হিসেবে নেই আর নিজেদের প্রশ্নগুলোকে তাদের সামনে রাখি, তাতে মনে হয় লাভের চেয়ে ক্ষতির পাল্লাই ভারী হবে।
বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে অধিকাংশ সময়েই দেখি ইসলাম বৃক্ষের মূলকে দূর্বল রেখেই এর উপশাখা আর বৃন্তে সময়ক্ষেপণ করেন। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে মাঝে মধ্যে খুবই হতাশাজনক মনে হয় এই দৃষ্টিভঙ্গীকে। সর্বশেষ দূত হিসেবে মরুভস্কর দৃষ্টিসীমানা থেকে অস্তমিত হয়েছেন প্রায় দেড় শহস্রাব্দ আগেই, বর্তমানের প্রযুক্তি, শিল্প আর বাস্তবতা প্রতিমূহুর্তে মানুষকে ডুবিয়ে দিচ্ছে পার্থিবতার গভীর থেকে গভীরতর পঙ্কিলতায়, এই প্রজন্মের মুসলিমকে আল্লাহ পর্যন্ত পৌছানোর জন্য যেই আন্দোলন আর শিক্ষা প্রয়োজন তাতে প্রাসঙ্গিক খুঁটিনাটি চেয়ে মৌলিক শিক্ষার দিকেই মনযোগ কেন্দ্রীভূত হওয়া জরুরী। যার ঈমানের শিখা হবে দেদীপ্যমান, তার জন্য তো শুকনো পাতার স্তুপ আর নোটের বান্ডিল একই সমান মূল্যহীন, সোনার পিন্ড আর পাথরখন্ড এক দরজারই। সে বেচারা কেনই বা দূর্নীতি করবে, আর কেনই বা মিথ্যার আশ্রয় নিবে, আর কেনই বা ক্ষমতার লোভে অন্যের পদলেহী হবে। তার মাধ্যমে যদি অন্য মাখলুক আল্লাহর পরিচয় না পায় তবে সেই পরজীবনে আল্লাহর সান্নিধ্য কিভাবে আশা করতে পারে।
আমার নিজের অভিজ্ঞতা হল যে, একজন মানুষের জন্য ইসলাম গ্রহণ করা খুব জটিল বিষয় না। ইসলামের মজা হল যে, একজন ভিন্নমতের মানুষ তার জীবনের যেকোন অংশে ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলোকে স্বীকার করে নিলেই সে ইসলামের ভিতরে প্রবেশ করে গেল। কিন্তু তার ইহলৌকিক আর পরলৌকিক সর্বাঙ্গীণ কল্যাণের জন্য সেটাই যথেষ্ট না। মানুষ হিসেবে একজনকে আল্লাহর নিকটবর্তী হবার জন্য সর্বোত্তম আদর্শ হিসেবে তাঁর প্রতিনিধিকে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। আর তার প্রতিটি কথা কর্ম আর ইচ্ছার বাস্তবায়নই ইসলাম। মুখে বলা সহজ কিন্তু নিজের জীবনে নিয়ে আসা বড়ই জটিল।
তাই ইতিহাসে পাতা ওল্টালে বারে বারেই দেখা যায়, যে প্রতিটি যুগেই ভিন্ন চেহারায় বারে বারেই কিছু মানুষ ইসলামের নামের ভিতরে থেকেই এমন জিনিষকে অনুপ্রবেশ করিয়েছে বা করানোর চেষ্টা করেছে যা ইসলাম নয়। আর তার মাধ্যমে ইসলামের কোন কল্যাণও হবার কথা না। আর তাই সর্বদাই সত্যপন্থীদের বিরোধ ছিল এইসকল নব্যপন্থীদের সাথে। কখনো এইসকলের সাথে মোকাবিলা করা হয়েছে কথা, লেখনী, যুক্তি আর ভাষণের মাধ্যমে, আর কখনো হতে হয়েছে রক্তরঞ্জিত। কিন্তু যা সঠিক তার সাথে সমঝোতা করা হয়নি। আর তাই জন্যই ভন্ড মুসাইলামাতুল কাযযাবের অনুসারীরা হয়েছে নিশ্চিহ্ন, মুতাযিলা, রাফেযী আর খারেজীদের মতবাদকে আর কেউ বহন করেনি। তাই শীর্ষ সাহাবাদের অপছন্দকারী শীয়াগোষ্টী, নব্য নুবুয়তের দাবীদার গোলাম আহমেদ কাদিয়ানীর অনুসারীগণকে উদার মনভাবের পরিচয় দিয়ে কোলাকুলি করে নিজেদের মধ্যে নিয়ে নেয়ার উদার মানসিকতা মনে হয় আত্মহত্যারই নামান্তর। যদি ইসলামের মৌলিক নীতিমালায় মতপরিবর্তন করে সঠিক পথে আস তাহলে আমরা ভাই ভাই, আর নাহলে আমরা আশা করি আখিরাতে তাদের চেয়ে আমাদের প্রতিদান উত্তম পাওয়া যাবে।
আমি জীবনের সমস্যাগুলোর ক্ষেত্রে অনেক সময়েই বাস্তববাদী সমাধান খোঁজার চেষ্টা করি। কোন ডায়েবেটিস রুগীর জন্য ভাত ক্ষতিকর হলে আমার মনে হয় তার জন্য রুটির ব্যাবস্থা না করে ভাতের সাপ্লাই বন্ধ করলে তো খুনের পর্যায়ে চলে যাবে। তাই ভাতের বদলে কিছুনা র বদলে রুটি হওয়া উচিৎ। আমাদের দেশ, অবস্থা আর পরিস্থিতি বিবেচনা করলে এটাই বাস্তব যে, মৌলিক আর বিশুদ্ধতার সাথে সাথে ইসলামের ভিতরে কিছু পরিমাণে কুসংস্কার, বাড়াবাড়ি, বিদাআত আর মনগড়া জিনিষ ঢুকে গেছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সমাজের কল্যাণকামী অনেকেই এই সমস্যাগুলোকে প্রাচীন সংস্কারে বদলে আধুনিকতা দিয়ে সমাধান করতে চান। ফর আ মুসলিম দ্যাটস ম্যাডনেস। ইসলামে চমৎকার সব সমাধান আছে, এখন সেগুলোর অপপ্রয়োগের বদলে সুপ্রয়োগ প্রয়োজন। তা না হলে মুসলিম সমাজের মূল উদ্দেশ্যই তো গোল্লায় গেল। পিচ্চি উদাহরণ, জামায়েতে ইসলামী আর ততসংস্লিষ্ট শক্তির সাথে স্বাধীনতার স্বপক্ষের যতদিনের বিরোধ, তার চেয়ে অনেক আগে থেকেই এই বিরোধ চলে এসেছে শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরামের। তাদের হিসাবে এই দলটির উদ্দেশ্য, কার্যক্রম আর পরিকল্পনার মাধ্যমে যেই ইসলাম তারা উপহার দিতে চাইছে, সেটি ইসলামের অনেক ক্ষেত্রেই বিপরীত। আর সেটি নিয়ে তাদের বিরোধ বহু আগে থেকেই। এখন এই অপশক্তির বিরুদ্ধে যখন কোন কার্যক্রম বা বিবৃতি দেয়া হয়, তখন আমাদের মত দিন আনি দিন খাই মানুষ দেখে যে, বেশিরভাগ সময়েই একজন অধার্মিক বা কিছু ক্ষেত্রে স্বঘোষিত নাস্তিক একজন মানুষ দিব্যি হুজুর টাইপের মানুষের বিরুদ্ধে চিল্লাচিল্লি করছে। আমার হিসাবে অনেক ক্ষেত্রেই তাতে আমাদের মতন মানুষ তেমন একটা গা করে না। এখন জাতীয়ভাবে এটা যদি ফোকাস করা যায় যে, আমরা ভাল ইসলাম চাই আর এই অপশক্তির থেকে ইসলামের ভালর থেকে মন্দই বেশী হবে, আমার মতে এই কালনাগের মূলোৎপাটন আরো অনেক জলদি হত। কি হওয়া উচিৎ ছিল আর কি হচ্ছে।
তাই অসংখ্য কনফিউশন আর ধোঁয়াটে বাস্তবতার মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেললে ফিরে যেতে হয় বৃদ্ধ পয়গম্বরের স্বীকারোক্তির কাছে। ইন্নি ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাহি ফাতারস সামাওয়াতি ওয়াল আরদা হানিফাও ওয়ামা আনা মশইন্নি ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাহি ফাতারস সামাওয়াতি ওয়াল আরদা হানিফাও ওয়ামা আনা মিনাল মুশরিকীন।
"আমি এক মুখী হয়ে স্বীয় আনন ঐ সত্তার দিকে করেছি, যিনি নভোমন্ডল ও ভুমন্ডল সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরেক নই|"
[আমার ৯৯ তম পোস্ট হিসেবে একটু ভিন্ন কিছু লিখলাম।ঘুম থেকে উঠে কমেন্ট মুছতে হলে খারাপ লাগবে। এডভান্স সতর্কীকরণঃ( ]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

