প্রাচীনকালে আমার মা রুটি বানাইতেন

১১ ই আগস্ট, ২০০৮ সকাল ৭:৫৫

শেয়ার করুন:                   Facebook

আজকালকার দিনে বেড়ানোর মানুষজন কমে যাচ্ছে। আগেকারদিনের প্রধান বিনেদোনগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল বেড়াতে যাওয়া, আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে বেড়ানো, প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব আরো চেনাজানা কলিগ সবকিছু তো ছিলই। আজকালকার ব্যাস্ত নাগরিক জীবনে বেড়ানোর ঝোঁক মনে হয় আগের চেয়ে কিছু কমেই গেছে। কিন্তু তারপরেও একেবারেই মনে হয় উঠে যায়নি। বেড়ানোর সাথের আবশ্যিক অংশ হল নাশতা। এই একই টপিকে সুগৃহিনীদের স্বর্গসুখ আর কাঁচা গৃহিনীদের দূঃস্বপ্ন। পিচ্চিকালে দেখা যেত যেই বাসার নাশতা মজা সেই বাসাতেই বারবার যাবার ব্যাপারে আমাদের বিশেষ আগ্রহ ছিল, আর যেসব বাসায়র রান্না মুখে দিয়ে কোনরকম মুখ সোজা রেখে কোঁত করে গিলে, 'ভাবীর হাতের রান্না তো অসাধারণ' ধরণের কমেন্ট করতে হয়, সেসব বাড়িতে বেড়ানোর ব্যাপারে ছোটরা কেন বড়দেরও স্পষ্ট অনাগ্রহ টের পেতাম।

প্রসঙ্গ এইজন্য টানলাম, যে কিছুদিন আগ পর্যন্তও আমরা মোটামুটি আত্মনির্ভরশীল প্রজন্ম হিসেবে ছিলাম। মতলব ডোমেস্টিক নিডস এর একটা বড় অংশ দেখা যেত বাসা থেকেই পূরণ করার মত ট্রেনিং ছিল। নানা এক ধাক্কায় আধমনি মাছ নিয়ে আসলেও সেটা নানুই কুটে ফেলতে পারতেন। হলুদ মরিচ বাসার পাটাতেই নিয়মিত গুঁড়ো হত। আর বাসার পর্দা আর বালিশের কভার মা-ই সেলাই করতেন।

আমার প্রজন্মের দিকে তাকালে ভয়াবহ রকমের অপদার্থ মনে হয়। এই ধারাটি প্রথমে মনে হয় শুরু হয়েছিল গুঁড়ো মশলা দিয়ে। গৃহিনীদের আর হলুদ শুকিয়ে, পাটায় গুঁড়ো করে রাঁধতে হবেনা, এখন মশলাই গুঁড়ো হিসেবে পাওয়া যাবে। এখন পাটায় মশলা গুঁড়ো করা প্রায় প্রাচীন টেকনোলজী হয়ে গেছে। আমি শুনেছি, সেই ষাটের দশকে নানু সেই মাটির চুলোয় মহা টেকনিক করে পাউরুটি বানাতেন ইস্ট আর বেকিং পাউডার দিয়ে। এখন বাসায় পাউরুটির কথা বললে যেকোন গৃহিনী উলটে পড়ে যাবে। সোজা হিসেব, পাউরুটি তো বেকারী থেকে আসবে সেটি আবার বাসায় কি?

কয়েক বছর আগে মনে হয় বাংলাদেশে আসল রেডিমেট পরোটা। শুরুর দিকে "মালেশিয়ান রুটি পরোটা" নাম দিয়ে বাজারজাত করা হচ্ছিল, আজকাল মনে হয় দেশেই একগাদা প্রোডাকশন শুরু হয়ে গেছে। লন্ডনে দেখলাম আমাদের সামনেই রেডিমেড চপ কাটলেটের পাশাপাশি সিঙ্গাড়া, সমুচা আরো মেলা জিনিষ বাজারে এসে বাজার ভরিয়ে ফেলল। এখন যেই বাসাতেই বেড়াতে যাই, সেখানেই একই জিনিষ। ভাবে বোঝা গেছে পরোটা বানানোর স্কিল আর হোমমেড সিঙ্গারা সমুচা অতিদ্রুত নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। কারণ বেশিরভাবগ সময়েই যখনই কোন জিনিষকে কমার্শিয়ালাইজ করে ফেলা হয়, তখনি কমার্শিয়াল এফিশিয়েন্সির কাছে ডোমেস্টিক প্রোসেস মার খেয়ে যায়।

কদিন আগেই পড়ছিলাম, সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে বেশীর থেকে বেশী আমেরিকান পরিবার সম্পুর্ণ রেডিমেড খাবার আর ফাস্টফুডের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। (কারণগুলো আমাদের জন্যও একটু ভাবার কারণ আমরা তেনাদেরই কপি করি কিনা)। প্রথমত ফাস্টফুডের কোম্পানীগুলো এতই এফশিয়েন্ট হয়ে উঠেছে, যে যেই খাবার রেডিমেড বা বাইরে তৈরি পাওয়া যায় বিশ ডলারে সেটির জন্য তিন দোকান ঘুরে বাজারসদাই করে, তারপরে দুইঘন্টা ধরে রান্না করার পরে হিসাবে তার চেয়ে খর্চা বেশীই পড়ে। দ্বিতীয়তঃ অনেক পরিবারেরই গৃহিনী বলতে আমরা যা বুঝি তার গঠনটা আর নেই, স্কুল কলেজ পড়াশোনা, সেই সাথে বাড়ি থেকে ফরেভার আউট আর সেখান থেকেই সঙ্গী-সঙ্গীনি জুটিয়ে নিয়ে জীবন ফলে সংসারের ট্রেনিং অনেক সময়েই নেয়া হয়না, আর সবাই কাজ করছে মানেই হল সবারই কামাই আর খর্চা করার স্বাধীনতা। তৃতীয়তঃ আলসেমী তো আছেই।

বাইরের রেডী খাবার মানেই মুনাফার উদ্দেশ্যে তৈরি আর মূনাফার জন্য বাজারের আরো দশ ব্র্যান্ডের সাথে মারপিট আর স্বাদ বাড়ানোর চিরন্তন সহজ বুদ্ধি হল ক্যালোরী আর ফ্যাট বাড়ানো। এই স্লো টিকিং টাইমবোম্বের চেয়ে বড় বিভীষিকা আমেরিকার জন্য (ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য আর আজকালকার এশিয়ার সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোও খুব পিছিয়ে নেই)। আজকালকার 'সন্ত্রাসী'দের ঘটে আরেকটু বুদ্ধি থাকলে আমেরিকার সাথে যুদ্ধমুদ্ধ না করে একটু অপেক্ষা করলেই পারে। কারণ যেহারে গোলালু হচ্ছে পুরো দেশ, বেলুনের মত ফেটে পড়তে খুব বেশী বাকি নাই বুঝি।

ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না পাটা আর বেলনী কি আমাদের চোখের সামনেই জাদুঘরে চলে যাবে কিনা। তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে আমি বলব আমাদের প্রজন্মের কাছে টিকে যাবার হালকা সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে।


[লেখা শুরু করেছিলাম কি যেন বিষয় নিয়ে, এইটা যে ক্যামনে মোটকা এমেরিকান দিয়ে শেষ হল বুঝলাম না। স্যরি :(]

 

প্রকাশ করা হয়েছে: আমার দিনকাল  বিভাগে ।

 

  • ১৪ টি মন্তব্য
  • ১৪৫ বার পঠিত,
Send to your friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ৭ জনের ভাল লেগেছে, ০ জনের ভাল লাগেনি
১. ১১ ই আগস্ট, ২০০৮ সকাল ৮:০৮
comment by: বিডি আইডল বলেছেন: ভালো লাগলো পড়ে...আহারে কতদিন মায়ের হাতের খাবার খাইনা
২. ১১ ই আগস্ট, ২০০৮ সকাল ১০:১৩
comment by: ঘাসফুল বলেছেন: খুব ভালো লাগলো --
নষ্ট অতীত মনে করানোর জন্য প্লাস :)
৩. ১১ ই আগস্ট, ২০০৮ দুপুর ১২:৪৬
comment by: ফারহান দাউদ বলেছেন: ব্যাপক লেখা।:)
"যেই বাসার নাশতা মজা সেই বাসাতেই বারবার যাবার ব্যাপারে আমাদের বিশেষ আগ্রহ ছিল, আর যেসব বাসায়র রান্না মুখে দিয়ে কোনরকম মুখ সোজা রেখে কোঁত করে গিলে, 'ভাবীর হাতের রান্না তো অসাধারণ' ধরণের কমেন্ট করতে হয়, সেসব বাড়িতে বেড়ানোর ব্যাপারে ছোটরা কেন বড়দেরও স্পষ্ট অনাগ্রহ টের পেতাম।:)
৪. ১১ ই আগস্ট, ২০০৮ দুপুর ১:২৪
comment by: মাহবুব সুমন বলেছেন: খুব ভালো লাগলো লেখাটা। নস্টালজিক লেখা।

আমার মা মনে হয় এখনো সেই প্রাচীনযুগে পড়ে আছেন। উনি এখনো নিজের হাতে বানান।
মজার ব্যপার কি জানেন ? আমিও নিজের হাতে বানাই। আগে বানাতে পারতাম না, বানাতে গিয়ে আফ্রিকা বা ইউরোপের ম্যাপাকৃতি হয়ে যেতো। এখন মোটামুটি গোল হয়। পরোটাও নিজে বানাই যদিও রুটি-পোরোটা সব কিছুই দোকানে রেডিমেইড পাওয়া যায়। বাকি সব মাঝে মাঝে দোকা থেকে কিনে আনলেও এখন অনেকসময় নিজেরাই বানিয়ে নেই। বেশ মজা লাগে কিন্তু।
ব্যস্ত জীবন তবে এসব কাজের জন্য সময় ঠিকই বের করে নেই।

ধন্যবাদ লেখাটির জন্য।
১১ ই আগস্ট, ২০০৮ বিকাল ৪:৩৩

লেখক বলেছেন: আমিও মেলাকিছু নিজের দায়িত্বে ঠেকায় পড়ে শিখেছি।

তয় আমার একটা একভান্টেজ হইল আমি তিনবেলার ভাতখোর। ডেগ ভইরা ভাত রান্ধি দিনের পর দিন পার হয়ে যায়।

প্রোব্লেম হল, প্রাচীন যুগে আছেন আপনার মা, আমার মা সহ অসংখ্য মায়েরা, কিন্তু ভাবে যা বোঝা যাচ্ছে আমাগোর নাতি নাতকুরের শিওর স্পেস এজে থাকবে।

৫. ১১ ই আগস্ট, ২০০৮ দুপুর ১:৩৩
comment by: ফারহান দাউদ বলেছেন: বাংলাদেশে রেডিমেড পরোটা নামে যে জিনিস পাওয়া যায় ঐটার মত জঘন্য খাদ্য দুনিয়াতে কম আসে,আপনাদেরও কি ঐ রকম নাকি?
১২ ই আগস্ট, ২০০৮ ভোর ৪:১৪

লেখক বলেছেন: নিজে রান্না করলে যেই অখাদ্য হয় তার তুলনায় রেডীমেড পরোটা খুব খারাপ লাগেনা :)

৬. ১১ ই আগস্ট, ২০০৮ দুপুর ১:৪৮
comment by: আহসান হাবিব শিমুল বলেছেন: সময়টা টিকেট কেটে চাঁদ দেখার সময়।
খাবার,ঘুম,বিনোদন,ভালোলাগ,ভালোবাসা সবই তো অটোমোশনে চলে ।
আর দিনকতক পড়ে চিন্তা-চেতনা,লেখা ইত্যাকার সব মানবিক অনূভুতির প্রকাশ হয়তোবা অটোমেশনে যাবে,কে জানে!

৭. ১১ ই আগস্ট, ২০০৮ দুপুর ১:৪৯
comment by: |জনারন্যে নিসংঙগ পথিক| বলেছেন: খুবই ভালো পর্যবেক্ষন| আহারে আম্মার রান্না!
৮. ১২ ই আগস্ট, ২০০৮ ভোর ৬:২৪
comment by: বিলাস আহমেদ খাঁন বলেছেন: কতদিন আম্মার হাতে রান্না করা খাবার খাইনা! এখন নিজে রান্ধি।
ধন্যবাদ।
৯. ১২ ই আগস্ট, ২০০৮ ভোর ৬:৪৫
comment by: কঁাকন বলেছেন: চাকরে বাচ্চা সামলানো তারপরো মেয়েরা রান্না করে এটাই তো বেশি
মশলা একদিন বেটে দেখেন কেমন লাগে
১২ ই আগস্ট, ২০০৮ ভোর ৬:৫৮

লেখক বলেছেন: আমি নিজেই গত দশ বছর ধরে নিজের রান্না খেয়ে আসছি। তাই রান্নার কিসুমিসু আইডিয়া আছে। সমস্যা গুঁড়ো মশলা না, ম্যানুয়ালী গুড়ো করার স্কিল নাই হয়ে যাওয়া।

দুঃখজনক, কিন্তু অবশ্যম্ভাবী :(

১০. ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ দুপুর ১:০১
comment by: পারভেজ বলেছেন: খুব ভালো লাগলো!! অবাক লাগে- একগাদা ছেলে মেয়ের পরিবারে, প্রথমে পড়াশোনা, পরে শিক্ষকতা করেও আমার মা কিভাবে এতকিছু একসাথে দেখভাল করতেন, কখনো দোকান থেকে হোম মেইড বলে কিছুর অস্তিত্ত্ব টের পাইনি, মশলা পেষা ছিল প্রতিদিনকার ব্যাপার।
আমাদের জীবন যাত্রা কি ফাস্ট হচ্ছে না স্লো?
+
০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৪:০০

লেখক বলেছেন: আমরা স্লো হচ্ছি আর যন্তরপাতি ডুয়েল কোর থেকে কোয়াড কোর হচ্ছে

 



 



বাংলাদেশের অনলাইন এক্টিভিটি বাড়ানোর জন্য বহুদিন ধরে ঠেলাঠেলি করছি।
কিন্তু এই পাথর নড়ে নাঃ(
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

সর্বমোট হিট

 ৪২১৩৭