তথাকথিত শ্রেণীহীন সমাজব্যবস্থা তো রাশিয়ায় পরীক্ষিত হয়েছে...দেখা গেছে যারা যারা ওই ব্যবস্থার মধ্যে জন্মেছে, তারাই ওই ব্যবস্থাকে বাতিল করে দিয়েছে...চীনেও কিছুদিন পর বাতিল হয়ে যাবে(ইতিমধ্যে প্রায় গেছে গেছে অবস্থা),কিউবায়ও বাতিল হবে,উত্তর কোরিয়ায়েও বাতিল হবে..মার্ক্স-এঙ্গেলস সমাজ ও রাষ্ট্রের বিবর্তনের যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা অসাধারন ; তাঁরা পৃথিবীর দুজন শ্রেষ্ঠ সমাজতাত্ত্বিক এবং মানবিক মানুষ..তাঁদের সময় তাঁরা দেখেছেন শুধু শোষণ, যা আজো চলছে তবে আগের মতো চলছে না...শ্রেণীবিভাজনও এখন কমে আসছে...ভারতীয় বৈদিক দর্শণ সৃষ্টি করেছিলো মানুষের ইতিহাসে সবচেয়ে নিকৃষ্ট শ্রেণীবিভাজন প্রথা-বর্ণবাদ প্রথা, যা জন্মভিত্তিক..ব্রাহ্মন ,ক্ষত্রিয়, বৈশ্য , শূদ্র শুধু আর্থিক শ্রেণী ছিলো না, ছিলো ধর্মীয় শ্রেণী ; তাই এটা এখনো ভারত তার মাটি থেকে এখনো দূর করতে পারছে না, যদিও অনেকটা দূর হয়েছে..এখন বাঙলাদেশে উচ্চশিক্ষিত ব্রাহ্মণকন্যার সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে বৈশ্য ও শূদ্রের ; কিন্তু একে তারা পাপ মনে করছে না, সমাজ বাঁধা দিচ্ছেনা, তারা নরকের ভয়ও পাচ্ছেনা.. যা আজো চলছে তবে আগের মতো চলছে না...শ্রেণীবিভাজনও এখন কমে আসছে...আর্থশ্রেণীভেদ দূর করা সম্ভব, পশ্চিম এখন এটা অনেকটাই সমাধান করেছে..মার্ক্সীয় প্রস্তাবের অনেক কিছু তারা তাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে গ্রহণ করেছে ; তাই সেখানে মার্ক্সীয় সমাজবিপ্লবের কোনো সম্ভাবনা নেই...
মার্ক্স যে- শ্রেণীহীন সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সর্বহারার একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠাকে অবধারিত ভেবেছিলেন, তা ঠিক নয়, যদিও তাঁর স্বপ্ন ও ভাষ্য অসাধারণ...সোভিয়েত রাশিয়া,পূর্ব ইউরোপ অথবা চীন,উত্তর,কিউবায় শ্রেণীহীন সমাজ ও সর্বহারার একনায়কত্বের নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো পার্টি ও ব্যক্তির একনায়কত্ব...সোভিয়েত রাশিয়ার প্রধান বিপ্লবীরা সবাই মৃত্যুদন্ডিত বা নিহত হয়েছিলেন স্ট্যালিনের ঘাতকদের হাতে...ট্রটস্কি পালিয়ে গিয়েও বাঁচতে পারেন নি, স্ট্যালিনের ঘাতক তাঁকে কুড়োল দিয়ে কুপিয়ে টুকরো করেছিলো..পশ্চিম একটি প্রচলিত কৌতুক আছে-'লেনিন যদি আরো কয়েক বছর বাঁচতেন, তাহলে কোথায় মারা যেতেন?' উত্তর-'স্ট্যালিনের কারগারে'..স্ট্যালিন কোটি কোটি মানুষকে খুন করেছিলো,কিন্তু জনগনকে সচ্ছলতা দিতে পারেনি ; স্বাধীনতা , অধিকার তো দেয়ই নি....সোভিয়েত বিপ্লবের প্রধান রাজনৈতিক শ্লোগানদাতা কবি মায়াকোভস্কি এবং কবি ইয়সেনিন কয়েক বছরের মধ্যেই আত্মহত্যা করেছিলো....
শ্রেণীহীন সমাজের নামে সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো হত্যাকান্ডের ও অধিকারহীনতার রাজত্ব, যেমন হয়েছিলো কম্বোডিয়া এবং হচ্ছে এখন নব্য-মাওবাদী নেপালের শহরগুলোতে...শিক্ষা ও সচ্ছলতার ফলে শ্রেণীবিভেদ নিজে নিজেই কমে যায়, তার জন্যে জোর করতে হয় না অথবা রক্তাক্ত বিপ্লব করতে হয়না..জোর করা শ্রেণীহীন সমাজ হচ্ছে স্বৈরাচারী সমাজ...সোভিয়েত বিপ্লবের কয়েক বছর পর সোভিয়েতপন্থি একদল ইউরোপীয় লেখককে সোভিয়েত ইউনিয়নে নিমন্ত্রণ করেছিলেন স্ট্যালিন, তাঁরা স্ট্যালিনের একনায়কত্ব দেখে শিউরে উঠে একটি বই প্রকাশ করেছিলেন 'দি গড দ্যাট ফেইল্ড' নামে ; তার কয়েক বছর পর গিয়েছিলেন রাসেল, তিনি ফিরে এসে লিখেছিলেন 'থিওরী এন্ড প্র্যাকটিস অফ বলশেভিজম'....তাঁরা কেউ এই একনায়কত্ব মেনে নিতে পারেন নি, এবং ভবিষ্যত্বাণী করেছিলেন যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন টিকবে না...এর আরো পরে গেলেন রবীন্দ্রনাথ, তিনি যে বিশেষ কিছু বোঝেন নি সোভিয়েত ইউনিয়নের কর্মকান্ডের, তা তাঁর রাশিয়ার চিঠি পড়লেই বোঝা যায় ; তিনি আদরআপ্যায়নেই প্রীত হয়েছিলেন, আপ্যায়নকারীর উচ্ছসিত প্রশংসাও করেছিলেন, তবু তাঁর মনেও একটুকু সন্দেহ ছিলো ।
আমাদের সমাজকে অবশ্যই শ্রেণীভেদহীন হতে হবে, সেটা হতে হবে সবার জন্য শিক্ষা ও জীবিকার ব্যবস্থা করে ; সেখানে সবার স্বাধীনতা ও ব্যাক্তিক অধিকার থাকতে হবে ; স্বৈরাচারী শ্রেণীভেদহীন সমাজের কোন ভবিষ্যত্ নেই, যেমন মৌলবাদ তথা ধর্মীয় গনতন্ত্রের কোন ভবিষ্যত্ নেই...
মজার ব্যাপার হলো, ব্রার্ট্যান্ড রাসেল তার 'আমি কেন খ্রীস্ট ধর্মে বিশ্বাস করি না' নামক বইটিতে যখনই ধর্মের কথা বলেছেন, তখন চারটি প্রধান ধর্মের কথা বলেছেন- ইহুদী, খ্রীস্টান, ইসলাম ও মার্ক্সবাদ...ব্যাপারটি মজার এই জন্য যে মার্ক্সবাদ কোনো ধর্ম নয়, কিন্তু তিনি তত্কালীন সোভিয়েতে যা দেখেছেন, তাতে এটাকে ধর্ম বলেই মনে হয়েছে..
সোভিয়েত ইউনিয়নে শ্রেণীহীন সমাজের নামে চলছিলো মার্ক্সীয় মৌলবাদ...সেখানে সবাই সমান ছিলো না, সেখানে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়নি ; এমনকি নারীপুরুষের সাম্যও প্রতিষ্ঠিত হয় নি...একই কাজে নিয়োজিত পুরুষ সেখানে বেশী বেতন পেতো নারীর থেকে এবং নারীদের নিযুক্ত করা হতো এমন সব পেশায় যেগুলোকে প্রথাগতরুপে মনে করা হতো নারীর পেশা, যেমন-ডাক্তার,নার্স , শিক্ষয়িত্রী প্রভৃতি...
আমাদের দরকার একটি মুক্ত, স্বাধীন, ব্যাক্তির অধিকারঋদ্ধ, সচ্ছল, সত্ ও যুক্তিবাদী-বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ...তা প্রথা দিয়ে চালিত হবে না, স্বৈরাচার দিয়ে পীড়িত হবে না এবং শাসকের নিরঙ্কুশ শক্তিধর ও আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত হবে না ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



