আমরা ঠিক করেছিলাম পিকনিকের আগে আর কোন আপডেট দেয়া হবে না ব্লগে। কোন জায়গা থেকে রওনা হবো সেটাও শুধূ মাত্র অংশগ্রহণকারীদের আগের দিন ফোন করে জানান হবে। এই লুকোছাপা (?) করার একটু কারণ ছিল। যেমন কিছু ব্লগার ব্লগে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু অনুরোধ করার পরও ফোন করে কনফার্ম করেন নাই। আবার কেউ কেউ ফোন করে পিকনিকের দিন দলবল সহ হাজির হতে চাইছিলেন, কিন্তু চাঁদা দিতে চাইছিলেন পিকনিকের দিনই। মজার ব্যাপার হলো ফোনে তারা তাদের ব্লগীয় পরিচয় দিতে চাইছিলেন না। সবদিক বিবেচনা করে আমরা এই লুকোছাপার আশ্রয় নেই। কারণ পিকনিকের দিন আর কিছু না হোক, শুধূমাত্র খাবার শর্ট পড়লেই বিশাল কেলেংকারী হয়ে যেত। পিকনিকের আগের দিন অবশ্য অংশগ্রহণকারীরা কিছুটা শংকিত হয়ে পড়েছিলেন আমাদের নিরবতায়্ আর এই আশংকার ঝড় প্রায় গূরোটা সামলাতে হয়েছে সারিয়াকে।
যাই হোক। আগের দিন আমরা কয়েকজন সারিয়ার বাসায় মিলিত হই সবকিছু ফাইনাল করার জন্য। আমি আর টুটুল (প্রত্যুতপন্নমতিত্ব) চকবাজার থেকে গিফট আর কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস কেনাকাটা করে হাজির হই সারিয়ার বাসায়। একে একে হাজির হয় রাহুল, রাতমজুর, কালপুরুষদা, কৌশিকদা, আবু সালেহ আর লুলু পাগলা। আর এদের সাথে কাজে হাত লাগায় ভাবী আর মিমি। আমাদেরকে সারিয়া চটপটি আর নুডলস দিয়ে আপ্যায়ন করে। সাথে ছিল চা। অবশ্য মিমির একটা বিশাল ধন্যবাদ প্রাপ্য এখানে, কারণ সেই ছিল এইসব মজাদার আইটেমের গুরু মারা বাবুর্চি। কাজের ফাকে ফাকে সারিয়া ফোনে অংশগ্রহণকারীদের জানাচ্ছিল কোথায় কখন জমায়েত হতে হবে সেই কথা।
বাসের সিট সংখ্যা ৫২ হলেও প্রাপ্ত চাঁদা আর স্পন্সরদের চাঁদা'র অংক মিলিয়ে আমরা আগেই ঠিক করেছিলাম ৪০ জনের বেশী করা যাবে না। এরমধ্যে আবার গাড়ীর লোকজন প্লাস ২/৩ একস্ট্রা ধরতে হবে। কালপুরুষদা খাবারের হিসাব এমন করে করেছিলেন যাতে কমপক্ষে ৪৫ জন খেতে পারে। এখানে নাশতার হিসেবে একটু ভূল হয়ে গিয়েছিল। নাশতা নেয়া হয়েছিল ৪০ জনের্। শেষ পর্যন্ত ১ জনের নাশতা কম পড়েছিল - আর সে বেচারাটি ছিল টুটুল। কারণ সে ছিল বন্টনের দায়িত্বে।সরি টুটুল।
আমি সকালে উঠে ব্লগে পিকনিকে যাওয়ার খবরটা দিয়েই রওনা হই বাসা থেকে।৭:৪০ এর দিকে খামার বাড়ীর সামনে চলে আসি। সারিয়ার সাথে ফোনে কথা বলে জানতে পারি উদাসী স্বপ্ন নাকি হাজির তার বান্দর গ্রুপ নিয়ে। আমরা কেউ কাউকে সামনা সামনি চিনি না। আশে পাশে লেজওয়ালা কোন বান্দর দেখতে না পেয়ে, ফোন দিলাম উদাসীকে। ফোন যখন করছি, রাহুল এসে হাজির। আর উদাসীকে আমার লোকেশন জানিয়ে দেয়ার পর পরই হাজির 'গন্ডার' এর মতো বিশাল দেহধারী এক ভদ্রলোক। এসেই আমাদের সাথে শেক হ্যান্ড করে বললেন "আপনি রন্জু আর আপনি রাহুল, তাই না ?" আমি বুঝলাম ইনিই উদাসী। আর কিছু না বলে আমি তার দলবল কোথায় প্রশ্ন করলাম। উত্তর পেলাম এই যে আমি আর আমার ভাগ্নে, আর কেউ নাই। সাথে মুচকি মুচকি হাসি। আমি মনে মনে বললাম উদা বান্দর। আমি তখন আইরিন সুলতানাকে ফোনে খুজছি। ফোন বন্ধ। না পেয়ে ভদ্রলোককে প্রশ্ন - আইরিন আসবেনা। উনি লাজুক হেসে জবাব দিলেন আমি তো ওনার খবর জানি না। বলেই বললেন ভাগ্নেকে একটু নাশতা করিয়ে আনি। আর ঠিক তখনই উদাসীর ফোন। আমি আর রাহুল তো পুরাই ব্যাক্কল। কি আর করা। একে একে সবাই জড়ো হতে থাকলো। বাসও এসে গেল। জানা গেল রাগ ইমন আর কৌশিক আসবেনা। রাহুল দেখি কাকে যেন ফোনে খামার বাড়ী আসার রাস্তার সর্ণনা দিচ্ছে। শুনলাম মুজতবা নাকি এ জায়গা চেনে না, সে গিয়েছে নভো থিয়েটারে। অবশেষে সে এলো। এসেই এ-টিমের এই পিচ্চি স্পাইবট এর ওর কানে ফিসফিস করে বলতে লাগলো গন্ডার আসতেছে। কথাটা আমারও কানে গেল। ..... তাহলে কি সেই দেহধারী ? মোটামুটি সবাই আসা শেষ, বাকি কেবল ৫ জন। এমেচার এবং জয়িতা উঠবে টেনিস কমপ্লেক্স এর সামনে থেকে আর পথিক এবং সূখী মানুষকে তুলতে হবে শনির আখড়া থেকে। আর সুনিলদা নাশতা নিয়ে উঠবেন অভিসার সিনেমা হলের সামনে থেকে। বাস আর পিকআপ নিয়ে আমরা হাজির হলাম রমনা টেনিস কমপ্লেক্স এর সামনে। এমেচার দেখলাম হাজির, জয়িতা নাই। বাস পাঠিয়ে দেয়া হলো অভিসার সিনেমা হলের দিকে, আমি আর কালপুরুষদা পিকআপ নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম জয়িতার জন্য। জয়িতা নাই তো নাই। জয়িতাকে ফোন করি ধরে না। জয়িতা এর মধ্যে ফোন করে জেনেছে যে বাস তাকে রেখে চলে গেছে পিকআপ রেখে। এতেই সে বিলা। অবশেষে সে ফোন ধরলো। ধরেই তার প্রথম ডায়ালগটা ছিলো এরকম - আমি যে আশায় বা যে উদ্দেশ্যে এসেছিলাম ..... । থা বলতে বলতেই দেখি লাল ড্রেস পড়া এক মহিলা হাজির। চেহারা দেখেই বুঝা যায় রেগে বোম হয়ে আছেন। তাকে জানান হলো বাস জ্যামে পড়তে পারে এই আশংকায় আগে পাঠান হয়েছে। তবেঁ সেটা অপেক্ষা করবে সামনে। সে অচিরেই তার বান্দর গ্রুপের সাথে মিলিত হবে পারবে। কথাটা শুনে একটু মনে হয় ঠান্ডা হলো।
বাসেই পরিবেশন করা হলো নাশতা। ;দেশবন্ধুর পরোটা আর ভাজি, সাথে একটা করে মিষ্টি।
সবাই একসময় পৌছালাম স্পটে। ফাটাফাটি স্পট। শুনলাম এটাই নাকি অয়োময়ের সেই জমিদার বাড়ী। এখন মুড়াপাড়া ডিগ্রি কলেজ। বিশাল এলাকা। আমরা ঘুরে দেখলাম পূরোটা। ছবি তোলা হলো অজস্র। এরপর শুরু হলো পরিচয় পর্ব। পরিচয় পর্বের পর সারিয়া বের করলো একটা বক্স্। খেলার নিয়মকানুন জানান হলো। বাক্সটা প্যাক করা হয়েছে অনেকগুলো কাগজ দিয়ে। প্রতিটা কাগজে একেকজন ব্লগারের শারীরিক কিংবা অন্য কোন ধরণের বর্ণনা আছে । সেটা পড়ে সেই ব্লগারকে বের করে উপরের কাগজটা ছিড়ে বক্সটা তার হাতে দিতে হবে। সে আবার দিবে পরবর্তী জনকে। এভাবে শেষ পর্যন্ত বক্সটা যে পাবে সেই পাবে বক্সের ভেতরের উপহারটি। শেষ পর্যন্ত উপহারটা পেয়েছিল প্রাপ্তি। তবে খেলার মাঝেমধ্যে ২/৩ বার মিস ফায়ার হওয়াতে খেলাটা জমেছিল দারুণ। একবার লেখা আসলো 'হ্যান্ডসাম টেকো'। এক সুন্দরী ললনা সেটা তুলে দিলেন রাতমজুরের হাতে। রাতমজুর তো বাক্যহারা ...... হ্যান্ডসাম বলা গেলেও তাকে কি টেকো বলা যায়। কি আর করা। আরেকবার ভুড়িওয়ালা ব্লগার বলার পর সেটা আরেক ললনা পোছে দিলেন ব্লগার প্রত্যুতপন্নমতিত্বের হাতে। মনে হলো গুলিটা একটুর জন্য আমার বাম কানের পাশ দিয়া বার হয়া গেলো। আল্লা বাচাইছে।
এরপর সুনীল'দা প্রাপ্তির উপর একটা লেখা পড়ে শোনালেন। খুবই ভাল লাগলো লেখাটা। এরপর আমি রাহেলার উপর কিছু বললাম। এ বিষয়ে মানবী দিদির সাথে আমার আলোচনা আর আমার করা খোজখবর তাদের জানালাম। সবাই তাদের নিজেদের মতো করে কিছু না কিছু জানাল। আমি এ বিষয়ে পরে আলাদা করে একটা পোষ্ট দিব। আস্তে আস্তে দুপুর পার হয়ে বিকাল হওয়ার দশা, খাবারের আর দেখা নাই। অবশেষে খাবার এলো। এরপর যা হয়েছে সবই আপনারা কমবেশী জানেন। আমি আর নতুন করে বললাম না। আমি কেবল না বলা ২টা কাহিনী বলি।
পথিকের পথ চলা হইলোনা শেষ : সারিয়ার বাসায় প্রথম যে মিটিং টা হয়েছিল, সেখানেই পথিক আমাদের জানিয়েছিল 'রাগ ইমন' কে তার খুব দেখার ইচ্ছা। শাহবাগে নাকি একবার মিট করার কথা ছিল, কিন্তু তিনি (রা.ই.)আসেন নাই। আর তাই পথিক এইবার খুব আশায় ছিলেন দেখা হওয়ার ব্যাপারে। কিন্তু এইবারও বিধি বাম। রাগ ইমনের বাবা অসুস্থ থাকায় সে আসে নাই। হায়রে পথিক!!!!!!! রাগ ইমনের সাথে দেখা হওয়ার আশায় আরো কত পথ হাটিতে হইবে কে জানে।
আইরিনের গন্ডুউ : 'গন্ডার' নিয়া ফিসফিসানির কথা আগেই বলেছি। স্পটে পৌছার পর আমি একফাকে আইরিন সুলতানাকে বললাম " আপনি কি আপনার গন্ডুকে চিনেন ?" মূহুর্তে আইরিনের মূখখানা উজ্জল হয়ে উঠলো। তার পাল্টা প্রশ্ন " ভাইয়া সে কি এসেছে ?" আমি উত্তর দিলাম "বুঝতেছি না, মুজতবা বলতেছে আসছে।" এরপর আমি সেই দেহধারী ভদ্রলোককে দেখাইয়া আমার সন্দেহের কথাটি ব্যক্ত করলাম। আর যায় কই, জয়িতা বেগম আইরিন কে গাছে তুলে দিয়ে মই কাড়ার আয়োজন করতে লাগলো। আইরিনের মূখ চোখ দেখি লাল হয়ে যাচ্ছে। আমি সরে আসতেছি সেখান থেকে, এমন সময সেই দেহধারী আমাকে হাত ধরে টানতে টানতে মাঠের মাঝখানে নিয়ে বললেন "আপনে তো ডুবাবেন মিয়া আমারে।'আমারে আপনি কিন্তু চিনেন।' আমি বললাম "কেমনে কি ?" তখন তিনি আমাকে একটা ক্লু দিলেন। সাথে সাথে সব ফকফকা। সাথে একটা রিকোয়েষ্ট করলেন যেন পরিচয় প্রকাশ না করি। ওকে নো প্রবলেম। আইরিন সুলতানাকে যখন জানালাম সে আসলে তার প্রিয় 'গন্ডুউ' না, এক লহমায় তার মূখটা কাল হয়ে গেল। বেচারা গন্ডার তুমি জানলা না তুমি কি হারাইলা।
সরকারী বাস বিতর্ক : রাজউকের বাসে করে পিকনিক করায় অনেকেই দেখলাম কালপুরুষদার বিরুদ্ধে দূনীতির অভিযোগ করছেন। আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে আপনারা সরকারী নিয়ম না জেনেই ঢালাও অভিযোগ করছেন দেখে। সরকারী কর্মকর্তারা তার নিজের অফিসের যানবাহন কিছু নিয়মনীতির ভিত্তিতে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের জন্য নিতে পারেন। যানবাহনের জন্য কিলোমিটার প্রতি একটা ভাড়া দিতে হয়, আর তেল খরচ সম্পূর্ণ বহন করতে হয়। কালপুরুষদা রাজউকের কর্মকর্তা হিসেবে বাসের ড্রাইভারকে বললেই সে নাচতে নাচতেগাড়ী নিয়ে পিকনিকে যাবে না। অথরাইজেশন লেটার ইস্যু হবে তারপর। আর এই অথরাইজেশন লেটার ছাড়া কোন সরকারী ড্রাইভার গাড়ী বের করবে বা তাকে বের করতে দেয়া হবে - এতোটা বেকুব পাবলিক কে কেন মনে করেন, বুঝলাম না।
আপনাদের একটা সূখবর দেই। এখন থেকে আমরা প্রতিমাসে একটা ব্লগারস মিট করার চিন্তা করছি। যে কোন দিন হয়ে যেতে পারে আমাদের প্রথম ব্লগারস মিট।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই জানুয়ারি, ২০১১ রাত ১১:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



