somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঘুরে আসুন কান্তজীউ মন্দির...

২৬ শে আগস্ট, ২০০৭ রাত ৯:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

( লেখাটি ছাপা হবে ভোরের কাগজের বেড়ানো ফিচার পাতাতে আগামি যেকোন বৃহ: বারের সংখ্যাতে)
বহু অজানা কাহিনী রয়েছে দিনাজপুর জেলার কাহারোল উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের কান্তজীর মন্দিরটির পেছনে। লোকমুখে প্রচলিত আর লিখিত কাহিনী সাক্ষ্য দেয় যে, ১৭০৪ সালে রাজা প্রাণনাথ এ মন্দিরের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। প্রচণ্ড আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও রাজা প্রাণনাথ এ মন্দিরের নির্মাণ কাজ শেষ করে যেতে পারেননি। ১৭২২ সালে রাজা প্রাণনাথের মৃত্যু হলে তার দত্তক পুত্র রাজা রামনাথ পুনরায় এর নির্মাণ কাজ শুরু করেন। ইতিহাস থেকে পাওয়া তথ্য এবং লোকমুখে শ্র“ত আছে যে, শতাধিক শ্রমিক টানা ৪৮ বছর কাজ করে ১৭৫২ সালে এ মন্দিরের নির্মাণ কাজ শেষ করেন।

কালের বিবর্তনে লোকমুখে কান্তজীউ মন্দিরের নাম পরিবর্তিত হয়ে কান্তজীর মন্দির নামে পরিচিত হয়েছে। এর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট্ট নদী টেপা যেন এ এলাকার সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দিয়েছে বহু গুণ। তেমন বড়ো না হলেও সারা বছরই কমবেশি পানি থাকে এ নদীতে। শান্ত নদী, গাছপালা, সাঁওতালদের বসবাস আর শহুরে পর্যটকদের পদচারণে এখানে গড়ে উঠেছে ভিন্ন মাত্রার পরিবেশ। কান্তজীর মন্দিরের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর গায়ে স্থাপনকৃত টেরাকোটার পোড়ামাটির ফলকের অলংকরণ। আর এ অলংকরণই এ মন্দিরকে দিয়েছে সৌন্দর্যের ভিন্নমাত্রা, অর্জন করেছে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি। টেপা নদীর পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত এ মন্দিরটি দেখতে প্রতি বছর দেশী-বিদেশী বহু পর্যটক এখানে ভিড় জমান। কান্তজীর মন্দিরটি ইট, টালি, টেরাকোটা ও কঠিন শিলা পাথরের সংমিশ্রণে তৈরি করা হয়েছে। ভিত্তি দেয়ালে খুব একটা লোহার ব্যবহার নেই, তবে অতি মূল্যবান কাঠের দরজা রয়েছে। মন্দিরে যেসব পাথর ব্যবহার করা হয়েছে তা সম্ভবত হিমালয়ের তরাই অঞ্চল, আসামের পার্বত্য অঞ্চল, বিহারের রাজমহল পাহাড় এবং বিনকাচল এলাকা থেকে আনা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। অতি গভীরভাবে লক্ষ করলে দেখা যাবে যে, ছাঁচ ব্যবহার করে পোড়ামাটির চিহ্নিত ফলকগুলো অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তৈরি করা হয়েছিল। এসব পোড়ামাটির ফলকে উৎকীর্ণ হয়েছে রামায়ণ, মহাভারত ও বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনীর অংশ। সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি- এ চারটি শাস্ত্রীর যুগের পৌরাণিক কাহিনীগুলো মন্দিরের চার দেয়ালে চিত্রায়িত। তাই বৈদিক চিত্রকাহিনী সংবলিত টেরাকোটায় আচ্ছাদিত এ মন্দিরটি দেখলে মনে হবে, এ যেন চার খণ্ডে শিল্পখচিত এক পৌরাণিক মহাকাব্য। রামায়ন-মহাভারতের পৌরাণিক কাহিনী সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য এসব টেরাকোটায় অঙ্কিত হয়েছে নারী-পুরুষ, দেবতা, যোদ্ধা, গায়ক, বাদক, শিকারি, হাতি, ঘোড়াসহ অসংখ্য চরিত্র। অতীত কাহিনীর ছবি এভাবে চোখের সামনে ফুটিয়ে তুলেছেন শত শত বছর আগের শিল্পীরা। মন্দিরের অপূর্ব এসব শিল্পকর্ম দেখতে দেখতে তন্ময় হয়ে মন চলে যাবে সেই ৩০০ বছর পেছনে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, মহারাজা প্রাণনাথ এ ধরনের মন্দির নির্মাণের জন্য স্বপ্নের মাধ্যমে ভগবানের আদেশ পান। আদেশের পর থেকেই ভগবানের সন্তুষ্টি লাভের জন্য সংগ্রহ করেন বিভিন্ন স্থানের শিলা। নিয়ে আসেন অভিজ্ঞ রাজমিস্ত্রি। তাদের ৪৮ বছর একটানা পরিশ্রমের ফলে তৈরি হয় তুলনাহীন এ মন্দির। মন্দিরটির কাঠামো লক্ষ করলে দেখা যায়, এর ভিত্তিমূলের বাইরে দৈর্ঘ্য ৬০ ফুট ৩ ইঞ্জি। মেঝেতে ওঠার জন্য দুই পাশে পাঁচ ধাপবিশিষ্ট সিঁড়ি রয়েছে। মন্দিরের ভবনের দেয়ালের দৈর্ঘ্য ৫২ ফুট এবং আয়তন ৩ হাজার ৬০০ ফুট। মন্দিরটির উচ্চতা ৭০ ফুট। বেশ কয়েকটি ধাপ ও চূড়াবিশিষ্ট এ মন্দিরটির নির্মাণরীতিতে রয়েছে মধ্যযুগীয় ছাপ। ১৮৭৯ সালের ভূমিকম্পে মন্দিরটির অনেক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়। তবে এখনো যা রয়েছে সেটা স্থাপত্যের নির্মাণ দক্ষতাই প্রমাণ করে। এখনো যেকোনো দর্শনার্থী প্রথম দেখাতেই এর নির্মাণ শৈলী এবং কারুকাজে মুগ্ধ হয়ে যায়। দৃষ্টিনন্দন ও স্থাপত্য শিল্পের অনুপম উদাহরণ হিসেবে কান্তজীর মন্দির দেশী-বিদেশী পর্যটক, গবেষক ও প্রতœতাত্ত্বিকদের কাছে পরম আগ্রহের বিষয়।


কীভাবে যাবেন?
ঢাকা থেকে দিনাজপুরের দূরত্ব প্রায় ৪১৪ কিলোমিটার। এ দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য ঢাকার গাবতলী, কল্যাণপুর থেকে রয়েছে বেশ কটি আরামদায়ক কোচ সার্ভিস। ভাড়া ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে দিনাজপুর যওয়ার ট্রেন রয়েছে তিস্তা এক্সপ্রেস। সময় বেশি লাগলেও এতে স্বাচ্ছন্দ্যে যাওয়া যায়। দিনাজপুর জেলা সদর থেকে কান্তজীর মন্দিরের দূরত্ব ২১ কিলোমিটার।

থাকা-খাওয়া
কান্তজীর মন্দিরের আশপাশে কোনো আবাসিক হোটেল নেই। তাই আপনাকে দিনাজপুর শহরের কোনো আবাসিক হোটেলে থাকতে হবে। ১০০-৮০০ টাকার মধ্যে রয়েছে বেশ কিছু আবাসিক হোটেল।

লক্ষ্য করুন
যারা দিনাজপুর না গিয়ে কান্তজীর মন্দির দেখতে চান, তাদের জন্য রয়েছে বিকল্প ব্যবস্থা। সাভারের আশুলিয়ার হেরিটেজ পার্কে রয়েছে কান্তজীর মন্দিরের প্রতিকৃতি। জানার মতো প্রয়োজনীয় তথ্যও দেওয়া আছে এতে। কান্তজীর মন্দিরের সত্যিকারের রূপদর্শন না হলেও বেশ ভালো লাগবে এটি দেখে।
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×