লাস্ট টার্মে কলেজে পৌছেই সিদ্ধান্ত নিলাম নিজের মাঝে পরিবর্তন আনতে হবে! কোন ধরনের নিয়ম বহির্ভুত কাজে যোগ দিব না! প্রপার ক্যাডেট বলতে যা বোঝায়,তাই হব! ঠিক করলাম নামাজ পড়তে হবে! পরদিন ফজর থেকে শুরু করলাম নামাজ পড়া। জুনিয়রকে বলে দিয়েছি রিভেল দিতে,ক্লাস সেভেন এইট নামাজ পড়ে,তাদের থেকে হুজুর দেখেই একটাকে বললাম “ফজরের নামজে জামাতের আগে ডাক দিবা”! জুনিয়রটাও মহাউৎসাহে ডাক দেয় প্রতিদিন! প্রথম দুদিন আমারও চরম ঊৎসাহ! ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি জামাতের সাথে,জুনিয়রদেরকেও আসতে বলি! আমার রুমমেট দুজনকেও ডাক দেই! ওরা অবশ্য আসে না,কিন্তু আমাকে ঊৎসাহ দেয়! পাশের অন্যান্য ক্লাসমেট কেউ নাই,টুয়েলভ থেকে দুজন ভাইয়া আসেন,অনিয়মিত! আর আমিই হঠাৎ করেই নিয়মিত! বলে রাখা ভাল,ক্লাস নাইনে ঊঠে নামাজ পড়া ছাড়সিলাম,সেই আমি আর হাউজ মস্কে যাই না ২ বছর। এমনকি এস এস সি পরীক্ষার সময়ও নামাজ পড়ি নাই! সেই কারণেই হোক আর আমার ইমেজ(!)এর কারণেই হোক,জুনিয়ররাও বোধহয় অবাক হয়েছিল,আমার ক্লাসমেটরা কম হয় নি! সেই কারণেই দু একজন ক্লাসমেট হঠাৎ হঠাৎ জিজ্ঞেস করত “দোস্ত ছ্যাক ট্যাক খাইসিস নাকি?”আমি আরও দ্বিগুণ বিষ্ময়ে পাল্টা জিজ্ঞেস করতাম,আমি কি নামাজ পড়তে পারি না!
যাই হোক,এভাবেই সবাই ধীরে ধীরে মেনে নিল আমি নামাজ পড়তে পারি,আমার মাথায় টুপি থাকবে রেস্ট আওয়ারে,প্যান্ট সবসময় গোড়ালির ওপর থাকবে!ডিভিডি শো দেখতে যাব না,টিভি রুমে যাব না(অবশ্য আমি এমনিতেও টিভিরুমে যাই না,B4U আর অন্যান্য মিঊজিক চ্যানেল কেন যেন আমার হজম হয় না)!এরকম করে দিন যাচ্ছে!এদিকে আমিও দিন দিন এই নিয়মে ফেড আপ হয়ে যাচ্ছি!নামাজ পড়তে কষ্ট লাগা শুরু হল।সবচেয়ে বড় কষ্ট অযু করতে যাওয়া!ফজরের নামাজে জুনিয়র আসে রিভেল দিতে,বিরক্ত হয়ে আমি বলি “গেট লস্ট!”বলে আবার ঘুমিয়ে পড়ি!অন্যান্য নামাজে আড্ডায় বসে পড়ি,নামাজে ইচ্ছা করে না!কারেন্ট এফেয়ার্স শুরু হওয়ায় সেটা নিয়ে ব্যস্ত থাকি,নামাজে আর যাওয়া হয় না!পরীক্ষা শুরু হল,দু এক জন বন্ধু কথা তুলে নামাজ পড়িস না কেন?আমিও যুক্তি দেখাই,বিজ়ি।এথলেটিক্স টাইমেও একই কজ,সময় পাইনা!এমনি করেই ধীরে ধীরে নামাজ থেকে সরে আসলাম!
টার্ম শেষ হল!ভ্যাকেশনে আসছি,কিন্তু সেই যে আমি,সেই আমিই হয়ে গেসি আবার!নামাজ পড়া হয় না!হঠাৎ ইচ্ছে হল আমার গার্লফ্রেন্ডকে প্রপোজ করতে হবে!এতদিন ফ্রেন্ড ছিল,কলেজে পড়ি যখন বড় হয়েছি,মনের কথাটা জানাই!ভেবে ফোন করলাম!
-হ্যালো!
-হু,আমি!একটা কথা বলার জন্য বলে ফোন করসি!
-কথা বলার জন্যই তো সবাই ফোন করে!কী বলবি?
-এইটা একটা বিশেষ কথা,সময় লাগবে!
-আমার তো টাইম নাই এখন!রাতে বল!
-ঠিক আছে!বাই!
আমি ফোন রেখে দেই!বুকটা হঠাৎ ঢিবঢিব করতে থাকে,যদি না বলে দেয়!এভাবে রাত হয়,আমি খালি গালে হাত দিয়ে ভাবি-কী বলতে পারে!রাতে মিসকল দেয়(গার্লফ্রেণ্ডরা কেন যেন কখনই ফোন করে না)!আমি দুরু দুরু বুকে ডায়াল করি!স্পষ্ট গলায় ওপাশ থেকে ভেসে আসে-”হ্যালো”।
-কী খবর?কেমন আছিস?
-আমি ভাল!কি যেন তোর কথা ছিল?
আমি এটেম্পট নেই,বলব কী না!সাহস পাইনা।বলি-
-এখন বলা যাবে না।আগামীকাল আমার সাথে দেখা করতে পারবি?
-নো প্রব!
——————————————————————————————
পরদিন দেখা হয়! এবার অনেক প্রাক্টিস হয়ে গেছে! সরাসরি আমার মনের কথা জানাই! অপরপক্ষের মুখ শক্ত হয়ে যায়! আমি ভয় পেতে শুরু করি! হঠাৎ বলে-তোর পছন্দ ঠিক আছে,আমারও তো কিছু কোয়ালিফিকেশন দরকার!
আমার মুখে আবার হাসি ফিরে আসে-”তোর কি কোয়ালিফিকেশন চাই?”
-বড় হয়ে কি করবি,আমার কিন্তু বড়লোক বর দরকার!
-সেটা তখন হবে,এখন কি চাস?
-আয়াতুল কুরসি বল!
-ফাজলামো করিস?
-আগে তুই বল,পারিস কীনা,আমার পছন্দ আল্লাহভক্ত ছেলে!
-আয়াতুল কুরসি তো পারি না!
-কী বলিস?
-ঠিক আছে,আজকে গিয়ে মুখস্ত করে ফেলব!
-ওকে। নামাজ পড়িস কয় ওয়াক্ত?
- নামাজ তো পড়ি না!
-নামাজ পড়িস না? আমার বয়ফ্রেন্ড নামাজ পড়ে না,এটা কি করে হয়?
-কেন?!আমি বিস্মিত!
-আজ থেকে ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়বি,যদি পড়িস আমি রাজী!
-এটা তো আমার জন্য কিছুই না,তোর জন্য আমি সব করতে পারি!
-আমার জন্যে না,নামাজ পড়বি আল্লাহর জন্য!তারপর আমার জন্য দোয়া করবি!
-হুমমম!
-মসজিদে গিয়ে পড়তে হবে কিন্তু!
-ঠিক আছে!
-আমাদের বাসার সামনে দিয়ে মসজিদে যেতে হয়,সেটা মনে আছে!
মুখে কষ্ট মাখা হাসি নিয়ে বলি,ঠিক আছে!
ফলাফলঃগত একসপ্তাহ ধরে আমি মাথায় টুপি দিয়ে মসজিদে হাজির হই দিনে ৫ বার! প্রতিবার দেখি দোতলায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমার দিকে মুখ টিপে হাসছে!আর প্রতি রাতে ফোনে জিজ্ঞেস করে “আয়াতুল কুরসি মুখস্ত হয়েছে কিনা”। প্রতিবার ওরসাথে কথা বলতে গিয়ে আমি আয়াতুল কুরসি ভুলে যাই!
অফটপিকঃউপরের পুরাটাই নিছক গল্প,আমার কল্পনাপ্রবন মনের কষ্টপ্রসূত!
লেখাটি ক্যাডেটকলেজব্লগে পূর্বপ্রকাশিত

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


