somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ব্যাচেলর বিড়ম্বনা

০৬ ই আগস্ট, ২০১২ সন্ধ্যা ৭:১০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অভিধানে ‘ব্যাচেলর’ শব্দটির অনেক রকম মানে আছে। উইকিপিডিয়ায়- এন আনমেরিড পারসন এবং এ পারসন হু হোল্ডস এ ডিগ্রি অব ব্যাচেলর এই দুটি মানে দেওয়া আছে। আমরা অবশ্য ব্যাচেলর বলতে শিক্ষাগত ডিগ্রি বুঝি না; বরং বুঝি ‘বিবাহযোগ্য’ কিন্তু ‘বিবাহ-পূর্ব’ অবস্থা। অর্থাৎ প্রাপ্তবয়স্ক অবিবাহিত লোকেরাই হচ্ছে ব্যাচেলর। পাশ্চাত্য দেশ গুলোতে ‘ব্যচেলর’ থাকাটাই হয়ে উঠেছে আরাধ্য। কিন্তু আমাদের দেশে ব্যাচেলরত্ব ঘুচানোটাই একজন নর বা নারীর অন্যতম তপস্যা। কারণ আমাদের দেশে ব্যাচেলর হবার হাজারটা ঝামেলা। ব্যাচেলর হয়ে মরেও সুখ নেই। ধর্ম মতে মরার পর মৃতদেহ সৎকারের দায়িত্ব বর্তায় সন্তানের উপর। কিন্তু কেউ যদি ব্যাচেলর অবস্থায়ই দুনিয়া থেকে অবসর নেয়, তবে তার লাশের দায়িত্ব কে বহন করবে? সেটা একটা সমস্যা বটে। যাহোক, প্রতিপদে ব্যচেলরদের ঠোক্কর খেতে হয়। ব্যাচেলরদের জীবন-পথ যেন খানাখন্দে আকীর্ণ ঢাকা টু কিশোরগঞ্জ সড়ক। ধাক্কা খেতে খেতে একসময় সন্দেহ হয়- গন্তব্যে পৌঁছতে পারবো তো? অবশ্য তবুও এগিয়ে যায় ব্যাচেলর জীবন।
আমার এক বন্ধুর কথাই ধরা যাক। বেচারা কলেজে শিক্ষকতা করে। যা মাইনে পায় তা দিয়ে কোনোরকমে দিন চলে যায়। এই আয় থেকে বাড়িতেও কিছু দিতে হয়। বিয়ে করার ইচ্ছে অনেক দিন থেকেই পোষণ করছে। কিন্তু সাধ্যে কুলোচ্ছে না। অগত্যা একা এবং একাকীত্বই সাথী হয়েছে। কিন্তু ঝামেলাটা শুরু হয়েছে বাসা নিয়ে। ঢাকা শহরে ব্যাচেলরদের জন্য বাসা ভাড়া পাওয়া যায় না। আমার সেই বন্ধুও পায়নি। অগত্যা 'ফুফাতো ভাইয়ের মেয়ে-জামাইয়ের ভায়রার শালা’ স্থানীয় এক পরমাত্মীয়ের খোঁজ বের করতে হয়েছে। বলা চলে যে ওই বাড়িতে উঠে পড়তে হয়েছে। সে বাড়িতে ‘বিবাহউত্তীর্ণ’ একাধিক মেয়ে রয়েছে। বাসার সবাই আমার নিরীহ বন্ধুটিকে চোখে চোখে রাখেন। তাদের সাধারণ হিসেব, ব্যাচেলর মানুষ। স্বভাব-চরিত্রের ঠিক নেই। এ অবস্থা অনুধাবন করে আমার বন্ধুটিও সারাক্ষণ চোরের মত নিজেকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করে। রাতে শোবার সময়ই কেবল বাসায় থাকে। অন্য সময়টা বঙ্গবাজারের জিনিসের দরদাম করে, গুলিস্তানে ক্যানভাসারদের বক্তৃতা শুনে, দেয়ালে সাঁটানো পত্রিকা পড়ে, পার্কে ঘুরে দিন কাটিয়ে দেয়। এদিকে গ্রামের বাড়ি থেকে বিভিন্ন সময় এ-ও এসে উপস্থিত হয়। এসব আগমনকারীরা যেন দ্রুত আবার ফেরৎ যায় এ ব্যাপারে আমার বন্ধুটি সোচ্চার থাকে। কেননা ওই বাসায় সে নিজেই এক আপদ। তারপর এসব মুসিবতের কারণে যদি আম-ছালা দুটোই যায়!
ইতিমধ্যে রটে গেছে, বাসার মেয়ে দুটোর সাথে আমার বন্ধুর লটর-পটর চলছে। তার বাড়ির লোকরাও বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। তাদের অভিমত: হতেও পারে। ব্যাচেলর ছেলে। কোনো দুর্বলতা যদি না-ই থাকবে তো ওখানে পড়ে আছে কেন? ঢাকা শহরে কি থাকার জায়গার অভাব? কিন্তু ওদের কে বোঝাবে যে, প্রায় দুই কোটি লোকের আবাস ঢাকা শহরে ব্যাচেলরদের থাকার জায়গার সত্যিই অভাব! এভাবে ব্যাচেলরত্বের কারণে আমার বন্ধুর জীবনে নেমে এসেছে ঘোর অমানিশা!
শুধু বন্ধুর কথা কেন; নিজেও যখন ব্যাচেলর ছিলাম তখন আমাকেই কি কম ঝামেলা পোহাতে হয়েছে? সারাক্ষণ সবাই জেরায় জেরায় জেরবার করতো-কেন বিয়ে করছি না। যেদিন তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতাম তখন অভিভাবকরা ভাবতেন, নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে। কোথাও দাগা খেয়েছে। আবার যেদিন দেড়ি করে ফিরতাম, সেদিনও দেখেছি হাজারও প্রশ্ন। এত রাত পর্যন্ত কোথায় ছিলাম। কার সঙ্গে আড্ডা দিয়েছি। অজস্র প্রশ্নবোধক চিহ্নের মধ্যে তারা আমাকে সারাক্ষণ জর্জরিত রাখতেন (প্রশ্ন অবশ্য এখনও শুনতে হয়, তবে তা একজনের মুখে)।
আগে শুনেছিলাম মেয়েরা ব্যাচেলরদের সঙ্গ পছন্দ করে। আমার সে ধারণাও ভেঙ্গে গেছে। একবার অফিসের এক জরুরি কাজে রাত ন’টা বেজে গিয়েছিল। অফিসের অধিকতর সুন্দরী অবিবাহিত কলিগ মেয়েটিকে পৌছে দেবার দায়িত্বটি আমার কাঁধেই অর্পিত হবে বলে আমি মনে মনে তৈরি হচ্ছিলাম। কেননা ওই সমাবেশে আমিই ছিলাম একমাত্র ব্যাচেলর। কিন্তু আমার আকাক্সক্ষা অনুযায়ী ঘটনাটা ঘটলো না। মেয়েটি আমাদের এক মাধ্যবয়সী বিবাহিত কলিগের সাহায্য প্রার্থনা করল। স্বভাবতই সেই বুড়োভাঁম দাঁত কেলিয়ে হাসতে হাসতে রাজি হয়ে গেল। আর আমার কাঁধে জুটলো বিগত-যৌবনা অপর এক কলিগকে পৌছে দেবার সুমহান দায়িত্ব!
ব্যাচেলররা যে আমাদের সমাজের কী এমন ক্ষতি করেছে বুঝি না। বাড়িওলারা তো মনে করে ব্যাচেলর মানেই হচ্ছে শয়তানের ডিপো। ওরা লম্পট, সমাজবিরোধী, উচ্ছৃঙ্খল, ঠগ, ভণ্ড, প্রতারক, নেশাখোর; মোটের ওপর অমানুষ বা পশু। আজকে বিয়ে করলে কালকেই তো ব্যাচেলারত্ব ঘুচে যায়, তখন কি তার দোষ থাকে না?বিয়ে দেওয়ার জন্য তো সবাই ব্যাচেলরকেই খোঁজেন! বিবাহিত লোক মানে কি ধোঁয়া তুলসী পাতা? ব্যাচেলর হলেই কি লম্পট হবেন? মদ-গাঁজা খাবেন, ব্যাভিচারে লিপ্ত হবেন? এরশাদ কিংবা বিল ক্লিনটন ঢাকায় কোনো বাড়ি ভাড়া চাইলে কি বাড়িআলারা না বলতেন, কিন্তু তারা কি নিষ্কলঙ্ক? আসলে ব্যাচেলরদের ওপর দোষ চাপিয়ে পার পাওয়া যায় সহজেই। ব্যাচেলররা নিপীড়িত, লাঞ্ছিত, বঞ্চিত, দুর্বল। আর দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার চিরদিনই নেমে আসে। ব্যাচেলরদের জীবনে স্ত্রীর ভালোবাসা নেই, সন্তানের প্রাণজুড়ানো মধুর ‘বাবা’ ডাক নেই, অসুখে সান্ত¦না নেই, নেই দুঃখের সাথী। ব্যাচেলরের জীবনে কাজের বুয়াই হচ্ছে একমাত্র আশ্রয় এবং প্রশ্রয়। তিনিই প্রভু, তিনিই কাক্সিক্ষতা। একদিন যদি বুয়া না আসে তবে এলোমেলো ব্যাচেলর জীবনে ভীষণ ঝড়ের সর্বনাশ নেমে আসে। ঘরটা হয় গোয়ালঘর। আহার জোটে না। বাথরুমে বালতি ভরা হয়নি বলে হাতমুখও ধোয়া হয় না। এক করুন অবস্থার সৃষ্টি হয়। ব্যাচেলরদের বিড়ম্বিত জীবনে বুয়াই হচ্ছে ক্লিওপেট্রা। আশা-ভরসা সব কিছু। আমাদের দেশে ব্যাচেলরত্ব কারুরই বিশেষ করে টানাটানির মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রতিনিধিদের মোটেও আকাক্সক্ষা নয়। বরং এ এক অনাকাক্সিক্ষত অনিবার্য পরিণতি। এই শ্রেণীর ব্যাচেলরা চাইলেও এ ‘কুমার সভা’ থেকে বিদায় নিতে পারে না। ব্যাচেলরের স্বপ্নের আকাশ জুড়ে কেবলই শূন্যতা। নীলিমার নীল নয়, জোছনার মায়া নয়, কেবলই রুক্ষ, শুষ্ক, মরুভূমি। লড়াই আর লড়াই, জোর সংগ্রাম। কেবল টিকে থাকার বেঁচে থাকার। সাফল্য নেই, বিত্ত-বৈভব নেই। আছে নিষ্পন্দ জীবনের লাশ বয়ে বেড়ানো। শ্রম আছে কিন্তু শ্রমের ন্যায্য মজুরি নেই। উদ্যোগ আছে, দিশা নেই। গাইড নেই। ব্যাচেলর-যৌবন আজ আর ‘মানি না, মানবো না’ বলে আগুন জ্বালাতে চায় না। নিজেই জ্বলে নিঃশেষ হয়। নেশার আগুনে পুড়ে যায়। জীবনের চাহিদা আর জীবিকার সীমাবদ্ধতার চাকায় পিষ্ট হয়। পাখির কলতান নয়, এক টুকরো আকাশ দেখার আনন্দ নয়, বর্ষার বৃষ্টিতে কিংবা শীতের শিশিরে সিক্ত হওয়া নয়- দিন কাটে সামান্য আয়ে অসামান্য চাহিদা পূরণের অসম্ভব পাটিগণিতের ফল মেলাতে। প্রিয়ার কালো চোখ মধ্যবিত্ত ব্যাচেলরের বুকে বীণা বাজায় না, অবসাদ ক্লান্তি আর হতাশার দৈত্যরা খাবলে খায় তার সমস্ত কোমল অনুভব। নানা বিকৃতি এসে বাসা বাধে অন্তকরণ জুড়ে। সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ অমান্য করে সিগারেটের ধোঁয়ায় একাকার তার জীবন। ঘুম নেই, তাই গুমের ওষুধের মায়ায় নিজেকে আবদ্ধ করেছে অনেকে। প্রেম-প্রীতি, ভালোবাসা, সুখ, স্বপ্ন, স্বাবলম্বিতা সবকিছু যেন অল্প কিছু ভাগ্যবানের ড্রইংরুমে সাজানো কারুপণ্য। অর্থ-কীর্তি, স্বচ্ছলতা তো নয়ই, এমন কি ‘বিপন্ন বিস্ময়’ও নয়, এক আদিগন্ত শূন্যতার মধ্যে ব্যাচেলরের বসবাস। চাকরি নেই, বেঁচে থাকার উপকরণ নেই, শান্তি-স্বস্তি কিছুই নেই।
তবু ব্যাচেলর নাহি মানে পরাভব। আজকের পোড়-খাওয়া হতভাগ্য ব্যাচেলর আগামীকালের ভাগ্যবান স্বামী। দায়িত্বশীল পিতা। এমনকি বাড়ি-গাড়ির মালিক। তাদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বেড়েই চলেছে। জয়তু ব্যাচেলর।
১১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×