কি না করেছে। একাত্তরে।
৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে কইছিলাম, মা আদেশ দেন।
খেলাটা নিজ হাতে শেষ কইরা ফালাই ।
মা রাজি হন নাই ।
আজ শুনতেছি , যে কোনো সময় এই হায়েনাটারে খোয়াড়ে ঢুকানো
হচ্ছে ।
ভোরের কাগজ রিপোর্ট , ১৭ ডিসেম্বর
যে কোনো সময় গ্রেপ্তার হচ্ছেন গোলাম আযম
ঝর্ণা মনি : যে কোনো মুহূর্তে গ্রেপ্তার হচ্ছেন জামাতে ইসলামীর সাবেক আমির ও একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের দোসর রাজাকার বাহিনীর প্রধান অধ্যাপক গোলাম আযম। গতকাল বিজয় দিবসের দিন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী গ্রেপ্তার হওয়ার পর যুদ্ধাপরাধীদের পালের গোদা গোলাম আযমের গ্রেপ্তার এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালে গোলাম আযমকে গ্রেপ্তারের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র। সূত্র জানায়, বেশ কিছুদিন ধরে তিনি নজরদারিতে রয়েছেন। তার পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তার দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ সংবলিত একটি সতর্কবার্তা বিমানবন্দরসহ দেশের সীমান্ত এলাকাগুলোতেও পাঠানো হয়েছে।
সূত্র অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে গোলাম আযমসহ ৪০ জনকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার। এদের মধ্যে জামাতে ইসলামীর ৩৮ জন। বাকি দুজন হচ্ছেন বিএনপির। ইতিমধ্যেই জামাতের আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদ, জামাত নেতা কাদের মোল্লা, কামারুজ্জামান ও রফিকুল ইসলাম
খান বিভিন্ন মামলায় আটক রয়েছেন। এ পর্যন্ত সারা দেশে ৬ শতাধিক জামাত-শিবিরের নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। এদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় দ্রুত বিচার ও দণ্ডবিধিতে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। জামিন না পাওয়ায় এরা সবাই দেশের বিভিন্ন কারাগারে আটক রয়েছেন। ডিবি হেফাজতে তিন শীর্ষ জামাত নেতাকে রিমান্ডে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। রিমান্ডে যুদ্ধাপরাধের বিচার বানচাল, জঙ্গিবাদের উত্থান, অর্থায়ন, দেশে অরাজকতা সৃষ্টিসহ বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন জামাত নেতারা। ইতিপূর্বেও গ্রেপ্তারকৃত জঙ্গি নেতারা এসব কাজে জামাতের কানেকশন থাকার কথা স্বীকার করেছে। বর্তমানে জঙ্গি নেতা ও জামাত নেতাদের মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে গোলাম আযমের নির্দেশ অনুযায়ীই এসব কাজ হচ্ছে বলে তারা স্বীকার করেছে। গোলাম আযমসহ বাকিদের গ্রেপ্তারের ব্যাপারে সরকারের গ্রিন সিগন্যালের অপেক্ষায় রয়েছেন গোয়েন্দারা। সিগন্যাল পাওয়ার পরই শুরু হবে গ্রেপ্তার অভিযান।
রাজধানীর বড় মগবাজারে ১১৯/২ কাজী অফিস লেনে গোলাম আযমের একাধিক প্রতিবেশীর সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, মাঝে মধ্যেই ডিবি পুলিশের একাধিক টিমকে বাড়িটির আশপাশে অবস্থান করতে দেখা গেছে।
গোলাম আযমের একাত্তরনামা : ‘এই বাড়িটি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড মৌচাক শাখার কাছে দায়বদ্ধ। ১১৯/২, কাজী অফিস লেন, বড় মগবাজার।’ গোলাম আযম যে বাড়িটিতে বাস করেন ওই বাড়ির নিচ তলায় নেমপ্লেটে ওপরের কথাগুলো লেখা রয়েছে। ৮ তলা এ বাড়িটির শেষ তলা অর্থাৎ ৮ তলায় বাস করেন গোলাম আযম। যিনি বাংলাদেশের নাগরিক হয়েও স্বাধীনতাযুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেন। মুক্তিবাহিনীকে কতল এবং পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতা করার জন্য গড়ে তোলেন রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনী। যুদ্ধের শেষ দিকে পাকিস্তানের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন এবং বিজয়ের মাত্র দুদিন আগে পাকিস্তানি জেনারেল রাও ফরমান আলীর সঙ্গে বৈঠক করে দেশের বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা করেন।
একাত্তরে পাকিস্তানের একনিষ্ঠ সমর্থক গোলাম আযম সরাসরি পাকিস্তানকে সমর্থন করে বেতারে ভাষণ দেন এবং বিভিন্ন সময় সমাবেশ করে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসদের উৎসাহ দেন। তার এসব কর্মকাণ্ড জামাতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম ফলাও করে প্রচার করে। গোলাম আযম বলেছিলেন, পাকিস্তান যদি না থাকে তাহলে জামাত কর্মীদের দুনিয়ায় বেঁচে থেকে লাভ নেই। ‘বাংলাদেশ’ নামের কিছু হলে আমি আত্মহত্যা করবো। (দৈনিক সংগ্রাম/ ২৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১)।
রাজাকারদের সমাবেশে গোলাম আযম বলেন, কালেমার ঝাণ্ডা উঁচু রাখার জন্য রাজাকারদের কাজ করে যেতে হবে। (দৈনিক সংগ্রাম/ ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১)। পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিটি মুসলমান নিজ এলাকার দুষ্কৃতকারীদের তন্ন তন্ন করে তালাশ করে নির্মূল করবে। (দৈনিক সংগ্রাম/ ১২ আগস্ট, ১৯৭১)। এমনকি দুষ্কৃতকারীদের মোকাবেলা করার উদ্দেশ্যে দেশের আদর্শ ও সংহতিতে বিশ্বাসী লোকদের হাতে অস্ত্র সরবরাহ করার জন্যও তিনি পাকিস্তান সরকারের কাছে আবেদন করেন। একাত্তরের ১৬ অক্টোবর বায়তুল মোকাররমে এক সভায় গোলাম আযম বলেন, তথাকথিত বাংলাদেশের আন্দোলনের ভূয়া স্লোাগানে কান না দিয়ে পাকিস্তানকে নতুনভাবে গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছি। (দৈনিক পাকিস্তান/ ১৭ অক্টোবর, ১৯৭১)। কোনো ভালো মুসলমানই তথাকথিত বাংলাদেশের আন্দোলনের সমর্থক হতে পারে না মন্তব্য করে খুব ভালো কাজ করছে বলে রাজাকারদের প্রশংসা করেন তিনি। (দৈনিক সংগ্রাম/ ০২ অক্টোবর, ১৯৭১)। গোলাম আযম বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে জামাতে ইসলামীর কর্মীরা বেশিরভাগ রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনী গঠন করে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করছে এবং প্রাণ দিচ্ছে। এখানে জামাতের অবদানই বেশি। সুতরাং পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী হলে জামাত থেকেই হতে হবে। (বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস, চতুর্থ খণ্ড, মুক্তিযুদ্ধ পর্ব)।
গোলাম আযমের জেএমবি কানেকশন : নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) গঠনের মূল হোতা অধ্যাপক গোলাম আযম।
জানা গেছে, জামাতে ইসলামী বাংলাদেশের সঙ্গে মিল রেখে জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ নাম প্রস্তাব এবং শায়খ আবদুর রহমানকে আমির বানিয়েছিলেন তিনিই। মূল পরামর্শক ও নীতিনির্ধারক ছিলেন গোলাম আযমই। জেএমবি প্রধান মওলানা সাইদুর রহমানও তার হাত ধরেই প্রথমে জামাতের রাজনীতিতে যুক্ত হন। পরে যোগ দেন জেএমবিতে। জামাতে ইসলামীতে সরাসরি গোলাম আযমের তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠা একটি বিশেষ বাহিনী দিয়েই তিনি পরিচালনা করেন জেএমবিকে। জেএমবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে। জানা গেছে, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর পরই জামাতে ইসলামী কৌশলগত কারণে প্রকাশ্যে ও গোপনে কাজ করার পরিকল্পনা তৈরি করে। দলের ‘আল্লাহর আইন চাই’ স্লোগান বাদ দেয়া হয়। ওই সময়ই শায়খ আবদুর রহমানকে আমির বানিয়ে গঠন করা হয় জেএমবি। তখন জামাতের আমির ছিলেন অধ্যাপক গোলাম আযম। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারা দেশে একযোগে বোমা হামলা করে জেএমবি। বিস্ফোরণের পর সব বোমার সঙ্গেই পাওয়া যায় একটি করে লিফলেট। ‘বাংলাদেশে ইসলামি আইন বাস্তবায়নের আহ্বান’ শীর্ষক ওই লিফলেটটিও লিখেছিলেন গোলাম আযম। সেটি ছাপা হয়েছিল জামাত নিয়ন্ত্রিত মগবাজারের আল-ফালাহ প্রিন্টিং প্রেসে।
গণআদালতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ : ১৯৯২ সালে একাত্তরের ঘাতক দালাল নিমূর্ল কমিটির গণআদালতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগনামা উত্থাপন করেন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। অভিযোগনামায় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, মরহুম মওলানা গোলাম কবিরের পুত্র গোলাম আযম যিনি একজন পাকিস্তানি নাগরিক সত্ত্বেও বহুদিন ধরে বেআইনিভাবে ঢাকার রমনা থানার মগবাজার এলাকার ১১৯ নম্বর কাজী অফিস লেনে বসবাস করছেন। ইনি সেই গোলাম আযম-যিনি একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রতিটি অন্যায়, বেআইনি, অমানবিক ও নিষ্ঠুর কাজ প্রকাশ্যে সমর্থন করেছিলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের দেশদ্রোহী বলে আখ্যা দিয়ে তাদের সমূলে ধ্বংস করার আহ্বান জানিয়েছিলেন, আল-বদর বাহিনী গড়ে তুলে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নির্মমভাবে হত্যা করার প্ররোচনা দিয়েছিলেন।
এছাড়া একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭৮ সালের ১০ জুলাই পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বক্তৃতা, বিবৃতি, আলোচনা, স্মারকলিপি, প্রবন্ধ ও প্রচারপত্রের মধ্য দিয়ে এবং সাংগঠনিক উদ্যোগ গ্রহণ করে বাংলাদেশকে দুর্বল ও সহায়হীন, বিচ্ছিন্ন ও বিনষ্ট করার ষড়যন্ত্র করেছেন। ১৯৭২ সালে তিনি লন্ডনে ‘পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি’ গঠন করেন। ওই বছরের ডিসেম্বরে গোলাম আযম রিয়াদে আন্তর্জাতিক ইসলামি যুব সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তান পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সকল মুসলিম রাষ্ট্রের সাহায্য চান। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৬ পর্যন্ত তিনি ৭ বার সৌদি বাদশার সঙ্গে দেখা করে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি এবং আর্থিক বা বৈশ্বিক সাহায্য না দিতে অনুরোধ করেন। ১৯৭৪ সালে রাবেতায়ে আলমে ইসলামির উদ্যোগে মক্কায় অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এবং ১৯৭৭ সালে কিং আবদুল আজিজ ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত একটি সভায় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বক্তৃতা করেন। ১৯৭৪-এ মাহমুদ আলীসহ কয়েকজন পাকিস্তানিকে নিয়ে তিনি পূর্ব লন্ডনে পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটির এক বৈঠক করেন। বাংলাদেশকে পাকিস্তানে পরিণত করার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে দেখে এই সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, তারা এখন থেকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান নিয়ে একটি কনফেডারেশন গঠনের আন্দোলন করবেন। এ সভায় গোলাম আযম ঝুঁকি নিয়ে হলেও বাংলাদেশে ফিরে অভ্যন্তর থেকে ‘কাজ চালানোর’ প্রয়োজনীয়তা ব্যক্ত করেন। ১৯৭৭-এ লন্ডনের হলি ট্রিনিটি চার্চ কলেজে অনুষ্ঠিত একটি সভায় তিনি এ কথারই পুনরাবৃত্তি করেন এবং সেই উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য পাকিস্তানি পাসপোর্ট ও বাংলাদেশী ভিসা নিয়ে ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশে আসেন।
প্রসঙ্গত, একাত্তরের চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে বাংলাদেশ সরকার ১৯৭২ সালের ২২ ফেব্র“য়ারির মধ্যে নিজ এলাকার ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির হতে নির্দেশ দেয়। ১৯৭৩ সালের ১৮ এপ্রিল এক প্রজ্ঞাপনে সরকার গোলাম আযমের নাগরিকত্ব বাতিল করে। পরে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে গোলাম আযম পাকিস্তানি পাসপোর্ট ও তিন মাসের ভিসা নিয়ে ১৯৭৮ সালের ১১ জুলাই বাংলাদেশে আসেন। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তিনি বেআইনিভাবে এ দেশে রয়ে যান। ১৯৭৬, ১৯৭৭, ১৯৭৮, ১৯৭৯ ও ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ সরকারের কাছে আবেদন করেও তিনি নাগরিকত্ব ফেরত পাননি এবং সরকার তাকে ১৯৮৮ সালের ২০ এপ্রিলের মধ্যে দেশত্যাগের নির্দেশ দিলেও তিনি বাংলাদেশে থেকে যান।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই ডিসেম্বর, ২০১০ ভোর ৬:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



