

পারমাণবিক চুলি্ল একদিকে যেমন শক্তির অবিরাম প্রবাহ নিশ্চিত করেছে, তেমনি সামান্য ভুল ডেকে এনেছে মাত্রা ছাড়া বিপদ। ইতিহাস ঘেঁটে তেমনি কিছু পারমাণবিক দুর্ঘটনার কথা জানাচ্ছেন জুবায়ের হোসেন
ইদাহো ফলস, ১৯৬১
পারমাণবিক শক্তির প্রাথমিক যুগের পরীক্ষামূলক চুলি্ল ছিল যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনী পরিচালিত ইদাহো ফলস প্লান্ট। ১৯৬০-এর ডিসেম্বরে টুকটাক সারাইয়ের জন্য কারখানা সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা হলো। ১১ দিন পর ১৯৬১ সালের ৩ জানুয়ারি শুরু হলো খুলে দেওয়ার প্রস্তুতি। জোরেশোরে চুলি্লর মাঝে নিয়ন্ত্রণ রড টেনে তুলতে গিয়ে হঠাৎ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি উপরে উঠে গেল। পারমাণবিক ভাঙনে উৎপাদিত অতিরিক্ত নিউট্রন শোষিত হলো প্রয়োজনের তুলনায় কম। মাত্র চার মিলিসেকেণ্ডে এত তাপ উৎপন্ন হলো যে পানি ফুটতে লাগল টগবগ করে। উত্তপ্ত পানির শক্তি সম্পর্কে উপস্থিত তিন হতভাগা অপারেটর জানলেন নতুন করে। চোখের সামনে পানির ধাক্কায় উড়ে গেল চুলি্লর উপরিভাগ। গরম পানির প্রবাহ দুজনকে মেঝেতে ফেলে দিল। একজন মারা গেলেন তৎক্ষণাৎ, আরেকজন পরে। তৃতীয়জনকে বর্শার মতো বিঁধিয়ে পানির প্রবাহ ঠেসে ধরল ছাদের সঙ্গে। তেজস্ক্রিয়া নয়, পানির অত্যাচারে মারা গেলেন তিনজন।
থ্রি মাইল আইল্যান্ড, পেনসিলভ্যানিয়া, ১৯৭৯
যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভ্যানিয়ার তিন মাইল দক্ষিণে সাসকোহানা নদীতে থ্রি মাইল দ্বীপে ছিল তাদের আরেকটি পারমাণবিক চুলি্ল। বলা হয়, এ দুর্ঘটনাই যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক শক্তির ইতিহাসে সবচেয়ে বড়। ১৯৭৯ সালের ২৮ মার্চ চুলি্লর একটি জরুরি ভাল্ব তথা প্রকোষ্ঠ দুর্ঘটনাবশত খুলে যায়। ফলে চুলি্লর শীতলীকারক পদার্থ বেরিয়ে যেতে থাকে। প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অভাব থাকায় সেখানকার কর্মীদের সমস্যাটা বুঝতেই দেরি হয়ে যায়। অন্যান্য পারমাণবিক প্লান্টের কর্মকর্তারা এসে হাত লাগানোর পর পুরো ব্যাপারটা বুঝতে লেগে যায় পাঁচদিন! আশপাশ এলাকায় বিপদসংকেত দেওয়া হবে কি না তা নিয়ে কর্তৃপক্ষও পড়ে ঝামেলায়। প্রথমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে জানালেও পরদিন সকালেই সুর বদলে যায়। তড়িঘড়ি করে পাঁচ মাইল ব্যাসার্ধের মধ্যে এক লাখ চলি্লশ হাজার মানুষকে ছাড়তে হয় ঘরবাড়ি।
চেরনোবিল, ইউক্রেন, ১৯৮৬
পৃথিবীর ইতিহাসে এখন পর্যন্ত ভয়াবহ পারমাণবিক দুর্ঘটনা ইউক্রেনের চেরনোবিল পারমাণবিক চুলি্লর বিস্ফোরণ। এর বিপদের মাত্রা ছিল সাতের মধ্যে সাত। চার নম্বর রিয়েক্টরে চালানো একটি পরীক্ষাই ছিল সব নষ্টের গোড়া। জরুরি শীতলীকরণ ব্যবস্থা কাজ করে কি না সেটা জানাই ছিল উদ্দেশ্য। যান্ত্রিক গোলযোগে চুলি্লর ভেতরে প্রচুর পরিমাণে শক্তি উৎপন্ন হয়। চুলি্লর কেন্দ্রে তাপমাত্রা বেড়ে যায় বিপজ্জনকভাবে। প্রথম বিস্ফোরণে ভেঙে যায় জ্বালানি ও নিয়ন্ত্রণ রড। দু-তিন সেকেণ্ড পর দ্বিতীয় বিস্ফোরণ। ওটা আরো মারাত্মক। চেইন রিয়েকশন দ্রুততর হতে থাকে। ছড়িয়ে পড়ে তেজস্ক্রিয়া এবং চুলি্লর তপ্ত উপকরণ। ২৩৭ জনের শরীরে ভয়াবহ সমস্যা দেখা দেয়, তিন মাসে তাঁদের মধ্যে মারা যায় ৩১ জন। একহাজার মাইল দূরেও লোকজনকে সরে যেতে বলা হয়। চেরনোবিল দুর্ঘটনা হিরোশিমায় ফেলা আণবিক বোমার চেয়ে চার শ গুণ বেশি তেজস্ক্রিয়া ছড়িয়েছিল।
মিহামা নিউক্লিয়ার প্লান্ট, জাপান, ২০০৪
এ বছরের ফুকুশিমা বিপর্যয়ের আগে জাপানে ভয়াবহতার দিক থেকে তালিকায় সবার ওপরে ছিল মিহামা দুর্ঘটনার নাম। টোকিওর ৩২০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত এ প্লান্টে ২০০৪-এর ৯ আগস্ট পাইপ ভেঙে গরম পানি ও বাষ্প ছড়াতে থাকে। কক্ষের তাপমাত্রা উঠে যায় ২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। চারজন সেখানেই মারা যান। আহত হন আরো সাতজন। তবে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, পর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা থাকার পরও এরকম দুর্ঘটনার কোনো পূর্বাভাস আঁচ করা যায়নি।
সূত্র:
View this link
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে মার্চ, ২০১১ বিকাল ৫:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



