স্ট্রীম থেকে মেইনস্ট্রিম : বাংলাদেশ (খন্ড ০১)
০৫ ই মার্চ, ২০০৮ রাত ১:২২
ইচ্ছা ছিলো মেইনস্ট্রিম মিউজিক (ব্যান্ড) নিয়ে লিখবো। আসলে মেইনস্ট্রিম বলতে যে কি বোঝায় তা আমার জানা নেই । মূল স্রোতের গান। মূল ধারার সংগীত। হতে পারে। উল্লেখ্য এই লেখায় মেইনস্ট্রিম শব্দটিকে আমি বিশেষ করে ব্যান্ড মিউজিকের বেলায় খাটাবো। মেইনস্ট্রিম বলতে বাংলাদেশে যে ধারাটা এখনও আছে বলে আমি মনে করি তা হলো, যে ব্যান্ডগুলো দিনের পর দিন বাংলাদেশে থেকে গেছে এবং কাজ করছে প্রায় কয়েক দশক ধরে, তাঁদেরই আধিপত্যের এক অন্য নাম মেইনস্ট্রিম। আবার রক ব্যান্ডগুলোর মধ্যে যেমন বহু আগের একটি ব্যান্ড রকস্ট্রাটা যদিও হেভী মেটাল ক্যাটাগরিতে পড়ে, তারাও কিন্তু মেইনস্ট্রিম- এই অর্থে কারণ বর্তমানে যেসব আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ড আছে তাদের নতুন ধারাগুলো বলে দিচ্ছে রকস্ট্রাটা মেইনস্ট্রিম এর আওতায় পড়ে। সবাই হয়তো ভুলেই গিয়েছে রকস্ট্রাটার কথা। কয়েক দশক আগের কথা বলছি- এই ব্যান্ড এর সাথে আরও কিছু (তখনকার আন্ডারগ্রাউন্ড) ব্যান্ড ছিলো যারা রাতের পর রাত পারফর্ম করতো ঢাকার স্থানীয় হোটেলগুলোতে। রকস্ট্রাটা মূলতঃ আইরন মেইডেন এর গান করেই অভ্যস্ত ছিলো বেশী। ইমরান ভাই (গিটার), মাইনুল ভাই(গিটার) আর সবার সেরা কানা (মাহবুব) ভাই এর রকস্ট্রাটা আজ আর নেই। তাই হয়তো বা ওরা বাংলাদেশের লিজেন্ডারি এ্যাসপেক্ট থেকে হয়ে গেছে মেইনস্ট্রিম। একটা কথা বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে অনেকদিন ধরে টিকে থাকা আর অনেকদিন ধরে টিকে থাকার পর হারিয়ে যাওয়ার নামান্তরই হলো, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, মেইনস্ট্রিম । রকস্ট্রাটার একটা এ্যালবাম'ও বেরিয়েছিলো বাজারে। অত্যন্ত নিম্নমানের রেকর্ডিং সুবিধার কারণে পিছিয়ে গেলো রকস্ট্রাটা। তখনই, খানিকটা ভালো রেকর্ডিং এর জন্য উঠে এলো ওয়ারফেইজ। রকস্ট্রাটার এ্যালবাম কেউই আসলে বুঝে উঠতে পারেনি যে ওরা আসলে কি বলতে চেয়েছিলো। ওই এ্যালবামে একটা গান ছিলো "নিউকিয়ার স্বাধীনতা"- এই গানের মর্মার্থ এখন পুরো বিশ্বই জানে। আর ওরা তখনই তা বলে দিয়েছিলো। লিজেন্ড হয়েই রয়ে গেলো রকস্ট্রাটা। এখনকার প্রজন্ম শুধু শুনেই গেলো এক রুপকথার নাম- রকস্ট্রাটা। বাজারে তখন বেশ কয়েকটি এ্যালবাম এসেছিলো যার মধ্যে উইনিং এবং এল আর বি'র ডাবল ক্যাসেট এর কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উইনিং দিয়েই শুরু করা যাক। উইনিং এর চন্দন ভাই এতটাই ভালো মেলো-রক করলেন যে তখনকার ঢাকায় একটা রোল পড়ে গেলো চন্দন ভাইকে নিয়ে। কে এই ছেলে? এত সুন্দর করে গান গায়? একদমই ভিন্ন ধারার মিউজিক নিয়ে আসলো উইনিং। উল্লেখ্য, ওয়ারফেইজ ব্যান্ডের ড্রামার টিপু ভাই (ট্যাপস) একইসাথে উইনিং'এ বাজাতেন তখন। আর আমাদের সবার প্রিয় মবিন ভাই তো আর আমাদের মাঝে নেই। বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার কে আমরা হারালাম সড়ক দুর্ঘটনায়। কি দুর্ভাগ্য আমাদের। এই লোকটা যে কি কষ্ট করেছিলো তা খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম। এখনও যখন সাউন্ডমেশিনে যাই (মগবাজারের বিখ্যাত প্র্যাকটিস প্যাড) তখন মূল ফটক দিয়ে ঢুকলেই মবিন ভাইয়ের একটি ছবি। মবিন ভাই একটা আস্ত প্যানেল জড়িয়ে হাসছেন। আহা মবিন ভাই। আপনার সেই হাসিটা বুকের ভেতরে কেমন একটা খোঁচা দেয়। আমার প্রিয় মবিন ভাই বেস বাজাতেন উইনিং'এ। আপনারা নিশ্চয়ই এখনও "হৃদয় জুড়ে যত ভালোবাসা" গানটা গুনগুন করেন। কে করেনা। চন্দন ভাই'এর এক অনবদ্য গান এটি। ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশের সবাই এই গান চেনে। এই গান ছাড়াও উইনিং আরও অনেক গান উপহার দিলো আমাদের। উইনিং চলে আসলো সবার নজরে। উইনিং ওদের পরের এ্যালবামে আরও বেশ কয়েকটা ভালো গান উপহার দিলো শ্রোতাদের যেখানে সবচেয়ে জনপ্রিয় গানটা ছিলো "ইচ্ছে করে"। সাধারণ সমঝোতা কিন্তু নিঁখুত সমঝোতা বলতে যা বোঝায়, তাই ছিলো উইনিং। পরে অবশ্য হাসান আবিদুর রেজা জুয়েল এই ব্যান্ডের ভোকাল হয়ে একটি মাত্র কনসার্ট করেছিলেন। কিন্তু সেখানেই ইতি। খুব খুশী হয়েছিলাম যে উইনিং আবার ফিরে আসছে জানতে পেরে। কিন্তু ওই এক কনসার্ট দিয়েই উইনিং চুড়ান্তভাবে খতম হয়ে গেলো। ওই কনসার্টের একমাসের মাথায় উইনিং এর কি-বোর্ডিস্ট বিপ্লব ভাই চলে গেলেন দেশের বাইরে। উইনিং এখন আর নেই। চন্দন ভাই নেই। বিপ্লব ভাই নেই। মবিন ভাই তো চলেই গেলেন আমাদের সবাইকে ছেড়ে। গুডবাই উইনিং।
মাইলস'এর কথায় আসি। এই ব্যান্ডের সাহসিকতা সত্যিই অনেক বেশী ছিলো, কারণ ওরা একটা ইংলিশ এ্যালবাম বের করেছিলো। খুব কম মানুষই শুনেছে সেই এ্যালবাম আবার কেউ হয়তো বা এই লেখার মাধ্যমে জানলেন যে ওদের একটা ইংলিশ এ্যালবাম বাজারে ছিলো। মাইলস তাদের প্রথম বাংলা এ্যালবামটা দিয়েই হিট করলো সবার মাঝে। ওদের প্রত্যেকটা এ্যালবামের শুরুর অক্ষর ছিলো "প্র"। এখন পর্যন্ত ঠিক তেমনটিই আছে। প্রথমেই মনে পড়ছে হামিন ভাই (গিটার) আর মানাম ভাই (কি-বোর্ডস)এর কথা। আমি এই মুহুর্তে তূর্য (ড্রামস) বা জুয়েলের (গিটার) কথা বলছিনা কারণ ওরা মাইলস এর লিজেন্ডারি সময়টার সাথে জড়িত না। ওরা বাংলাদেশের বাঘা পারফর্মার এতে নেই কোন সন্দেহ। তূর্য সম্পর্কে আমার বন্ধু। আর জুয়েলের বাজানো আজকে থেকে না অনেকদিন থেকেই আমার ভালো লাগে। তবে মনে হয় এই দু'জন মাইলস'এর জন্য না। ওদের দুজনের আলাদা একটা সাইড-প্রোজেক্ট থাকা উচিত ছিলো। আমার খুব প্রিয় একজন ড্রামার, অনেক আগেই জয়েন করেছিলেন এই ব্যান্ডে। তিনি রকস্ট্রাটার মাহবুব ভাই মানে কানা ভাই। তবে, মাহবুব ভাই'ও আসলে এই ব্যান্ডের সাথে যাওয়ার মতো ড্রামার কখনোই হতে পারেননি। যিনি হতে পেরেছিলেন তিনি হলেন মিল্টন ভাই। অসম্ভব ভালো মিশে যেতে পেরেছিলেন মাইলস'এর গানগুলোর সাথে। লাইভ কনসার্টগুলোতে মিল্টন ভাই এর ড্রামস শোনা ছিলো এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা। যা বলছিলাম, হামিন ভাই আর মানাম ভাই। বাংলাদেশে এত বড় মিউজিশিয়ান সত্যিই কম আছে। হামিন ভাই এর "সেন্স অফ চুজিং দ্যা রাইট নোট" সবসময়ই আমাকে মুগ্ধ করেছে। আর মানাম ভাই। উফ। সত্যিই একজন কি-বোর্ডিস্ট। এই লেখার'ই পরের অংশে আরও দু'এক জন কি-বোর্ডিস্টের কথা বলবো।
একদিন বাসায় বসে আছি। আমার ড্রামস প্লেয়ার অমিত আর আমাদের এলাকার ছোটভাই আলভি বাসায় আসলো। ওরা আমাকে জুয়েল'এর সোলো গিটার কপি "এক্স ফ্যাকটর" এর কথা জানালো। বললো সাথে করে নিয়ে এসেছে। সাথে সাথে কম্পিউটারে পেন-ড্রাইভের সাহায্যে ভরে নিলাম। ওরা বারাবার বলছিলো এই এ্যালবামের "সার্কেল অফ দ্যা সিক্সথ্" ট্র্যাকটা শোনবার জন্য। যা বলা তাই কাজ। শোনা শুরু করলাম "সার্কেল অফ দ্যা সিক্সথ্"। ট্র্যাকটার লেংথ ১১:৫৩ সেকেন্ড। ঠিক ৭:১৮ সেকেন্ডের মাথায় পুরো ট্র্যাকটা পাল্টে গিয়ে অন্য এক দিকে যাত্রা শুরু করলো। কোথা থেকে যেন একটা কি-বোর্ড সোলো এসে ঢুকে পড়লো। শোনার পর মনে মনে যা প্রথম আউড়ালাম তা হলো, "ও মাই গড!" এত সুন্দর কম্বিনেশন অফ নোটস হতে পারে জানা ছিলোনা। ওরা আমাকে ধাঁধাঁয় ফেলে দিলো- "বলেন তো কে বাজাইসে?" আমি বিভিন্ন কি-বোর্ডিস্টের নাম বললাম, কিন্তু লাভ হলোনা। ওরা আমায় বললো, "এইটা হইলো মিয়া মানাম ভাই...কি বুঝলেন?" মানাম ভাইয়ের জন্য গর্বে আমার বুকটা ফুলে অনেক বড় হয়ে গেলো। আমার দেশের কি-বোর্ডিস্টের হাতে এত মধু...ভুলেই যাচ্ছিলাম। সাম্প্রতিক সময়ের কি-বোর্ডিস্ট সংকটের ভেতর একজন গুরু এর থেকে ভালো কি বা বাজাতে পারতেন। সাব-কন্টিনেন্টাল টোনে মোহময় এক আবেশ সেই সোলোর ভেতরে আছে। আপনারা চাইলে শুনে দেখতে পারেন। স্যালুট টু ইউ মানাম ভাই। সেই মাইলস এর মানাম ভাই কে যেন আবার নতুন করে খুঁজে পেলাম। "সার্কেল অফ দ্যা সিক্সথ্" শুনতে থাকলাম। মাইলস এর ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এই দুটি নাম হামিন ভাই আর মানাম ভাই। শাফিন ভাই কে যে আমার খারাপ লাগে তা নয়। কিন্তু এক্সট্রা-অর্ডিনারি বলেতো একটা কথা আছে। সেখানে হামিন ভাই আর মানাম ভাই'এর তুলনা নেই। মাইলস একের পর এক "প্র" অক্ষর সম্বলিত এ্যালবাম বাজারে ছাড়তে লাগলো। তবে, বিশেষভাবে উল্লেখ্য, প্রথম দিকের মাইলস যেন এখন আর নেই। "প্রথম প্রেমের মতো"-র মত একটা ট্র্যাক এখন মাইলস এর এ্যালবামে খুঁজলে আর পাওয়া যাবেনা। মাইলস বাংলাদেশের মেইনস্ট্রিম ব্যান্ড মিউজিকে লিভিং লিজেন্ড হিসেবেই আছে এখনও- আর তাই সত্যি। চটপট মেইনস্ট্রিম কিছু ব্যান্ডের নাম মনে আসলো তাই বলে ফেলি। ফিডব্যাক, নোভা, রেনেসাঁ, প্রমিথিউস এবং সোলস। আরও একটি ব্যান্ডের নামও সাথে উল্লেখ করছি- "ডিফরেন্ট টাচ্"।
চলবে...
বেনসন বলেছেন:
রকস্টার্টার এলবাম শুধু নিম্নমানের রেকর্ডিংএর জন্য হিট করে নাই তা না। আমার মনে হয় ঐ সময় বেশীরভাগ শ্রোতারা মেটালের সাথে ফ্যামিলিয়ার ছিল না। যেটা এখন হয়েছে। রকস্টার্টার এলবাম ছিল সময়ের চেয়ে বেশ খানিকটা এগিয়ে।
ওয়ারফেজের বৈশিষ্ট হল ওরা শেষ পর্যন্ত শ্রোতা কে বাধ্য করেছে নিজেদের গান শোনাতে।
আর জুয়েলের ব্যপারে আমার ধারনা, সে মাইলসে নিজের ক্যারিয়ারের শ্রেস্ঠ সময় নস্ট করছে। তার কাছ থেকে শ্রোতাদের আরও কিছু পাওয়ার ছিল, যেমনটা অর্থহীনের সুমন।
লেখক বলেছেন: যথার্থ।
তৌফিক আহমেদ বলেছেন:
আপনার কথার সাথে আমি একমত। বিশেষ করে জুয়েলের যেই বিষয়টা আপনি উল্লেখ করলেন তা শতভাগ সত্যি। আর সুমনের ব্যাপারটাও।ধন্যবাদ আপনাকে।
নিহন বলেছেন:
চলুক।
শাহেদুর রহমান বলেছেন:
চলুক।
রাশেদ বলেছেন:
+
জ্বিনের বাদশা বলেছেন:
বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতকে জনপ্রিয় করে তুলেছিল সোলস, সেই আশির দশকের প্রথম দিকে ... তবে আমার ধারনা সবচেয়ে বড় ইম্পাল্স ব্যান্ড সঙ্গীত পেয়েছে এককভাবে চাইমের "নাতিখাতি বেলা গেল ... " গানটা দিয়ে ... ব্যান্ড সঙ্গীত বলে আলাদা একটা ধারা যে কনভেনশনাল গানের রীতিকে ভাঙতে আসছে বাংলাদেশে এই গানটাই প্রথম জোরেসোরে সেই দাবী রেখেছিল ... সারা বাংলাদেশে বেজেছে গানটাতারপর আরেকদফা জনপ্রিয় করল "কলিকালের ভন্ডবাবা ..." গানটা ... শুধু তাইনা, অবসকিউরের পুরো এ্যালবামটাই সুপারডুপারহিট ছিল ...
মাঝখানে বেবী নাজনীনের কিছু গান / ডলি সায়ন্তনীর "রংচটা জিন্সের প্যান্টপরা ..." আরেকটি ধারার উত্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল
আমাদের কৈশোরে আরেকটা সাড়াজাগানো গান ছিল, অরবিটের "ঐ লাল শাড়ীরে ..."
লেখক বলেছেন: আপনাকে ধন্যবাদ লেখাটা পড়বার জন্য।
রাশেদ বলেছেন:
Click This Linkকাইন্ডলি এই লিঙ্কটা একটু ভিজিট করুন। আপনার লেখাটা বৈশাখি ইসংকলনের জন্য নির্বাচিত হয়েছে। আপনার মতামত প্রয়োজন।


















