অনেক দু:খ আর ক্ষোভ থেকে লিখতে বসলাম। স্কুলে থাকতে স্বপ্ন ছিল ইউনিভার্সিটির পড়াশোনা শেষ করেই দৌড় দেবো বিদেশে। সেটেল হয়ে যাবো বাইরেই। কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝতে শিখলাম। আমি ক্লাশ ৫ থেকে আজ পর্যন্ত পড়াশোনা করছি সরকারী প্রতিষ্ঠানে। আমার পড়াশোনার খরচ চালিয়েছে দেশের গরীব মানুষেরা। তাদের টাকায় পড়াশোনা করে তাদের জন্য কিছু না করে বাইরের দেশের গোলামী করা বড় অকৃতজ্ঞের মত কাজ হয়ে যায়। যত বড় হচ্ছি দেশের জন্য ভালবাসা ততই বাড়ছে। ঘৃণা বাড়ছে পাকিস্তান, রাজাকার, দুর্নীতিবাজ, যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি। সত্যি কথা বলতে, আমি চাই দেশের জন্য কিছু করতে। আমি জানি আমার মত একই চিন্তা-ভাবনা করছে আমারই মত তরুণেরা। কিছুদিন আগে একটা অনুষ্ঠানে মুনির হাসান স্যার বলেছিলেন, “যে দেশের ৬৫% লোকের বয়স ২৫ এর নীচে তারাই পারে একটা দেশের ভবিষ্যত বদলে দিতে।” খুবই ভাল লাগে ভাবতে যে আমরাই দেশটাকে বদলে দেবো। কিন্তু স্বপ্ন তো স্বপ্নই। অন্তত এ দেশে। কতটুকু কি করা সম্ভব আমাদের পক্ষে?
পুরো দেশটাই আসলে পড়ে আছে একটা ডেডলকের মধ্যে। দুর্নীতির দুষ্টচক্রের মধ্যে ঘুরছে পুরো দেশ। একটা ভাল কিছু করতে যান, শত বাধা আসবে। আমি ইতিবাচক চিন্তা করি। কেউ যদি বলে যে, আজকে দেখলাম রাস্তায় একটা ছেলে একটা মেয়ের ওড়না ধরে টান দিয়েছে। আমি সাথে সাথেই বলবো , “কেন দুইটা থাপ্পড় দিলেন না?” আমি বিশ্বাস করি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা ছাড়া বিকল্প কোন রাস্তা নেই। সেটা বড় অন্যায়ই হোক বা ছোটই হোক। কিন্তু বাংলাদেশের অবস্থা আসলেই খুব খারাপ। প্রতিবাদ করতে হবে আপনাকে একা। দেশের সুশীল সমাজ দুটো বুলি দিয়েই ঠান্ডা। যে দেশে ছাত্ররাজনীতির জোড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তার ৪ বছর সিনিয়রের গায়ে হাত তুলতে পারে সে দেশের কাছে মূল্যবোধের উত্তরণ আশা করা বৃথা।
একটা ঘটনা বলি। ১০ বছর আগে পৌরসভা নির্বাচনের সময় আমাদের ওয়ার্ড থেকে যিনি কমিশনার প্রার্থী ছিলেন তিনি আমাদের পাড়ার রাস্তাটা ঢালাই করেছিলেন খুব মজবুত করে। কেন? ভোট দরকার। রাস্তাটা অনেক ভাল হয়েছিল। কারণ, এই ১০ বছরেও কোন জায়গায় ফাটল ধরেনি, ইট উঠে যায়নি। কিছুদিন আগে গরমের বন্ধে বাসায় গেলাম। গিয়ে দেখি একই রাস্তার উপর দিয়ে আবার নতুন করে ঢালাই করা হচ্ছে। কারণ, আবার নির্বাচন। নির্বাচন মানেই পাড়ায় পাড়ায় টাকা ছড়ানোর খেলা। এমনি এমনি তো আর টাকা দেয়া যায়না। তাই একটা ছোটখাট উন্নয়ন। আমাদের পাড়ায় এক রিকশাওয়ালা থাকত। বেশ কয়েকবার চুরির দায়ে ধরা পড়েছিল। তার এখন ২তালা একটা বিল্ডিং আছে। কিভাবে? গত ১০-১২ বছর সে সবসময় একটা লোকের খেদমত করত। সে লোকটাই হল আমাদের পাড়ার এবারের নির্বাচনের প্রার্থী। যার কাজই হল এলাকায় চাদাবাজি করা, বর্ডার থেকে ইন্ডিয়ান শাড়ী, মাদকদ্রব্য চোড়াচালানী করা। সে সারাদিন ঘুমায় আর রাত্রে ব্যবসা শুরু করে। মজার ব্যাপার হল এলাকার নিরাপত্তার জন্য প্রতিরাত্রে আমাদের পাড়ায় ৩জন আর্মড পুলিশ থাকে, যারা ওই প্রার্থী বাদে অন্য যে কাউকেই রাস্তায় দেখলে হেনস্তা করে, মারধোর করে। আমি আবার বাসায় গেলে রাত্রে সিগারেট খেতে বের হই মাঝে মাঝে। এবার পুলিশগুলো আমাকে ৫ মিনিট জিজ্ঞাসাবাদ করে। আমি ইচ্ছা করেই বেয়াদবী করি। কিছুক্ষণ পর প্রার্থী এসে তাদের বলে, “আমার ভাইগনা। সমস্যা নাই”। তারপর আমাকে বলে, “ভাগিনা, ইলেকশান করতাসিতো। তোমার বাবারে কইয়ো ভোটটা দিতে। সবাই দিবো। তোমরা না দিলে কেমন দেহায়না?” যতক্ষন সিলেটে ক্যাম্পাসে থাকি নিজেকে অনেক সাহসী মনে হয়। মনে হয় সব চোড়-বাটপারদেরকে ফু দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারব। কিন্তু একটু বাইরে বের হলেই সাহস হারিয়ে ফেলি। নিজের নিরাপত্তাটাই তখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের হাত-পা আসলে বন্ধ। একসাথে প্রতিবাদ করার দরজাও বন্ধ। সমাজ বদলে দেবার রাস্তাটাও রুদ্ধ। দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া উপায় নেই।
দেশের উন্নয়ন কিভাবে হবে? এবার শুনলাম পৌরসভা নির্বাচনের প্রার্থীরা প্রচারণায় ১-১.৫ কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ করছে, যেখানে চেয়ারম্যানের মাসিক বেতন ৩০০০ টাকার মত। তাহলে এই টাকা তুলবে কিভাবে? সুতরাং দেশের সাধারণ জনগণের পুটু মারো আর সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে দেশের টাকা মেরে বাড়ি, গাড়ি করো। প্রতিবছরের বাজেটের নাকি ২০% এর মত বরাদ্দ থাকে পল্লী উন্নয়নের জন্য। এই ২০% টাকা যে কার উন্নয়নে খরচ হচ্ছে তা নিশ্চয়ই আর বলা লাগবেনা। আমাদের বড় দুর্ভাগ্য দেশের এই অবস্থায় আমাদের কিছুই করার নেই। সব রাজনৈতিক দলের অধিকাংশ নেতারাই চোর-বাটপার। জানি আপনি বলবেন, “না। আওয়ামীলীগ এই। বিএনপি সেই। নেতারা ধোয়া তুলসীপাতা। মুজিব-জিয়ার আদর্শের অগ্রপথিক তারা। আমার শিক্ষা হওয়া উচিত এ কথা বলার জন্য”। এ কথা বলার আগে নিজের বিবেককে প্রশ্ন করে দেখুন আপনার কথাগুলো সঠিক কিনা। হয়তবা আপনার করা বাড়িটিও কোন নেতার পা-চেটে ইনকাম করা টাকার ফসল। এদেশের কৃষকরা ফসলের দাম পায়না। ক্ষুধার চোটে আত্মহত্যা করে। আর, তারেক, কোকো সহ আরো অনেক জারজ জনগণের কষ্টের টাকা মেরে বিদেশে পাচার করে। দেশের প্রতি ভালবাসা থেকে একজন যে আত্মত্যাগ করে, সেই আত্মত্যাগকে পুটু মেরে আকাশে তুলে দেয় ১০০ জন জারজ দুর্নিতীবাজ। তাই জাফর ইকবাল স্যারকে কিছুদিন পরপর হত্যার হুমকির চিঠি পড়তে হয় দেশের তরুণদেরকে স্বপ্ন দেখানোর জন্য, হুমায়ুন আজাদকে খুন হতে হয় কিছু অপরাধীর মুখোশ খুলে দেবার জন্য, মুহাম্মদ ইউনুসকে অপমানিত হতে হয় কিছু গরীব জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য। আমার সত্যিই সন্দেহ হয় এইসব দেশদ্রোহী দুর্নীতিবাজদের জন্ম পরিচয় নিয়ে। এরাই কি ৭১ এ পাকিস্তানীদের ঔরশজাত সন্তানেরা? এরা ছাড়াতো আর কারো পক্ষে সম্ভব না বাংলাদেশের সর্বনাশ করা।
বাঙ্গালী আসলে ভদ্রতা শেখেনি। শেখেনি সত্য বলা, দেশকে ভালবাসা। শিখেছে কিভাবে অন্যের পুটু মেরে নিজের ভাল করা যায়। কেউ স্যাক্রিফাইস করা শেখেনি। শিখেছে অন্যের হক কেড়ে নেয়া। যারা আজ দেশের কথা চিন্তা করছি, দেশকে ভালবাসছি তাদের জন্য আসলে হতাশা ছাড়া কিছুই নেই। কারণ, দেশে দরকার একটা ম্যাসিভ পরিবর্তন। কিন্তু এই পরিবর্তন আনতে হলে বদলে দিতে হবে দেশের প্রতিটা মানুষের মন-মানসিকতা। লাখ লাখ দুর্নীতিবাজদের খুন করা দরকার, যেমনটা করেছিল ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানীরা এদেশকে পঙ্গু করার জন্য বুদ্ধিজীবিদের মেরে ফেলে। আরেকটা ১৪ ডিসেম্বর আসা দরকার। সেদিন যারা এদেশকে ফকির পঙ্গু করে দিচ্ছে তাদের খুন করা হবে। সরকার এতদিনে যা ভুলভাল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে এগুলো তো আর আনডু করা সম্ভব না। একজোট হয়ে দেখতে হবে যে আর যাতে কোন ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া না হয়।
আমরা তরুণরা একজোট হলেই পারব দেশটাকে বদলে দিতে। দরকার শুধু ভদ্রতা শেখা, দেশকে ভালবাসা। সবাইকে যদি আমরা তার প্রাপ্যটা দেয়ার ব্যবস্থা করতে পারি তাহলেই দেশ বদলাতে বাধ্য। অসুন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা শিখি। একসাথে প্রতিবাদ করি। কারণ একা প্রতিবাদ করতে গেলেই আসে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তার প্রশ্ন। তাই যখসি দেখবো পরিবর্তন দরকার, একসাথে পরিবর্তন করবো। বিষদাঁত ভেঙে দেবো কুচক্রী সাপের। দেখবো কোন শালায় এদেশকে ধ্বংস করে। খুন করে ফেলবো সব গুলারে।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই নভেম্বর, ২০১১ দুপুর ১২:২৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



