আতিক সাহেবের মন আজ অনেক ভাল। তিনি অপেক্ষা করছেন মেয়েটা কখন মার্কেট থেকে বাসায় ফিরবে। তার জন্য একটা সুখবর নিয়ে বসে আছেন তিনি। একমাত্র মেয়েটার বিয়ের কথাবার্তা একদম পাকা করে ফেলেছেন। সেদিনের সেই ছোট্ট মেয়েটাকে তিনি বিয়ে দিয়ে দেবেন। পাত্র আমেরিকায় থাকে। পি.এইচ.ডি করছে। ফ্যামিলীও অনেক ভালো। মেয়েটা সুখেই থাকবে। মেয়েকে সারপ্রাইজ দেবেন বলে আগেভাগে কিছু জানাননি তিনি। জানালে তো সে আজকের এই আনন্দটা পেত না। আজতো ঈদের চেয়েও বেশী খুশী লাগছে তার। আর দু মাস পরেই মেয়ের বিয়ে।
রিমি ৫টার দিকে বাসায় ফিরে দেখে কেমন যেন একটা চাপা খুশী খুশী ভাব। সে বুঝতে পারলনা কি হয়েছে। বাবাকে জিজ্ঞেস করলে বাবা বলে তোর মাকে জিজ্ঞেস কর। মাকে জিজ্ঞেস করলে বলে বাবাকে জিজ্ঞেস কর। এভাবে কয়েক মিনিট যাওয়ার পর রেগেমেগে যখন নিজের রুমের দিকে পা বাড়ায় তখন মা পেছন থেকে বলে উঠেন, “মা, তোর বিয়ে তো ঠিক করে ফেললাম। নভেম্বরে বিয়ে। ছেলে আমেরিকায় থাকে।” রিমি একটু থমকে দাড়ায়। তারপর দ্রুতপায়ে নিজের রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়। আতিক সাহেব জোড়ে বলেন, “কিরে, লজ্জা পেলি নাকি? দাড়া। শোন।”
------------------------------------------------------------------------------
মোবাইলে ভাইব্রেশান টের পেয়ে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে শুভ্র। রিমি ফোন করেছে। কি হল আবার, একটু আগেই তো দেখা করে এল। ফোন রিসিভ করে বলে, “কি জান, কি হল?”
- শুভ্র, বাবা আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে। এখন কি হবে?
- হলি শিট। কি বলছো এসব? তোমাকে জিজ্ঞেস না করেই?
- হ্যা। আমি কিছুই জানতাম না। একটু আগে বাসায় ফিরেই শুনলাম। কি করব এখন?
- আমিও তো বুঝতে পারছিনা কি করব।
- শুভ্র চল, পালিয়ে বিয়ে করে ফেলি।
- মাথা খারাপ? পালিয়ে বিয়ে করলেই হল? আরো অনেক ব্যাপার স্যাপার আছে। টাকা দরকার। বাসা দরকার। আমার অবস্থাতো তুমি জানই। জবের স্যালারী অনেক কম। এখন কিভাবে বিয়ে করব?
- তাহলে কি তুমি বলছ বিয়ে করে ফেলতে? আমি তোমাকে ছাড়া বাচব না শুভ্র। প্লিজ কিছু একটা কর।
- ওকে ওকে। কুল ডাউন জান। তুমি এক কাজ কর। আন্টিকে বলে দেখো। যদি বুঝাতে পার, তাহলে হয়তোবা কিছু করা পসিবল।
- আচ্ছা ঠিক আছে। রাত্রে ফোন করব। বাই।
কি ঝামেলায় পড়া গেল। টাকা পয়সার কোন ঠিক ঠিকানা নাই, এখন হুট করে কিভাবে বিয়ে করবে? মুখের কথা নাকি?
রাতে রিমি ফোনে বলল, মাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল। কাজ হয়নি। মা উল্টো রেগে গেছেন। বাবাকে বলে দিয়েছেন। বাবাও শোনার পর আগ্নেয়গিরি হয়ে আছেন। পালাতেই হবে। আর কোন উপায় নেই। বাবা কিছুতেই এত ভাল ছেলে হারাতে রাজী না। শুভ্রর কথা শোনার পর বলেছেন, শুভ্র যদি তার মেয়ে জামাই হওয়ার মত কোয়ালিটি অর্জন করতে পারে তবেই বিয়ে দেবেন। তা না হলে আশা ছেড়ে দিতে বলেছেন।
শুভ্র বড় চিন্তায় পড়ে গেল। প্রাইভেট কোম্পানীর চাকরীতে যে বেতন পায় সে বেতনে ঢাকা শহরে বউ নিয়ে থাকা অনেক শক্ত। এছাড়া মাসে বেশ কয়েকবার বন্ধু-বান্ধবদের সাথে মদের পার্টি দিলে তো পকেট পুরোটাই খালি হয়ে যাবে। মাঝে মাঝে সাধু-সংসর্গ না হলে তো জীবনের মজাই পাওয়া যায়না। অনেক চেষ্টা করেছিল ছাড়তে। কিন্তু পারেনি। রিমি এসব জানেনা। জানলে সমস্যা হয়ে যাবে। রিমির বাবার প্রচুর টাকা। বিয়েটা করতে পারলে অনেক লাভ হত। ভাল একটা মেয়েই বাগিয়েছে সে, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। অন্ধের মত বিশ্বাস করে তাকে রিমি। কিন্তু এই বাপটাই তো দিল সব গোলমাল করে। কে বলেছিল এত তাড়াতাড়ি মেয়ের বিয়ে ঠিক করতে। নাহ, পালানো ছাড়া উপায় নেই। মোবাইলটা হাতে তুলে নিয়ে রিমির নাম্বারটা খুজতে থাকে শুভ্র।
অনেকক্ষণ ধরে রেস্টুরেন্টে অপেক্ষা করছে রিমি। শুভ্রকে নিয়ে আর পারা গেলনা। দশটায় আসার কথা। এখন সাড়ে দশটা বাজে। এদিকে টেনশনে অবস্থা খারাপ। বান্ধবীর বাসায় যাবার কথা বলে বের হয়েছে বাসা থেকে। মাকে বলেছে দুপুরের আগেই চলে আসবে। কিন্তু ফেরা যে কবে হবে তা তো রিমি নিজেও জানেনা। আজ শুভ্রকে বিয়ে করবে সে। জীবনের অনেক বড় একটা ডিসিশান নিয়ে ফেলল সে। একটু ভয় ভয়ও লাগছে। প্রথমে ভেবেছিল পালাবেনা। মা-বাবাকে সে কষ্ট দিতে পারবেনা। কিন্তু শুভ্র তাকে অনেক ভালবাসে। সে সুখেই থাকবে। পালিয়ে বিয়ে করে বাবার সামনে দাড়ালে নিশ্চয়ই বাবা মেনে নিবেন। একমাত্র আদরের মেয়ে সে। তাই ডিসিশানটা নিয়েই ফেলল। রাস্তার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে থাকল শুভ্রর জন্য।
আতিক সাহেব অনেক টেনশনে আছেন। রিমির মা ফোন করে বলল, রিমি সেই সকালে বান্ধবীর বাসায় গেছে দুপুরে ফিরবে বলে। কিন্তু এখনো কোন খবর নেই। মোবাইল ও বন্ধ। এদিকে সব বান্ধবীর বাসায় ফোন করেও রিমির কোন খোজ মিলল না। আতিক সাহেবও খোজ-খবর নিচ্ছেন। অপেক্ষা করছেন কখন অফিস ছুটি হবে। হঠাৎ একটা মেসেজ এল মোবাইলে। মেসেজে লেখা, “"বাবা, আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমি তোমাদের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারলাম না। আমি শুভ্রকে বিয়ে করে ফেলেছি।”" স্তব্ধ হয়ে আরেকবার মেসেজটা পড়লেন তিনি। বুকের বামপাশে চিনচিনে একটা ব্যাথা অনুভব করলেন। তারপর অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন।
রিমিকে নিয়ে শুভ্র তার এক বন্ধুর বাসায় উঠেছে। রিমির মনে একদিকে আনন্দ, আরেকদিকে মা-বাবাকে ছেড়ে আসার কষ্ট। মেনে নেয় নিয়তিকে। এটাই মনে হয় হবার ছিল। দেখা যাক কি হয়। এক সপ্তাহ পর সে বাসায় যাবে শুভ্রকে নিয়ে। ক্ষমা চাইবে বাবা-মার কাছে। মনে হয় ক্ষমা পেয়ে যাবে। খবরটা পেল রাত ১২টার দিকে। বাবার হার্ট এটাক হয়েছে। দু চোখের জল সামলে নিয়ে শুভ্রকে বলল একসাথে হসপিটালে যাওয়ার জন্য। কিন্তু শুভ্রতো নববিবাহিতা স্ত্রীকে আদর করা বাদ দিয়ে তাকে মেনে নেয়নি এমন একজনকে দেখার জন্য হসপিটালে দৌড়াতে পারেনা। “জান, আজকে থাক। কালকে যাব। আজ আমাদের বাসর রাত। ভালবাসার রাত। বাইরে থাকাটা কেমন দেখায়না? আর তোমার বাবাতো আমাদের বিয়েটা মেনে নেয়নি। তাই না? কি লাভ এত দরদ দেখিয়ে।” এই বলে কামুক হাত দুটো বাড়িয়ে দেয় রিমির দিকে। স্তম্ভিত হয়ে পড়ে রিমি শুভ্রর কথা শোনে। এ কোন শুভ্র। জোর -জবরদস্তি করে শুভ্রর হাত থেকে মুক্তি পাবার। কিন্তু এতো মানুষের হাত নয়, কোন এক পশুর হাত। বিয়ের দিনই বদলে যাওয়া মানুষটাকে মেনে নিতে বড় কষ্ট হয় রিমির। হার মেনে নেয় শুভ্রর কাছে। অসহায় সত্ত্বাকে সমর্পন করে দেয় শুভ্রর কাছে। চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে দু-ফোটা জল।
সকাল না হতেই নির্ঘুম চোখে হাসপাতালে দৌড়ে গেল সে। একা। শুভ্রতো ক্লান্ত। সে কিভাবে আসবে? হাসপাতালে গিয়ে রিসিপশানে খোজ করে। রিসিপশান থেকে জানতে পারল ভয়াবহ দু:সংবাদ। বাবা আর নেই। রাত সাড়ে তিনটার দিকে মারা গেছেন। রিমিকে একবার দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার মোবাইল অফ থাকায় তাকে পাওয়া যায়নি।
কান্নায় ভেঙে পড়ে রিমি। একটা সি.এন.জি নিয়ে চলে যায় বাসায়। বাসায় অনেক লোকজন। ঘরে ঢুকে বাবার নিথর দেহটা দেখে ডুকরে কেদে উঠে রিমি। তার উপর চোখ পড়ে মায়ের। মা তাকে বের হয়ে যেতে বলেন বাসা থেকে। কান্নার তোড়ে কথা বের হয় না রিমির মুখ থেকে। মার পা জড়িয়ে ধরে কেদে উঠে রিমি। কিন্তু মা তাকে লাথি মেরে বের করে দেন বাসা থেকে। রিমির অসহায় মুখটা দেখেও আজ মার কোন মায়া হয়না। যে মেয়ে মা-বাবার মনে কষ্ট দিয়ে পালিয়ে বিয়ে করে তার জন্য কোন স্নেহ নেই, নেই কোন ক্ষমা।
শোকে পাথর রিমি ফিরে আসে শুভ্রর কাছে। খুলে বলে সব কথা। শুভ্র সব শুনে বলে, “আরে, বাদ দাও। লেটস এনজয় আওয়ার নিউ লাইফ। আমরা আজ হানিমুনে যাচ্ছি কক্সবাজার। রেডি হও তাড়াতাড়ি। আর যে আমাদের বিয়ে মেনে নেয়নি তার জন্য তোমার এত ভালবাসা কেন? জাষ্ট ফরগেট দিস হেল।”- রিমি পাথর হয়ে ভাবে, “এটাই কি সেই শুভ্র যাকে সে ভালবেসে বাসা থেকে পালিয়েছে, যার জন্য আজ তার বাবাকে সে খুন করল, এটাই কি সেই শুভ্র?”
ছয় মাস পেরিয়ে গেছে। রিমিকে তার মা ক্ষমা করেননি। আত্মীয়-স্বজনরাও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তার থেকে। একটা ছোট্ট দুই রুমের বাসায় রিমির সংসার। বিয়ের মাসখানেকের মধ্যেই রিমি প্রেগনেন্ট হয়ে পড়ে। শুভ্রর অল্প ইনকামে সংসার চালানো দায়। শুভ্রও অনেক বদলে গেছে। অনেক ধারদেনা করে ফেলেছে ইতিমধ্যেই। প্রতি শুক্রবারে সে বাসায় বন্ধু-বান্ধব নিয়ে মদ খায় । তার বন্ধুরা রিমির দিকে বাজে নজরে তাকায়। দু-একজন বাজে ইঙ্গিতও করে। শুভ্রকে একদিন বলেছিল। লাভ হয়নি কোন। বরং পার মাতাল শুভ্র তাকে একটা চড় মেরে বলে, "“আমার বন্ধুদের নিয়ে কোন বাজে কথা বললে খুন করে ফেলব হারামজাদী। তোকে বিয়ে করলাম আর জীবনটা নরক হয়ে গেল। কোথায় বাপের বাড়ি থেকে টাকা-পয়সা আনবি তা না, আমার বন্ধুদের পেছনে লেগেছিস।"” রিমির বড় কষ্ট হয়। শুভ্রকে তার সন্তানের কথা বলে চেষ্টা করে ভাল করার। কিন্তু শুভ্র কি আর এখন রিমির কথা শুনবে?
দিনটা রবিবার। শুভ্র অফিসে। রিমি বাসায় রান্না করছিল। হঠাৎ দরজায় টোকার শব্দ শুনে দরজা খুলে দেখল শুভ্রর বন্ধু কমল। ভেতরে আসতে বলার আগেই সে ভেতরে চলে আসে। এসে রিমির হাতে মোবাইল দিয়ে বলে, “শুভ্রর ফোন।” রিমি ফোন কানে নিতেই শুভ্র বলে, “"জান, কমলের কাছে আমার অনেক টাকা ঋণ। এগুলো তোমার সাহায্য ছাড়া শোধ করতে পারব না। তুমি প্লিজ একটু হেল্প কর। আই এম সরি জান। আই লাভ ইউ।”" কথা শেষ হতে না হতেই কমল রিমিকে দু হাতে জড়িয়ে ধরে সোফায় ফেলে দেয়। চিৎকার করে উঠে রিমি। আপ্রাণ চেষ্টা করে ছাড়া পাবার। কিন্তু পারেনা। কমলের হাত চেপে ধরে তার মুখ। ধর্ষিত হয় রিমির শরীর, রিমির সত্ত্বা, ভালবাসা, বিবেক। নিথর হয়ে তাকিয়ে দেখে কমলের চলে যাওয়া। নিজের প্রতি ঘৃণা জড় করে ফেলে রিমিকে। আস্ত আস্তে হেটে ড্রয়ার থেকে একটা ব্লেড বের করে। বাবার হাস্যোজ্জল মুখটা ভেসে উঠে চোখের সামনে। আই এম সরি বলে ডান হাতে ধরা ব্লেডটা নিয়ে যায় বাম হাতে। আলতো একটা দাগ টানে হাতের ধমনীতে। লাল দাগটা ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। চারপাশটা বড় অস্পষ্ট হতে থাকে। প্রচন্ড জোড়ে রিমি ব্লেড দিয়ে আরেকটা দাগ টানে তার হাতে।
===========================================
এই গল্পের সব চরিত্র কাল্পনিক। কারো সাথে মিলে গেলে তা নিতান্তই কাকতালীয়। কেমন লাগল বলবেন।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই নভেম্বর, ২০১১ দুপুর ১২:২৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


