স্টাফ রিপোর্টার : আজ বুধবার দেশের সংবাদপত্র শিল্পের কালো দিবস। জাতীয় ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কময় দিন এটি। ‘বাকশাল' দর্শন অনুসারে ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন তৎকালীন শেখ মুজিবুর রহমান সরকার চারটি রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত পত্রিকা ছাড়া বাকি সকল সংবাদপত্র বন্ধ করে দিয়েছিল। সাংবাদিক সমাজ প্রতি বছর দিনটিকে ঘৃণা ও ধিক্কারের সাথে কালো দিবস হিসেবে পালন করে থাকে। আজ এমন এক সময়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে যখন শেখ মুজিবের উত্তরসূরী শেখ হাসিনার সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন। বর্তমান সরকার চ্যানেল ওয়ান বন্ধ করে দিয়েছে। যমুনা টেলিভিশনের অনুমোদন আটক রাখা হয়েছে। দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার প্রকাশনা (ডিক্লারেশন) বাতিল করে দেয়া হয়েছে এবং ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের ওপর রিমান্ডের নামে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে। ভিন্ন মতের সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন, মামলা অব্যাহত রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে এবারের সংবাদপত্রের কালো দিবস বাড়তি কর্মসূচিতে পালন করা হচ্ছে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র তিন বছর পার হতে না হতেই ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি কোন প্রকার আলোচনা ছাড়াই কয়েক মিনিটের ব্যবধানে সংসদে আনা হয়েছিল সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী উক্ত সংশোধনীর ফলে জাতির ঘাড়ে চেপে বসে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা ‘বাকশালের' জগদ্দল পাথর। এরই ধারাবাহিকতায় ওই বছর ১৬ জুন আওয়ামী লীগ থেকে রূপান্তরিত বিতর্কিত বাকশাল সরকার প্রণয়ন করে ‘দ্য নিউজ পেপার এমেন্ডমেনট অ্যাক্ট'। আসলে সংবাদপত্রের ব্যবস্থাপনা নয়, এমনকি কেবল নিয়ন্ত্রণও নয়, ইচ্ছেমতো পত্রিকা নিধনের লক্ষ্যেই এই কলঙ্কজনক আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে শাসক গোষ্ঠী খবর ‘সেন্সর' করতো। লিখিত-অলিখিত অনেক বিধি-নিষেধ ছিলো। সংবাদপত্রে অনেক কিছুই লেখা যেতো না। ‘এটা লিখো না, ওটা লিখো না, শুধু ব্যক্তি মুজিবের গুণকীর্তন করো'- এই রকমই ছিলো সেই হীন স্বার্থমূলক আইনের মূলকথা।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ওই ঘোরকৃষ্ণ অধ্যায়ে সরকারের স্বেচ্ছাচারের শিকার হয়ে যায় ৮ হাজার সংবাদপত্রসেবী পেশাচ্যুত হয়েছিল। বেকার অবস্থায় দীর্ঘদিনের সপরিবারে অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করতে হয়েছে বহু সাংবাদিককে। এমনকি তাদের কেউ কেউ এ অবস্থার মধ্য দিয়েই দুনিয়া থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন। ‘কালো' জুনের পরিণামে সারাদেশে চার শতাধিক পত্রিকার মধ্যে মাত্র সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা চারটি বের হতো। এগুলো হলো- দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ টাইমস ও বাংলাদেশ অবজারভার। যে ইত্তেফাকের জন্মই হয়েছিল আওযামী লীগ ও শেখ মুজিবকে সমর্থনের জন্য সেই ইত্তেফাকের দীর্ঘ দু'যুগের ইতিহাস মুছে ফেলে বাকশালী সরকারের নির্দেশে প্রথম পৃষ্ঠায় লিখতে হয়েছিল ‘১ম বর্ষ ১ম সংখ্যা'। অবশ্য ১৫ আগস্টের পর ইত্তেফাক পূর্বের সিরিয়ালে ফিরে আসে আটষট্টি দিনের এপিসোডের পর এবং দৈনিক বাংলা তার পূর্ব সিরিয়ালে ফিরে যায় ১৯৭৫ সালের ৬ নবেম্বর।
শেখ মুজিব-কন্যা শেখ হাসিনার সরকারও ১৯৯৯ সালে টাইমস-বাংলা ট্রাস্টের চারটি পত্রিকা বন্ধ করে দিয়ে প্রায় ৮শ' সাংবাদিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পথে বসায়। ফেনীর জয়নাল হাজারীদের মতো ‘পাক পবিত্র' নেতারা অনেক সাংবাদিককে নির্যাতন করেছে। দ্বিতীয় আওয়ামী সরকারের আমলে সংঘটিত সাংবাদিক হত্যাকান্ডের সঙ্গে দলীয় নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার বিষয়টি প্রমাণিতও হয়েছিল। কিন্তু কোনটারই কোন বিচার হয়নি। তৃতীয়বারের মতো আওয়ামী লীগ সমমনাদের সমর্থন ও একটি বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। তারা ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ'-এর স্বপ্ন দেখালেও গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে তারা বরদাশত করতে পারছে না। বন্ধকৃত পত্রিকা চালু ও বেকার সাংবাদিকদের কাজ না দিয়ে বরং নতুন করে পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল বন্ধ ও সাংবাদিক বেকার করছে। ‘তথ্য অধিকার আইন' প্রণয়নের উদ্দেশ্য কী তা এখন আর বুঝতে বাকি নেই। এ সরকারের শীর্ষ ব্যক্তি থেকে শুরু করে এমপি, এমনকি একজন চুঁনোপুটি নেতার হাত থেকেও সাংবাদিকরা রেহাই পাচ্ছে না। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের অনেক সাংবাদিককে রাজনৈতিক বিবেচনায় চাকরিচ্যুত বা শাস্তিমূলক বদলী করা হয়েছে। দৈনিক আমার দেশ বন্ধের ষড়যন্ত্র কীভাবে চলছে তা সচেতন নাগরিক মাত্রই জানেন।
সংবাদপত্রের কালো দিবসের প্রাক্কালে গতকাল মঙ্গলবার বিএনপি চেয়ারপার্সন, বিরোধী দলীয় নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও জনগণের তথ্য জানার অধিকার রক্ষায় সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানিয়ে এক বাণী দিয়েছেন।
এদিকে গতকাল মঙ্গলবার এক আলোচনা সভায় বাংলাদেশ ন্যাপ নেতৃবৃন্দ বলেন, বর্তমান মহাজোট সরকার '৭৫-এর মতো সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করে বাকশাল প্রতিষ্ঠার চক্রান্ত করছে। তারা একের পর এক গণমাধ্যমের গলা টিপে হত্যা করে। '৭৫-এর ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করছে। সভায় বক্তব্য রাখেন পার্টির চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি, মহাসচিব এম গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম মাস্টার প্রমুখ।
আজকের কর্মসূচি
আওয়ামী লীগ সরকারের ১৯৭৫ থেকে অব্যাহতভাবে গণমাধ্যম দলনের বিরুদ্ধে সাংবাদিক ছাড়াও দল-মত নির্বিশেষে সকল পেশাজীবী নাগরিকরা আজ সোচ্চার হয়ে উঠেছে। এবারের কালো দিবসেও বিভিন্ন সংগঠন ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কর্মসূচি পালন করছে।
বিএফইউজে ও ডিইউজে যৌথ উদ্যোগে সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে সাংবাদিক ও পেশাজীবী নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখবেন। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) পক্ষ থেকে সকল অঙ্গ ইউনিয়নে কালো দিবস পালনের আহবান জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি : বিকেল ৩টায় কাজী বশির উদ্দিন মিলনায়তনে (ঢাকা মহানগর নাট্যমঞ্চ) এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এতে বিএনপির জাতীয় নেতৃবৃন্দসহ দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবীগণ আলোচনা করবেন। আলোচনা সভায় বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সকল পর্যায়ের নেতৃবৃন্দকে যথাসময়ে উপস্থিত হওয়ার জন্য যুগ্ম মহাসচিব মো. রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এনডিপি : বিকেল ৩টায় দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আলোচনা সভা হবে। এতে দলের চেয়ারম্যান খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজা উপস্থিত থাকবেন।
আগ্রাসন প্রতিরোধ জাতীয় কমিটি : বিকেল ৪টায় পুরানা পল্টনস্থ মদীনা মিলনায়তনে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এতে সভাপতিত্ব করবেন কমিটির আহবায়ক, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের নির্বাহী সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন খান।
বাংলাদেশ লেবার পার্টি : সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় প্রেসক্লাব ভিআইপি লাউঞ্জে ‘সংবাদপত্রের কালো দিবস : আজকের বাংলাদেশ' শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করা হয়েছে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য এমকে আনোয়ার এমপি।
কালো দিবসের আলোচনায় বক্তারা
পত্রিকা সম্পাদককে
বিবস্ত্র করে পেটানোর জবাব
একদিন দিতে হবে
স্টাফ রিপোর্টার : বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য সাংবাদিকরা রক্ত দিয়েছে। ন্যায়বিচার পাবার আশায় লড়াই সংগ্রাম করেছে মানুষ। কিন্তু সেই বিচার বিভাগ যদি স্বাধীনভাবে বিচার করতে না পারে তাহলে দেশের গণতন্ত্র কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। মানুষ তাদের শেষ আশ্রয়স্থল হারালে তার পরিণতি শুভ হয় না। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) ঢাকা মহানগরীর উদ্যোগে সংবাদপত্রের কালো দিবস ও দৈনিক আমার দেশের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা এ কথা বলেন। জাসাসের ঢাকা মহানগরীর সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ ফয়েজের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান আলোচক ছিলেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি ও বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা শওকত মাহমুদ। আরও বক্তব্য রাখেন সাবেক মন্ত্রী বিএনপির স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, নজরুল গবেষক কবি আব্দুল হাই শিকদার, জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক জোটের মহাসচিব রফিকুল ইসলাম, জাসাসের কেন্দ্রীয় সভাপতি এম এ মালেক, সাধারণ সম্পাদক বাবুল আহমেদ, সাংগঠনিক সম্পাদক মোশাররফ আহমেদ ঠাকুর, প্রকাশনা সম্পাদক মতিউর রহমান সূর্য, আমার দেশ পত্রিকার রিপোর্টার আহমেদ করিম প্রমুখ।
শওকত মাহমুদ বলেন, একজন পত্রিকা সম্পাদককে বিবস্ত্র করে পেটানো হয়েছে এর জবাব একদিন প্রধানমন্ত্রী, তথ্যমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দিতে হবে। আগামী ২০ জুন সারাদেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য বিএনপির ডাকা বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে সরকার পতন আন্দোলনের সূচনা হবে। ঘরে ঘরে চাকরি দেয়ার কথা বলে হাজার হাজার মানুষকে বেকার করার মাশুল একদিন সরকারকে দিতে হবে। তিনি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য মানুষ লড়াই সংগ্রাম করেছে। সাংবাদিকরা রক্ত ঝরিয়েছে। কিন্তু সেই আদালত যদি সাংবাদিকদের বেকার করার পক্ষে রায় দেয়, গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করে, তাহলে ন্যায়বিচার হয় না। আমরা আদালতের কাছে ন্যায়বিচার আশা করি।
রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, যে আওয়ামী লীগ ১৯৭২ সালে শুধুমাত্র ৪টি সংবাদপত্র নিজেদের আয়ত্তে রেখে বাকি সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দিয়েছিল। সাংবাদিকদের পথে বসিয়েছিল, তাদের পেটে লাথি মেরেছিল, সেই সাংবাদিকরা যখন আওয়ামী লীগের পক্ষে গুণগান করেন, তখন আমার লজ্জা লাগে, কষ্ট লাগে। সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করে শেখ মুজিবুর রহমান টিকতে পারেনি, শেখ হাসিনাও টিকতে পারবে না।
কবি আব্দুল হাই শিকদার বলেন, আদালতের ওপরে আর একটি আদালত আছে। এজন্য দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি বাদ দিয়ে বিবেক ও মগজ দিয়ে বিচার করুন। এ সরকারই শেষ সরকার নয়। যারা মাহমুদুর রহমানের ওপর নির্যাতন করে ভাবছেন পার পাবেন তারা ভুল করছেন।
স্টাফ রিপোর্টার : আজ বুধবার দেশের সংবাদপত্র শিল্পের কালো দিবস। জাতীয় ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কময় দিন এটি। ‘বাকশাল' দর্শন অনুসারে ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন তৎকালীন শেখ মুজিবুর রহমান সরকার চারটি রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত পত্রিকা ছাড়া বাকি সকল সংবাদপত্র বন্ধ করে দিয়েছিল। সাংবাদিক সমাজ প্রতি বছর দিনটিকে ঘৃণা ও ধিক্কারের সাথে কালো দিবস হিসেবে পালন করে থাকে। আজ এমন এক সময়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে যখন শেখ মুজিবের উত্তরসূরী শেখ হাসিনার সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন। বর্তমান সরকার চ্যানেল ওয়ান বন্ধ করে দিয়েছে। যমুনা টেলিভিশনের অনুমোদন আটক রাখা হয়েছে। দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার প্রকাশনা (ডিক্লারেশন) বাতিল করে দেয়া হয়েছে এবং ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের ওপর রিমান্ডের নামে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে। ভিন্ন মতের সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন, মামলা অব্যাহত রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে এবারের সংবাদপত্রের কালো দিবস বাড়তি কর্মসূচিতে পালন করা হচ্ছে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র তিন বছর পার হতে না হতেই ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি কোন প্রকার আলোচনা ছাড়াই কয়েক মিনিটের ব্যবধানে সংসদে আনা হয়েছিল সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী উক্ত সংশোধনীর ফলে জাতির ঘাড়ে চেপে বসে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা ‘বাকশালের' জগদ্দল পাথর। এরই ধারাবাহিকতায় ওই বছর ১৬ জুন আওয়ামী লীগ থেকে রূপান্তরিত বিতর্কিত বাকশাল সরকার প্রণয়ন করে ‘দ্য নিউজ পেপার এমেন্ডমেনট অ্যাক্ট'। আসলে সংবাদপত্রের ব্যবস্থাপনা নয়, এমনকি কেবল নিয়ন্ত্রণও নয়, ইচ্ছেমতো পত্রিকা নিধনের লক্ষ্যেই এই কলঙ্কজনক আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে শাসক গোষ্ঠী খবর ‘সেন্সর' করতো। লিখিত-অলিখিত অনেক বিধি-নিষেধ ছিলো। সংবাদপত্রে অনেক কিছুই লেখা যেতো না। ‘এটা লিখো না, ওটা লিখো না, শুধু ব্যক্তি মুজিবের গুণকীর্তন করো'- এই রকমই ছিলো সেই হীন স্বার্থমূলক আইনের মূলকথা।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ওই ঘোরকৃষ্ণ অধ্যায়ে সরকারের স্বেচ্ছাচারের শিকার হয়ে যায় ৮ হাজার সংবাদপত্রসেবী পেশাচ্যুত হয়েছিল। বেকার অবস্থায় দীর্ঘদিনের সপরিবারে অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করতে হয়েছে বহু সাংবাদিককে। এমনকি তাদের কেউ কেউ এ অবস্থার মধ্য দিয়েই দুনিয়া থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন। ‘কালো' জুনের পরিণামে সারাদেশে চার শতাধিক পত্রিকার মধ্যে মাত্র সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা চারটি বের হতো। এগুলো হলো- দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ টাইমস ও বাংলাদেশ অবজারভার। যে ইত্তেফাকের জন্মই হয়েছিল আওযামী লীগ ও শেখ মুজিবকে সমর্থনের জন্য সেই ইত্তেফাকের দীর্ঘ দু'যুগের ইতিহাস মুছে ফেলে বাকশালী সরকারের নির্দেশে প্রথম পৃষ্ঠায় লিখতে হয়েছিল ‘১ম বর্ষ ১ম সংখ্যা'। অবশ্য ১৫ আগস্টের পর ইত্তেফাক পূর্বের সিরিয়ালে ফিরে আসে আটষট্টি দিনের এপিসোডের পর এবং দৈনিক বাংলা তার পূর্ব সিরিয়ালে ফিরে যায় ১৯৭৫ সালের ৬ নবেম্বর।
শেখ মুজিব-কন্যা শেখ হাসিনার সরকারও ১৯৯৯ সালে টাইমস-বাংলা ট্রাস্টের চারটি পত্রিকা বন্ধ করে দিয়ে প্রায় ৮শ' সাংবাদিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পথে বসায়। ফেনীর জয়নাল হাজারীদের মতো ‘পাক পবিত্র' নেতারা অনেক সাংবাদিককে নির্যাতন করেছে। দ্বিতীয় আওয়ামী সরকারের আমলে সংঘটিত সাংবাদিক হত্যাকান্ডের সঙ্গে দলীয় নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার বিষয়টি প্রমাণিতও হয়েছিল। কিন্তু কোনটারই কোন বিচার হয়নি। তৃতীয়বারের মতো আওয়ামী লীগ সমমনাদের সমর্থন ও একটি বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। তারা ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ'-এর স্বপ্ন দেখালেও গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে তারা বরদাশত করতে পারছে না। বন্ধকৃত পত্রিকা চালু ও বেকার সাংবাদিকদের কাজ না দিয়ে বরং নতুন করে পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল বন্ধ ও সাংবাদিক বেকার করছে। ‘তথ্য অধিকার আইন' প্রণয়নের উদ্দেশ্য কী তা এখন আর বুঝতে বাকি নেই। এ সরকারের শীর্ষ ব্যক্তি থেকে শুরু করে এমপি, এমনকি একজন চুঁনোপুটি নেতার হাত থেকেও সাংবাদিকরা রেহাই পাচ্ছে না। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের অনেক সাংবাদিককে রাজনৈতিক বিবেচনায় চাকরিচ্যুত বা শাস্তিমূলক বদলী করা হয়েছে। দৈনিক আমার দেশ বন্ধের ষড়যন্ত্র কীভাবে চলছে তা সচেতন নাগরিক মাত্রই জানেন।
সংবাদপত্রের কালো দিবসের প্রাক্কালে গতকাল মঙ্গলবার বিএনপি চেয়ারপার্সন, বিরোধী দলীয় নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও জনগণের তথ্য জানার অধিকার রক্ষায় সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানিয়ে এক বাণী দিয়েছেন।
এদিকে গতকাল মঙ্গলবার এক আলোচনা সভায় বাংলাদেশ ন্যাপ নেতৃবৃন্দ বলেন, বর্তমান মহাজোট সরকার '৭৫-এর মতো সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করে বাকশাল প্রতিষ্ঠার চক্রান্ত করছে। তারা একের পর এক গণমাধ্যমের গলা টিপে হত্যা করে। '৭৫-এর ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করছে। সভায় বক্তব্য রাখেন পার্টির চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি, মহাসচিব এম গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম মাস্টার প্রমুখ।
আজকের কর্মসূচি
আওয়ামী লীগ সরকারের ১৯৭৫ থেকে অব্যাহতভাবে গণমাধ্যম দলনের বিরুদ্ধে সাংবাদিক ছাড়াও দল-মত নির্বিশেষে সকল পেশাজীবী নাগরিকরা আজ সোচ্চার হয়ে উঠেছে। এবারের কালো দিবসেও বিভিন্ন সংগঠন ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কর্মসূচি পালন করছে।
বিএফইউজে ও ডিইউজে যৌথ উদ্যোগে সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে সাংবাদিক ও পেশাজীবী নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখবেন। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) পক্ষ থেকে সকল অঙ্গ ইউনিয়নে কালো দিবস পালনের আহবান জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি : বিকেল ৩টায় কাজী বশির উদ্দিন মিলনায়তনে (ঢাকা মহানগর নাট্যমঞ্চ) এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এতে বিএনপির জাতীয় নেতৃবৃন্দসহ দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবীগণ আলোচনা করবেন। আলোচনা সভায় বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সকল পর্যায়ের নেতৃবৃন্দকে যথাসময়ে উপস্থিত হওয়ার জন্য যুগ্ম মহাসচিব মো. রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এনডিপি : বিকেল ৩টায় দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আলোচনা সভা হবে। এতে দলের চেয়ারম্যান খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজা উপস্থিত থাকবেন।
আগ্রাসন প্রতিরোধ জাতীয় কমিটি : বিকেল ৪টায় পুরানা পল্টনস্থ মদীনা মিলনায়তনে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এতে সভাপতিত্ব করবেন কমিটির আহবায়ক, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের নির্বাহী সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন খান।
বাংলাদেশ লেবার পার্টি : সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় প্রেসক্লাব ভিআইপি লাউঞ্জে ‘সংবাদপত্রের কালো দিবস : আজকের বাংলাদেশ' শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করা হয়েছে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য এমকে আনোয়ার এমপি।
কালো দিবসের আলোচনায় বক্তারা
পত্রিকা সম্পাদককে
বিবস্ত্র করে পেটানোর জবাব
একদিন দিতে হবে
স্টাফ রিপোর্টার : বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য সাংবাদিকরা রক্ত দিয়েছে। ন্যায়বিচার পাবার আশায় লড়াই সংগ্রাম করেছে মানুষ। কিন্তু সেই বিচার বিভাগ যদি স্বাধীনভাবে বিচার করতে না পারে তাহলে দেশের গণতন্ত্র কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। মানুষ তাদের শেষ আশ্রয়স্থল হারালে তার পরিণতি শুভ হয় না। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) ঢাকা মহানগরীর উদ্যোগে সংবাদপত্রের কালো দিবস ও দৈনিক আমার দেশের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা এ কথা বলেন। জাসাসের ঢাকা মহানগরীর সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ ফয়েজের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান আলোচক ছিলেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি ও বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা শওকত মাহমুদ। আরও বক্তব্য রাখেন সাবেক মন্ত্রী বিএনপির স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, নজরুল গবেষক কবি আব্দুল হাই শিকদার, জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক জোটের মহাসচিব রফিকুল ইসলাম, জাসাসের কেন্দ্রীয় সভাপতি এম এ মালেক, সাধারণ সম্পাদক বাবুল আহমেদ, সাংগঠনিক সম্পাদক মোশাররফ আহমেদ ঠাকুর, প্রকাশনা সম্পাদক মতিউর রহমান সূর্য, আমার দেশ পত্রিকার রিপোর্টার আহমেদ করিম প্রমুখ।
শওকত মাহমুদ বলেন, একজন পত্রিকা সম্পাদককে বিবস্ত্র করে পেটানো হয়েছে এর জবাব একদিন প্রধানমন্ত্রী, তথ্যমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দিতে হবে। আগামী ২০ জুন সারাদেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য বিএনপির ডাকা বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে সরকার পতন আন্দোলনের সূচনা হবে। ঘরে ঘরে চাকরি দেয়ার কথা বলে হাজার হাজার মানুষকে বেকার করার মাশুল একদিন সরকারকে দিতে হবে। তিনি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য মানুষ লড়াই সংগ্রাম করেছে। সাংবাদিকরা রক্ত ঝরিয়েছে। কিন্তু সেই আদালত যদি সাংবাদিকদের বেকার করার পক্ষে রায় দেয়, গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করে, তাহলে ন্যায়বিচার হয় না। আমরা আদালতের কাছে ন্যায়বিচার আশা করি।
রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, যে আওয়ামী লীগ ১৯৭২ সালে শুধুমাত্র ৪টি সংবাদপত্র নিজেদের আয়ত্তে রেখে বাকি সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দিয়েছিল। সাংবাদিকদের পথে বসিয়েছিল, তাদের পেটে লাথি মেরেছিল, সেই সাংবাদিকরা যখন আওয়ামী লীগের পক্ষে গুণগান করেন, তখন আমার লজ্জা লাগে, কষ্ট লাগে। সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করে শেখ মুজিবুর রহমান টিকতে পারেনি, শেখ হাসিনাও টিকতে পারবে না।
কবি আব্দুল হাই শিকদার বলেন, আদালতের ওপরে আর একটি আদালত আছে। এজন্য দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি বাদ দিয়ে বিবেক ও মগজ দিয়ে বিচার করুন। এ সরকারই শেষ সরকার নয়। যারা মাহমুদুর রহমানের ওপর নির্যাতন করে ভাবছেন পার পাবেন তারা ভুল করছেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



