সে একটা সময় ছিল। গুরুরা লিখতেন,আমরা পড়তাম,সিরিয়াসলিই লিখতেন,হালকাভাবে পড়ার উপায়ও ছিলনা। এখনকার মত মেশিনগানের এলোমেলো গুলিবর্ষণ নয়,বেশ বড়সড় কামানের গোলা,কাঁপানো লেখা যাকে বলে,উপেক্ষা করার উপায় ছিল না। তারপর যখন ধীরে-সুস্থে ৫০ বা ১০০ টা গোলা তাদের ঝোলা থেকে বের হয়ে যেত,বেশ আড়ম্বর করে ১টা লেখা দিয়ে জানান দিতেন যে হয়ে গেল কিছু একটা। আলী-ঢালীরা সেই যুগেও ছিল কিন্তু টপ ব্লগারস লিস্ট থাকার পরেও সেখানে থাকার জন্য কারো খুব ব্যাকুলতা দেখিনি।তা সেই রাম নেই সেই অযোদ্ধাও নেই,আজকাল দেখি বোঝার আগেই সবার ১০০-২০০ পার হয়ে যায়,টোয়েন্টি-টোয়েন্টির যুগ কিনা,ঝিমিয়ে খেলার সময় কই?
তো,আমি ঝিমিয়ে যাচ্ছিলাম,যাচ্ছি এখনো। আগে লেখা দিতাম না গুরুদের ভয়ে,লেখা পড়তেই তো রাত কাবার,আর ওখানে লেখা দিলে লজ্জা পাওয়াই সার হত। তা মাঝে মাঝে সাহস করে দিয়ে যাই,আস্তে আস্তে গুরুরা সরে পড়লেন,মাঝে-সাঝে তাই আমাদের ব্লগেও এর-ওর পা পড়ে,আমি বেশ ঝুঁটিখাড়া মোরগের মত ঘাড় উঁচিয়ে চলি। এই করে করে দেখি,কোথা দিয়ে যেন ১ বছর ৫ মাসে আমারো ৪৯ হয়েই গেল,ভাবলাম দেখি একটু পুরানো কেতা ধরে,বেহায়ার মত জানান দিই যে ধীরতম ৫০ এর রেকর্ডটা আমিই করে ফেলেছি। নিজে যা লিখেছি,পড়েছি তার অনেকগুণ বেশি,মন্তব্য করেছি ৫৪৪২ খানা,প্রতি মন্তব্যে গড়ে ১৫টা শব্দ থাকলেও বলা যায় ৮১৬৩০ টা শব্দ লিখে ফেলেছি,বলা যায়,হুমায়ুন আহমেদ সাইজের ২টা বই হয়ে যেত মন্তব্যগুলো একসাথে করলে।
তো,এইবেলা নিজের ঢোল পেটানোর মত তেমন কিছু খুঁজে পেলাম না,তাই মনে হল,যাদের সাথে নিয়ত ক্রিয়া,যাদের বাড়ির দরজায় নিয়মিত ষাঁড়ের মত গুঁতিয়ে হাম্বা রবে মন্তব্য ছেড়ে বিরক্ত করে এসেছি,সেই ব্লগারদের ঢোলই পেটাই,জানাই তাঁদের প্রতি আমার টান,শ্রদ্ধা। এদের অনেকেই আর এই ব্লগে লেখেন না,যারা লেখেন তারাও অনেকে নিয়মিত নন,অনেকেই এই অধমের ব্লগে কোনদিন পদধূলি দেননি,কিন্তু ব্লগারকুলের একলব্য শিষ্য হতে আমার কোন আপত্তি নেই,কখনো ছিলও না।
ব্লগার হিমু ভাইকে দিয়েই শুরু করি,যার লেখা পড়ার জন্য এই ব্লগে আমার আগমন। লেখকদের তুলনা করা ঠিক নয় জেনেও বলি,আমার কাছে তখনো,এখনো তিনি সেরা। নিভৃতচারী। অসাধারণ লিখতেন,কিন্তু কখনো কোথাও লেখা দিতেন না। মন্তব্য করলে জবাবও পাওয়া যেত খুব কম। সব বিষয়ে সবরকম লেখা,রম্য থেকে আলোচনা,ছড়া থেকে ভারি লেখা,কোথায় নেই? সাথে ছিলেন নজমুল আলবাব,হাসান মোরশেদ,সাদিক মোহাম্মদ আলম,মুখফোঁড়,সুমন চৌধুরীর মত লেখকরা।অনুবাদ করতেন তিমুর নামের আড়ালে কেউ,নিয়মিত পাঠক ছিলাম তাঁর। আরাফাতুল ইসলাম ছিলেন খবরের বোঝা নিয়ে,ঢুঁ মারতাম তাঁর
লেখাতেও। বলতে হবে আস্তমেয়ের কথা,আস্তে আস্তে বিবর্তিত হয়েছে যার লেখা,নতুন নিক সন্ধ্যাবাতিতেও ঠিক সেরকম চমৎকার লিখত,এখন ব্লগ ছেড়ে পরবাসী। ত্রিভুজ মনে হয় আলোচনার দিক দিয়ে এদের সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছেন,রীতিমত গবেষণা হত তাঁকে নিয়ে,এখনো হয়,তবে তাঁর শত্রু-মিত্র ২ পক্ষই আছে এবং ছিল এখনো,উপস্থিতি কমে গেছে তারও। রাগ ইমন তো লেখার ফুলঝুড়ি ছুটাতেন,এখন কেনযে এত কম লিখেন! মাহবুব মোর্শেদ এখনো আছেন,আগের মতই লেখার টানে লিখে যাচ্ছেন,তবে আগে তাঁর ব্লগ থাকত বেশ নীরব,সেটা নিয়ে তাঁর বিশেষ মাথাব্যথা দেখিনি,আজকাল তাতে আনাগোনা বেড়েছে অনেকের,তাতেও তাঁর মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয়নি। দারুণ সব যুক্তি-তর্ক নিয়ে একদমই অন্যরকম জামাল ভাস্করও এখনো চালিয়ে যাচ্ছেন,ছেড়ে যাননি। এদের লেখকই বলবো,কারণ লেখাটা তাঁদের ধ্যানজ্ঞান ছিল বলেই মনে হয়েছে,শৌখিন নয়।
সময় বদলেছে,আস্তে আস্তে নতুন আরো অনেকে এসেছেন,কাকে ছেড়ে কার কথা বলবো? আরিফ জেবতিক পরিচিত লেখক,তাঁর লেখা নিয়ে বলার কিছু নেই নতুন করে,আবেগকে ধরে রাখতে পারেন অক্ষরের মাঝে,কিন্তু তাঁর রম্য পড়াটাও দারুণ এক অভিজ্ঞতা। অনেক আগেই এসেছেন জ্বিনের বাদশা,দারুণ বৈচিত্র্য লেখার বিষয়ে,গেসবল বা ভ্রমণ বা হাজারো বিষয় নিয়ে লেখেন,মাঝে ধারাবাহিক দু'টো গল্প দিয়েছিলেন,আরো আশা করে আছি,যদিও বেশ কিছুদিন তিনিও লাপাত্তা।মাহবুব সুমন পুরানো ব্লগার,আগে সক্রিয় ছিলেন খুব,জীবনের দৌড়ে এগোতে গিয়ে ইদানিং ক্যানবেরার ডায়েরি ছাড়া আর কিছু দিচ্ছেন না। রাগিব ভাইয়ের কথা বলতেই হবে,গণক মিস্ত্রি হয়েও লেখার হাতে দক্ষতার কমতি নেই। মিরাজ ভাইকে মিস করছি আজকাল,ইতিহাস
খুঁড়ে বের করে আনা অসংখ্য দলিল আর লেখাগুলো যাঁর ব্লগকে একটা ডকুমেন্টারি করে দিয়েছে,ব্যস্ততার কারণে অনুপস্থিত তিনিও আজকাল।দারুণ ঠোকাঠুকি হয়ে গিয়েছে প্রায়ই আইজুদ্দিনের সাথে মতপার্থক্যগত কারণে,কিন্তু তার লাল বালিকার গল্প পড়ে মনে হয়েছে,মানুষ চেনা বড় দায়। অমি পিয়ালের মুক্তিযুদ্ধের দলিলগুলো দেখার জন্য তার ব্লগে যেতেই হয়,যদিও তার চেহারাও আজকাল তেমন দেখা যায়না ব্লগে,হয়তো রাজকন্যা নিয়েই ব্যস্ত।
তবে এ সময়ে সবাইকে সবচেয়ে নাড়া দিয়েছেনমনে হয় নির্বাসিত,তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিরিজ দিয়ে(পরে নাম বদলে নির্বাসিতের আপনজন)। তাঁর লেখাগুলো পড়ে একবারো চোখের কোণ ভিজে যায়নি বা স্তব্ধ হয়ে থাকেনি,এমন কাউকে মনে হয় পাওয়া যাবেনা। এই ব্লগ থেকে নির্বাসন নিয়েছেন মনে হয়,আজকাল আর দেখি না। যেমন নির্বাসনে আছে সিহাব চৌধুরী আর আরিফুল হোসেন তুহিন,খুব কম লেখার মাঝেও যার লেখায় মানের সাথে কোন আপোষ ছিল না। মেহরাব শাহরিয়ারও আজকাল চেহারা দেখায় না তেমন। পুতুল কে দেখি খুব মাঝে মাঝে,রক্তজবা সিরিজটা দিয়ে প্রায় হারিয়েই গেছেন। দীর্ঘ বিরতির পর মানবীকে আজকাল অবশ্য দেখা যায় মাঝে মাঝেই,যদিও কম। কালপুরুষ তাঁর কবিতা নিয়ে সক্রিয় আছেন,আছেন শেখ জলিলও,আগের চেয়ে অনিয়মিত যদিও,কিন্তু দেবদারু মনে হয় পড়াশোনাজনিত ব্যস্ততায় ডুব মেরে গেছেন। দীর্ঘ বিরতির পরে সেদিন হঠাৎই দেখলাম উদাসী স্বপ্নকে,ভাল লাগলো। ভুলে পেয়ে যাওয়া নিক মৃমৃ নিয়ে বেশ লিখছিলেন মুক্ত মানব,ব্যস্ততার অজুহাতে তিনিও নেই,সবাই এভাবে পালায় কেন?
তবে লেখা কিন্তু ব্লগে আসছে,নতুন মানুষের সাথে নতুন আঙ্গিকে,একজনের ফাঁকা জায়গা ভরাট করে দিচ্ছেন আরেকজন। কবিতা লিখছেন নিয়মিত প্রণব আচার্য,সুলতানা শিরিন সাজি লিখছেন,লিখছেন মুজিব মেহেদী। মূলধারার লেখক আহমেদ মোস্তফা কামালের লেখা ব্লগে দেখে আনন্দিত হয়েছি,আবার মৃদুল মাহবুব,মুয়ীয মাহফুয,মাঠশালা,মাজুল হাসান,আজহার ফরহাদ সহ লিটল ম্যাগের অনেকের লেখার নিয়মিত পাঠক হয়ে গেছি। নানা ডাইমেনশনের লেখা
পড়ছি,আবদুর রাজ্জাক শিপন যেমন শুধু নিজে লিখেই না,বরং কবিতার ফেরিওয়ালা হয়ে কবিতা বিলিয়ে প্রতিদিন তাঁর ব্লগে ঢুঁ দিতে বাধ্য করছেন। টাটকা কবিতা লিখেই ব্লগে ছেড়ে দেন মুকুল ভাই,মানুষের কালো চশমা সিরিজ শেষ হয়ে যাওয়াতে এই লেখাতেও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়ে রাখলাম। এখানে পুরো "বান্দর গ্রুপ"কেই স্মরণ করতে হচ্ছে,ব্লগ মাতিয়ে রাখার কাজটা তারা ভালই করে,কখনো ভারি লেখার মাঝে হাঁফ ছাড়ারও তো দরকার হয়। চিটি আর উত্তরাধিকারের কবিতা নিয়ে বিশাল বিশাল কবিতাগুলো পড়েও আজকাল সময় যাচ্ছে কিছু,শফিউল আলম ইমন তো পরীক্ষা শেষেই লেখার ফুলঝুড়ি ছুটানোর ঘোষণা দিয়ে এখনো ঝিম মেরে আছেন। একরামুল হক শামীম কিন্তু প্রথম দিকে দারুণ কিছু অনুবাদ দিতেন,মাঝে রুচিবদল করে আবার আজকাল একটু ভারি লেখাতেই ঝুঁকেছেন মনে হচ্ছে। আকাশচুরি তাঁর অসাধারণ লেখা দিচ্ছেন না অনেকদিন,অপেক্ষায় আছি। অনেকদিন দেখা নেই সামী মিয়াদাদ আর মোসতাকীম রাহীর,গেলেন কোথায় তাঁরা? পথিক ভাই মাঝে মাঝে আসেন,মাঝে মাঝে নেই,যেমন অনেকদিন ধরে নেই মুনিয়া আর অজানা অচেনা আর ফারজানা মাহবুবা। জিহাদ ছেলেটার লেখা মিস করি,দারুণ শুরু করে হঠাৎ হাওয়া। কিংকর্তব্যবিমূঢ় লেখে এখন অন্য কোথাও,ভক্ত পাঠক ছিলাম বলা যায়। অনেকদিন দেখা নেই প্রিয় ব্লগার বিহংগের,ব্যস্ত হয়তো তিনিও। লাল দরজা অবশ্য মাঝে মাঝে লেখা দেন,তেমন নিয়মিত না। বিবর্তনবাদী আর রন্টি চৌধুরীর ছোট ছোট লেখাগুলো পড়ি,যেমন পড়ি দুরন্তর বিজ্ঞান নিয়ে বিশাল লেখাগুলোও। শেষ ২-১টা পোস্ট আর ভিজিটর লিস্টে দেখতে পাচ্ছি আন্দালীব,স্বাক্ষর শতাব্দ আর নিয়াজ মোর্শেদ চৌধুরীকে,নতুন আগমন দেখে মহা উৎসাহে আজকাল তাঁদের ব্লগেও ঢুঁ দিয়ে আসি লেখা পড়ার লোভে।
নাহ,এ বেলা থামা দরকার,এভাবে হবে না। কতজনের সাথে কত তর্ক,কত কথা,কত আদান-প্রদান,এই ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে আর কতটুকুই রাখতে পারব? খুব আলাদা একটা জগৎ,দূরের মানুষগুলো চলে এসেছে অনেক কাছে,একটা দিন না এলেই মনে হয় বাড়িঘর ছেড়ে দূরে আছি। সম্পর্ক বদলে যাচ্ছে,ভার্চুয়াল সম্পর্ক এখন আর ঠিক ভার্চুয়াল নয়,বরং দ্বিতীয় সত্ত্বা,দ্বিতীয় জীবন হয়ে যাচ্ছে,আর এক জীবনের কথা কি এত অল্প কথায় বলা যায়? অনেকে হয়তো বাদ রয়ে গেলেন চলার পথে যাদের সাথে দেখা হয়েছে,আরো যেসব কথা বাকি রইলো সেগুলো নাহয় ১০০তম পোস্টের জন্য তুলে রাখি,ধীরতম হলেও,আমারো একটা
অসম্ভব শখ তো আছেই ১০০ করে আরো একবার ব্লগারদের ময়দানে ব্যাটখানা উঁচু করে ধরবার

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

