গানটা শুনেছিলাম অনেক আগে,এককালে যখন বিটিভির নিরুপায় একনিষ্ঠ দর্শক ছিলাম তখন কোন এক ছায়াছন্দে। গাইছিলেন মনে হয় ইলিয়াস কান্ঞ্চন,তিনি তখন বিখ্যাত মানুষ,বেদের মেয়ে জোছনা ছবিতে চানাচুরওয়ালার পোষাকে নেচে-গেয়ে বাঁশি বাজিয়ে ফাটিয়ে দিয়েছেন। তো এহেন জাঁদরেল নায়ক তখন জেলের ভিতরে(সিনেমায় অবশ্যই) গারদ ধরে কেঁদে কেঁদে গাইছেন এই করুণ গান,"আমি বন্দী কারাগারে,আছি মাগো বিপদে,বাইরের আলো চোখে পড়ে না"--শুনে চোখে পানি এসে যায়।মনে হয় আহা,এমন রঙচঙে লোকটাকে কোন পাষাণ দুর্বৃত্ত এই অন্ধকার জেলখানায় ভরে দিল,আবেগে আমার মত নাদান দর্শকদের মাঝে কেমন একটা বিদ্রোহ বিদ্রোহ ভাব।তো সেই গান আমি সেদিন গাইছি নিজের বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে,পাশের বাসার ছাদে দাঁড়ানো ছোকরাগুলোর তোয়াক্কা না করে,এমনকি পাড়ার কুকুরগুলো খেপে যেতে পারে এই ভয়টাও করছি না,একটা কারণ অবশ্য আমি তিন তলায় আছি,কুকুরগুলো আপাতত চাইলেও আমাকে ধরতে পারবে না।
কিছুক্ষণ সঙ্গীতচর্চা মন্দ চললো না,চারপাশ অন্ধকার,বারান্দা থেকে দেখতে পাচ্ছি শুধু আমাদের এলাকা না আশপাশে যতদূর চক্ষু যায় সবই অন্ধকার,শুধু বিশাল বিশাল বাড়িগুলো ভূতুড়ে অবয়ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে,রাস্তার গাড়িগুলোর হর্ন না থাকলে শ্রীকান্তের শ্মশানস্মৃতিও মনে পড়ে যেতে পারতো। বাদ সাধলো মা,বারান্দায় উঁকি দিয়ে জানালো এই মুহূর্তে লোডশেডিং আর রান্নাঘরের গরমে তার মাথার তাপমাত্রা গ্যাসের চুলার সাথে পাল্লা দিচ্ছে,আমার এই নাকিকান্না আর খানিকক্ষণ চালালে আমার চামড়া কতখানি অগ্নিসহ সেটা খুন্তিটা দিয়ে পরীক্ষা করা হবে।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে গান থামাই,এই পোড়ার দেশের লোকজন প্রতিভার কদর করলো না,না ইলিয়াস কান্ঞ্চনের,না আমার। কি একখানা গান ছিল রে,বাঙ্গালির জন্য একেবারে চিরন্তন গান। কি যে এক জাদুর কারাগারে আমরা বন্দী হয়ে গেছি,আর সেই কারাগারের শিকের সংখ্যা দিন দিন ১৪টা ছাড়িয়ে হাজার হাজার হয়ে যাচ্ছে,লেয়ার আফটার লেয়ার,দুঃস্বপ্ন হল সত্যি,শিকের পর শিক। আমরা লোডশেডিংয়ের কারাগারে বন্দী, আমরা আমলাতন্ত্রের ফাইলফিতার কারাগারে বন্দী,আমরা রক্তচোষা ব্যবসায়ীদের বানানো কৃত্রিম দ্রব্যমূল্য সংকটে বন্দী। শিকলগুলো একটা একটা করে বেড়ে বেঁধে নিচ্ছে আমাদের,আর আমরা "এ শিকল পরা ছল মোদের এ শিকল পরা ছল" ভেবে ধেই ধেই নেচে যাচ্ছি।
ঠিক যে মুহূর্তে গান থামিয়ে গালে হাত দিয়্বে জগৎসংসার নিয়ে দার্শনিক চিন্তায় মগ্ন আছি(রাত ১২টায় লোডশেডিং হলে এর বেশি কিছু করারও থাকেনা,বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নাম করে সরকার বাহাদুর এর আগেই শহরের লোকজনকে গুহামানব স্টাইলে ঘরে ফেরত পাঠিয়েছেন),সেই সময়টায় অবশ্য ঠিক নৃত্যের আনন্দে আছি তা না,বরং দার্শনিক চিন্তার ফাঁকে ফাঁকে ব্লগে এবং জীবনের নানা বাঁকে শেখা জঘন্য গালিগালাজগুলো কেন যেন বারবারই উঁকি দিয়ে যাচ্ছে। গানটা বন্ধ করাই ভুল হয়েছে,নইলে কি এতসব চিন্তা মাথায় আসতো? সঙ্গীতের জগৎ,ঘোরের জগৎ,আহা! আমরা কোন ঘোরের জগতে আছি সেটা অবশ্য ভাবার বিষয়,ঠিক কতটা ঘোরের মাঝে থাকলে গায়ের উপর দিয়ে ১০ টনী রোড রোলার চলে গেলেও কেউ কিছু টের পায় না সেটা একটা গবেষণার বিষয়।
আচ্ছা,এইবেলা বরং কারাগার বা রোডরোলারগুলোর একটা শ্রেণীবিভাগ, নিদেনপক্ষে একটা তালিকা করার চেষ্টা করা যাক,যদিও সব বাঙ্গালিরই সেগুলো জানা আছে বোধ করি,একবার স্মরণ করিয়ে দেয়া আরকি। লোডশেডিং নিয়ে বলার কিছু নেই,আজকাল আলো দেখলেই কেমন জানি অস্বস্তি লাগে,অন্ধকারে রাস্তায় চলতে পারি ভাল।সকাল ৯টা থেকে তামাশা শুরু,এক ঘণ্টা পরে পরে গমন এবং আগমন।চলছে,চলছে,রাত ১২টায় একদম ডেডস্টপ,ভোর ৫টার আগে আর আসবে না। প্রথম ২ দিন তড়পানি চললো,খেয়ে ফেলবো খুন করে ফেলবো অমুকের বাচ্চা তমুকের ছানা,এরপর রাত ১২টায় সবদিক অন্ধকার করে বিদ্যুৎ চলে গেলে বেশ উদাস ভঙ্গিতে হাতপাখা নিয়ে বারান্দায় বসি,হাওয়া খাই,মশা মারি চটাস চটাস,শেষে ঘুমে চোখ ঢুলে পড়লে প্রেশার কুকারের মত ভাঁপে সেদ্ধ হতে হতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ি,সকালে অফিস যেতে দেরি,বাসে ঘোড়ার মত দাঁড়িয়ে আধা ঘুম,বসের ঝাড়ি,ঢুলু ঢুলু চোখে এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে বের করে দেয়া,আবার ঝিমাতে ঝিমাতে বাড়ি ফিরে আবারো অন্ধকার বারান্দায় বসে মশা মারা,আহা জীবন!
বাজারে যাইনা আমি,ঐটা বাপের ঘাড়ে,তবে ভুল করে মাঝে মাঝে দাম জিজ্ঞেস করে ফেলি আর নিশ্চিতভাবেই সেদিনের খাবার রুচি নষ্ট হয়ে যায়। সেদিন আয়েশ করে মুড়ি চিবাতে চিবাতে বলে বসলাম মুড়ির কেজি কত? মা জানালো,৪৮ টাকা,গলায় আটকে গেল,পানি খেয়ে শান্তি। চা এত পাতলা কেন? মায়ের সাফ জবাব,কিনে আন,দাম শুনে তারপর ঘন লিকার খাও। জবাব নেই,মহিলা কি কথাই না জানে রে! নিরামিষটা আরেকটু ভাল হতে পারত,এবার একেবারে বাউন্সার,তরকারির দাম জানো? একদম মুখে তালা মনে তালা,বলার আর কি-ই বা আছে,যে সংসার চালায় তার উপর কথা চলে না,তার উপর আজকাল সারাক্ষণই যদি তার মেজাজ ফাস্ট বোলারের মত হয়ে থাকে।
এতো গেল ঘরের কথা,বাইরে বের হলে নিজের মেজাজই কেমন যেন চেঙ্গিস খানের মত খুনে হয়ে যায়,ইচ্ছা করে মেরেকেটে একদম কবরের শান্তি এনে ফেলি,না থাকবে মাথা না থাকবে মাথাব্যথা। বাস ভাড়া দিতাম আগে ১০ টাকা,কি যেন এক দাম বাড়ল আর সাথে সাথে চামবাজ বাস কোম্পানি প্রতি স্টপেজে ভাড়া বাড়িয়ে দিল ৪ টাকা করে,কারো কিছু বলার নেই,২-১ জন হালকা হাতাহাতি করলেও নিরীহ শান্তিপ্রিয় বাঙ্গালির চাপে সবাই সোনামুখ করে সিটিং নামের সিটি সার্ভিসে স্ট্যান্ডিং,এমনকি দরজা ধরে সুইঙ্গিং সার্কাস দেখিয়ে যাতায়াত করে চলেছি। সরকারের নানা বাহিনীর অভিযান চলছে,তাকে কাচকলা দেখিয়ে সবকিছুর দাম
বৃদ্ধি চলছে। দুর্নীতি নিয়ে নানা নীতিবাক্য শুনছি কিন্তু দুর্জনেরা বলে দুর্নীতি বেশ আগের চেয়েও ভাল তালে চলছে। ২-১টা উদাহরণ দাবী করা যায় এখানে,সেদিন এক বন্ধু জানালো সরকারী কৃষ্ঞ বাহিনীর জনৈক সদস্য তার প্রিয়তমা সুন্দরীতমাকে সাথে নিয়ে এসে মাত্র ৯০ লক্ষ টাকার একখানা ফ্ল্যাট তাদের কোম্পনিতে বুকিং দিয়ে গেছেন,আরেকজন জানালেন দেশরক্ষা বাহিনীতে নাকি বেশ একটা কোটি টাকার ঘরের অর্থায়ন তারা করেছেন দেশসেবার খাতিরে,সদ্যই। চুক্তি হচ্ছে নানামুখী,দেশে-বিদেশে। আগে করতেন নেতারা,তারা আপাতত চুরি-চামারি করে জনগণের অর্থে বিদেশ ভ্রমণে আছেন,পাজেরো গুলো এখন নানান তারকাধারী উর্দিধারীদের বাড়িতেই পৌঁছে দেয়া হয়,যতদূর দুর্মুখ জনতার মুখে শোনা যায় আরকি।
তো,এভাবেই চলছে আরকি,এভাবেই চলবে,যে যখন যাবে,কামাবে। নিজে কাজ করেছি সরকারি প্রকল্পে,টাকার গন্ধে কিভাবে দেশের স্বার্থ বিলিয়ে দেয়া হয় কিছু দেখা হয়ে গেছে এর মাঝেই,আজকাল অবাক হই না,আমরা যেমন,আমরা তো তেমনই পাবো। আমরা সোনিয়া গান্ধীর ভারতপ্রেম দেখি রাহুল আর প্রিয়াংকার সুদর্শন চেহারা দেখে আহ্লাদে গদগদ হই,ভুট্টোর কন্যা বেনজিরের শোকে আমাদের মানবাধিকার কর্মীদের চোখে অশ্রুধারা নামে, হিলারির মঙ্গল কামনায় আমাদের ঘুম হয়না ওবামার চিন্তায় আমাদের বদহজম হয় ম্যাককেইনের মেয়ে বাংলাদেশি কিনা আর কানাডাতে কে কবে গভর্নর পুরষ্কার পেল তা নিয়ে
আমাদের আনন্দের সীমা থাকে না,কিন্তু নিজের দেশের লাউয়াছড়া নিয়ে আমাদের চিন্তা হয়না,সুন্দরবন উজাড় করে বান্দরবনের পাহাড় কেটে কি হচ্ছে আমাদের ভাবনায় আসে না,দেশের জ্বালানি সম্পদ শেষের দিকে সেটা নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই,জিপিএ ৫ এর বন্যায় দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ১২টা বেজে যাচ্ছে তা নিয়ে আমাদের দুদণ্ড ভাবার সময় হয়না,কোন নেত্রীর কানে ব্যথা কোন পুত্রের হাড় বাঁকা তাই নিয়ে আমরা নাচি কিন্তু দেশের তরুণরা কাজের অভাবে হাহাকার করছে দু'মুঠো খেতে না পেয়ে মানুষ কথা বলারও শক্তি হারিয়ে ফেলছে সেটা নিয়ে আমরা ভাবি না,আমরা কোথায় যাচ্ছি তা নিয়ে আমরা কথা বলি না,নিজের খোঁড়া কবরে শুয়ে আমরা বেশ আছি,আপনি বাঁচলে বাপের নাম।
ছোটবেলায় অরাজকতা শব্দটার বেশ একটা সুন্দর বাগধারা ছিল--"মগের মুল্লুক"। নিশ্চিতভাবেই,একি শব্দের বাগধারা হিসেবে কিছুদিন পর মগরা বলবে--"বাঙ্গালের মুল্লুক"।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

