জঙ্গল রাজ্যের ভারপ্রাপ্ত প্রধান মহারাজা নৃসিংহ রায়চৌধুরী যে খুবই চিন্তিত আছেন,তা তার সুরম্য প্রাসাদঘরে অনবরত পায়চারী আর কণ্ঠনিঃসৃত ঘোঁৎ ঘোঁৎ থেকেই বোঝা যাচ্ছে। যদিও নৃসিংহের কণ্ঠ থেকে ঘোঁৎ ঘোঁৎ এর বদলে সিংহনিনাদই বের হবার কথা,যেখানে রাজ্যের মঙ্গল সাধনার্থে প্রায় এক বছর হল তিনি সবুজ সিংহাসনে,যা কিনা সিংহের জন্যই ছিল আর যেটাতে বহুদিন হয়ে গেল কোন সিংহের পদধূলি পড়েনি তাতেই আরোহণ করেছেন,আর পশুকুল তাকে উদ্বাহু স্বাগত জানিয়েও ছিল,কিন্তু ঘোঁৎ ঘোঁৎ থেকেই আমাদের কাছে পরিষ্কার যে আদপেই তিনি সিংহ নন আর সেটা নিয়েই আজ চামড়ার ভেতর তার কেশ ঘেমে জলাকার।
ঘটনা তবে খুলেই বলা যাক,কেন তিনি আদপেই সিংহ না হয়েও আজ কেশরাবৃত নৃসিংহ,পশুকুলের সেটা জানার অধিকার আছে বলেই মালুম হয়। যদিও যে বেচারা নখরজীবী পশু এ কাহিনী লিখবে তাকে মহারাজার নখানলে পুড়তে হতেও পারে,তবে পশুতান্ত্রিক অধিকার বলে কথা। এক্ষণে কিছু অতীতে ফেরা লাগে অবশ্য,যেদিন মহান বরাহনন্দ ভড় তার দীর্ঘকালের নানা জঙ্গল পরিদর্শন শেষে নিজস্ব দাঁত দুখানা এবং তার দাঁতাল সঙ্গীসাথীসমেত নিজ জঙ্গলে দাঁতার্পণ করলেন। সবুজ বনে তখন দীর্ঘকাল হল,তা সময়ের হিসাবে পন্ঞ্চদশ বর্ষ হবেই,দুই মাদী বিল্লির পাল্টাপাল্টি শাসন। দুই বিল্লির খ্যাঁচম্যাচ ফ্যাঁসফোঁসই যথেষ্ট ছিল পশুদের দিবা আর নৈশকালীন নিদ্রার সর্বনাশের জন্য,তার উপর যখন বিল্লিকুমার এবং তার সার্বক্ষণিক হায়েনা সাথীরা পশুরাজ্যের আপৎকালীন ভাণ্ডারকেও নিজস্ব সম্পত্তি বলেই ঠাওর করলো, ঘেসো পশুদের মস্তিষ্কেও চিন্তার উদ্রেক হল যে এইক্ষণে জঙ্গলরাজ্যে কিন্ঞ্চিত পরিবর্তন অত্যাবশ্যকীয়। যদিও সুশীল পশুসমাজ হায়েনাদের কাজকর্মে এতই বিহ্বল,অস্বীকার করা যায়না তার পেছনে জঙ্গল ভাণ্ডার লুটের কিছু ভাগজোখও ছিল,যে নিজ হাতে এই পরিবর্তনের দুরূহ কাজটা না করে বন্দুকখানা আর কারো ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া যায় কিনা সে ধান্দাতেই বিভোর ছিল।
এহেন পরিস্থিতিতে জঙ্গলমন্ঞ্চে আগমন বরাহনন্দের। রাজ্যে তখন অরাজকতা চরমে,দুই বিল্লির দল জিহাদী জোশে একে অপরের উপর নখ-দন্ত-ডাল-পালা নিয়ে ঝাঁপাচ্ছে,সে ফাঁকে জঙ্গলরাজ্যের পুরানো শত্রু গোলামে শকুন তার দলবল নিয়ে সত্যিকার অর্থেই জেগে উঠেছে রক্তমাংসের লোভে,বহুদিন হল রাজ্যের সিংহাসনকে শকুনাসন বানাবার লোভে ঘাসমাংস বিলিয়ে যাচ্ছে তারা নিরীহ নির্বোধ পশুকুলের মাঝে। রাজ্যের অর্থভাণ্ডারেও তারা যে আজকাল বড় ভূমিকা রাখে তা অস্বীকার করা যায়না,সিংহাসনের দাবীদার সিজনাল হিজাবী ঝগড়াটে বিল্লি আর সুন্দরী মাদাম বিল্লিও মাঝে মাঝেই তাদের নেকনজর কামনা করে ধর্ণা দিয়ে থাকেন,এককালে যে তারা হায়েনাস্তানের হামলায় সহযোগী ছিল সেকথা বেমালুম ভুলে গিয়েই,আফটার অল,স্বজাতির মাংসে তাদের কখনোই অরুচি ছিলনা।
যাকগে যাক,কথা হচ্ছিল বরাহনন্দের মন্ঞ্চারোহণ নিয়ে। দীর্ঘকাল তিনি তার ভিনজঙ্গলের,একি সাথে তামাম বনরাজ্যের প্রভু,সেই গর্দভ আর হস্তীশাসিত দেশের মহাগর্দভের অধীনে কাজ করে বিস্তর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। গর্দভচালিত অর্থশাস্ত্রে ব্যাপক জ্ঞান তার রয়েছে বলে জনশ্রুতি, কতিপয় দুর্মুখ পশু অবশ্য বলে গর্দভকুলের সংস্পর্শে থেকে তাদের মতই নিজ জঙ্গলের ভাণ্ডার শূন্য করে দেয়ার রীতিপদ্ধতি আয়ত্ত্ব করাই তার কাজ ছিল,কিন্তু সবাই জানে যে দুর্মুখদের কথায় কান না দিয়ে তাদের আলজিহ্বা সহ ছিঁড়ে নেয়াই বিদগ্ধ ব্যক্তির কাজ। তাছাড়া,তারই অন্তরঙ্গ বন্ধু বিশিষ্ট রক্তচোষা বাদুড় ডক্টর ভ্যাম্পানুস যেখানে কিছুদিন আগেই পশুকুলের গ্রীষ্মকালীন খাদ্যাভাব দূরীকরণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে গর্দভপ্রদত্ত সর্বোচ্চ কদবেল পুরস্কার পেয়েছেন,তখন তার জ্ঞানবুদ্ধি নিয়ে কথা বলা নেহাৎই রাজ্যদ্রোহীতা।
তো,জঙ্গলরাজ্যের অরাজকতা দেখে মহান বরাহনন্দের বরাহপ্রাণও কেঁদে উঠলো। দাঁত ঘষে তিনি রাজ্যের দুঃখ দূরীকরণের শপথ নিয়ে বসলেন,তার শপথবাক্যকে পশুকুলের কাছে সিংহনিনাদ বলেই বোধ হল,বিল্লিদের ফ্যাঁচফ্যাঁচ আর জঙ্গলপিতারূপে যে মেষশাবকখানা ছিল,যে কিনা সামান্যতেই কোরবানীর পশুর মতই শয্যা নিত,তার করুণ ব্যাঁ ব্যাঁ রবে অভ্যস্তকর্ণ পশুকুলের কাছে বরাহের ঘোঁৎ ঘোঁৎ আর সিংহের হুংকারে বিশেষ পার্থক্য থাকার কথাও নয়। সেই বজ্রনির্ঘোষের সাথে শিং বাগিয়ে সুর মেলালেন জঙ্গলরক্ষা বাহিনীর প্রধান গোঁয়ারগোবিন্দ খান বাহাদুর,এখানে অবশ্য বলে রাখা ভাল যে এই সম্মানিত পদখানা কোন এক ব্যাঘ্রসন্তানের পাবার কথা থাকলেও রাজ্যে বাঘের আকালে জাতিগতভাবে গণ্ডার হয়েও গোঁয়ারগোবিন্দ এই পদে আসীন হয়েছেন।
সেই শুভদিনের কথা মনে পড়ায় ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস ছাড়েন বরাহনন্দ, থুক্কু,এখন থেকে তাকে নৃসিংহই বলতে হবে। সিংহাসনে বসবার জন্য গর্দভরাজ্য থেকে অর্ডার দিয়ে একখানা চকচকে কেশরসহ সিংহচর্ম আমদানী করেছিলেন তিনি,দাঁত দু'খানাকে ঘষে চকচকে করে শ্বদন্তের রূপ দেয়ার কাজও করে গেছেন পশুসার্জন। দরকার ছিল না, তারপরেও,সিংহাসনে বরাহ দেখে কোন কোন ত্যাঁদড় পশু আপত্তি করতেও পারে,সেজন্যই এই সিংহবেশ। গোঁয়ারগোবিন্দও তাঁর দেখাদেখি আজকাল একখানা বাঘছাল পড়ে ঘোরাঘুরি করে থাকেন,ছালখানা এনেছেন তিনি প্রতিবেশী বড়ভাই রাজ্য থেকে,একখানা শান্তিমার্কা শালের সাথে বোনাস হিসেবে,যদিও নিজের বিশাল গণ্ডারি শিংখানা কিভাবে লুকানো যায় সেটা নিয়ে আজকাল তিনিও বেশ চিন্তিত থাকেন। পশুসার্জন ডেকে দাঁতখানা ফেলে দেবেন কিনা সে চিন্তাও গোঁয়ারগোবিন্দের মাথায় কয়েকবার এসেছে,বলা যায় না দিনকাল একরকম থাকেনা,কোনদিন হয়তো নিরীহ প্রজারা খেপে গিয়ে এই শিংখানাই তার পশ্চাদ্দেশে প্রবেশ করিয়ে দিতে পারে। বিশেষত,ক'দিন আগেই বড়ভাই রাজ্যের বন্যকুকুরদের দলবদ্ধ আক্রমণে তার জঙ্গলরক্ষী বাহিনীর দুই বাঘ নিহত হবার পরেও গোঁয়ারবাবুর রহস্যজনক বিড়ালসুলভ মিউ মিউ পশুগণ তেমন ভালভাবে নেয়নি বলেই মনে হচ্ছে।
গোঁয়ারটাকে আরেকটু ট্যাকটিক্যাল হতে হবে,ভাবেন নৃসিংহ। এই ট্যাকটিক্যাল কথাবার্তাটা বলতে শিখলো না বলেই না পশুখাদ্য দপ্তর থেকে বেবুন চৌধুরীকে ছাঁটাই করে দিতে হল,তেমন কিছু না, ক'টা হাভাতে পশুর সমাবেশে মুখ ফসকে বলে ফেলেছিল যে পশুখাদ্যের সংকট মেটানো তার কাজ নয়,আর যায় কোথায়,প্যাঁচাগুলো সেই কথাই দিগ্বিদিক ছড়িয়ে দিল পাতায় পাতায় লিখে,এত হুংকার এত ধাওয়া তবুও এই প্যাঁচাগুলোর স্বভাব পাল্টালো না,কিছু একটা পেলেই তিলকে নারকেল বানিয়ে রাজার মাথায় মারা চাই। আর বেবুনটাও এমন গাধা,কোবরেজি কারবার করেও ব্লাফ দেয়া শিখলো না,আরে সব কথা কি বলতে হয়? এই জঙ্গলের পশুদের গায়ে পিঠে হাত বুলিয়ে ঠাণ্ডা রাখা যে কত সোজা তা কি আর বলতে! নইলে সিংহাসনে বসেই কি সুন্দর পশুকুলে একটা অবতারসুলভ ভাব নিয়ে ফেলেছিলেন তিনি,দুই মাদী বিল্লির কুকুর-বেড়ালগুলো তো বটেই খোদ বিল্লিকুমারদ্বয়কেও খাঁচায় ভরে দেয়াতে ঘেসো পশুদের মাঝে বেশ একটা ভক্তিগদগদ ভাবই চলে এসেছিল,এমনকি জিলাপির প্যাঁচ নিয়ে চলা প্যাঁচারাও ধন্দে পড়ে গিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেই ফেলেছিল যে জঙ্গলরাজ্যে মনে হয় শান্তি চলেই এল।
আহা,সেই সে দিন! খুশিতে ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে সিংহাসনে দু'টো গুঁতো মেরে আসেন জনাব,সিংহচর্ম থাকার পরেও আবেগময় মুহূর্তে বরাহস্বভাব তাঁর মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। মাদী বিল্লিগুলোর সে কি অসহায় করুণ মিঁয়াও,দু'দল কুকুর-বেড়াল এখন এক খাঁচাতে জল খায়। সবই তো ঠিক ছিল,রাজ্যের শীর্ষ প্যাঁচাপত্র "জঙ্গলে সূর্যোদয়" এর প্যাঁচাপাদকও বেশ তাকে তাল দিয়ে যাচ্ছিলেন,গর্দভরাজ্য থেকে রক্তচোষা বাদুড়ের দলও চলে এসেছিল জঙ্গলরাজ্যের সম্পদের দখল নিতে,কিন্তু গোল পাকালো হাভাতে পশুর দল,শুধু খাই আর খাই, পশুখাদ্যের সরবরাহ চাই। আরে, এত খাই খাই করলে চলে? ফুড চেইন বলে কথা,উপরে উঠে নিচেরটা খাও,কিন্তু তৃণভোজীগুলো শুধুই খেতে চায়,খাদ্য হতে রাজি না,কোন কথা হল? আজ ঘাস দাও কাল পাতা দাও পরশু কলা দাও,ব্লাডি পশুর দল। অবশ্য,দু'এক জায়গায় চালে ভুল হয়ে গেছে,স্বীকার করেন তিনি মনে মনে। হায়েনাস্তানের সহযোগী শকুনে আজমী কে এত তাড়াতাড়িই খাঁচা থেকে ছেড়ে দেয়াটা ঠিক হয়নি,এখনো এই নির্বোধ পশুগুলো এত বছর আগের কথা মনে রেখেছে সেটা তার বরাহমস্তিষ্কে খেলেনি। বিরক্ত তিনি এ নিয়ে অনেকদিনই,এখন কাঁধে কাঁধ মেলানোর সময়,শকুন আর বরাহের সাথে কোরাসে গাইবার সময়,এ না হলে রাজ্যের উন্নতি হবে কি করে? এই যেমন,রাজ্যের পশুশাবকদের উচ্চশিক্ষিত করে তুলতে পশুমেধা যাচাই পরীক্ষাতে "গণপঞ্চপত্র বিলি" কর্মসূচী চালু করেছেন তিনি বিশ্বমোড়ল গর্দভদের কথামত,সে নিয়েও আপত্তি,আরে বলি,যত বেশি পন্ঞ্চপত্র পাবি ততই তো গর্দভের কাছাকাছি যাবি,তাতে পন্ঞ্চত্বপ্রাপ্তি হলেই বা কি?
আবারো ঘোঁৎ করে সিংহাসনে গুঁতোন মহারাজ,এবার অবশ্য কিন্ঞ্চিৎ ক্রোধান্বিত,গর্দভরাজের সরবারাহকৃত পরিকল্পনাতে বারবার বাধা পড়লে হালকা রাগ হতেই পারে তাঁর। পশুগুলো কি যে এক কথা শিখেছে, নির্বাচন আর পশুতন্ত্র। তা সেটাও দেয়া হবে,যেসব কুকুর-বেড়াল ধরে খাঁচায় পুরেছিলেন তাদেরকেই আবারো নির্বাচিত করা হবে,পোড়ার জঙ্গলে আর যোগ্য পশু কোথায়? তবে কিনা,এবার লাগাম থাকবে তাঁরই হাতে,কুকুর-বেড়াল তো ভাগ পেলেই খুশি,খুদখুশি হয়েই ভাবেন তিনি। গোঁয়ারগোবিন্দও তৈরি,বড় সহজে তাঁর গণ্ডারবাহিনী আর গুহায় ফিরছে না,মিনিমাগনায় লুটের সুযোগ পেলে বাঘও যে হায়েনা হয়ে যায়,সে কি আর তিনি জানেন না? বড়ভাই রাজ্য তৈরি,তৈরি গর্দভ বাহিনীও, হায়েনারা প্রস্তুত থাবা বাগিয়ে,শকুন আসছে নখ বাড়িয়ে,জঙ্গলরাজ্য শ্মশান বানিয়ে ভোজ দেবে সবাই,বরাহনৃত্যের আগুনে পুড়বে সবুজ বনের কোমল ঘাস।
তবু ভয় হয় মহারাজের,বড় ভয় হয়। ঘুমের মাঝে তিনি তৃণভোজীদের পায়ের আওয়াজ শুনতে পান আজকাল। ভয় পান তিনি এই জঙ্গলের আদিকালের গভীর ধ্বনিকে,ভয় পান জঙ্গলরাজ্যের পিতৃপুরুষদের বজ্রনির্ঘোষকে,ভয় পান বনদেবীর প্রেতাত্মাকে। কেঁচোর বনে এখনো শকুনের নখরাঘাত সয়ে কখনো কখনো গর্জে ওঠে অরিন্দম ব্যাঘ্রসন্তান, সন্দেহবাদী প্যাঁচার দল এখনো বাজপাখির দৃষ্টি নিয়ে ঘুরে বেড়ায় বনের আকাশে,বন্যকুকুর আর হায়েনার দলের সামনে এখনো রুখে দাঁড়ায় বাঘের চোখ,বরাহের পালে এখনো ঢিল ছোঁড়ে তৃণভোজীরা,এখনো আশা নিয়ে কোন এক দূর গুহায় বেড়ে ওঠে ছোট্ট কোন সিংহশাবক।
বড় ভয় পান মহারাজ বরাহনন্দ ভড়,পায়ের নিচে মৃদু কাঁপন শুনতে পান তিনি,সিংহচর্মের নিচে ঘেমে ওঠে তার বরাহ গতর।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

