somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দিনলিপি ২: বেকারজীবনের বিরক্ত কিচ্ছা

০২ রা আগস্ট, ২০০৮ রাত ২:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

টিং টিং শব্দে মোবাইলটা বেজে উঠতেই এক থাবা দিয়ে সেটা বন্ধ করে পাশ ফিরি। পূর্বমুখী জানালাটার বাধা একদমই অগ্রাহ্য করে সূর্যদেব ঘরে অনধিকার ঢুকে যাচ্ছেন,ছোটবেলার মামাকে মনে মনে সক্কালবেলায় ২-৪টা গালি দিয়ে আবার তন্দ্রায় ডুব দিই। একটু পরে আবারো মোবাইলের শব্দ,আবার থাবা,এই জিনিসটা বেকারজীবনের সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা হয়ে দাঁড়াচ্ছে,কোনদিন আছাড় দিয়ে ভাঙি ঠিক নেই,সারাদিন খবর নেই কিন্তু ঘুমে-বাথরুমে-বাসে-ট্রেনে উঠলেই কেন যেন আমার গুরুত্ব সবার কাছে বেড়ে যায়।

কতক্ষণ তন্দ্রারাজ্যে ছিলাম ঠিক নেই,নতুন কোন অফিসে জয়েন করে সেখানকার সুন্দরী সেক্রেটারিটাকে প্রায় পটিয়েই ফেলেছি এমন সময় "এই শালা, এখনো ঘুমাস,তর না ৯টায় বাইর হওয়ার কথা" হুংকার শুনে ধড়মড়িয়ে উঠে বসি,সামনে রণমূর্তিতে দণ্ডায়মান বন্ধুবর মতিউর। চোখ কচলে জানাই,বেকারের ঘুম শুরুই হয় সকাল ৯টায়,কাজেই বের হওয়া উচিত রাত ৯টায়। যুক্তিতে কাজ হল না,টেনে উঠিয়ে দিল। হাত-মুখ ধুয়ে গদাইলস্করি চালে নাস্তা করে বের হবার সময় আড়চোখে দেখি,ঘড়িতে বাজে সাড়ে বারোটা।

বের হয়ে চামড়ায় ছ্যাঁকা খেলাম,সুয্যিমামার মেজাজ আজকাল বেশ কড়া। বাসের লাইন দেখে মেজাজ আরো খাপ্পা,নামে সিটি আর সিটিং সার্ভিস কিন্তু একটা বাসও নেই যেটায় কেউ বসে যাচ্ছে। তুলনায় ১০ নম্বর মুড়ির টিন গুলো খালি যাচ্ছে, ভদ্রলোকেরা মনে হয় ১০ নম্বরে ছোটলোকের গায়ে ঘেঁষাঘেঁষি করে যাবার চেয়ে সিটি সার্ভিসে নিজেদের ক্লাসের পশ্চাদ্দেশে ঘষাঘষি করে যাওয়াটাই শ্রেয় ভাবেন,ডাবল ভাড়া দিয়েও কি চমৎকার মুখ বিকৃত করে সামনে দাঁড়ানো লোকগুলোকে ঠেলে-গুঁতিয়ে-মাড়িয়ে নিজের কাংক্ষিত স্টপেজে নামার চেষ্টা তবু মুখে কথা নেই,আহা এরই নাম নাগরিক সভ্যতা।

শাপলা চত্বর নেমে এদিক-ওদিক হাঁটি খানিক,ফর্মটা জমা দেয়ার আজকেই শেষ দিন কিন্তু বিশেষ তাড়া নেই,সরকারি কাজকারবার,ক'দিন আগেই এমনই কোন এক মহার্ঘ্য স্থানে আমারই এক হতাশ বন্ধুকে জনৈক ব্যক্তি ভাইভার পরে সানন্দে জানিয়েছেন যে ১০ লাখ টাকা দিলেই পদখানা তার হতে পারে। আপাতত আমার ১০ টাকা দেয়ারও ইচ্ছা বা সামর্থ্য নেই,রুটিন কাজ সারার মত দরখাস্ত ফেলে যাই,নইলে খারাপ দেখায় শুয়ে-বসে ঘুমানো। কড়া রোদটাও বেশি খারাপ লাগে না,তাকিয়ে থাকলে বাণিজ্যিক এলাকার ছুট দেখে মাথা ঘুরাতে পারে কিন্তু উদাসী ভাব ধরে সামনে হাঁটা দিলে মনে হয় কোন ব্যাপার না। ফাঁকতালে বাংলালিংকের কাস্টোমার কেয়ারের বাইরে থেকে হালকা উঁকি দিই,ভাবি ভেতরে গিয়ে ঠাণ্ডা হাওয়া খেয়ে আসা যায় কিনা, কাঁচের দরজায় নিজের পোশাক আর চুল-দাড়ির বহর দেখে সাহস হয়না।

যে সরকারী প্রতিষ্ঠানটায় ঢুকি সেটা বেশ ভালই দেখতে,অন্য সরকারী অফিসগুলোর মত ভূমিকম্পাতংকে শংকিত চেহারার নয়। দরখাস্ত জমা দেবার বাক্সটা এর মাঝেই ভর্তি প্রায়,আরো ক'জন বসে আছে জমা দেবে বলে,তার মাঝে চেপেচুপে নিজের আর আরো ২ বন্ধুরটা ঢুকিয়ে দিই। একজন জানালো,এগুলো শুধু আজকের,হিসেব করে দেখলাম,মোট পদের সংখ্যা আজকের দরখাস্তের চেয়েও কম। দেশে এত বেকার প্রকৌশলী, ভেবে আনন্দ পাই,অনেকটা অন্যের পশ্চাতে মরিচগুঁড়ো দেখে নিজের জ্বলুনি ভোলার মত।

বের হয়ে আবার এলোমেলো হাঁটি,তাড়া নেই,এক বড় ভাইয়ের সাথে দেখা করার কথা,একটা বই ফটোকপি করতে দিয়েছি পলাশীর মোড়ে সেটা আনার কথা,কিন্তু আজকে বাদ। বরং বিকালে টিউশনি করতে যাওয়া যায়,আপাত সম্বলটায় বেশি ফাঁকি দিয়ে লাভ নেই। নাকি চুলটা কাটাবো? সাড়ে চার মাস হল কাকের বাসা মাথায় রেখে দিয়েছি,একটু হালকা করা দরকার। তাই সই,বেশ আরামেই উঠে গেলাম ৬ নম্বর কাঠবডিতে,সিটও পেয়ে গেলাম,পাশের মিডওয়ে বাসের ষাঁড়গুঁতোনো লোকগুলোর দিকে চেয়ে আরেকবার মনে এল ছোটলোকের গায়ের চেয়ে ভদ্রলোকের পশ্চাদ্দেশের দামও বেশি।

নাপিত চুল কাটানোর জন্য টাকা বেশি দাবী করে বসলো,ভুরু কুঁচকে তাকাতে জানালো মামা আপনের চুলের সাইজ আরো ৩জনের সমান,টাকা নাহয় ৫টা বেশি চাইলাম। অকাট্য যুক্তি,খণ্ডানোর উপায় নেই:( অবশ্য, ছাত্রের বাসায় গেলে চেহারা চিনবে কিনা সেটা একটা প্রশ্ন,একবারে বেশি ছোট না করে রয়েসয়ে কাটানো দরকার ছিল:(

পাশের বাড়ির বাড়িওয়ালার বখাটে ছোঁড়া-ছুঁড়িগুলোর দুমদাম হিন্দি গান উপেক্ষা করে শুয়ে পড়লেও বিকালের ঘুমটা ভাল হল না,লোডশেডিংয়ের জ্বালায় উঠে গিয়ে আবারো সরকারের মা-বাপ তুলে ক'টা গালি দিয়ে বসি। বাড়িওয়ালা সদ্যই একটা নেড়ি কুকুর আমদানী করেছে,সিঁড়ির নিচে সেটা শুয়ে থাকে,অন্ধকারে পা দিয়ে বসলে নির্ঘাত খ্যাঁক করে কামড়ে দেবে। সাবধানে সেটাকে পাশ কাটিয়ে হেলেদুলে বাইরে বেরিয়ে বুঝলাম মনখারাপের কিছু নেই,রাস্তার দু'ধারেই অন্ধকার,পাবলিক দিব্যি নিশাচর হয়ে গেছে,একজনও খোলা ম্যানহোলে পড়ছে না,এর নাম অভিযোজন। রিকশা একটা রাজি হয়ে গেল,হাওয়া খেতে খেতে বেশ একটা ফুরফুরে ভাব,(বলাই বাহুল্য আমি টিপিক্যাল মধ্যবিত্ত, রিকশাওয়ালার কষ্ট নিয়ে ভাবছি না), মৌচাক মোড়ে গিয়ে রঙচঙে বালিকাগুলোর ঢং দেখে নিজের মনটাও বেশ রোমান্টিক রঙিন হয়ে গেল বলেও মনে হল। বিজ্ঞাপনের হোর্ডিংগুলোর পরাবাস্তব রঙে হারিয়ে রাস্তার কোলাহলটাও যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য ভুলে যাই, গ্রামীনের সৈকতের বোন বা বাংলালিংক সুন্দরীর দেয়া কথাও এমন রঙে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে,কারণ আমরা খড়কুটো আঁকড়ে হলেও বিশ্বাস করতে চাই,যেমন বিশ্বাস করতে চাই নষ্ট শহরের নষ্ট মাথাদের মধুর বাক্য,যেমন গুলশান-বনানীর পোরশে আর বিএমডব্লিউ আর আগোরা-হেলভেশিয়ার জাঁকজমক দেখে রাস্তার ভিখারিও ভাবতে চায় এখানে স্বর্গের একটা টুকরো নেমে এসেছে পরীদের নিয়ে,যেমন ১৪ ফেব্রুয়ারির দিনে বা অগাস্টের প্রথম রবিবারে আর্চিস বা হলমার্কের লক্ষ লক্ষ টাকার কার্ড ডিজে পার্টির ভিড়ে আমরা ভাবতে চাই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে নতুন শতাব্দীর দিকে, পেটে ভাত না থাকুক হাতে বোতল তো আছে,কানে ডিজুসের গান তো আছে,হাতে বাপের পকেট কাটা দামী মোবাইল তো আছে,যে টাকা হয়তো এসেছে কোন সরকারী অফিসে কোন বুড়োর ফাইল ঠেকিয়ে বা ১০ লাখ টাকায় বেচে দেয়া কোন চাকরির বিনিময়ে, সাথে আরেকটা ভবিষ্যৎ দানব পয়দা করে।

টিউশনি সেরে বের হতে প্রায় ১০টা,ভিড়ের কোন কমতি নেই,এত এত মানুষ কোন গুহায় গিয়ে ঢোকে? ঠেসে ময়দার বস্তার মত ভরে দেয়া হচ্ছে,আলো নেই পানি নেই জায়গা নেই তবু এক অন্ধকুপের দিকে অন্ধপোকার মত ছুটে আসছি আমরা সবাই। পাশ থেকে হঠাৎ করেই ঘোমটা পরা এক মূর্তি উদয় হয়ে চমকে দেয়,"বাবা আমি ভিক্ষা করি না,ঘরে পোলাপান বাবা,খাওয়া নাই,১টা টাকা দেন বাবা" শুনে আনমনা হয়ে যাই। লাগামছাড়া দামের আঁচ উচ্চবিত্তের গায়ে লাগে নি,পিজ্জা হাট কি কেএফসিতে একটুও ভিড় কমেনি,রাস্তায় আমাদেরই জিম্মি করে কেনা প্রাডো গাড়ির অশ্লীল উদ্ধত হর্নে কান পাতা দায় । কিন্তু মধ্যবিত্তের
এখন নুন আনতে পান্তা ফুরায় আর নিম্নবিত্ত পথে নেমে গেছে। "এই ভাই জায়গা ছাড়েন"-বিরক্ত কণ্ঠ শুনে সম্বিৎ ফেরে,দু'টো টাকা বের করে মূর্তির দিকে বাড়িয়ে ভাবি,এমন আর কতগুলো দু'টাকা হলে একবেলার চাল কেনার টাকা হবে?

মাগুরছড়ার গ্যাসের মতই মাটির মানুষের বুক চিড়ে ক্ষোভের বুদবুদ উঠছে,আমরা কি কেউ আসন্ন বিস্ফোরণের আগুন দেখতে পাচ্ছি?
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:৫৮
৫৫টি মন্তব্য ৫৪টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×