আমার বন্ধু মোটকা মাশুক দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। এখন,এটা বড় কোন খবর না যে ঢোল পিটিয়ে লিখতে হবে,এমন কোন শোকসংবাদ না যে এলিজি লিখতে হবে,সত্যি বলতে কি এই ধরণের লেখা দেখলে মোটকার খেপে যাওয়াটাই হবে স্বাভাবিক কারণ জীবিত মানুষ নিজের নামে শোকগ্রস্থ প্যানপেনে লেখা দেখতে পছন্দ করে না,অন্তত,আমি বা আমরা করি না,যারা মোটকার সাথে ছিলাম বা মোটকা যাদের সাথে ছিল। জীবনটাকে তুড়ি মেরে দেখার একটা ইচ্ছা ছিল আমাদের আর ভার্সিটি জীবনে সেই ইচ্ছাটা একেবারে বাস্তবায়ন করিনি তাও না,আমি পুরোপুরি না পারি,আমার অন্য সাথীরা অনেকটাই পেরেছে।
তো,আজকে এই লেখাটা লেখার কথা ছিল না,কথা ছিল আরো হয়তো ২০-২৫ বছর বা তারো পরে কোন গেটটুগেদারে আন্ডাবাচ্চাসহ বন্ধুবান্ধবদের দেখে স্মৃতিকথায় তাদের জন্য লিখবো। তাও কেন লিখছি? লিখছি কারণ হঠাৎ করে মাথায় চলে এসেছে যে ২০-২৫ বছর বা আগামী ১৮ অগাস্টের মাঝে কোন পার্থক্য নেই,দূরে চলে যাওয়া মাত্রই শুরু হল,আর সেটা হাবলের সূত্রমতই শুধু সরতেই থাকবে গ্যালাক্সির মত, আমরা, বন্ধুরা, কেউই আর ঠিক আগের মতই তুড়িমারা জীবনে ফিরে যেতে পারবো না। জানা ছিল মোটকা বাইরে যাবে,দেশের বিনবেতনের চাকরিতে বিরক্ত। জানা ছিল ভিসা হয়ে গেছে,কিন্তু জানা ছিলনা সময়টা এত কাছে। কবে ফ্লাইট,কথাচ্ছলে জিজ্ঞেস করতে জানালো,১৮ তারিখ। অনেকদিন,সত্যি বলতে কি,বুয়েট ছাড়ার দিনটার পর থেকে এমন ধাক্কা দেয়া ২-১ টা শব্দ মনে হয় শুনিনি। মোটকা যাচ্ছে বলেই এই শোক তা না,মোটকা শুধু মনে করিয়ে দিয়ে গেল এটাই শুরু,আস্তে আস্তে সবাই যাবে,দেশে থেকেও দূরে,কেউ দেশ থেকেই দূরে।
মোটকার পরিচয়টা দেয়া দরকার কিনা বুঝতে পারছি না,আলাদা করে নিজের বন্ধুদের কাউকে পরিচয় করিয়ে দিতে আমি নিজে বা বন্ধুমহল ঠিক স্বস্তি বোধ করি না। এটাও জানি না যে আমরা নিজেদের কি ঠিক কোন চোখে দেখি,কাঠখোট্টা কথাগুলোর মাঝে কোথাও এক জায়গায় ইস্পাতের বন্ধন কবে হয়ে গিয়েছে সেটাও ভাবার সময় বা সুযোগ আমাদের কারো হয়নি। তারপরেও কাছে ছিলাম,কাছেই আছি,বিপদ বা কষ্ট,আনন্দ বা হাসি,হাত বাড়ানোর মানুষগুলো কখনো সরে যায়নি। রশিদ হলের ৩০১১ এর আড্ডা বা পাগলামি ছাড়িয়েও শেকড়টা চলে গিয়েছিল আরো অনেকদূর। জীবনের অন্ধকারতম মুহূর্তগুলোতে যখন পৃথিবী আর বেঁচে থাকার অর্থ নিয়ে নিজের মাঝে প্রশ্ন উঠে গেছে,এই হাসিমুখগুলোর দিকে তাকিয়ে আর তীক্ষ্ণ রসিকতাবাণে জীবনটাকে নতুন করে দেখতে শিখেছি। সেই ভরা মজলিশ খালি হয়ে যাবার সূচনা যখন দেখি,তখন হয়তো ছোট্ট ২-১টা এলিজি লিখলে মোটকা বা আর কেউই কিছু মনে করবে না।
চৌধুরীকে জিজ্ঞেস করলাম,এখনো আছিস? জানালো,আছে,তবে অবস্থা সুবিধার না। বুঝলাম,পাখির মন উড়ু উড়ু। হাফিজের খবর কি? উড়বে,শিগগিরি। দুলা? আছে আরো কিছুদিন,টেকার ইচ্ছা,তবে খুব ব্যস্ত। মোটা রুকন? শেষ পর্যন্ত চেষ্টা আছে মামা থাকার,দেখি কি হয়। নেতা গবুর খবর কি? কাগজপত্র অ্যাম্বেসিতে,চলে যাবে যে কোনদিন। বিপি রাসেল চাকরি ছাড়বে আরেকটা,আপাতত বিভ্রান্ত। সুপন উড়বে,মতিউরও,আজ অথবা কাল। টাক্কুও মনে হয় টিকবে না,রাহাত হয়তো কিছুদিন থাকবে। মনির,হামিদ আর রেজা চাকরি নিয়ে সারাদেশ ঘুরছে,রিপনের মত তাদেরো আপাতত দেশে থাকার ইচ্ছা,প্রিয়মুখগুলো কতদিন দেখিনা,আরো কতদিন দেখবোনা কে জানে!
সবার খবর নিয়ে মেসেন্ঞ্জারে আবার মোটকাকে গুঁতো দেই। খ্যাঁক করে ওঠে,কি সমস্যা? জানালাম,পকেট খালি,যাবার আগে তার বাপের পয়সায় আমাদের গরিবদের একটা খানাদানার ব্যবস্থা হবে কিনা। জবাব এল,ক্যান বিদেশে যাইতে যে পয়সা লাগতাসে তাতে কি কমতি পড়লো? উত্তর দিলাম,তা পড়ে নাই,তবে ওদের ভোগে না লাগায়া আমাদেরো কিছু ভাগ দে। বিবেচনা করা হবে,আশ্বাস পাই। এরপর কুঁই কুঁই করে জানায়,দেশ ছাড়তে ভয়,ভাল লাগে না। ভবিষ্যৎ হয়তো ওখানে ভাল, কিন্তু ভরা মজলিশ ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করছে না।
আরেকবার দীর্ঘশ্বাস ফেলি,সেই ভরা মজলিশের কথা। একটা সময়ের কথা,ফিরে না আসা গল্পের কথা,নিজের ঘুম নষ্ট করে আমাকে পরীক্ষায় পাশ করানোর জন্য গজগজ করতে করতে পড়ানোর কথা,ভেঙে পড়ার মুহূর্তে অট্টহাসিতে ঘর কাঁপিয়ে জীবনকে আরো একবার দেখে নেয়ার সাহস দেখানোর কথা।
মোটকা,আর আরো সব বন্ধুরা,এই দুর্বল মানুষ কখনোই তোদের বলতে পারেনি নিজের জীবনের জন্য সে কতখানি ঋণী সবার কাছে,মনে হয়,সামনে দাঁড়িয়ে বলার সাহস কোনদিন হবেও না,তাই লিখে দিলাম এখানেই। ভাল থাকবি সবাই,কাছে,দূরে,চোখের আড়ালে বা সামনে।
পুনশ্চ: এই লেখা মোটকাকে দেখানো যাবে না,প্রথমত,বজ্জাতটার ভাব বেড়ে যাবে,দ্বিতীয়ত,এই চরম ন্যাকামি লেখা দেখে টিটকারি দিয়ে বাকি জীবন নরক করে ছাড়বে।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা আগস্ট, ২০০৮ রাত ৩:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



