somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দিনলিপি ৪: একা এই শহরে

১৮ ই আগস্ট, ২০০৮ রাত ২:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বুয়েটে গিয়েছিলাম। আপাত অজুহাত ক্লাস করা,কিন্তু ৩টা ৩০ এর ক্লাসে ৪টা ৩০ এ ঢুকলে কি ক্লাস করা হয় সেটা সবাই বুঝে। আসল কথা হল গেলে ২-৪ জনের সাথে দেখা হয়,হা-হুতাশ করার সঙ্গী জোটে,২ কাপ চা খাওয়া হয়,পলাশীর মোড়ে দাঁড়িয়ে ফটোকপি মেশিনের সরল ছন্দিত স্পন্দন দেখা হয়। তাই যাই,যেতে হয়,মনে হয় আরো কিছুদিন যাবো যতদিন না আস্তে আস্তে একা হয়ে যাব।

যে ক্লাসে যাই সেই কোর্সের প্রফেসর একটু কাজপাগলা টাইপ, আন্ডারগ্র্যাডে নিয়মের ফাঁদে পড়ে ১ ঘণ্টার মাঝে ক্লাস শেষ করা লাগে,মাস্টার্সে ঐ হ্যাপা নেই,কাজেই ৩টা ৩০ এ ক্লাস শুরু করে শেষ করেন ৮টা ৩০ এ। একদিনই পুরো সময় ছিলাম,সেই ক্লাসের অসাধারণ লেকচার নিয়ে একদিন লিখবো,তবে আমার মাঝে জন্মগত ফাঁকিবাজ কেউ আছে,সেজন্যই আর একদিনও সে সাহস করিনি। হেলেদুলে ৪টার পরে ঢুকি,৫টার কিছু পর বের হয়ে যাই,তিনি কিছু মনে করেন না। শেষ পর্যন্ত,যা শুনেছি,৮-১০ জন থাকে,নিবেদিতপ্রাণ,ভাগ্যিস থাকে,নইলে বাকিদের আর পরীক্ষা দেয়া লাগতো না। আজ শেষ ক্লাস,৬টার আগেই ছেড়ে দিলেন,একটু হতাশ হলাম। তবে শেষ মুহূর্তে আরো ৪-৫ তাড়া কাগজ ধরিয়ে দিয়ে সবাইকে বললেন ফটোকপি করতে, এও নাকি পরীক্ষায় আসবে। একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, পরীক্ষা যে দেব,কোন কার্ড বা রেজিস্ট্রেশন বা কোন প্রমাণ লাগবে না? সে জানালো যে এমনকি বুয়েটেও এখনো কাউরে পাগলা কুত্তা কামড়ায় নাই যে আরেকজনের মাস্টার্সের পরীক্ষা দিয়ে দিবে,আসল পরীক্ষার্থীই অর্ধেক আসেনা।:(

ক্লাস শেষে হাঁটতে হাঁটতে পলাশীর মোড়,দেখা হয় সবার সাথে, রাহাত, সাবিত,রাশেদ,সৈকত। চা,গল্প,ফটোকপি। চাকরি,মাস্টার্স,দেশ আর বিদেশ। হাঁটতে হাঁটতেই হলে,হাঁটতে হাঁটতেই ক্যানটিনে। পরামর্শ চলে,বা বলা যায়,পরামর্শ দেয়া চলে,আমি শ্রোতা,বক্তা রাহাত। তার কোম্পানিতে লোক নিবে কিনা খোঁজখবর নেই,মাঝে সৈকত এসে বসে।শুনি,ভাবি,বুঝি,বা বুঝতে চাই। সময় খুব কম ভাবার আর করার,হয়তো আরেকটা টু ডু লিস্ট করা লাগবে। গল্পে গল্পে সময় যায়,ঘড়িতে ৯টা ছুঁই ছুঁই দেখে উঠে পড়ি,যে যার পথে। পলাশীর মোড়ে আবার,এবার রিকশা খোঁজার অভিযান। আগুনে ভাড়া,তারা তখন মহারাজ। একজন কাছাকাছি যায় প্রত্যাশিত ভাড়ার, দরাদরি চলে,এরপর চুপচাপ অভিমানীর মত দু'জন দুদিকে তাকানো, স্নায়ুযুদ্ধ চলে। শেষমেশ আমার জিত,উঠে পড়ি। রাস্তা ফাঁকা,রিকশা চলে,তবে ঢিমেতালে,চলুক,তাড়া নেই কারোরই, দু'জনেরই দিনের শেষ ট্রিপ।

আলো-আঁধারি দিয়ে নিঃশব্দে চলে রিকশা,আমি নিঃশব্দে ভাবি,আর দেখি। মাথাটা ফাঁকা করে দেয়ার খুব ভালো একটা সময়,খুব ভাল একটা উপায়,এই ফাঁকা রাস্তায় ঘুরে যাওয়া। শুধু দেখি,ভাবি না। ভাঙ্গাচোরা সলিমুল্লাহ হলের আবছা অবয়ব দেখি,গাছের ফাঁকে স্ট্রিটলাইটের আলো, অপার্থিব তরল আলো দেখি। রিকশায় চুম্বনরত যুগল দেখি,আহা এত বড় শহরে ওদের আর জায়গা নেই। জায়গা নেই কার্জন হলের সামনে ফুটপাথে শুয়ে থাকা মানুষগুলোরও,আর হাইকোর্টের জীবন বয়ে চলা ভাবের পাগলদেরও। ফুটপাথের সে জীবনও দেখি প্রতিদিন,নিস্তব্ধ আলোয় আরো একবার ভাল করে দেখি পলিথিন আর ক্যানভাসের জীবনটাকে। দেখি,তবে ভাবি না,খাই,কিন্তু গিলি না।

রিকশা ঢোকে সেগুনবাগিচায়,ঠেক দেয়ার ব্যাপারে জায়গাটার সুনাম আছে,মিষ্টি খাওয়ার টাকা চায় প্রায়ই। তবে ১টা ১১০০ টাকার মোবাইল ছাড়া কিছু নেই,কাজেই ওটাও ভাবিনা,শুধু খেপে দিয়ে ছুরি মেরে দেয় কিনা সেটাই চিন্তা ।এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটারের সামনের আড্ডা ভাঙছে মনে হয়,পাজেরো আর টয়োটাতে চড়ে সুবেশী আর রূপসীরা হাসতে হাসতে বের হচ্ছে।উচ্চবিত্ত দেখে গেল মধ্যবিত্তের অসময়ের বিলাস,কে জানে পিজ্জা হাটের হাজার টাকার তরুণ ২ পয়সার জলদাসের দুঃখ কি বুঝলো,তবে স্ট্যাটাস সিম্বল হিসেবে বেশ,সংস্কৃতি কেনা হল সোনার দামে,ওটা ডিসকো বারে পাওয়া যায় না কিনা,থিয়েটারে আসতেই হয় আরেকটা অভিনয় করতে।

চলতে চলতে কাকরাইল,শান্তিনগর,মালিবাগ,মৌচাক। আজকে ঝিম ধরা,৩ দিনের ছুটিতে ঢাকাবাসী শহরটাকে একটু শান্তি দিয়ে গেছে। ২-১টা নিয়ন আলো তাও বেহায়ার মত জ্বলে দাঁত বের করে,তবে আমার মগ্নতায় ব্যাঘাত ঘটানোর মত নয়। রিকশাটাকে সদম্ভ ভেংচি কেটে প্রবল গতিতে ছুটে যায় প্রিমিও,অ্যালিয়ন,প্রাডো,আজকে রাস্তা খালি,অন্যদিন গণতন্ত্রের নিয়মে জ্যামে পড়ে তাদেরো জিভ বের করে হাঁপানো লাগে। পার হয়ে আসি ফারুক-তসলিমের কবর,পার হয়ে আসি গার্মেন্টসগুলো, পার হয়ে আসি সিনেমাহল,নীরব রাস্তা আমাকে বিরক্ত করে না। আজ কি করবো ভাবার চেষ্টা করি,কিন্তু ভাবনাগুলোও জ্বালায় না,আজ একা হতে দিচ্ছে হয়তো।

বাসার কাছে এসে নেমে পড়ি,নিঃশব্দে ভাড়া বাড়িয়ে দিই,নীরবে ভাংতি ফেরত দেয় চালক। বেশ ভিড়ভাট্টা এদিকটায়,কেন যেন কানে আসে না আমার। গলির মাঝে রিকশা আর মানুষের গুঁতো বাঁচিয়ে ঢুকে পড়ি বাসায়,বাড়িওয়ালার পোলাপান হইহই করে ক্যারামবাজি করছে,ফিরেও তাকায় না,আমিও না। বজ্জাত কুকুরটা ঝিমোচ্ছে,একবার মাথা তুলে আবার ধ্যানে মগ্ন হয়। রেলিংছাড়া সিঁড়িতে পায়ের শব্দ শুনি শুধু,বাসার দরজায় বেসুরো কলিং বেলের আওয়াজ শুনি,ঘরে ঢুকে আব্বা-আম্মার টুকটাক কথা শুনি। ইটিভিতে স্মার্ট পাঠিকার বেইজিং সংবাদ শুনি,মাইকেল ফেল্পসের অট্টহাসি শুনি,উসাইন বোল্টের গর্বিত হুংকার শুনি,পরাজিত প্রতিদ্বন্দীর কান্নার শব্দ শুনি। শুধু শুনি,তবে ভাবি না,ভাবতে চাইও না। ভাত চিবানোর আওয়াজ থেকেও মুক্তি পেতে ইচ্ছে করে,কীবোর্ডের খটাখট শব্দকেও নিস্তব্ধ করে দিতে ভাল লাগে,কাগজের খসখসটাকেও থামিয়ে দিতে আনন্দ পাই,শুধু মাথাটা ফাঁকা রেখে দেখে যেতে ইচ্ছে করে।

জনারণ্যে নিঃসঙ্গ থাকার পদ্ধতি শিখে গেছি কিনা ভাবতে গিয়ে মনে হল,আমি না,সবাই শিখে গেছে সেটা,এই বিশাল শহরে বেঁচে থাকার প্রয়োজনে সবাই নির্লিপ্ত নিস্তব্ধতার পদ্ধতি আয়ত্ত্ব করে নিয়েছে। আসব একা,যাব একা,যা আছে তাই খাবোও একা,পাশের মানুষটা হোঁচট খেয়ে পড়লে তার দিকে হাত বাড়ানোর সময় কোথায়?

রক্তকরবীর এই ঝলমলে খনিশহরে জীবনটা সলো গীটারের মতই একা।

[লেখাগুলো বড় বেশি একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছে,ক'দিনের জন্য লেখা থেকে ডুব দিয়ে দেব ভাবছি,সামনে পরীক্ষা,পাশ করার জন্য কিছু পড়াশোনাও করা দরকার]
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ৮:০৫
৫০টি মন্তব্য ৪৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×