somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মুশফিক ও মেহরাবের ৫১ ওভার: ফিনিক্স পাখির এক দিন

১৮ ই অক্টোবর, ২০০৮ রাত ১:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে,তোমার কাছে একটা বিলাসী ছুটির দিন মানে কি,আমি বলবো,একটু বেলা করে ঘুম থেকে উঠে পরোটা-ভাজি দিয়ে নাস্তা করে বাসার আলোকিত ঘরটায় বড় বিছানাটাতে হেলান দিয়ে বসা,তারপর ঘরের অন্যতম মূল্যবান সম্পদ ২১" রঙিন টিভিটাতে চোখ রাখা,আর সেখানে নিজের প্রিয় ব্যাটসম্যানের ঠ্যাঙানো আর প্রতিপক্ষের বোলার-ফিল্ডারদের দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে মাথা চাপড়ানো আর আহাজারি দেখা।এককালে অন্য দেশের ব্যাটিং দেখে এই শখটা মেটাতে হতো,বাংলাদেশ জোরেশোরে খেলা শুরু হবার পরে নিজের দেশের খেলা দেখেই সেই শখ মেটানোর চেষ্টা করি। সুযোগ যে খুব একটা আসে তা না,বেশিরভাগ সময়েই আমাদের স্কোরকার্ডের এমন হাল থাকে যে তাতে ছুটির বিলাসী ভাবটা কেটে গিয়ে নিজের মাঝে কেমন একটা জঙ্গী ভাব চলে আসে আর নূরা পাগলার কায়দায় দা-কুড়াল বা নিদেনপক্ষে একটা বাঁশ নিয়ে মাঠে গিয়ে ব্যাটসম্যান গুলোকে তাড়া করার ইচ্ছাটাই প্রবল হয়ে ওঠে।আজকের দিনটাও সেভাবেই শুরু হয়েছিল, রাতে দেরিতে ঘুমিয়েছি, উঠেছি সাড়ে বারোটায়,আমার মত নবাবপুত্তুরকে তারপরেও মা নাস্তা দিয়েছে। সেটা নিয়ে টিভির সামনে বসামাত্র দেখলাম,ভেট্টোরির মোটামুটি মানের একটা বলে আমাদের আশকারা-পাওয়া-ফুল ব্যাটপ্যাডে সিলি পয়েন্টে অত্যন্ত সিলি ভাবে ক্যাচ দিয়ে সন্ন্যাসীর মত উদাস মুখ করে প্যাভিলিয়নের দিকে হাঁটা ধরেছে। আরেকবার মনে হলো, একে প্রতিদিন বিছুটি পাতা দিয়ে একবার করে পেটানো দরকার,যতই বয়স বাড়ুক তার ক্রিকেট সেন্স গজাবে না। স্কোরবোর্ডে রান তখন ৪৪/৪।

এমন স্কোরকার্ড আমাদের জন্য নতুন কিছু না,অনেক সময় এরচেয়ে কম রানেও বাংলাদেশের ৪-৫ টা উইকেট চলে যায়। যেটা নতুন, সেটা হলো এই ৪৪ রান এসেছে ৪৩ ওভারে,টেস্ট ক্রিকেটের ১৩১ বছরের ইতিহাসেই এমন ঘটনা আর আছে বলে জানা নেই, জেফরি বয়কট জানলে নিশ্চয়ই রাজিন তামিম আশরাফুলকে গুরু মানতো! তো সেই থেকে মুশফিক আর মেহরাব (জুনিয়র নামটা এখন মেহরাব হোসেনের নাম থেকে সরিয়ে দেয়া উচিত,কারণ আগের সেই মেহরাবের ছায়াও এখন আর এই দলে নেই) এর সংগ্রাম শুরু। প্রথম দিকে এটা তাদের সংগ্রামই বলা যায়, আস্তে আস্তে যেটা হয়ে দাঁড়িয়েছে নিউজিল্যান্ডের বোলারদের
সংগ্রাম।যতভাবে সম্ভব,নিউজিল্যান্ডের বোলার আর ফিল্ডাররা মিলে চেষ্টা করে গেছে এই জুটি ভাঙার,তাদের ব্যাটসম্যানরাও নির্ঘাত মনে মনে প্রস্তুতি নিয়েছিল চা-বিরতির পরেই ব্যাটিংয়ে নামার। কিন্তু শুরু থেকেই সত্যিকারের টেস্ট ব্যাটিং কেমন হতে পারে তার একটা নমুনা দেখতে শুরু করে তারা। মেইডেন ওভার,এক রান,দুই রান,বাজে বল পেলেই আবার বাউন্ডারি। মুশফিকুর রহিম একদম গুরুসিনহা বা নভজ্যোৎ সিধুর মতই শিট অ্যাংকর,বেশ স্লো,কিন্তু
একমাথা ধরে রাখা,অন্যদিকে মেহরাব হোসেনের স্ট্রাইক রেট একটু হলেও বেশি,মাঝে মাঝে ভাল বলকেও শায়েস্তা করতে দেখা গেছে তাকে।

যাই হোক,টেস্ট ক্রিকেট,খেলা চলুক,গেলাম জুম্মা পড়তে, এসে ভাবছি,গেছে এতক্ষণে আরো ২-১টা। টিভি খুলে অবাক,এখনো ২ জন ঠুকঠাক করে যাচ্ছে,হেলাফেলা করে বসলাম। সময় যায়,আমি পত্রিকা পড়ি,নেটে বসি,ঘুরোঘুরি করি,উইকেট পড়ে না। ভাত খাওয়া শেষ,তাও পড়ে না। আমারই অস্বস্তি লাগা শুরু হলো,ঘটনা কি,যায় না কেন,নিউজিল্যান্ডের বোলার আর কোচের গোমড়া মুখ দেখে তাদেরও যে একই প্রশ্ন সেটা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল না,৩৫ ডিগ্রির গরমে এমন ফাউ দৌড়াতে কারই বা ভাল লাগে,বিশেষ করে তারা যদি ১০ ডিগ্রির আরামদায়ক হাওয়া থেকে আসে?:)এর মাঝে মুশফিক আর মেহরাব কিছুটা মারতেও শুরু করেছে,পার্টনারশিপে ৫০ হয়ে গেছে,শট বেরোচ্ছে। শুধু ঠেকানো নয়,দেখা যাচ্ছে বাইরে বা একটু লাইন-লেংথের বাইরে বল পেলেই ক্লাসিক কিছু ক্রিকেট শট। দারুণ একটা সুইপ করলো মুশফিক,পরেই একটা স্কয়ার ড্রাইভ মেহরাবের,কিছু পরেই আরেকটা সুইপে চার। আসছে ফ্লিক,কভার ড্রাইভ,লফটেড অন আর অফ ড্রাইভ,স্কয়্যার কাট,তবে পুল আর হুক নয়,সাবধানী খেলা।

একসময় মেহরাবের ৫০ হয়ে যায়,নিউজিল্যান্ডের বোলার ফিল্ডারদের ক্লান্তি বাড়ে,ভেট্টোরির কপালে বিরক্তির ভাঁজ বাড়ে,আর বাইরে তাকিয়ে হাতিচুবানো গরম দেখে আমার হাসি বাড়ে, যা ব্যাটারা দৌড়া আরো। ততক্ষণে মজা পেয়ে গেছি, ঝিমানো ঠেকানো ক্রিকেটের মাঝেও যে একটা মজা আছে সেটা দেখা যাচ্ছে। ঠিক কোন বলটা ছাড়তে হবে, কোনটা মারতে হবে,সেটা সঠিকভাবে বিচার করে যখন কেউ খেলে,তখন আসলেই টেস্টক্রিকেট দেখা একটা আনন্দের ব্যাপার,যদি সত্যিকারের ক্রিকেটকে ভালোবাসা যায়। সন্দেহ নেই,সেটা দিয়েছে আজকে ২ ব্যাটসম্যান। শেষদিকে এসে রানের গতিও একটু বেড়েছে, দেখা গেছে আরো কিছু চমৎকার শট। ৮০ ওভার শেষ হতেই ভেট্টোরি নতুন বল নিয়ে নিল,আশা,কাইল মিলস আর ইয়ান ও'ব্রায়েন যেমন সকালে আতংক জাগিয়েছিল,এবারো হয়তো সেটা পারবে। গুড়ে বালি,যে ব্রায়েন আগের ২ স্পেলে ১১ ওভারে মাত্র ৮ রান দিয়েছিল,দিন শেষে সেটা হলো ১৭ ওভারে ২৫,৩য় স্পেলের প্রথম ওভারেই বাউন্ডারি খেয়ে যেটার শুরু। ৩য় স্লিপের উপর দিয়ে মেহরাবের মারা বাউন্ডারিটা একটু ঝুঁকিপূর্ণ হলেও দেখার মত,আর শেষদিকে এসেও বাংলাদেশ আর খোলসে ঢোকেনি,একই ওভারে পরপর ২টা বাউন্ডারি মেরে মুশফিকের ৫০ পূর্ণ করাটা সেটারই প্রমাণ। ভেট্টোরিকে ড্যান্সিং ডাউন দ্য উইকেটে এসে অনড্রাইভে বা একটু আগেই এক পা এগিয়ে মিলসকে অফড্রাইভে যে বাউন্ডারি দু'টো মেহরাব মেরেছে,দেখলে নেভিল কার্ডাসও নিশ্চিৎ নড়েচড়ে বসে টেস্ট ব্যাটিংয়ের সৌন্দর্য্যের উপর ২-১টা লাইন লিখে ফেলতেন।

তো,দিন শেষে যখন খেলোয়াররা সবাই মাঠ ছাড়ছেন, দৃশ্যটা এমন,স্কোরবোর্ডে বাংলাদেশের রান ১৮৩,উইকেট সেই ৪টাই রয়ে গেছে,দুর্লভ একটা দৃশ্য হিসেবে হাসিমুখে বাংলাদেশের ২ ব্যাটসম্যান,আর বোনাস হলো ত্যক্ত-বিরক্ত নিউজিল্যান্ডের খেলোয়ারদের মুখ। অন্যের কষ্টে নাকি আনন্দিত হতে নেই,কিন্তু ভেট্টোরির
চেহারা দেখে যে আনন্দ পেয়েছি সেটার তুলনা নেই,আহা,৫১ ওভার অথবা ২১৫ মিনিট এই গরমে দৌড়াতে বেচারাদের না জানি কত কষ্টই গেছে,তাও আবার কোন উইকেট ছাড়া!:) ৫১ ওভারের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে মুশফিকের ৫৯ রান,১৪৫ বলে,৯টা ৪,১টা ৬,আর মেহরাবের ৭৯ রান,১৬৪ বলে,১০টি ৪। ৯৪ ওভারে ১৮৩/৪,অথবা ৫১ ওভারে ১৩৯ রানের পার্টনারশিপ,ইমপ্রেসিভ কিছু মনে হয়না আপাতচোখে,কিন্তু পুনরুত্থানের যে গল্প এখানে লেখা হয়েছে সেটা এই খেলা যারা দেখেছে তারাই বুঝবে, সাথে টেস্ট ব্যাটিংটা বাড়তি পাওনা, আরো বোনাস হলো ৫ম উইকেটে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রান,আগের রেকর্ডটা ছিল আশরাফুল আর বুলবুলের সেই কলম্বো টেস্টে। যদিও অতীত ইতিহাস বলে,কাল সকালেই ঝটপট উইকেট পড়ে বাংলাদেশ ২৫০ এর আগেই অলআউট হয়ে যেতে পারে,কিন্তু তাতে এই দু'জনের লড়াই ম্লান হয়না। কাজেই,তুলে রাখলাম ব্লগে,সাথে অভিনন্দন জানিয়ে রাখলাম মুশফিক আর মেহরাবকে।

[একটা দুরাশা হিসেবে যোগ করে রাখি,যেকোন উইকেটে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পার্টনারশিপ হলো ১৯১ রানের,৬ষ্ঠ উইকেটে,অংশীদার ছিলেন আশরাফুল আর মুশফিক। রেকর্ডটা এবার ভাঙলে ভালই হতো,রান গুলো বড় দরকার]
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ৮:১৩
২৭টি মন্তব্য ২৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×