somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আবার প্রার্থনা

০১ লা নভেম্বর, ২০০৮ রাত ২:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বারবার এই জিনিস নিয়ে লিখতে ভাল লাগে না। যতবার লিখতে বসি এটা নিয়ে ভাবি আর লিখবো না, যেটা জীবনের অনিবার্য সত্য সেটাকে মেনে নেয়াই উচিত। কিন্তু বেহায়া বলে আর সাথে কোন কিছুই মেনে নিতে না পারার অক্ষমতার জন্য যে কুখ্যাতি সেটাই বারবার কীবোর্ডের দিকে আঙ্গুল নিয়ে যায় আর বারবারই সবাইকে বিরক্ত করে মারি। এটাই নিয়তি যে সবাই যা চায় না সেটাই বারবার করতে হয় আর তারপরে আবারো করতে হয় আর তারপরে আবারো পৌনপুনিকের
শর্ত মেনে অনন্ত ধারাতে চলতে হয়, অসীমতক সমষ্টি কত সেটা না জেনেই।

এত প্যাঁচানোর কারণটা খুব সরল- বন্ধুবিদায়। ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়ে গেছে কয়দিন পরে পরে কেউ একজন বিদায় হবে আড্ডা থেকে আর সেটা নিয়ে প্যানপ্যান করে কিছু একটা লিখবো। বন্ধুমহলে (হয়তো সব মহলেই) ছিঁচকাদুনে বা ন্যাকা বলে কুখ্যাতি আরেকটু বাড়বে। বা এভাবেই যাবে সবাই,এমনো না যে দুনিয়ার বাইরে কোথাও যাচ্ছে বা যোগাযোগ হবে না, কিন্তু তারপরেও অদ্ভুত একটা অনুভূতি যেটা লিখিয়ে ছাড়ে সেটা হলো যে দিন শেষ হয়ে এলো, আমাদের ঘুড়ি ওড়ানোর বেলা গোধুলির দিকে হেঁটে চললো। মনে হয় যে কয়েক বছর পরে দেখা হলেই আর হুংকার দিয়ে ঘাড়ে হাত দিয়ে 'আরে মামা খবর কি' বলে উচ্ছ্বসিত হতে পারবো না অথবা ৩ টাকার চা এর বিল নিয়ে হইচই করতে পারবো না। ঠিক যেন বন্ধুর বিদায় না, একটা সময়ের বিদায়; যে সময়টাকে আমরা গড়ে তুলেছিলাম অনেক বেশি জীবন আর লাগামছাড়া কণ্ঠ দিয়ে। বন্ধুত্ব আমাদের সোনালি আঁশের প্রতিনিধি, তার বুড়োকালের জন্য একটা এলিজি লেখাই যায়।

বলছিলাম চৌধুরীর কথা, যাকে আমরা বলি চৌধুরী বংশের প্রতিষ্ঠাতা। কেন বলি সেটা অনেকে ভুলেই গেছে, তবে পিছনের ইতিহাস হলো তার বংশে সে-ই প্রথম চৌধুরী। আমাদের সকল কুকর্মের সঙ্গী ও সাক্ষী, আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অংশগ্রহণকারী, এবং যাকে আমরা বলি "কট খাওয়া"র অগ্রপথিক, তারও উড়ে যাবার সময় হয়ে গেছে। চেষ্টা করছিলো অনেকদিন থেকেই, তারপরেও যতবারই কেউ বলে চলে যাচ্ছি কেমন যেন একটা ধাক্কা খাই। এই যুগে ফালতু আবেগের দাম নেই, ব্যাপারটা বোঝা উচিত আর সেজন্যই কংগ্রাটস জানাই, কিন্তু মনে হয় সুতোটা ছিঁড়ে যাচ্ছে কোথাও। ঈর্ষা নয়, কোন এক ধরণের স্বার্থপরতা, অতীতকে ধরে রাখার। এই অনুভূতি হয়েছিল যেদিন কলেজের টেবিল টেনিসের টেবিলটা ছেড়ে আসি, হয়েছিল যেদিন ভার্সিটির ক্যাফেটেরিয়া থেকে শেষবারের মত দল বেঁধে বের হয়ে আসি, হয়েছিল যেদিন মোটকার সাথে ধানমন্ডি লেকের পাশে হাত মিলিয়ে সামনে হাঁটা ধরি, হয়েছিল যেদিন মতিউরের বিদেশের অ্যাডমিশন লেটারটা দেখি। এই স্বার্থপর অনুভূতি আমার অচেনা কিছু না, কিন্তু এই দেজা ভুঁ থেকে বের হতে পারি না; চক্রের মত বাকি জীবন বারবারই মুখোমুখি হতে হবে, কোনদিন হয়তো নিজের কাছে নিজেকেও।

যাওয়ার আগে অবধারিত একটা শেষ বাঁশ দেয়ার চেষ্টা করা হয়, তবে চৌধুরী মনে হয় ৫ বছরের অভিজ্ঞতায় ঠেকে শিখেছে,ফোন করতে জানায়, এত বেশি ব্যস্ত যে কোন কিছুরই সময় পাচ্ছেনা। কথা বেশি বাড়াই না। ২ দিন পরে ফ্লাইট হলে সময় থাকারও কথা না, তারপরেও একবার মনে করে দেই পরের দিন পারলে চলে আসতে। চেষ্টা করবে,জানায়,ভরসা পাই না,সবসময় কট খাওয়া চৌধুরী এবার হয়তো আমাদেরই কট দিয়ে দেবে।

রুমে ফিরে পিসি ছেড়ে বসি। এলোমেলো ড্রাইভগুলো খোঁজাখুঁজি করি মন ভালো করার কোন গানের আশায়। কাজের মাঝে কাজ হয়। একটা ভিডিও পাই, সেন্ট মার্টিন্স লেখা, এডিটেড বাই রাসেল। ছাড়বো না ভেবেও ছেড়ে দেই। একটা হাহাকার করা সুরের সাথে পর্দায় একগাদা মন খারাপ করা মুখ ভেসে আসে, অতীতচারীর জন্য সবই অবশ্য কষ্টের। সাজিদ, রাহাত, মাহফুজ, স্বপন, মোটকা, রুকন, চৌধুরী, দুলা, রিপন, সুফল, সুরা, আদু, সুপন, নূরা পাগলা- এককালের অনেকগুলো প্রিয় মুখ। ভাবার চেষ্টা করি কে কোথায়। আছে,এখনো অনেকেই নাগালের মাঝে আছে। দায়িত্বশীল প্রকৌশলী একেকজন, দম ফেলার অবসর নেই। ক্যারিয়ারের দৌড়ে বাকি সব হারিয়ে যাচ্ছে। বড় লক্ষ্যের দিকে দৌড়াচ্ছে কেউ কেউ। আমার মত ভ্যাগাবন্ডও যে ২-১ টা নেই তাও না, কিন্তু সংখ্যা
কমছে। খুঁজে নিচ্ছে যে যার ঠিকানা, শূন্য করে যাচ্ছে কথা বলার টেবিল।

যাক, মনমেজাজ বিগড়ে লাভ নেই। যাদের যাবার তারা যাবেই, আসলে সবারই যাবার কথা। রাসেলকে ফোন দেই আসতে। গাঁইগুই করে শেষমেশ রাজি হয়। গল্প হয়- অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ। চৌধুরী কেন দাওয়াত খাওয়াবে না সেটা নিয়ে গবেষণা চলে; হাফিজের শ্বশুরবাড়ি আর মামাতো চাচাতো শালীদের নিয়েও খানিক গবেষণা চলে। কিন্তু ঘুরেফিরে সেই ভবিষ্যৎ - কোথায় যাবো কি করবো। ঘুরেফিরে সেই বন্ধুমহলের খবর। আজব এক চক্র, কেউই থাকবে না, তারপরেও ঘুরেফিরে
চক্রে ফিরতে হয়; মায়া কাটাতে পারি না। রাতে মোটকার সাথে কথা, ফিনল্যান্ড ঘুরতে যাবে জাহাজে করে। ফ্রি টিকেট পেয়ে গেছে, ভয়টা হলো জাহাজে যা দাম খাবারের হাড়িপাতিল না নিয়ে উঠলে ২ দিন না খেয়েই থাকতে হবে। অভয় দেই, এমন তো না খেয়েই ক্ষ্যাপার মত ঘুরেছে কত জায়গায়; এখন গেলে সমস্যা কোথায়? দিন হয়তো বদলেই যাচ্ছে, আমিই হয়তো দিন বদলের গান শুনতে পাচ্ছিনা, সোনালি আঁশের দিন গুনে হেলায় ফেলে দিচ্ছি সময়কে।

আমি দিন গুনতে থাকি, তবে এই বেলার জন্য অনেক বেশি কথা গোনা হয়ে গেছে; শুধু প্রার্থনাটুকু ছাড়া। যতবার কেউ দূরে যায়, আমি প্রার্থনা করি। ছোট্ট একটা প্রার্থনা- ভাল থাকবে, ভাল থাকবি, ভাল থাকবেন। আমি হয়তো ভাল নেই কিন্তু আমি শুনতে চাই আমরা ভালো আছি। চৌধুরী, অনেক দূরে ভাল থাকবি, যেমন আমরা ভালো আছি তার চেয়ে অনেক অনেক ভাল।

[যতিচিহ্ণ ঠিকমত দিই না বলে লেখা পড়তে অনেকেরই কষ্ট হয়,ব্লগার আশরাফ মাহমুদ অনেকদিন থেকেই অনুযোগ করছিলেন। চিরকালীন অলস আমি সেটা শুনি শুনি করেও শুনছিলাম না। আশরাফ ভাই নিজেই এবার এগিয়ে এসে পুরো লেখাটা পড়ে যতিচিহ্ণ ঠিক করে দিলেন,সেটাই এখানে বসালাম। আমার সব বন্ধুরাই এমন,যতবার আমার গাফিলতির জন্য পথে বসে পড়েছি,হাতে ধরে আমাকে আবার তুলে দিয়েছে জীবনের রাস্তায়। আশরাফ ভাইকে ধন্যবাদ,কথাটা আরেকবার মনে করিয়ে দেয়ার জন্য।]
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা নভেম্বর, ২০০৮ ভোর ৬:৪৩
৩৬টি মন্তব্য ৩৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×